হোম » আমার কথা

আমার কথা

admin- Wednesday, March 15th, 2017

সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, আওয়ামী লীগের সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক সৈয়দ আবুল হোসেন তার কর্মব্যস্ত জীবনের বাইরে লেখালেখি করেন নিয়মিত। এই পর্যন্ত তার বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘আমার কথা’ নামের একটি বই। বাংলা একাডেমীর একুশে বই মেলায় ছিল। বইটি ধারাবাকিভাবে এখন সময়-তে প্রকাশ করা হচ্ছে। এই বইয়ে তিনি নিজের চিন্তা, চেতনা, স্বভাব, অনুভূতি, কর্মকান্ড, মূল্যবোধ, নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে লিখেছেন। লিখেছেন এই জীবনে তাকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে যে সব কথা নানা জন জেনে না জেনে বলেছেন। সেই সম্পর্কে তার নিজের কথা। এছাড়াও বইয়ের ৪৮ টি অধ্যায়ে তিনি তুলে ধরেছেন তার জীবনের না বলা অনেক কথা। এই বইটি পড়লে তার সম্পর্কে মানুষ অনেক তথ্য জানতে পারবে ও তাকে যারা পুরোপুরি চিনেন না তাদের চিনতেও সুবিধা হবে। তার এই বইটি ‘এখন সময়’ ধারাবাহিকভাবে আজ থেকে প্রকাশিত হলো। প্রকাশিত হচ্ছে ‘আমার কথা’ বইয়ের সকল অধ্যায়। পড়তে চোখ রাখুন ‘এখন সময়’এ।

সৈয়দ আবুল হোসেন এই বইটি এখন সময় প্রকাশ হওয়া উপলক্ষ্যে জানান, তিনি এতে আনন্দিত যে তার কথাগুলো তিনি বাংলাদেশের পাশাপাশি প্রবাসীদের কাছেও তুলে ধরতে পারছেন। তিনি বলেন, আশা করি বইটি যারা আগ্রহ নিয়ে পড়বেন তাদের ভাল লাগবে। যারা অনেক কথা জানেন না তাদের জানা হবে। সেই সঙ্গে মানুষের কাছে অনেক ভুল তথ্য আছে সেগুলোরও সংশোধন হবে। তিনি বলেন, আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাইনি। অনেক সতর্কতার সঙ্গে লিখেছি। এরপরও যদি কেউ কষ্ট পান তাহলে সেটা আমার অনিচ্ছাকৃত।

১. আমার অনুভব

সৈয়দ আবুল হোসেন: শিশুকাল থেকে আমি ছিলাম শান্তশিষ্ট, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী এবং হাসিখুশি। মনের দিক থেকেও সবসময় প্রাণবন্ত, বন্ধুবৎসল ও অমায়িক ছিলাম। শারীরিক দুরন্তপনা আমার কাছে পাশব মনে হতো। তার চেয়ে পাশব মনে হতো মন্দকথা। ‘সাম ওয়ার্ডস হার্ট মোর দ্যান সোর্ডস’- এটি আমার অন্তরে সর্বক্ষণ বিরাজ করত। তাই কাউকে কিছু বলার সময় সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের চেষ্টা করতাম।

যে কাজ অন্যকে আঘাত দেয়, যে কথা কাউকে মর্মাহত করে, যে আচরণ মানবিক বিকাশের পক্ষে ক্ষতিকর তা কখনও মেনে নিতে পারতাম না। এখনও পারি না। প্রত্যেকের কষ্টকে আমার নিজের কষ্টের চেয়েও ভয়ঙ্কর মনে হয়। তাই প্রতিটি কাজ করার আগে ভাবতাম। সবার সঙ্গে এমন ব্যবহার করতাম যাতে কেউ কষ্ট না পায়। আমার এ আচরণের জন্য উচ্ছ্বসিত প্রশংসা পেয়েছি। আবার অনেকের কাছে আমাকে ভীতু হিসাবেও প্রতিভাত করেছে। তবুও আমি আমার মননশীলতায় একাগ্র থেকেছি।

পৃথিবীর সব আকর্ষণীয় জিনিসগুলো নরম, ভালবাসা নরম, স্নেহ-মমতাও নরম। পৃথিবীর মনোহর বস্তুগুলোর কোনোটাতে শক্তি প্রয়োগের আস্ফালন নেই। নমনীয়তা সুন্দর, এটাই সর্বজনীন। সর্বজনীনতার চেয়ে অধিক আনন্দের এবং নিপুণ সাফল্যের আর কিছু নেই।

ছোটবেলার কথা এখনও মনে পড়ে। পিতামাতা আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। তাঁদের ধারণা আমি নিরীহ, বোকা এবং কখনও লড়তে পারব না; প্রতিষ্ঠিত হতে পারব না- নিষ্ঠুর পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন করে। আসলেই আমি নিরীহ ছিলাম। শিশুবেলা থেকে অন্যের কষ্ট মোটেও সহ্য করতে পারতাম না।

বাবা আফসোস করতেন- এত কোমল মনের ছেলে কি কখনও সংসারজীবনে টিকে থাকতে পারবে?

অনেকে আমাকে শক্ত হওয়ার উপদেশ দিতেন। শক্ত হওয়া কী আমি বুঝতাম না। নমনীয়তার মাঝে জীবনের সার্থকতা খুঁজতাম, আমি এতে আনন্দ পেতাম। পৃথিবীর সব আকর্ষণীয় জিনিসগুলো নরম, ভালবাসা নরম, স্নেহ-মমতাও নরম। পৃথিবীর মনোহর বস্তুগুলোর কোনোটাতে শক্তি প্রয়োগের আস্ফালন নেই। নমনীয়তা সুন্দর, এটাই সর্বজনীন। সর্বজনীনতার চেয়ে অধিক আনন্দের এবং নিপুণ সাফল্যের আর কিছু নেই।

আমার পিতামাতা আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে ধৈর্য ধারণ করতে হয়। রাগ সংবরণ করতে হয়। এক সেকেন্ডের রাগ কারও পুরো জীবনকে বিষিয়ে তুলতে পারে। যে ব্যক্তির ধৈর্য নেই, তার আত্মাও নেই। যার আত্মা নেই সে মানুষ নয়। রাগ পাশবতার নামান্তর। অধৈর্য মানুষকে পশুতে পরিণত করে। মানুষ কেন রাগে? মানুষ যখন ভুল করে এবং সে ভুল স্বীকার করে না, স্বভাবতই তখন সে রেগে যায়। রাগ অশান্তিকে প্রসারিত করে। রাগের জন্য মানুষের শান্তি হয় না, তবে রাগ নিজেই রাগের শাস্তি দিয়ে ছাড়ে। প্রবাদ আছে- “রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন”। আমি হারতে চাইনি। তাই আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস রপ্ত করে নিয়েছি। আমার পিতামাতা এভাবে আমাকে গড়ে তুলেছেন। ভদ্রতা দিয়ে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। মহাত্মা গান্ধির ভাষায় বলতে পারি : ওহ মবহঃষব ধিু, ুড়ঁ পধহ ংযধশব ঃযব ড়িৎষফ.১ রাগ পোশাকের নিচে লুকিয়ে থাকা বিষধর সাপের মতো। এটি পরিহার করতে পারলে নিরাপত্তা ও শান্তি দুটোই বহুলাংশে নিশ্চিত হয়ে যায়। আমি বলি, রাগ একধরনের নিছক পাগলামী। তাই রাগকে সংযত করে চলাই মনুষ্যত্বের পরিচয়।

ষাটের দশকে গ্রামীণ মনের নির্ভেজাল স্নেহ, হৃৎটান, ধর্মবোধ ও সম্প্রীতি ছিল আমার বেড়ে ওঠার আবহ। আমার পরিবারের সবাই ছিলেন ধর্মপ্রাণ। ঐকান্তিক উদারতার প্রমুগ্ধ আতিথেয়তা ছিল আমার পরিবারের অবিচ্ছেদ্য পরিবেশ। মুরব্বিদের প্রতিটি পদক্ষেপ গভীরভাবে নিরীক্ষণ করতাম। সবার ভালো দিকগুলো আমাকে আকৃষ্ট করত। এভাবে আমি গভীর পর্যবেক্ষণে অভ্যস্ত হয়ে উঠি। আমার অস্থিমজ্জায় পারিবারিক ঐতিহ্য-আদর্শ সম্পূর্ণভাবে নিজের হয়ে হৃদয়ে নির্ভীক স্পন্দন সৃষ্টি করে। এ স্পন্দন ছিল মানুষকে জানার, দেশকে ভালবাসার, গুরুজনদের শ্রদ্ধার এবং প্রকৃতিকে মহিমায় গ্রহণ করার।

আমি কখনও এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। এসবকে ঘিরে আমার সত্তা আপন গতিতে আবর্তিত হয়েছে। বেরিয়ে আসতে না-পারাকে আমি এখনও সৌভাগ্যের বলে মনে করি। তবে এটাকে পশ্চাদপদতা বলার কোনো অবকাশ নেই। শেঁকড়ে লেগে থাকা যেমন উন্নয়ন নয় তেমনি শেঁকড় উপড়ে ফেলাও প্রগতি নয়। দুটোর মাঝে সমন্বয়কে আমি নিজের, জাতির, সর্বোপরি, বিশ্বের জন্য সর্বোচ্চ কল্যাণময় মনে করি। আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণাতেও এটি প্রতীয়মান হয়েছে। নইলে কেন বিশ্ব এখনও তার অতীত ঐতিহ্যগুলোকে টিকিয়ে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টায় মগ্ন!

অভ্যাস, পরিবেশ ও চেতনা মানুষের সহজাত প্রত্যয়। এ তিনটি প্রতীতি মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায়ক। মূলত এ তিনটি প্রত্যয়ই মানুষের নিয়ন্ত্রক। প্রত্যেকের জীবনে এগুলোর প্রভাব যেমন ব্যাপক, তেমনি অপ্রতিরোধ্য।

আর একটি কথা না বললে নয়- গত শতকের ষাটের দশকের কথা। তখন গ্রামে ধর্মীয় কুসংস্কার ছিল প্রবল। এখনকার মতো এত বৈশ্বিক যোজনার সমন্বিত যোগাযোগ ছিল না। দেশ ছিল পরাধীন। এখনও যে কুসংস্কার নেই তা নয়। আমার পরিবার প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষায় ঋদ্ধ ছিল। তাই তারা ছিল জাগতিক কুসংস্কার থেকে বহুলাংশে মুক্ত। ফলে ধর্ম আমাকে উদার করেছে, সংকীর্ণতা দিতে পারেনি। আমি ধর্মকে মর্মমূলে লালন করেছি বিকাশের মুগ্ধতায়। ধর্ম ছিল আমার সযতœ অভিলাষের প্রসন্ন চয়ন। আগুনের আবিষ্কার মানবসভ্যতার প্রথম সূচনা। আগুনই মানুষকে গুহা হতে আধুনিক বিজ্ঞানময় বিশ্বের মহীয়ান আসনে আসীন করেছে। আবার এ আগুনের অপরিকল্পিত ব্যবহারই নিয়ে আসে মারাত্মক দুর্যোগ। প্রত্যেকটি বিষয়ের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য। আমি ধর্মকে উত্তমরূপে ব্যবহার করেছি, ঠিক আগুনকে যথাযথ ব্যবহারের মতো নিষ্ঠা আর সতর্কতায়। তাই কুসংস্কার নামের কোনো ভ্রান্তি আমার চেতনাকে কলঙ্কিত করতে পারেনি। ইসলাম মানবতার ধর্ম। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান নিজের ধর্ম যথাযথভাবে পালন করে, অন্যের ধর্ম পালনে কখনো বাধা দেয় না।

অভ্যাস, পরিবেশ ও চেতনা মানুষের সহজাত প্রত্যয়। এ তিনটি প্রতীতি মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায়ক। মূলত এ তিনটি প্রত্যয়ই মানুষের নিয়ন্ত্রক। প্রত্যেকের জীবনে এগুলোর প্রভাব যেমন ব্যাপক, তেমনি অপ্রতিরোধ্য। অবহেলার সাধ্য নেই। ব্যক্তির ওপর এসবের প্রভাব রাষ্ট্রীয় প্রভাবের চেয়ে অনেক বেশি। এর সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত হয় পেশা। পেশা মানুষের অভ্যাস, পরিবেশ ও চেতনাকে ইতিবাচকতায় ধাবিত করার নিখুঁত ও অব্যর্থ অস্ত্র। তাই সভ্য সমাজে পেশা অগ্রগতির ধারক।

প্রত্যেক পেশার মানুষ কিছু সাধারণ অভ্যাস ও চেতনার ধারক। একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ তাকে লালন করে, ঐ পরিবেশের মধ্যে তাকে অতিবাহিত করতে হয়। একজন ব্যবসায়ী যখন রাজনীতিবিদ হয়ে যায় কিংবা একজন শিক্ষক যখন ব্যবসায়ী হয়ে যায় তখন তার আচরণ এবং ব্যবহারে অনিবার্য কিছু পরিবর্তন আসে। পেশা ক্রমাগত অস্থিমজ্জায় মিশে চিন্তা-চেতনাকে একাকার করে দেয়। এজন্য সমাজবিজ্ঞানীরা পেশা দিয়ে মানুষের চরিত্র ও আচরণগত সমীকরণ টানার প্রয়াস নেন। এটি বহুলাংশে বৈজ্ঞানিক। তাই সমাজ-গবেষণাকেও এখন সমাজবিজ্ঞান নামে অভিহিত করা হয়।

সততা ছিল আমার মূলধন, নিষ্ঠা ছিল আমার দক্ষতা আর শ্রম ছিল আমার প্রেরণা। এ তিনের সমন্বয় আমাকে, আমার ব্যবসায়কে প্রত্যাশিত লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। আমার ব্যবসায় লাভের মুখ দেখে। কিন্তু আমার প্রয়োজন ছিল সামান্য। ব্যবসায় আসার পর যা আয় হয়েছে তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি।

বাকি অর্থ দিয়ে কী করব? বাবা-মায়ের কাছে জানতে চাইলাম। বাবা বললেন, এলাকার গরিবদের জন্য কিছু করো। মা বললেন- শিক্ষা প্রসারের জন্য ব্যয় করো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আমরা নারীরা লেখাপড়া করতে পারিনি। তুমি মেয়েদের লেখাপড়ার পথ সুগম করার জন্য কিছু করো। মায়ের কথা সেদিন রাখতে না পারলেও পরবর্তীকালে রেখেছিলাম। মায়ের প্রত্যাশার শ্রদ্ধা- আমার প্রতিষ্ঠিত ‘শেখ হাসিনা একাডেমী অ্যান্ড উইমেন্স কলেজ’, যা গুণগত শিক্ষার মান বিবেচনায় ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে জাতীয়করণ করা হয়েছে।

বাবা-মায়ের নির্দেশে ও আমার স্বতঃস্ফূর্ত তাগিদে নজর দিলাম এলাকার প্রতি। গরিব-দুঃখীদের প্রতি। তখন ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ এবং আমি সাতাশ বছরের টগবগে যুবক। তবু আমি যৌবনকে বিপথে হারাতে দিইনি। একটি পয়সাও অবৈধ পথে কিংবা অশালীন কাজে কখনও খরচ করিনি।

আমার এলাকার দিকে নজর দিয়ে আমার অন্তর ও যৌবনের সব উদ্দামতা সবুজ নিগড়ে জনকল্যাণের কোলে টেনে নিয়েছিল। আমিও সানন্দে এগিয়ে গিয়েছিলাম এলাকার কল্যাণে, এলাকার উন্নয়নে। ওই জনপদে আমার মা, বাবা, ভাইবোন। ওখানে আমার পায়েচলা পথ, গুবাক তরুর সারি। স্কুল ছিল না, স্কুল হলো। কলেজ ছিল না, কলেজ হলো। রাস্তা ছিল না, রাস্তা হলো। বিদ্যুতের আলো ছিল না, আলো এলো। এভাবে নিজের অজান্তে এলাকার জনগণের কাছাকাছি চলে এলাম অবলীলায়।

রাজনীতি- সে অনেক পরের ঘটনা। ভালোই চলছিল ব্যবসায়, বেশ প্রশান্তিতে ছিলাম জনসেবায় নিমগ্ন থেকে। কিন্তু বিধাতা হয়তো তা চাইছিলেন না। তিনি আমাকে রাজনীতিতে টেনে আনেন। ঘটনাটা আকস্মিক নয়, তবে নাটকীয়। জীবনের প্রতিটি মোড়-পরিবর্তনকারী ঘটনা নাটকীয়ই হয়।

রাজনীতিতে আসার পর আমার চেতনায় নতুন একটি মাত্রা যোগ হয়। আগে জনসেবা ছিল আমার নেশা ও আনন্দ। এখন যুক্ত হয় কর্তব্যবোধ। তিনটির সমন্বয় আমাকে জনসেবায় অদম্য করে তোলে। জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছেন, তাদের ভালবাসা দিয়েছেন। প্রতিটি ভোট প্রতিটি মানুষের ভালবাসা; শুধু ভালবাসা নয়, ভালবাসার দুর্লভ আমানত। আমার কর্তব্য বেড়ে যায়, বেড়ে যায় দায়িত্ব। প্রতিটি ভোটার আমার পরিবারের সদস্য হয়ে যায়।

প্রতিটি ভোট প্রতিটি মানুষের ভালবাসা; শুধু ভালবাসা নয়, ভালবাসার দুর্লভ আমানত। আমার কর্তব্য বেড়ে যায়, বেড়ে যায় দায়িত্ব। প্রতিটি ভোটার আমার পরিবারের সদস্য হয়ে যায়।

পরিবার-প্রধানের লক্ষ্যÑ পরিবারের সদস্যবর্গের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা এবং আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বিধান করা। আমি সংসদ সদস্য থাকাকালীন আমার সম্মানিত ভোটারগণের মৌলিক চাহিদা ও আর্থসামাজিক নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে নিজেকে নিবেদিত করার মাধ্যমে আমার নির্বাচনি এলাকার জনগণকে পরিবারের সদস্য হিসাবে বিনি সুতোর মালায় একীভূত করে নেওয়ার অনুপ্রেরণা পাই। এভাবে আমি অগ্রসর হয়েছি। মানুষের কল্যাণে কাজ করেছি।  সংসদ সদস্য না হয়েও এখনও তাদের সাথে আমার অন্তরের বন্ধন আছে- তা কখনও ছিন্ন হবে না।  -ইনসাল্লাহ।

ডাসার, কালকিনি- মাদারীপুর আমার জন্মস্থান। এ সংসদীয় এলাকা থেকে আমি পর পর চার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছি। গর্বিত হয়েছি মুগ্ধকর সম্মানে। তাই ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুর এবং এর জনগণ উভয়ে আমার গর্ব, আর শাশ্বত অহঙ্কারের নির্মল অনুভব। এলাকার উন্নয়ন আমার স্বপ্ন। আমার চিন্তা-চেতনা ও কর্ম-ভাবনা সব ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুরকে ঘিরে সারাদেশের জন্য আবর্তিত। আমার এই এলাকা- আমার সুখ, আমার শান্তি।

আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতামাতাসহ পুণ্যবান পূর্বপুরুষগণ ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুর-এর মাটিতে শুয়ে। তাই ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুর আমার অস্তিত্বের কেন্দ্র। আমি চাই আমার এলাকা নন্দিত সৌকর্য আর মায়াবী মাধুর্যের প্রশান্তিময় শান্তিতে অমিয় নীড়ের স্বর্গ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাক, সমৃদ্ধ হোক বর্ণিল মহিমার অনন্ত সৌহার্দ্য,ে ভরে উঠুক চিরন্তন উৎসবের প্রাণোচ্ছল আনন্দে। আমার স্বপ্ন আমার এলাকা এমন একটি জনপদরূপে প্রতিষ্ঠা পাক, যেখানে নিরক্ষরতা থাকবে না; থাকবে না ক্ষুধা, দারিদ্র্য, সন্ত্রাস এবং অনাচার। আমার প্রত্যাশা- এ এলাকার সমৃদ্ধ যোগাযোগ, ঋদ্ধ পরিবেশ, গুণী মানুষ এবং মানবসম্পদের আকর্ষণীয় উন্নয়ন। আমার এলাকাই হবে শিক্ষার বিমূর্ত প্রতীক, মানবিক মূল্যবোধে প্রাগ্রসর, বিদগ্ধতায় অবিনশ্বর। এখানে থাকবে আদর্শ ও যুগোপযোগী শিক্ষা; প্রতিটি নারী ও প্রতিটি পুরুষ সত্যিকার মানুষ হিসাবে গড়ে উঠবে। সৎ ও দক্ষ কর্মী হয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত থাকার পরিপূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করবে।

১৯৯১-এর আগে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও আর্থসামাজিক চিত্র ছিল ভয়াবহ। এলাকাটি সন্ত্রাসের জনপদ হিসাবে পরিচিত ছিল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের প্রথমদিকে এলাকার একটি কাজে তৎকালীন আইজিপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। তিনি আমার বাড়ি ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুর শুনে আঁতকে উঠেছিলেন- এটি খুব প্রত্যন্ত এলাকা, সন্ত্রাসী জনপদ। আইজিপির কথায় কষ্ট পেলেও প্রতিবাদ করতে পারিনি। সেসময় আমার এলাকার সড়কে-নৌপথে, ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপত্তা ছিল না। খুন-খারাবি ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়।

পশ্চাৎপদ ডাসার-কালকিনি- মাদারীপুরের যোগাযোগব্যবস্থা ছিল ভীষণ নাজুক। উন্নয়নবঞ্চিত এবং মারাত্মকভাবে অবহেলিত নির্বান্ধব জনপদটির দেখ্ভালের কেউ ছিল না। আমি এলাকার সন্তান হিসাবে, আমার সুন্দর স্বপ্নগুলোকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উন্নয়নের কাজ শুরু করি। আমি বিশ্বাস করি, মানুষকে সভ্য করার, দেশকে উন্নত করার এবং নিজের মর্যাদা ও গৌরব বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান পথ শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরীর চেয়ে মহৎ ও কল্যাণকর কাজ আর নেই। আমার চেষ্টা আর জনগণের সহায়তায় আজ প্রত্যন্ত ও অবহেলিত এ এলাকা আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার সাবলীল মুখরতায় যোজিত। সড়ক ও সেতুর বন্ধনে এলাকা সংযুক্ত হয়েছে আধুনিকতার বিশ্বায়নে। অন্ধকার জনপদে জ্বলছে আলো। সন্ত্রাস পুরোপুরি নির্মূল না হলেও একেবারে শূন্যের কাছাকাছি। স্কুল হয়েছে, কলেজ হয়েছে। সর্বজনীন শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে।

এ ধারা যদি দেশের সব উপজেলায়, সব নির্বাচনি এলাকায় বাস্তবায়ন করা যায় তাহলে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন অবধারিত। আমার প্রত্যাশা, আমার অনুভব এবং আমার স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটবে- বাংলাদেশ রূপান্তরিত হবে সোনার বাংলায়। জনগণের অধিকারকে কোনোভাবে কেড়ে নিলে, জনগণ অধিকার বঞ্চিত হলে পক্ষান্তরে দেশই বঞ্চিত হবে।

আমার শক্তি সততা। মর্মে রয়েছে আমার মানুষের প্রতি ভালবাসা, কর্মে নিষ্ঠা এবং ধর্মে অবিচল একাগ্রতা। প্রত্যেক শিশু নিষ্পাপ হয়ে জন্মায়। নানা কারণে সে পাপী হয়ে যায়, পাপী হতে বাধ্য হয়। এজন্য ব্যক্তির চেয়ে সমাজ কম দায়ী নয়। তাই আমি পাপীকে ঘৃণা করি না, পাপকে ঘৃণা করি। পাপীর চেতনা হতে ঘৃণার্হ পাপ দূরীভূত করা গেলে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষটাও উৎকৃষ্ট হয়ে উঠতে পারে। নিজাম ডাকাত-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনিতে এমন শত শত উদাহরণ রয়েছে। আমি যা বলি এবং বিশ্বাস করি- ঠিক ওটাই কর্মে প্রতিফলন করার চেষ্টা করি। সাধুর ভাণ করি না, সাধুর চিন্তা ও কর্ম বাস্তবে প্রতিফলন করে নিজের নিষ্ঠাকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রাণন্তকর চেষ্টা করি।

২. আমার প্রাত্যহিক জীবন

সৈয়দ আবুল হোসেন: একজন মন্ত্রী, রাজনীতিক নেতা কিংবা ব্যবসায়ী হিসাবে নয়, ব্যক্তিজীবনে প্রতিদিন আমি কী করি, এ সম্পর্কে অনেকেই জানতে চান। অনেকের কৌতূহল আবার সীমাহীন। জবাবে তাঁদের বলি, আমি একেবারে সহজ-সরল এবং খুব সাধারণ জীবনযাপন করি। লোকজন মনে করেন, আমি সৈয়দ আবুল হোসেন অনেক টাকার মালিক। আসলে তা নয়, আমি আমার আয়ের অধিকাংশ অর্থ দান করে দিই জনকল্যাণে। আমি অন্যায় পথে কোন সম্পদ অর্জন করিনি। কোন অন্যায় পথে অর্থ ব্যয়ও করিনা। কোন অপচয় করিনা। আর্তমানবতার সেবায় অর্থ ব্যয় করি।

মাছে ভাতে বাঙালি। ভাত তো প্রিয়ই, মাছের মধ্যে ইলিশ আমার প্রিয় মাছ। ছাত্রজীবনে বাড়ি যাওয়ার পথে ফেরিঘাটে ইলিশ ভাজা দিয়ে ভাত খেতাম। কী স্বাদ ছিল সে মাছের! গান-শোনা আমার প্রিয় একটি শখ। পুরনো দিনের প্রায় সবগুলো গান আমার ক্যাসেটে বন্দি ছিল। রবীন্দ্রসংগীত আমার খুব প্রিয়। নজরুলগীতিও শুনি। এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় থাকার সময় অবসর পেলে গান শুনতাম। এখন আগের মতো সময় পাই না, তবু গান শুনি কাজের ফাঁকে, যখনই সময় পাই। গান মানুষের মনকে শৈল্পিক চিত্রণে আবেশিত করে রাখে। মনে আনে নান্দনিক অনুভূতি।

মনুষ্যজীবন দুর্লভ ও মহীয়ান হলেও খুব ক্ষণস্থায়ী। এ ক্ষণস্থায়ী জীবনকে কাজের মাধ্যমে চিরন্তন মুগ্ধতায় দীর্ঘস্থায়ী করে তোলা যায়। এটি করতে হলে আমাদেরকে সংকীর্ণ লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে সহজ-সরল জীবন পরিচালনা করতে হবে।

আমি প্রতিদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে অফিসে পৌঁছাই। সাধারণত চিন্তাগুলো আমি সকালের দিকেই করি। সারাদিন কাজ নিয়ে অনেক ব্যস্ত থাকি। ছুটির দিনসহ প্রতিদিন, সকালের নামাজ দিয়ে শুরু হয় আমার দিন। তাই সবাইকে আমি বলি : খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠবেন। এটা খুব কঠিন কাজ নয়, যদি এটা অভ্যাসে পরিণত করা যায়। ঊধৎষু ৎরংরহম রং ধষংড় বংংবহঃরধষ ঃড় ঃযব মড়ড়ফ মড়াবৎহসবহঃ ড়ভ ধ ভধসরষু. অ ষধঃব নৎবধশভধংঃ ফবৎধহমবং ঃযব যিড়ষব নঁংরহবংং ড়ভ ঃযব ফধু, ধহফ ঃযৎড়ংি ধ ঢ়ড়ৎঃরড়হ ড়ভ রঃ ড়হ ঃযব হবীঃ, যিরপয ড়ঢ়বহং ঃযব ফড়ড়ৎ ভড়ৎ পড়হভঁংরড়হ ঃড় বহঃবৎ.২

অতএব প্রত্যেকের উচিত ভোরে ঘুম থেকে ওঠা। ভোরে ঘুম থেকে উঠলে দিনটা অনেক বড় হয়, বড় দিন মানে কাজের জন্য প্রচুর সময়। আপনি যদি বেশি কাজ করতে চান, পৃথিবীর সৌন্দর্য অধিক উপভোগ করতে চান, তাহলে ভোরে শয্যা ত্যাগ করতে হবে।

সকালে নামাজের পর আমি আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নাস্তা করি। তারপর, আমার কিছু শখ আছে সেগুলোর অনুশীলন করি। হাঁটতে যাই, মাঝে মাঝে লংড্রাইভে যাই। প্রকৃতি আমাকে আনন্দ দেয়। তাই প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুভব করি। অনেক সময় সবুজ ঘাসের উপর খালি পায়ে হাঁটি, সবুজ ঘাস আর মুক্তার মতো শিশিরমাখা মাটি আমাকে বিমোহিত করে। মনকে প্রশান্তিময় উদারতায় ভরিয়ে তোলে। এ এক মনোরম অনুভব!

মাঝে মাঝে আমি বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানাই। দুপুরে খাওয়ার জন্য অফিস থেকে বাসায় যাই এবং আমার সহধর্মিনীর সঙ্গে খাই। কখনও কখনও নিকটবর্তী কোনো রেস্তোরাঁয় যাই। মাঝে মাঝে সাধারণ নাগরিকদের পরিদর্শনে যাই। তাদের সঙ্গে কথা বলি। মাঝে মাঝে এলাকাতেও যাই। আমার দিন চলে খুব সাধারণভাবে। আর এতেই আমি সুখী ও আনন্দিত। আসলে জীবনযাত্রা যত সহজ হয়-শান্তি ও সুখ তত অবারিত হয়। জটিল জীবনে সুখও জটিল হয়ে ওঠে।

মনুষ্যজীবন দুর্লভ ও মহীয়ান হলেও খুব ক্ষণস্থায়ী। এ ক্ষণস্থায়ী জীবনকে কাজের মাধ্যমে চিরন্তন মুগ্ধতায় দীর্ঘস্থায়ী করে তোলা যায়। এটি করতে হলে আমাদেরকে সংকীর্ণ লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থেকে সহজ-সরল জীবন পরিচালনা করতে হবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরলতা প্রকৃতিপ্রদত্ত সহজাত একটি গুণ। এটা মানুষের মনে শান্তি ও সুখ এনে দেয়। আমি একেবারেই পছন্দ করি না জটিল ও দুর্বোধ্য জিনিস; যাঁরা আমার নিকটজন, তাঁরা এটা খুব ভালো করে জানেন। সবার সঙ্গে আমি যতটুকু সম্ভব খোলামনে আন্তরিকতার সঙ্গে মেশার চেষ্টা করি। এমনকি যারা আমার অকল্যাণ কামনা করেন, তাদেরকেও আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করি, সবার মঙ্গল কামনা করি। কোনো বিলাসিতা আমার পছন্দ নয়। অতি সাধারণ আমার ব্যক্তিগত জীবন।

শহর ও নগরের প্রচুর উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করা হয়েছে। তারপরও ভালো লাগে গ্রামীণ পরিবেশ। এখানে আছে সারল্য, প্রকৃতির স্নিগ্ধতা। সাগর ও পানি দেখতে ভালো লাগে। আকাশের চাঁদ, বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতি, সবুজ ঘাসের প্রান্তর, বন্ধুবান্ধবদের জড়ো হওয়া এবং একের প্রতি অপরের ভালবাসা- এসবে জীবনের অনন্ত সৌন্দর্য নিহিত। আমি মাঝে মাঝে গাড়ি চালাতে পছন্দ করি। আমাকে প্রতিনিয়ত আলোড়িত করে মহান আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালার কিছু বাণী। পারিবারিকভাবেই ধর্মীয় অনুভূতি ও মূল্যবোধটা আমার একটু বেশি এবং আমি সেভাবে নিজেকে পরিচালিত করি। ইসলাম ধর্মে সাধারণ জীবনযাত্রাও একটি ইবাদত।

পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। তারপরও কিছু মানুষ উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা নিয়ে এবং অন্যের বোঝা ও বিরাগভাজন হয়ে জীবনযাপন করেন। হতাশায় থাকেন। আমি মনে করি, ইচ্ছা থাকলে খুব সহজে জীবনের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। জীবনকে ভরিয়ে তোলা যায় মায়ের স্নেহে, শিশুর হাসিতে, বন্ধুর সাহচর্যে এবং স্ত্রীর ভালবাসায়। এজন্য যেটি প্রয়োজন সেটি হচ্ছে সরলতা এবং অহংবোধ ত্যাগ করে সাধারণ্যে বিলীন হওয়া।

আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ (স.) বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মহামানব; মহান নেতা এবং সহজ-সরল জীবনযাপনের প্রতীক। তিনি ছিলেন মানবতার ধ্বজা, ব্যক্তিত্বের সীমাহীন লাস্যে ভরপুর একজন সাহসী রসুল। তিনি সবসময় হাসিখুশি, প্রফুল্ল ও খোশমেজাজে থাকতেন। সাধারণ লোকদের সঙ্গে আহারে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি জীবনের সৌন্দর্যকে ভালবাসতেন। ব্যস্ত সময়সূচি এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে উপভোগ করতেন এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতেন।

আমাকে অনেকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার কি রাগ নেই? আমি বলি : আছে।

আবার প্রশ্ন আসে, তা হলে রাগেন না কেন? কত নগণ্য লোক আপনার বিরুদ্ধে অযথা মিথ্যা প্রচার করে আপনাকে হেয় করেছে। ইচ্ছা করলে তাদের সমুচিত শিক্ষা ও জবাব দিতে পারতেন, কেন দেননি?

সবিনয়ে তাঁদের বলেছি : আমি প্রায় প্রতিদিন নানা কারণে রাগি, কিন্তু আমি শিখেছি কীভাবে এ রাগকে গোপন রাখতে হয়, সংবরণ করতে হয়। এখনও আমি মনে করি, রাগকে যত গোপন রাখা যায়, ততই অন্যের ওপর আমার প্রভাব ও আমার ওপর তাদের শ্রদ্ধাবোধ বাড়বে। রাগ একপ্রকার পাশবতা। এটি ভুলের উৎস। এজন্য মানুষকে চরমভাবে অনুতপ্ত হতে হয়। তাই রাগ যত সংযত রাখা যায় ততই মঙ্গল। আর একটা বিষয় আমি খুব বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রয়োগ করার চেষ্টা করি- সেটি হচ্ছে সময় ব্যবস্থাপনা। জীবনে সময় কম, তাই সময়ের সদ্ব্যবহার অনিবার্য কিন্তু তাই বলে তাড়াহুড়া কখনও নয়। তাড়াহুড়ো প্রায়শ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে তাড়াহুড়ো করে সে লক্ষ্য হতে ছিটকে যেতে পারে। অতএব, সাবধান- কোনো অবস্থাতে তাড়াহুড়ো নয়, বরং ধীরস্থির মনোভাব নিয়ে বিচক্ষণতার সঙ্গে অগ্রসর হউন। সাফল্য আসবেই।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় বাংলাদেশ একটি নরকে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। মানবাধিকারের বালাই ছিল না। তবু আমি আশা ছাড়িনি। কারণ আমি জানি, পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকারও ছোট্ট একটি মোমবাতির আলোকে ঢেকে রাখার সামর্থ্য রাখে না। এসময় আমাকে অনেকে বিপদে ফেলার জন্য চেষ্টা করেছে। এমন অনেকে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে, যাদের আমি একদিন উপকার করেছিলাম। আমি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। আমি জানি, শত্রুকে ধ্বংস করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে তাদের বন্ধু করে নেওয়া। ওয়ান-ইলেভেনে যারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনেছিল, তাদের সবাইকে আমি জানি। আমি প্রতিশোধ নেব না। প্রতিশোধ নেইনি। প্রতিশোধ এক প্রকার বন্য বিচার। তবে আমি ভালবাসার মাধ্যমে প্রতিশোধ নেব। এমন প্রতিশোধের পরিণতি খুবই মধুর হয়। শত্রুতা কখনও শেষ হয় না। কারও জীবন শেষ করে দেওয়ার জন্য একজন শত্রুই যথেষ্ট। তবে শত্রু এমন একটা শক্তি যে, এটাকে শত্রুতা দিয়ে কোনোদিন শেষ করা যায় না। আগুন দিয়ে কি আগুন নেভানো যায়? যায় না।

যদি ‘চোখের বদলে চোখ, হাতের বদলে হাত’ নীতি বিদ্যমান থাকে তাহলে পৃথিবীর সব মানুষ অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে যাবে। তাই আমি সহনশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

উন্নয়নের জন্য, শিল্পায়নের জন্য, গণতন্ত্রের সুফল পরিপূর্ণভাবে পরিব্যাপ্ত করার জন্য রাজনীতিক সহনশীলতা অত্যাবশ্যক। রাজনীতি থাকবে রাজনীতির স্থানে। সমাজ বিনির্মাণে রাজনীতির কৌশল প্রতিফলিত হবে, তবে তা হবে দলমতের ঊর্ধ্বে। যদি ‘চোখের বদলে চোখ, হাতের বদলে হাত’ নীতি বিদ্যমান থাকে তাহলে পৃথিবীর সব মানুষ অন্ধ ও পঙ্গু হয়ে যাবে। তাই আমি সহনশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী।

সন্ত্রাসী জনপদ হতে সুশীল সন্তান পাওয়া যায় না। তাই আমি, আমার এলাকায় আমার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষালয়গুলোকে সন্ত্রাস ও রাজনীতিমুক্ত রেখে পরিচালনা করছি। আমি বিশ্বাস করি, সহনশীল রাজনীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। শিশুদের সহনশীল মনোভাব, উদার চেতনা ও সহানুভূতিশীল প্রত্যয়ে গড়ে তোলা গেলে জাতির আর কিছুর প্রয়োজন হবে না। ভবিষ্যতে শিশুরাই হয়ে উঠবে জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ।

যেকোনো পরিস্থিতিতে আমি হাসিমুখে থাকি, হাসিমুখে থাকা ভালো। হাসি খুশী মানুষের চিন্তা, কর্ম আর বিবেককে শালীন রাখে। একটি হাসিমাখা মুখ মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণ জ্যোৎ¯œার চেয়েও মনোরম। কথা মানুষের সবচেয়ে বড় বন্ধু আবার সবচেয়ে বড় শত্রু। কথা দিয়ে মানুষকে জয় করা যায় আবার এ কথাই বন্ধুকেও শত্রুতে পরিণত করতে পারে। জিহ্বা কথার বাহন, স্বাদেরও বাহন বটে। তাই জিহ্বাকে যে যত সংযতভাবে ব্যবহার করতে পারে সে তত মহৎ হয়ে ওঠে। বেশি কথা বলা যেমন ভালো নয়, তেমনি ভালো নয় কম কথা বলা। কথায় আছে, “কথা ব্যক্তিত্বের একটি উপাদান। সবার সাথে তাল মিলিয়ে যে কথা বলে সে ব্যক্তিত্বহীন।” কথা এমনভাবে বলতে হবে- যেন আপনার চারপাশ আপনাতে মুগ্ধ হয়ে ওঠার প্রেরণা খুঁজে পায়। আপনার ব্যক্তিত্বে আকর্ষনবোধ করে।

৩. আদর্শ জীবন গঠনে মূল্যবোধ

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমার বাবা ছিলেন একজন খাঁটি মুসলমান। ধর্মীয় মূল্যবোধে ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস। তিনি তাঁর সব কাজের মধ্য দিয়ে সততা, ন্যায় এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে ভালবেসেছেন। তিনি সবাইকে আপন করে নিয়েছিলেন। আমার পিতার এ ইতিবাচক চিন্তা তাঁকে অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আমরা ভাইবোনেরা পিতার এমন উদার শিক্ষায় বড় হয়েছি। বাবার অনুসরণীয় মূল্যবোধ আমরা ধারণ করেছি। সেই পঞ্চাশের দশকে মানুষ ভালোকে ভালো বলে গ্রহণ করেছেন। মন্দকে ঘৃণা করেছেন। মন্দ কখনও ভালোকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। ফলে সমাজে ভালো দিকটা উচ্চকিত হয়েছে। এতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে মানবিক মূল্যবোধ।

মূল্যবোধ মানুষকে ভালো হতে শেখায়। মন্দকে চিনতে শেখায়, মন্দ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। মূল্যবোধ সততা ও সৎ হতে উৎসারিত একটি স্বর্গীয় প্রত্যয়- যা ব্যক্তিকে মানবিকবোধে উজ্জীবিত করে। মানুষকে ন্যায়পথে পরিচালিত করে।

বর্তমানে আমরা প্রায়শ মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কথা শুনি। সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও রাজনীতির অবক্ষয়ের কারণ হিসাবে মূল্যবোধের অভাবের কথা বলতে শুনি। রেডিও, টিভির আলোচনা, সভা-সেমিনারে বক্তৃতা-বিবৃতি সর্বত্র মূল্যবোধের অবক্ষয় জাতিকে অধঃপতনের দিকে ধাবিত করছে- একথা বুদ্ধিজীবী ও দেশের বোদ্ধা নাগরিকদের বলতে শুনি। দেশে দুর্নীতির প্রসার ও বিচারহীনতার কথা শুনি। অত্যাচার, অনাচার, মারামরি এবং অন্যায়ভাবে দ্রুত বড়লোক হওয়ার প্রতিযোগিতার কথা শুনি। আমরা দেখি, সমাজ নৈরাজ্যের দিকে যাচ্ছে। সমাজে ও রাষ্ট্রে ন্যায়কে দাবিয়ে অন্যায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ভালোকে সরিয়ে মন্দ জায়গা করে নিচ্ছে। সততাকে কাঁদতে দেখি। অসৎ ব্যক্তিকে সমাজে বুক ফুলিয়ে হাসতে দেখি। রাজাকারকে ‘শহিদ’ বলতে শুনি। মুক্তিযোদ্ধাকে সমাজে নিগৃহীত হতে দেখি। অপমান লুকাতে মুক্তিযোদ্ধাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে দেখি। বোদ্ধাজনেরা বলেন, এসব আমাদের সার্বিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের ফসল। আমরা যারা ভালো, তারা সবাই এর প্রতিকার চাই- সত্যকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চাই। কিন্তু প্রতিকার পাই কি? পাই না। কারণ, আজকের দিনে মূল্যবোধ ও মানবিকতার অভাব খুব বেশি।

