সরকার পতনের আন্দোলন

বহুবার শোনা কথা। শুধু ঈদের পর নয়, এসএসসি পরীক্ষার পর বর্ষা মওসুমের পর স্বাধীনতা দিবসের পর বিজয় দিবসের পর এই বছরের পর- সরকার পতনের এই টার্গেটের কথা শুধু গত পাঁচ বছরেই নয়, এর আগের পাঁচ বছর তার আগের পাঁচ বছর তার আগের পাঁচ বছর অর্থাৎ যেদিন থেকে দুই নেত্রীর মধ্যে ক্ষমতার মিউজিক্যাল চেয়ার রেস শুরু হয়েছে সেদিন থেকেই আমরা শুনে আসছি। এই ধরনের বচন আমরা শেখ হাসিনার মুখে শুনেছি, অতীতে বেগম খালেদা জিয়ার মুখে শুনেছি, এখনও শুনছি। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে এতবার শুনেছি যে নেত্রী আ উচ্চারণ করলেই পাবলিক বুঝতে পারে তিনি কখন আম খেতে চাইছেন আর কখন আমড়া পাড়তে বলছেন! এই সমস্ত হুংকার এখন আর দেশের মানুষকে নাড়া দেয়না উদ্বেলিত করেনা।
তারপরও নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে মানুষের মনে আশা জাগিয়ে রাখতে মাঝে মাঝে বিরোধী নেতা-নেত্রীদেরকে এমন হুমকী ধমকি দিতে হয়, বেগম জিয়াও দিয়ে আসছেন। এটা আমাদের দেশের বিরোধী রাজনীতির একটা সাধারন বৈশিষ্ট্য। এতে নতুন করে চমকিত হবার কিছু নাই। সেদিন বেগম জিয়া যখন ঘোষনা করেছেন রোজার ঈদের পরই তিনি সরকার পতনের এক দফার আন্দোলন গড়ে তুলবেন কারও মাঝেই কোন প্রতিক্রিয়া হয় নাই, না নিজ দলের নেতাকর্মীদের মাঝে না জনগনের মাঝে না সরকারের মাঝে। সবাই এটাকে এক ধরনের বাত কা বাত’ই ধরে নিয়েছেন।
কেন এমনটা মনে করা হচ্ছে! পত্র পত্রিকার প্রচারণা মতে বিএনপি এখন ভীষনভাবে অসংগঠিত, নেতাকর্মীদের মাঝে দ্বিধাদ্বন্ধ অবিশ্বাষ সন্দেহ তীব্র। সরকার পতনের আন্দোলন দুরের কথা সাধারন হরতাল অবরোধের মত আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষমতাও এই দলটির আর অবশিষ্ট নাই। দ্বিতীয়ত: আওয়ামী লীগ সরকার এখন অতীতের যে কোন সময় থেকে সংহত অবস্থায় আছে। গত পাঁচ বছরের মতই আগামী পাঁচ বছরও ক্ষমতায় টিকে থাকার ব্যপারে তারা ভীষণভাবে আতা¥প্রত্যয়ী। আগামী বছরের শুরুতে নতুন নির্বাচন দুরের কথা কোন ধরনের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথাও তারা ভাবছে না। তৃতীয়ত: এই সরকার মানুষের মনে এমন আতংক তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে যে, সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামলেই গুলী করে মেরে ফেলা হবে বা ধরে নিয়ে গুম করে ফেলা হবে। চতুর্থত: ক্ষমতা ধরে রাখার মেকানিজম এবং মেশিনারিজ এখনও ষোল আনা আওয়ামী লীগের হাতেই আছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা ৫ জানুয়ারির তামাশার নির্বাচন ঠেকাতে সকল বিরোধী দল মিলে যে সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল তা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে নজীর বিহীন। স্বাধীনতার পর থেকে সরকারবিরোধী কোন আন্দোলনে এত রক্তপাত এত প্রানহানি ঘটে নাই যা ঘটিয়েছে হাসিনা সরকার নিকট অতীতে। সেই আন্দোলনও সফল হয় নাই। কাজেই বেগম জিয়া ঈদের পর বা সহসাই আর একটা আন্দোলন গড়ে তুলে এই সরকারের পতন ঘটাতে পারবেন সাধারন হিসাবে এমনটা মনে করা এক ধরনের আহম্মকীও বটে! অবশ্য তেমনটা কেউ মনে করেও না।
