চেতনাবাজ সমাচার-১

বাংলাদেশে যেসব সাংবাদিকের ভবিষ্যত উজ্জ্বল

অাবিদুর রহীম

  • ফেইসবুকে আমার বন্ধু তালিকায় থাকা একজনের একটি লেখা পড়ে মর্মাহত হলাম। লেখাটির সারমর্ম মোটামুটি এরকম-
    “ভারতে গরুর গোস্ত খাওয়া বা কেনা নিয়ে সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর যেসব নির্যাতন/হত্যাযজ্ঞের ঘটনা ঘটছে তার খবর প্রচারের সময় এখানকার মানে আমরা বাংলাদেশের মানুষরা নাকি একটু চিন্তাও করিনা যে সেখানে এসবের প্রতিবাদ জানাতে/ তাদের পাশে দাঁড়াতে অনেক হৃদয়বান, মানবতাবাদী, সমাজকর্মী আছেন। সুতরাং এখানে ঐসব ঘটনা নিয়ে সহানুভূতি না দেখালেও চলবে।”
    আর হ্যাঁ তিনি আরও কিছু একটা ‘জাস্টিফিকেশনের’ বিষয়েও লিখেছেন যার সারমর্ম এরকম-
    ” ওখানকার কোন অন্যায় ঘটনার প্রচার করে এখানকার কোনো অন্যায়ের ঘটনাকে জাস্টিফিকেশন করা ঠিক না”
    এবার প্রথমেই তার ২য় বক্তব্যের বিষয়ে বলি,- এখানে তিনি জাস্টিফিকেশন বলতে কি বুঝিয়েছেন তা স্পষ্ট নয়। তিনি যদি এখানকার হিন্দু সমপ্রদায়ের উপর হামলা/প্রতিমা ভাংচুরের কথা বুঝিয়ে থাকেন তাহলে বলবো, এসব অপকর্ম বিবেকবান অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার এমনকি ধর্মপ্রাণ কোনো মানুষই সমর্থন করে না। অন্যায় সব সময়ই অন্যায়, দুস্কৃতিকারী সর্বাবস্থায় দুস্কৃতিকারী, তাতে কোনো দেশ কাল জাতি ধর্ম বর্ণ গোষ্ঠি গোত্র বিবেচ্য নয়। তিনি হয়তো বুঝাতে চেয়েছেন যে ওখানে যেসব মুসলমান নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তাদের কথা প্রচার করে এখানে হিন্দু নির্যাতন বা হিন্দুদের বাড়ীঘর দখল করার বৈধতা দেয়াকে। কিন্তু এখানে এসব হিন্দু নির্যাতন বা হিন্দু সম্পত্তি দখলের ঘটনা কারা ঘটাচ্ছে বা সেসব অপকর্ম জাস্টিফিকেশনের চেষ্টা কারা চালাচ্ছেন তা তিনি খতিয়ে দেখার চিন্তা করেননি কিংবা বর্তমান বাস্তবতায় ইচ্ছাকৃতভাবেই তা এডিয়ে গিয়ে ঢালাও স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে যা বলার তা বলেছেন।
    এটা অস্বীকার করবো না যে বাংলাদেশে যেসব বিচ্ছিন্ন কিছু হিন্দু নির্যাতন এবং দখল বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে তাতে কিছু ধর্মের নামধারী অর্ধশিক্ষিত লেবাসধারী অতি উৎসাহীরা জড়াচ্ছে না! কিন্তু তাদের এসব অপকর্মে প্রকৃত ধর্মপ্রাণ এবং ধর্মের শিক্ষায় শিক্ষিত কেউ কি অংশ নিচ্ছে? না সমর্থন করছে? মোটেও না। কারণ ইসলাম প্রতিবেশীর নিরাপত্তা বিধানের কথা বলেছে, প্রতিবেশীর সুখে-দু:খে তার পাশে দাঁড়াতে বলেছে, প্রতিবেশী হিন্দু না খৃস্টান না বৌদ্ধ তা বিবেচনা করতে বলেনি। তাই অন্য দেশে হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানরা আক্রান্ত হলে এই দেশের হিন্দুদের উপর আক্রমণ করে তার প্রতিশোধ নিতে হবে- এটা ইসলামের শিক্ষা না। এবং প্রকৃত-শিক্ষিত ও শিক্ষা মেনে চলায় অভ্যস্ত বা আমলদার মুসলমানের দ্বারা এটি সম্ভব নয়। আগেই বলেছি অর্ধশিক্ষিত এবং অতি উৎসাহী কিছু লোক হয়তো এসব অপকর্মের সাথে জড়াচ্ছে যারা ধর্মের বিধি-বিধান পালনেও ততটা আন্তরিক নয়। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হলো সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন বা দখল-ভাঙচুরের পেছনে কাজ করছে তাদের বন্ধু বলে পরিচয়দানকারী একটি শক্তি, এটা এখন প্রমাণিত সত্য। দেশে যেসব হিন্দু নির্যাতন দখল নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে তার শ্বেতপত্র প্রকাশ করলে এবং এসব ঘটনার সুবিধাভোগী (বেনিফিশারী) কারা তা খতিয়ে দেখলেই এই সত্য উপলব্ধি করা যাবে। মাত্র কদিন আগেই জাতির বেয়াই হিসাবে পরিচিত এক মন্ত্রীর হিন্দু সম্পত্তি দখলের সংবাদ কিভাবে আমরা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলাম। নাকি সেসব কাহিনী ভুলিয়ে দিয়ে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানোই এসব লেখার উদ্দেশ্য?
