‘বাংলাদেশের রাজনীতি ভবিষ্যতে আরও সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাবে’

আকবর আলি খান। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী ও সমাজ বিশ্লেষক হিসেবেও তার খ্যাতি রয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত সুপরিচিত ও জনপ্রিয় ‘সাপ্তহিক’ পত্রিকার সাথে কথা বলেন। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি চলমান ঘটনাবলির নানা দিক ব্যাখ্যা করেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রায়হান।

সাক্ষাৎকারটি এখানে পুন:প্রচার করা হলো।

প্রশ্ন : রাজনীতির গতিমুখ দেশকে কোন দিকে নিয়ে যাবে? দীর্ঘমেয়াদে দেশের রাজনীতিতে কোনো চরমপন্থার উত্থানের ইঙ্গিত পাচ্ছেন কি না?

আকবর আলি খান : দীর্ঘমেয়াদে সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী করা শক্ত। বাংলাদেশের রাজনীতি অতীতেও সংঘাতময় ছিল, বর্তমানেও সংঘাতময় এবং ভবিষ্যতে আরও সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাবে। এগিয়ে গেলে সেক্ষেত্রে আরও কী কী হবে, তা দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এই মুহূর্তে এর চেয়ে বেশি আমি বলতে পারছি না।

প্রশ্ন : আপনি বললেন, ভবিষ্যতে আরও সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাবে। তবে এখন যে অবস্থা আমরা দেখছি, বিভিন্ন পক্ষ আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছে, এটাকে কীভাবে দেখছেন?

আকবর আলি খান : প্রস্তাব যদি সরকার গ্রহণ করত তাহলে এটা নিয়ে চিন্তা করা যেত। কিন্তু প্রস্তাব তো সরকার প্রত্যাখ্যান করছে। এখানে আর কিছু তো বলার নেই।

প্রশ্ন : তাহলে আপনি এখানে কোনো সমাধানের লক্ষণ দেখছেন না?

আকবর আলি খান : আপাতত সমাধানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

প্রশ্ন : সরকার তো ৭/১৫ দিনের মধ্যে সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু পারছে না কেন? বিদেশি কোনো হস্তক্ষেপ আছে কি না?

আকবর আলি খান : সরকারের পক্ষ থেকেও তো এই অভিযোগ করা হয়নি যে, বিদেশি হস্তক্ষেপ হয়েছে। আমি অন্তত সরকারের এমন কোনো অভিযোগের কথা শুনিনি।

প্রশ্ন : সরকারের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এই বক্তব্য দিয়েছেন যে, দেশে চলমান সংঘাতে পাকিস্তানি দূতাবাসের সংযোগ আছে। পাকিস্তানি দূতাবাসের এক কর্মকর্তার জঙ্গি সংযোগের অভিযোগও আনা হয়েছে। তাদের চ্যানেল হয়ে অস্ত্র আসছে এবং সেগুলোর কিছু জব্দ করা হয়েছে বলেও সরকার জানিয়েছে।

আকবর আলি খান : এখন পর্যন্ত আমরা এ সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ পাইনি এবং এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না।

প্রশ্ন : তাহলে সরকার যে বলেছিল এই পরিস্থিতি দ্রুতই ঠিক হয়ে যাবে, তা করতে তারা ব্যর্থ হলো কেন?

আকবর আলি খান : এটা সরকারকেই জিজ্ঞেস করতে হবে। তারা কেন বলেছে আর কেন পারেনি, এই ব্যাখ্যাটা তাদের কাছ থেকেই নেয়া উচিত। আমি সরকারের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নই।

প্রশ্ন : সম্প্রতি নানা কায়দায় ক্রসফায়ার হচ্ছে। ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে দুই যুবদলকর্মীর মৃত্যুর ঘটনায়ও একই অভিযোগ উঠেছে। আমরা আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি, বিনা বিচারের হত্যার প্রভাব সমাজে কীভাবে পড়ে?

