সুষমার ঢাকা জয় ও রাজনীতিকদের মুখোশ উন্মোচিত

স্টালিন সরকার :  ঢাকা ঘুরে গেলেন ভারতের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। তিনি কার্যত বাংলাদেশের জনগণের বদলে বড় তিন দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাদের হৃদয় জয় করেই গেছেন। তার এই শুভেচ্ছা সফরে বাংলাদেশ এবং দেশের জনগণ কিছু না পেলেও বড় দলগুলোর নেতাদের দৌড়ঝাঁপ, তোষামোদীর প্রতিযোগিতা নাটক-সিনেমাকে হার মানিয়েছে।

এমনকি দুই দল থেকেই অতিথির কাছে ‘আমি-আমরা তোমাদের লোক’ প্রমাণের প্রণান্তকর চেষ্টা দেখেছে দেশের মানুষ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ চেষ্টা লোকলজ্জাকেও হার মানিয়েছে।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে যাতে সুষমা দেখা না করেন সে চেষ্টা যেমন হয়েছে- তেমনি রওশন এরশাদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যবস্থাও করে দেয়া হয়েছে। আর আমরা ওদের (কংগ্রেস) নই আপনাদের (বিজেপি) প্রমাণের সব চেষ্টাই হয়েছে সরকার পক্ষ থেকে। এমনকি ভারতের মোদী সরকার ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন প্রার্থীবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষকে সেটা বোঝাতে ‘কেরাস’ এখনো চলছে। এ জন্য সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, বিদ্যাজীবী এবং দল সমর্থিত সাংবাদিকদের মাঠে নামানো হয়েছে।

অন্যদিকে মাথামোটা কিছু আমলার ‘মন্ত্রণায়’ বিএনপি নেত্রী প্রটোকল ভেঙে ভারতের একজন মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে নিজের দল, সমমনা দল এবং জাতীয়তাবাদী ধারার রাজনীতির প্রতি বিশ্বাসী মানুষের ইগোর প্রতি অবিচার করেছেন।

ভারতের নির্বাচনের সময় ‘দিল¬ীর মসনদে’ কারা বসেন সেটা দেখার জন্য চাতক পাখির মতো তাকিয়ে ছিল বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। আওয়ামী লীগের প্রত্যাশা ছিল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে সহায়তা, সমর্থন এবং নতুন সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলকে টানতে সহায়তা করা কংগ্রেস বিজয়ী হয়ে আবার ক্ষমতায় বসবে। আর বিএনপির প্রত্যাশা ছিল ‘র’ এর দৃষ্টিতে বাংলাদেশ দর্শন করা কংগ্রেসের পরাজয়। তাদের বিশ্বাস সত্তর দশকের মাঝামাঝি ইন্দিরা গান্ধীর পরাজয়ের পর ভারতের মোরারজি দেশাই সরকার যেমন আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল; তেমনি নরেন্দ্র মোদী সরকারও সে পথ অনুসরণ করবে। ভারতের নির্বাচনের সময় উভয় দল নিজেদের মতো করে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে। ফলাফল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ ক্ষণিক সময় ‘হতোদ্যম’ এবং বিএনপি ‘উলে¬াসিত’ হলেও অভিনন্দন জানাতে তারা প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন।

