ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ

যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি তৈরি হয় তার জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে। জাতীয় স্বার্থ হঠাৎ করেই বদলে যায় না। আর তাই একটা জাতির পররাষ্ট্রনীতিতে আসতে দেখা যায় না বড় ধরনের পরিবর্তন; তা সে দেশের মন্ত্রিসভার পরিবর্তন হলেও। জানি না, আমরা কেন ভাবতে পারলাম ও ভাবতে পারছি যে, মোদি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি যেতে চলেছে একেবারেই বদলে। ভারত হতে চলেছে অন্য ভারত। যেটা সম্ভব নয়।

ভারত অনুসরণ করছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি পদ্ধতি। এতে সরকার (এড়াবৎহসবহঃ) বদলায়, কিন্তু প্রশাসন (অফসরহরংঃৎধঃরড়হ) বদলায় না। প্রশাসনের মাধ্যমে যথেষ্ট পরিমাণে বজায় থাকে পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনুসরণ করে ঝঢ়ড়রষং পদ্ধতি। এখানে সরকার বদলালে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের প্রায় ২৫ ভাগ বদলে যায়। নতুন সরকার এসে গড়ে তাদের মনমতো প্রশাসন। কিন্তু তাই বলে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে যে ধারাবাহিকতা থাকে না, তা নয়। ধারাবাহিকতা থাকে, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থগুলো বদলে যায় না। তার ওপর নির্ভর করেই রচিত হতে হয় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি। তাই সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওয়াকার বুশের সাথে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওবামার পররাষ্ট্রনীতি প্রায় একই রকম হয়ে আছে। বেশ বিস্মিত হলাম দেখে, সুষমা স্বরাজকে বিএনপি ভাবতে পারল, তিনি এমন কিছু সাথে করে এনেছেন যে, তার দ্বারা দল হিসেবে বিএনপি উপকৃত হতে পারবে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের কথা শুনে মনে হলো বিজেপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে যেন আসতে পারছে একটা বিরাট পরিবর্তন। কিন্তু সে রকম পরিবর্তন আসা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ, রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের মৌলিক স্বার্থে আসতে যাচ্ছে না কোনো পরিবর্তন। সুষমা স্বরাজ এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ জানাতে; তার বেশি কিছু করতে নয়। ভারত সরকার শেখ হাসিনা সরকারকে মনে করছে বাংলাদেশের বৈধ সরকার। তার সাথে তারা কাজ চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক। কেবল যে ভারত সরকারই হাসিনা সরকারকে বৈধ সরকার বলে মনে করছে তা নয়, চীনসহ বিশ্বের সব সরকারই হাসিনা সরকারকে ধরছে বাংলাদেশের বৈধ সরকার বলে। আর তার সাথে বজায় রাখতে চাচ্ছে কূটনৈতিক সম্পর্ক।
খালেদা জিয়া সুষমা স্বরাজকে বললেন বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই। কিন্তু তিনি সুষমা স্বরাজকে এ কথা না বললেও পারতেন। কেননা, সুষমা স্বরাজ এসেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প থেকে আমন্ত্রণ জানাতে; বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য নয়। আর সেটা ভারত প্রতিষ্ঠা করতেও পারে না। বাংলাদেশের রাজনীতি বাংলাদেশের নিজস্ব ব্যাপার। অন্য দিক থেকে বললে বলতে হয়, ভারত সব সময়ই চাইবে বাংলাদেশে একটা ভারতনির্ভর সরকার প্রতিষ্ঠিত থাকুক। আর বাংলাদেশ হয়ে থাকুক ভারতের একটা উপগ্রহ। বাংলাদেশেরেে ত্র তার এটাই ছিল এবং এখনো হয়ে আছে মূল পররাষ্ট্রনীতির ধারা। ভারতের সব সরকারই চাইবে এই একই ধারা অনুসরণ করতে। না হলে ভারতের জাতীয় স্বার্থে আঘাত আসতে পারে।