আকবর আলি খান : বিনা বিচারে হত্যা আমাদের দেশের আইন অনুসারে নিষিদ্ধ। যদি বিনা বিচারে হত্যা যেকোনো সূত্র থেকেই এভাবে ঘটতে থাকে, তাহলে এতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিবে এবং দুর্বৃত্তরা সমাজে প্রাধান্য লাভ করবে।

প্রশ্ন : পুলিশের কর্তারা ইদানীং সভা-সমাবেশ ও মতবিনিময়ও করছেন। নাশকতাকারীদের ধরিয়ে দেয়ায় পুলিশ যাদের পুরস্কার দিচ্ছে তারা অধিকাংশই ছাত্রলীগ। আইজিপির বক্তব্যের সূত্র ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য দিচ্ছেন, এই প্রবণতাও নতুন মনে হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনের রাজনীতিকরণ কীভাবে দেখছেন?

আকবর আলি খান : বাংলাদেশে প্রশাসনের রাজনীতিকরণ দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। এটা নতুন কিছু নয়। নতুন করে যা ঘটছে বলছেন, তা দলীয়করণের ধারাবাহিকতামাত্র। আমি এর মধ্যে ভিন্ন কোনো তাৎপর্য দেখছি না।

প্রশ্ন : ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে যে, সরকার জোর করে ক্ষমতায় থাকছে। আমাদের সমাজে এর প্রভাব কীভাবে পড়ছে বা পড়বে বলে মনে করেন?

আকবর আলি খান : ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করার ক্ষেত্রে সরকারের বক্তব্য ছিল গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে এটা অবশ্যম্ভাবী ছিল। এছাড়া গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা কিছুতেই রক্ষা করা যেত না। এখন এই নির্বাচনে যেটা অসুবিধা হয়েছে তা হলো, ১৫৩টি আসনে কোনো নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয়নি, কোনো ভোটার সেখানে ভোট দিতে পারেননি। আমাদের সংবিধান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরে প্রতিষ্ঠিত। সেই অনুসারে এ ধরনের ভোটারবিহীন নির্বাচন অল্প কিছু ক্ষেত্রে হতে পারে, কিন্তু ৫০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে হওয়া মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। এই নির্বাচনে বিরোধী দল আসেনি। যে ১৪৭টি আসনে নির্বাচন হয়েছে সেখানে মূলত জাতীয় পার্টির সঙ্গে সরকারি দল আসনগুলো ভাগ করে নিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কোনো নির্বাচন হয়নি। সরকার গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে ঠিকই, কিন্তু যদি সত্যিকারের গণতন্ত্রের পথে যেতে হয়, তাহলে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা একান্ত জরুরি।

প্রশ্ন : একটি নির্বাচনের কথা তো সরকারও বলছে, সেটা হবে পাঁচ বছর শেষে। আপনি কি মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা বলছেন?

আকবর আলি খান : এই নির্বাচনটা আইন অনুসারে বৈধ হলেও এটা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। তাই নতুন করে নির্বাচনটা অতি দ্রুত না হলে পরে সমস্যা বাড়বে।

প্রশ্ন : সরকার তো শুরুতে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা বলেছিল, ক্রসফায়ারের ক্ষেত্রেও আমরা তাই দেখছি। এই যে রাজনৈতিক মিথ্যাচার এবং অবস্থান পরিবর্তন এটা জাতির বিকাশে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে?

আকবর আলি খান : অবশ্যই এগুলো নিন্দনীয়। তবে এটা যে শুধু এই সরকার করছে, তা নয়। এর আগের সরকারও একই রকম কাজ করেছে। কাজেই এখন যারা সুস্থ রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন কীভাবে এই অসুস্থ রাজনীতিকে সুস্থ রাজনীতির পথে নেয়া যায়, তা আমাদের চিন্তা করতে হবে।

প্রশ্ন : আমরা এখন যা কিছু জানছি তা গণমাধ্যমের মুখ দিয়েই জানছি। সরকারের বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেছেন, গণমাধ্যম যদি একদিন হরতাল-অবরোধের খবর না দেখাত, তাহলে অবরোধ-হরতাল থাকত না। গণমাধ্যমের বর্তমান মতামত ও অবস্থাকে একজন নাগরিক হিসেবে আপনি কীভাবে পর্যালোচনা করছেন?