কার আগে কে অভিনন্দন জানাবেন, চিঠি দেবেন এবং ফোনে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে কথা বলবেন তার প্রতিযোগিতা হয়। মোদী সরকারের মেয়াদ এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই ঢাকা সফরে আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (আর এস এস নিয়ন্ত্রণাধীন বিজেপি নেত্রী) সুষমা স্বরাজ। তার ঢাকা সফরের খবর নিশ্চিত হওয়ায় শুরু হয় প্রচারণা আর ঢাকঢোল পেটানো।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সাবেক কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের মতামত হলো, গুজরাটের নরেন্দ্র মোদী দিল¬ীর হালচাল এখনো ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারেননি। বাংলাদেশ সম্পর্কে তার ধারণা বেশি নেই। বাংলাদেশ সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে তার সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। এ জন্য দিল¬ী থেকে সুষমার ঢাকা সফরকে শুভেচ্ছা সফর হিসেবে বলা হলেও প্রচার হতে থাকে তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত সমস্যাসহ দু’দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হবে। ভারতের জনগণ থেকে প্রত্যাখ্যাত কংগ্রেসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মধুর সম্পর্ক। এ সম্পর্কের খবর বিজেপি জানে। সে জন্য আওয়ামী লীগের অনেকেরই আশঙ্কা বিজেপি ক্ষমতায় এসেই হয়তো বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেবে। ‘র’ চোখের বদলে তারা আর এস এস-এর চোখে বাংলাদেশ দেখতে শুরু করবে। এ আশঙ্কা থেকেই আওয়ামী লীগের তরফ থেকে ‘ভয় তাড়ানিয়া’ গান গাওয়ার মতো একটা কথা প্রচার করা হয় সরকার পরিবর্তন হলেও ঢাকার মতো দিল¬ীর বিদেশ নীতির পরিবর্তন হয় না। বিজেপির বিজয়ে বিএনপির উল¬াস করার কিছু নেই।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় জনগণ ভোট দিতে পারেনি বলে যারা ‘উদোর পি-ি বুদোর ঘাড়ে’ চাপাচ্ছেন সেই সুবিধাভোগী সুশীল, বিদ্যাজীবী, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী লেখক-সাংবাদিকরা নানা পদের লেখায় এবং টিভির টকশোতে এটা প্রমাণ করতে গলদঘর্ম হচ্ছেন কংগ্রেসের মতো ভারতের মোদি সরকারের সম্পর্কও বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকরের সঙ্গেই থাকবে। দিল¬ীর সরকার পরিবর্তন হলেও বিদেশি নীতির পরিবর্তন হয় না।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ নতুন সরকারের মেয়াদ এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই বিদেশ সফরের জন্য বাংলাদেশকে বেছে নেয়ায় বেজায় আনন্দে তারা বগল বাজাতে থাকেন। তারা প্রচার করেন আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন জানাতেই সুষমাদি প্রথমেই বাংলাদেশে আসবেন। সুষমা স্বরাজ দিল¬ী সফরে যাওয়ার জন্য নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণপত্র বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়ায় সুবিধাভোগীরা দারুণ খুশি। তারা একে অন্যের কাছে জানান দেন ‘তাদের সব আশঙ্কা কেটে গেছে’।

প্রশ্ন হলো, এক সরকার প্রধানকে অন্য সরকার প্রধানের এ ধরনের আমন্ত্রণ কী অস্বাভাবিক কিছু? অন্যদিকে বিএনপি থেকে দেশবাসীকে এমন একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে যে ‘কংগ্রেস ওদের (আওয়ামী লীগ), বিজেপি আমাদের (বিএনপি)।’

এটা ঠিক ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে কংগ্রেস সরকার কূটনীতির রীতিনীতি পরিহার করে আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় বসাতে সব চেষ্টা তদবির করেছে। সে সময় ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং প্রার্থী ও ভোটারবিহীন দশম সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ সফরকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করে আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় আনার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণে প্রভাবিত করেন।

বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে তিনি সে সময় যে আচরণ করেন তা কোনো কূটনীতির পর্যায়ে পড়ে না। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করে কংগ্রেস ও কংগ্রেসি সরকারের মনোভাব জানিয়ে দেন তিনি। কিন্তু এরশাদ সাংবাদিকদের মাধ্যমে তা দেশবাসীর কাছে ফাঁস করে দেয়ায় ‘বিব্রতকর’ অবস্থায় পড়ে আওয়ামী লীগ ও ভারতের কংগ্রেস সরকার। সুজাতা সিং এরশাদকে জানিয়েছিলেন জাতীয় পার্টি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন না করলে মৌলবাদী শক্তি বাংলাদেশে ক্ষমতায় এসে যাবে। তাই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনা উচিত। তাই শেখ হাসিনা যেভাবে বলেন, সেভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুন। বার্তাটি স্পষ্ট যে নির্বাচনে সব দল অংশগ্রহণ করলো কী করলো না, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলো কি হলো না, ওইসব কংগ্রেসের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় বসানো। সেই সুজাতা সিংকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় এসে সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশের মানুষকে যে বার্তাটি দিয়ে গেলেন তা খুবই রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ।

সংসদে না থাকা এবং বিরোধী দলের নেত্রী না থাকার পরও বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় নেত্রী হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তিনি আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন (ভারতীয় পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে বেগম জিয়ার সঙ্গে যাতে সুষমা বৈঠক না করেন সে জন্য চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ সরকার)। ঢাকায় সুষমার সফরসঙ্গী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখপাত্র সৈয়দ আকবর উদ্দিন প্রেস ব্রিফিংয়ে যা বলেছেন, কোনো বিশেষ দলের সঙ্গে নয়, তাদের নীতি হবে এ দেশের সব গণতান্ত্রিক দল ও জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্ব, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক।