মূল্যবোধ মানুষকে ভালো হতে শেখায়। মন্দকে চিনতে শেখায়, মন্দ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। মূল্যবোধ সততা ও সৎ হতে উৎসারিত একটি স্বর্গীয় প্রত্যয়- যা ব্যক্তিকে মানবিকবোধে উজ্জীবিত করে। মানুষকে ন্যায়পথে পরিচালিত করে। বিশেষ করে, মানুষকে সৎবুদ্ধি ও মানবতার সেবায় উদ্বুদ্ধ করে। প্রশ্ন জাগে, তাহলে মূল্যবোধ কী? এককথায় বলা যায়, ঠধষঁবং বা মূল্যবোধ হলো মানুষের সর্বজনীন আচরণ। সত্য, ন্যায় ও ভালবাসা- এ মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ। এগুলো মানুষের মানবিক গুণ (ঐঁসধহ াধষঁবং)। এ মূল্যবোধ কালের আবর্তেও পরিবর্তন হয় না। অধিকাংশ সমাজ এ গুণগুলোকে, এ ভালো আচরণগুলোকে শাশ্বত হিসাবে লালন করে। এ মূল্যবোধ সর্বসমাজে সর্বজনস্বীকৃত।

সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্রমবিকাশে আরও কিছু ইতিবাচক কাজ- এ মূল্যবোধের সাথে সংযুক্ত হয়েছে। বর্তমান সমাজে কিছু ধারণা যেমন- ইক্যুইটি, সোশ্যাল জাস্টিস, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা, নাগরিকত্ব, শ্রমের মর্যাদা, ধৈর্যশীলতা, নারী ও বয়স্কদের প্রতি সম্মান এবং দরিদ্রদের প্রতি দয়া- এসবও সর্বজনীন মূল্যবোধের আওতাভুক্ত বলে বিবেচিত। সমাজ এবং রাজনীতিক পরিবেশের কারণে আরও কিছু মূল্যবোধের উদ্ভব হতে দেখা যায়। যেমন- কমিউনিজম, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র; এমনকি একনায়কতন্ত্রের কারণেও কিছু মূল্যবোধের অস্তিত্ব দেখা যায়। অধিকন্তু রয়েছে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ (ঝঢ়রৎরঃঁধষ াধষঁবং)। মানুষকে সম্প্রীতির মাঝে প্রশান্তিতে বসবাস ও বিকাশের জন্য এ মূল্যবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ-সংসার কিংবা রাষ্ট্র বা জাতিতে জাতিতে হানাহানির অন্যতম কারণ মূল্যবোধের অবক্ষয়। তাই মূল্যবোধের যে কোনো বিচ্যুতি সমাজে ভারসাম্যহীনতার জন্ম দেয়। মূল্যবোধহীনতা সমাজে অন্যায়, অত্যাচার বৃদ্ধি করে। আমরা যদি ভালো হতে চাই, তাহলে সর্বজনীন মূল্যবোধে ফিরে যেতে হবে। মন্দ পথ পরিহার করে ন্যায়ের পথ প্রশস্ত করতে হবে। ন্যায়ের পথ ও ভালো কাজ প্রভৃতি আমাদের মনের প্রশান্তি ও শান্তি আনতে পারে।

সমাজে ‘নৈতিকতা’ শব্দটি বহুল প্রচলিত। ভালো কাজের সাথে নৈতিকতা শব্দটি সম্পর্কিত। এ নৈতিকতা আবার মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত। নৈতিকতা মানে ব্যবহার (গধহহবৎ), চরিত্র (ঈযধৎধপঃবৎ) এবং যথাযথ আচরণ (চৎড়ঢ়বৎ নবযধারড়ঁৎ)।  নৈতিকতা বলতে সাধারণত ঈড়ফব ড়ভ ঈড়হফঁপঃ-কে বোঝায়, যা আয়ত্ত করে একজন ব্যক্তি, দল বা সমাজ, সত্য ও মিথ্যাকে পার্থক্য করতে শেখে এবং যার দ্বারা সত্যকে এগিয়ে নেওয়া যায়। মূল্যবোধ অর্জনে আমাদের ধর্ম ইসলাম পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে। ইসলাম একটি সম্পূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসাবে নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে সমন্বয় করে মানুুষের জীবনকে ভালোর দিকে নিয়ে যায় এবং মন্দ বর্জনের পথ দেখায়। আমরা বর্তমানে যে সমাজে বাস করি সেখানে ভালো ও মন্দ বিদ্যমান। ইসলাম শুধু ভালোকে মূল্যবোধ হিসাবে চিহ্নিত করে এবং সমগ্র মানবজাতিকে মূল্যবোধ অর্জন ও সত্যের পথ দেখায়।

ভালো ও মন্দ দুটো বিশেষণ। ভালো কাজ হলো যা বিভিন্ন ধারণা যেমন- মূল্যবোধ, সদ্গুণ, আদর্শ, ন্যায়বিচার, কল্যাণ ইত্যাদির সাথে সম্পর্কিত। পক্ষান্তরে, মন্দ কাজ ভালো ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থবোধক। এ ভালো ও মন্দের পার্থক্যকরণে ইসলামের দৃষ্টিকোণের বাইরেও বিভিন্ন ধর্ম ও কালচারে এ ধারণা প্রতিফলিত হয়। তারা মনে করে ভালো অর্থ- সততা (ঐড়হবংঃু), সত্য বলা (ঃৎঁঃয),  দয়া (ঈযধৎরঃু)। অন্যদিকে, মন্দ অর্থ- প্রতারণা, চুরি, মিথ্যা বলা প্রভৃতি। অবশ্য তাদের মনোভাবের সাথে মদ্যপান, যৌন স্বাধীনতা, হিজাব ইত্যাদি বিষয়ে ইসলামের পার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ ধর্মপ্রাণ। ধর্মান্ধের সংখ্যা খুব কম। আমাদের দেশের মুসলমান অন্যান্য দেশের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি উদার ও সহনশীল।

আমরা জানি, ইসলাম একটি সর্বজনীন ধর্ম। মানবতার ধর্ম। ইসলাম সমগ্র মানবজাতির ধর্ম। ইসলাম ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেয়। এই উন্নয়নের জন্য দরকার ধৈর্য ও সংগ্রাম। এ সংগ্রাম হবে অবিচার, মন্দ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে। অসত্যের বিরুদ্ধে। কূপম-ূকতার বিরুদ্ধে। এই সংগ্রাম হবে মানুষের নৈতিকতা ও জাগতিক কল্যাণের জন্য। সত্যের জন্য, ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য, মানুষের উন্নত জীবনযাপনের জন্য। আল্লাহর পথে কাজ করার জন্য। ইসলামে উন্নয়নের অর্থ- সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা, শান্তি স্থাপন করা, মানুষের জন্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করা এবং সমাজের অগ্রগতি সাধন করা। সার্বিকভাবে মানুষের শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক উন্নয়ন করা।

বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ ধর্মপ্রাণ। ধর্মান্ধের সংখ্যা খুব কম। আমাদের দেশের মুসলমান অন্যান্য দেশের মানুষের চেয়ে অনেক বেশি উদার ও সহনশীল। আমার এলাকার অনেক মুসলিম হিন্দুসম্প্রদায়ের বিভিন্ন পূজায়, হিন্দু বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে আমার কাছে সহায়তা প্রদানের অনুরোধ নিয়ে আসেন। আমি যথাসাধ্য সহায়তা করি। এমন অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় সম্প্রীতি পৃথিবীর খুব কম দেশে আছে। ভারতে সম্প্রতি গরুর মাংস খাওয়া-না খাওয়া বিতর্ক আমাকে ভীষণভাবে কষ্ট দিয়েছে। ভারতের বিদগ্ধ সমাজকেও কষ্ট দিয়েছে। অনেক কবি-সাহিত্যিক ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদস্বরূপ ভারত সরকার প্রদত্ত তাদের খেতাব বর্জন করেছেন। একবিংশ শতকে এসে মানুষ এসব কী করছে! আমার একটা কথা মনে পড়ে। রাজীব গান্ধী (১৯৪৪-১৯৯১) তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আমি ত্রিবান্দামের এক হোটেলে ছিলাম। গরুর মাংস খেতে ইচ্ছে হলো। এক বাবুর্চিকে বললে, তিনি নিজেই আমার জন্য বিফস্টিক বানিয়ে আনলেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, ওই বাবুর্চি ছিলেন হিন্দুধর্মাবলম্বী। সেটি সম্ভবত, ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারির ঘটনা। এখন ২০১৫। এ বছর গরুর মাংস খাওয়া-না-খাওয়া বিতর্কে মানুষ খুন হলো। পঁচিশ বছর সময় এগিয়েছে কিন্তু ভারতের ক্ষমতাসীনদের রাজনীতি কি এগিয়েছে, নাকি পিছিয়েছে? কোথায় নেমে গিয়েছে ভারতের অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও মানবিক মূল্যবোধ! আমরা অনেক ক্ষেত্রে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বশান্তির জন্য এমন সাম্প্রদায়িক কর্মকা- ও চিন্তা-চেতনা হতে আমাদের দূরে থাকা আবশ্যক।

আল্লাহর প্রতি যে ব্যক্তির প্রতিনিয়ত আত্মসমর্পণ করার ইচ্ছা, তাগিদ এবং ভয় রয়েছে- সে ব্যক্তি কখনও অন্যায় কাজ করতে পারে না।

এ কথা সত্য যে, আদর্শবান মানুষ হতে হলে তার সামনে কিছু অনুকরণীয় বিষয় থাকে, তা তিনি যে-ধর্মের অনুসারীই হোন না কেন। এই অনুকরণীয় বিষয়গুলো, নৈতিক মূল্যবোধগুলো তার পার্থিব এবং অপার্থিব সকল জীবনের ক্ষেত্রেই প্রয়োজন। আমরা মুসলমান। আমাদের সামনে রয়েছে আল্লাহ-প্রদত্ত বিধিবিধানÑ যা আল্লাহপাক পবিত্র কোরানের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করেছেন। মহানবি হযরত মুহম্মদ (স.) আল্লাহপাকের নির্দেশিত কোরানের আলোকে জীবন গঠনের তাগিদ দিয়েছেন। আমাদের সামনে একদিকে যেমন কোরানের মহান বাণী রয়েছে, অপরদিকে রয়েছে মহানবি (স.)-এর হাদিস। সুতরাং মানুষের চরিত্র গঠন, সামাজিক কর্তব্যপরায়ণতা এবং পরকালের নিরন্তর শান্তি অর্জন প্রভৃতি ক্ষেত্রে এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। পবিত্র কোরানে আল্লাহপাক বলেন, “যারা মানুষকে সৎকাজের আহ্বান করবে, নিজে সৎকাজ করবে এবং বলবে আমিই তো আত্মসমর্পণকারী, আল্লাহ বলেছেন তার কথার চেয়ে উৎকৃষ্ট কথা আর কার হতে পারে।” এখানে সৎকাজের প্রতি আহ্বান এবং আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সমাজজীবনে তিনিই শ্রেষ্ঠ মানুষ যিনি সৎচিন্তা করেন এবং সৎকাজ করেন। আল্লাহর প্রতি যে ব্যক্তির প্রতিনিয়ত আত্মসমর্পণ করার ইচ্ছা, তাগিদ এবং ভয় রয়েছে- সে ব্যক্তি কখনও অন্যায় কাজ করতে পারে না। পৃথিবীতে আদর্শবান ব্যক্তি তিনিই যিনি ¯্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণ করার মাধ্যমে নিজেকে উৎসর্গ করেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে থাকেন।

রাতের অন্ধকার এবং দিনের আলো কখনও এক হতে পারে না। এ দুয়ের মধ্যে রয়েছে সত্য এবং ন্যায়ের উপমা। অন্ধকার হচ্ছে অন্যায়ের প্রতীক এবং আলো হচ্ছে সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক। আলোর রশ্মিতে অন্ধকার বিদূরিত হয় এবং সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। যেমন- সূর্যালোকের শুভাগমনে রাতের অন্ধকারের অস্তিত্ব থাকে না। ঠিক তেমনিভাবে ভালো এবং মন্দ এই দুয়ের মূল্যমান কখনও একই পর্যায়ভুক্ত নয়। ভালো চিরকালই কল্যাণের এবং আদর্শের, অপরদিকে মন্দ চিরকালই অকল্যাণকর, ঘৃণ্য ও অপাঙ্্ক্তেয়। কোরান পাকে তাই বলা হয়েছে : ‘ভালো এবং মন্দ সমান হতে পারে না, মন্দকে তুমি প্রতিহত করো উৎকৃষ্ট কিছু দিয়ে।’ আল-কোরানে আল্লাহ ভালো সম্পর্কে আরও বলেছেন- “ঐব যিড় পৎবধঃবফ ফবধঃয ধহফ ষরভব, ঃযধঃ যব সধু ঃৎু যিরপয ড়ভ ুড়ঁ রং  ঃযব নবংঃ রহ ফববফ’ –অষ-গঁষশ ৬৭:২. আল্লাহ মন্দ সম্পর্কে আল কোরানে বলেছেন- “ঞধংঃব ঃযব ঢ়বহধষঃু ড়ভ বঃবৎহরঃু ভড়ৎ ুড়ঁৎ বারষ ফববফং.”– অষ ঝধলফধয-৩২:১৪. মানুষের বিশ্বাস ভালো ও মন্দ কাজের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়। মহান আল্লাহতায়ালা আল-কোরানে ভালো-মন্দ সম্পর্কে অন্তত ৩৬০ বার ভালো পথে চলার আহ্বান এবং মন্দ সম্পর্কে সতর্ক থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। হযরত মুহম্মদ (স.) অসংখ্যবার একই তাগিদ দিয়েছেন।

বর্তমান সমাজে ‘বন্ধুত্ব ও শত্রুতা’ শব্দ দুটোও ভালো ও মন্দ কাজের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। অথচ বন্ধুত্ব শব্দটি আল্লাহ ও রাসুলের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে দ্যোতনা পেয়েছে। ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুঝতে অক্ষম হওয়ায় আমরা বন্ধুত্বকে শত্রুতায় পরিণত করেছি। বন্ধুত্ব মানুষকে মহান করে এবং শত্রুতা মানুষকে ধ্বংস করে। তবে শত্রুর ওপর ভরসা করা বোকামি। মানুষের জীবনে বন্ধুর প্রয়োজন খুব বেশি। পরস্পরের মধ্যে বন্ধুত্বে উভয়ই লাভবান হন। আমরা দেখেছি একজন শত্রু যখন বন্ধু হয়, তখন সে তার জন্য ভালো কিছু করে। ইতিহাসে এর অনেক নজির রয়েছে। শত্রুকে বন্ধু করার চেয়ে ভালো কাজ কিছু হতে পারে না। আল-কোরান ও হাদিস শরিফের অনেক জায়গায় শত্রুকে বন্ধু করার তাগিদ রয়েছে এবং পরস্পরের জন্য ভালো কাজ করাকে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠার সহজ উপায় বলা হয়েছে।

কাজ, সততা ও মনুষ্যত্ব মানুষকে মহান করে। মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধন করে। আমি আমার ব্যক্তিজীবন, অনুভব এবং সকল কাজের মধ্য দিয়ে তা উপলব্ধি করেছি।

আমরা দেখেছি, অভিজ্ঞতায় উপলব্ধি করেছি, অস্থিরচেতা মানুষ বরাবরই সমাজে অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। মানুষের কল্যাণ এবং সমাজ বিনির্মাণে ধৈর্যশীলদের আদর্শবান বলা হয়েছে। এ আদর্শবান ব্যক্তি সমাজ থেকে অন্যায়, অপকর্ম, দুঃশাসন দূরীভূত করতে পারে। ভালোকে উচ্চকিত এবং মন্দকে পরিহার করতে পারে। ভালো ব্যক্তিত্বের সামনে শয়তান কখনও অগ্রসর হতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, “যদি কখনও শয়তানের কুমন্ত্রণা পাও তাহলে আল্লাহকে বারবার স্মরণ করো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্যে যে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে তা যথাযথভাবে পালন করা হলে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।” আল্লাহপাক আরও বলেছেন, ‘শয়তানের ধোঁকা এবং কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা পেতে হলে বেশি বেশি কোরান তিলাওয়াত করতে হবে।’ কথায় বলে, মানুষ যতই বুদ্ধিমান হোক না কেন, খারাপ কাজ শেষ পর্যন্ত মানুষের ধ্বংস ডেকে আনে।

তাই বলা যায়, মানুষের জীবন গঠন, সমাজ, পারিপার্শ্বিকতা, দেশ গঠন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রেই যে ধর্মীয় আদর্শ রয়েছে তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ধর্মীয় মূল্যবোধ স্বাভাবিক কারণেই পার্থিব এবং অপার্থিব সকল জীবনের জন্য অনুকরণীয়। এ মূল্যবোধ অর্জনকারী ব্যক্তিই হলো আদর্শ ব্যক্তি বা নাগরিক এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দা। পৃথিবীতে যত ধর্মাবলম্বী মানুষই থাকুক না কেন, তা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যাই হোক না কেন, প্রত্যেকের ধর্মের সামাজিক দর্শনের মর্মবাণী প্রায় অভিন্ন। ব্যক্তিগত জীবন, সমাজ বিনির্মাণ, দেশ ও রাষ্ট্র গঠনÑ এর সকল ক্ষেত্রেই যার যার ধর্মীয় অনুশাসন অনুসরণ করলে পৃথিবী হবে সকলের জন্য অধিকতর বাসযোগ্য, কল্যাণকর এবং শান্তিময়। এই প্রশান্তিময় জীবন গড়ায় আমরা যেন সবাই সচেষ্ট হই। কাজ, সততা ও মনুষ্যত্ব মানুষকে মহান করে। মানুষের সার্বিক কল্যাণ সাধন করে। আমি আমার ব্যক্তিজীবন, অনুভব এবং সকল কাজের মধ্য দিয়ে তা উপলব্ধি করেছি।

৪.নেতৃত্বের শক্তি

সৈয়দ আবুল হোসেন: ‘নেতৃত্ব’ একটি ছোট শব্দ। তবে এর গভীরতা ও প্রসারতা অনেক বেশি। নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন ও বিকাশ কোনোটা সহজে হয় না। এজন্য সময় লাগে, লাগে ত্যাগ, শ্রম আর অধ্যবসায়। মানুষের মনের মধ্যে প্রশ্ন আসতে পারে- নেতৃত্ব কি সহজাত না অর্জিত? আমি মনে করি- নেতৃত্ব হলো বুদ্ধিমত্তা, উন্নত মেধা, প্রজ্ঞা এবং ব্যক্তিত্বের সমন্বয় যা সর্বাধিক ও সর্বশ্রেষ্ঠত্বে পরিণত করার মাধ্যম হিসাবে কাজ করে থাকে। এ গুণগুলোর অধিকাংশই অর্জন করতে হয়। কিন্তু কেউ যদি বংশগতভাবে এ গুণগুলো নিয়েই জন্মগ্রহণ করেছে বলে মনে করে, তখনও তাকে সুশিক্ষা এবং কঠোর রীতিনীতির মধ্যেই এ গুণগুলোর চর্চা করেই সফল নেতা হতে হয়। পরিবার এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সততা, নিষ্ঠা, ধৈর্য, সহনশীলতা, দয়া ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা- আমি অনেকটাই পেয়েছি আমার পরিবার থেকে। এরপর আরও পেয়েছি আমার বন্ধুবান্ধব, পরিবেশ ও নেতা-নেত্রীর কাছ থেকে।

ফসলের জন্য যেমন জমি কর্ষণ করতে হয়, বীজ রোপণ করতে হয়, পরিচর্যা করতে হয়, তেমনি নেতৃত্বের যোগ্যতাও অর্জন করতে হয়। নেতৃত্ব আপনাআপনি আসে না। আকাশ থেকে পড়ে না। মাটি ফুঁড়ে গজায় না। তার জন্য পরিশ্রম করতে হয়। সাধনা করতে হয়। অধ্যবসায়ী হতে হয়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.) যথার্থই বলেছেন, নেতা ও দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য বিদ্যা অর্জন অপরিহার্য।

আমরা দেখেছি, যারা অনুসন্ধানী মনোভাবাপন্ন এবং যাদের নিরন্তর চেষ্টা আছে তারা নেতৃত্বের এ পথে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। আমরা নেতৃত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণাকে বদলে দিতে চাই। তাই এর অন্তর্ভুক্ত সে-ই হবে যার লক্ষ্যই হলো নিজেকে বদলে দেওয়া এবং সমাজের উপকার করা। সে সাথে অন্যকেও বদলে দেওয়া।

একজন সত্যিকারের নেতা জনগণের কল্যাণে কাজ করেন, তবে গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়ে এমন কাজ করতে পারেন না, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কল্যাণকে বিঘিœত করে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। সফিকুল ইসলাম ইউনুছ ঘটনাটি লিখেছেন ড. মোহাম্মদ আমীন সম্পাদিত ‘সময়ের পরশ পাথর’ গ্রন্থে। আমি তখন যোগাযোগমন্ত্রী। একদিন মন্ত্রণালয়ে আমার এলাকার সমবয়সী বন্ধু এসে একটা তদবির করলেন। তদবিরের বিবরণ শুনে বললাম, ‘এটি আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ বন্ধুবর বললেন, ‘আপনি মন্ত্রী, আপনার মন্ত্রণালয়ের কাজ। সম্ভব নয় কেন?’ বললাম : ‘তুমি একজন শিক্ষিত লোক। কোন কাজটি করা আমার উচিত, কোনটি উচিত নয়- সে বিষয়ে তোমার ধারণা থাকা উচিত। প্রত্যেকের সীমাবদ্ধতা আছে। ডব ধৎব ধষষ ংড়সবঃযরহম, নঁঃ হড়হব ড়ভ ঁং ধৎব বাবৎুঃযরহম.৩ ‘আপনি এত বড় নেতা, এত বড় পদে আছেন, বলে দেন, কাজ হয়ে যাবে।’ আমি বলেছিলাম : খবধফবৎংযরঢ় রং ধপঃরড়হ, হড়ঃ ঢ়ড়ংরঃরড়হ৪। আমার দায়িত্ব কাজ, তদবির করা নয়। বন্ধু বললেন : তদবির না-করলে হয় না। আমি বললাম : যেগুলো হবার সেগুলোই আমি তদবির করি। যেগুলো হয় না, সেগুলোর তদবির করি না। অর্থাৎ আইন ও বিধিই আমার তদবিরকে পরিচালিত করে।৫

যখন আমরা ‘নেতা’ বলি তখন আমজনতা সাধারণত মনে করে থাকেন রাজনীতিক, সেনাবাহিনী অথবা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যাঁরা তাঁদের দেশের ও মানুষের অতীতকে পরিবর্তন করে বর্তমান স্তরে নিয়ে এসেছেন। আবার তাঁরা কখনও ‘নেতা’ বলতে এটাও মনে করে থাকেন, কোনো সফল বড় ব্যবসায়ী যিনি একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছেন কিংবা নতুন কিছু সৃষ্টি করেছেন। এসব লোকদের বংশগত গুণগুলো তার বর্তমান অবস্থান, ব্যক্তিগত উন্নয়নের প্রচেষ্টার সাথে মিলেমিশে তাকে এক ব্যতিক্রমী নেতা হিসাবে সমাজ ও মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

কিন্তু বর্তমানকালে নেতৃত্ব সম্পর্কে মানুষের ধারণা প্রকৃত নেতৃত্বের থেকে অনেক দূরে। এর মধ্যেই যাঁরা নিজের জীবন উন্নত করতে পারেন- তাঁরাই নেতা। অনুরূপভাবে যিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেবা দিয়ে তাদের সুখী করতে পারেন- তিনিই নেতা। একজন নেতা অবশ্যই সেরকম একজন ব্যক্তি যিনি ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারেন- সেটা তাঁর কাজেই হোক, নিজের মধ্যেই হোক কিংবা তুচ্ছতুল্য কোনো বিষয়েই হোক। একজন নেতা তাঁর নৈপুণ্য, শিল্প, মেধা-মনন ও পেশাদারিত্বের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। প্রত্যেক মানুষই জন্মগতভাবে নেতৃত্বের মানবীয় গুণাবলি নিয়েই জন্মগ্রহণ করে থাকে, যা তার শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে তার মধ্যে ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হয় এবং ক্রমশ তাকে নেতৃত্বের পর্যায়ে উন্নীত করে। নেতৃত্ব সম্পর্কে সাধারণ মানুষের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেওয়া প্রয়োজন। এর অন্তর্ভুক্ত তারাই হবে যাদের লক্ষ্যই হলো নিজেদের বদলে দেওয়া এবং সমাজের উপকার করা। তারাই প্রকৃত নেতা হবে যাদের ইচ্ছা হচ্ছে মানুষের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করা। জনগণকে সামনের দিকে নিয়ে যাওয়া। রাজনীতিটা তাদের সুবিধা পাওয়ার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হবে না।

আপনার প্রত্যেকটি ব্যক্তিগত অর্জন, আপনার জীবনের প্রত্যেকটি ইতিবাচক পরিবর্তন এবং প্রত্যেকটি দক্ষতা যা আপনি অর্জন করবেন সবই হবে আপনার একজন সফল নেতা হওয়ার এক-একটি ধাপ। একজন উন্নত মানুষ ও বড় মাপের নেতা হওয়ার জন্য প্রতিদিন আপনার মধ্যে বিদ্যমান নেতৃত্বকে বিকশিত করুন। বিকশিত করার ধাপ হচ্ছে অনুসারীদের প্রতি ইতিবাচক আচরণ এবং ব্যক্তিগত জীবনের নান্দনিক মূল্যবোধ। আমি মনে করি, অভিজ্ঞতার আলোকে বলি, কারো প্রতি অবজ্ঞা করে কঠোর আদেশ দেয়া অনুচিত। মিষ্টিভাবে আদেশ প্রদানের মধ্যে প্রবল শক্তি নিহিত থাকে। এতে ভালো ফল পাওয়া যায়।

একজন নেতা বা নেত্রীকে কথায় ও কাজে কেবল পারফেক্ট হলেই চলবে না, তাঁকে অনুকরণীয় গুণাবলির অধিকারীও হতে হবে। তাঁর কাছ থেকে মানুষ প্রেরণা পাবে। তিনি হবেন আদর্শস্থানীয়। মানুষ তাঁকে অনুসরণ করবে। তাঁকে দেখে শিখবে, উজ্জীবিত হবে। সেজন্য একজন নেতা বা নেত্রীকে চিন্তা-ভাবনা করে কথা বলতে হয়। তিনি যা বলছেন তাঁর তাৎপর্য, মর্ম এবং জনগণের মনে তা কী সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, সে সম্পর্কে তাঁর সঠিক ধারণা থাকতে হবে। কারণ রাজনীতিক অবস্থানের কারণে তাঁর প্রতিটি কথারই গুরুত্ব রয়েছে। তাই দৃষ্টিনন্দনের চেয়ে তাঁকে হতে হবে বেশিমাত্রায় উক্তিনন্দন। তাঁকে সবসময় স্মরণ রাখতে হবে তাঁর অসংলগ্ন বা বল্গাহীন উক্তি তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে পারে। আব্রাহাম লিংকন বলতেন : ডযবহ ও মবঃ ৎবধফু ঃড় ঃধষশ ঃড় ঢ়বড়ঢ়ষব, ও ংঢ়বহফ ঃড়ি-ঃযরৎফং ড়ভ ঃযব ঃরসব ঃযরহশরহম যিধঃ ঃযবু ধিহঃ ঃড় যবধৎ ধহফ ড়হব-ঃযরৎফ ঃযরহশরহম ধনড়ঁঃ যিধঃ ও ধিহঃ ঃড় ংধু.৬

আমাদের কি শুধু নেতৃত্বকে অসাধারণ গুণী রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ কিংবা বিজ্ঞানীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখা উচিত? আমাদের এই সীমিত জগৎ থেকে বেরিয়ে সুবিশাল মানবজাতির বলয়ে নিবিড় হতে হবে সুগভীর সখ্যে। সবকিছুই শেখা যাবে এবং সকলেই আত্ম-উন্নয়নে সক্ষম। মানব-উন্নয়নে বর্তমান প্রজন্মের নেতাদের প্রয়োজন তার জাতি ও মানুষকে উন্নত করা।

একজন মহান নেতা হওয়ার জন্য শুধু দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হলেই হবে না, নেতৃত্বের গুণাবলিও নিজের মধ্যে থাকা এবং লালন করা বাঞ্ছনীয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় নেতৃত্ব শুধু সহজাত কোনো বিষয় নয়, সঙ্গে থাকতে হবে অর্জনের নিরলস প্রত্যয়। আপনার প্রত্যেকটি ব্যক্তিগত অর্জন, আপনার জীবনের প্রত্যেকটি ইতিবাচক পরিবর্তন এবং আপনার প্রত্যেকটি দক্ষতা যা আপনি অর্জন করবেন সবই হবে আপনার একজন সফল নেতা হওয়ার এক-একটি ধাপ। সে ধাপগুলো পেরিয়েই সফল হতে হবে।

নেতা অসামান্য ত্যাগের বিন্দু বিন্দু অর্জনে গড়ে ওঠা এক বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তি। যাঁর হৃদয় হিমালয়কে ছাড়িয়ে বিশ্বময় বিস্তৃত হয় আপন মহিমায়। যিনি অন্যের সুখে অনিন্দ্য তৃপ্তিতে ভাস্বর হয়ে উঠতে পারেন। নেতা সহ¯্র মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার স্বপ্নসাধ।

আমরা যদি উন্নয়ন চাই, অগ্রগতি চাই, দারিদ্র্যের বিষবৃত্ত ভাঙতে চাই, তাহলে আমাদের সৎ, দক্ষ, মেধাবী ও সুশিক্ষিত নেতৃত্ব বেছে নিতে হবে। যাঁরা বুঝতে পারবেন দেশের আসল সমস্যা কী, কীভাবে হবে তার সমাধান, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কী চায়, কীভাবে তাদের সক্রিয় সমর্থন ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা যায়।

জনগণ আর নেতার মধ্যে মিল আছে, সূত্র আছে, যোগাযোগ আছে। তবে দুজনের মধ্যে পার্থক্যও আছে। নেতা জনগণকে দেখে তার দুই চোখে, কিন্তু নেতাকে জনগণ দেখে অসংখ্য চোখে। দুই চোখ দিয়ে নেতা কোটি চোখকে প্রত্যক্ষ করেন, নিয়ন্ত্রণ করেন। তাই নেতার দুচোখ জনগণের অসংখ্য চোখের চেয়ে প্রখর হতে হয়। এরূপ প্রখরতা যার নেই তিনি নেতা নন। একজন সত্যিকার নেতা দেশের উন্নয়নে জনগণকে নিয়োগ করতে পারেন, উদ্বুদ্ধ করতে পারেন, দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারেন এবং দেশকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।

নেতা ও নেতৃত্ব তাদের দায়িত্বকে ভালবাসার মোড়কে এবং প্রেমের বিদগ্ধ চেষ্টায় ভিন্ন আদলে গড়ে তুলতে পারে। এখানে দায়িত্ব শুধু কাজ নয়, আনন্দের প্রতিভূ, শান্তির প্রতিযোগ। যেখানে ভালবাসা আছে, প্রেম আছেÑ সেখানে শান্তি অনিবার্য। ভালবাসার মূল্য দিতে হয়। এ মূল্য দিতে গিয়ে নেতা যখন আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠে, তখনই ঐক্যবদ্ধ উন্নয়ন জাতিকে মহাশক্তিতে পরিণত করে। প্রতিটি মানুষ হয়ে ওঠে এক একটা জাতি। নেতা হয়ে ওঠে অবিসংবাদিত।

নেতা অসামান্য ত্যাগের বিন্দু বিন্দু অর্জনে গড়ে ওঠা এক বিশাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যক্তি। যাঁর হৃদয় হিমালয়কে ছাড়িয়ে বিশ্বময় বিস্তৃত হয় আপন মহিমায়। যিনি অন্যের সুখে অনিন্দ্য তৃপ্তিতে ভাস্বর হয়ে উঠতে পারেন। নেতা সহ¯্র মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার স্বপ্নসাধ। ফ্রান্সের স¤্রাট ন্যাপোলিয়ন বোনাপার্ট (ঘধঢ়ড়ষবড়হ ইড়হধঢ়ধৎঃব)-এর ভাষায় “অ ষবধফবৎ রং ধ উবধষবৎ রহ ঐড়ঢ়ব”.৭

৫. সুখ ও শান্তি : আমাদের করণীয়

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমি ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’ সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পর নিজে মনে মনে ভেবেছিÑ বিভিন্ন দেশের মানুষ কতটা বিভিন্নভাবে তাদের ভাবনা ভাবে, প্রকাশ করে। দেশভেদে মানুষের চিন্তা, আশা আর দর্শনের পার্থক্য আছে। কিন্তু যে যাই ভাবুক না কেন, স্থান ও ব্যক্তি নির্বিশেষে দেশপ্রেমিকদের ভাবনা সর্বত্র অভিন্ন ধারায় পরিচালিত এক সর্বজনীন চিন্তা। এ কারণে দেশপ্রেমিকদের চিন্তা-চেতনায় অনেক মিল লক্ষ্য করা যায়; হোক সেটি উন্নত বা অনুন্নত দেশ।

ওই শীর্ষ সম্মেলনে নিজের মনের কাছে নিজেই প্রশ্ন রেখেছিলাম : আমরা এখানে কেন?

এ ধরনের সভা ও সম্মেলনের উদ্দেশ্যই বা কী?

তখন উত্তর পাই, আসলে আমি যে অবস্থায় যখন যেখানেই থাকি না কেন, আমি দেশের উন্নয়ন চাই। দেশের উন্নয়ন মানে আমার উন্নয়ন, কারণ আমি দেশের একজন সাধারণ নাগরিক। সে চিন্তা আমাকে সুদূর চীনের বোয়াও ফোরামেও করতে হবে। আমি যদি এখান থেকে দেশের জন্য সামান্য কিছু হলেও নিয়ে যেতে পারি, সেটাই হবে আমার সার্থকতা, দেশের কল্যাণ আর মাতৃভূমির প্রতি আমার কর্তব্য পালন। আমাদের দেশের সরকারি সেবার মান আরও উন্নত করার জন্য, মানুষকে সুখ-শান্তিতে রাখার উপায় খুঁজে বের করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আমি চাই প্রত্যেকে যেন সরকারের কাজকে বৃহত্তর পরিসরে দেখে এবং সরকারও যেন জনগণকে তার কাজে অংশীদার করার সুযোগ রাখে।

সরকারের ভুল থাকলে যেমন ধরিয়ে দিতে হবে, তেমনি সরকারকে সহযোগিতাও করতে হবে। সরকার ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের প্রতিটি নাগরিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরিমাত্রায় সরকারের এক-একটি অংশ। তাই কোনো নাগরিক তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না।

তাহলে সরকারের মূল কাজটা কী?

জনগণ যখন দেখবে তারা সরকারের কাজের অংশীদার,  তখন প্রকৃতপক্ষে আমাদের সবার চিন্তা আরও অনেক বেশি প্রসারিত হবে। সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের জন্য চিন্তা করলে দেশের উন্নতি হবে। সবাই একসঙ্গে নিজের ও নিজ-পরিবারের এবং প্রতিবেশীর উন্নয়ন করলে দেশের উন্নয়ন হবে। দেশ এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে। আমাদের কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবলে হবে না। সবাইকে নিয়েই ভাবতে হবে। একজন মানুষ যখন কেবল নিজেকে নিয়ে ভাবে তখন অহংবোধ বেড়ে যায়। এ অবস্থায় নিজের একার ওপরে ওঠার ইচ্ছেটাই প্রবল হয়ে ওঠে। সে তখন একা হয়ে যায়, সামষ্টিক উন্নয়নের চিন্তা করতে পারে না। সেটা না করলে দেশের ও দশের উপকার হবে না। উন্নয়নও হবে না। নিজেও একাকীত্বের যাতনায় নিষ্পেষিত হবে। আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে ততকাল পিছিয়ে থাকব, যতকাল আমরা নিজের উন্নয়নের সঙ্গে সামষ্টিক উন্নয়নকে একীভূত করে জাতির কল্যাণে নিবেদিত হতে না-পারি। আমাদের সবাইকে চিন্তা করতে হবে- একটি উন্নত দেশ হিসাবে বিশ্বের মানচিত্রে নাম লেখাবার। সেটা লেখাতে হবে এবং এর অন্যতম উপায় হচ্ছে একতা, সংহতি আর সহমর্মিতা।

অনেকে মনে করেন, নিজের উন্নয়ন কি দেশের উন্নয়ন নয়?

সংকীর্ণ অর্থে তা ঠিক, কিন্তু প্রকৃত বিশ্লেষণে তা নয়। কারণ নিজের উন্নয়ন করতে গিয়ে অনেকে দেশ ও দশের স্বার্থকে ব্যাহত করে। কেবল তখনই নিজের উন্নয়ন দেশের উন্নয়নে রূপান্তরিত হবে, যখন ব্যক্তিস্বার্থ সামষ্টিক কল্যাণের লক্ষ্যে পরিচালিত হবে। আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই : আমরা সবাই একযোগে কাজ করলে দেশের উন্নতি হবে। সরকারের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাওয়া এবং তা সরকারকে যেকোনো মূল্যে করতে হবে। তবে সেটা যেন এমন না হয়- সব কাজ সরকার একাই করবে। শুধু সরকারকে দোষ দিলে হবে না। আবার শুধু সমালোচনার জন্য কিংবা বিরোধিতার জন্য শুধু কথা বললে, কটূক্তি করলে হবে না। সরকারের ভুল থাকলে যেমন ধরিয়ে দিতে হবে, তেমনি সরকারকে সহযোগিতাও করতে হবে। সরকার ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের প্রতিটি নাগরিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পরিমাত্রায় সরকারের এক-একটি অংশ। তাই কোনো নাগরিক তার দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না।

কেউ যদি আমার কাছে জানতে চানÑ সরকারের প্রধান ও মৌলিক কাজ কী?

আমার কাছে এ প্রশ্নের একটাই উত্তর। আমি সহজ-সরল নিরাভরণ ভাষায় দ্বিধাহীনচিত্তে বলব : সরকারের প্রধান ও মৌলিক কাজ হচ্ছে- জনগণের সুখ ও শান্তি অর্জনের লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। মনে রাখতে হবে, দেশের ভার আল্লাহ তায়ালার নিকট থেকে আমানত। তাই সরকারের উচিত আমানতের খেয়ানত না করা। সুশাসন ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা তাদের একমাত্র কাম্য হওয়া উচত। সরকারের যত কাজ সব জনগণের সুখ-শান্তির জন্য নিবেদিত হতে হবে। মূলত, সরকারের নিত্যদিনের কাজই হচ্ছে জাতির সার্বিক কল্যাণে নিবেদিত থাকা। সরকারের আর একটি কাজ হচ্ছে সমতার ভিত্তিতে সম্পদের যথাসম্ভব সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা- যা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে একটা সাবলীল স্থায়ী রূপ দিতে পারে।

সরকার যখন মানুষের জীবনকে আরও সহজ এবং আরামদায়ক করার জন্য সরকারি সেবার মান বৃদ্ধিতে নিরলসভাবে কাজ করে যায়, মানুষের স্বস্তি ও সুখ বাড়াতে অবদান রাখে এবং মানুষের জন্য অবারিত সুযোগ ও কাজের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে পারে, তখন সেটাই হবে সরকারের সুখ ও প্রাপ্তি। বেকারদের কর্মসংস্থান করতে পারলেই সরকারের আনন্দ। সরকার যখন সবচেয়ে ভালো শিক্ষাব্যবস্থাটা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয় এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে টেকসইভাবে বিনির্মাণ করার জন্য কাজ করে যায়, তখন সেটাই তাদের বড় অর্জন ও সফলতা। কারণ একটি শিক্ষিত জাতিই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে আগামীদিনের সোনালি প্রত্যাশার মহাসড়কে। ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে শিক্ষিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

শিক্ষা ছাড়া উন্নতি সম্ভব হবে না। তবে কেবল পুঁথিগত শিক্ষাই বড় কথা নয়। পুঁথিগত শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষাও প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর জন্য নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ মানুষকে সত্যের পথ দেখায়। সুনাগরিক ও সামাজিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। তাহলেই তারা আগামীদিনের সুনাগরিক হিসাবে গড়ে উঠবে। সেটা করা সম্ভব হলে প্রত্যেকে নিজের সঙ্গে সঙ্গে দেশের কল্যাণেও আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হবে- যা দেশের উন্নতিতে অবদান রাখবে। কিন্তু নৈতিকতা যদি না থাকে তাহলে কেবল উচ্চশিক্ষিত হলে হবে না। নৈতিকতাহীন ব্যক্তি পশুর মতো শুধু আত্মচিন্তায় মগ্ন থাকে। আত্মচিন্তায় মগ্ন ব্যক্তি কখনও অন্যের কল্যাণ করতে পারে না। যারা অন্যের কল্যাণ করতে পারে না, তারা কীভাবে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে?

