যাদের আছে, তারাই নেই : লাভ কী

জাতিসংঘের ১২২টির বেশি দেশ পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু যাদের পরমাণু অস্ত্র আছে, তারাই এ চুক্তিতে নেই। তাহলে লাভ কী? এ চুক্তি হওয়া আর না-হওয়ার মধ্যে আপাতত কোনো তফাৎ নেই। পরমাণু অস্ত্রধারী বিশ্বের নয়টি দেশের কেউ-ই বহুল প্রতীক্ষিত এই চুক্তির পক্ষে নেই। তারা জানিয়ে দিয়েছে, আবেগী এই চুক্তিতে তারা স্বাক্ষর করবে না, তাতে অনুমোদন দেবে না, সবিশেষ তা মানবেও না। ফলে ‘প্রত্যাশার এক নিষ্ফল চুক্তি’ হয়ে থাকবে জাতিসংঘের পরমাণু নিষিদ্ধকরণ চুক্তিটি।

পরমাণু অস্ত্রধারীরা না থাকলেও জাতিসংঘের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যকে নিয়ে চুক্তিতে পৌঁছাতে পেরে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন এ-সংক্রান্ত জাতিসংঘ সম্মেলনের সভাপতি এলায়নি হুইটি গোজেম। চুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাভুটির ফলাফল প্রকাশ করেন তিনি। তার দৃষ্টিতে এটি ‘ঐতিহাসিক ফলাফল’। কারণ জাতিসংঘ সৃষ্টির ৭০ বছর ধরে চেষ্টা করা হচ্ছে, পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধ করার, পরমাণু অস্ত্রমুক্ত একটি বিশ্ব নতুন প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার। হিরোশিমা, নাগাসাকিতে ফেলা আনবিক বোমার যে বিভৎসতা বিশ্বের মানুষ দেখেছে, তেমন আর কোনো ভয়াবহতা যাতে না দেখতে হয়, সেজন্য বিশ্বনেতাদের একটি দৃঢ় চুক্তিতে আবদ্ধ রাখার প্রয়াস ছিল জাতিসংঘের। অবশেষে সেই চুক্তি হলো। ফলে চুক্তিটি ঐতিহাসিক। কিন্তু এ চুক্তির কার্যকারিতা আশা-প্রত্যাশার মধ্যেই বুঁদ হয়ে গেল, বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যাবে না।

হুইটি গোমেজও আশার কথা শোনালেন। চুক্তিতে ১২২ দেশের সম্মতির বিষয়ে ঘোষণা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘পরমাণু অস্ত্রমুক্ত একটি বিশ্বের জন্য আমরা প্রথম বীজটি লাগাতে পেরেছি।’ হ্যাঁ, তার কথার সঙ্গে একমত। আশা-ভরসার একটি বীজ বপণ করা গেল। এখন বীজ থেকে গাছ, গাছ থেকে ফল- এই প্রক্রিয়ার পুরোটাই ভবিষ্যতের গহ্বরে থেকে যাচ্ছে। ১২২ দেশ, হোক তা ১৮০ দেশ- চুক্তির পক্ষে যত বড় সমর্থক জোটই হোক না কেন, যাদের হাতে পরমাণু অস্ত্র আছে, তারা যদি প্রতিশ্রুতি না দেয়, তাহলে কোনো কাজ হবে কি? হবে না।