    এবার ঐ ফেইসবুক বন্ধুর ১ম বক্তব্যের বিষয়ে কিছু বলি-
    তিনি লিখেছেন, ভারতে মুসলিম নির্যাতনের প্রতিবাদ জানাতে সেদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের অনেকেই মুসলমানদের পাশে দাডিয়েছেন। খুব ভালো কথা, আমরা তাদের ধন্যবাদ জানাই, কিন্তু সেজন্য আমরা এখানে বাংলাদেশের মানুষেরা কেন তাদের পক্ষে কিছু বলতে পারবো না! কেন তাদের পক্ষে দাঁড়াতে পারবো না তা বোধগম্য নয়! সেখানকার হিন্দু ভাইয়েরা নির্যাতিতদের পাশে দাডিয়েছেন, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন; কিন্তু আমরা কেন আমাদের দায়িত্ব পালন করবো না! এসব কি উদ্দেশ্যে লেখা? এটি কি প্রকারান্তরে ঘুরিয়ে পেচিয়ে ভারতের বর্ণবাদী উগ্রসাম্প্রদায়িক হিংস্র সেসব জনগোষ্ঠিকেই সমর্থন এবং উৎসাহ যোগাবে না? যারা গরুর গোস্ত খাওয়া এবং রাখার কারণে মুসলমানদেরকে পিটিয়ে হত্যা করছে এবং রাষ্ট্রিয় মৌন সম্মতিতে যে প্রবণতা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে।
    ফেসবুক বন্ধুর ঐ লেখার নিচে তার সাথে রিলেটেড একজন মন্তব্য করেছেন যে- “ভাই এই লেখার কারণে এখন আপনাকে অনেকেই ভারতের দালাল বলতে শুরু করবে” এই মন্তব্য পড়ার পর আমি তাকে নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আসলেই সে হয়তো ভারতের দালালী করার জন্য লেখাটি লিখেছে- এমনটি নাও হতে পারে। তবে কি উদ্দেশ্যে এই লেখা, তাও আমার বোধগম্য হচ্ছে না। বাংলাদেশে সচিবালয়ে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে অনেককেই দেখেছি- নির্দিষ্ট কোনো মন্ত্রী বা সচিবের সুনির্দিষ্ট কোনো পার্পাস সার্ভ করতে কিংবা নিজের কোনো তদ্বীর বাগাতে উদ্দেশ্যমূলক রিপোর্ট করতে। পাশাপাশি ইদানীং আবার প্রবলভাবে শুরু হয়েছে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের লক্ষে উল্টোপাল্টা লেখালেখির প্রবণতা। এ ক্ষেত্রে কোনটি কাজ করেছে তা নিয়ে আমি কনফউজড্। তাই না জেনে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আবার অনেক সময় অনেক লেখক ইচ্ছে করেই সমালোচিত হওয়ার জন্য লেখেন, এবং সমালোচনা শুরু হলে তা পুঁজি করে বরং নির্দিষ্ট কোথাও কোনো সুবিধা আদায় তার জন্য সহজ হয়ে যায়।
    যাক সেসব কথা এবার বলি আমি কেন তার লেখার পরিপ্রেক্ষিতে এই লেখা লিখতে উদ্যত হলাম, কারণ তার লেখাটি পরে তার প্রোফাইল ঘেটে দেখলাম তিনি একজন সাংবাদিক। যিনি কিনা ভারতে ঘটে যাওয়া সেসব বেদনাবিধুর ঘটনার সত্যাসত্য চ্যলেন্জ্ঞ না করে তা প্রচার না করার আহবান জানিয়েছেন। যা দেখে যে কারো মনে হবে বাংলাদেশে সাবাদিকতার ভবিষ্যত খুবই উজ্জ্বল!!! তবে সাংবাদিকতার না হলেও এসব সাংবাদিকদের ভবিষ্যত যে উজ্জ্বল সে ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নাই; এরাই প্রধানমন্ত্রীর প্রেসকনফারেন্সে গিয়ে উত্তরপত্র ধরিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে এরম প্রশ্ন করেন- “আমরা দেখেছি আপনার সরকার অমুক অমুক ক্ষেত্রে এই এই সাফল্য অর্জন করেছেন, ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতায় আর কি পদক্ষেপ নিবেন”!
    তাই উপরোক্ত নানাবিধ কারণে আর বিচার চাই না! শুধু জানতে চাই ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের পাশে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের অনেকেই আছেন-বন্ধুর মতো, তাই বলে কি এর মধ্যেও যেসব সংখ্যালঘু মুসলিম নিগ্রহ নির্যাতন বা হত্যার শিকার হচ্ছেন তাদের কথা বা খবর প্রচার করা যাবে না! এটা কোন মতবাদ!!! ছি!!!

You Might Also Like