আরও বলে রাখি, যখন সরকার একটি চমৎকার ও সর্বাধুনিক স্বাস্থ্যসেবার পরিবেশ তৈরি করে, সবসময় তা প্রত্যেক রোগীর জন্য প্রত্যাশিত সফলতার আনন্দ না-ও নিয়ে আসতে পারে। তবে সে যে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে এটাই তার প্রশান্তি এবং এ প্রশান্তিই সরকারের সাফল্য। এ মুহূর্তে সবার জন্য শিক্ষা পুরোপুরি নিশ্চিত করা তেমন সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামীদিনে যাতে হয় সে ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। এখন থেকে সে লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। সরকারকেও আরও অধিক পরিমাণ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। আর একটি কথা, যখন সরকার ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়নে কাজ করে তখন দেশের উন্নতি হবেই। কারণ এটি মানুষের ভ্রমণ-সময় কমিয়ে দেয়। দ্রুত যোগাযোগ সম্ভব হয়। কাজও বেশি করতে পারে। সেসঙ্গে অর্থবাণিজ্যের চাকাও দ্রুত ঘোরে এবং বিস্তৃত হয় সর্বস্তরে- যতটা সম্ভব। বাংলাদেশের মতো জনবহুল উন্নয়নশীল দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন খুব বেশি প্রয়োজন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিঃসন্দেহে জনগণের সুখ ও আরামকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা সতত দৃশ্যমান হয় এবং মানুষ গর্বের সঙ্গে বলতে পারে, দেখতে পারে এবং দেখাতে পারে।

আমি মনে করি, মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যখন ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন পুরো জাতি সন্তুষ্ট ও নিশ্চিন্ত থাকে। নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই। ন্যায়বিচার না থাকলে কিংবা বিচারহীনতায় লাঞ্ছিত হওয়ার মতো কোনো শঙ্কা থাকলে মানুষের মধ্যে একটা অনাস্থার ক্ষেত্র তৈরি হয়। এমন অনাস্থা সরকারের জন্য কোনোভাবে সুখকর হয় না। এ কারণেই সরকারকে সবসময় এটা মনে রাখতে হবে, যেন দেশের আপামর জনসাধারণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়। যেখানে এবং যে ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা দূর করা প্রয়োজন। সেবাখাতগুলোকে আরও জনকল্যাণমুখী করতে হবে। সবকিছুর পেছনে ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে জরুরি। আমি সবসময় মনে করি- সরকার যে কাজই করুক না কেনÑ তা যেন মানুষের অন্তরে আনন্দ দেয়, মানুষ যেন বুঝতে পারে সরকার জনগণের জন্য কাজ করছে, সরকারের লোকজন জনকল্যাণে নিবেদিত। এমনটি দিতে পারা এবং করতে পারাই হচ্ছেÑ সরকারের সবচেয়ে বড় সফলতা এবং এটাই আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

সবচেয়ে উত্তম, কার্যকর ও সুন্দর সরকার খুঁজে বের করার জন্য কয়েক বছর পর পর সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে সম্মেলনের আয়োজন করা দরকার। তাহলে এর মাধ্যমে জনগণের কথাও শোনার সুযোগ হবে। সরকার তাদের মতামত নিতে পারবে। সরকারকে সবসময় এ বিষয়টি মনে রাখতে হবে যে, সরকারের কাজ নিজের জন্য নয়, জনগণ ও দেশের জন্য- যা প্রকৃতপক্ষে নিজের চেয়েও অধিক। কারণ আমরা প্রত্যেকে সরকারের এবং দেশের অংশ। আমরা সুখী ও সমৃদ্ধ জনগণ চাই এবং আমরা আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের ভালো কাজে সহায়তা করেন।

এটাও আমি মনে করি যে, কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ কাজ-কর্মে, চিন্তা-চেতনায়, ধ্যান-ধারণায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে, কাজের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে, এমনকি মানুষের সঙ্গে আচার-আচরণের বেলায় নিজের মনমানসিকতাকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তন করে জনগণের সেবার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসবে। আমি মনে করি, কেবল তখনই সরকার তার সাফল্যকে আরও চমৎকারভাবে প্রয়োগ করতে পারবে। যখন সে উপলব্ধি করবে, হাজার হাজার মানুষের কল্যাণের জন্য, আনন্দের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, তখন তার আত্মতুষ্টি ও নিজ কাজের গতি বহুগুণ বেড়ে যাবে। মানুষ তার প্রশংসা করবে, উদ্বেলিত করবে জয়গানে। যখন তারা জনগণের জন্য কাজ করে আনন্দ পাবে তখনই আসল উন্নতি হবে। এখন অনেকের মধ্যে কাজ করার ব্যাপারে ঢিলেঢালা ভাব রয়েছে। আবার অনেকের রয়েছে হতাশা, বঞ্চনার অভিযোগ। কেউ কেউ যথাযোগ্য বিবেচনাবোধ হতে বঞ্চিত এমনও মনে করেন। এসবও কাটানো দরকার। তারা জনগণের জন্য কাজ করবে অথচ তাদের সুবিধার বিষয়গুলো দেখা হবে না- এটা ঠিক হবে না। তারা সুস্থ থাকলে ও ভালো থাকলে অন্যের জন্য কাজ করতে পারবে। তারাই যদি সমস্যায় থাকে তাহলে সে সমস্যার বাইরে চিন্তাও করতে পারবে না। তার কাজও ভালো হবে না।

যে নদী নিজেই গতিহীন সে নদী কীভাবে অন্যের তৃষ্ণা মেটাবে!

একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, বিভিন্ন বিষয় অহেতুক অগ্রাধিকার দেওয়া বা শাসকদের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে বহু প্রতিষ্ঠিত দেশ বা জাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আমরা পরাধীনতার নাগপাশ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি লাভের পর জনগণের সম্মিলিত প্রয়াসে তিল তিল করে অনেক এগিয়েছি। অবিরাম ভালো নেতৃত্ব পেলে দেশ আরও বহুগুণ এগিয়ে যেতে পারত।

গণতন্ত্রকে আমাদের আরও সুদৃঢ় করতে হবে। আমরা তা পারব, আমাদের রয়েছে প্রায় ষোলো কোটি দেশপ্রেমিক জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি আর হৃদয় উজাড় করা সমর্থন।

তবে একটা কথা না বললে নয়; তা হলো জনগণের কিসে কল্যাণ এবং কিসে শান্তি আসেÑ সেটাই একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল আমাদের নেতৃবৃন্দের। এ উদ্দেশ্য সফল করতে গিয়ে যাঁরা নিজেদের নিবেদিত করেছেন তাঁরা সফল। এ কারণেই জনগণ আমাদের নেতৃবৃন্দকে ভালবাসেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কারও কারও এবং কোনো কোনো নেতার নেতিবাচক ভূমিকার কারণে মাঝে মাঝে সরকার সমালোচিত হয়েছে। এমনটি স্বাভাবিক, বৃহৎ কোনো লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হলে পথে কিছু ভুলভ্রান্তি হবে, এ ভুলভ্রান্তিই এগিয়ে যাবার প্রমাণ এবং সংশোধিত হওয়ার শিক্ষা। ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের আবার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়েছে। আবার যথার্থ ট্রেনে ঠিকই উঠে গেছে। আমাদের দেশে বারবার সামরিক শাসন এসেছে, নানা অপকৌশলে তা স্থায়ী করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে তারা ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু তাদের লোভ-লালসা ও ক্ষমতায় যাওয়ার এবং ক্ষমতায় গিয়ে থেকে যাওয়ার অভিলাষ বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বারবার ব্যাহত করেছে। সামরিক শাসকদের কারণে দেশ পিছিয়েও গিয়েছে। তবু জনগণ এবং জনগণের ব্যাপক সমর্থনে বলীয়ান নেতৃবৃন্দ থেমে থাকেননি। প্রবল উদ্যমে আবার উঠে দাঁড়িয়েছেন।

এটাও প্রমাণ হয়েছে, এদেশে সামরিক বাহিনী অনেকে ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় আসতে পারলেও টিকতে পারেনি। ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। আর নাহলে জীবন দিতে হয়েছে। যাই হোক এতকিছুর মধ্যেও বাংলাদেশের গণতন্ত্র ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে। সামরিক বাহিনীর মধ্যে নতুন নেতৃত্ব ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উন্মেষ ঘটেছে। এই গণতন্ত্রকে আমাদের আরও সুদৃঢ় করতে হবে। আমরা তা পারব, আমাদের রয়েছে প্রায় ষোলো কোটি দেশপ্রেমিক জনগণের ঐক্যবদ্ধ শক্তি আর হৃদয় উজাড় করা সমর্থন।

আজকে যাঁরা নেতা আছেন এবং আগামীদিনে যাঁরা নেতা হবেন- তাঁদের সবাইকে মনে রাখতে হবে আমাদের কাজের প্রথম স্থানেই রয়েছে জনগণ। বারবার জনগণের কথা আসে। সবকিছুতে তারাই অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। এজন্য আমাদের দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকারি সকল কাজ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণের সমৃদ্ধি, স্বস্তি এবং সন্তুষ্টির জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যেতে হবে। সকল বাধাবিঘœ তুচ্ছ করে পরম সাহসিকতায় এগিয়ে যেতে হবে এক লক্ষ্যে। সে লক্ষ্য আর কিছু নয়, কেবল জনকল্যাণ, জাতির কল্যাণ, বাংলাদেশের কল্যাণ।

একটি সরকার যখন জনগণের উন্নয়নের কথা চিন্তা করে তখন সে দেশ আর পিছিয়ে থাকে না, পিছিয়ে থাকে না সে সরকার, থাকতে পারে না। এ কারণে আমাদের উচিত সুখ ও শান্তির চিন্তা করা, যার ওপর ভিত্তি করে নীতি ও চিন্তাধারা কার্যে পরিণত হবে। তবে সবকিছুর ভিত্তি হবে জনগণ, দেশ ও মাটি। এজন্য জনগণকেও সরকারকে সহায়তা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। কারণ সরকার ও জনগণ পরস্পর সম্পূরক।

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে প্রতিযোগিতা যেমন বেড়েছে তেমনি অবারিত হয়েছে সুযোগ এবং বহুমুখী হয়েছে ক্ষেত্র। বস্তুত জ্ঞান-বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান মানুষের ইতিবাচক উত্তরণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এ সহযোগিতা তারা বাংলাদেশের জন্য আরও বাড়াতে চায়। সে সহযোগিতা নিতে হবে। চীন, ভারত, জাপানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের গভীর সুসম্পর্ক। আমাদের পররাষ্ট্র নীতির মূল কথা হচ্ছেÑ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। এ নীতির কার্যকর প্রতিফলন ঘটিয়ে আমরা আমাদের দেশের অনুকূলে বৈশ্বিক সহায়তা আরও বাড়াতে পারি। এজন্য আমাদের কুশলী কূটনীতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে। চীন, জাপান, ভারত প্রভৃতি দেশের সঙ্গে আমাদের দেশের আর্থনীতিক সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য সরকারকে আরও অধিকসংখ্যক দেশের সঙ্গে এরূপ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা আবশ্যক। এ ধরনের বন্ধু হলে দেশের উন্নতি হবে। তাদের সহযোগিতাও আমাদেরকে উন্নয়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

আমি সরকারকে জাতি বা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে দেখি; কখনও বিচ্ছিন্ন, স্বতন্ত্র বা আলাদা কোনো অংশ হিসাবে নয়। সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এটি আর সরকার থাকে না, ছারখার হয়ে যায়। অন্যদিকে জনগণেরও উচিত- তাদের কল্যাণে যে সরকার নিবেদিত সে সরকারকে রক্ষায়, বিস্তারে আর প্রসারে পূর্ণ সহযোগিতা করা। বিষয়টি সরকার ও জনগণ উভয়কে বিচক্ষণভাবে মনে রাখতে হবে এবং সেই বিচক্ষণ হিসাবের ভিত্তিতে পরস্পর সম্মান, সহযোগিতা ও প্রাপ্তির মূল্যবোধের ঔজ্জ্বল্যে এগোতেও হবে। যে সরকার জনগণের জন্য কাজ করবে, জনগণের উচিত সে সরকারের সার্বিক সহায়তা প্রদান করা। জনগণের সহায়তা সরকারকে শক্তিশালী করে, উৎসাহিত করে কর্মে। সরকার জনকল্যাণে অসংখ্য কর্মকা- গ্রহণ করে থাকে। জনগোষ্ঠীর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আরও বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। আর এসব কাজের সফলতা তখনই আসে, যখন জনগণ সরকারের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে। কারণ সরকার হচ্ছে একটি কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের একমাত্র কাজ হচ্ছে জনগণের সেবায় কাজ করে যাওয়া। এর ব্যত্যয় হলে সরকারকে জনগণের রোষানলে পড়তে হয়।

সরকারকে মনে রাখতে হবে, জনগণের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা নয়, সরকারের একমাত্র উদ্দেশ্য জনগণের সন্তুষ্টি অর্জন এবং জাতির অনাগত ভবিষ্যতের জন্য টেকসই উন্নয়ন সাধন। এটি করতে পারলে জাতি হিসাবে আমাদের শ্রীবৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে উঠবে।

৬ .মাতৃভাষার প্রতি মমতা

সৈয়দ আবুল হোসেন: ভাষা-আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ও আলোকবর্তিকা হিসাবে চিহ্নিত। ভাষা রক্ষায় রক্ত দিয়ে আমরা বিশ্বকে আমাদের শক্তি, সাহস, তেজ আর উত্থানের বার্তা দিয়েছিলাম। তাই একুশে আমাদের চেতনার স্মারক, প্রেরণার উৎস। একুশ আমাদের অহংকার। একুশ আমাদের গর্ব। একুশ আমাদের পথের দিশা। একুশ মানে মাথা নত না করে মাথা উঁচু করা। মাতৃভাষাকে রক্ষার মাধ্যমে সত্য ও ন্যায়ের দাবী প্রতিষ্ঠা করা। একুশের বিজয় আমাদের সীমাহীন শক্তিতে উদ্দীপ্ত করেছে, উজ্জীবিত করেছে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার মন্ত্রে। আমরা ধাপে ধাপে এগিয়ে গিয়েছি। একুশ থেকে একাত্তর, তাই দুটো একসূত্রে গাঁথা। আমরা মুখের ভাষার জন্য বুকের রক্ত দিয়েছি কিন্তু আজ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে বা সামাজিকভাবে বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি। ভাষা একটি জাতির স্বকীয়তার প্রধান নিয়ামক। যে ভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি, জীবন দিয়েছি অকাতরে- সে ভাষা শুদ্ধরূপে উচ্চারণের ও লেখার জন্য এখন সামান্য শ্রম দিতে কুণ্ঠিত হচ্ছি, এমন স্ববিরোধী জাতি কি পৃথিবীতে আর আছে?৮

পবিত্র কোরানে বলা হয়েছে, ভাষার ¯্রষ্টা স্বয়ং আল্লাহতায়ালা। ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি (আল্লাহ) মানুষ সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে ভাব প্রকাশ করতে শিখিয়েছেন।৯’ জন্মগতভাবেই মানুষ তার মাতৃভাষায় কথা বলে। কারণ মহান আল্লাহতায়ালা মানুষের জন্মের পর তাকে মায়ের ভাষাতে কথা বলতে শিখিয়েছেন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর একটি শিশু তার মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী থেকে যেসব কথা শোনে, তাদের কাছ থেকে যে ভাষা শেখে এবং তাদের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করে তা-ই তার মাতৃভাষা। ভাষা মানুষের প্রতি আল্লাহর অশেষ দয়া ও অনুগ্রহ এবং তাঁর সৃষ্টিকুশলতার একটি অনুপম নিদর্শন। পবিত্র কোরানে আল্লাহ্পাক বলেছেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে মহাকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।’১০

পৃথিবীতে প্রতিবছর ৭টি করে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। জনসংখ্যার বিলুপ্তি ভাষা-বিলুপ্তির প্রধান কারণ। সে হিসাবে বাংলা ভাষার অবস্থান পতনের দিকে নয়, উত্থানের দিকে। পৃথিবীতে চারটি ভাষাও যদি টিকে থাকে তন্মধ্যে একটি হবে বাংলা। তবে, আমরা যারা বাংলা ভাষায় কথা বলি এবং লিখি, বিশেষ করে, শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত হিসাবে পরিচিত- তাঁদের অনেকের কার্যকলাপ বাংলা ভাষাকে ক্রমশ বিপন্নতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। প-িতদের লেখালেখি বাংলা বানান ও উচ্চারণ রীতির বিরাট প্রতিবন্ধক। তাঁদের লেখা ও বানানে পারস্পরিক ভিন্নতা সাধারণ পাঠকদের বাংলা বানান ও শব্দচয়নকে সাংঘাতিকভাবে স্বেচ্ছাচারী করে তুলছে। ভাষার অভ্যন্তরীণ রীতিনীতির তুঘলকি সিদ্ধান্ত ও দায়বোধহীন চিন্তা-চেতনা বাংলা ভাষাকে ক্ষয়রোগের মতো পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। প-িতবর্গের বানান-বিষয়ক মতানৈক্য বাংলা ভাষার বিদ্যমান জটিলতার মূল কারণ। একবিংশ শতকে এসেও আমাদের বুদ্ধিজীবীরা বাংলার মতো একটি সুসমৃদ্ধ ভাষাকে সমতার বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারছেন না। এ ব্যর্থতার দায় তাঁরা কীভাবে এড়াবেন?১১

বিশ্বায়নের প্রক্রিয়ায় আমাদের আশপাশের দেশগুলো অধিকমাত্রায় ইংরেজির দিকে ঝুঁকছে। এমনকি গণচীনেও ইংরেজি রপ্ত করার হিড়িক পড়েছে। ব্যবসায়-বাণিজ্য-বিনিয়োগ-প্রযুক্তি ও যোগাযোগের জন্য এছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। অগ্রগতি অর্জনের জন্য আমাদেরও এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। কিন্তু সেটা কতটুকু এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তার সুস্পষ্ট সীমা নির্ধারণও প্রয়োজন। তা নিশ্চয়ই মাতৃভাষাকে অবহেলা করে নয়। বাংলার বদলে ইংরেজির প্রসার হবে আত্মহননের শামিল। পর্ণকুটিরে ছিন্নবস্ত্রে বসবাসরত

গর্ভধারিণীকে অবহেলা করে ধনী শাশুড়িকে নিয়ে মেতে থাকা আর যাই হোক, কোনো সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারে না। ঠিক তেমনি মানুষের কাজ হতে পারে না- মাতৃভাষাকে অবহেলা করে অন্যের ভাষা নিয়ে উল্লাস করা। এমন লোকদের চরিত্র আঁকতে গিয়ে মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিম বলেছেন :

যে সব বঙ্গেতে জন্মি

হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।

এ কারণে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আমাদের একটি ভাষানীতি প্রয়োজন। এ ভাষানীতি বাংলা ও ইংরেজির একটি সমান্তরাল সহঅবস্থান নিরূপণ করবে এবং তার যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করবে। ভাষানীতি না-থাকার কারণে আমরা প্রায় সবক্ষেত্রে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা প্রত্যক্ষ করছি। সরকারি দফতরগুলোতে যে-যার মর্জি-মতো করে বাংলায় নোট লিখছেন। আমি গত বিশ বছরে সরকারি দফতরে শুদ্ধ ও প্রমিত বাংলা বানানে একটি পত্রও পাইনি। নোটের ভাষা ও বানানও নিম্নমানের। যাঁরা এগুলো লেখেন তাঁরা উচ্চশিক্ষিত। নিজের ভাষার প্রতি যাঁরা এত অজ্ঞ তাঁদের উচ্চডিগ্রি নিয়ে সংশয় প্রকাশ অমূলক হবে না। সবচেয়ে বেশি নৈরাজ্য চলছে শিক্ষায়তনগুলোতে। বাংলা বানানে কোথাও কোনো সমতা নেই। শিক্ষকবৃন্দেরও কিছু করার নেই। বাজারে প্রচলিত বিশেষজ্ঞ-লিখিত বানানেও রয়েছে সাংঘর্ষিকতা। এমনকি বাংলা একাডেমির বানান-রীতিতেও কোনো সুনির্দিষ্টতা নেই। প্রত্যেক দেশের প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ভাষানীতি রয়েছে। তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই তারা তা প্রণয়ন করেছে, অনুসরণ করে চলেছে। কিন্তু বাংলা ভাষায় তা নেই। অথচ আমরা এ ভাষার জন্যই জীবন দিয়েছি।

একটি জাতীয় ভাষানীতির জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য। এ ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয়তাভিত্তিক উদ্যোগ আবশ্যক। ভাষানীতি প্রণয়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এ ধরনের জাতীয় কমিটি শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, সরকারি কর্মকর্তা ও কূটনীতিক, সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষার্থী এবং আগ্রহী সাধারণ নাগরিকদের মতামত গ্রহণ করবে। এ মতামতের ভিত্তিতে কমিটি জাতির সম্মুখে তার প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে। অতঃপর এ বিষয়ে দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে। বিতর্কের পরে সবার সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় ভাষানীতি গৃহীত হবে এবং তার প্রয়োগ হবে বাধ্যতামূলক। ভাষা-সংক্রান্ত এ জাতীয় কমিটির দ্বিতীয় কাজ হবে জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে ভাষানীতি কতটুকু প্রয়োগ হচ্ছে তা মনিটর করা বা লক্ষ্য রাখা। যারা ভাষানীতি অনুসরণ করবে না, তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

অনেকে যুক্তাক্ষরকে বাংলা ও বাংলা বানানের সমস্যা বলে মনে করে থাকেন। ভাষা কিংবা বানান উভয় বিবেচনায় যুক্তাক্ষর সমস্যা নয়, বরং সুবিধা। যুক্তাক্ষর শব্দের যথার্থ উচ্চারণে সহায়তা করে। বাংলা যুক্তাক্ষরগুলো ধ্বনি-প্রতিলিপি হিসাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাশ্রয় বিবেচনায় বিস্ময়কর শৃঙ্খলাজাত কৌশল। এটি শুধু অভ্রান্ত নয়, অতি সূক্ষ্ম বিবেচনাতেও একটি বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়াস হিসাবে স্বীকৃত। বাংলায় লেখা যায় নাÑ এমন ধ্বনি খুব একটা বেশি নেই।

জনসংখ্যা বিবেচনায় বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ ভাষা। বাইশ কোটি লোক বাংলায় কথা বলে। পৃথিবীর প্রত্যেক ভাষার কিছু-না-কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সে বিবেচনায় বাংলা ভাষার যে সীমাবদ্ধতা পরিদৃষ্ট হয়, তা অন্যান্য ভাষা বিবেচনায় অতি নগণ্য। বাংলা ভাষার লিখনগতি ইংরেজি ভাষার সমান, কিন্তু পঠনবেগ ইংরেজির চেয়ে বেশি। ইংরেজি লিপি ধ্বনিমূলক নয়, বর্ণনাত্মকমূলক। একটি ধ্বনির প্রতিলিপি হিসাবে ইংরেজিতে একটি বর্ণ সৃষ্টি হয় না। উদাহরণস্বরূপ ‘ম’ বর্ণের কথা বলা যায়। এটি কখনও ‘বর্গীয়-জ’ কখনও বা ‘গ’। আবার কখনও উচ্চারণই হয় না। ইংরেজিতে অনেকগুলো শব্দ রয়েছে যেখানে বর্ণচিহ্ন উপস্থিত থাকলেও উচ্চারিত হয় না এবং বর্ণের উচ্চারণে প্রবল পার্থক্য লক্ষণীয়। ইংরেজির এ অবিজ্ঞানোচিত ও রীতিবিহীন উচ্চারণরীতি সংস্কার করে ধ্বনিমূলক পদ্ধতিতে বিজ্ঞানোচিত ইংরেজি লেখার পদ্ধতি প্রচলনের জন্য জর্জ বার্নার্ড শ মোটা অঙ্কের অর্থ উইল করে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজি ভাষা এত বেশি অবৈজ্ঞানিক যে, তা ঠিক করা সম্ভব হয়নি।১২

প্রত্যেকটি ধ্বনির জন্য বাংলায় নির্দিষ্ট হরফ আছে। ‘ক’ বর্ণের উচ্চারণ সবসময় সর্বত্র অভিন্ন। ইংরেজি বর্ণমালার তৃতীয় বর্ণ ‘সি (ঈ)’ এর মতো ভিন্নভাবে উচ্চারিত হওয়ার সুযোগ বাংলায় নেই। আবার কোনো বর্ণের অর্ধ-উচ্চারণ প্রয়োজন হলে হসন্ত দিয়ে চিহ্নিত করে দেওয়ার রীতি বাংলা ভাষার একটি বাড়তি সুবিধা।

সমতাভিত্তিক বানানরীতির সর্বজনীন গ্রাহ্যতা এবং সম্প্রসারণের অভাব বাংলা বানানের প্রধান সমস্যা। বাংলা বানানরীতির পরিপ্রেক্ষিত সূত্রগুলো শব্দের উৎসভিত্তিক। একজন লোকের পক্ষে বাংলা বানানরীতি যত সহজে আয়ত্তে আনা সম্ভব, বাংলা শব্দের উৎসগুলো আয়ত্তে আনা তত কঠিন। কিন্তু বানানরীতির সমতাবিধানের মাধ্যমে সহজে কষ্টকর বিষয়টাকে আয়ত্তে নিয়ে আসা যায়। বাংলা ভাষায় বর্তমানে ব্যবহৃত শব্দের সংখ্যা প্রায় এক লাখ পঁচিশ হাজার। তন্মধ্যে আনুমানিক ষাট ভাগ শব্দ তৎসম।

শব্দের উৎস সম্পর্কে জ্ঞাত না-হলে বানানের নিয়মগুলো যথার্থভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। তবে বাংলা বানানের নিয়মে সমতা ও আদর্শরীতি প্রচলন করা সম্ভব হলে শব্দের উৎসভিত্তিক অসুবিধাগুলো চমৎকারভাবে দূরীভূত করা সম্ভব। তৎসম-অতৎসমের দ্বন্দ্বে না গিয়ে সব শব্দকে বাংলা ভাষার নিজস্ব সমৃদ্ধি ধরে নিয়ে অগ্রসর হলে সমস্যা থাকার কথা নয়। মাতৃভাষা মায়ের মতো। ভাষা শেখার প্রতি অবহেলা ও স্বেচ্ছাচারিতা বাংলা বানানে ভুল ও সাংঘর্ষিকতার অন্যতম কারণ। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সুনজর না দিলে আমাদের প্রিয় মাতৃভাষার সাবলীল প্রসারে বিঘœ ঘটবে।

আল্লাহ্ যুগে যুগে মানবজাতিকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য যত নবি-রাসুল প্রেরণ করেছেন এবং তাঁদের কাছে যেসব ধর্মগ্রন্থ পাঠিয়েছেন তাঁদের ভাষা ছিল ওইসব জাতির মাতৃভাষা। এর উদ্দেশ্য ছিলÑ প্রত্যেক জাতির নিজ নিজ মাতৃভাষার মাধ্যমে ঐশী বাণী থেকে সহজে শিক্ষালাভ করতে সমর্থ হওয়া। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত মাতৃভাষা বাংলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান। মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ্ ইরশাদ করেছেন, ‘আর আমি প্রত্যেক রাসুলকেই তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য।’১৩

আগেই বলা হয়েছে, বাংলা বানানে সাংঘর্ষিকতা ও সে¦চ্ছাচারিতা প্রমিত বানান প্রচলনে বিরাট বাধা। প্রচলিত ভুল বাংলায় বানান সাংঘর্ষিকতার অন্যতম কারণ। এখানে উদাহরণস্বরূপ ইক (ষ্ণিক) প্রত্যয়যোগে গঠিত শব্দের কথা বলা যায়। যেমন- ‘বর্ষ’ থেকে বার্ষিক, ‘মানস’ থেকে মানসিক, ‘মাস’ থেকে মাসিক, ‘রসায়ন’ থেকে রাসায়নিক, ‘দর্শন’ থেকে দার্শনিক এবং ‘অর্থ’ থেকে আর্থিক; তাহলে ‘অর্থনীতি’ থেকে অর্থনৈতিক হবে কেন? এটি প্রচলিত ভুল। ব্যাকরণের রীতি অনুসারে অর্থনীতি + ইক (ষ্ণিক) = আর্থনীতিক। তেমনি রাজনীতি + ইক (ষ্ণিক) = রাজনীতিক। কিন্তু অনেকে লেখেন যথাক্রমে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক। এমন লেখা ভুল। প্রায় সবাই এমন ভুল করেন বলে এরূপ ভুলকে বলা হয় প্রচলিত ভুল। এখানে ব্যাকরণগত ভুল ছাড়াও প্রায়োগিক ভুলও রয়েছে। অর্থনীতি ও রাজনীতি উভয়ই নীতির বিষয়, তাই নৈতিকতা নিয়ে আসা হাস্যকর। এটি বিবেচনা করলেও ‘অর্থনৈতিক’ ও ‘রাজনৈতিক’ শব্দ দুটোর বানান অশুদ্ধ।১৪

বাংলায় বচন পরিবর্তনে প্রমিত-রীতি অনুসরণেও প্রচুর ভুল ও সাংঘর্ষিকতা লক্ষ্য করা যায়। অনেকে ‘কর্মকর্তা’ পদের বহুবচন-প্রকাশে লেখেন ‘কর্মকর্তাগণ, কর্মকর্তাবৃন্দ’ কিন্তু ‘নেতা’ শব্দের বহুবচন-প্রকাশে লেখেন নেতৃবৃন্দ, ভ্রাতার বহুবচন প্রকাশে লেখেন ভ্রাতৃবৃন্দ, শ্রোতার বহুবচন প্রকাশে লেখেন শ্রোতৃবৃন্দ। তাহলে ‘কর্মকর্তা’ শব্দের বহুবচন প্রকাশে ‘কর্মকর্তাবৃন্দ হবে কেন? এটি প্রচলিত ভুল। শুদ্ধরূপ হবে ‘কর্মকর্তৃবৃন্দ’। এর একটি সূত্র রয়েছে। এটি মনে রাখলে ভুলের আশঙ্কা কমে যাবে। কোনো বিশেষ্যের শেষে ‘তা’ থাকলে ওটি বহুবচন করার সময় ‘ত’ এর নিচে ‘ঋ-কার’ যুক্ত হয়। এটাই ব্যাকরণের নিয়ম। অতএব নেতা শব্দের বহুবচন যে-কারণে নেতৃবৃন্দ বা নেতৃগণ সে একই কারণে কর্মকর্তা শব্দের বহুবচন কর্মকর্তৃবৃন্দ বা কর্মকর্তৃগণ। ‘নেত্রীবর্গ’ ও ‘নেতৃবর্গ’ শব্দ দুটো সমোচ্চারিত কিন্তু বানান ও অর্থ ভিন্ন। ‘নেত্রীবর্গ’ শব্দের অর্থ ‘একাধিক মহিলা নেতা’। অন্যদিকে ‘নেতৃবর্গ’ শব্দের অর্থ ‘পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে একাধিক নেতা’। তেমনি ‘অভিনেত্রীবর্গ’ মানে মহিলা অভিনেতাবৃন্দ কিন্তু ‘অভিনেতৃবর্গ’ অর্থ সব অভিনেতা ও সব অভিনেত্রী।১৫

‘ভাল’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ ভড়ৎবযবধফ, নৎড়,ি ভধঃব ইত্যাদি। ‘ভালো/ভাল’ শব্দদ্বয়ের ইংরেজি প্রতিশব্দ মড়ড়ফ, ভধরৎ, বীপবষষবহঃ. ভালো শব্দটি ‘ভাল’ হিসাবেও লেখা হয়। অভিধানেও অমনটি দ্বিতীয় ঘরে শুদ্ধ দেখানো হয়েছে। তবে যেহেতু দুটো বানানে পার্থক্য আছে সেহেতু মড়ড়ফ বলতে ‘ভালো’ লেখা বিধেয়। আমি মড়ড়ফ অর্থে ভালো লিখি। মড়ড়ফ অর্থে ‘ভাল’ লেখা প্রমিত নয়। তেমনি নষধপশ অর্থে ‘কালো’ কিন্তু ুবংঃবৎফধু/ঃরসব/ সময় অর্থে ‘কাল’ (উচ্চারণ : কাল্) লেখা বিধেয়। ‘ভালো যে বাসা’ বাক্যটিকে এককথায় প্রকাশ করলে হয় ‘ভালোবাসা’ কিন্তু ইংরেজি ষড়াব শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে ভালবাসা। তাই ইংরেজি ষড়াব-কে ‘ভালবাসা’র পরিবর্তে ভালোবাসা লিখলে তা ষড়াব না হয়ে মড়ড়ফ যড়ঁংব অর্থ প্রকাশের আশঙ্কা থেকে যায়।১৬

মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসার পাশাপাশি অন্যের ভাষার প্রতিও সবার শ্রদ্ধাশীল হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পৃথিবীর সব ভাষাই আল্লাহর অনুমোদিত ভাষা। প্রত্যেক মাতৃভাষায় যেহেতু একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী কথা বলে থাকে তাই মাতৃভাষার প্রতি তাদের মধ্যে ভালবাসা সৃষ্টি হয়। ভাষার সঙ্গে তাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি জড়িত থাকে, পারস্পরিক ভাব আদান-প্রদান হয়, একে অপরকে বোঝা ও উপলব্ধি করা, অন্যকে প্রভাবিত করা, সৎপথে চলার আহ্বান করা, অন্যায় কাজে বাধা প্রদান প্রভৃতি মাতৃভাষার মাধ্যমেই সহজভাবে সম্ভব। তাই মাতৃভাষার প্রতি আমাদের সবচেয়ে বেশি মমতা প্রয়োজন, ঠিক মায়ের মতো।

৭.  ভবিষ্যতের সরকার কেমন হবে

সৈয়দ আবুল হোসেন: সরকার, সে যে দলেরই হোক না কেন, জনগণের জন্য কাজ করে, করার চেষ্টা করে। তবে কাজের পদ্ধতি ভিন্ন। তাই কোনো নির্দিষ্ট সরকারের কাজে অনেকে সন্তুষ্ট নয়। তারা নানাভাবেই সরকারের সমালোচনা করে। অনেকে কোনো যৌক্তিক কারণ ব্যতীত সবসময় সরকারের সমালোচনায় মগ্ন থাকে। এ ধরনের লোকদের কাজই হচ্ছে সব কাজে সরকারের বিরোধিতা করা। তারা কখনও সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করে না। সব কাজেই দোষ দেখে, দোষই দেখে শুধু। সমালোচনা করাটাই তাদের যেন একমাত্র রাজনীতিক লক্ষ্য। এমন রাজনীতি, এমন লক্ষ্য কোনো রাজনীতিক দলের লক্ষ্য হলে সে দলের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সমালোচনা থাকবে এবং তা প্রয়োজন, তবে সমালোচনার জন্য সমালোচনা কখনও কল্যাণকর হতে পারে না।

এটা স্বীকার করতে দোষ নেই, যখন যে সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে তাদের অন্তত সরকারে টিকে থাকার জন্য ও মেয়াদ পূরণ করার জন্য হলেও কিছু ভালো কাজ করতে হয়েছে। তবে কোনো সরকারের সব কাজে সবাই তুষ্ট হতে পারে না, একজনের পক্ষে সবাইকে কখনও সন্তুষ্ট করা সম্ভবও নয়। এ কারণে নতুন করে ভাবতে হবে ভবিষ্যৎ সরকারের রূপরেখা, তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত। ভেবে দেখা আবশ্যক- বিশাল জনসংখ্যার দেশে সর্বজনীন কল্যাণ ও কর্মকা-ের প্রকৃতি কীরূপ হওয়া উচিত প্রভৃতি। মূল বিষয়ে আলোকপাত করার আগে কিছু বিষয়ে অল্পবিস্তর আলোচনা করা আবশ্যক, যা ভবিষ্যৎ সরকার সম্পর্কে আলোচনা করার সময় কাজে লাগবে। আমরা শুধু সেবা প্রদানের বিষয়ে আলোকপাত করব, রাজনীতিক পরিকাঠামোর বিষয়ে নয়। পৃথিবীর বহু দেশে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের সরকার রয়েছে। তাদের সকল কাজের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের জন্য উত্তম সেবা নিশ্চিত করা। রাজনীতিক পরিকাঠামো নিয়ে আলোচনা করলে অনেক আলোচনা করতে হবে। তাছাড়াও এটা নিয়ে বিতর্কও তৈরি হবে। আমি কোনো বিতর্ক তৈরি করতে চাই না। জনকল্যাণ বহুমাত্রিক ধারায় বিবর্ধিত করে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম হবে, আমরা সে কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে চাই এবং সেটার ওপরই জোর দেওয়া হবে।

প্রথম পর্যায় লক্ষ্য। তারপর লক্ষ্য হাসিলের উপায়, প্রক্রিয়া প্রভৃতি। সর্বাগ্রে এরকম একটা পরিকল্পনা ও পন্থা বের করা আবশ্যক- একটা সরকার কেমন করে ও কীভাবে জনগণের দোরগোড়ায় যেতে পারে। সেটা কত দ্রুততম সময়ে সেটাও উপযুক্ত পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্ধারণ করতে হবে। অপেক্ষাকৃত কত কম সময়ে এবং সর্বক্ষণ সেবা দিতে রাষ্ট্রযন্ত্রসমূহ কতটা আন্তরিক এটাও বিবেচনার দাবি রাখে। মাঝে মাঝে আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবি। কারণ, এটাই আমার প্রথম এবং প্রধান চিন্তার বিষয়। আমি যত দিন সরকারে ছিলামÑ এটাই মনে করেছি যে, বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য কঠোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই আমাদের প্রধান কাজ। আমি সেভাবে কাজ করেছি।

একটি দেশ যে পর্যায়ে থাকুক না কেন, সফল ও যোগ্য নেতৃত্ব তাকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ তার অনবদ্য উদাহরণ। যাই হোক এটা বলা প্রয়োজন যে, একটা সরকার কিংবা ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠান যখন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে তা সবসময় সফল হয় এমন নয়। কারণ আমি মনে করি না, সবসময় আমাদের সব কৌশল সকল বাধা অতিক্রম করে চূড়ান্ত সফলতা লাভ করবে। তবে এরপরও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যা আমরা অর্জন করেছি এবং করছি- তা অহংকার করার মতোই। আমরা কখনও আত্মতুষ্টিতে আহ্লাদিত হয়ে উঠি না, কেবল আত্মতুষ্টিকে পরবর্তী গন্তব্যের পাথেয় হিসাবে ব্যবহার করি। উচ্চাকাক্সক্ষা বজায় রাখতে, তৎলক্ষ্যে ধাবিত হতে এবং শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য, সবসময় আমাদের অবশ্যই উচ্চাভিলাষী হতে হবে। উচ্চাকাক্সক্ষা না-থাকলে মানুষ উপরে যেতে পারে না। আমি আবারও বলতে চাই, আমাদের সফলতার সংজ্ঞা পরিবর্তন করা হয়েছে। আমাদের অবশ্যই পরবর্তী প্রজন্মের সরকারের দিকে নজর দিতে হবে। সেদিকে নজর দিয়েই চিন্তা করতে হবে আগামী দিনের সরকার কেমন হবে আর তার রূপরেখাই বা কেমন হবে। এটা এ মুহূর্ত থেকে ভাবতে হবে।

আগামীদিনের সরকার হবে নিবিড়ভাবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান। এটি হবে জনকল্যাণে একান্তভাবে নিবেদিত জনগণের অতি প্রিয় একটি সরকার। এ সরকারের কোনো অংশের সঙ্গে জনগণের কোনো দূরত্ব থাকবে না। সরকার ও জনগণ পরস্পর পরস্পরের কল্যাণের জন্য সবসময় উন্মুখ হয়ে থাকবে। সরকারপ্রধানও থাকবেন সাধারণ জনগণের কাছাকাছি। নিরাপত্তা-ব্যয় অনেক কমে যাবে। এ সরকারের প্রশাসনযন্ত্র, আইন-শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে মানুষের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হবে। এ আদর্শ ও পরিকল্পনা নিয়ে ভবিষ্যৎ সরকারের রূপরেখা রচনা করতে হবে।

আগামী দিনে যে সরকার হবেÑ ওই ভবিষ্যৎ সরকারের সেবার দরজা সপ্তাহের প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। তা বছরব্যাপী চলবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসার জন্য সবসময় খোলা থাকে। তারা তা পারলে, সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ কেন পারবে না? তাদেরও পারতে হবে। আমরা সরকারকে একটি এয়ারলাইন্স বা বিমান পরিবহনব্যবস্থার অথবা ইমারজেন্সি কল সেন্টারের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। এয়ারলাইন্স ও ইমারেজেন্সি কল-সেন্টার ২৪ ঘণ্টা বিরতিহীনভাবে চলতে থাকে। সেবা দিয়ে থাকে প্রতিমুহূর্ত। সরকারও হবে তেমন।

ভবিষ্যতের সরকারকে, মানসম্পন্ন সেবা দেওয়ার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। এখন সরকারি প্রতিষ্ঠানের অনেক জায়গাতেই কাজের গতি কম। সে গতি বাড়াতে হবে। আমাদের সরকার তার সেবাপ্রত্যাশী জনগণকে অভ্যর্থনা জানাবে। তাদের সেবা দেবে। কোনো নাগরিক সরকারের সেবা নিতে এসে ব্যর্থ হয়ে কিংবা খারাপ ব্যবহার পেয়ে ফিরে যাবে না কিংবা চলে যাবে না বেসরকারি কোথাও সেবা নিতে। পাঁচতারকা হোটেলের পেশাগতরা যেমন অভ্যর্থনা জানায় অতিথিকে, তাদের চেয়েও অধিক বিন¤্রভাবে জনগণকে, সেবাপ্রার্থীকে অভ্যর্থনা জানাতে হবে। গ্রাহককে কে কত বেশি সেবা দিতে পারে এমন বেসারকরি প্রতিযোগিতা ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে। যে ব্যাংক যত বেশি উত্তম সেবা দিচ্ছে তাদের ওখানে তত বেশি গ্রাহক যাচ্ছে। আমাদের সরকারকেও সেভাবে ভাবতে হবে এবং সেভাবে কাজ করতে হবে। কারণ সেটা করতে পারলে আমাদের সরকার ব্যাংকের চেয়েও ভালো উপায়ে কার্যনির্বাহ করতে সক্ষম হবে। এটাই সরকার ও জনগণকে অভিন্নসূত্রে আবদ্ধ করে পরস্পরকে দায়বদ্ধ করে তুলতে সক্ষম হবে।