আকবর আলি খান : আমার মনে হয় যে, গণমাধ্যমকে সরকার যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ করছে। অনেক টিভি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। টিভি প্রোগ্রামের ব্যাপারেও সরকার থেকে বক্তব্য দেয়া হয়েছে। সুতরাং এর থেকে বেশি গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। কারণ দেশের গণমাধ্যম যদি অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে লোকজন বাইরে থেকে তথ্য সংগ্রহ করবে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই বিবিসির সংবাদ শুনতো, দেশের সংবাদ শুনতো না। আজকের আন্তর্জাতিকায়ন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গণমাধ্যম বেশি নিয়ন্ত্রণ করে লাভ নেই, বাইরে থেকে খবর চলে আসবে। এর বেশি গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

প্রশ্ন : তাহলে বলছেন যে, সরকার গণমাধ্যমের ওপর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ জারি রেখেছে?

আকবর আলি খান : আমার তো মনে হয় যে, এটাই সর্বোচ্চ। বর্তমান গণমাধ্যমকে অবাধ, স্বাধীন বলা যাচ্ছে না। তবে এর মধ্যেও কিছু খবর চলে আসছে। কারণ আজকের বিশ্ব ব্যবস্থায় তথ্যপ্রবাহের ওপর সরকারের ক্ষমতা সীমিত হয়ে গেছে।

প্রশ্ন : আগে ছোট নেতারা মুখ খারাপ করে বক্তব্য রাখতেন, এখন কেন্দ্রীয় নেতারা গালি দেয়ার পর নিচের সারির নেতারা তা প্র্যাকটিস করেন। কথায় কথায় একে অপরকে নির্মূল করেন। এর সামাজিক ভিত্তি কী? এই প্রবণতার কারণ কী?

আকবর আলি খান : আমাদের রাজনীতিকে সুস্থ পথে ফিরিয়ে আনতে গেলে রাজনীতিবিদদের সুস্থ ভাষায় কথা বলতে হবে। আমাকে যখন কেউ প্রশ্ন করে যে, বাংলাদেশের রাজনীতির সমস্যা সমাধানের কোনো উপায় আছে কি না, আমি তাদের শুধু খবরের কাগজে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতার ভাষা দেখিয়েই বলে দিই, কোনো লক্ষণ আমি দেখতে পাচ্ছি না। কারণ যে ভাষায় দেশের রাজনীতিবিদরা একে অপরকে আক্রমণ করে, পৃথিবীর কোনো সভ্য-গণতান্ত্রিক দেশে এ ধরনের আচরণ দেখা যায় না। আমি বারবার তাদের কাছে নিবেদন করেছি এবং এখনও করি, তারা যেন ভদ্র ভাষায় একে অপরের সম্পর্কে কথাবার্তা বলেন।

প্রশ্ন : আমরা দেখি যে, ’৯০ এর পর থেকেই ক্ষমতাসীন দলগুলো শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করছে না। ’৯০-এ এতবড় আন্দোলন হলো, তারপর এই দশা কেন? এর বীজটা কোথায় ছিল?