একুশ শতকের পরিবর্তিত ও নয়া বাস্তবতাবাদের বিশ্বে যেখানে উত্তর কোরিয়ার মতো একঘরে ও দরিদ্র একটি দেশের হাতে পরমাণু অস্ত্র চলে এসেছে, সেখানে পরমাণু অস্ত্রের না-ব্যবহারের কসম কাটার সুযোগ কোথায়? নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও সমরনীতির যে ভারসাম্য গড়ে উঠেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে পরমাণু অস্ত্র। বাস্তবিক পক্ষে ‘ভয় বা শক্তি’ যা-ই বলি না কেন, এই পরমাণু অস্ত্রের কারণেই আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ হয়তো বাঁধবে না। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তান, চীন, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়া- এই নয় দেশের কাছে কয়েক হাজার পরমাণু অস্ত্র আছে। এর এক-তৃতীয়াংশও যুদ্ধে ব্যবহৃত হলে বিশ্বটা আর বাসযোগ্য থাকবে না। সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ হলে কেউ-ই বাঁচবে না।’ অর্থাৎ পরস্পরের নিশ্চিহ্নের ভয় আছে। যে কারণে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের পথে হয়তো হাঁটবে না বিশ্বনেতারা।
হ্যাঁ, পারস্পরিক নিশ্চিহ্নের ভয় আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ বা পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনলেও তা যে হবেই না, তেমন কোনো গ্যারান্টি কেউ দেয়নি। জাতিসংঘ এই গ্যারান্টির জন্য ৭০ বছর ধরে কাজ করছে। শান্তিকামীরা নবজাতককে প্রতিশ্রুতি শোনাতে চাইছে, ‘এই পৃথিবী পরমাণু অস্ত্রমুক্ত, তুমি নিরাপদ।’ হ্যাঁ, তেমন অভয়বাণী শোনানোর একটি সুযোগ হলো বটে, কিন্তু তা বাস্তবসম্মত হলো না।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৩ বছর বয়সি সেটসুকো থারলো নামে এক জাপানি ও তার মতো যেসব মানুষ হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্রের আনবিক বোমা হামলায় বেঁচে গিয়েছেন, তারা তাদের জীবনভর স্বপ্ন দেখেছেন, তাদের মতো দুঃস্বপ্নের সময় যেন আর কারো জীবনে ফিরে না আসে। পরমাণু অস্ত্রমুক্ত একটি বিশ্বের স্বপ্ন লালন করে চলেছেন তারা। তাদের স্বপ্নের প্রতিফলন বলা যায় জাতিসংঘের পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তিকে। কিন্তু চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন তাদের সেই স্বপ্নের মতোই স্বপ্ন হয়ে থাকবে, যতদিন পরমাণু অস্ত্রধারীরা চুক্তিতে না আসবে।

জাতিসংঘে পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা এই চুক্তিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ ও বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে অভিহিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি বলেছেন, ‘আমাদের আরো বাস্তবজ্ঞানসম্পন্ন হতে হবে।’ চুক্তিকারীদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, ‘উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার কথা কেউ কি ভাবতে পারে?’ নিকি হ্যালির প্রশ্নের প্রসঙ্গভিত্তিও খুব জোরালো। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ও বিশ্বের উদ্বেগ সত্ত্বেও একের পর এক পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। তাদের সবশেষ আন্তঃমহাদেশীয় বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) পরীক্ষার ঘটনা বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। বিশ্বের যেকোনো স্থানে তাদের আইসিবিএম আঘাত করতে সক্ষম বলে দাবি করেছে দেশটি। এই অবস্থায় অনিয়ন্ত্রিত উত্তর কোরিয়াকে দমন করতে ও তাদের হুমকি থেকে নিরাপদ থাকতে পারমাণবিক অস্ত্রই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। উত্তর কোরিয়াকে শান্ত রাখতে বেসামরিক উদ্যোগের কিছু প্রস্তাব আছে। দরিদ্র এই দেশের পাশে অর্থসহায়তা ও মানবিক সহায়তা নিয়ে দাঁড়ালে হয়তো তারা আশ্বস্ত হতে পারে। কিন্তু দেশটির প্র্রধান সমস্যা অর্থ নয়, মতাদর্শ। কঠোর বামপন্থার দেশটির বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থায় তাদের পাশে দাঁড়াতে রাজি নয় পশ্চিমা বিশ্ব। একমাত্র চীন-ই তাদের প্রধান মিত্র। কিন্তু হুমকি-পাল্টা হুমকির এই সময়ে চীনের ডাকও শুনছে না উত্তর কোরিয়া।