এখনকার সরকার কিছু কিছু অফিসে ওয়ানস্টপ সার্ভিসেস সেন্টার চালু করেছে। কিন্তু এটা কিছু প্রতিষ্ঠানে করলে হবে না। সর্বত্র করতে হবে। এজন্য ভবিষ্যতের সরকার হবে ওয়ানস্টপ সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত একটি জননিবেদিত সর্বজনীন প্রতিষ্ঠান। সরকারের যেকোনো সেবাকেন্দ্র থেকেই নাগরিকগণ তাদের সকল সেবা সর্বোচ্চ সহানুভূতিতে গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। একজন যদি এক জায়গা থেকে সব ধরনের সেবা নিতে পারে তাহলে তার ভোগান্তি কমবে। সময়ও বাঁচবে। যৌথ-সেবাকেন্দ্র নাগরিকদের দীর্ঘ যন্ত্রণা থেকে রেহাই দিতে সক্ষম হবে। সেটা পেলে সরকারের ওপর মানুষের আস্থা বাড়বে। সরকারের ওপর আস্থা বাড়লে সরকার সুদৃঢ় হবে, শক্তিশালী হবে প্রশাসন, দীর্ঘস্থায়ী হবে সার্বিক উন্নয়ন।

এমন যদি করা যায় আগামী দিনের সরকারের সেবার দরজা সপ্তাহের সাতদিন, দিনে চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকবে এবং তা বছরব্যাপী চলবে। ওয়ানস্টপ সার্ভিসও থাকবে সবার জন্য। এতে কম সময়ে বেশি সেবা পাবে জনগণ।

এখন অনেক জায়গা থেকেই মানুষ জানতে পারছে সরকার তার জন্য কী কী সেবা দিচ্ছে। বিশেষ করে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে এটা অনেক সহজ করা হয়েছে। আগামীতে এটা আরও সহজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভবিষ্যতের সরকারের সেবা সবস্থানেই পাওয়া যাবে। এখন স্মার্টফোনে সব সেবার কথা জানা যায় না। তাই ভবিষ্যতে স্মার্টফোনে সরকারের সেবাসমূহকে স্থানান্তর করতে হবে। তা করা সম্ভব হলে নাগরিকরা তাদের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে স্বচ্ছন্দ্যে এবং স্বল্প সময়ে কম-খরচে সরকারি সেবার হালনাগাদ তথ্য মুহূর্তের মধ্যে জানতে পারবে। সেবা নেওয়াও তাদের জন্য সহজ হবে। এটা সরকারকে জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে। জাতি উপভোগ করতে পারবে পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্য এবং নির্ভয় নিরাপত্তা।

সরকার চেষ্টা করে নতুন নতুন কিছু আবিষ্কার করার। পাটের জন্ম-রহস্যও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। তারা আবিষ্কার করেছেন সাদা-দানার ভুট্টা। বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞান এবং জিনবিজ্ঞান বেশ ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। ধানের জিন-সংক্রান্ত আবিষ্কার আর পাটের জিনোম-সংক্রান্ত আবিষ্কার বিশ্বব্যাপী প্রশংসা লাভ করেছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন কৃষকের জন্য সহজে বহনযোগ্য ও স্বল্পমূল্যের গুটি ইউরিয়া প্রয়োগযন্ত্র বা ‘অ্যাপ্লিকেটর’, ‘ইন্টারন্যাশনাল ফার্টিলাইজার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’ যা আইএফডিসির বাংলাদেশ কার্যালয়ে কর্মরত ড. ওহাব বছর দেড়েক আগে যন্ত্রটি উদ্ভাবন করেন।

আমি মনে করি, ভবিষ্যতের সরকার হবে উদ্ভাবন-ক্ষমতাসম্পন্ন। তারা জনকল্যাণে প্রতিনিয়ত নতুন চিন্তা-চেতনা উপস্থাপন করবে। যেমন ২০০৯-২০১৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সরকারি সেবার মান সহজ ও উন্নত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবস্থা এমনভাবে বিস্তৃত করা হয়েছে যার সেবা পাচ্ছে কোটি কোটি মানুষ।১৭ এটা তাদের জন্য নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছে। এটা আগামী দিনে আরও নিবিড় করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, আমাদের লক্ষ্য এমন এক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে নাগরিকরা নতুন নতুন চিন্তা-ধারণা সহজেই উপস্থাপন করতে পারবে। তাদের সে সব চিন্তা-চেতনা পর্যালোচনা করে কেবল বাস্তবায়নযোগ্য পর্যায়গুলো গ্রহণ করা হবে। এরপর সেগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কেও অবগত হবে। জনগণের সম্মিলিত চিন্তা-চেতনা দেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। এছাড়াও অনেক বাণিজ্যিক ধারণাও বের হবে। দেশের ভবিষ্যতের মূলধন বিনির্মাণে এসব ধারণা কাজে লাগবে। তখন ব্যবসায়-বাণিজ্যেরও প্রসার ঘটবে। সরকারও আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাও জোরদার হবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, জনগণ পাবে তার সুফল।

ভবিষ্যতের সরকার হবে প্রযুক্তিবান্ধব, বুদ্ধিমান ও স্মার্ট। সরকার হবে প্রযুক্তিজ্ঞানে সমৃদ্ধ ও পরিবর্তনশীল। তারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের কাজ সম্পাদনে সক্ষম হবে। এজন্য জনগণের একটি বড় অংশকেও তারা দক্ষ হিসাবে তৈরি করবে। তারা দক্ষ হয়ে উঠবে আধুনিক প্রযুক্তিতে এবং সক্ষম হবে জনগণকে কাক্সিক্ষত সেবা দিতে। এজন্য ভবিষ্যৎ সরকারকে আবশ্যিকভাবে শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে।

ইতোমধ্যে আমরা বহু প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে দিয়েছি। বিগত কয়েক বছর হতে জনগণ তাদের দৈনন্দিন জীবনে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিসহ নানা প্রযুক্তিগত সুবিধা ভোগ করে আসছে। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে, আমরা ভাবতে শুরু করেছি, সরকারি সেবা প্রদানের জন্য সফলতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে।

সরকার হবে জগণের আশা-ভরসা আর ভালবাসার সাগর। সরকার জাতি-ধর্ম-দল নির্বিশেষে সবার প্রতি পূর্ণ দয়া প্রদর্শন করে যাবে। কোনো জনগণের প্রতি বিরূপ হবে না, কঠোরতা দেখাবে না, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। দয়া হবে সরকারের মূলমন্ত্র। তবে কারও প্রতি দয়া যদি বৃহত্তর জনগণের অকল্যাণ ডেকে আনেÑ তখন সে দয়া মহা পাপ হয়ে যায়। এমন কখনও কাম্য নয়, এমন দয়া দেখানই হবে নিষ্ঠুরতা। প্রজাবৃন্দ রাজার কাছে আল্লাহর পবিত্র আমানত। প্রকৃত রাজা কখনও আমানতকে খেয়ানত করে না। যেকোনো পরিস্থিতিতে, জীবন দিয়ে হলেও আমানতের মর্যাদা রক্ষার চেষ্টা করে। তাই রাজাকে বলা হয় প্রজাগণের ত্রাণকর্তা। আমাদের ভবিষ্যতের সরকার সর্বতোভাবে প্রজাদের ত্রাণকর্তারূপে কাজ করবেÑ ভবিষ্যতের সরকারের কাছে এটাই আমার প্রত্যাশা, বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা।

৮. ইতিবাচক ভাবনা সাফল্যের চাবিকাঠি

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমি সবসময় একটা কাজ করি, তা হচ্ছে ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনা। কেউ কেউ আমাকে নেগেটিভ দৃষ্টিতে কোনো কোনো বিষয়কে দেখার জন্য বললেও আমি সেটা দেখি না। আমাকে নিয়ে কত জন কত কথা বানিয়ে বানিয়ে নিজেদের মনের মতো করে লিখেছেন। এখন সবই মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এখন তো তাদের লজ্জায় মুখ দেখাতে পারার কথা নয়। অনেকে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছেন, আমার সম্মানহানি করার চেষ্টা করেছেন। সাময়িকভাবে কিছুটা সফলও হয়েছেন; তাহলেও তো আমার প্রকৃত ক্ষতি তাঁরা করতে পারেননি। অবশেষে এটাই প্রমাণিত হয়েছে এ পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে যত কথা বলেছেন, বদনাম ছড়িয়েছেন, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করেছেনÑ তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাঁরা আমার ক্ষতি করলেও আমি কারও ক্ষতি করিনি। ওপেন চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। কিন্তু তাঁরা আসেননি। কারণ সমস্যা তো তাঁদের ভিতরেই। আমার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলে তাঁদের অনেক গোপন কথাই ফাঁস হয়ে যেত। এই কারণে তাঁরা ভীত ছিলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল কেবল একটা : আমাকে হেয় করা, সরকারকে বিব্রত করা এবং পদ্মা সেতু নির্মাণকে বিলম্বিত করা। এরও উদ্দেশ্য ছিল- আমার ইতিবাচক ভাবনায় তাঁদের ঈর্ষাপরায়নতা। আমি মামলা করতে পারতাম, তাও করিনি। কারণ আমি জানি, সত্য একদিন প্রকাশিত হবেই। এ কারণে আমি সবসময় সবকিছু ইতিবাচকভাবেই দেখি। আর এজন্য আমি ইতিবাচক কার্যকলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করা সবচেয়ে কার্যকর পন্থা বলে মনে করি।

নেতিবাচক লোক ব্লাড ক্যানসারের চেয়েও ভয়াবহ। এটি যেমন ব্যক্তির জন্য সত্য তেমনি সত্য সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও। নেতিবাচক চিন্তার অধিকারী ব্যক্তি আপনার মূল্যবোধকে অবমূল্যায়ন করবে, ভাবমূর্তিকে করে দেবে ধ্বংস।… সুতরাং সবসময় নেতিবাচক চিন্তার অধিকারী লোক, সে যে-ই হোক না কেন, তার থেকে দূরে থাকুন।

আমাদের জীবনকে সামনে এগিয়ে নিতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সফলতা অর্জনের জন্য ইতিবাচক কার্যকলাপের কোনো বিকল্প নেই। আমি মন-খোলার আগে মুখ খুলি না। অন্তরকে সবসময় শান্ত ও ধীরস্থির রাখার চেষ্টা করি, আমার আবেগ প্রকাশ করি- সে যেটাই হোক- হাসি দিয়ে। আবেগ যদি কৃত্রিম হয় তাহলে সেটি হয় মারাত্মক প্রতারণা। ইতঃপূর্বে, আমার লেখা ‘আমার জবাবদিহিতা’ শিরোনামের গ্রন্থে কিছু কিছু বিষয় নথিপত্রসহ তুলে ধরে আমার কর্মকা-ের ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেছি।

আমার বিশ^াস, আমরা অন্তরে যা ধারণ করি, তা আমাদের সকল কাজে-কর্মে, শিক্ষাদীক্ষায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। আমি আরও বিশ^াস করি, ইতিবাচক শক্তি ও আশা-প্রত্যাশা, আমাদের চ্যালেঞ্জ বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করে। অত্যন্ত কঠিন ও জটিল কাজে সফল হতে হলে ইতিবাচক কার্যকলাপের বিকল্প নেই। আমি এ-ও বিশ^াস করি, ইতিবাচক শক্তি বা কার্যকলাপ সংক্রামক ব্যাধির মতো। কেননা ইতিবাচক কার্যকলাপের সফলতা পরবর্তীকালে অন্যান্য কাজের ওপরও প্রভাব ফেলে। একইভাবে আমাদের নিজেদের ইতিবাচক কার্যকলাপ অন্যদের ওপর প্রভাব ফেলে। এ প্রভাব ইতিবাচক বা নেতিবাচক দুইভাবেই হতে পারে। ইতিবাচক চিন্তা করলে মানুষ বাঁচেও বেশিদিন। ইতিবাচক চিন্তা বা হাসি-খুশী মন মানুষকে বেশী দিন বাঁচিয়ে রাখে। ইতিবাচক ও হাসি-খুশী ভাব খোলা মনের ও ভালো হৃদয়ের পরিচায়ক। যে মন খুলে হাসতে পারে না, ইতিবাচক চিন্তা করতে পারে না- সে পৃথিবীর সবচেয়ে অসুখী ব্যক্তি। হাসি-খুশী মন ও ইতিবাচক চিন্তার অধিকারী মানুষ সুস্থ থাকে বেশি। নেতিবাচকতা অসুস্থতার নামান্তর। অসুস্থ ও নেতিবাচক চিন্তা-চেতনা মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়।

নেতিবাচক লোক ব্লাড ক্যানসারের চেয়েও ভয়াবহ। এটি যেমন ব্যক্তির জন্য সত্য তেমনি সত্য সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও। নেতিবাচক চিন্তার অধিকারী ব্যক্তি আপনার মূল্যবোধকে অবমূল্যায়ন করবে, ভাবমূর্তিকে করে দেবে ধ্বংস, আপনাকে উন্মাদের মতো পরিচালিত হতে ইন্ধন যোগাবে, নষ্ট করে দেবে আপনার স্বপ্ন, ভেঙে দেবে সৃজনশীলতাকে, উৎসাহকে করবে বাধাগ্রস্ত, সামর্থকে করে দেবে দুর্বল এবং আপনার মূল্যবান মতামতকে উপহাস করে উড়িয়ে দেবে; এ অবস্থায় আপনার মনোভাবে নেমে আসবে হতাশার কালো মেঘ। সুতরাং সবসময় নেতিবাচক চিন্তার অধিকারী লোক, সে যে-ই হোক না কেন, তার থেকে দূরে থাকুন। নেতিবাচক লোক বা অসৎ লোক সৎ ব্যক্তির কাজের মধ্যে, ইতিবাচক লোকের কাজের মধ্যে কখনো মহৎ উদ্দেশ্য খুঁজে পায় না। সে সব সময় কাজের নেতিবাচক দিক, কাজের অসৎ উদ্দেশ্য ও অসৎ কর্ম দেখতে পায়।

এ সমাজে অনেক মানুষ আছে যারা নেতিবাচক চিন্তা করে। তারা কাজও করে অনেক খারাপ, অনেক ভয়ঙ্কর। সেটার কুফল সে একা ভোগ করে এমন নয়, পুরো পরিবারকে বহন করতে হয়, এমনকি জাতিকেও। আমার দীর্ঘ কর্মময় জীবনে, রাজনীতিক জীবনে অনেক সহকর্মী ও বন্ধুদের দেখেছি যাঁরা নেতিবাচক ধারণার কারণে নেতিবাচক কার্যকলাপে জড়িত হতেন। ওটাতেই তাঁদের আনন্দ। আমি অনেক চেষ্টা করেছি তাঁদের ফেরাতে। কিন্তু আমি তাঁদের বদলাতে পারিনি। কারণ, তাঁরা কোনোকিছুকেই ইতিবাচকভাবে মেনে নিতে পারেন না। এ কারণে সবকিছুই মনে করেন কঠিন। ইতিবাচক ও সৃষ্টিশীল কোনো কাজ যখনই তাঁদের সামনে উত্থাপন করেছি, তখন তাঁরা বলতেন, এটা অসম্ভব ও জটিল একটি কাজ। তাই কাজ করা হতে বিরত থাকতেন, অধিকন্তু নেতিবাচক ধারণার ফলে অন্যকেও সহায়তা করতেন না।

আবার যখনই আমি কোনো কাজের উদ্যোগ গ্রহণ করতাম, তখনই তাঁরা শুধু একটি কথাই বলতেন, এটা করার মতো নয়। এমনকি যদি আমি তাঁদের বলি, সূর্যটি জ্বলজ্বল করছে, তখনও তাঁরা বলত, কই, আমরা তো দেখছি না। তখন আমি তাঁদের বলতাম : বের হয়ে গিয়ে সূর্যের আলো দেখে আসতে। তখন তাঁরা কী উত্তর দিতেন, জানেন? তাঁদের উত্তর মুখস্থ : আমাদের এখন বাইরে যাওয়ার সময় নেই। আমরা খুবই ব্যস্ত এবং খুবই ক্লান্ত। আসলে এটা তাঁদের নেতিবাচক ধারণার প্রতিক্রিয়া, যা তাঁদের ইচ্ছাশক্তিকেও হ্রাস করে দিয়েছে। তাই তাঁদের জানারও আগ্রহ কম। সৃষ্টির আগ্রহ তো ছিলই না। এরকম অনেক মানুষ আছে। আমি দেখেছি, প্রত্যেক ভালো কাজের শুরুতে ‘অসম্ভব’ এসে বাধার সৃষ্টি করে। যারা মূর্খ, যারা অলস- তারা কিছু করবেনা বলে ‘অসম্ভব’ শব্দটি সামনে নিয়ে আসে। এ পৃথিবীতে মানুষের ‘অসম্ভব’ বলে কিছু নেই, থাকতে পারেনা। আমি আমার জীবন থেকে ‘অসম্ভব’ শব্দটি বাদ দিয়েছি- জীবনে সফলতা অর্জন করেছি।

ইতিবাচকতা সফলতার মেরুদ-। ইতিবাচক মনমানসিকতার লোক খুবই আত্মবিশ^াসী হয়। চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে যত বাধাই আসুক না কেন, কেউ তাদের দমাতে পারে না। সেটা যত কষ্টই হোক ইতিবাচক শক্তি তাকে ঠিক যথাসময়ে গন্তব্য স্থানে নিয়ে যায়।

আমার সঙ্গে এ জীবনে অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষের যেমন দেখা হয়েছে, তেমনি গুটিকয়েক নৈরাশ্যবাদী ও নেতিবাচক মনমানসিকতার লোকজনের সঙ্গেও দেখা হয়েছে। এর মধ্যে অনেককেই আমি অভিজ্ঞতা দিয়ে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছি, তাঁরা এখন আগের থেকে অনেক উদ্যমী, আশাবাদী এবং ইতিবাচক ধারণার অধিকারী লোক হিসাবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। কালকিনি-মাদারীপুর সংসদীয় এলাকায় আমার প্রতিষ্ঠিত সাতটি কলেজে ছেলেমেয়েরা পড়ছে। এর মধ্যে কত রকম শিক্ষার্থী আছে, কত ভিন্ন তাদের মানসিকতা- তার ইয়ত্তা নেই। তাদেরও আমি ঠিক পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। অনেকেই এমন হয়েছে যেটা আমার কল্পনারও বাইরে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো জায়গায় বিসিএস-এর টপ র‌্যাঙ্কিঙে থাকা কর্মকর্তাও আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষকতা করছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থী এখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কর্মরত। সেটা কি আমার জন্য কম পাওয়া!

এখন যারা তৈরি হচ্ছে তারা আগামীদিনে আরও বড় বড় পদে চলে যাবে। এটাই আমার শান্তি। এ কলেজগুলো করতে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। অনেকে বিরোধিতা করেছে। তবু আমি হতাশ হইনি, হতাশা আমাকে ভয় পায়। সাফল্য আনার জন্য চেষ্টারও কমতি ছিল না। অনেক বাধাও ছিল, তবে ইতিবাচক ধারণার জন্য আমি সফল হয়েছি। ইতিবাচকতা সফলতার মেরুদ-। ইতোমধ্যে আমার প্রতিষ্ঠিত ‘শেখ হাসিনা একাডেমী অ্যান্ড উইমেন্স বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ যোগ্যতা বিবেচনায় সরকার জাতীয়করণ করেছে।

এটা তো গেল একটা প্রসঙ্গ। আমার পেশাগত জীবনে বহু সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে জীবনে যখন যেখানে থেকেছি সেখানে, সে কাজে, নিজেকে আন্তরিকভাবে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করেছি। জীবনের লক্ষ্য একটাই- যত বাধাই আসুক না কেন এগিয়ে যেতে হবে। একটা জীবন বহমান পানির মতো। বহমান পানির প্রবাহকে পাথরে আটকে রাখা যায় না। এটাকে অবশ্যই হয় বামে নাহয় ডানে যেতেই হবে। সে তার পথ তৈরি করে নেবেই নেবে। এটাই তার চরিত্র ও ধর্ম। পানির প্রবল ¯্রােতকে কখনও আটকানো যাবে না। ঠিক তেমনিভাবে আমিও এগিয়ে গিয়েছি। কথায় বলে, ইতিবাচক মনমানসিকতার লোক খুবই আত্মবিশ^াসী হয়। চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছতে যত বাধাই আসুক না কেন, কেউ তাদের দমাতে পারে না। সেটা যত কষ্টই হোক ইতিবাচক শক্তি তাকে ঠিক যথাসময়ে গন্তব্য স্থানে নিয়ে যায়।

আমি নিজে ইতিবাচক চিন্তায় বিশ্বাস করি। আমার কলেজের ছাত্রছাত্রীদের জন্য পরামর্শ দিই ইতিবাচক চিন্তাধারায় নিজেকে সর্বক্ষণ সমুন্নত রাখতে। তাদেরকে নিজের ক্ষমতার ওপর প্রচ- বিশ^াস ও উচ্চাকাক্সক্ষা নিয়ে দিনের কাজ শুরু করতে হবে। সেটা হলে তা প্রতিফলিত হবে তাদের চেহারায়, হাসিতে, মানুষের সঙ্গে ভাববিনিময়ে এবং প্রতিদিন যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয় সেগুলোতে। এসব বিষয় মোকাবিলায় ব্যক্তির ইতিবাচক মানসিকতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

আপনি কি দেখেননি- সবসময় দেখা যায় একজন প্রচ- আত্মবিশ^াসী মানুষের ভাবভঙ্গিই হয় অন্যরকম। তাঁর চেহারা, হাসি, শারীরিক ভাষা ও কর্মস্পৃহাই বলে দেয় তাঁর সফলতার কথা। আত্মবিশ্বাস তার সর্বক্ষণের সঙ্গী। এর বিপরীত দিকে একজন নেতিবাচক চিন্তাধারার মানুষ নিজেকে সবসময় গুটিয়ে রাখে। প্রকাশ করতে চায় না। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে পারে না। মোকাবিলা করা তো দূরের কথা, কাজ দেখলেই সে ভয় পায়। কাজ থেকে দূরে থাকতে পারলেই যেন তার জয়। এ কারণে সাফল্য আসে না। সঙ্গতকারণে আত্মবিশ্বাসহীন ও নেতিবাচক মননশীলতার অধিকারী মানুষ জীবন থেকে ভালো কোনোকিছু আশা করতে পারে না। যতদিন বেঁচে থাকে হতাশার মধ্যে থাকে, অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়। কিন্তু নিজের ব্যর্থতা দেখে ও শিক্ষা নিয়ে সাফল্যের স্বপ্ন দেখতে পারে না। তাদের জীবনে কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। আছে কেবল পরাজয়ের গ্লানি। চ্যালেঞ্জহীন জীবন ঢেউহীন নদীর মতো নিথর।

একজন মানুষকে আশাবাদী করে তোলে তার ইতিবাচক কার্যকলাপ। ইসলাম ধর্মেও এই কথা বলা আছে: যদি আপনি আশাবাদী হন, তাহলে যা আশা বা অনুসন্ধান করছেন তা খুঁজে পাবেনই পাবেন। পৃথিবীকে যদি আপনি সমস্যাসঙ্কুল, দুর্ভাগ্যময় এবং অমঙ্গলময় হিসাবে দেখেন, তাহলে সেভাবেই আপনার চোখে পৃথিবীটা চিত্রায়িত হবে। অন্যদিকে, যদি আপনি ভাবেন পৃথিবীটা খুবই সুন্দর, এখানে অনেক কিছু করার আছে, সুখ-শান্তি ও আনন্দ আছে, আছে স্বস্তি ও সফলতায় ভরা অবিরাম মাধুরী, তাহলে আপনার পৃথিবী আপনার কাছে সেভাবেই, সুন্দরভাবে ধরা দেবে। পৃথিবীর সবকিছু ভালো আপনাকে সালাম জানাবে। আপনার চিন্তা-চেতনা, চরিত্র এবং কল্পনায় যা ভেবেছেন, এগুলো সৃষ্টি করবে আপনার বাস্তবজগৎ এবং একই সঙ্গে মনোজগৎ। সুতরাং আপনি যেভাবেই চান সেভাবেই আপনার জীবন পরিচালিত হবে। হয় আপনাকে ইতিবাচক চিন্তা-চেতনায়, নাহয় নেতিবাচক কার্যকলাপে বেঁচে থাকতে হবে। এই কারণে অনেকেই নিজের জীবনের পথটা ইতিবাচকভাবেই প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তবে সেখানে ইচ্ছেশক্তি প্রবল না-থাকায় কখনও কখনও তার ছেদ ঘটে। এজন্য ইতিবাচক মনোভাবের সঙ্গে সঙ্গে ইতিবাচক প্রচেষ্টাও আবশ্যক।

ইতিবাচক চিন্তা-চেতনা ও কাজকর্ম যেকোনো মানুষের জীবনের খারাপ ও জটিল সময়কে ক্ষণিকের মধ্যে সুন্দর মুহূর্তে পরিণত করে। পীড়াদায়ক ও কষ্টকর কাজটাকে বাস্তবায়নযোগ্য করে তোলে। কথায় আছে, অসম্ভব বলে পৃথিবীতে কোনো কিছু নেই। আমিও তা বিশ্বাস করি, ধারণ করি এবং লালন করি। তাই এটা মনে রাখতে হবে, ইতিবাচক কার্যকলাপ আপনাকে দেবে একটা সুন্দর ও গঠনমূলক জীবন। সফল হতে প্রেরণা দেবে। মনে আনবে উচ্চাকাক্সক্ষা এবং বাতলে দেবে সঠিক পথ।

আমাকে নিয়ে কারও কারও মনে সংশয় থাকলেও এখন সেটা থাকার কথা নয়। তারপরও, থাকলে বলব: এখনই সেটা কাটিয়ে নিতে। সবার কাছে আমার একটি অনুরোধ ও পরামর্শ : ইতিবাচক শক্তি ও কার্যকলাপের মাধ্যমে নিজেকে শাণিত করুন। অন্যের ক্ষতি করা বা ক্ষতি করার চেষ্টা করা নেতিবাচক মনোভাবের লক্ষণ। এটা হতে দূরে থাকুন। দলের বা কর্মীবাহিনীর মনোবল বাড়াতে ইতিবাচক শক্তিকে ব্যবহার করুন। দলের নেতা ইতিবাচক শক্তিতে বলীয়ান হলে, তা পুরো দলের ওপর প্রভাব ফেলে এবং দলকে করে তোলে আত্মবিশ্বাসী, কার্যকর, সৃজনশীল ও শক্তিশালী। এসব গুণাবলি থাকলে একটি দলের সাফল্য অনিবার্য। কোনো বাধাই তাকে পানির ¯্রােতের মতো আটকে রাখতে পারবে না। প্রকৃতির মতো অজেয় শক্তিতে সে নিজের জায়গা করে নেবেই।

বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমি মনে করি এবং সবারই এটা মনে করা উচিত যে, নিরাশা ও হতাশা দিয়ে নিজের, পরিবারের, সমাজের ও দলের মনোবল ভেঙে না-দেওয়া। তাহলেই বিপদ হবে। একটা বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে- সামরিক বাহিনীর সফলতা শুধু অস্ত্র ও গোলাবারুদের ওপর নির্ভর করে না। তাদের ইতিবাচক চিন্তা-চেতনা ও শক্তিশালী মনোবল হতে পারে বিজয়ের চাবিকাঠি। এ কারণে তারা বড় বড় প্রতিযোগিতায় বিজয়ের মালা ছিনিয়ে নেয়। অন্যদিকে, মনোবলে সামান্য চিড় ধরলেই সর্বনাশ হয়ে যেতে পারে। লড়াই না করে অল্পতেই পরাজয়বরণ করে নিতে হতে পারে। মনে হতে পারে যে, এটা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। কারণ উচ্চ মনোবল বা প্রাণশক্তিতে বলীয়ান লোকজন তাদের নেতার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হয়। তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য সাধিত হয়। পাশাপাশি তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয় না। অন্যদিকে ক্ষীণ মনোবলসম্পন্ন দুর্বল নীতিহীন ব্যক্তিরা ব্যর্থ ও পরাজিত হয়। পরাজয়ের পর নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে চায়। এজন্য তাদের নেতাদের ওপর সকল দোষ-ত্রুটি বিনাদ্বিধায় চাপিয়ে দেয়। এটা করতে তারা একটুও কার্পণ্য করে না।

একজন মানুষের ইতিবাচক শক্তি তার জীবনকে করে তোলে সুন্দর ও অর্থবহ এবং সফলতা লাভের জন্য করে উচ্চাকাক্সক্ষী, উৎসাহী এবং আত্মনিভর্রশীল। সেটা হলেই সফলতা আসবে নিশ্চিত।

মানুষকে আন্দোলনের মধ্যে বেঁচে থাকতে হয়। তাই যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রত্যেকের ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা উচিত। যা হওয়ার তাই হবে এটি যেমন সত্য, যা ঘটবে তা মেনে নিয়ে ইতিবাচক মনোভাবের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসা যায়- এটাও সত্য। বাস্তবতা বিবেচনা করে কর্মিবাহিনীকে আশাবাদী ও ইতিবাচক শক্তিতে গড়ে তুলতে হবে, তাহলে তারা হবে সৃজনশীল এবং মহৎ গুণাবলিসম্পন্ন। আশাবাদী মানুষের মন উদার হয়, দৃঢ়চেতা হয়। সেটাই হবে মানুষের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।

আমি সবসময় হাসিমুখে থাকতে পারি, শান্তিতে থাকতে পারি। কারণ আমি কারও অশান্তি কামনা করি না। আমার শত্রু হোক- সবার কল্যাণ চাই। আমি মনে করি, আমার চারপাশে যারা আছেন, তারা পরিবেশের অংশ হিসাবে আমারও অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি মনে করি, “পৃথিবীতে শত্রু-মিত্র কেহ কারো নয়, ব্যবহারে শত্রু-মিত্র সবাকার হয়”। তাই চারপাশের লোকদের অশান্তিতে রেখে আমার প্রকৃত শান্তি কখনও সম্ভব নয়। এজন্য যারা আমার অশান্তি কামনা করে, আমাকে কষ্ট দেয় কিংবা দিয়েছিল- তাদের সবার শুভ কামনা করি। এটাই আমার শান্তির উৎস।

৯. বিজয়চিহ্ন ‘ঠ’ প্রকাশে ভিন্নতা

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমার একটি ব্যক্তিগত কিন্তু প্রথাবিরোধী হাতের অঙ্গভঙ্গিমূলক বিজয়চিহ্ন আছে, যা আমি প্রকাশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি এবং প্রায়শ এ চিহ্নের মাধ্যমে আমি আনন্দ প্রকাশ করি এবং জনগণকে আমার মনোভাব জানাই। লোকজন আমার কাছে এ অস্বাভাবিক বিজয়চিহ্নের গোপন রহস্য জানতে চান। এ অধ্যায়ে আমি সে সম্পর্কে কিছু বলব। সাধারণত সবাই তর্জনী ও মধ্যমার সমন্বয়ে ইংরেজি শব্দ ‘ভিক্টরি’র প্রথম অক্ষর ‘ঠ’ দেখিয়ে বিজয় প্রকাশ করে। আমার দেখানো বিজয়চিহ্নটি একটু ভিন্নরকম। প্রথাগত দুই আঙুলের ‘ভি’ চিহ্নের পরিবর্তে আমি ‘বিজয়-প্রকাশে’ পাঁচ আঙুল ব্যবহার করি। আমি একসঙ্গে বৃদ্ধাঙুলসহ, তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা ও কনিষ্ঠ আঙুল উত্তোলন করে বিজয়বার্তা দিই। এই পাঁচ আঙুলের অভিবাদন সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব স্টাইল। তবে এটি অর্থবিহীন নয়। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে আমি এ বিজয়চিহ্ন প্রকাশের সমধিক যৌক্তিকতা খুঁজে পেয়েছি।

বিশ^জুড়ে সর্বজনীন চিরাচরিত বিজয়ের চিহ্ন হচ্ছে অনামিকা ও মধ্যমা দিয়ে প্রকাশ করা ইংরেজি ‘ঠ’ চিহ্ন। আমাদের দেশেও একই রকম ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে বিজয়বার্তা জ্ঞাপন করা হয়। আমার ব্যক্তিগত অভিমত, কেন আমরা সবসময় আমাদের সুখ ও আনন্দ অন্যের ভাষায় বা অন্যের চিহ্নে প্রকাশ করব? আমাদের বাঙালিদের রয়েছে ঐতিহ্যময় সভ্যতা, সমৃদ্ধ ভাষা এবং অপরিসীম সৃজনশীলতা। পাঁচটি বিষয়কে ইঙ্গিত করার জন্য বিজয়চিহ্নে আমি পাঁচ আঙুল একসঙ্গে উত্তোলন করি। প্রথমত ঐক্য, দ্বিতীয়ত বিজয়, তৃতীয়ত সুখ, চতুর্থত সমৃদ্ধি এবং পঞ্চমত সাফল্য। এ পাঁচটি বিষয়: ঐক্য, বিজয়, সুখ, সমৃদ্ধি ও সাফল্য অর্জিত হলে একটি জাতির উন্নতি হবেই। আর পাঁচ আঙুল উঠালে একসঙ্গে চারটা ‘ঠ’ হয়। প্রথম ‘ঠ’ জাতীয় বিজয়, দ্বিতীয় ‘ঠ’ সামষ্টিক বিজয়, তৃতীয় ‘ঠ’ ব্যক্তিগত বিজয় এবং চতুর্থ ‘ঠ’ বৈশ্বিক বিজয়। এ চারটি ক্ষেত্রে জয়ী হতে পারলে সে জাতির প্রতিটি মানুষ পরিপূর্ণ সমৃদ্ধি ও স্থায়ী শক্তির অধিকারী হতে সক্ষম হয়।

একজন মানুষ শত বছর হয়তো বাঁচবে না, তবে আমরা মরে গেলেও আমাদের সৃজনশীল কাজগুলো উত্তরাধিকার হিসাবে বেঁচে থাকবে দীর্ঘদিন এবং সেটাই হবে অন্যদের কাছে অনুসরণীয়। অনুসরণীয় কাজই মানুষকে স্মরণীয় করে রাখে।

আমার বিজয়চিহ্ন এখনও কারও কারও কাছে মনে হবে অস্বাভাবিক। সাধারণ প্রতীকী অঙ্গভঙ্গি মনে হতে পারে। তা হলেও তাতে আমাদের রয়েছে স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা। আমাদের যে সমৃদ্ধ ভাষা এবং ঐতিহ্য রয়েছে, তা গর্ব করার মতো বিষয়। অতীতকালে আমাদের বিজয়ের ইতিহাস এবং আমাদের বর্তমানের প্রত্যাশার সোনালি ঝলক। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে নতুন বাংলাদেশের জন্ম বিশ্ব-ইতিহাসের একটি অনন্য মাইলফলক। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা-আন্দোলনও একটি গৌরবময় ইতিহাস। আমরা অনেক কিছুই করেছি যা ব্যতিক্রমী। এ কারণে আমরা যা করি সবই সৃজনশীল হওয়া উচিত। সৃজনশীলতা আমাদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে জাতিসত্তার সংঙ্গে মিশে থাকা উচিত। এই গুণটা থাকা দরকার এবং এই গুণটা থাকলে যেকোনো বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

কয়েক বছর আগের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। পদ্মা সেতুর কথা- যে সেতু নির্মাণ করতে পারলে দেশের জিডিপি বেড়ে যাবে প্রায় এক দশমিক ৫০ ভাগ। আর দক্ষিণাঞ্চলের মানুষেরও ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব যখন আমার ওপর ন্যস্ত হয়, তখন সত্যি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান ও গর্বিত মনে হয়েছে। সারা দেশের মানুষের সঙ্গে এ এলাকার মানুষের যোগাযোগ বাড়বে। সবদিক থেকে ইতিবাচক হবে। সে লক্ষ্যে আমি যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে কাজটা শুরু করি। কিন্তু আমি তা করতে পারিনি, ঈর্ষাপরায়ণ কিছু লোক আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ এনে পদ্মা সেতুর কাজ হতে আমাকে সরে যেতে বাধ্য করেছে। এখন প্রমাণিত হয়েছে, আমি একবিন্দু অন্যায় করিনি।

আমাদের কক্সবাজার পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। এ কক্সবাজারের সমুদ্রতীর ধরে তৈরি করা হয়েছে মেরিন ড্রাইভ। এ মেরিন ড্রাইভ তৈরির অভিজ্ঞতাও কম নয়। তবে আমার ইচ্ছে ছিলÑ এই মেরিন ড্রাইভকে ব্যবহার করে আরও বেশি করে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটানো এবং পর্যটনমুখী বৈচিত্র্যময় ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো। এ নিয়ে কেউ কেউ আমার কাছে প্রস্তাবও দিয়েছেন। এর মধ্যে একটি কোম্পানির কথা মনে পড়ে। তারা নতুন ও অদ্ভুত পরিকল্পনার কথা আমাকে জানায়। তারা পর্যটকদের জন্য সমুদ্রের বুকে অত্যাধুনিক আকর্ষণীয় দ্বীপ, বিলাসবহুল হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করতে চেয়েছিল। বিশ্বের নানা দেশে এমন হোটেল ও পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু এখনও এটা করা সম্ভব হয়নি।

যেকোনো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে সৃজনশীল কিছু তৈরি করা গেলে সেটা এক-একটা অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে। কারণ সৃজনশীলতা জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং জীবনের নিষ্ক্রিয় অংশকে সক্রিয় করে তোলে।

আমাদের বাংলাদেশে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারকে কাজে লাগানো গেলে পর্যটন শিল্পের মাধ্যমেও বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে। আমার প্রস্তাব, যেকোনো মূল্যে এটা আমাদের করতে হবে। এটা করতে পারলে আমাদের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে যাবে। আমাদের সমুদ্রসৈকত পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে নিরাপদ এবং সবচেয়ে সুন্দর। আমাদের উচিত এর মধ্যে এমন কিছু যোগ করা, যাতে আমাদের ঐতিহ্যের ছাপ থাকে। কেননা এটা তো আর আট-দশটা সাধারণ আকৃতির মতো নয়। যাতে আমাদের ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে এবং দ্বীপটি যেন আমাদের সংস্কৃতির সাক্ষ্য দেয় এমন একটা কিছু করা। তবে সেটা সম্ভব হয়নি। আশা করি আগামীতে কেউ-না-কেউ এটি করবে। তখন পর্যটকদের আগমন বেড়ে যাবে কয়েকশ গুণ। বাংলাদেশ হয়ে উঠবে এশিয়ার সুইজারল্যান্ড।

সে স্বপ্ন একদিন বাস্তব হবে, পৃথিবীর বিখ্যাত ও সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিগুলোর মধ্যে অন্যতম হবে কক্সবাজার- যা হবে আমাদের কাছে গৌরবের প্রতীক এবং গর্বের বিষয়। যেকোনো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে সৃজনশীল কিছু তৈরি করা গেলে সেটা অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে। কারণ সৃজনশীলতা জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং জীবনের নিষ্ক্রিয় অংশকে সক্রিয় করে তোলে। শুধু তাই নয়, অন্যান্য স্থাপত্য-নিদর্শনও জীবনকে সক্রিয় করে তোলে।

আশার কথা, সরকার কক্সবাজারকে বিশ্বমানের পর্যটনশহর হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে মাস্টার প্লান গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ মাস্টার প্লান বাস্তবায়ন করা গেলে বিশাল সৃষ্টিকর্ম, যা আকাশ থেকে দৃশ্যমান হবে। এটা হবে আমাদের উচ্চাকাক্সক্ষার প্রতীক, শক্তির প্রতীক এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতীক। কক্সবাজারে অনুপম ও অসাধারণ কৌশলে প্রকাশিত হবে আমাদের সৃজনশীলতা, নতুনত্ব এবং ঐতিহ্য। সেন্ট মার্টিনকে ঘিরেও গড়ে তোলা যেতে পারে এমন কিছু, যা হবে দেশের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। সেখানে আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিল রেখে পর্যটকদের জন্য স্থাপনা তৈরি করা দরকার। তবে যেটাই করা হোক না কেন, তা যেন পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায় সেটি খেয়াল রাখতে হবে।

আমি আমার সহকর্মী, বন্ধু ও পরিচিতজনদের বলি- যদি আপনি ছোট বিষয়ে আপনার সৃজনশীলতাকে অভ্যস্ত করাতে পারেন, তাহলে সৃজনশীলতা বড় আকারে বিমূর্ত হয়ে আপনাকে অনুসরণ করবে। সৃজনশীলতা একটা সহজাত প্রতিভা, যা মানুষের চিন্তাশৈলীতে অবস্থান করে। একটু উদ্দীপনা পেলে তা সুপ্ত অবস্থা ত্যাগ করে বের হয়ে আসে। সৃজনশীলতা জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং জীবনের নিষ্ক্রিয় অংশকে সক্রিয় করে তোলে। মানুষ শত বছর হয়তো বাঁচবে না, তবে আমরা মরে গেলেও আমাদের সৃজনশীল ক্রিয়াকর্ম উত্তরাধিকার হিসাবে বেঁচে থাকবে দীর্ঘদিন।

সৃজনশীলতা এমন একটি প্রত্যয় যা ব্যক্তিবিশেষের প্রতিভা কোথায় লুকিয়ে আছে তা বের করে এবং কাজে লাগায়। সৃজনশীলতা প্রকাশের জন্য সাহস প্রয়োজন। অনেক লোক সৃজনশীল হলেও ভীরুতা তার সৃজনশীলতাকে আজীবন সুপ্ত করে রাখে। কারন, ভীরুতা বা ভয় মানুষকে দমিয়ে রাখে, আদর্শ পথে, সঠিক পথে এবং নিজের সৃজনশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এমন ভয়ের খোলস ছেড়ে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ভয়কে পরিহার করতে হবে। ঐক্য, বিশ্বাস, ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শনের মাধ্যমে নতুনকে গ্রহণ করতে হবে, প্রকাশ করতে হবে। পরিবর্তনকে মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকলে আমাদের বিকাশ অবশ্যই হবে। সুনিশ্চিত হবে বিজয়।

১০. উন্নয়ন ও অগ্রাধিকার

সৈয়দ আবুল হোসেন: একটি সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উন্নয়নের কোন কোন ক্ষেত্রকে প্রাধান্য দেয় সে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া জরুরি। এটা অনেকেই জানেন না। সরকার তিনটি বিষয়ের ওপর বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। তা হলো : ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও দেশপ্রেম। এবার পর্যায়ক্রমে এগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা যায়।