আকবর আলি খান : এর মূল কারণ হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো আদর্শের চর্চা নেই। ক্ষমতায় আসার জন্য তারা ক্ষমতার রাজনীতি করে। এ কারণেই ক্ষমতা তারা কোনোভাবে ছাড়তে চায় না। সুতরাং আদর্শহীন দুটি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে ক্ষমতা দখলের জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে কোনো সহিষ্ণুতা নেই, একে অপরের ক্ষেত্রে কোনো শ্রদ্ধাবোধও নেই।

প্রশ্ন : আজকে আমাদের ব্যবসায়ীরা মাঠে নামছেন, এই অবস্থার অবসান চাচ্ছেন। কিন্তু আমরা জানি যে, ব্যবসায়ীরাই আবার রাজনৈতিক দলগুলোর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে সব তৎপরতার পেছনে অর্থায়ন করেন।

আকবর আলি খান : অবশ্যই। যে সরকার থাকে, তাদের পক্ষের লোকেরাই চেম্বার অব কমার্সে কর্তৃত্ব করে। কাজেই তাদের যে বক্তব্য, তা আপামর ব্যবসায়ীদের বক্তব্য নয়। যদি বাংলাদেশের আপামর ব্যবসায়ীরা চায় যে, এই রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে হবে তাহলে তা অবশ্যই পরিবর্তিত হতো। কিন্তু বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটি সর্বত্রই বিভক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজ্ঞ, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, সরকারি কর্মকর্তা, এরা সবাই রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। এদের মধ্যে কোনো ঐকমত্য নেই। যদি সত্যিকারের ঐকমত্য থাকতো, তাহলে এ পরিস্থিতির অবসান অনেক আগেই ঘটত।

প্রশ্ন : আপনার বক্তব্যে পুরোটাই হতাশা! উত্তরণের কোনো পথ কি দেখা যাচ্ছে না?

আকবর আলি খান : হতাশা কি না তা নির্ভর করে, কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। আপনি একজন সাপ্তাহিক পত্রিকার সাংবাদিক, প্রতি সপ্তাহে খবর দেন। এখন আপনি যদি আগামী সপ্তাহে কিছু হবে কি না, তা নিয়ে লিখতে যান, তাহলে হতাশ হবেন। কিন্তু জাতির জীবনে এক দিন, এক সপ্তাহ বা এক বছর কোনো উল্লেখযোগ্য বিষয় না। কাজেই আমি মূলত আশাবাদী। কিন্তু সেই আশাবাদের যে সময়সীমা, তা সীমিত নয়। এখন না হয়, আগামী ১০ বা ১৫ বছরে আমার ধারণা বাংলাদেশের সৃজনশীল মানুষ রাজনীতিতে পরিবর্তন আনবে।

প্রশ্ন : বর্তমান তরুণেরাই তো আগামীতে রাজনীতি থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব করবে। সম্প্রতি তরুণদের আন্দোলন গণজাগরণ মঞ্চ এবং তাকে কেন্দ্র করে বিভাজনও দেখলাম…

আকবর আলি খান : দেখছেন, ঠিক আছে। তবে আবার তরুণদের মধ্য থেকেই বিরাট শক্তি বেরিয়ে আসবে। এখন যাদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে দেখছেন তারাই যে করবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। নতুন মানুষ বেরিয়ে আসতে পারে। তাই এভাবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। তবে আপাতত কোনো আশা আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

প্রশ্ন : সরকার সম্প্রতি রাজনৈতিক অস্থিরতায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে শীর্ষ ঋণখেলাপিদের ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু আমরা দেখেছি বড় ব্যবসায়ীরাই শুধু এ সুবিধা পেল। বিপরীতে মাঝারি ও দরিদ্র ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হলো। এটাকে কীভাবে দেখছেন? এর ফলাফল কি হবে বলে মনে করেন?