তবে হ্যাঁ একটা ফ্যাক্টরকে যদি নিউট্রালাইজ করা যায় তাহলে হয়তো একটা অবস্থা তৈরী হতে পারে। দিল্লীর স্ট্যান্ড। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যপারে দিল্লী যদি নিরুপেক্ষ ভুমিকা পালন করে তাহলে অনেক হিসাব কিতাবই উল্টে যেতে পারে বলে মনে করা হয়। প্রশ্নটা হচ্ছে বাংলাদেশে যদি আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কোন অলআউট আন্দোলন গড়ে ওঠে দিল্লী কার পক্ষ নেবে! শেখ হাসিনার না বেগম জিয়ার। বাংলাদেশে হাসিনা সরকারের যে ভিত্তি তা গোটা দুনিয়া জানে। দিল্লীও জানে। ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রীও জানেন সোনিয়া-মনমোহনের কংগ্রেস সরকার কিভাবে উলংগ হয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের জনমতকে পায়ে দলে হাসিনা সরকারকে বসিয়ে দিয়েছে। কংগ্রেস সরকার বসানো হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বেগম জিয়ার আন্দোলনে মোদী সরকার যদি নিরুপেক্ষও থাকে তা হবে বেগম জিয়াকে সমর্থন করার শামিল। কেবল তেমন ক্ষেত্রেই বেগম জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবেন এবং সে আন্দোলনে সফলও হতে পারবেন অর্থাৎ শেখ হাসিনাকে নতুন নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে পারবেন। দল গোছানো না নড়বড়ে নেতা কর্মী আছে কি নাই সেসব তখন কোন সাবজেক্টই থাকবে না। মনে রাখতে হবে ’৯০এ এরশাদবিরোধী আন্দোলনও বেগম জিয়া করেছিলেন এই নড়বড়ে দল নিয়েই, ’৯১এর নির্বাচনে তিন শ’ আসনে প্রার্থী দেয়ারও লোক তার ছিলনা!
মোদী সরকার কোনটা করবে!
নির্বাচন শেষে নতুন সরকার বসে গেছে বেশ কয়েক সপ্তাহ হলো। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যপারে অবস্থান ষ্পষ্ট করেনি মোদী সরকার। শপথ অনুষ্ঠানে উপমহাদেশ তো বটেই বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো থেকে সরকারপ্রধান রাষ্ট্রপ্রধানসহ বড় মাপের নেতানেত্রীরা যোগ দিয়েছিলেন। এমনকি ভারতের যে চিরশত্রু পাকিস্তান, তারও সরকারপ্রধান গিয়ে হাজির হয়েছিলেন সেখানে। অথচ যার হাজির হওয়া কাংখিত ছিল সবার আগে সেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তখন জাপান সফরের উছিলায় বিদেশে। কেন এমনটি করলেন শেখ হাসিনা! বাজারে চাউড় ভারতের নতুন সরকারের কাছ থেকে অভ্যর্থনার ব্যপারে কোন গ্রিন সিগন্যাল না পাওয়াতেই মাননীয় শেখ হাসিনা সে শপথ অনুষ্ঠান এড়াতে নিজে জাপান গিয়ে ষ্পীকারকে দিল্লী পাঠান। দিল্লী ব্যপারটা খেয়াল করেছে এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের সাথে খুবই সাদামাটা সৌজন্যতা দেখিয়েছে।
এরপর এলেন মোদী সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। মন্ত্রী হবার পর বাংলাদেশেই তার প্রথম বিদেশ সফর। ভারতীয় মন্ত্রীর এই সফরকে কেন্দ্র করেও এক পুরনো নোংড়া খেলার ছক কাটা হয়েছিল। কয়েক বছর ধরে মামলা রায়ের অপেক্ষায় পড়ে আছে ফাইলে ধুলার আস্তরণ, হুট করে সুষমা স্বরাজের আসার আগের দিন জামাত নেতা মাওলানা নিজামীর মামলার রায়ের দিন ধার্য্য করা হলো। দুষ্টু লোকে বলে, এর উদ্দেশ্য ছিল মাওলানা নিজামীর নামে ফাঁসির রায় ঘোষনা করে জামাত শিবিরকে মাঠে নামানো। তাদেরকে দিয়ে সারা দেশে জ্বলাও পোড়াও করিয়ে, পরদিন হরতাল ডাকানো। এরপর সুষমাকে দেখানো এই দেখ বাংলাদেশে ইসলামপন্থীরা এখনও কত শক্তিশালী এবং এরা কতবড় সন্ত্রাসী। বিএনপি এদেরই দোসর। অতএব ওদের সাথে কোন সমঝোতায় যেও না। জঙ্গী সন্ত্রাসী নাম দিয়ে ইসলামপন্থীদেরকে নির্মূল করতে আমরাই সিদ্ধহস্ত। অতএব সংগ্রেস সরকারের মত তোমরা আমাদেরকে প্রটেকশন দিয়ে যাও!