ক্ষমতায়ন

কোনো সরকারের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্যÑ গণতন্ত্রকে সুসংহত করে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা। জনগণের প্রতি সরকারের এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস প্রয়োজন। উভয়ের সমন্বিত প্রয়াসে দেশ ও রাষ্ট্রের কল্যাণ ত্বরান্বিত হয়, কার্যকর হয়। কিন্তু উভয়ের বিশ্বাসের মধ্যে যদি কোনো ফাঁক থাকে তাহলে রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং এ বিষয়টি উভয়ের জন্য আত্মঘাতী হয়ে ওঠে। সুতরাং একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকার এবং জনগণ উভয়কে সর্বতোভাবে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে কাজ করতে হবে।

ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র একটি মৌলিক বিষয়। অগণতান্ত্রিক বিষয়Ñ ক্ষমতায়নের একটি নেতিবাচক দিক। সুতরাং কোনো সরকার যদি অগণতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হয় তাহলে সে সরকার কখনও স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে না। এখানেও জনগণের অংশগ্রহণ একটি প্রধান বিষয় হয়ে দেখা দেয়। জনগণ হচ্ছে গণতন্ত্রের মৌলিক বিষয়। গণতন্ত্র হলো সরকার ও জনগণের পারস্পরিক মর্যাদার এক তীর্থভূমি। যে দেশে গণতন্ত্র নেই, সেদেশে শাস্তি নেই, নিরাপত্তা নেই। গণতন্ত্র ব্যাহত হলে দেশের রাজনীতি থাকে না। মানুষের মৌলিক-মানবিক চাহিদাগুলোও পূরণ হয় না। সংকট দেখা দেয় সর্বত্র। সুতরাং গণতন্ত্রের প্লাটফর্ম তৈরি করতে সরকার ও জনগণ উভয়কে ভাবতে হবে। জনগণ ও সরকারের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে যে কোন পন্থায় অগণতান্ত্রিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়। সঙ্গত কারণে এর পরিণাম হয় ভয়াবহ। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ব্যাহত হয়। তখন জনগণের মৌলিক অধিকার বলতে কিছুই থাকে না। সরকার জেল-জুলুমের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা স্থায়ী করতে মরিয়া হয়ে ওঠে, যা সংবিধানকে অকার্যকর করে দেয় নির্মম সহিংসতায়।

একটি সরকারকে মনে রাখতে হবে, মানবসম্পদ উন্নয়ন তার অন্যতম অগ্রাধিকার। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে তাদের প্রধান ও অন্যতম কাজ হচ্ছে জনগণের ক্ষমতায়ন। আমাদের দেশের নাগরিকরা এ ব্যাপারে যেমন দক্ষ তেমনি উপযুক্ত ও সচেতন। তাদের ওপর আমাদের গভীর আস্থা ও বিশ^াস আছে। তারাই তাদের ভাগ্যের নিয়ন্তা। এ কারণে তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আরও সচেতন হতে হবে। অন্তত ভোটাধিকার প্রয়োগ করার বেলায় এটা তাদের দেখাতে হবে- আগে যেসব সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল তারা জনসাধারণের উন্নয়নের জন্য কতটুকু কী করেছে, দেখতে হবে স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কতটুকু তৎপর ছিল অথবা রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনিয়ম বা দুর্নীতিতে তৎপর ছিল কিনা। এসব বিষয় ভোটাধিকার প্রয়োগের আগে বিশ্লেষণ করতে হবে। তাকে বুঝতে হবে এবং জানতে হবে তার ভোটের মূল্যটুকুই-বা কত। ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের বিকল্প কিছু নেই, গণতন্ত্রের ধারক-বাহকও হচ্ছে জনগণ। সুতরাং একটি সৎ, যোগ্য এবং জনকল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য যে ব্যক্তি বা দল নিয়ে ভবিষ্যতে সরকার গঠিত হবে তাকে তৈরিও কিন্তু জনগণকেই করতে হবে।

শিক্ষা

উন্নয়নের অগ্রাধিকার খাতের মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। বলা যায়, শিক্ষা জাতির অগ্রাধিকার খাতগুলোর শীর্ষে অবস্থানকারী একটি অনিবার্য খাত। আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার শিক্ষাখাতে অনেকগুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এগুলো একটি চলমান প্রক্রিয়া। শিক্ষা বুদ্ধিবৃত্তির মাধ্যম। আর বিদ্যালয় শিক্ষা অর্জন ও চরিত্র গঠনের কারখানা। শিক্ষা প্রকৃত মানুষের জন্ম দেয়। শিক্ষা সুন্দর আলো, সুন্দর ভবিষ্যত এবং আত্মবিশ্বাস দেয়- যা মানুষকে মহিয়ান করে তোলে। সে কারণে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর মধ্যে সব সরকার শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসাবে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এ খাতের উন্নয়নের জন্য ও শিক্ষিত জাতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ব্যাপক সংখ্যক স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এমপিওভুক্তিকরণও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রয়োজনের সঙ্গে দেশের ক্রমবর্ধমান জনগণের জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে বই বিতরণ করা হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে নকল-প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে। গুণগত শিক্ষা ও পাসের হার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। এই শিক্ষিত মানুষরাই আগামীদিনে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। শিক্ষার হার বাড়লে দেশের উন্নয়নের হারও বাড়বে। তবে ভারসাম্য রক্ষার্থে সরকারকে চাকরি ও ব্যবসায়ের সুযোগ সৃষ্টি করে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে। এ অগ্রযাত্রার শামিল হতে হলে উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে সরকারকে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়েবসাইট নির্মাণ, রিসোর্স সেন্টার স্থাপন, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি, কারিগরি শিক্ষার ব্যাপক প্রসার, প্রতিটি বিভাগীয় শহরে গার্লস টেকনিক্যাল স্কুল প্রতিষ্ঠা, মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন আবশ্যক। ইংরেজি ও গণিত শিক্ষার মান বৃদ্ধিকল্পে শিক্ষকের মধ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের প্রবর্তন করতে হবে।

দেশপ্রেম ও সরকার

দেশের জন্য কষ্ট বা সুখ অনুভবের নামই দেশ প্রেম। দেশকেই অন্ধের মত ভালবাসা যায়। তাই দেশের জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। নিজেকে জনগণের কল্যাণে বিলিয়ে দিতে হবে। ব্যক্তি স্বার্থকে জাতির স্বার্থে পরিণত করতে হবে। জাতির উন্নয়ন ও কল্যাণই হবে ব্যক্তির কল্যাণ ও উন্নয়ন। তাই দেশপ্রেম সুনাগরিকের একটি অপরিহার্য বিষয়। যে জাতির দেশপ্রেম যত গভীর সে জাতি তত বেশি আত্মপ্রত্যয়ী এবং সংগ্রামী। বাঙালি জাতির মধ্যে গভীর দেশপ্রেম রয়েছে। এ দেশপ্রেমের কারণে এ জাতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়েছে, যার প্রমাণ ইতিহাসের পাতায় লিখিত আছে। এক্ষেত্রে সরকারের মূল লক্ষ্য একটি এবং তা হচ্ছে- কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকদের শক্তিশালী ও আত্মবিশ^াসী করে গড়ে তোলা। তাই সরকার এবং স্থানীয় সরকার সবার কাছে এখনও কর্মক্ষেত্র তৈরি করা একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত। প্রতিটি সরকারের উচিত উপযুক্ত নাগরিককে যথার্থ কর্মক্ষেত্রে নিয়োগ দেওয়া। শুধু স্বদেশেই নয়, বহির্বিশ্বে জনশক্তি রপ্তানির বাজার সৃষ্টির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি প্রাইভেট সেক্টরের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের এক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। সরকার এবং সব পর্যায়ের জনসাধারণের অংশগ্রহণেই কেবল সফল উন্নয়ন সম্ভব। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন হঠাৎ ঘটে যায় না। লক্ষ্য স্থির করে নিজেদের মধ্যে, সরকার ও জনগণের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন দ্বারাই উন্নয়ন সম্ভব।

আর একটি বিষয় হলো, সব ধরনের পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি চিন্তায় রাখতে হবে। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর ক্ষেত্রে একটি ‘ভিশন’ থাকবে যার নির্দেশনাও থাকবে ভিশন্ রিপোর্টে। সরকারের উদারনীতির মধ্যে দেশপ্রেমের অমিয়ধারা প্রতিফলিত হবে এবং সব শ্রেণির নাগরিক এর সুফল পাবে। বাংলাদেশের মানুষের সাহস, উদ্যম ও কর্মস্পৃহার ব্যাপারে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ওপর সরকারের ও আমাদের প্রচ- আস্থা ও বিশ^াস আছে। তারা পারবে। কেননা তারাই তাদের ভাগ্যের নিয়ন্তা। তারা নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নেবে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত মতে, বর্তমানে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর মাথাপিছু গড় আয় ৫২৮ ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার গড় আয় ১ হাজার ১৭৬ ডলার। ২০১৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৪৬৬ ডলারে উন্নীত হয়েছে। সাফল্য আছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাসেও। বাংলাদেশে এখন এই হার মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ আর দক্ষিণ এশিয়ার গড় ১ দশমিক ৪ শতাংশ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ গড় অনেক বেশি, প্রায় ২.১ শতাংশ। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মানুষের গড়-আয়ু ছিল ৪৬ বছর, এখন তা ৬৯ বছর। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার গড়-আয়ু হচ্ছে ৬৫ বছর।১৮ নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এক হাজার নবজাতকের মধ্যে মারা যায় ৭০ জন, দক্ষিণ এশিয়ায় ৫২, আর বাংলাদেশে ৩৫ জন।১৯ দক্ষিণ এশিয়ায় মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মেয়ে স্কুলে যায় আমাদের দেশে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বাংলাদেশ অনেক বেশি অগ্রসরমাণ আর এটা সম্ভব হয়েছে জনগণের মধ্যে লালিত দেশপ্রেমের সুমহান প্রত্যয়ের কারণে।

১১. ঐক্যবদ্ধ শক্তি সাফল্যের মেরুদ-

সৈয়দ আবুল হোসেন: বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম, যদিও আয়তনের হিসাবে বাংলাদেশ বিশ্বে ৯৪তম। মাত্র ৫৫,৯৭৭ বর্গমাইল আয়তনের এ দেশে বর্তমান জনসংখ্যা ১৫.৫৯ কোটির বেশি। জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা এবং শিক্ষার হার ৬৫ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ ছিল ১১,৯৮,৯২৩ কোটি টাকা (চলতি বাজারমূল্যে) যা ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বৃদ্ধি লাভ করে ১৩,৫০,৯২০ টাকায় উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে জনগণের মাথাপিছু বার্ষিক আয় পূর্ববর্তী বছরের ১,০৪৪ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১,১৯০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে মর্মে সরকারি বিবরণে প্রকাশিত হয়। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৯২,৫১০ টাকা। ২০১৬ সালের প্রথমার্ধে যা ১,৪৬৬ ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ২৬.২০ শতাংশ, অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১১.৯০ শতাংশ, এবং বার্ষিক দারিদ্র্য হ্রাসের হার ১.৫ শতাংশ।২৫ এই উন্নয়নশীল দেশটি দুই দশক যাবৎ বার্ষিক ৫ থেকে ৬.২ শতাংশ হারে আর্থিক প্রবৃদ্ধি অর্জনপূর্বক ‘পরবর্তী একাদশ’ অর্থনীতির দেশসমূহের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।২৬ উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে কাজ করেছে একটি উচ্চাকাক্সক্ষী মধ্যবিত্তশ্রেণির দ্রুত বিকাশ এবং একটি সক্ষম ও সক্রিয় উদ্যোক্তা শ্রেণির নিরলস শ্রম। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সারাবিশ্বে প্রসিদ্ধ। জনশক্তি রপ্তানিও দেশটির অন্যতম আর্থনীতিক হাতিয়ার।

বাংলাদেশ জনভারে ন্যুব্জ কোনো পরমুখাপেক্ষী দেশ নয়। বাংলাদেশ আজ ১৬ কোটি কর্মীবাহিনীর ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে বলীয়ান একটি উদ্ভাসিত জাতি, যার শিকড় পাতালের গভীরে আর মস্তক আকাশের চূড়ায়। আমরা এখন আমাদের নিয়ে একাই এগিয়ে যেতে পারি। পদ্মা সেতু প্রকল্পের মতো বিশাল প্রকল্প নির্মাণেও আমাদের কারও মুখাপেক্ষী থাকতে হয় না। এটি আমাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তি, স্বপ্নমুখর জাতির সামগ্রিক ইচ্ছা আর ঐকান্তিক চেষ্টার প্রতিফলন।

এ একটি পতাকা ও বিজয়ের হাসি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি- আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য। সবার পরিচয়ের ও বিশ^াসের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ‘স্পিরিট’। একই উদ্দেশ্য এবং স্বদেশপ্রেমÑ আমাদের শক্তি, উৎসাহ ও উদ্যম দেয়। প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও সাহসী করে তোলে। জার্মান কবি, দার্শনিক, ইতিহাসবেত্তা ও নাট্যকার জোহান ক্রিস্টোফ ফ্রেডরিক ফন শিলার (ঔড়যধহহ ঈযৎরংঃড়ঢ়য ঋৎরবফৎরপয ঠড়হ ঝপযরষষবৎ)-এর ভাষায় বলা যায় : ঊাবহ ঃযব বিধশ নবপড়সব ংঃৎড়হম যিবহ ঃযবু ধৎব ঁহরঃবফ. আমরা আজ ঐক্যবদ্ধ, আমাদের শক্তি এখন তাই অজেয়।

সমসাময়িক দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে জোটভুক্ত দেশ হিসাবে বাংলাদেশ ছোট হলেও বিভিন্ন দিক থেকেই সবচেয়ে বেশি সফল ও সার্থক। জাতি হিসাবে আমাদের সফলতা ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ পাঠ শিক্ষা দেয় যে, কেউ ইচ্ছা ও পণ করলেই নিজেদেরকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে এবং পৌঁছে যেতে পারে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে আর জাতিকে নিয়ে যেতে পারে বিশ্বমানের অঙ্গনে।

কোনো জোটই উন্নতিলাভ করতে পারবে না, যদি কেবল তা বস্তুগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়। আমরা কোনো সংঘবদ্ধ কোম্পানি নই, বরং আমরা সংঘবদ্ধ মানবসমাজ। আমরা একটি জাতি, যার আছে সুপ্রাচীন ঐতিহ্য এবং অবিনাশী লক্ষ্যে ভরপুর উজ্জ্বল সম্ভাবনা আর স্বপ্নিল ভবিষ্যৎ। আমাদের লক্ষ্য অযুত, রথ নিযুত; সে নিযুত রথে চড়ে আমরা জয় করে নিতে পারি অযুত পথের দিশা। তাই কেউ আমাদের ঠেকাতে পারবে না, কোনোদিক দিয়ে, কোনোভাবে। আমরা জানি ঐক্যের সখ্যে কীভাবে নিজেকে গঠন করে কাক্সিক্ষত সাফল্য ছিনিয়ে আনতে হয়।

জোটের জনগণকে একই ছাতার নিচে নিয়ে আসতে চাইলে অবশ্যই স্বদেশপ্রেম থাকতে হবে। সবার একই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্য, অবশ্যই দলীয় শক্তি হিসাবে কাজ করতে হবে। জোটের এবং জোটের জনগণের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে। আস্থা শক্তির প্রতীক। বিশ্বাস আর কর্মের মাধ্যমে আস্থা পরস্পরকে নিবিড় শক্তিতে রূপান্তরিত করে। জোটের বন্ধন আস্থার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়। পরস্পর সহানুভূতি আর ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে সামষ্টিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিলে আস্থা ইস্পাত-কঠিন ঐক্যে পরিণত হয়।

প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও একাগ্র লক্ষ্যের সমন্বয়ে এই দেশের জনগণ অভিন্ন মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তারা গভীর স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েছে, যা ক্রমাগতভাবে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে একসঙ্গে তাদের পরিচালিত হতে সহায়তা করেছে। আমরা মানুষ প্রায় ১৬ কোটি কিন্তু আমাদের চিন্তা একসূত্রে গ্রথিত, আমাদের বিশ্বাস ঐক্যের অভিন্ন রজ্জুতে সমর্পিত। তাই আমরা প্রায় ১৬ কোটি হয়েও এক : ঙহব পড়ঁহঃৎু, ড়হব পড়হংঃরঃঁঃরড়হ, ড়হব ফবংঃরহু ধহফ ঃযরং রং ড়ঁৎ পড়ঁহঃৎু, ইধহমষধফবংয.

জোটবদ্ধ শক্তিতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপদান কাজ করে। প্রথমত, আমাদের মাটি, দ্বিতীয়ত, আমাদের কর্মীবাহিনী, তৃতীয়ত, পতাকা এবং চতুর্থত, আমাদের সরকার।

শর্তাবলির মধ্যেই রয়েছে এর প্রতীকীবাদ। আমি মনে করি, জোটবদ্ধ শক্তিতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ উপদান কাজ করে। প্রথমত, আমাদের মাটি, দ্বিতীয়ত, আমাদের কর্মীবাহিনী, তৃতীয়ত, পতাকা এবং চতুর্থত, আমাদের সরকার। অন্য কথায়, কর্মীবাহিনী কেবল দেশকে ভালবেসে কাজ করবে, একটি পতাকার নিচে এবং এক নেতৃত্বের অধীনে। যে নেতৃত্ব নিজেকে বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকবে জনকল্যাণে এবং দেশের ও বিশ্বের উন্নয়নে সবসময় সজাগ থাকবে।

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক জোটেও বাংলাদেশ সক্রিয়। বাংলাদেশে সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার-ব্যবস্থা প্রচলিত। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা ও বিমসটেক-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এছাড়া বাংলাদেশ জাতিসংঘ, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, বিশ্ব শুল্ক সংস্থা, কমনওয়েলথ অব নেশনস, উন্নয়নশীল ৮টি দেশ, জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলন, ওআইসি ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থার সক্রিয় সদস্য।

দেশের নেতা, কোম্পানির প্রধান, দলপতি বা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে নেতাসহ সকলের প্রতি আমার আহ্বান, চলুন, আগে মানুষের হৃদয়গুলোকে ঐক্যবদ্ধ করি, তারপর তাদের প্রচেষ্টাসমূহ। আগে শক্তিকে উপলব্ধি করি, তারপর ক্ষেত্রনির্মাণ। তাহলে আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই দেশ ও জাতি হিসাবে শ্রেষ্ঠ আসনে উপনীত হওয়ার গতি আরও দ্রুত হবে, আরও নিবিড় হবে, আমরা দ্রুত কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হব।

১২. পদ্মা সেতু

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমার এলাকার অনেকেই আমাকে অনুরোধ করতেন, আমি যেন বাংলাদেশর সবচেয়ে বড় সেতু ‘পদ্মা সেতু’ তৈরি করি। এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করি। বাংলাদেশের ও বিশ্বের সবচেয়ে বড় জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট পদ্মা সেতু প্রকল্পটি একটি ইতিহাস তৈরি করবে। এ সেতু শুধু একটি নির্মাণ-প্রকল্প নয়। এটি এমন একটি গল্প, যার পেছনে থাকবে হাজার হাজার মানুষের স্বপ্নিল অবদান এবং নিবিড় আগ্রহ। এটা হবে আমাদের জাতির অগ্রগতি ও মর্যাদার অনুপম প্রতীক, যাকে ঘিরে আবর্তিত হবে আমাদের আর্থনীতিক কর্মকা-।

যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালীন পদ্মা সেতুর প্রথম যে ড্রয়িংটি আমি পাই, সেখানে কোনো রেল লাইন ছিল না। আমি এটা পর্যবেক্ষণ করলাম। প্রথম আলোচনাসভাটি তাদের পরিকল্পনার ওপর কোনোপ্রকার মন্তব্য ছাড়া শেষ করলাম। ফলে প্রকল্পের লোকজন বুঝতে সক্ষম হয়েছে, তাঁদের আরও ভালো কিছু করতে হবে। তাঁরা এক মাস পর নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আমার কাছে আসে। সেটাও খুব ভালো ছিল না। সরাসরি না হলেও তাঁদের ইশারা-ইঙ্গিতে এটা বুঝিয়ে দিই। তাঁরাও বুঝতে পারেন।

আমি তাঁদের বলি, মানুষের বানানো সবচেয়ে সুন্দর সেতুর একটি সেতু আমরা নির্মাণ করতে চাই। এর অর্থ হচ্ছে, আমরা এটাকে সবচেয়ে দীর্ঘ, সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে সুন্দর এবং সবচেয়ে কার্যকর একটি বহুমুখী সেতু হিসাবে দেখতে চাই। সেখানে থাকবে সবচেয়ে সুন্দর যাতায়াত-পথ। এর আশপাশে থাকবে বাগান ও ফোয়ারা। উভয় পাশে যাতে পর্যটন-কেন্দ্রিক স্থাপনাও গড়ে তোলা যায়- সেটাও ভাবতে হবে। আমরা এ যাবৎকালের সর্বশ্রেষ্ঠ একটি সেতু নির্মাণ করতে চাই। সুতরাং ড্রয়িংও হতে হবে সুন্দর এবং শ্রেষ্ঠ ও অতুলনীয়।

আগামীদিনে পদ্মা সেতু হলে সেটি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের শহরের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হতে পারে। এ সেতুর নকশার ধরন এমন, যাকে বিশ্বের সবচেয়ে সুরুচিসম্মত সেতু হিসাবে বিবেচনা করা হবে। পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। দ্বিতলবিশিষ্ট এ সেতু নির্মিত হবে কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে। উপর দিয়ে চলবে যানবাহন আর নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে সেতুটি পূর্ণ-উদ্যমে চালু হবে।২০

অঊঈঙগ-এর ডিজাইনে পদ্মা নদীর উপর বহুমুখী আর্থসামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প- পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প যার দৈর্ঘ্য ৬,১৫০ মিটার (২০,১৮০ ফুট), প্রস্থ ২১.১০ মিটার (৬৯.২ ফুট); এর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল ২০১১ খ্রিস্টাব্দে এবং শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছিল ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে। দেশের সার্বিক উন্নয়ন এবং কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনে সেতুটির গুরুত্ব অপরিসীম। সেতুটি হলে দেশের জিডিপি ১.২ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। সেতুটিতে চার লেন-বিশিষ্ট মহাসড়ক এবং নিচে একটি রেললাইন থাকবে। পুরো প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয় ২৯২ কোটি ডলার- যার মধ্যে এডিবির ঋণ সহায়তা ৬১.৫ কোটি ডলার। এছাড়া বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলার, জাইকা ৪১.৫ কোটি ডলার, আইডিবি ১৫.৫ কোটি ডলার, আবুধাবি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ ৩ কোটি ডলার ঋণ-সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল।২১

পরামর্শক নিয়োগে তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগে গত ২৯ জুন, ২০১২ বিশ্বব্যাংকের ১২০ কোটি ডলার ঋণচুক্তি বাতিলের মাধ্যমে পদ্মা সেতুর ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। এ ঋণচুক্তি বাতিল ছিল একটি ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে আমাকে, সরকারকে, দেশের জনগণকে। এটা যে ষড়যন্ত্র ছিল তা পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে। পরে সরকার ঘুরে দাঁড়ায়। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন

শুরু করে। ফলে পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসের প্রথমার্ধের মধ্যে সেতু নির্মাণের কাজ এক-চতুর্থাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আমার ডিজাইন অনুযায়ীই পদ্মা সেতু নির্মিত হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমার দ্বারা শুরু-করা কাজ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এগিয়ে নেওয়ায় সমগ্র দেশ উপকৃত হবে, সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হবে। পদ্মা সেতু হবে বিশ্বের স্থাপত্যশিল্পের অপূর্ব নিদর্শন।

দেশের সর্ববৃহৎ এ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে টেস্ট পাইলিঙের কাজ। সংযোগ-সড়ক নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও প্রকল্প এলাকার উন্নয়নে ৬শ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে ঢাকাসহ দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি সড়কপথে যুক্ত হবে দক্ষিণ জনপদের ১৯টি জেলা।

সাতটি ভাগে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মূল সেতু নির্মাণের দায়িত্বে আছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। চুক্তি অনুযায়ী ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকায় ৪৮ মাসের মধ্যে তাদের কাজ শেষ করার কথা। সে হিসাবে মূল সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে। ৮ হাজার ৭০৭ কোটি টাকায় নদী-শাসনের জন্য চীনের সিনোহাইড্রো কর্পোরেশন লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ নভেম্বর। শুরু হয়েছে নদী-শাসনের কাজ। ১২৯০ কোটি টাকায় বাংলাদেশের আব্দুল মোনেম লিমিটেড ও মালয়েশিয়াভিত্তিক এইচসিএম যৌথভাবে করছে মাওয়া ও জাজিরায় সংযোগ-সড়ক নির্মাণের কাজ। মাওয়ার কাজ ইতোমধ্যে ২২ শতাংশ এবং জাজিরায় ২৯ শতাংশ এগিয়েছে। মূল সেতু ও নদী-শাসন কাজের পরামর্শক হিসাবে রয়েছে কোরিয়ান এক্সপ্রেস ওয়ে। এজন্য ব্যয় হবে ৩৮৩ কোটি টাকা। আর ১৩৩ কোটি টাকায় সংযোগ-সড়ক ও সার্ভিস এলাকার পরামর্শকের কাজ করছে সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন।২২

পদ্মার ওপারে জাজিরা ও শিবচরে চলছে আরও বড় কর্মযজ্ঞ। মূল সেতু যেখানে নামবে সে নাওডোবা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে শুধুই নির্মাণকাজ। ড্রেজিং পাইপে বালু এনে ফেলা হচ্ছে পুরো এলাকায়। সংযোগ-সড়ক, সংযোগ-সেতু, কালভার্ট, সার্ভিস এলাকা ও সেনাক্যাম্প নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে পুরোদমে।

পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের আর্থিক প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়বে। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ইতোমধ্যে ২০০ বিদেশিসহ প্রায় ২ হাজার লোকের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে। কাজ পুরোদমে শুরু হলে প্রত্যক্ষভাবে ২০ থেকে ২৫ হাজার লোকের সম্পৃক্ততা লাগবে, যার মধ্যে ২ হাজার বিদেশি থাকবে। পদ্মা সেতুর দুই তীরে হংকং-এর আদলে শহর গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার।২৩

২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য ২৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে জাতীয় আর্থনীতিক প্রবৃদ্ধিতে গতি-সঞ্চালক ৮টি বৃহৎ প্রকল্পকে (ঋধংঃ ঞৎধপশ চৎড়লবপঃং) দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়নের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরদারিতে আনা হয়েছে। প্রকল্পগুলো হচ্ছে : পদ্মা সেতু প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প, এমআরটি-৬ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ প্রকল্প ও পায়রা সমুদ্রবন্দর প্রকল্প। এসব প্রকল্পের মধ্যে পদ্মা সেতু ও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প দুটি বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদে শেষ হবে।২৪

আমি মনে করি, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে বাংলাদেশ একটি নতুন যুগে প্রবেশ করবে। রাজধানীর সীমানার পরিবৃদ্ধি ঘটবে, ঢাকা হয়ে উঠবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম মনোহর নগরীÑ যার কার্যক্রম বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ বাংলাদেশের জনগণের প্রতীক হয়ে সারাবিশ্বকে বিমোহিত করে দেবে।

পদ্মা সেতু পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং ব্যস্ত সেতু হিসাবে পরিচিত, যা জাতির জন্য বিরাট গৌরবের বিষয়। এটি হবে একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং সচল অর্থনীতির সফল চাবিকাঠি। এটা আমাদের গর্ব ও অহংকারের প্রতীক হয়ে উঠবে। এটা শুধু বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার গৌরবের প্রতীক। পদ্মা সেতু আধুনিক সভ্যতার নিদর্শন হিসাবে গণ্য করা হবে। আমি আশা করি, পদ্মা সেতু নতুন পরিবর্তিত বিশ্বের আশার প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত হবে, যা দেশের উত্তর-দক্ষিণের মিলন ঘটাবে। বর্তমানে বিশ্বে যোগাযোগের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য-সভ্যতার কথা উঠলে এর একটি হবে পদ্মা সেতু। সেখানে মানুষের সৃজনশীলতা শুধু রাজত্ব করবে, সেখানে থাকবে না কোনো ভৌগোলিক সীমানা কিংবা জাতিগত বা ধর্মীয় কোনো প্রতিবন্ধকতা। এ কাজের ভিত্তিমূলে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার সুযোগ- আমার জন্য গর্বের।

মনোমুগ্ধকর পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকৌশলী, হাজার হাজার শ্রমিক, পরামর্শক এবং অন্যান্য খাতের বিশেষজ্ঞগণ। এ সেতু নির্মাণে ব্যবহার করা হবে নতুন নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি, যা আগে কখনও করা হয়নি। এটাই হচ্ছে বাংলাদেশ, যেখানে অনেক মেধাবী মানুষ একত্রিত হয়ে বড় বড় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে। বিশে^র মানচিত্রে বাংলাদেশ নানা কারণেই লক্ষণীয় ও উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর একটি দেশ হিসাবে পরিচিতি পাচ্ছে। একটি প্রতিনিধিত্বশীল দেশ হিসাবে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটি প্রতিবছর তার মর্যাদা ও সমৃদ্ধি বাড়িয়ে চলেছে। তারা নবযুগের এ পৃথিবী সম্পর্কে সচেতন। ভবিষ্যৎ তো তারই জন্য, যে স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে, স্বপ্নের পিছু ছুটতে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের মানুষ এ স্বপ্ন দেখা ও বাস্তবায়নে উপযুক্ত।

পদ্মা সেতু থেকে আমরা প্রত্যক্ষভাবে কোনো অর্থনীতিক সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করি না। বরং পদ্মা সেতু সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিকে উপকৃত করবে। বাংলাদেশের, বিশেষ করে, দক্ষিণাঞ্চলের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ভাবমূর্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করবে। এটা বাংলাদেশের ‘ব্র্যান্ড’ হিসাবে কাজ করবে, ফলে অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে। আমরা সমন্বিত, সুসংহত, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সুপরিচিত সেতুর মালিক হব। সারা বিশ্বের মানুষজন আমাদের এখানে বেড়াতে আসবে।

বিশ্ববাসী ও আমাদের জনগণকে পদ্মা সেতু একটি ম্যাসেজ দিচ্ছে। আমরা বলি, আমরা অনেক কিছু অর্জন করতে পারি। বিভিন্ন শাখায় আমরা সারাবিশে^র মধ্যে এক নম্বর হতে পারি। আমরা পৃথিবী নতুনভাবে সাজাতে পারি। আমরা ইতিহাসে এবং সভ্যতায় কোনো আগন্তুক বা নবজাতক শিশু নই। আমরা তোয়াক্কা করি না, তাদের দিকে তাকাই না, যারা আমাদের এবং আমাদের জনগণের সক্ষমতা, কর্মস্পৃহা, উদ্যম এবং বিশ^াসকে অবজ্ঞা ও অসম্মান করে। এই দুনিয়াকে জানাই, বাংলাদেশ হচ্ছে বিশ^-অর্থনীতির নতুন সত্তা- যা হবে আগামী দিনের পদ্মা সেতুর মতো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। সেতু হিসাবে নয়, মানুষের মিলনমেলার স্থাপত্য-নিদর্শন হিসাবেও এটি চিহ্নিত হবে।

আমি মনে করি, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে বাংলাদেশ একটি নতুন যুগে প্রবেশ করবে। রাজধানীর সীমানার পরিবৃদ্ধি ঘটবে, ঢাকা হয়ে উঠবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম মনোহর নগরীÑ যার কার্যক্রম বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ বাংলাদেশের জনগণের প্রতীক হয়ে সারাবিশ্বকে বিমোহিত করে দেবে।

পদ্মা সেতু পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং ব্যস্ত সেতু হিসাবে পরিচিত, যা জাতির জন্য বিরাট গৌরবের বিষয়। এটি হবে একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং সচল অর্থনীতির সফল চাবিকাঠি। এটা আমাদের গর্ব ও অহংকারের প্রতীক হয়ে উঠবে। এটা শুধু বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার গৌরবের প্রতীক। পদ্মা সেতু আধুনিক সভ্যতার নিদর্শন হিসাবে গণ্য করা হবে। আমি আশা করি, পদ্মা সেতু নতুন পরিবর্তিত বিশ্বের আশার প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত হবে, যা দেশের উত্তর-দক্ষিণের মিলন ঘটাবে। বর্তমানে বিশ্বে যোগাযোগের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য-সভ্যতার কথা উঠলে এর একটি হবে পদ্মা সেতু। সেখানে মানুষের সৃজনশীলতা শুধু রাজত্ব করবে, সেখানে থাকবে না কোনো ভৌগোলিক সীমানা কিংবা জাতিগত বা ধর্মীয় কোনো প্রতিবন্ধকতা। এ কাজের ভিত্তিমূলে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখার সুযোগ- আমার জন্য গর্বের।

মনোমুগ্ধকর পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকৌশলী, হাজার হাজার শ্রমিক, পরামর্শক এবং অন্যান্য খাতের বিশেষজ্ঞগণ। এ সেতু নির্মাণে ব্যবহার করা হবে নতুন নতুন কৌশল ও প্রযুক্তি, যা আগে কখনও করা হয়নি। এটাই হচ্ছে বাংলাদেশ, যেখানে অনেক মেধাবী মানুষ একত্রিত হয়ে বড় বড় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবে। বিশে^র মানচিত্রে বাংলাদেশ নানা কারণেই লক্ষণীয় ও উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর একটি দেশ হিসাবে পরিচিতি পাচ্ছে। একটি প্রতিনিধিত্বশীল দেশ হিসাবে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটি প্রতিবছর তার মর্যাদা ও সমৃদ্ধি বাড়িয়ে চলেছে। তারা নবযুগের এ পৃথিবী সম্পর্কে সচেতন। ভবিষ্যৎ তো তারই জন্য, যে স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে, স্বপ্নের পিছু ছুটতে সাহসের সঙ্গে এগিয়ে যায়। বাংলাদেশের মানুষ এ স্বপ্ন দেখা ও বাস্তবায়নে উপযুক্ত।

পদ্মা সেতু থেকে আমরা প্রত্যক্ষভাবে কোনো অর্থনীতিক সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করি না। বরং পদ্মা সেতু সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিকে উপকৃত করবে। বাংলাদেশের, বিশেষ করে, দক্ষিণাঞ্চলের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ভাবমূর্তি বহুগুণ বৃদ্ধি করবে। এটা বাংলাদেশের ‘ব্র্যান্ড’ হিসাবে কাজ করবে, ফলে অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে। আমরা সমন্বিত, সুসংহত, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সুপরিচিত সেতুর মালিক হব। সারা বিশ্বের মানুষজন আমাদের এখানে বেড়াতে আসবে।

বিশ্ববাসী ও আমাদের জনগণকে পদ্মা সেতু একটি ম্যাসেজ দিচ্ছে। আমরা বলি, আমরা অনেক কিছু অর্জন করতে পারি। বিভিন্ন শাখায় আমরা সারাবিশে^র মধ্যে এক নম্বর হতে পারি। আমরা পৃথিবী নতুনভাবে সাজাতে পারি। আমরা ইতিহাসে এবং সভ্যতায় কোনো আগন্তুক বা নবজাতক শিশু নই। আমরা তোয়াক্কা করি না, তাদের দিকে তাকাই না, যারা আমাদের এবং আমাদের জনগণের সক্ষমতা, কর্মস্পৃহা, উদ্যম এবং বিশ^াসকে অবজ্ঞা ও অসম্মান করে। এই দুনিয়াকে জানাই, বাংলাদেশ হচ্ছে বিশ^-অর্থনীতির নতুন সত্তা- যা হবে আগামী দিনের পদ্মা সেতুর মতো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। সেতু হিসাবে নয়, মানুষের মিলনমেলার স্থাপত্য-নিদর্শন হিসাবেও এটি চিহ্নিত হবে।

আমি মনে করি, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে বাংলাদেশ একটি নতুন যুগে প্রবেশ করবে। রাজধানীর সীমানার পরিবৃদ্ধি ঘটবে, ঢাকা হয়ে উঠবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম মনোহর নগরীÑ যার কার্যক্রম বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ বাংলাদেশের জনগণের প্রতীক হয়ে সারাবিশ্বকে বিমোহিত করে দেবে।

 

১৩. সাফল্যের স্বর্ণদ্বার

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমি সবসময় একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। নিখাদ সাদা চরিত্রের মানুষ। শোভন ও ভালোর বিপরীতে কিছু করতে অভ্যস্থ নই। সাধারণত সবাই যেসব বিষয়ে গা ভাসিয়ে দেয়- সেটা আমি করি না। আমার কোনো বদাভ্যাস নেই। কোনো অসৎসঙ্গ নেই। এই কারণে আমার ওইরকম কোনো ভয় নেই। নেই পিছুটানও। আর এ কারণে সর্বক্ষেত্রে সাফল্য লাভের অদম্য ইচ্ছা ও দৃঢ় প্রত্যয় আমাকে তাড়িত করে। তবে জেদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে অথবা চূড়ান্ত সাফল্য অর্জনের প্রতিবন্ধকতা বা জটিলতা সম্পর্কে যখন আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করেন, তখন উত্তরে আমি বলি- রানার্স আপ বা দ্বিতীয় স্থান অধিকারীকে কেউ মনে রাখে না, স্মরণও করে না। কে বলতে পারবে দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি হিমালয়ের চূড়ায় আরোহণ করেছে? দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি চাঁদে পা রেখেছে? কে বলতে পারবে কোন ব্যক্তি দ্বিতীয় নম্বরে এসেছে? এসবের উত্তর কেউ দিতে পারবে না। কারণ দ্বিতীয় ব্যক্তিকে কেউ মনে রাখে না। সবার নজর থাকে প্রথম স্থান অধিকারীর দিকে। জিগ জিগলারের ভাষায়: ওভ ুড়ঁ ফড়হ’ঃ ংবব ুড়ঁৎংবষভ ধং ধ রিহহবৎ, ঃযবহ ুড়ঁ পধহহড়ঃ ঢ়বৎভড়ৎস ধং ধ রিহহবৎ.২৭

আমরা এখন সফলতার স্বর্ণদ্বারে উপনীত হওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছি এবং লক্ষ্যস্থল আমাদের নিকট থেকে বেশি দূরে নয়। যে নিজে উপলব্ধি করে যে, সে প্রথম স্থান লাভের যোগ্য নয়, তাহলে সে তো শুরুতেই নিজের নিয়তির কাছে হেরে গেল। আমাদের জনগণ এখন সেরা হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশ এখন সেরাদের তালিকায়, বাংলাদেশের জনগণও তাই। এ আমার মুখের কথা নয়। পরিসংখ্যান দিয়ে জাতিসংঘ বলছে, বলছেন অমর্ত্য সেন এবং সারা বিশ্ব। বাংলাদেশ এখন তার জনগণের অদম্য ইচ্ছা আর অধ্যবসায়ের কারণে বিশ্বের যেকোনো দেশের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সকল যোগ্যতায় সমৃদ্ধ।

গত দুই দশকের আর্থনীতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের সূচক বিচারে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন যেকোনো বিবেচনায় স্বকীয়তার প্রেক্ষাপটে নম্বর ওয়ানে। ১৯৯০-এর পর সার্বিক প্রবৃদ্ধিতে উন্নয়নশীল দেশের গড় হারের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। দারিদ্র্যের হার কমে অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। মেয়েদের আর্থনীতিক কর্মকা-ে অবদানের হার দ্রুত বেড়েছে, জনসংখ্যা, গড় আয়ু, শিশুমৃত্যুর হার, মেয়েদের স্কুলে পড়ার হার, সক্ষম দম্পতিদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণের হার ইত্যাদি সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ সমপর্যায়ের উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশ, এমনকি প্রতিবেশী ভারতকেও অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের সাফল্য অনেক বেশি। নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন তাঁর লেখা ‘অ্যান আনসারটেইন গ্লোরি : ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইটস কন্ট্রাডিক্শন্স্’২৮ গ্রন্থে বাংলাদেশ নিয়ে আলাদা একটি অধ্যায় লিখেছেন। সেখানে তিনি যুক্তি ও তথ্যসহ বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের বিবরণ দিয়েছেন।২৯

বিশ্বব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এখন গড় মাথাপিছু আয় ৫২৮ ডলার। আর দক্ষিণ এশিয়ার গড় আয় ১ হাজার ১৭৬ ডলার। ১ হাজার ৪৪ ডলার নিয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে প্রায় ধরে ফেলেছে বাংলাদেশ। সাফল্য আছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারেও। বাংলাদেশে এখন এ হার মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ আর দক্ষিণ এশিয়ার গড় ১ দশমিক ৪ শতাংশ। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ গড় অনেক বেশি, ২ দশমিক ১ শতাংশ। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মানুষের গড়-আয়ু ছিল ৪৬ বছর, এখন তা ৬৯ বছর। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার গড়-আয়ু হচ্ছে ৬৫ বছর। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এক হাজার নবজাতকের মধ্যে মারা যায় ৭০ জন, দক্ষিণ এশিয়ায় ৫২, আর বাংলাদেশে ৩৫ জন। মেয়েরা সবচেয়ে বেশি স্কুলে যায় বাংলাদেশে।৩০

বাংলাদেশের কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরব কোনো অংশেই কম নয়। আমাদের ঐতিহ্য শুধু সহ¯্র বছরের পুরনো নয়, এটি মানুষের চেতনা আর উৎসের গভীরে গ্রথিত বিশ্ব-ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছিন্ন অংশ। বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তাই বাঙালি জাতির সত্তাকে একাকার করে দিয়েছে প্রকৃতির সাথে- তাদের মনে ও মননে। এসব দিক থেকেও বাংলাদেশ সেরাদের একটি।