আকবর আলি খান : প্রথম কথা হলো, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে হরতালের কিছু প্রভাব পড়ছে। কিন্তু এতে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যায়নি। যেখানে ৬ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি বছরের পর বছর ধরে চলছে, সেখানে বলাই যায় যে, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ী নিশ্চয়ই লাভবানও হচ্ছেন, সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। সুতরাং যদি কোনো খেলাপি ঋণ থাকে, তাহলে ব্যাংকগুলোর উচিত এর ভিত্তিতে আলাদাভাবে ব্যবস্থা নেয়া। সরকার থেকে যেভাবে ঢালাও আদেশ দেয়া হয়েছে, তার অপব্যবহার হতে পারে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হননি, তারাও এর সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করতে পারে। যা হওয়া উচিত তা হচ্ছে, ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের কোনো সমস্যা থাকলে সেখানে সুযোগ সুবিধা দিবে। এই যে ঢালাও সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়েছে, এর ফলাফল অর্থনীতির জন্য ভালো হবে বলে মনে করি না।

প্রশ্ন : গত বছরের ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করলে আমরা পাই ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা দেয়ার পর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ হয়ে গেল…

আকবর আলি খান : এসব হিসাব নিয়ে লাভ নেই। কারণ এগুলোর মধ্যে এমন অনেক কিছু থাকে, যা পর্দার আড়ালে করা হয়ে থাকে। এসব অঙ্ক ও হিসাবের সত্যতা সম্পর্কে আমি অন্তত নিশ্চিত নই।

প্রশ্ন : এই বক্তব্য আমরা আপনাকে এর আগেও দিতে দেখেছি যে, সরকারের তথ্যের ওপর আপনার আস্থা কম। দারিদ্র্যের হার সংক্রান্ত সরকারি তথ্য সম্পর্কেও এর আগে আপনি কথা বলেছিলেন। কিন্তু একটু আগে আপনি ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সরকারি তথ্য বেশ কনফিডেন্সের সঙ্গেই উত্থাপন করলেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির সরকারি তথ্যের ওপর কি নির্ভর করা যায়?

আকবর আলি খান : ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। তবে এটা সরকারের কোনো অবদান নয়। এটা মূলত সাধারণ বাংলাদেশিদের সৃজনশীলতা। প্রথমত, কৃষকরা কৃষি উৎপাদন বাড়াচ্ছে। দ্বিতীয়ত প্রবাসীরা ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে। তৃতীয়ত পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকরা কাজ করে অর্থনীতিতে একটা বড় অবদান রাখছে। চতুর্থত, ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থায় উজ্জীবিত হয়ে অনেক ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। দেশের রাজনীতি আর শাসন ব্যবস্থা যা-ই হোক, এসব অবদান মিলে প্রতি বছর প্রায় ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। এটা মূলত বিশ্বায়ন এবং তার সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সৃজনশীলতার সংমিশ্রণের ফলে সম্ভব হচ্ছে।

প্রশ্ন : আপনি বলছেন, এখানে সরকারের অবদান নেই। অথচ সরকার অর্থনীতির নবযাত্রার কথা বলছে। উন্নয়নের নানা তথ্য হাজির করছে…

আকবর আলি খান : অর্থনীতির নবযাত্রা কিছুই না। এত বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও প্রতি দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। বিএনপি যখন ’৯১ সালে আসে, তাদের যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, তার চেয়ে আওয়ামী লীগের ’৯৬ সালের আমলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ভালো ছিল। তারপর যখন আবার বিএনপি ফিরে আসে, তাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের শেষ আমলের চেয়ে ভালো ছিল। এরপর আবার যখন আওয়ামী লীগ ফিরে আসে, তখন দেখা যায়, আগের বিএনপি সরকারের চেয়ে তাদের কর্মকাণ্ড ভালো। অর্থাৎ ধাপে ধাপে অর্থনীতি এগুচ্ছে। এখানে কোনো রাজনৈতিক দলের কৃতিত্ব নেয়ার কিছু নেই। এটা মূলত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের অবদান। সারা বিশ্বের এগিয়ে চলার সঙ্গে তারাও তাদের সৃজনশীলতা দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে সরকার এ প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করছে, সুশাসনের অভাবে। এত হরতাল-অবরোধের পরেও হয়ত দেখা যাবে, এ বছর ৫ শতাংশের ঊর্ধ্বে গিয়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সুতরাং এই যে বলা হচ্ছে, অবরোধ-হরতালের ফলে অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, এটা ঠিক নয়। কোনো ক্ষেত্রে কিছু কিছু লোকের ক্ষতি হচ্ছে। পর্যটনশিল্পে যারা কাজ করে, তারা কাজ পাচ্ছে না। দিনমজুরদের অসুবিধা হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কোনো প্রভাব পড়ছে না।