আল্লাহ বাঁচিয়েছেন গেমটা শেষ পর্যন্ত খেলা যায় নাই। সেদিন এক রসিক বন্ধু মন্তব্য করলেন, দিল্লী থেকেই নাকি ধমক দিয়ে বলা হয়েছে এই সমস্ত মষ্করা বন্ধ করো। তড়িঘড়ি মাওলানা নিজামীকে অসুস্থ বানিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়। রায় ঝুলে যায় আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য। সেদিন বিকেলে শাহবাগ মোড়ে কয়েক বাছুরকে দেখা গেল এ নিয়ে ঘন প্যাচাল পাড়তে। এই সব বেকুব এতদিনেও বুঝলোনা কারা কি উদ্দেশ্যে এতদিন এদেরকে নাকে দড়ি দিয়ে নাচিয়েছে!
যাই হোক শেষ পর্যন্ত সুষমা স্বরাজ নির্বিঘেœ তার ঢাকা সফর সম্পন্ন করে গেছেন। সরকার সমর্থক পত্রিকাগুলো লিখেছে প্রধানমন্ত্রীর সাথে তার মোলাকাত বাতচিত ছিল খুবই আন্তরিক পক্ষান্তরে বেগম জিয়ার সাথে বৈঠকটি ছিল একেবারেই ফর্মাল। সুষমা স্বরাজ বেগম জিয়ার অনেক কথায়ই নাকি বিরক্ত হয়েছেন। এই বৈঠকের আলোচনা নিয়ে কয়েকটি কথা বাজারে এসেছে। বিএনপি নেতারা তাদের ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন আলোচনাকালে সুষমা নাকি বলেছেন ভারত কোন বিশেষ দল নয় বাংলাদেশের জনগনের সাথে সম্পর্ক রাখবে। এক টিভি চ্যানেল তাদের ষ্ক্রলে প্রচার করেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন রাজনীতির বিষয়ে ভারত নাক গলাবে না। ঢাকা ছাড়ার আগে ভারতের এক সরকারি মুখপাত্র বলেছেন ভারত বাংলাদেশের সরকারের সাথে কাজ করে যাবে। গতকাল আওয়ামীপন্থী প্রথম আলো পত্রিকা লিখেছে নয়াদিল্লীতে ক্ষমতার পালাবদলে দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্কে ছেদ পড়বে না বরং তা জোরদ্রা হবে- ঢাকা সফরে আওয়ামী লীগ সরকারকে এ আশ্বাসই দিয়ে গেছেন সুষমা স্বরাজ।
তাহলে মোদ্দা কথাটা কি দাঁড়ালো! বা বাংলাদেশের জনগন কি বারতা পেল সুষমা স্বরাজের এই সফর থেকে! তারা কি কংগ্রেস সরকারের মত হাসিনা সরকারের প্রতি কাছাখোলা সমর্থন জানিয়ে যাবে না বাংলাদেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রনের ভার বাংলাদেশের মানুষের ওপর ছেড়ে দেবে। এখনও পুরোপুরি ষ্পষ্ট হয় নাই। অবশ্য কূটনীতির খেলার খুব কমই ষ্পষ্ট হয়। অনেক কিছু বুঝে নিতে হয়। যদিও সরকারঘেষা মিডিয়াগুলো বলছে সুষমার সাথে বৈঠক করে বিএনপি হতাশ তারপরও এই বোঝার জন্যই যদি বেগম জিয়া ঈদের পর সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বলে থাকেন তাহলে তার একটা অর্থ অবশ্য ধরা যায়। তখন দেখা যেতে পারে মোদী সরকার ফাইনালি কি স্ট্যান্ড নেয়। সরকার পতন না হলেও বাংলাদেশে একটি জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের দাবী এবং বাংলাদেশের জনগনের আকাংখার প্রতি যদি তারা সমর্থন জানায় তাহলেই বোঝা যাবে ভারতের নতুন শাষকরা আমাদের কতটুকু বন্ধু। যদি এর অন্যথা হয় অর্থাৎ পতিত কংগ্রেস সরকারের নীতি অব্যাহত রেখে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারকেই পাঁচ বছরের জন্য টিকে থাকতে সমর্থন যোগায় তাহলে বুঝতে হবে মিষ্টার মোদী বাংলাদেশে তার নীতি-আদর্শ কায়েমের জন্য আওয়ামী লীগকেই উপযুক্ত মনে করছে। আল্লাহ না করুন এমনটিই যদি হয়- কং্েরগস সরকার যদি আমাদের সর্বনাশ করে গিয়ে থাকে মোদী সরকার করবে সাড়ে সর্বনাশ!

৩০ জুন, ’১৪

www.saeedtarek.com

e-mail: mail@saeedtarek.com  saeedtarek@yahoo.com

You Might Also Like