আমাদের প্রত্যেকের উচিত সেরা হওয়ার জন্য সেরা নীতি প্রণয়ন করা, সেরাদের ন্যায় সেরা কর্মকা-ে নিয়োজিত হওয়া। আমরা শ্রেষ্ঠ আসনে আসীন হওয়ার লক্ষ্যে অদম্য অধ্যবসায় নিয়ে সবার সঙ্গে এগিয়ে যেতে চাই। এটা আমাদের নতুন চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য নয়, আমি এটা আমার পরিবার এবং আমাদের জাতির সম্মিলিত প্রয়াসের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। আমার মা-বাবা আমাকে ছোটবেলা হতে শিক্ষা দিয়েছেন কীভাবে বড় হতে হয়, কীভাবে সেরা ও ব্যতিক্রমী থাকার জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখতে হয়। তাঁরা আমাকে শিখিয়েছেন কারও সঙ্গে প্রতারণা করে নয়, বরং যোগ্যতা দিয়ে অন্যকে হারিয়ে নিজের আসন প্রতিষ্ঠা করাতেই আনন্দ। এটাই মহত্ত্ব আর গৌরবজনক অধ্যায়। যারা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ষড়যন্ত্র করে, অন্যকে ঠকায়, তারা তো ঠগই।

আমরা অনেক কিছুতেই শ্রেষ্ঠ। জ¦লন্ত উদাহরণ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সারা বিশ্বে আমরাই একমাত্র জাতি, যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। আমরা জীবনের বিনিময়ে মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জন করেছি। আমাদের ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো।৩১ এটি সামান্য বিষয় নয়।

আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিক দলের নেতা-নেত্রীরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন এবং তৎসঙ্গে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে উপস্থাপন করার কারণে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের উৎসভূমি হিসাবে বাংলাদেশ পরিচিতি লাভ করেছে। এ বিষয়টি জানানোর জন্য এখন বিশ্বের অনেক দেশেই শহিদ মিনার তৈরি করার জন্য সরকার জায়গা দিচ্ছে। ভাষার জন্য একটি দেশের মানুষ কী করতে পারে সে উদাহরণ দিয়ে তাঁরাও তাঁদের জনগণকে উজ্জীবিত ও উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। এর ফলে, আজ বাংলাদেশের মাতৃভাষা দিবস অনেক দেশের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে গড়ে উঠছে বিভিন্ন গবেষণাকেন্দ্র।

বাংলাদেশের কৃষ্টি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরব কোনো অংশেই কম নয়। আমাদের ঐতিহ্য শুধু সহ¯্র বছরের পুরনো নয়, এটি মানুষের চেতনা আর উৎসের গভীরে শিহরিত বিশ্ব-ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছিন্ন অংশ। বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তাই বাঙালি জাতির সত্তাকে একাকার করে দিয়েছে প্রকৃতির সাথে- তাদের মন ও মননে। এসব দিক থেকেও বাংলাদেশ সেরাদের একটি। বিশে^র সংস্কৃতির শহরও বলা যায় ঢাকাকে। এখানে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিভিন্ন জাদুঘর নির্মাণ, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং অনেক কিছুরই সুন্দর শিল্পকর্মের সমাহার। এমন মহান কর্মযজ্ঞের কারণে বাংলাদেশকে সেরা বলা যেতেই পারে। আমাদের জন্য সেরা হওয়ার বিকল্প কোনো কিছু নেই। শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করতে হলে সে যোগ্যতা থাকতে হবে, থাকতে হবে যথার্থ অনুশীলন আর ঐকান্তিক সাধনা।

এর ব্যাখ্যায় আমি বলব, যদি কেউ ১ কিলোমিটার দৌড়াতে চান, সেটা সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করার পর তিনি খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। এটাই বাস্তব। ধরুন, আবার একই ব্যক্তি যদি ১০ কিলোমিটার দৌড়াবার ইচ্ছা করলেন এবং তা শুরুও করলেন, এবার আর প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় কিলোমিটার দৌড়ানোর পরও তিনি ক্লান্ত হবেন না। কেননা এবার তার লক্ষ্য এক, দুই বা তিন কিলোমিটার নয়, দশ কিলোমিটার। তাই তার ক্লান্ত হয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। সাফল্য ও বিজয় অর্জন করতে হলে দৃঢ়সঙ্কল্প ও শক্তি রাখতে হবে লক্ষ্যের সমানুপাতিক। সুতরাং প্রথম স্থান অর্জনের সংকল্প করতে হবে।

প্রথম স্থান অর্জনের বাইরে অন্য কোনো স্থান লাভের চেষ্টাও করা কারও পক্ষে সমীচীন হবে না। তখন সেরাটাই আপনার অনিবার্য প্রাপ্য হয়ে উঠবে, যদি কেউ দৃঢ়সঙ্কল্পে আবদ্ধ থাকেন। নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে কারও কখনও কোনো সময় সন্দিহান থাকলে হবে না, কখনও নিজের ক্ষমতার অবমূল্যায়ন করা মানে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়া। নিজেকে কখনো অপরের চেয়ে ছোট মনে করা ঠিক নয়। আত্মবিশ্বাস, আত্মজ্ঞান ও আত্মনিয়ন্ত্রন- এ তিনটি বিষয় মানুষকে বড় করে তোলে এবং আত্মবিশ্বাসই মানুষের বড় হওয়ার মূলমন্ত্র। আত্মবিশ্বাস লক্ষ্যবস্তু থেকে মনকে বিচ্যুত করবেন না। শ্রেষ্ঠ হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যান এবং আপনি আপনাকে মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করে তুলুন। সফলতা অবশ্যম্ভাবী।

বর্তমানে বাংলাদেশ যেসব ক্ষেত্রে সেরা হতে চাইছে সেগুলো হলো : অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন, জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, নাগরিকদের সুখ ও সন্তুষ্টি, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, নিরাপত্তা, ব্যবসা, ট্যুরিজম বা ভ্রমণব্যবস্থা এবং অন্যান্য আরও অনেক ক্ষেত্রেই প্রথম স্থানে আছে বাংলাদেশ। সব ক্ষেত্রে সারা বিশে^র মধ্যে শ্রেষ্ঠ হওয়ার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা চলতেই থাকবে। আমরা জাতি হিসাবে প্রথম স্থান ব্যতীত অন্যকিছু নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাই না। আমাদের প্রচুর দক্ষ জনশক্তি আছে, তাদের আছে অদম্য স্পৃহা। অতএব, সেরা হওয়া আমাদের শুধু সময়ের ব্যাপার। গত ২১ জুন, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ বিশ্বক্রিকেটের অন্যতম শক্তি ভারতকে হারিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে বিজয় অর্জন করেছে। এটি আমাদের সেরা হওয়ার যোগ্যতার একটি অন্যতম নিয়ামক।

একতার চেয়ে বড় শক্তি আর নেই। ঐক্যবদ্ধ হলে অনেক কঠিন কাজ সহজ হয়ে যায়, আবার বিভক্তি অনেক সহজ কাজকেও কঠিন করে দেয়। কেউ এককভাবে কিছু করতে চাইলে সফলতা না-ও আসতে পারে। তবে সম্মিলিত প্রয়াস কখনও ব্যর্থ হয় না। ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে পারলে আমরাও ব্যর্থ হব না। আমরা জিতবইÑ ইনাশাআল্লাহ।

১৪. নারীর ক্ষমতায়ন ও বাংলাদেশ

সৈয়দ আবুল হোসেন: নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। সময় এসেছে নারীকে আরও এগিয়ে নেওয়ার। এ বিষয়টা মাথায় রেখেই আমাদের এগোতে হবে। কেউ যদি মনে করেন নারীকে অবহেলিত রেখেই সমাজের ও দেশের উন্নয়ন সম্ভবÑ সেটা কখনও চিন্তা করাও উচিত হবে না। কারণ পুরুষের সাফল্যের পেছনেও রয়েছে নারীর অবদান। তাই এই নারীসমাজকে এখন আর পেছনে থেকে সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজে না লাগিয়ে তাদেরকেও সামনের দিকে নিয়ে এসে সরাসরি কাজে লাগাতে হবে। সম্মানের আসনে জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে। কোনো নারী যাতে নির্যাতিত না হয়Ñ সেটা দেখতে হবে। নারীর সহযোগিতা ছাড়া কোনো জাতি যোগ্য নাগরিক পায় না। তাই নারীর ক্ষমতায়ন মানেই জাতির ক্ষমতায়ন। পবিত্র কোরানে আল্লাহ্ বলেছেন : নারীদের রয়েছে বিধি মোতাবেক অধিকার। যেমন আছে তাদের ওপর (পুরুষদের) অধিকার। [সূরা আল-বাকারা ২(২২৮)]

আমাদের দেশের প্রথম ও দ্বিতীয় বৃহত্তম দলের প্রধান নারী। প্রধানমন্ত্রীও নারী। বিরোধীদলের নেতাও নারী। অপর একটি বড় রাজনীতিক দলের প্রধানও নারী। তিনিও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলের নেত্রী ছিলেন। স্পিকারও নারী। বাকি আছে একজন নারী প্রেসিডেন্ট করার। সেটাও হয়তো যেকোনো সময় হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের শীর্ষ-পর্যায়ে নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এখন সচিব, বিচারপতিও নারী আছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সেক্টরে নারীরা ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছেন। সেনাবাহিনী ও পুলিশেও নারীরা ভালো করছেন। একটা সময় এ অবস্থা ছিল না। অনেক কষ্ট করেই আমাদের এখানে আসতে হয়েছে। আমাদের সমাজের নারীর ক্ষমতায়নের ব্যাপারে অনেকেই বিস্মিত হয়। এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি কৌতূহলী জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হতে হয় বিদেশে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়নে এবং নারীর যথাযথ মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। অতীতের কোনো সরকার বাংলাদেশের রাজনীতিক ইতিহাসে ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিক ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নে এবং নারীর মূল্যায়নে এমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। শেখ হাসিনা যতবার ক্ষমতায় এসেছেন নারীর ক্ষমতায়নে নতুন নতুন পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়িয়েছেন। এর পরের বার কেবিনেট এবং একসময় স্পিকার হিসেবে নারীর যোগ্যতার প্রমাণ তুলে ধরলেন। নারীর ক্ষমতায়নে অবদান রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘গ্ল্যামার’-এর বিচারে বর্ষসেরা নারী মনোনীত হয়েছেনÑ শেখ হাসিনা।

২০০৯ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতা গ্রহণের পর শেখ হাসিনার সরকার নারী উন্নয়নের জন্য নানাবিধ কর্মসূচি ও প্রকল্প গ্রহণ শুরু করেন। বাংলাদেশ সরকারের ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১১-২০১৫), যেখানে জাতীয়, মাঝারি পর্যায়ের উন্নয়ন-পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে ২০২১ সাল (ভিশন ২০২১ নামেও পরিচিত) নাগাদ একটি মধ্য আয়ের রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তোলায় অঙ্গীকারবদ্ধ, নারীকে রাজনীতিক ও আর্থনীতিক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করাকে নারীর ক্ষমতায়নের প্রধানতম চালিকাশক্তি হিসাবে বিবেচনায় আনা হয়েছে। শেখ হাসিনা নারীর কার্যকর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তন্মধ্যে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উদ্যোগ, মাতৃত্ব ও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১, নারীর প্রতি সহিংসতা দমন, অকাল এবং বাল্যবিবাহের সমাপ্তি, রাজনীতি, প্রশাসন এবং নিরাপত্তায় প্রভৃতিতে নারীরা উল্লেখযোগ্য।

আমি মনে করি, আমরা ইতোমধ্যে নারীর ক্ষমতায়নের কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে ফেলেছি। আমরা আমাদের সমাজকে ক্ষমতায়ন করেছি, আর এ সমাজের মাধ্যমে নারীরাও ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েছে। আমাদের শক্তিশালী অর্থনীতিতে নারীদের ভূমিকা রয়েছে। আমরা সরকারি কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি করছি, যেখানে নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছে। আমরা নারীদের নির্দেশনায় বহু প্রকল্পও আরম্ভ করেছি। আমাদের অবকাঠামো, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা কার্যক্রমের উন্নয়নে নারীদের ভূমিকা রয়েছে, এমনকি আমাদের সামরিক বাহিনীতেও নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে, পোশাকশিল্পে নারীদের অবদান অপরিসীম।

নারীরা তাদের নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের দেশ গঠন করছে এবং বলিষ্ঠ ও শিক্ষিত এক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলছে, যাঁরা দেশকে ভালবাসেন, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে জানেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়া এবং নির্মাণকাজ চালিয়ে নিতে পারেন, সর্বোপরি, সহায়তা দিচ্ছেন একটি শিক্ষিত প্রজন্ম গঠনে।

লিঙ্গ-সমতা স্থাপনের অন্যতম নিয়ামক রাজনীতিক ক্ষমতায় নারী-পুরুষের আনুপাতিক অবস্থান। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে সৃষ্টি করেছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বিশ্ব আর্থনীতিক ফোরাম প্রকাশিত গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৩ অনুযায়ী, ১৩৬টি দেশের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য নিরসনে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৫তম, যা ১০ বছরে এগিয়েছে ১১ ধাপ। অন্যদিকে শুধু রাজনীতিক ক্ষমতায়নে নারীর অংশগ্রহণের বিষয় বিবেচনায় বাংলাদেশের স্থান পৃথিবীর মধ্যে অষ্টম। যা ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দ থেকে পর্যায়ক্রমিকভাবে দুই নেত্রীর রাজনীতিক ক্ষমতায় থাকা এবং সংসদে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০ শতাংশে পৌঁছানোর কারণে সম্ভব হয়েছে।৩২

অবশ্যই সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে, নারীরা তাদের নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের দেশ গঠন করছে এবং বলিষ্ঠ ও শিক্ষিত এক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলছে, যাঁরা দেশকে ভালবাসেন, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে জানেন, উন্নয়ন প্রক্রিয়া এবং নির্মাণকাজ চালিয়ে নিতে পারেন, সর্বোপরি, সহায়তা দিচ্ছেন একটি শিক্ষিত প্রজন্ম গঠনে।

আমি আগেও বলেছি, নারীরা হচ্ছে দেশের আত্মা ও শক্তি। এর অর্থ হচ্ছে, একজন নারীর রয়েছে আবেগময় বোধশক্তি, দয়ালু হৃদয়, উদার মন, প্রবল উচ্চাকাক্সক্ষা এবং দূরদর্শী মূল্যবোধ। বাংলাদেশের নারীরা দেশের জীবন-যাপন পদ্ধতিতে অভ্যস্ত এবং তারা আমাদের সমাজের মূল সংস্কৃতিকে ধারণ করে, যা অনেক মানুষ চিন্তাও করতে পারে না। মা-বোন ছাড়া কোনো ব্যক্তি কি বাঁচতে পারে? মেয়ে অথবা স্ত্রীর স্নেহ-মমতা ছাড়া কোনো ঘর কি চিন্তা করা যায়? নারী ছাড়া কোনো সমাজ কি এগিয়ে যেতে পারে? সম্ভব নয়।

আর্থিক সমৃদ্ধায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতিতে নারীদের কী ভূমিকা তা অনুধাবনের জন্য অমর্ত্য সেনের একটি উক্তি প্রণিধানযোগ্য। অর্মত্য সেনের মতে, নানা আর্থসামাজিক ও রাজনীতিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, বাংলাদেশের পক্ষে অভাবনীয় আর্থিক সমৃদ্ধি, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে মূলত নারীর ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির জন্য। ‘অ্যান আনসার্টেন গ্লোরি, ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইটস কনট্রাডিকশন্স’ (২০১৩) প্রবন্ধে অমর্ত্য সেন বলেছেন, “বাংলাদেশের বেগবান নারী-আন্দোলন, সক্রিয় এনজিও-কার্যক্রম ও বেইজিং-পরবর্তী বিশ্ব-নারী-উন্নয়ন এজেন্ডার প্রভাবে নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশ সরকারের নারী উন্নয়ন নীতি ও তা বাস্তবায়নের কার্যকর কৌশলের লক্ষ্যে যে ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে, তার মাধ্যমে বাংলার নারীজীবনে এক নীরব বিপ্লবের সূচনা ঘটে, যাকে বিশ্বব্যাংক আখ্যা দিয়েছে ‘হুইসপার টু ভয়েসেস’ (২০০৮)।”৩৩

সুতরাং এটি সহজে অনুমেয় যে, নারীরা আমাদের সমাজের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেদের আসন ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে। আজ আমরা যে অবস্থানে আছি, এ অবস্থানে কখনও আসতে পারতাম না, যদি না-থাকত নারীদের অবদান। আমাদের আত্মবিশ^াসী, উচ্চাকাক্সক্ষী এবং বিশ^াসী মা-বোনদের অনেক অবদান রয়েছে বাংলাদেশের এ অবস্থানে আসার পেছনে। আমাদের বোনেরা দৃঢ়চেতা, কাজের প্রতি নিষ্ঠাবতী, উন্নয়নের জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং চ্যালেঞ্জ নিতে অভ্যস্ত। মহান স্বাধীনতাযুদ্ধেও আমাদের নারীদের অবদান ছিল অবিস্মরণীয়।

আমি সবিনয়ে বলতে চাই, হে পুরুষ, একটু বিবেচনা করুন, নারীরা আমাদের সমাজের অর্ধেক। অযথা তাদের পেছনে লাগলে আপনাকে নেতৃত্বের পদ থেকে বঞ্চিত হতে হবে। কারণ, নারী আপনার ঘর এবং সন্তানের সবচেয়ে নিকটে অবস্থানকারী একটি অনিবার্য গোষ্ঠী।

বাংলাদেশের নারীদের সক্ষমতার ওপর আমার দৃঢ় আস্থা ও বিশ^াস আছে। তাদের কৃতিত্ব ও সাফল্য তাদের পক্ষ হয়ে কথা বলে এবং সকল সন্দেহ, সংশয় এবং অবিশ^াস দূর করে দেয়। নারীর ক্ষমতায়ন সরকার সব ক্ষেত্রেই করতে চায়। আসলে না করে উপায় নেই। সরকার মনে করে, দেশের প্রতিটি কোম্পানির এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডে নারী-সদস্য রাখা আবশ্যক। অতএব আমি সবিনয়ে বলতে চাই, হে পুরুষ, একটু বিবেচনা করুন, নারীরা আমাদের সমাজের অর্ধেক। অযথা তাদের পেছনে লাগলে আপনাকে নেতৃত্বের পদ থেকে বঞ্চিত হতে হবে। কারণ, নারী আপনার ঘর এবং সন্তানের সবচেয়ে নিকটে অবস্থানকারী একটি অনিবার্য গোষ্ঠী।

নারীর ক্ষমতায়ন সম্পর্কে লোকজন আমাকে জিজ্ঞেস করে। উত্তরে আমি বলি, প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্ধেক সদস্য হবে নারী। কোম্পানিগুলোর অর্ধেক গ্রাহক হচ্ছে নারী এবং ঠিক তেমনিভাবে সরকারি সংস্থার নিয়ম-নীতির অর্ধেক প্রভাব পড়ে নারীদের ওপর। তা হলে, এটা কি ন্যায়বিচার? আমরা পুরুষরা অর্ধেক জনগোষ্ঠী হয়ে পুরো জনগোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব! এটি যথার্থ হবে না। সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণ যত নিবিড় হবে উন্নয়নও হবে তত টেকসই ও বিস্তৃত। সারাবিশ্ব এখন নারীদের ক্ষমতায়নের সুফল ভোগ করছে। অনেক নারী এখন বিশ্ব-নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এ প্রসঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ছাড়াও মালালা, অ্যাঞ্জেলা মার্কেল, হিলারি ক্লিনটন, মিশেল ওবামা, সোনিয়া গান্ধী, অং সান সুচি, ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ, দিলমা রুসেফ, অফরাহ উইনফে, শেরি স্যান্ডবার্গ ও ইন্দ্রা নুয়ি ছাড়া আরও অনেক প্রভাবশালী নারীর কথা বলা যায়।

আমরা আধুনিক ও প্রাচীন ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, মায়ের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বিখ্যাত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন বহু মানুষ এবং বহু নারী নিজের কৃতিত্বে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ আছেন। নারীদের বহু অবদান আছে বদান্যতায়, মহত্ত্বে এবং দানশীলতায়। মনে পড়ে আমার বেগম রোকেয়ার কথা। ’৪৭-পরবর্তী সময়ে বাংলার নারী-জাগরণের সূচনায় যাঁদের অনবদ্য অবদান সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করতে হয় তাঁদের মধ্যে সুফিয়া কামাল, নূরজাহান বেগম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তাঁরা সম-অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মাধ্যমে এনজিও-ভিত্তিক নারী-আন্দোলনের বিশাল ক্ষেত্র উন্মোচিত করে দিয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে বিশ্ব-নেত্রীবর্গের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধী, মাদার তেরেসা, রানি ভিক্টোরিয়া, জোয়ান অব আর্ক, অ্যান ফ্রাংক, মার্গারেট থ্যাচারসহ আরও অনেকের কথা বলা যায়।

বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম পর্যায় ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণের চেষ্টা। আশির দশকে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীরা চরম দারিদ্র্য মোকাবিলা করে উপার্জনের পথ খুঁজে পায়। পরবর্তী সময়ে ব্র্যাক ও অন্যান্য এনজিও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে শুরু করে। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ২৬ মিলিয়নের মতো দরিদ্র মানুষ উন্নয়নের পথ খুঁজে পায়।৩৪ এ ঋণগ্রহীতাদের ৯৭ শতাংশের অধিক নারী, যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ২০১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে দারিদ্র্য হ্রাসের বার্ষিক হার ১ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অপুষ্টি দূর করে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, শ্রীলঙ্কাসহ সব দেশকে পেছনে ফেলে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গত কারণে বাংলাদেশের আর্থিক সমৃদ্ধিতে জাতি বহুলাংশে নারীদের কাছে ঋণী।৩৫

আমরা ইতোমধ্যে নারীর ক্ষমতায়নের কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে ফেলেছি। আমরা আমাদের সমাজকে ক্ষমতায়ন করেছি, আর এই সমাজের মাধ্যমে নারীরাও ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়েছে। আজকের মহিয়সী ও সফল নারীরাই আগামী দিনের নারীদের এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগাবে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে নারীশিক্ষার অকল্পনীয় অগ্রগতি, প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা-স্থাপন এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অধিক অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতায় নারীর প্রজনন-হার অর্ধেকের বেশি হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে শিশুমৃত্যু-হার ৭২ শতাংশ নেমে এসেছে। এ সাফল্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু অনুকরণীয় দৃষ্টান্তই স্থাপন করেনি, বরং সহ¯্রাব্দ-উন্নয়ন-লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে প্রথম স্থান অধিকার করে জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভ করেছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিবেদন (২০১১) অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীশিক্ষার হার (১৫ থেকে ২৪ বছর) ৭৮ শতাংশ, যার বিপরীতে পুরুষের শিক্ষার হার ৭৫ শতাংশ। এটি বিশ্বে একটি অন্যতম অর্জন।৩৬

বৃষ্টি সম্পর্কে বলা হয়, বৃষ্টি যেখানেই পড়ে সেখানে প্রাচুর্য সৃষ্টি করে। বৃষ্টি স্নেহ ও মায়া-মমতার প্রতীক। এমন বোধ আমরা নারীতে দেখতে পাই। আমাদের একটা বিষয় মনে রাখা উচিত- “ডযবৎবাবৎ ুড়ঁ ভরহফ ধ মৎবধঃ সধহ, ুড়ঁ রিষষ ভরহফ ধ মৎবধঃ সড়ঃযবৎ ড়ৎ ধ মৎবধঃ রিভব ংঃধহফরহম নবযরহফ যরস- ড়ৎ ংড় ঃযবু ঁংবফ ঃড় ংধু. ওঃ ড়িঁষফ নব রহঃবৎবংঃরহম ঃড় শহড়ি যড়ি সধহু মৎবধঃ ড়িসবহ যধাব যধফ মৎবধঃ ভধঃযবৎং ধহফ যঁংনধহফং নবযরহফ ঃযবস.” ৩৭

আমাদের দায়িত্ব নারীদেরকে নিরাপদ কাজের পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া, যাতে তারা তাদের সর্বোচ্চ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারে। অন্যকথায়, বৃষ্টির পানিতে ভালো ফসল ফলাতে হলে অবশ্যই মাটির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে কাজের এমন পরিবেশ তৈরি করা, যাতে নারীরা ইজ্জত, সম্ভ্রম ও নারীত্ব বজায়ে রেখে তাদের সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারে। মেধার মূল্যায়ন, সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এবং তাদের জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ করার জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

এরকম পরিবেশ দিতে পারলে, আমি বিশ^াস করি যে, নারীরা সবকিছুই করতে সক্ষম হবে। এটা অলৌকিক কিছু নয়- এটাই বাস্তবতা। নারীরা সাধারণত কাজকর্ম ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি প্রফেশনাল, তাই কোনো কাজে তারা যত আন্তরিক পুরুষেরা তত আন্তরিক হতে পারে না। তাদের এ অন্তর্নিহিত ক্ষমতাকে আমাদের কাজে লাগাতে হবে।

১৫. অধ্যয়ন, লেখালেখি ও নেতৃত্ব

সৈয়দ আবুল হোসেন: লেখা, পড়া, আলোচনা এবং সমাজকল্যাণ- এই চারটি আমার চলার গতি ও জীবনের ছন্দ। সেসঙ্গে পছন্দ গবেষণা। পড়ার মধ্যে যে বিষয়টি আমাকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করে সেটি হচ্ছে- কবিতা। এ চারটি বিষয়ের মধ্যে গভীর একটা সম্পর্ক রয়েছে। আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয়Ñ এ চারটির মধ্যে কি কোনো সম্পর্ক রয়েছে?

উত্তর হবে- একটির সঙ্গে অপরটির অবশ্যই গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

লেখালেখি হচ্ছে গর্ব, সম্মান, শৌর্য, ঐতিহ্য, মর্যাদা এবং আভিজাত্যের প্রতীক। ফ্রান্সিস বেকনের ভাষায়: জবধফরহম সধশবঃয ধ ভঁষষ সধহ; পড়হভবৎবহপব ধ ৎবধফু সধহ; ধহফ ৎিরঃরহম ধহ বীধপঃ সধহ.৩৮ নিজের সম্পর্কে লিখতে পারা এবং নিজের কাজ সম্পর্কে লেখা, এমনকি নিজেকে নিয়ে প্রচারিত সমালোচনার জবাবদিহি করতে পারাÑ একজন ভালো নেতার চরিত্রের জন্য আবশ্যক। আমি লিখতে লিখতে অনেক কিছু শিখেছি এবং লিখতে গিয়ে আমাকে অনেক পড়তেও হয়েছে। আমি আমার সংগ্রহে রাখা অনেকগুলো বই মাঝে মাঝে পৃষ্ঠা উল্টে দেখি, কিছু কিছু একাগ্রতায় পড়ি। বইয়ের সংগ্রহ আমার ভীষণ পছন্দের। নিজে লেখা মানে নিজের একটি সুন্দর পৃথিবীর দেখা পাওয়া, যে এর ভালবাসায় পড়েছে সে কখনও এই ভালবাসার বন্ধন ছিন্ন করতে পারবে না। তাই লেখালেখি করাটাই প্রায় সবার জন্যই প্রয়োজন। বিশেষ করে, যারা নিজেকে সৎ মনে করে, মানবকল্যাণে কাজ করে।

নিজে লেখা মানে নিজের একটি সুন্দর পৃথিবীর দেখা পাওয়া, যে এর ভালবাসায় পড়েছে সে কখনও এই ভালবাসার বন্ধন ছিন্ন করতে পারবে না। তাই লেখালেখি করাটাই প্রায় সবার জন্যই প্রয়োজন।

আমার প্রথম পছন্দÑ লেখা। তারপর অন্যদের লেখাসমূহ ভালোভাবে পড়া। এটা আমার শিশুবেলা থেকে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যগত চরিত্র। লেখার জন্য ও পড়ার জন্য প্রয়োজন সঠিক ও যথাযথ পরিকল্পনা, ধৈর্য এবং উচ্চ নিয়ন্ত্রণক্ষমতা। এসব গুণ একজন নেতার বিকাশ ও প্রকাশ এবং নিজের স্থায়িত্বের জন্য অত্যাবশ্যক। পৃথিবীর প্রায় সব বিখ্যাত নেতারাই ছিলেন লেখক এবং একই সঙ্গে একাগ্র পাঠক। এ প্রসঙ্গে প্লেটো, অ্যারিস্টেটল, কার্ল মার্ক্স, জর্জ অরওয়েল, বারাক ওবামা, ম্যাকিয়াভ্যালি, এডল্ফ্ হিটলার, বিল ক্লিনটন, জর্জ বুশ, কেনেডি, আব্রাহাম লিংকন, বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন, স্তালিন, মহাত্মা গান্ধী, উইনস্টন চার্চিল, নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, ইন্দিরা গান্ধী, রুজভেল্ট, জওহরলাল নেহেরু, জর্জ ওয়াশিংটনসহ আরও অজ¯্র বিখ্যাত ব্যক্তির কথা বলা যায়। তাঁরা নেতা ছিলেন, তবে এখন নেতার চেয়ে লেখক হিসাবে অনেক বেশি পরিচিত।

আমি গল্প-উপন্যাস ও প্রবন্ধ পড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তারপরও বলব, কবিতা হচ্ছে একটি ভিন্ন জগৎ। প্রেম আর দ্রোহের অপূর্ব সম্মিলন। একজন কবির চোখ অন্তরের সঙ্গে যুক্ত। কবির চক্ষু এবং হৃদয় অন্যদের থেকে ভিন্ন। একজন কবি যা দেখে, অন্যরা তা দেখতে ব্যর্থ। কবি আকাশ, সাগর এবং প্রকৃতির ভাষা বুঝতে পারেন। তার হৃদয় আবেগে পূর্ণ থাকে, কবি তার আশপাশের দৃশ্য থেকে জীবেনের সৌন্দর্য খুঁজে নিতে পারে। তার হৃদয় খুবই স্পর্শকাতর। কবি তার সমাজকে ভালো করে জানে এবং সমাজের সুখ, আনন্দ ও উদ্বেগ তাকে ছুঁয়ে যায়। এমনকি তার কল্পনা জীবন্ত হয়ে ওঠে, যা কথা বলে মানুষের ও তাদের অন্তরের সঙ্গে ভাববিনিময় করে অভিন্ন হৃদ্যতায়।

আর একটা বিষয় আমার পড়তে খুব ভালো লাগে, সেটি হচ্ছে কোটেশন। এটাকে আমরা জ্ঞানের সারাংশ বলতে পারি। কোটেশন জীবনাভিজ্ঞতার প্রায়োগিক প্রকাশ। এটি আমাদের শক্তি দেয়, সাহস দেয়, উৎসাহ দেয়। অল্পকথায়, বেশি কিছু আহরণের জন্য কোটেশনের বিকল্প নেই।

সফল সব নেতার অবশ্যই প্রবল আবেগ থাকতে হবে, যা তার নেতৃত্বকে করবে স্বতন্ত্র, গভীর এবং অতুলনীয়। আবেগ না-থাকলে সে মানুষ কখনও অন্যকে ভালবাসতে পারে না। যে অন্যকে ভালবাসতে পারে না সে হয় স্বার্থপর। স্বার্থপর মানুষ কখনও জনগণের কল্যাণ করতে পারে না। এই কারণেই স্বার্থহীনভাবেই জনগণের জন্য কাজ করতে হবে। সেখানে আবেগ দিয়ে তাদের কথাগুলো, দুঃখগুলো বুঝতে হবে। জনগণের দুঃখ মুছে দেওয়া একজন সফল নেতার কাজ।

আমার জীবন লেখা, পড়া, কবিতা এবং জনসেবা মিলে একটি চতুর্ভুজে পরিণত হয়েছে। একটির সঙ্গে অপরটির গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। আপনি হতে পারেন ভালো লেখক, ভালো পাঠক, কবি, অশ^ারোহী অথবা নেতা। অবশ্যই আমি এটা মনে করি না যে, প্রত্যেক নেতাকে কবি বা লেখক হতে হবে। তবে প্রত্যেক নেতার অবশ্যই সংবেদনশীল আবেগ থাকতে হবে, যে আবেগ তার নেতৃত্বকে করবে স্বতন্ত্র, গভীর এবং অতুলনীয়। লেখক ও কবির চোখ এবং আত্মা অন্যান্যদের চেয়ে আলাদা। তারা সবকিছুকেই ভিন্নভাবে দেখে। তাদের দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী।

লেখক হিসাবে আমি যত গভীর ও মগ্ন, তত প্রচারবিমুখ। আমি লিখি সৃষ্টির আনন্দে, এখানে পাখির কূজনের মতো সুর আছে, কিন্তু প্রকাশের বাহুল্য নেই। আমার লেখা গ্রন্থের মধ্যে নিচের কয়েকটির কথা উল্লেখ করা যায় :

১.   স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

২.   শেখ হাসিনা সংগ্রামী জননেত্রীর প্রতিকৃতি

৩.   গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন

৪.   গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সংকট

৫.   আওয়ামী লীগের নীতি ও কৌশল- শিল্পায়ন ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ সমাবেশ

৬.   শেখ হাসিনার অক্ষয় কীর্তি- পার্বত্য শান্তিচুক্তি

৭.   বঙ্গজননী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব

৮.   শেখ হাসিনার অসামান্য সাফল্য

৯.   বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সুবর্ণজয়ন্তী স্মারকগ্রন্থ

১০.  আমি ও জবাবদিহিতা

১১.  পবিত্র স্মৃতি অ্যালবাম

অনেকে প্রশ্ন করেন, আমি রাজনীতিবিদ না ব্যবসায়ী, নাকি লেখক? আসলে আমি তিনটাই। আমি রাজনীতি করিÑ সেজন্য রাজনীতিবিদ। তবে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে আমি শুধু রাজনীতিবিদ নই; সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী এবং একজন দেশপ্রেমিক। তাই আমাকে আমার ভোটার, পরবর্তী নির্বাচন ও পরবর্তী প্রজন্মÑ তিনটার দিকে লক্ষ্য রাখতে হয়। একজন রাজনীতিবিদ শুধু পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার কথা ভাবে, কিন্তু একজন দেশপ্রেমিক পরবর্তী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে তার কর্মকা-কে বিকশিত করে। আমি শুধু পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য কাজ করি না, আমি পরবর্তী প্রজন্মের কল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করি। আমার রাজনীতি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, বর্তমানের জন্য এবং ভবিষ্যতের জন্য। তাই জনগণকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছি। আমি মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরীর মতো মহৎ ও কল্যাণের কাজ আর দ্বিতীয়টি নেই।

আগে দেশ, তারপর রাজনীতি। দেশের উন্নতি ঘটলে জনগণের উন্নয়ন আসবে। আমার শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পরিবেশ, ইতিহাস এবং অধ্যয়ন হতে আমি এ শিক্ষা পেয়েছি যে, দেশের চেয়ে বড় কিছু নেই। তাই দেশকে গড়ার লক্ষ্যে আমি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছি। আমার রাজনীতিক চেতনাকে বাস্তবায়ন এবং প্রজন্মান্তরে বিস্তারের জন্য আমার লেখক না হয়ে উপায় নেই। আর ব্যবসায়? সে তো আমার পরিবার-পরিজন পরিচালনার জন্য আবশ্যক। রাজনীতি তো কারও আয়ের পেশা হতে পারে না। যারা রাজনীতিকে অর্থ উপার্জনের উপায় হিসাবে দেখেনÑ তাদের তো আর রাজনীতিবিদ বা নেতা কোনোটাই বলা যাবে না।

ছাত্ররাজনীতি আমি সমর্থন করি, তবে তা কোনো রাজনীতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করতে নয়। রাজনীতি যদি ছাত্রসমাজের ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায় ও ভবিষ্যৎনেতা হিসাবে নিজেদের গঠনের জন্য হয়, তাহলে কেবল সেটাই সমর্থনযোগ্য।

রাজনীতি আমার কাছে কোনো পেশা নয়, আকস্মিক ঘটনার ফল মাত্র। তবে আমার রাজনীতি সর্বদা দেশ ও জাতির জন্য, ব্যক্তির জন্য বা আমার জন্য নয়। যদিও রাজনীতি আমার জীবনের কোনো পরিকল্পনায় ছিল না। আমি নিজের জন্য রাজনীতিতে আসিনি, জনগণের দাবিকে সম্মান করে তাদের কল্যাণে রাজনীতিতে এসেছি। সমাজ, সভ্যতা ও প্রগতির নিয়ামক হচ্ছে রাজনীতি। মহত্তর ও উন্নততর জীবনের সন্ধানেই মানুষ রাজনীতি করে থাকে। রাজনীতির পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট আদর্শ। যদি তা না হতো তাহলে মানুষ রাজনীতি করতে গিয়ে জেল-জুলুম সহ্য করত না, বুলেট-বেয়োনেটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারত না। তবে রাজনীতি হতে হবে সুশৃঙ্খল, নীতিবদ্ধÑ যা সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে পরিবর্তনশীল হবে, হবে কল্যাণমুখী। সবকিছুরই একটা নিয়ম-শৃঙ্খলা বা ব্যাকরণ থাকে। তেমনি রাজনীতিরও নিজস্ব ব্যাকরণ ও নিয়ম-শৃঙ্খলা রয়েছে। এটা ভঙ্গ করলে রাজনীতি হয় না, দলনীতি হয়। গণতন্ত্র হয় না, হয় দল ও ব্যক্তিতন্ত্র। যে রাজনীতি গণতন্ত্রের বিকাশ, জনকল্যাণ ও নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহী নয়, কেবল ক্ষমতামুখী সে রাজনীতিকে চর দখলের রাজনীতি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। আমি এ ধরনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করিনা।

রাজনীতিকে আমি উন্নয়নের হাতিয়ার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মূল মাধ্যম মনে করি। রাজনীতি ক্ষমতা দেয়, এ ক্ষমতা ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতিহত করার জন্য নয় বরং উন্নয়নের জন্য, মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। যে রাজনীতি ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতিহত করে, অন্যের বাক্স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়, সেটি রাজনীতি নয়, পশ্বাচার। গণতন্ত্র মানে জনগণের অংশীদারিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা। রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেও রাজনীতির কুফল, বিশেষ করে, বাংলাদেশে এর অপব্যবহার নিয়ে আমি মাঝে মাঝে শঙ্কিত হয়ে উঠি। ছাত্ররাজনীতি আমি সমর্থন করি, তবে তা কোনো রাজনীতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করতে নয়। রাজনীতি যদি ছাত্রসমাজের ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায় ও ভবিষ্যনেতা হিসাবে নিজেদের গঠনের জন্য হয়, তাহলে কেবল সেটাই সমর্থনযোগ্য।

রাজনীতি করতে হলে দল প্রয়োজন। যে দল জনমুখী ও সাম্প্রদায়িকতা-মুক্ত সেটিই আমার প্রিয় দল। এমন দলই জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্রষ্টা এবং রক্ষক হিসাবে পূর্ণ দায়িত্ব পালন করার সক্ষমতা রাখে। এমন দল হয় জনগণের দল এবং জনগণই থাকে এর সদস্য, কোনো সন্ত্রাসী দলবাজ ব্যক্তি নয়। এ দল বুঝতে পারে জনগণের হৃদয়-স্পন্দন, সহজে বুঝতে পারে জনগণের মনের গভীরে সুপ্ত থাকা অনুভূতির অব্যক্ত কথা।

রাজনীতির চালক- নেতা। তবে নেতা যদি নেতৃত্বের গুণাবলিতে বিভূষিত না-হন, তাহলে সে রাজনীতি দেশের কল্যাণ নয় বরং অকল্যাণই বয়ে আনে। নেতাকে কথা ও কাজে যেমন শালীন তেমন আন্তরিক হতে হয়। নইলে রাজনীতি মিথ্যানীতির জঞ্জালে পরিণত হয়। আমাদের দেশের নেতৃবৃন্দ অনেক সময় অশালীন ও রূঢ় মন্তব্য করে বসেন। একজন নেতা বা নেত্রীকে কথায় ও কাজে কেবল পারফেক্ট হলেই চলবে না, তাঁকে অনুকরণীয় গুণাবলির অধিকারীও হতে হবে।

নেতার আদিরূপ প্রজা। সাধারণ জনগণই ব্যক্তিকে সাধারণ পর্যায় হতে নেতায় রূপান্তর করে। অনেক নেতা ক্ষমতা পেয়ে নিজেকে সর্বাধিনায়ক ভেবে বসেন। মনে করেন, তিনিই সব। যাঁরা তাঁকে নেতা করেছেন, ক্ষমতায় এনেছেন, তাঁদের তুচ্ছ মনে করেন এবং নেতা হয়ে তাঁদের কথা ভুলে যান। আমি এ অপনীতির বিরোধী। আমি মনে করি, যথাসম্ভব সবাইকে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা উত্তম কৌশল। তাহলে কেউ নিজেকে বঞ্চিত ভাবতে পারবে না। রাষ্ট্র সবার জন্য, সবাইকে সংশ্লিষ্ট করতে না-পারলে রাষ্ট্র-পরিচালনায় কাক্সিক্ষত সাফল্য আসে না। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার চেষ্টা গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রতিকূল ধারণা। নেতা মানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি- যিনি জনগণের কাজ করবেন, জনগণের কাজে দায়বদ্ধ থাকবেন। নেতা হয়ে যিনি সাধারণ জনগণের কথা ভুলে যান, নিজেকে নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়েনÑ  তিনি নেতা নন, মস্ত এক ব্যথা।

দায়িত্ব পাবার আগে প্রত্যেকের উচিত দায়িত্ব বহনের সামর্থ্য অর্জন। সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রজ্ঞা। উপযুক্ত শিক্ষা আর ত্যাগী মনোভাব ছাড়া তা অর্জন করার কোনো উপায় নেই।

অনেকের কাছে নেতৃত্ব ক্ষমতা জৌলুশের বিষয়, গর্বের বিষয়। আমি নেতৃত্ব ও দায়িত্বকে জৌলুশময় কিছু মনে করি না। আমার মতে, একটি কার্য আর একটি বোঝা। এ বোঝা মূলত বাস্তবায়নের, দায়িত্বের এবং প্রতিজ্ঞার। যে-মস্তকে শোভিত হয় মুকুট, সে-মস্তক কখনও নিশ্চিন্ত থাকে না; হাজারও চিন্তা-ভাবনা, শত সমস্যার কণ্টকে সে মুকুট থাকে সর্বদা আকুল। রাতের ঘুম, দিনের আরাম তখন বিলকুল হারাম হয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো হতদরিদ্র দেশ হলে তো কথাই নেই। তাই দায়িত্ব পাবার আগে প্রত্যেকের উচিত দায়িত্ব বহনের সামর্থ্য অর্জন। সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রজ্ঞা। উপযুক্ত শিক্ষা আর ত্যাগী মনোভাব ছাড়া তা অর্জন করার কোনো উপায় নেই। এজন্য আদর্শ নেতা হলে প্রয়োজন আদর্শ পাঠক হওয়ার এবং আদর্শ লেখক হওয়ার। লেখনীর মাধ্যমে তিনি মননশীল জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করে বাংলাদেশের রাজনীতির সহিংস ক্ষেত্রকে সহনশীলতার উর্বর ক্ষেত্রে পরিব্যাপ্ত করতে পারেন।

বাংলাদেশের সমস্যা- গুড গভর্নেন্স এবং সুষ্ঠু ও সৎ শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা। সমকালীন রাজনীতি গণতন্ত্রের শ্লোগানে মূখর হলেও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, দূর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। আমি সুশাসন বলতে ১. সৎ ও প্রত্যয়দীপ্ত নেতৃত্ব, ২. সুষ্ঠু নির্বাচন বা অংশীদারিত্বমূলক গণতন্ত্র এবং ৩. উপযোগী নীতিমালা গ্রহণকে বুঝে থাকি। এ তিনটি বিষয়কে সমন্বিত করার জন্য আমাদের নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া উচিত। এ কাজ করতে গিয়ে আমাদের অনেক বাধাবিঘেœর মুখোমুখি হতে হয়েছে। রাজনীতিক সদিচ্ছার অভাবের কারণে মাঝে মাঝে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হয়েছে। আমাদের জেনে রাখা উচিত, একটি সৎ ও সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারই কেবল এ সব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম। সন্ত্রাস, স্বৈরশাসন ও দূর্নীতি বিরোধী বাংলাদেশ গড়তে পারে।

‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সুশাসনের অন্যতম পূর্বশর্ত।’ আমি মনে করি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সুশিক্ষিত ও প্রজ্ঞাময় মানুষ এবং দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। এজন্য একজন নেতাকে একই সঙ্গে পাঠক ও লেখক হওয়া আবশ্যক।

পৃথিবীতে কয়টি কর্ম আছে?