সুষমা স্বরাজ ঢাকায় ব্যস্ত সময় কাটালেন। নিয়ন অনুযায়ী তিনি সবার সঙ্গে বৈঠক করলেন। তিনি যে শুভেচ্ছা সফরে এসেছেন সেটাও জানিয়ে দিতে ভুল করেননি। কিন্তু খবর হলো অন্য জায়গায়। সুষমা স্বরাজ যাতে অন্য পক্ষের না হয়ে যান সে জন্য তাকে খুশি করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। ভারতবিরোধী দল হিসেবে পরিচিত বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিরোধীদলীয় নেতা থাকাবস্থায় ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরের সময় তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের আয়োজন করেও পরে সেটা বাতিল করেন। তিনি কী দেশের জনগণের কাছে নিজেকে ভারতবিরোধী নেত্রী হিসেবে জাহিরের জন্যই মাথামোটা আমলা কাম নেতাদের পরামর্শে সেদিন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

এ ধরনের হটকারী সিদ্ধান্তে কী তার ইমেজ বেড়েছে? সেই বেগম খালেদা জিয়া একজন মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে প্রটোকল ভেঙে ছুটে গেলেন। তিন বারের প্রধানমন্ত্রী, দ্ইু বারের বিরোধীদলীয় নেতা হয়ে হোটেলে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন। শুধু তাই নয়, তার মুখে চুনকালি দিলেন তারই উপদেষ্টা মাথামোটা সাবেক আমলা শমসের মোবিন চৌধুরী। সুষমার সঙ্গে বৈঠকের পর শমসের মোবিন চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, বেগম খালেদা জিয়া সুষমা স্বরাজের কাছে ‘নালিশ’ করেছেন।

প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের মানুষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। জনগণের ভোট কেড়ে নিয়ে প্রহসনের নির্বাচন করা হয়েছে। জনগণের নেত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার এ তথ্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরা কী নালিশের পর্যায় পড়ে?

এই মাথামোটা আমলারাই সে সময় বিএনপির শীর্ষ নেত্রীকে বুঝিয়েছিল ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকিয়ে দেবে বিদেশীরা। যার কারণে বিএনপি জনগণের চেয়ে বিদেশিদের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। একই কাজ করেছে ওই মাথামোটা সাবেক আমলা কাম বিএনপি নেতারা নির্বাচনের পর নেতাকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে হঠাৎ আন্দোলন স্থগিত করে।

অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়া অতিথি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জামদানি শাড়ি দিয়েছেন এ খবর শুনে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। এই বোধ হয় বেগম জিয়া ম্যানেজ করে ফেললেন সুষমাকে। এ আশঙ্কা থেকেই আওয়ামী লীগের নেতা, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এমনকি শেখ রেহানা ও সায়মা ওয়াজেদ ছুটে যান হোটেলে। আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত সংখ্যালঘু হিন্দু নেতাদের কাজে লাগানো হয় সুষমা যেন বেগম খালেদা জিয়ার কথায় গলে না যান। তবে এটা ঠিক যে সুষমা স্বরাজ ঢাকার আতিথেওতা যেমন মনে রাখবেনÑ তেমনি মনে রাখবেন বাংলাদেশের অসুস্থ নেতানেত্রীদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনাসুলভ আচরণ।

কংগ্রেস পুরনো বন্ধু আওয়ামী লীগের। নির্বাচনে লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়েছে দলটি। বন্ধুর বিপদে বন্ধুকে সান্ত¦না দেয়ার কথা। কিন্তু সে পথে না গিয়ে বন্ধুর প্রতিপক্ষ বিজয়ীদের অনুকম্পা আদায়ে মরিয়া হয়ে উঠে আওয়ামী লীগ। কংগ্রেসের সোনিয়া গান্ধি, রাহুল গান্ধিরা এতোদিনে বুঝে গেছেন তারা কার সঙ্গে নিবিড় বন্ধত্বের সম্পর্ক করেছিলেন। অন্যদিকে বিএনপি কী তাদের ভারতবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে এসেছে? তারা কী এরেই মধ্যে বুঝতে পেরেছেন বাংলাদেশের জনগণ নয়; দিল¬ীর ছায়া যে দলের ওপর থাকবে তারাই ঢাকায় সরকার গঠন করবে? সেই জন্য কি হঠাৎ দিল¬ীকে খুশি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো কেন দলটি? বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনে অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর কথা বিএনপি কী ভুলে গেল? ১৯ দলীয় জোটের বেশ কয়েকজন নেতা হঠাৎ করে দিল¬ীর কাছে বিএনপির এ নতজানু মানসিকতা মেনে নিতে পারছেন না। তাদের কেউ কেউ বলছেন, সুষমার সঙ্গে বৈঠকে যদি জোর দিয়ে তিস্তার চুক্তি, সীমান্ত হত্যাকা- বন্ধ, টিপ্ইামুখে বাঁধ বন্ধসহ জাতীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরতেন তাহলে তিনি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতেন। দেশের জনগণও তার প্রতি খুশি থাকতেন। কিন্তু শমসের মোবিন চৌধুরী বৈঠক থেকে বের হয়ে সে বার্তা (সুষমার কাছে নালিশ করেছেন বেগম জিয়া) দিয়েছেন তাতে বেগম খালেদা জিয়ার ইমেজ ক্ষুণœ হয়েছে।