দুর্বলের ওপর সবলের আধিপত্য ছিল, আছে এবং থাকবে। উত্তর কোরিয়া দুর্বল, তাই তার দাঁত খিঁচুনি দেখা যুক্তরাষ্ট্রের মতো শীর্ষ পরাশক্তির জন্য ভীষণ যন্ত্রণার। এ গেল পরমাণু অস্ত্রধারীদের একদিক। অন্যদিকে রয়েছে শক্তির সঙ্গে শক্তির টক্কর। বিশ্বে আধিপত্য ধরে রাখতে ও বিস্তার করতে পরমাণু অস্ত্রধারীদের এক অদেখা প্রতিযোগিতা সব সময়ই আছে। সব দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখন প্রতিদ্বন্দ্বী। এই মুহূর্তে অর্থনীতির প্রধান ঘাঁটিগুলোয় নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ও বাড়াতে চেষ্টায় রয়েছে তারা। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের একক মালিকানা দাবির বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ চীন সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মালিকানা নেই। চীনের প্রতিবেশীদের মালিকানা নিয়ে লড়ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সাগরে শুধু চীন থাকলে এশিয়ার অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও সামরিক কৌশলে প্রভূত্ব হারাবে যুক্তরাষ্ট্র। এ ক্ষেত্রে দুই দেশকে চরম আগ্রাসী হয়ে উঠতে বাধা দেয় তাদের উভয়ের কাছে থাকা পরমাণু অস্ত্র।

ভারত-পাকিস্তান, ভারত-চীনের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। এই দেশগুলোর অমীমাংসিত সীমান্ত তাদের মধ্যে অশান্তি জিইয়ে রেখেছে। কিন্তু সবার হাতে পরমাণু অস্ত্র থাকায় কেউ চাইলেই কারো ওপর যখন তখন হামলা চালাতে পারে না। তিন রাষ্ট্রেরই তাতে বিপন্ন ও বিলুপ্তির আশঙ্কা থাকে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য পরমাণু অস্ত্রের বড়াই না করলেও তারা তো ধারণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমাদের একটি অঘোষিত জোট সক্রিয় রয়েছে। যেকোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের পথ অনুসরণ করছে ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার। অন্যদিকে, পারমাণবিক অস্ত্রের জোরে মধ্যপ্রাচ্যে দেদারছে মাতব্বরি করে যাচ্ছে ইসরায়েল। পরমাণু অস্ত্র ছাড়া ইসরায়েল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকা খুবই দুরুহ। অর্থাৎ অপ্রিয় হলেও সত্য, পরমাণু অস্ত্রের কারণেই ইসরায়েলের ওপর আক্রমণের সাহস করে না আরব দেশগুলো।

পরমাণু অস্ত্রের কারণে এই যে ভারসাম্য, তার আড়ালে রয়েছে শোষণ-শাসনের কালো ইতিহাস। ‘জোর যার মুল্লুক তার’- এই প্রবাদটি ঘুরে ফিরে আসছে প্রায়ই। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন তার প্রমাণ দেয়। আবার ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়াকে ছিনিয়ে নিয়ে রাশিয়া শক্তি প্রদর্শনের প্রবাদ হয়ে উঠেছে। এখনো কিছু স্থানে উপনিবেশ টিকিয়ে রেখেছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স। এ ছাড়া বেশ কিছু গৃহযুদ্ধে জ্বালানি জোগাচ্ছে পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলো। স্বার্থের সংঘাত সর্বত্রই আছে।

যুদ্ধ ও স্বার্থের সংঘাত যে বিশ্বের দিক নির্দেশনা করে, সেখানে ফুলের অঞ্জলির মূল্য কতটুকু? তবু অস্ত্রের চেয়ে ফুল শ্রেয়- এই চেতনার একটি বিশ্ব পাওয়ার প্রত্যাশা ১২২টি দেশের মধ্যে আছে, এ-ইবা কম কীসের। পরমাণু অস্ত্রমুক্ত হোক আমাদের ধরিত্রী- এই কামনা সব সময়।

You Might Also Like