নরেন্দ্র মোদি বলছেন, তিনি চাচ্ছেন সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মৈত্রীর বন্ধন দৃঢ় করতে। স্মরণ করা যেতে পারে, সার্ক গঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে। ভারত প্রথমে সার্কে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। ভারত যদি দেখে, সার্কে থাকলে তাকে অসুবিধা পোহাতে হচ্ছে, তবে সে নিশ্চয়ই সার্কে থাকতে চাইবে না। ভারত একটি বিরাট দেশ এবং সমরশক্তিতে সে হয়ে উঠেছে যথেষ্ট প্রবল। সার্ক থেকে বেরিয়ে যেতে তার কোনো অসুবিধা হবে বলে মনে করার কারণ নেই। নরেন্দ্র মোদি বলছেন, তিনি বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক গড়তে আগ্রহী। কিন্তু এটা করতে হলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের নদীর পানি নিয়ে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তার একটা সমাধান হওয়া দরকার। নরেন্দ্র মোদি বলছেন, তিনি খাল কেটে গঙ্গার পানি দণি ভারতের কাবেরি নদীতে ফেলতে ইচ্ছুক। তিনি যদি এটা করেন, তবে বাংলাদেশে পদ্মা নদী আরো শুকিয়ে যাবে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কোনোভাবেই মসৃণ হতে পারবে না। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নয়ন করতে হলে নদীর পানির সমস্যা নিয়ে ভাবতে হবে সর্বাগ্রে। সুষমা স্বরাজ ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঐক্যের কথা বলেছেন, কিন্তু এ কথা তিনি না বললেও পারতেন। কারণ, সংস্কৃতির ওপর দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়ন নির্ভর করছে না। তিনি বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের গান হতে পেরেছে দুই দেশেরই জাতীয় সঙ্গীত। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান ভারতে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গীত হচ্ছে হিন্দি ভাষায় অনুবাদ করে, বাংলা ভাষায় নয়। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত গীত হচ্ছে বাংলা ভাষাতেই। যেটা বিশেষভাবেই বিবেচ্য। শুনেছি নরেন্দ্র মোদি নাকি বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল। জানি না তার এই সহানুভূতির বিশেষ কোনো কারণ আছে কি না। এক সময় গুজরাট (সৌরাষ্ট্র) এবং তার সাথে লাগোয়া রাজস্থান (মাড়োয়ার) থেকে ব্রিটিশ শাসনামলে অনেক লোক তখনকার বাংলায় ব্যবসায় করতে আসতেন। পূর্ব বাংলাতেও তারা এসেছেন। তখনকার বাংলার অর্থনীতি চলে গিয়েছিল প্রায় এসব ব্যবসায়ীর হাতে। গুজরাট ভৌগোলিক দিক থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। বাংলাদেশ থেকে মানুষ যায়নি গুজরাটে কোনো ব্যবসাপাতি করতে। কিন্তু গুজরাট থেকে অনেকে এসেছেন এই অঞ্চলে ব্যবসায়-বাণিজ্য করতে। নরেন্দ্র মোদির স্মৃতিতে হয়তো বিরাজ করছে সে যুগের কিছু কথা।
গুজরাট অবশ্য কেবল ব্যবসার জন্যই ভারতে খ্যাত হয়নি। রাজনৈতিক কারণেও খ্যাত হয়েছে। ভারতের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী জন্মেছিলেন গুজরাটে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ গুজরাটে না জন্মালেও তিনি ছিলেন গুজরাটেরই লোক। তিনি তার জীবনের প্রথম রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখেছিলেন গুজরাটি ভাষায়; যে কথা আমরা অনেকেই জানি না। সাধারণভাবে মনে করি তার মাতৃভাষা ছিল উর্দু। কংগ্রেসের বিখ্যাত নেতা বল্লব ভাই প্যাটেল ছিলেন গুজরাট অঞ্চলেরই লোক। এদের সাথে এখন যুক্ত হতে চলেছে নরেন্দ্র মোদির নাম। তবে তিনি রাজনীতিতে এদের মতো কৃতীর স্বার রাখতে পারবেন কি না, সেটার পরিচয় পাওয়া যাবে আগামী বছরগুলোতে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ভারতনির্ভর নয়। আমরা তৈরী পোশাক বিক্রি করছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে, ভারতে নয়। আমরা জনশক্তি রফতানি করছি মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ায়, ভারতে নয়। আমাদের তাই ভারতের চেয়ে এসব অঞ্চলের কথাই সাধারণভাবে আসতে বাধ্য বৈষয়িক ভাবনায়। ভারত আমাদের ব্যবসায় কেন্দ্র হতে পারে না। ভারতের বেকার সমস্যা খুবই জটিল। ভারত একটা জনবহুল দেশ। সে দেশে যেয়ে আমাদের দেশের মানুষের কর্মসংস্থান হওয়া সম্ভব নয়। মাত্র কিছু দিন আগে বিজেপি তার নির্বাচনী প্রচারে ব্যাপকভাবে বলেছে, বাংলাদেশ থেকে দুই কোটির ওপরে মানুষ অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে ভারতে। এদের বাংলাদেশে বিতাড়িত করতে হবে। বিজেপি সরকার যদি এই নীতি অনুসরণ করতে চায়, তবে ভারতের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন না হয়ে অবনমনই হবে।

You Might Also Like