প্রশ্ন : সর্বশেষ হেফাজতের আন্দোলনের পর সমাজে ও রাজনীতিতে ধর্মকেন্দ্রিক একটা বিভাজন তৈরি হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। আগামী রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব কেমন হবে?

আকবর আলি খান : আমার মনে হয় যে, ধর্মভিত্তিক বিভাজন হয়নি। রাজনীতির বিভাজন হয়েছে মূলত আওয়ামী লীগ ও তার বিরোধী শক্তির মধ্যে। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে, শাসন করে, তখন তারা অনেক শত্রুও তৈরি করে। এবারও সেই ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের শত্রু এবং আওয়ামী লীগের বন্ধু, এরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। সুতরাং ধর্মভিত্তিক বিভাজন রাজনীতির হয়নি। ধর্ম এক্ষেত্রে একটামাত্র উপাদান।

প্রশ্ন : সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারত সফর করে গেলেন। এর আগে তিনি মিয়ানমারে এসেছিলেন। বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকার পরেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশে আগমন নিয়ে কিছু হলো না, অনেক বিশ্লেষক এক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতিকে দায়ী করেছেন…

আকবর আলি খান : সব দেশের পররাষ্ট্রনীতিই সে দেশের রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশে এখন অভ্যন্তরীণ অবস্থা নিয়ে সরকার এত ব্যস্ত যে, সামগ্রিকভাবে পররাষ্ট্রনীতি এখানে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অবনমিত হয়েছে। এদের মূল লক্ষ্য হলো, কীভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকবে।

প্রশ্ন : ভারত ও মার্কিনের বাংলাদেশে স্বার্থ রয়েছে। বিভিন্ন সময়েই এই আলাপ উঠেছে যে, তারা আমাদের রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। এখানে তাদের বিনিয়োগও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদের বিশৃঙ্খলায় তাদের যে ক্ষতি সেটাকে মোকাবেলা করতে তারা কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?

আকবর আলি খান : বিনিয়োগ যা আছে সেটা তো চলছেই। এই অবস্থার ফলে যেটা হচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ পৃথিবীর কোথাও থেকে বাংলাদেশে আসবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত স্থিতিশীলতা না আসছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগকারীরা সমস্যায় পড়লে তার প্রতিকারও কঠিন। তারা চুক্তি লঙ্ঘনের কোনো মামলা করলে বিচার পান না। বিচার ব্যবস্থায় এত বেশি দীর্ঘসূত্রতা যে, এখানে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ নেই, সড়ক, বন্দরের অবস্থা বেহাল। এই অবস্থাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যদি অতিরিক্ত কোনো সুবিধা না দেয়া হয়, তাহলে তারা কেউ আসবে না। এই অতিরিক্ত সুবিধাটা হতে পারে গ্যাসক্ষেত্র যদি নিশ্চিতভাবে থাকে, যদি সেটা দেয়া হয় অথবা মোবাইল সেক্টরে। এ ধরনের খাতে কিছু নতুন বিনিয়োগ আসতে পারে। সেটা করতে হলে আন্তর্জাতিক মান অর্জন করতে হবে। সুশাসনের দিক থেকে আমরা আন্তর্জাতিক মানের অনেক পেছনে পড়ে আছি।

আর কোনো কোনো দেশের বিনিয়োগ তো অনেক দেশেই আছে। তারা কি সেখানে গিয়ে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে? আমার তো তা মনে হয় না!