জাতীয় পার্টির অবস্থা আরো করুণ। বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে বেগম রওশন এরশাদকে দেশ-বিদেশের কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। বিদেশিরা ঢাকা সফরে এলে এবং ঢাকায় কর্মরত দাতাসংস্থা ও বিদেশি দূতাবাসে কর্মরত কূটনীতিকরা কেউ রওশন এরশাদকে পাত্তা দেন না। তারা মাঠের বিরোধী দল হিসেবে পরিচিত বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এ জন্য মনের দুঃখে রওশন এরশাদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছেন কোনো বিদেশি ঢাকা সফরে এলে মন্ত্রণালয় যেন বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে তার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন।

বেগম জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন অথচ রওশন এরশাদের সঙ্গে দেখা করেন না এজন্য সরকারের ওপর মহলও বিদেশিদের ওপর ক্ষুব্ধ। আর সুজাতা সিং ৫ জানুয়ারির আগে ঢাকায় এসে এরশাদকে যে প্রস্তাব দেন তিনি তা প্রকাশ করে দেয়ায় সুষমা স্বরাজ বিরোধীদলীয় নেতা রওশনের সঙ্গে দেখা নাও করতে পারেন সে আশঙ্কায় অস্থির ছিলেন রওশন এরশাদ। সরকারের সহায়তায় অবশ্য সুষমা স্বরাজ বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরে বড় দলগুলোর এ দৌড়ঝাঁপ আর একে অন্যেকে টেক্কা দেয়ার মানসিকতায় জনগণের সামনে তাদের রাজনীতির মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে। দেশের জনগণ নয় বিদেশিরাই যে তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূণ সেটাই তারা প্রকাশ করেছেন। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রবীণ সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, ‘একটি রাষ্ট্রের জন্য যে ধরনেরই হোক একটি সরকার অপরিহার্য, গণতন্ত্র অপরিহার্য নয়। অনেক রকম সরকার পদ্ধতির মধ্যে গণতন্ত্রও একটি পদ্ধতি মাত্র। গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা। হাজার হাজার বছর পৃথিবীতে রাষ্ট্র ছিল, গণতন্ত্র ছিল না। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বয়স সবচেয়ে কম। একটি রাষ্ট্রে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম সরকার থাকতে পারে।

রাজতন্ত্র-সামন্ততন্ত্র অতীতের বিষয়। একালেও কোথাও গণতান্ত্রিক সরকার থাকতে পারে। সামরিক সরকার থাকতে পারে। অগণতান্ত্রিক অসামরিক সরকার থাকতে পারে। আধা সামরিক, আধা গণতান্ত্রিক সরকার থাকতে পারে। সাংবিধানিক সরকারই যে থাকবে সব সময়, তার নিশ্চয়তা একেবারেই নেই; অসাংবিধানিক সরকার দ্বারাও দেশ পরিচালিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, মোটেই সমর্থনযোগ্য না হলেও, বেশ ভালোভাবেই হয়। বাংলাদেশের হতভাগ্য মানুষের নিয়তি এমনই যে সব ধরনের সরকার দ্বারাই তারা শাসিত হয়েছে। স্বাধীনতার আগেও হয়েছে, স্বাধীনতার পরেও হয়েছে এবং হচ্ছে। গণতন্ত্রের স্বাদ ছাড়া আর সব রকম সরকারের স্বাদই তারা পেয়েছে।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, যে ভাবেই হোক একটি সরকার বর্তমানে ক্ষমতায়। সেটা গণতান্ত্রিক হোক আর অগণতান্ত্রি হোক। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হোক আর জনগণের ভোট ছাড়া পাতানো নির্বাচনেই হোক।

সরকারের কাজ সরকার করবে। কিন্তু প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা এবং বিদেশিদের প্রতি এতো নির্ভরশীল হওয়া এবং সেটা জনগণকে বোঝানোর প্রণান্তকর চেষ্টা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। দেশপ্রেমতো নয়ই। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. নুরুল আমিন ব্যাপারির মতে, জনগণ থেকে রাজনৈতিক দলগুলো যখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তখন তাদের আচরণ হয় এমনই। তাহলে কী দেশের বড় দলগুলো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে?

ইনকিলাব

You Might Also Like