প্রশ্ন : বিদেশি হস্তক্ষেপের বিষয়টি আপনি নাকচ করে দিলেন। যদিও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি দেখিয়ে দেয় যে, বিএনপি বিদেশি হস্তক্ষেপ চাইছে। সরকারও অভিযোগ করছে যে, তারা বিদেশিদের দিকে তাকিয়ে আছে।

আকবর আলি খান : এটা বাংলাদেশের রাজনীতির সমস্যা। যারা সরকারে থাকে, তারা বিদেশিদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করে। যারা ক্ষমতায় থাকে না, তারা বিদেশিদের কথা বেশি বলে। ১৯৯০ সালের পর থেকে দেখেন, সব সরকার ও বিরোধী পক্ষের ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটতে দেখবেন। আজকের অবস্থাকে আমার নতুন কিছু মনে হচ্ছে না।

প্রশ্ন : যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া এখন আলাপের বাইরে চলে গেছে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সম্পর্কে আপনার মত কী?

আকবর আলি খান : বিচার প্রক্রিয়ায় অনেক সমস্যা আছে। দেশের বিচার প্রক্রিয়া অনুযায়ী কাজ চলছে। এটাকে খুব বেশি ত্বরান্বিত করা সম্ভব বলে মনে হয় না। বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এখানে অনেক দিনের সমস্যা। অল্প কিছু মামলায় হয়ত হইচই করে কিছু করা যাবে। কিন্তু বিচার ব্যবস্থায় আজ যে জট লেগে আছে তা মুখের কথায় বা দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে না।

প্রশ্ন : আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর কোনো সম্পর্ক আছে কি?

আকবর আলি খান : এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কিছুটা সম্পর্ক থাকতে পারে। যেহেতু জামায়াতে ইসলামী বিএনপির সঙ্গে জোটে আছে। তবে বিএনপি এই বিচারের বিপক্ষে এটা আমার কাছে সুস্পষ্ট না। আমার ধারণা, আপামর বিএনপির সমর্থক ও নেতাকর্মীরা যুদ্ধাপরাধের বিচার চায়। কিন্তু সেই বিচার স্বচ্ছ হোক, এটাই তারা বলে। বিএনপি ও যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি বলার মতো আমার কোনো গবেষণা নেই।

প্রশ্ন : আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আপনার পরামর্শ কী?

আকবর আলি খান : সব ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রপতি উদ্যোগ নিতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হতে পারে, তারা উদ্যোগ নিতে পারেন। সিভিল সমাজ এমনিতেই বিভক্ত। তাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব না। সিভিল সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো যদি এক হয়ে চাপ দেয়, তাহলে কিছু একটা হতে পারে।

এখনকার যে সমস্যা তার মূল অনেক গভীরে প্রোথিত। সুতরাং শুধু নির্বাচন করলে বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। দেশের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। সেজন্য তৃতীয় কোনো রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব ঘটতে পারে। সেটাও কালই হবে না। ১৬ কোটি মানুষের দেশে এ ধরনের মতবাদ প্রচার করে, রাজনৈতিক শক্তি সঞ্চার করে এগিয়ে যেতে সময় লাগতে পারে। এছাড়া আমাদের তরুণরা রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারে। এরকম অজস্র সম্ভাবনা আছে। কোনটা হবে তা আমি বলতে পারব না।

প্রশ্ন : ভারতের আম আদমি পার্টিকে সেক্ষেত্রে আমাদের জন্য কোনো মডেল মনে করেন কি?

আকবর আলি খান : তারা একটি মাত্র রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে। ভারত যত বড় দেশ, তাতে এর প্রভাব এখনও সীমিত। আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষ। যে কেউ তাদের কাছ থেকে শিখতে পারেন। কিন্তু রাতারাতি বা অল্প সময়ে কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না।

সাপ্তাহিক এর সৌজন্যে

You Might Also Like