এ প্রশ্নের উত্তর কোনো সমাজবিজ্ঞানী দিতে পারবেন বলে মনে হয় না। ষোল কোটি মানুষের ষোল কোটি কর্ম। তবে কিছু কর্ম সবার জন্য, এটি সর্বজনীন অনুভূতির অনিবার্য স্মারক। অনিবার্য স্মারকটা কী?

সাহিত্যকর্ম। হতে পারে গান, কবিতা, লেখা, নৃত্য…। গুনগুন করে গায় নাÑ এমন মানুষ নেই। কলম পেয়ে লেখেনি, লেখার চেষ্টা করেনিÑ এমন মানুষও নেই। আপন মনে ঘটনার কাঠামো গড়েনি এমন মানুষের সংখ্যাও কম। জীবনের জন্য শ্বাস, চেতনার জন্য প্রকাশ। এ প্রকাশটা লেখার মাধ্যমে সবচেয়ে উত্তমরূপে স্থায়ীভাবে করা যায়। তাই যাঁরা লিখতে পারেন তাঁরা সবাই লেখেন, লিখতে চান, লেখক হতে চান। যাঁরা লিখতে পারেন না তাঁরা নিজের মনের কালি দিয়ে মস্তিষ্কে প্লট এঁকে যান, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কথার মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়। লেখনসামগ্রী বা কৌশল আবিষ্কার হওয়ার পূর্বে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রজন্মান্তরের এটিই ছিল একমাত্র উপায়।

নইলে কীভাবে প্লেটো-সক্রেটিস-অ্যারিস্টেটল-আর্কিমিডিসÑ আমাদের কাছে এখনও বর্তমান!

লেখার ফল বই; বই জ্ঞানের সংরক্ষণাগার। বই প্রাগৈতিহাসিক কালের সঙ্গে বর্তমান এবং সুদূর ভবিষ্যতের সেতুবন্ধন। এমন অবিচ্ছিন্ন সেতুবন্ধন আর হয় না। পৃথিবীর সব সেতু হয়তো ধ্বংস হয়ে যাবে, সব সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে পারে, কিন্তু বই, বইয়ের মাধ্যমে রচিত যুগ-পরম্পরা সেতুটি কখনও নষ্ট হবে না, ধ্বংস করার কোনো সাধ্য কারও নেই। চেঙ্গিস খান চীন জয় করে সমস্ত গ্রন্থ ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি। বই এত সহজে এত বেশিমাত্রায় বিস্তৃত হয়ে পড়ে যে, কোনো মানুষের পক্ষে আর তাকে করায়ত্তে নিয়ে আসা সম্ভব হয় না। তাই বইকে মানবসভ্যতার চিরন্তন উৎস বলা হয়।

বই বাদ দিলে মানুষ আর পশুতে কি কোনো তফাত থাকে?

না।

মানুষ আর পশুর তফাত- মানুষের বই আছে, পশুর নেই।

মহাকবি আলাওলের পদ্মাবতী রচনাকালীন একটি ঘটনা। মহামন্ত্রী মাগন ঠাকুর আলাওলকে ডেকে বললেন :

তোমার পুঁথির এক কোণায়,

আমার নামটা রেখ ভাই।

এ আমার মিনতি,

আলাওল মহামতি।

হতবাক আলাওল মহামন্ত্রীর আকুতি শুনে হতবাক : প্রভু, আপনি কত মসজিদ করেছেন, মন্দির করেছেন, ভবন করেছেন, রাজ্যের প্রতিটি আকাশচুম্বী ভবনে আপনার নাম। বিশাল আরাকানের অপ্রতিরোধ্য মহামন্ত্রী আপনি, গাছপালা হতে পশুপাখি, নদী হতে সাগর- সবকিছু আপনার গুণগানে রত। এসব আপনাকে বাঁচিয়ে রাখবে চিরকাল। আপনার কর্ম সমুদ্র, আমার নগণ্য গ্রন্থ শিশির মাত্র। আমার গ্রন্থে আপনার নাম রাখার আকুতি সমুদ্রের কাছে শিশির প্রার্থনার মতো।

হতাশ কণ্ঠে উদাস সুর তুলে মাগন ঠাকুর বলেছিলেন :

মসজিদ মন্দির নিজ দেশে রহে

গ্রন্থ কথা যথা তথা সর্বত্র বহে।

আলাওল মহামন্ত্রী মাগন ঠাকুরের অনুরোধ রেখেছিলেন। পদ্মাবতী পুঁথির মাধ্যমে মাগন ঠাকুর আজও জীবিত। আরাকানে কত মন্ত্রী এলেন গেলেন; কত ভবন হলো কে-বা মনে রাখে। কিন্তু আলাওলের গ্রন্থের একটা ক্ষুদ্র কোণায় লিখে রাখা নামের জন্য মাগন ঠাকুর চিরজীবী হয়ে আছেন।

আমার লেখা আমার হয়ে সবার। আমার চেতনার শৈশব, অভিজ্ঞতার বিনিময়, চিন্তার ফল। এখানে আমার চিন্তা-ভাবনা প্রতিফলিত। প্রতিফলিত আমার অনুভূতি, রাজনীতি ও ধর্মীয় দর্শন। আমার লেখা নিয়ে আমি কখনও তেমন ভাবিনি, আমার অস্তিত্বের সাথে এগুলো লীন হয়ে ছিল নিজের হৃৎস্পন্দনের মতো। তবে কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তি আমার কয়েকটি বই নিয়ে আলোচনা করেছেন। তন্মধ্যে এশিয়ার বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. আবদুল করিম, জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী প্রমুখ অন্যতম।

আমার লেখা গ্রন্থসমগ্রের কোনো ঐতিহাসিক মূল্য কিংবা সাহিত্যিক তাৎপর্য আছে কিনা জানি না। এ নিয়ে আমি কখনও ভাবিনি, এখনও ভাবি না। এখানে আমি উৎসব, প্রকৃতির ন্যায়, পাখির কাকলীর মতো সৃষ্টির উল্লাসে অনুরণিতÑ যা সাহিত্য বা ঐতিহাসিক মূল্যের চেয়ে অনেক বড়। সৃষ্টির আনন্দ যেখানে উদ্বেল, প্রকাশ সেখানে নির্মোহ; সৃষ্টি যেখানে পার্থিবতাকে অতিক্রম করে, সফলতা-অসফলতা নামক ঠুনকো বিষয় সেখানে তুচ্ছই বটে।

মসজিদ মন্দির নিজ দেশে রহে

গ্রন্থ কথা যথা তথা সর্বত্র বহে।

আমার লেখা আমার চেতনার বিকাশ। এখানে এত আনন্দ যে, অন্য সব নগণ্য। কতটুকু সফল হয়েছি জানি না। তবে, অনেক বোদ্ধাজন আমার লেখার প্রশংসা করেছেন, অনেকে চিঠিও লিখেছেন, এখনও আলোচনা করেন। হতে পারে অতিরঞ্জিত অথবা আমাকে খুশি করার কৌশল। যেটিই হোক তাতে আমি উৎসাহিত হয়েছি। কিন্তু ব্যবসায়, রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকা-ে অতি ব্যস্ততার কারণে লেখক হওয়ার সাধ পূরণ হয়নি। এভাবে মানুষের অনেক ইচ্ছা বৃক্ষের অসংখ্য পাতার মতো ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে। প্রাপ্ত প্রশংসা কতটুকু যৌক্তিক তাও ভেবে দেখিনি। তবু আমি লিখে যাই, পাখি যেমন গান গেয়ে যায়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়:

কেউ ভোলে না ভোলে

অতীত দিনের স্মৃতি

কেউ দুঃখলয়ে কাঁদে

কেউ ভুলিতে গায় গীত।

১৬. খেলাধুলা ও বাংলাদেশ

সৈয়দ আবুল হোসেন: খেলাধুলা যেমন আকর্ষণীয়, তেমন উত্তেজনাময় ও উদ্দীপক। খেলাধুলা একটি ব্যায়াম, এক ধরনের বিশেষ যুদ্ধ। এ যুদ্ধ শরীর ও মনকে সুস্থ রাখার। কিন্তু এ যুদ্ধ নির্মল, পবিত্র, আরাম ও আনন্দদায়ক। খেলার সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং জয়-পরাজয়ের সম্পর্ক যেমন নিবিড়, তেমনি গভীর। খেলার কথা উঠলে আমার একটা বিখ্যাত প্রবাদের কথা মনে পড়ে যায়- ডরহহবৎং হবাবৎ য়ঁরঃ ধহফ য়ঁরঃঃবৎং হবাবৎ রিহ.৩৯ পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে সময় পেলে প্রায়ই আমি খেলা দেখি। ইদানীং ক্রিকেট খেলা বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ছেলেরা খুব ভালো করছে ক্রিকেটে। এটি আমাদের উন্নয়নের একটি প্রমাণ। গত কয়েক বছর আমাদের ক্রিকেট টিম টেস্ট সিরিজে এত ভালো খেলেছে যে, সেটা দেখে ভালো লেগেছে। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে খেলা নিয়ে শুরু করা যাক। প্রথম কয়েক দিনের খেলা তো ছিল টানটান উত্তেজনায় ভরপুর। কিন্তু পাঁচ দিনের শেষ দিনে যখন বাংলাদেশ জিম্বাবুয়েকে পরাজিত করার গৌরব অর্জন করলÑ তখন বুকটা ভরে গেল গর্বে। আমাদের দেশের অনেক খেলোয়াড় ওয়ার্ল্ড র‌্যাঙ্কিঙে নিজের অবস্থান অনেক দূর নিয়ে গেছে। এটা কম গৌরবের কথা নয়।

আমি একসময় হাডুডু ও ভলিবল খেলতাম। যে খেলাই হোক, খেলার মাঠের মধ্যে প্রচ- উত্তেজনা বিরাজ করত, তেমনি উত্তেজনা বিরাজ করত খেলোয়াড়ের মধ্যেও। অনেক সময় আমি এসব খেলায় নির্দেশক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেছি। আমি খেলোয়াড়দের এমনভাবে পর্যবেক্ষণ করতাম, যেন তারা প্রত্যেকে আমার সেনাবাহিনীর এক-একজন সৈনিক। একজন কমান্ডারের মাথায় রক্ত উঠে যায়, যখন তার সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে থাকে। শরীর প্রচ- উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং স্নায়ুচাপ বেড়ে যায়। তবে ভালো ফল পেতে হলে উত্তেজনাকে যথাসম্ভব প্রশমিত রেখে জয়ের কৌশল নিয়ে ব্যস্ত থাকা উচিত।

এখন আমি ক্রিকেট খেলা দেখি। দেখতে দেখতে মাঝে মাঝে উত্তেজনায় সিট থেকে লাফ দিয়ে উঠে পড়ি, যখন বিজয়সূচক উইকেটটি পড়ে যায় তখন শরীর শিউরে ওঠে। উত্তেজনায় টেবিলের উপর থাপ্পড় দিয়ে বসি। অনেক জোরে শব্দ হয়। আজকাল তেমন একটা বাইরে যাওয়া হয় না। কিন্তু খেলা দেখতে বেশ ভালোই লাগে। হাজার হাজার বাংলাদেশির মধ্যে নিজেকে একাকার করে দেওয়াÑ এটাই জাতীয়তাবোধ, সহমর্মিতা এবং ঐক্যচেতনার উৎস। ছোটবেলায় হাডুডু ও ভলিবল খেলতে গিয়ে কত-না ব্যথা পেয়েছি। ওইসব ইনজুরি বা আঘাত মাঠে আমাকে ভোগাত। মাঠে খেলতে গিয়ে অনেক সময় ব্যথা পেয়েছি। তবে যখন জয়ী হতাম তখন জয়ের কারণে সেই ব্যথা ভুলে যেতাম। মন ভরে উঠত গভীর আনন্দে।

ক্রিকেটকে আমি অন্য সকল খেলার চেয়ে কুশলী, গুরুত্বপূর্ণ ও মেধাময় মনে করি। কারণ ক্রিকেট খেলায় প্রত্যেক খেলোয়াড়ের কৃতিত্বের পৃথক তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। ফুটবল, হকি, ভলিবল, হাডুডু বা অন্যান্য দলগত খেলাসমূহে সবার কৃতিকে পেছনে ফেলে শুধু স্কোরারদের কৃতিত্বকে সামনে তুলে ধরা হয়। অন্যান্যদের কৃতি খুব একটা বিবেচনায় আসে না। কিন্তু ক্রিকেটে প্রতিটি খেলোয়াড়ের খতিয়ান লিপিবদ্ধ হয়। কৃতি-বিকৃতির কিছুই এখানে উপেক্ষিত হয় না। ক্রিকেট খেলার বিশ্লেষণে তাই ক্রিকেট-পরিসংখ্যান বিশ্বের ক্রিকেট-বোদ্ধাদের কাছে অত্যন্ত জরুরি।৪০

২০০৭ খ্রিস্টাব্দের বিশ্বকাপে ভারতকে হারিয়ে সুপার-৮ পর্বে ওঠার পর বাংলাদেশ আরও ছয়টি ম্যাচ খেলেছিল। সেবার প্রথম পর্বের তিনটি ও পরে সুপার আট পর্বের ৬টি- সব মিলিয়ে ৯টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ। ওই ৯ ম্যাচে বাংলাদেশ মোট ১২৭২ রান সংগ্রহ করে, যা ছিল গড়ে ১৪১.৩৩ রান। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে প্রথম পর্বের খেলা শেষে বাংলাদেশকে বিদায় নিতে হয়েছিল। ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে জয়লাভ করলেও বাংলাদেশ পরবর্তী রাউন্ডে উঠতে পারেনি। সমান পয়েন্ট পেয়েও নিট রান রেটে এগিয়ে থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। সে বছর ছয় খেলায় বাংলাদেশ মোট রান করেছিল ১০১৭। যা ছিল গড়ে ১৬৯.৫০ রান।৪১

আমরা সফল হতে পারব যতক্ষণ ঐক্যবদ্ধ থাকব এবং ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব। ভারতের মতো দলকে হারিয়ে আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি যে, আমাদের পক্ষে কোনো জয় অসম্ভব নয়।

২০০৭ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় বাংলাদেশ ব্যাটিঙে উন্নতি লাভ করেছে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারতের সঙ্গে অনুষ্ঠিত ‘বিতর্কিত’ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচসহ বাংলাদেশ মোট ৬টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়। প্রথম পর্বের অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের নির্ধারিত ব্রিজবেন-ম্যাচটি আবহাওয়ার কারণে পরিত্যক্ত হয়। ওই ছয় ম্যাচে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ১৫৮৫ রান, যার গড় ২৬৪.০০ রান। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের বিশ্বকাপে পর পর দুই ম্যাচে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের করা দুটো সেঞ্চুরি বাংলাদেশের ক্রিকেটের শক্তি ও গৌরব বৃদ্ধি করেছে। রিয়াদের আগে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের আর কোনো ব্যাটসমানের একটিও সেঞ্চুরি ছিল না। বিশ্বকাপে বিতর্কিত রানে বাংলাদেশকে হারালেও এর মধুর প্রতিশোধ নিয়েছে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের জুনে ভারতীয় দলের বাংলাদেশ সফরে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে ম্যাচে বাংলাদেশ ভারতকে পর পর দুই খেলায় হারিয়ে সিরিজ জিতে নেয়। এর আগে অনুষ্ঠিত টেস্ট ম্যাচে উভয় দলের খেলা ড্র হয়।৪২

এখন ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেট অনেক বেশি জনপ্রিয়। তা হলেও ফুটবলের যে আনন্দ একসময়ে ছিল সেটাকে ফিরিয়ে আনাটাও প্রয়োজন। ক্রিকেটের ভিড়ে ফুটবল হারিয়ে যাবে বিষয়টা এমন যেন না হয়। আমি আরও বলতে চাই, বাংলাদেশের টেস্ট সিরিজ জয় বা অন্য কোনো টুর্নামেন্টে জয়ে আমাদের আনন্দ ও আত্মবিশ^াস নবায়ন হয় এবং সকলে একত্রে আবেগাপ্লুত হয়ে উঠি। বিজয় আমাদের এ নির্দেশ দেয় যে, টিম-স্পিরিটের বিকল্প কিছু নেই। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা সফল হতে পারব যতক্ষণ ঐক্যবদ্ধ থাকব এবং ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব। ভারতের মতো দলকে হারিয়ে আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছি যে, আমাদের পক্ষে কোনো জয় অসম্ভব নয়।

২০১৫ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আমাদের ক্রিকেট দলের কৃতিত্ব সারাবিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এটি আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস আর খেলোয়াড়দের সক্ষমতার গৌরবজনক নিয়ামক। এটি জানিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশ বিশ্বমানের দক্ষ জনগোষ্ঠীসমৃদ্ধ একটি অপার সম্ভাবনাময় দেশ। ক্রিকেটে এখন আমরা আগের চেয়ে অনেক এগিয়ে গিয়েছি। ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছি। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২১ জুন মাসে ক্রিকেটে ভারতকে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছি। একই বছর জুলাই মাসে আমরা ওয়ানডে-সিরিজে আফ্রিকাকেও হারিয়েছি। ক্রিকেট খেলার বিজয় আমাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতিভূ।

ক্রিকেট খেলার বিজয় আমাদের ঐক্যবদ্ধ শক্তির প্রতিভূ। ক্রিকেট দলের মতো আমাদের জাতিও আজ ঐক্যবদ্ধ। ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে কেউ হারাতে পারে না। এর অপরিসীম ক্ষমতার কাছে সবাইকে হার মানতে হয়।

ক্রিকেট দলের মতো আমাদের জাতিও আজ ঐক্যবদ্ধ। ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে কেউ হারাতে পারে না। এর অপরিসীম ক্ষমতার কাছে সবাইকে হার মানতে হয়। প্রশ্ন আসতে পারে, ক্ষমতা কী? ক্ষমতার বহু সংজ্ঞা আছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে ক্ষমতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নানাজন নানাভাবে নানা উপায়ে ক্ষমতার অধিকারী হন। ক্ষমতা অন্যদের দলিত করার জন্য নয়। যে ক্ষমতা অন্যকে দলিত করে সেটি নৃশংসতা এবং পাশব। কোনো আদর্শ মানুষ ক্ষমতা দিয়ে অন্যকে দলিত করতে পারে না। আমি মনে করি- চড়বিৎ রং ঃযব ধনরষরঃু ঃড় ফড় মড়ড়ফ ঃযরহমং ভড়ৎ ড়ঃযবৎং.৪৩ যারা ক্ষমতাকে সুসংহতরূপে ব্যবহার করতে পারে না, তারা সন্ত্রাসী।

ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অসামান্য দক্ষতা ও কৃতিত্ব আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে এবং সেরা হতে অনুপ্রাণিত করবে। আমি আমাদের জাতীয় ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানাই ভালো খেলার জন্য, ভালো খেলে সম্মানজনক বিজয় অর্জনের জন্য। তারা তাদের সাফল্য ধরে রাখবে। আগামীদিনে বাংলাদেশের জন্য আরও বড় সাফল্য তারা এনে দেবেÑ এটাই জাতির প্রত্যাশা।

১৭. ধৈর্য পরীক্ষা

সৈয়দ আবুল হোসেন: শেখ সাদীর একটা বাণী দিয়ে শুরু করা যায়। ধৈর্য রাখুন, সহজ হওয়ার পূর্বে যে-কোনো কাজই কঠিন বলে মনে হয়। ধৈর্যের মাধ্যমে যে-কোনো কঠিন কাজ সহজ করে তোলা যায়। প্রশ্ন আসতে পারে, ধৈর্য কী? এর অনেকগুলো সংজ্ঞা আছে। আমার সবচেয়ে যেটি আকর্ষণীয় মনে হয় সেটি হচ্ছে : চধঃরবহপব রং হড়ঃ ংরসঢ়ষু ঃযব ধনরষরঃু ঃড় ধিরঃ- রঃ’ং যড়ি বি নবযধাব যিরষব বি’ৎব ধিরঃরহম.৪৪

অলিম্পিক শুধু বিশ্ববৃহৎ ক্রীড়া-উৎসবই নয়, বিশ্বের সর্ববৃহৎ মিলনমেলা। বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে তাবৎ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন এ আয়োজনে। চীনের বেইজিঙে অনুষ্ঠিত ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের অলিম্পিকে মার্কিন সা¤্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিয়ে প্রথমবারের মতো শ্রেষ্ঠত্ব নিজেদের করে নিয়েছিল এশিয়ার গর্ব চীন। সেবার ৫১টি স্বর্ণসহ ১০০টি পদক জিতে সবার সেরা হয়েছিল চীন। মোট ১১০টি পদক জিতলেও স্বর্ণসংখ্যা (৩৬) কম হওয়ায় দ্বিতীয় হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।৪৫ বিগত আসরগুলোর পরিসংখ্যান দেখলে প্রতীয়মান হয়, অলিম্পিকে বরাবরই একক আধিপত্য দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। শুরুর দিকে তাদের সঙ্গে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, গ্রেট ব্রিটেন টেক্কা দিলেও কালের বিবর্তনে একক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে মার্কিনিরা। কিন্তু নিজ মাটিতে অনুষ্ঠিত ২৯তম অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রকে টপকে পদক তালিকার শীর্ষে আরোহণ করে চীন। আমি ঐ অলিম্পিকে দর্শক হিসাবে গিয়েছিলাম। সরকারি সম্মেলনে মতবিনিময় সভায় প্রতিযোগিতার সফলতার রহস্য জানতে চেয়েছিল অনেকে। এ সম্বন্ধে আমি বলি, এটা ছিল আমার জন্য খুবই সম্মানের বিষয়। এই সুযোগে একটু বলতে চাই, সেখান থেকে আমি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।৪৬

চীনের প্রতিযোগীরা ছিল পেশাদার ক্রীড়াবিদ এবং ট্রেইনার। এর সবই ছিল আমার জন্য হতাশা ও চিন্তার বিষয়। কারণ বাংলাদেশেরও প্রতিযোগী ছিল। কিন্তু তারা অন্যান্য দেশের মতো ততটা পেশাদার ক্রীড়াবিদ নয়। শুধু শখের বশে কেউ কেউ খেলোয়াড় হয় এবং শখের বসে অনুশীলন করে। আমি তেমনভাবে না-খেললেও খেলা খুবই পছন্দ করি এবং আমি খুব ভালো করে আমার সম্পর্কে জানি এবং আমার কতটুকু সক্ষমতা আছে তা-ও আমি অবগত।

লন্ডনে পরবর্তী অলিম্পিকেও চীন তাদের সেরা স্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর লন্ডন অলিম্পিকের দশম দিন শেষে পদক-তালিকার শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন। ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত এ ক্রীড়া-আসরে শুরু থেকেই কৃতিত্বের সঙ্গে এই স্থানটি নিজেদের দখলে রেখেছে এশিয়ার অন্যতম এ দেশ। ৩১ সোনা, ১৯ রুপা ও ১৪ ব্রোঞ্জসহ তাদের পদক ৬৪টি। অন্যদিকে ২৯ সোনা, ১৫ রুপা ও ১৯ ব্রোঞ্জসহ ৬৩টি পদক নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। আর ১৮ সোনা এবং ১১টি করে রুপা ও ব্রোঞ্জ জিতে মোট ৪০টি পদক নিয়ে স্বাগতিক যুক্তরাজ্য ছিল তৃতীয় স্থানে। এছাড়া অলিম্পিকের ৩০তম এ আসরে চতুর্থ স্থানে রয়েছে এশিয়ার আরেক দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। ১১ সোনা, ৫ রুপা ও ৬ ব্রোঞ্জসহ তাদের পদক ২২টি। ক্রীড়া ম্যাজিক অলিম্পিকের লন্ডন আসরে পঞ্চম হয়েছে ইউরোপের অন্যতম দেশ ফ্রান্স। তাদের সংগ্রহ ৮ সোনা এবং ৯টি করে রুপা ও ব্রোঞ্জ। এ অলিম্পিকে পদক লড়াইয়ে শুরু থেকেই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলে আসছে। শুরু থেকে পদক তালিকায় শীর্ষস্থান ধরে রাখে চীন। সপ্তম দিনে এসে চীনকে ছাড়িয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে শীর্ষস্থান ফিরে পেতে ৩৬ ঘণ্টার বেশি সময় নেয়নি চীন।৪৭

দীর্ঘদিন একটা আপ্তবাক্য সবাই মেনে নিয়েছিল- অলিম্পিক মানেই যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ শ্রেষ্ঠত্ব। বেইজিং অলিম্পিকের আগে টানা তিন আসরে এর প্রমাণও তারা রেখেছিল। মার্কিনিদের এই একতরফা আধিপত্যের কারণ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বলতে গেলে ফাঁকা মাঠেই গোল করে চলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এসময়ে তাদের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ার দুঃসাহসই কেউ দেখাতে পারেনি। তবে অনেকদিন থেকে সোভিয়েতদের শূন্য জায়গাটা দখলের জন্য মরিয়া হয়ে কাজ করছিল চীন। বিশ্বরাজনীতির মাধ্যমে যার শুরু। অলিম্পিকের দায়িত্বটা পাওয়ার পর থেকে এটি প্রসারিত হয়ে ক্রীড়াঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়ে। তার ফল কী হয়েছে সেটা পর পর দুটি অলিম্পিকে চীন বিশ্বের সামনে উন্মোচিত করে দিয়েছে। চীন এখন বিশ্বরাজনীতি কিংবা অলিম্পিক যাই বলুন না কেন সর্বক্ষেত্রেই মার্কিনিদের জন্য হুমকি। ক্রীড়াঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতাগিরি থেকে রেহাই পেতে বিশ্বের জনগণ এমন একটি শক্তির প্রত্যাশা করছিল। অবশেষে তা পূর্ণতা পায় বেইজিং অলিম্পিকে সাফল্যের মধ্য দিয়ে, যা লন্ডন অলিম্পিকের মাধ্যমে স্থায়ী রূপ লাভ করে।

অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, যারা বিশ^চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করতে প্রচ- ইচ্ছা পোষণ করেন, সেটা যে-স্তরের ক্রীড়া প্রতিযোগিতাই হোক না কেন, অবশ্যই যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে যাবেন এবং প্রত্যেককে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। অন্যথায় সফলতা সুদূরপরাহত হয়ে পড়বে।

অলিম্পিকে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের নৈপুণ্য ক্রমশ বাড়ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব অলিম্পিকে বাংলাদেশ প্রথম অংশগ্রহণ করে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে লস এঞ্জেলেস গেম্সে। একমাত্র ক্রীড়াবিদ হিসাবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন সাইদুর রহমান ডন। তিনি ১০০ মিটার স্প্রিন্টে খেলেছেন। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে সিউল অলিম্পিকে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে শাহ জালাল, ২০০ মিটারে শাহ আলম, লং জাম্পে শাহানুদ্দিন চৌধুরী এবং ৪০০ ও ৮০০ মিটারে মিলজার হোসেন অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া ৪  ১০০ মিটার রিলে খেলেন শাহ আলম, শাহ জালাল, মিলজার হোসেন ও শাহানুদ্দিন চৌধুরী। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে বার্সেলোনা গেম্সে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে গোলাম আম্বিয়া ও ৪  ১০০ রিলে দলে ছিলেন গোলাম আম্বিয়া, মেহেদী, শাহানুদ্দিন চৌধুরী ও শাহ জালাল।৪৮

১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে গেমসে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন বিমল চন্দ্র তরফদার। অ্যাথলেটিক্সে প্রথম মহিলা এথ্লেট হিসাবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন লং জাম্পার নিলুফার ইয়াসমিন। ২০০০ সিডনি গেম্সে ২০০ মিটার স্প্রিন্টে খেলেন মাহবুবুল আলম। মহিলা বিভাগে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে খেলেন ফৌজিয়া হুদা জুঁই। ২০০৪ এথেন্স গেম্সে ১০০ মিটারে মোহাম্মদ শামসুদ্দিন দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে চীনে আয়োজিত আসরে অংশ নিয়েছেন আবু আবদুল্লাহ। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে লন্ডন গেম্সে দেশের দ্রুততম মানব হিসাবে খেলেছেন মোহন খান। সেনাবাহিনীর অ্যাথলেট মোহন খান বিদেশে যেকোনো প্রতিযোগিতায় সেরা নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন লন্ডনে। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে জাপানের কোবে নগরে এশিয়ান ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে ১১.৩১ সেকেন্ড সময় নিয়েছিলেন তিনি। লন্ডনে সময় লেগেছে ১১.২৫ সেকেন্ড। জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে ১১.২২ হচ্ছে মোহনের ক্যারিয়ারের সেরা নৈপুণ্য।৪৯

অলিম্পিকসহ আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্যের জন্য আমাদের ক্রীড়াবিদগণকে আরও একাগ্র, পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়ী হতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী দৌড় প্রতিযোগিতায় আপনাকে অবশ্যই খেলার মাঠের সবদিক বিবেচনা করেই ও নিজের শক্তির ওপর নির্ভর করে প্রতিনিয়ত পরিকল্পনা সাজাতে হবে। যখন অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবেন, তখন মাঠ ও সময়ের ওপর তীক্ষè দৃষ্টি রাখতে হবে। দ্রুত অগ্রসর হলে শুরুতেই ক্লান্ত হয়ে যাবেন। আবার আস্তে গেলে পেছনে পড়ে যাবেন। সমতল স্থানে, অবস্থা বুঝে সামনে এগিয়ে যেতে নিজেকে দ্রুত নিয়ে যেতে হবে এবং এভাবে এগিয়ে যেতে হবে। এটাও মনে রাখতে হবে, সময় সর্বদা অনুকূলে থাকে না। তাই সেভাবে এগোতে হয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সবসময় সমানভাবে তীক্ষè দৃষ্টি রাখতে হয়।

অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, যারা বিশ^চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করতে প্রচ- ইচ্ছা পোষণ করেন, সেটা যে-স্তরের ক্রীড়া প্রতিযোগিতাই হোক না কেন, অবশ্যই যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে যাবেন এবং প্রত্যেককে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। অন্যথায় সফলতা সুদূরপরাহত হয়ে পড়বে।

লক্ষ্যস্থলে উপনীত হতে হলে জ্ঞান অর্জন করুন। জ্ঞানের মাধ্যমে অন্যদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যান। বিজয়ের সংক্ষিপ্ত পথ হচ্ছে জ্ঞান। আপনার সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা নিন, অতঃপর নিজের সক্ষমতা কতটুকু সে ব্যাপারে জানুন, অনুশীলনের মাধ্যমে জানার ও বিকাশের চেষ্টা করুন। আপনার প্রতিপক্ষের সক্ষমতা কতটুকু তা অবগত হওয়ার চেষ্টা করুন। খেলার মাঠ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করুন। নিজের ও অন্য খেলোয়াড়ের প্রতিটি অঙ্গের বিচার-বিশ্লেষণ করে এবং অন্য খেলোয়াড় ও আপনি মাঠে কীরূপ আচরণ করবেন তা জানতে হবে। জ্ঞানের দিক দিয়ে প্রতিপক্ষের চেয়ে যত এগিয়ে থাকবেন, তার চেয়েও দ্রুতবেগে বিজয়ের মালা আপনাকে আলিঙ্গন করবে।

প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। কারণ প্রশিক্ষণ আপনাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে কোথায় আপনার দুর্বলতা। অন্যদিকে প্রশিক্ষণ আপনার আত্মবিশ^াসকে সুসংহত করবে এবং আপনাকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে।

এটা মনে রাখতে হবে, প্রতিযোগিতায় নামা মানে যুদ্ধক্ষেত্রে নামা। বিখ্যাত চাইনিজ দার্শনিক সান্ৎজু বেশ জনপ্রিয় একজন লেখক। আমি এখানে তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করতে চাই, “যদি আপনি নিজের সম্পর্কে এবং আপনার প্রতিপক্ষের সম্পর্কে অবগত থাকেন, তাহলে শত যুদ্ধেও আপনি বিপন্ন হবেন না। যদি আপনি শুধু নিজের সম্পর্কে অবগত হন কিন্তু আপনার প্রতিপক্ষের সম্পর্কে অবগত না থাকেন, তাহলে আপনি একবার জিতবেন, আরেকবার হারবেন। আর যদি আপনি এবং আপনার প্রতিপক্ষ উভয়ের বিষয়ে অবগত না থাকেন, তাহলে আপনি প্রতিটি যুদ্ধেই পরাজিত হবেন।”৫০ আমি আরও একটি বিষয় যোগ করতে চাই, যুদ্ধক্ষেত্র সম্পর্কে জানুন- কেননা শক্তির চেয়ে জ্ঞান বা জানা আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বিজয়ের সংক্ষিপ্ত পথ হচ্ছে জ্ঞান। সেটা ক্রীড়ার ক্ষেত্রেও। সক্ষমতা, দক্ষতা, যোগ্যতা এবং শক্তির চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান। জ্ঞান অর্জন করতে না পারলে হবে না। তাই যখন যেখানেই থাকুন না কেন জ্ঞান অর্জন করুন।

আমি আরও বলতে চাই- প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং আরও অধিক প্রশিক্ষণ। আমি ফুলটাইম ক্রীড়াবিদ ছিলাম না। তবে যেকোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতা উপভোগে বিমল আনন্দ পাই। প্রত্যেকের শারীরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। উদ্যম বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। প্রশিক্ষণ আপনাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে কোথায় আপনার দুর্বলতা; অন্যদিকে প্রশিক্ষণ আপনার আত্মবিশ^াসকে সুসংহত করবে এবং আপনাকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে।

আত্মবিশ্বাস যেকোনো সফলতার মূল উৎস। নিজের প্রতি বিশ^াস রাখুন, এ বিশ্বাস আপনাকে আশাবাদী করে তুলবে। মানসিক শক্তি সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যা আপনাকে এবং আপনার প্রতিপক্ষের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করবে। নিজের ওপর আস্থা রাখুন। অহংকার করবেন না অথবা প্রতিপক্ষকে অবহেলা করবেন না। আশাবাদী হোন, কোনোকিছুকেই অবহেলা করবেন না যদিও সেটা অনেক ছোট হয়। তাহলে নিজের জয়কে নিশ্চিত করতে সক্ষম হবেন।

১৮. আমার আদর্শ আমার নায়ক

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমি নিজে নিজেই ভাবি- আচ্ছা কখনও কি এমন হয়েছে যে নিজের অজান্তেই আমি কাউকে আমার আদর্শ ব্যক্তি বা নায়ক মনে করি? কেউ কেউ আমার কাছ থেকে জানতে চায়, কে আমার জীবনের নায়ক বা হিরো। উত্তরে আমি বলি, আমার অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন- আমাদের নবী হযরত মোহাম্মদ (স.)। নেতাদের মধ্যে যাঁরা আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছেন, আমার জানা মতে, নিঃসন্দেহে তাঁরা হচ্ছেন, হযরত আবু বকর (রা.), হযরত ওসমান (রা.), হযরত ওমর ফারুক (রা.), হযরত আলী (রা.), জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলা, মহাত্মা গান্ধী, মাও সেতুং, কামাল আতাতুর্ক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা, আমার পিতা সৈয়দ আতাহার আলী এবং আমার আব্বা হুজুরপাক এনায়েতপুর দরবার শরিফের গদিনশিন হুজুরপাক হযরত খাজা কামাল উদ্দিন নুহ মিয়া। অধিকন্তু আরও অনেক নেতা-নেত্রী আছেন, যাঁরা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন, যাঁদের নিকট থেকে আমি শিখেছি অনেক কিছু এবং প্রতিনিয়ত শিখে যাচ্ছি।

ছোটবেলায় বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি মাদারীপুরে। তিনি মাঝে মাঝে মাদারীপুর যেতেন বেড়াতে এবং রাজনীতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতে। বঙ্গবন্ধু মাদারীপুর আসবেন সংবাদ পেলে ছুটে যেতাম সেখানে। দেখতাম তাঁর অঙ্গভঙ্গি, কথা, তর্জনীর ঊর্ধ্বমুখিনতা এবং উদার-বজ্রকণ্ঠের সাহসী বাণী। সবকিছু ছিল যেন স্বপ্নের মতো। অভিভূত হয়ে দেখতাম বঙ্গবন্ধুকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন বঙ্গবন্ধু-পরিবারের অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ঢাকা থাকার সুবাদে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যবর্গকে আরও নিকট থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। এ শুধু সুযোগ নয়, বরং বিরল অভিজ্ঞতাও।

আমি অবাক বিস্ময়ে মুগ্ধচোখে চেয়ে থাকি সৌম্য, লম্বা, ঋজু ও অসম্ভব আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বময় চেহারার অধিকারী অবিংসবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের দিকে। তিনি ঢেউ-প্রবল নদী, আমরা সেই নদীর ¯্রােতস্বিনী পানি। প্রবল আবেগে সবাই ধেয়ে চলছে একমাত্র তাঁকে লক্ষ্য করে।

বঙ্গবন্ধুকে দেখাÑ আমার জীবনের এক নাটকীয় ঘটনা, অবিস্মরণীয় মুহূর্তের কালজয়ী স্মৃতি। সেই ছোটবেলায়, মহান স্বাধীনতা অর্জনের অনেক আগে বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখি। দেখেছি মাদারীপুরের বিশাল এক জনসভায়। আমার বাবার হাত ধরে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুকে দেখতে, দেশ-কাঁপানো নেতা বঙ্গবন্ধু, সবার প্রিয় মুজিব ভাইয়ের কথা শুনতে। সে জনসভায় অনেক নেতা বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তাঁরা তেমন মনোযোগ টানতে পারেনি, শিশু আমি, অত অনুধাবনেরও যোগ্যতা হয়নি। চারদিকে লোকজনের কথায় নেতাদের বক্তৃতা আরও অস্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দিতে আসছেনÑ ঘোষণা আসার সঙ্গে সঙ্গে চারদিক মুহূর্তের মধ্যে পিনপতন স্তব্ধতায় সুনসান হয়ে উঠল। হাজার হাজার শ্রোতার পিনপতন নিরবতায় বঙ্গবন্ধু ভাষণ শুরু করলেন। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের অমিয়বাণী ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। পৃথিবীতে এখন যেন একটাই শব্দ। বাকি সব স্তব্ধ। স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো প্রকৃতি, আকাশ, হাওয়া, পাখির কূজন; এমনকি পাতার মর্মর শব্দ পর্যন্ত থেমে গেছে। আমি অবাক বিস্ময়ে মুগ্ধচোখে চেয়ে থাকি সৌম্য, লম্বা, ঋজু ও অসম্ভব আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বময় চেহারার অধিকারী অবিংসবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের দিকে। তিনি ঢেউ-প্রবল নদী, আমরা সেই নদীর ¯্রােতস্বিনী পানি। প্রবল আবেগে সবাই ধেয়ে চলছে একমাত্র তাঁকে লক্ষ্য করে। একজন মানুষ কেবল বক্তৃতা দিয়ে কীভাবে মানুষকে বিমোহিত করে দিতে পারেন, সেদিন টের পেয়েছিলাম। মূলত সেদিনই বঙ্গবন্ধু আমার অন্তরে চিরদিনের জন্য চিরস্থায়ী হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁকে ছাড়া রাজনীতির ক্ষেত্রে আর কোনো বিকল্প ভাবতেও পারিনি, বাংলার মানুষও পারেনি। তিনি হয়ে ওঠেন আমার অবিসংবাদিত নেতা।

আমার সময়ের ভালো স্কুল-কলেজে পড়াশুনা করেছি আমি । কিন্তু জ্ঞান অর্জনের এমন কোনো প্রতিষ্ঠান পাইনি, যা অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের চেয়ে বেশি জ্ঞান বিতরণ করতে সক্ষম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। সেখানে অনেক কিছুই শিখেছি। তবে জীবনের বড় একটা জিনিস শিখেছি রাজনীতি করতে এসে। ঘাত-প্রতিঘাত ও জীবনবোধের নানা অভিজ্ঞতায় রাজনীতি আমাকে বিরল অর্জনে সমৃদ্ধ করেছে। বিশ্ব-নেতৃবৃন্দের জীবনীপাঠ আমাকে দিয়েছে অফুরন্ত চিন্তার নিষ্ঠাবান প্রত্যয়, যাতে আমি সাঁতরে বেড়াচ্ছি এখনও।

আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তখন বাবার সঙ্গে বিভিন্ন সময় ভ্রমণে তাঁর সঙ্গী হতাম। সেখানেও অনেক স্মৃতি আছে। অনেক কিছুই শিখেছি বাবার কাছ থেকে। পিতা আমার যেমন ছিলেন ধার্মিক, তেমনি ছিলেন দূরদর্শী। তিনি ছিলেন সমাজসংস্কারক, বিচক্ষণ, উদার ও অসাম্প্রদায়িক। নিজের চেতনার সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতি এবং দেশীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ। এখানে মানুষে মানুষে ছিল না কোনো ভেদাভেদ, ধর্মের মাঝে পূর্ণ সমাহারে আমার পিতা সৈয়দ আতাহার আলী হয়ে উঠেছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ।

একটি অসাম্প্রদায়িক খাঁটি বাঙালি পরিবেশে আমি মানুষ হয়েছি এবং সে শিক্ষাই ধারণ করে চলেছি এখনও। সেই শিক্ষাই ধারণ করে চলব আমৃত্যু। ইসলামের শাশ্বত ঘোষণা, ‘হুব্বুল ওয়াতানে মিনাল ইমান’, অর্থাৎ দেশকে ভালবাসা ইমানের অঙ্গ। মহানবি (স.) ছিলেন দেশপ্রেমের অগ্রদূত। স্বদেশের প্রতি ভালবাসাকে চিরন্তন অঙ্গীকার হিসাবে ইসলামে দিঙ্নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ্পাক বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য স্বীকার করো এবং তোমাদের ন্যায়পরায়ণ শাসকের আদেশ মেনে চলো’।৫১ রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘দেশ রক্ষার্থে একদিন এক রাতের প্রহরা- ক্রমাগত এক মাসের নফল রোজা এবং সারা রাত ইবাদতে কাটিয়ে দেওয়ার চেয়ে উত্তম (মুসলিম শরিফ)।’ দেশের স্বাধীনতা রক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করে রাসুল (স.) আরও বলেছেন, যে চোখ দেশের সীমান্ত রক্ষায় বিনিদ্র থাকে, সে চোখকে জাহান্নাম স্পর্শ করবে না। প্রিয় ধর্ম ইসলামের আদর্শ, প্রিয় নবির নির্দেশনা, পিতার শিক্ষা এবং আজন্ম লালিত দেশপ্রেমবোধ আমাকে প্রণোদিত করেছিল, উদ্বুদ্ধ করেছিল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে।

এরপর আমি যখন রাজনীতিতে জড়ালাম, রাষ্ট্রপতি ও সরকারপ্রধানসহ সবার সঙ্গে আমার পরিচয় আরও ঘনিষ্ঠ হলো। সৌভাগ্য ঘটে তাঁদের সঙ্গে কাজ করার। এরপর মন্ত্রিসভায় যোগ দিই এবং রাষ্ট্রীয় কাজে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করি। বিভিন্ন সময় দেশ-বিদেশের বহু নেতার সঙ্গে ইউরোপ এবং আমেরিকার শহরগুলোতে সফরসঙ্গী হিসাবে ভ্রমণ করেছি। ভ্রমণে যাওয়ার ফলে, আমি গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় শিখেছি, বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি এবং জীবনের সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে পেরেছি। জানতে পেরেছি জীবনের অন্ধকার দিক সম্পর্কেও। নেলসন মেন্ডেলার সঙ্গে পরিচয় ও তাঁর সঙ্গে আলাপ আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল জনপ্রেমে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার চেতনায়। ব্যবসা ও মন্ত্রীত্বের সুবাদে আমি পৃথিবীর বহুদেশ ঘুরেছি। নানাজাতের, পেশার লোকদের সাথে পরিচিত হয়েছি। সেদেশের সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখেছি। কিন্তু আমার দেশের মতো প্রাণচাঞ্চল্য আর কোথাও দেখিনি। যত বেশী দেশ ঘুরেছি- নিজের দেশের প্রতি মমত্ববোধ ও ভালবাসা শতগুণে বেড়েছে।

 

দেশে-বিদেশের এসব ভ্রমণ আমার জন্য ছিল শিক্ষার ক্লাসের মতো গুরুত্বপূর্ণÑ যেখান থেকে জীবন-ব্যবস্থা, জীবন-পরিচালনা পদ্ধতি, নেতৃত্ব দেওয়ার কৌশল এবং প্রশাসন পরিচালনা সম্পর্কে অনেক বিষয় অবগত হয়েছি। আমি শিখেছি শুধু অধ্যয়ন বা আনুষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে নয়, প্রশ্নের মাধ্যমে কথায় কথায় উদাহরণ দিয়ে কীভাবে জানার পরিধিকে ঋদ্ধ করতে হয়। আমি প্রায়ই পর্যবেক্ষণ করতাম বিশ্ব-নেতৃবৃন্দের কাজ, দৃষ্টিভঙ্গি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এবং কীভাবে মানুষের সঙ্গে আচরণ করতে হয়। তাঁদের কাছ থেকে আমি শিখেছি কীভাবে সামলাতে হয় ব্যস্ত সময়সূচি।

পিতা আমার যেমন ছিলেন ধার্মিক তেমনি ছিলেন দূরদর্শী। তিনি ছিলেন সমাজসংস্কারক, বিচক্ষণ, উদার ও অসাম্প্রদায়িক। নিজের চেতনার সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতি এবং দেশীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ। এখানে মানুষে মানুষে ছিল না কোনো ভেদাভেদ, ধর্মের মাঝে পূর্ণ সমাহারে আমার পিতা সৈয়দ আতাহার আলী হয়ে উঠেছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ।

আমার শ্রেষ্ঠ নেতা ও শ্রেষ্ঠ আদর্শ মহানবি (সা.)। তাঁর জীবনী পড়ে যতটুকু জেনেছি, তিনি সবসময় ইসলামি পদ্ধতিতে সমস্যা মোকাবিলা করতেন। বিচক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন অবস্থা সামলে নিতেন। তিনি অত্যন্ত হার্দিকভাবে তাঁর সাহাবা, অনুসারী ও বিরোধীদের পরিচালনা করতেন। তিনি ছিলেন উচ্চমর্যাদাশীল, নীতিবান এবং চরিত্রবান। এ প্রসঙ্গে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মহানবি (সা.)-সৃষ্ট ‘মদিনা সনদে’র কথা উল্লেখ করা যায়। মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী ‘মানব মুকুট’ গ্রন্থের প্রস্তাবনায় লিখেছেন, “যে সকল মহাপুরুষের আবির্ভাবে এই পাপ-পঙ্কিল পৃথিবী ধন্য হইয়াছে, যাহাদিগের প্রেমের অমৃত সেচনে, দুঃখতপ্ত মানবচিত্ত স্নিগ্ধ হইয়াছে, যাহারা মানবসমাজের যুগ-যুগান্তরের কুক্ষিগত কালিমা রশ্মির মধ্য হইতে সূর্যের ন্যায় উত্থিত হইয়া পাপের কুহক ভাঙিয়াছেন, ধর্মের নবীন কিরণ জ্বালাইয়াছেন ও পতিত মানবকে সত্য ও প্রেমে সঞ্জীবিত করিয়া নবীন জীবন পথে টানিয়া লইয়া গিয়াছেন, ইসলাম ধর্মের প্রচারক হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁহাদের অন্যতম।”৫২ শুধু তাই নয়, তিনি ছিলেন বিশ্বের মহান রাষ্ট্রনায়ক। ৬২২ খ্রিস্টাব্দের ২২ অথবা ২৪ সেপ্টেম্বর (১২ রবিউল আউয়াল) মদিনা সনদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি পৃথিবির প্রথম কার্যকর লিখিত সংবিধান প্রতিষ্ঠা করে নিজেকে শ্রেষ্ঠতম রাষ্ট্রনায়কের চিরন্তন আসনে অধিষ্ঠিত করে গিয়েছেন।৫৩ এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হলো জনগণের সম্মতিভিত্তিক, কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্র। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শক্তির যে সকল দেশ তাঁর বিরোধিতা করছিল সবাই তার বিচক্ষণতার কাছে নত স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তিনি পুরো বিশ্ব-পরিবেশটাই নিজের অনুকূলে নিয়ে এসেছিলেন। মদিনা সনদ এবং মহানবির রাষ্ট্রনায়কোচিত শ্রেষ্ঠতম সিদ্ধান্তগুলো আমাকে সরকারে থাকাকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্দেশনা দিয়েছে নানাভাবে। তাই আমি কোনো অপশক্তির কাছে নতি স্বীকার না করে দেশের কল্যাণে কাজ করেছি সর্বোচ্চ সততায়।

সরকারে থাকাকালীন আমি রাষ্ট্রীয় অর্থ-ব্যবস্থাপনায় সর্বদা খলিফা ওমরের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছি। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা বলা যায়। খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.) [৫৭৭-৬৪৪ খ্রিস্টাব্দ] রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে কোষাগারের হিসাব করছিলেন। এ সময় তাঁর দুই ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কক্ষে প্রবেশ করল। তাঁরা প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে খলিফা মোমবাতি নিভিয়ে অন্য আরেকটা মোমবাতি জ্বালিয়ে আত্মীয়দের স্বাগত জানালেন। কা- দেখে দুই আত্মীয়ের একজন মোমবাতি জ্বালানো-নিভানোর কারণ জানতে চাইলে হযরত ওমর (রা.) বললেন, “তোমরা ঘরে প্রবেশের পূর্বে আমি রাষ্ট্রের কাজ করছিলাম, তাই রাজকোষ থেকে প্রাপ্ত মোমবাতি জ্বালানো আমার জন্য জায়েজ ছিল, কিন্তু তোমরা যখন ঘরে প্রবেশ করলে তখন তোমাদের সঙ্গে আলাপে ওই মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা আমার জন্য জায়েজ হতো না। তাই ঐ মোমবাতি নিভিয়ে আমি ব্যক্তিগত রোজগারে অর্জিত মোমবাতি জ্বালিয়েছি।” সরকারে থাকাকালীন আমি ব্যক্তিগত কাজে কখনও সরকারি যান ব্যবহার করিনি, কখনও সরকারি অর্থে নিজের কাজে বিদেশ ভ্রমণ করিনি। পরোক্ষভাবেও যদি কোনো কাজে ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত থাকত, তো সে কাজে আমি কখনও রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার করতাম না।

দারিদ্র্য বিমোচনে আমি নিজেকে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করেছি। এ ব্যাপারে ইসলামের চার খলিফাসহ আধুনিক বিশ্বনেতৃবৃন্দের কর্মকা- আমাকে প্রেরণা দিয়েছে। শিক্ষার মাধ্যমে আমি দারিদ্র্যবিমোচনের মূলোৎপাটনের চেষ্টায় আমার এলাকাসহ সারা দেশে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছি। নানাভাবে নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা করেছি এবং করে যাচ্ছি। আমার মনে পড়ে ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)-এর জীবনের একটি ঘটনা। আবু বকর সিদ্দিক (রা.) মদিনার বাইরে একটি তাঁবুতে যেতেন। তিনি তাঁবুতে প্রবেশ করে সেখানে কিছু সময় কাটাতেন। আবু বকর (রা.)-এর মৃত্যুর পর হযরত ওমর (রা.) ওই লোকটিকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন। তাঁবুতে গিয়ে তিনি অন্ধপ্রায় এক বৃদ্ধা মহিলাকে দেখতে পেলেন। ওমর (রা.) বৃদ্ধার কাছে লোকটি সম্পর্কে জানতে চাইলেন। বৃদ্ধা বললেন, ‘আমি এক অসহায় বৃদ্ধা। আমার কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। আমি আমার ভেড়া নিয়ে একা এ তাঁবুতে থাকি। প্রতিদিন মদিনা থেকে একজন লোক এসে আমার তাঁবু ঝাড়ু দিয়ে দিতেন, খাবার রান্না করে দিতেন, ভেড়া থেকে দুধ দোহন করে দিতেন এবং সেগুলোর যতœ নিতেন। তারপর চলে যেতেন। তাঁর পরিচর্যা ছাড়া এতদিন আমার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল না।’ ওমর (রা.) প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি জানেন উনি কে ছিলেন?’ বৃদ্ধা বললেন, “না। তিনি কখনও আমার কাছে নিজের পরিচয় দেননি।” ওমর (রা.) বললেন, “তিনি ছিলেন খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।”

তাঁরাই আমার আদর্শ যাঁরা বিশ্বের কল্যাণে নিবেদিত। তাঁরাই আমার নায়ক যাঁরা সাধারণ মানুষের কল্যাণে সর্বদা নিজেদের উৎসর্গিত করার আনন্দে উন্মুখ হয়ে থাকতেন। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত আমার পিতা আমাকে এমন বোধে উদ্বুদ্ধ করেছেন- যাতে আমি সাধারণ মানুষের কল্যাণে সবসময় প্রস্তুত থাকি ও কাজ করি। তিনি আমাকে ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের ধারণা দিয়েছেন। আমার জীবনবোধ, চিন্তা-চেতনা ও সাফল্যের জন্য আমি তাঁদের সবার কাছে ঋণী। মুলত আদর্শ, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে কাজ করতে হয়। আদর্শ ও লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে কাজ করলে- সে কাজে সফলতা আসে।

 

১৯.সময়, শ্রম ও অধ্যবসায়

সৈয়দ আবুল হোসেন: সময়কে যেকোনো কাজে যথাযথভাবে ব্যবহার করাটা অতি জরুরি। একজন মানুষকে ঠিক করতে হবে কত কম সময়ে কত বেশি কাজ করা যায়। আর সেটা করার জন্য পরিকল্পনা করতে হবে ও যথাসময়ের টাইম ফ্রেম ঠিক করতে হবে। কাজটা কেন করছেন এবং সেই কাজের লক্ষ্যটাও ঠিক করতে হবে। সব ঠিক করলে কম সময়ে অনেক বেশি কাজ করে সফল হওয়া যাবে। আমি কম সময়ে অনেক কাজ করতে পারি এবং করি। এটা কেমন করে সম্ভব অনেকে এটা আমার কাছে জানতে চান। তাঁদের আগ্রহ আমি অল্প সময়ে এত কাজ সম্পন্ন করতে কীভাবে সময়কে ব্যবহার করি। আমি বিষয়টি পরিষ্কার করছি। প্রথমত এর সম্পূর্ণ কৃতিত্ব হচ্ছে আমার সক্রিয় ও কঠোর পরিশ্রমী কর্মীবাহিনীর, যাঁরা আমাকে পেছনে থেকে সকল কাজ সম্পাদন করে দেন। তবে এ কর্মীবাহিনীকে যথাযথভাবে গড়ে তোলার পেছনে আমার সময়ানুবর্তিতার যে ভূমিকা রয়েছেÑ তা বিনয়ের সঙ্গে প্রকাশ করছি। মনে রাখবেন, আপনার কর্মীবাহিনী কেমন হবে তা বহুলাংশে নির্ভর করবে আপনার ওপর ।

সময় ও জীবনের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে। পরিবারকে সময় দিতে হবে এবং কাজের জন্য, নিজের জন্য, শখের জন্য, আত্ম-উন্নয়নের জন্য, সর্বোপরি, সামনে এগিয়ে যাবার জন্য সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহারের কৌশল জানতে হবে। না জানলে তা অনুশীলন, অধ্যবসায় কিংবা ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমে আয়ত্তে আনতে হবে। সময় যতই সংক্ষিপ্ত বা দ্রুতগামী হোক না কেন, অধ্যবসায়ীর কাছে দৌড় প্রতিযোগিতায় সে পরাজিত হতে বাধ্য। কোনো অধ্যবসায়ীকে সময় হারাতে পারে না, সময়ই তার কাছে হেরে যায়।

সময়ের বিষয়ে আমি বলতে চাই, একদিনে ২৪ ঘণ্টা সময় পাই; আমরা সময়কে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করি, প্রশ্ন সেটা নয়, বরং প্রশ্ন হচ্ছে- কীভাবে আমরা আমাদের সময় ব্যয় করি। কতকগুলো কাজ আছে, যেগুলো আমরা কম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে পারি- এই যেমন, তিন ঘণ্টার সম্মেলনকে আধা ঘণ্টায় এবং এক মাসের কাজ এক সপ্তাহে সম্পন্ন করতে পারি। এরকম দক্ষতা অর্জন অবশ্যই সম্ভব এবং আমরা যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি, তাহলে অল্প সময়ের মধ্যে অনেক কাজ সম্পন্ন করা কোনো ব্যাপারই নয়। একটা কথা মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক কাজ সম্পন্ন করার জন্য আপনার যথেষ্ট সময় না-ও থাকতে পারে, কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার জন্য যথেষ্ট সময় যেন থাকে। এটি মনে রেখে কার্যবিভাজন ও কর্মসম্পাদন পরিক্রমা সজ্জিত করলে সময় দেখবেন অফুরন্ত হয়ে উঠেছে। আমি মূলত এভাবে আমার কর্মযজ্ঞকে বিভাজন করে থাকি।

অপরদিকে, সময়ের ব্যবহার অত্যন্ত সুচারু হওয়া উচিত। সময় ও জীবনের মধ্যে ভারসাম্য থাকতে হবে। পরিবারকে সময় দিতে হবে এবং কাজের জন্য, নিজের জন্য, শখের জন্য, আত্ম-উন্নয়নের জন্য, সর্বোপরি, সামনে এগিয়ে যাবার জন্য সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহারের কৌশল জানতে হবে। না জানলে তা অনুশীলন, অধ্যবসায় কিংবা ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমে আয়ত্তে আনতে হবে। সময় যতই সংক্ষিপ্ত বা দ্রুতগামী হোক না কেন, অধ্যবসায়ীর কাছে দৌড় প্রতিযোগিতায় সে পরাজিত হতে বাধ্য। কোনো অধ্যবসায়ীকে সময় হারাতে পারে না, সময়ই তার কাছে হেরে যায়।

সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করুন, আপনার অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো জেনে নিন, জীবনকে উপভোগ করুন এবং এ পৃথিবীতে আপনার কাজের চিহ্ন রেখে যান। সময়ের সঠিক ব্যবহার না জানলে এর অপচয় হবে। সময়ের অপচয় করা মোটেই ঠিক নয়। কারণ আল্লাহ্তালা একজন মানুষকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন কিছু অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে। সময়ের অপচয় হলে অনেক কাজ বাকি থেকে যাবে। অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করা যাবে না। তা করা না গেলে তিনিও অসন্তুষ্ট হবেন। তাঁর কাছে ফিরে যাওয়ার সময় এমনভাবেই যেতে হবে, তিনি যে দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তা যেন সম্পন্ন করে ফিরে যাওয়া যায়। এই জন্যই কথায় আছে- সময়ের এক ফোঁড় আর অসময়ের দশ ফোঁড়। সময় সবার সব সময়ে অনুকূলেও থাকেনা। তাই সব কাজ ভেবেচিন্তে করতে হবে।

সময়ই হচ্ছে জীবন। একে জমিয়ে বা থামিয়ে রাখা যায় না। সময় চলমান নদীর মতো। পানির ¯্রােতকে থামিয়ে রাখা যায় না। আমার জীবনের মূলনীতি হচ্ছে, প্রতিটি মিনিটই আমার জীবনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, মূল্যবান, তাৎপর্যময়, আনন্দময় এবং ভালো কাজ সম্পাদনের মাধ্যম। যদি আপনি তা চান, তাহলে আপনাকে জীবনের প্রতিটি মিনিট কাজে লাগাতে হবে। কখনও কাজ ও চিন্তাকে থামিয়ে রাখবেন না। জীবনের প্রতিটি মিনিটকে আনন্দময় এবং উদ্ভাবনাময় করে তোলার চেষ্টা করুন এবং নিশ্চিত থাকুন এসব আপনার জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে।

আজ যাকে পাব কাল তাকে না-ও পেতে পারি। তাই আমার সঙ্গে যাঁরা আছেন, যাঁদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছেÑ সবাইকে জীবনের অংশ মনে করে যথাযোগ্য গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করি।

সময় নদীর ¯্রােতের মতো, আপনি এই ¯্রােতকে একস্থানে দুই বার আটকে রাখতে পারবেন না। জীবনের সময় ক্রমশ কমতে থাকে। মানুষ বয়স গণনা করে বলে, বয়স কত হলো, মানে কত বাড়ল। আসলে তো তার বয়সটা বাড়ছে মনে হলেও পৃথিবীতে তার সময়টা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। এই কারণে সময়কে গুনতে হবে উল্টো করে। ভাবতে হবে জীবনের সময় থেকে এক একটি করে দিন কমে যাচ্ছে। হাতে বেশি সময় নেইÑ সেটাও মনে রাখতে হবে। আর কাজ করতে হবে বেশি। এখনকার কাজ পরবর্তী সময়ের জন্য, আজকের কাজ কখনও আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা যাবে না। তা করলেই হিসাব মিলবে না। অলসতা পরিহার করা জরুরি।

প্রতি সেকেন্ড আমার কাছে নতুন, প্রতিটি নতুন সূর্য আমাকে একটি নতুন জীবন উপহার দেয়। তাই আমি বর্তমানকে গুরুত্বের সঙ্গে বরণ করি, ব্যবহার করি, আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করি। প্রতিটি মুহূর্তকে অবস্থা বিবেচনায় অভিযোজনীয় কৌশলে নান্দনিক করে তুলি। শিশুকাল, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য- প্রতিটির আনন্দ আছে, সার্থকতা আছে। আমার উপলব্ধিই আমার উপভোগ। মানুষ এককভাবে বাস করতে পারে না। প্রত্যেককে নিয়ে আমি, আমাদের নিয়ে সমাজ, দেশ ও জাতি। আজ যাকে পাব কাল তাকে না-ও পেতে পারি। তাই আমার সঙ্গে যাঁরা আছেন, যাঁদের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছেÑ সবাইকে জীবনের অংশ মনে করে যথাযোগ্য গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করি।

প্রতিটি নতুন দিন নিয়ে আসে নতুন সুযোগ। যাঁরা মিনিটের পর মিনিট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা এবং দিনের পর দিন অযথা ব্যয় করেন, কোনো মূল্যায়নই করেন না, তাঁরা জীবনকেই মূল্যায়ন করেননি। আমার খুব দুঃখ হয়, যখন দেখি তরুণরা বহু সময় সিনেমা দেখার পেছনে, কফি হাউজে, টিভি এবং ভিডিও গেম্স্ খেলে অযথা সময় নষ্ট করে। তাদের এই সময়গুলো ছিল দেশের, সমাজের, পরিবারের এবং প্রজন্মের উন্নতির ও সমৃদ্ধির জন্য খুবই মূল্যবান সম্পদ। অনেকে আমার কর্মকে কষ্ট মনে করে বিশ্রামের আশ্রয় নেওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। প্রকৃতপক্ষে কাজের চেয়ে আনন্দের আর কিছু নেই। ডড়ৎশ রং সধহ’ং সড়ংঃ হধঃঁৎধষ ভড়ৎস ড়ভ ৎবষধীধঃরড়হ.৫৪ ডড়ৎশ রং হড়ঃ ঢ়ঁহরংযসবহঃ. ওঃ রং ৎবধিৎফ, ংঃৎবহমঃয, ঢ়ষবধংঁৎব.৫৫

সময়কে যথাযথ ব্যবহারের আর একটি কৌশল হচ্ছে কর্মবিভাজন। আমি তা-ই করি, যা করতে পারি, তা-ই চাই যা আমার আছে; আমি তা হতে চাই যা আমি ইতোমধ্যে হয়ে আছি। এর বেশি কিছু চেয়ে হতাশ হতে চাই না। হতাশা মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব নষ্ট করে দেয়। আমি হতাশ হই না, কারণ হতাশ করার মতো কোনো উচ্চাকাক্সক্ষায় আমি নিজেকে জড়াই না, আমার আকাক্সক্ষা অন্যের কাছে উঁচু হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে তা আমার আয়ত্তের জিনিস। তাই আমি সবসময় প্রফুল্ল থাকি। আমার হাসি আমার প্রফুল্লতার প্রকাশ। আমাকে আমার কর্ম দ্বারা বড় হতে হবে। আপনাকে কেউ বড় হবার জন্য অনুগ্রহ করবে না। আপনার দক্ষতাই আপনাকে সহায়তা দেবে। আপনার বোঝা আপনাকেই বহন করতে হবে। আপনার শরীরের কষ্ট আপনার নিজের। কেউ এর ভাগ কখনও নেয়নি, নেবেও না এবং নিতে পারে না। মনে রাখবেন, যেখানে পরিশ্রম নেই, সেখানে কোন সাফল্য নেই। চেষ্টা ও কর্মের উপরে মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ে উঠে। জীবনে সুখী হতে হলে- সহিষ্ণুতা, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস চাই এবং পরিশ্রম চাই। তাহলে সব দুঃখের কালো ছায়া মাথার উপর থেকে সরে যাবে- জীবন নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হবে।

সময়কে ব্যবহার করতে হবে সময়ের মতো নিষ্ঠায়। আর তাকে ব্যস্ত রাখতে হবে স্বপ্ন, জ্ঞান-অনে¦ষণ আর অধ্যবসায়ী শ্রমে- উৎবধস, উরংপড়াবৎ ধহফ উড়.৫৬ স্বপ্ন দেখতে হবে সৃজনশীলতার। তবে শুধু নিজের কল্যাণের জন্য স্বপ্ন দেখলে হবে না। সবার জন্য স্বপ্ন দেখতে হবে। জানতে হবে এবং জানার কোনো বিকল্প নেই। নিজে কাজ না করে অন্যের কাছ থেকে পাওয়ার প্রত্যাশা ভিক্ষাবৃত্তির নামান্তর; এমন আচরণ ব্যক্তিকে পরমুখাপেক্ষী করে রাখে। নিজের স্বপ্ন নিজে বাস্তবায়ন করতে পারার মতো আনন্দ আর কিছু হতে পারে না। মনে রাখবেন, সময়ের সদ্ব্যবহার হলো সবচেয়ে বড় সম্পদ। অর্থ সম্পদ হারালে তা ব্যবসা-বানিজ্যের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব। জ্ঞানের অভাব হলে তা অধ্যয়নের মাধ্যমে পূরণ করা যায়। স্বাস্থ্য নষ্ট হলে সংযম দ্বারা, চিকিৎসা দ্বারা পুনরুদ্ধার করা যায়। কিন্তু সময়ের সদ্ব্যবহার করা না গেলে তা চিরদিনের জন্য চলে যায়।

একটি বছর ৩৬৫ দিনের সমষ্টি। ভালো কথা, তবে আমি বলি : বছর হচ্ছে কতগুলো দিনের সমষ্টি, যা আপনি ব্যয় করছেন পরিবারের, সমাজের এবং আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য। কেননা এই দিনগুলোই একমাত্র গণ্য হবে, যখন আপনি জীবনী লিখবেন। সুতরাং প্রতিটি মিনিট, ঘণ্টা এবং দিনকে কাজে লাগান। সময়কে ভালো কাজে ব্যয় করুন। আপনার অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো জানুন, জীবনকে উপভোগ করুন এবং এই পৃথিবীর বুকে পদচিহ্ন রেখে যান। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- কোনো সময়ই এমন কাউকে আপনার জীবনের সঙ্গে জড়াবেন না, যা আপনার সময়কে চুরি করে নিয়ে যাবে। এরকম যদি কেউ আপনাকে পেয়ে বসে, তবে তারা আপনার জীবনকেই চুরি করে নিয়ে যাবে। তাই সাবধান।

২০.বাংলার বসন্ত

সৈয়দ আবুল হোসেন: আজকাল প্রতিটি সভা-সম্মেলনের প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছেÑ বাংলাদেশের বসন্তে অন্তরায় হচ্ছে জঙ্গিবাদ। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এর প্রতিক্রিয়া কী তা নিয়েও আলোচনা হয়। জঙ্গিবাদ এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে যেÑ  এটা চিরতরে নির্মূল করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। কেবল পুরুষ নয়, এই জঙ্গী দলে নারীও নাকি নাম লিখিয়েছে। ভারতে আবার ধরাও পড়েছে ওই জঙ্গিদের দুজন। জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের জন্য একটা বড় সমস্যা। তবে এই সমস্যা রাতারাতি তৈরি হয়নি। মোটা দাগে বলতে গেলে, তাদের দীর্ঘদিনের অগ্রহণযোগ্য ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টি থেকে বাংলার বসন্তের অন্তরায় সৃষ্টি হয়েছে। তাদের নির্মূল করতে হবে। উন্নয়নের যে হাওয়া বইছে এই পরিবর্তনের হাওয়াকে কাজে লাগাতে না পারলে বহু বছর ভুগতে হবে আমাদের।

আমি সরকারে থাকতে এবং সরকারের বাইরে আসার পরও বিভিন্ন সময়, আমাদের নেতৃবৃন্দকে উচ্চঃস্বরে এবং পরিষ্কারভাবে এ বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম- নাগরিক সুবিধা বাড়াতে হবে। জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে হবে। এটা যদি নির্মূল করা না যায় এবং সরকার যদি আরও নাগরিক সুবিধা বাড়াতে নিজেদের আমূল সংস্কার করতে সক্ষম না হয়, তাহলে নাগরিকরা তাদের ক্ষমা করবে না এবং ইতিহাস তাদেরকে রূঢ়ভাবে বিচার করবে। আমি তাঁদেরকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি- বদলে যান অথবা নিজেদেরকে যাঁরা বদলাতে চান তাঁদেরকে গ্রহণ করুন। আমি এখনও বলি, যারা অন্যদের উপকার করবে নাÑ ওইরকম নেতার কোনো দরকার নেই। দেশপ্রেমিক নেতা আনুন। তাঁরা নিজের নয়, দেশের স্বার্থে আর জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করবেন।

আমি অনেক কিছুই আগে থেকে অনুমান করতে পারি। এটা একটা বিশেষ যোগ্যতা বলতে পারেন। তাই আমি সবসময় সবদিক খেয়াল রেখে কার্যক্রম গ্রহণ করিÑ যেন আমার কাজের দ্বারা সরকারি নীতিমালার কোনো ব্যত্যয় না ঘটে। আমি চাই না আগামীদিনের একটি মুহূর্তও আমরা কষ্টে থাকি। আমরা যেন জনগণকে নিয়ে ভালো থাকতে পারি। অনেক সময়ই অনেক বিপদ আসে। সেটা সরকার মোকাবিলাও করছে। আমাদের পূর্বের ইতিহাস থেকে আমার শিক্ষা নিতে হবে। কোন ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে বা ঘটবে, সে সম্পর্কে ইতিহাসই আমাকে স্বচ্ছ ও স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে। প্রতিটি ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। প্রতিটি ঘটনাই নতুন ঘটনার জন্ম দেয়। আমি দেশের নতুন বা পুরাতন কোনো সরকারের বিচার-বিশ্লেষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হইনি। এটা ধ্রুব সত্য যে, আমি জনগণের কর্মকা-ের বিচার-বিশ্লেষণ করারও কেউ নই। তবে যেটা সত্য, সেটা বলতে হবে। মিথ্যাটাকে ধরে রাখা যাবে না। জনগণের উচিত তার অধিকার, ইচ্ছা, অনিচ্ছার কথা তুলে ধরা। সরকার যা করে গেল তার পছন্দ হলো না কিন্তু কিছু বলার সুযোগ নেই বলে মেনে নিল- বিষয়টা এমন হলে চলবে না। সবারই অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সরকার ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

যখনই কোনো সমস্যা তৈরি হয়েছে, তখনই তা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার জন্য নিজেকে ইতিহাসের পাতায় অনুসন্ধানে নিয়োজিত করেছি। আমার প্রিয় নেতৃবৃন্দ ও নায়কগণের জীবনী পড়েছি। অনেক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি এবং কী ঘটতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে খোলাখুলি আলোচনা করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করেছি। তিনি আমার সব কথাই আগ্রহ সহকারে শুনতেন ও বিশ্বাস করতেন। কিন্তু দলের নেতাদের মধ্যে কয়েকজন আমার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাঁরা আমাকে সহ্য করতে পারতেন না। আমি নেত্রীর ¯েœহভাজন বলে তারা আমাকে মারাত্মক ঈর্ষা করতেন। এই কারণে দলের ভিতরে আগাগোড়া আমার একদল শত্রু গড়ে উঠেছিল। তাঁরা আমার বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু আমি দেশের জন্য কাজ করেছি। সরকারের প্রতি আমার অনেক আন্তরিক পরামর্শ ছিল। এতে আমার ব্যক্তিগত কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। আমি অন্তর থেকে আমাদের জনগণের কল্যাণ চাই।

সরকারি কর্মকর্তাদের বলেছি, আপনাদের অবশ্যই আমূল পরিবর্তনের জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে এবং জনগণের জন্য এ আমূল পরিবর্তন অবশ্যই প্রয়োজন। সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত জনগণকে কিছু দেওয়া এবং দেওয়ার চেষ্টা করা। জনগণের একমাত্র চাওয়া একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন। সরকারি কর্মকর্তাগণ ইচ্ছা করলে তা দিতে পারেন। তাঁদের উচিত জনকল্যাণে নিবেদিত থাকা এবং জনগণকে এমন কিছু প্রদান করা যা আপনাদের পক্ষে করা সম্ভব। সরকারি কর্মকর্তাদের জেনে রাখা উচিত, আমাদের উন্নয়নের পথে জঙ্গিবাদ একটি অন্তরায় এবং সেটা নির্মূল করাও জরুরি।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় আমি গভীরভাবে বিশ্বাসী। তবে যে গণমাধ্যমে আক্রোশবশত কার্টুন ছাপে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রিপোর্ট করে আর যে গণমাধ্যমে মিথ্যে রিপোর্টিং করা হয়, আর যাই হোক ওইসব গণমাধ্যমে আমার কোনো আস্থা নেই। কারণ, আমি মিথ্যাটাকে সহ্য করতে পারি না। আমাকে নিয়ে কত মিথ্যা কথাই-না সংবাদমাধ্যমগুলো প্রকাশ করেছে। এর কোনো জবাবদিহি আছে! সেটা তো নেই।

জঙ্গিরা মনে করে, তাদের ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ^াস বিদ্যমান। কেউ জনগণকে এক বছর অথবা দুই বছরের জন্য বোকা বানাতে পারে, তবে চিরদিন তাদের বোকা বানিয়ে রাখা যায় না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে জঙ্গিরা নিজেরাই জানে না যে, তারা সবচেয়ে বেশি বোকামির মধ্যে আছে। তারা গণমাধ্যমের ওপর বলপ্রয়োগ করে, যাতে গণমাধ্যম সব ব্যাপারে ইতিবাচক খবর পরিবেশন করে। আর তারা এসব খবরের ওপর দৃঢ়ভাবে বিশ^াস রাখতে চায় এবং এমন এক ঘোলাটে পরিবেশের সৃষ্টি করে যেন দেশে কোনো সমস্যা নেই। বলে রাখা ভালোÑ সামাজিক গণমাধ্যমের দ্রুত বিকাশ হচ্ছে, এর মাধ্যমে বহু সত্য প্রকাশিত হয়ে পড়ছে। জনগণের ধৈর্যশক্তি কমে যাচ্ছে। বিস্ফোরণ অনিবার্য হয়ে পড়ছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় আমি গভীরভাবে বিশ্বাসী। তবে যে গণমাধ্যমে আক্রোশবশত কার্টুন ছাপে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রিপোর্ট করে আর যে গণমাধ্যমে মিথ্যে রিপোর্টিং করা হয়, আর যাই হোক ওইসব গণমাধ্যমে আমার কোনো আস্থা নেই। কারণ, আমি মিথ্যাটাকে সহ্য করতে পারি না। আমাকে নিয়ে কত মিথ্যা কথাই-না সংবাদমাধ্যমগুলো প্রকাশ করেছে। এর কোনো জবাবদিহি আছে! সেটা তো নেই।

আমি দেশের নতুন বা পুরাতন কোনো সরকারের বিচার-বিশ্লেষক হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হইনি। এটা ধ্রুব সত্য যে, আমি তাদের, জনগণ ও বিপ্লবের বিচার-বিশ্লেষণ করারও কেউ নই। তবু যেটা করলে জনগণের উপকার হবে, আমার অভিজ্ঞতায় যা দেশের জন্য, মানুষের জন্য কল্যাণকর মনে হবে- তা আমি অবশ্যই করব এবং বলব। আমার একমাত্র ইচ্ছা বা আকাক্সক্ষা, জনগণের জন্য স্থিতিশীল, নিরাপদ, শান্তি এবং অগ্রগতিপূর্ণ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্য কাজ করে যাওয়া। একমাত্র সততা ও ভালবাসা দিয়ে, জনগণের কল্যাণে কাজ করে মানুষকে জয় করা যায়, পৃথিবীকে জয় করা যায়। যে ব্যক্তি সততা ও সদিচ্ছা নিয়ে কাজে নামে, তার কোন কাজই অসম্ভব বলে মনে হবে না। সরকারের বেলাও একই কথা প্রযোজ্য। আমার জীবনের অভিজ্ঞতায় আমি এ সত্য বুঝেছি।

 

জনগণ চায়, সরকার যেন তাদের ভালো স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বাসস্থান, বিচার এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দেয়। তারা সত্যিকারের আর্থনীতিক উন্নয়ন চায়। আর এটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য, যখন আমরা সরকারি কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিই। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার এসব অর্জনের জন্য নীতি গ্রহণ না করবে ও ওয়াদাবদ্ধ না হবে, ততদিন অশান্তি, বিশৃৃঙ্খলা এবং সংকট চলতেই থাকবে।

এই বইয়ের শুরুতে আমি উল্লেখ করেছিলাম, জনগণের শান্তি ও কল্যাণের জন্য সরকারের কাজ করা উচিত। নানা সীমাবদ্ধতা ও ভুল-ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও আমাদের নেতৃবৃন্দেরও একটাই লক্ষ্য ছিল এবং সেটি হচ্ছে জনগণকে সুখে ও শান্তিতে রাখা। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাঁরা বিরামহীনভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। হয়তো শতভাগ সফলতা অর্জন হচ্ছে না, কিন্তু যা অর্জিত হচ্ছে তা কিন্তু ফেলনা নয়, নানা কারণে তা উল্লেখযোগ্য। তাই এত বিশাল জনগোষ্ঠীর ছোট ভূমি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিশ্ব-অর্থনীতিতে অনেককে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। জনগণের উচিত সরকারকে ভালো কাজে সহায়তা করা। তাহলে দেশ আরও এগিয়ে যাবে এবং নেতৃবৃন্দেরও কর্তব্য অধিক সংখ্যক জনগণকে রাষ্ট্রীয় কাজে সম্পৃক্ত করার কৌশল খুঁজে বের করা। জনগণের জন্য কাজ করা। মানুষের শ্রেষ্ঠ কাজ হলো ভালো কাজ করা। দেশের সুবিধা-বঞ্চিত লোকদের জন্য কাজ করা, শিক্ষার জন্য কাজ করা। মহৎ কাজ, ভালো কাজ কখনো হারিয়ে যায় না।

২১.বিনিয়োগ

সৈয়দ আবুল হোসেন: বহু বছর ধরে গোটা ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ পোশাকশিল্পের পণ্যের জন্য স্থিতিশীলতার স্তম্ভ হিসাবে পরিচিত। এ খাতে বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্যস্থল, আঞ্চলিক ব্যবসার কেন্দ্রবিন্দু এবং এক্ষেত্রে অর্থনীতির দ্বার হিসাবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করা হয়। সম্প্রতি কিছু প্রশ্নের উদয় হয়েছে, পোষাকশিল্পে বিভিন্ন দুর্ঘটনাই তার জন্য দায়ী। এর পাশাপাশি এটা নিয়ে অনেক অপপ্রচারও হয়েছে। তবে হিসাব করে দেখা দরকার, আমরা বিদেশ থেকে আর্থনীতিকভাবে কী লাভবান হয়েছি। বিশেষ করে, আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলো থেকে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের তুলনায় ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ভারত, পাকিস্তানসহ প্রতিবেশী অনেক দেশে এ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক। আন্তর্জাতিকভাবে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহের তালিকায় ১২০ থেকে ১১৪তম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে ৯১৩ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলার যা ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের চেয়ে ২১৩ মিলিয়ন ডলার বেশি। তবে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের চেয়ে এ বিনিয়োগ ১৭৩ মিলিয়ন ডলার কম। ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আঙ্কটাড)-এর বিশ্ব-বিনিয়োগ প্রতিবেদনে এ তথ্য ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বলা যায়, ২০১০ খ্রিস্টাব্দে বৈদেশিক বিনিয়োগে ভারতে ৩০ শতাংশ, আফগানিস্তানে ৫৮ শতাংশ, ভুটানে ২৫ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৩ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশে ৩০ শতাংশ এবং শ্রীলংকায় ১৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আর্থনীতিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি অন্যান্য দেশের তুলনায় আশাব্যঞ্জক।৫৭

টাকার অঙ্কে ২০১০ খ্রিস্টাব্দে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে সিঙ্গাপুর থেকে এর পরিমাণ ৩১৭ দশমিক ১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর পরে যুক্তরাজ্য ১০৫.৬৮, নেদারল্যান্ড ৬৪.৯২, হংকং-চীন ৬৩.৮৪, যুক্তরাষ্ট্র ৫৬.৯৫, ভারত ৪৩.১৯, দক্ষিণ কোরিয়া ৪০, নরওয়ে ৩৯.১৬, সংযুক্ত আরব আমিরাত ২৪.৫, জাপান ২১.৭৯, পাকিস্তান ১৮.৮৮ ও অস্ট্রেলিয়া ১৩.৯৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে টেলিযোগাযোগ খাতে, যা প্রায় ৩৬০ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া, টেক্সটাইল খাতে ১৪৫ দশমিক ১৯ মিলিয়ন ডলার, ব্যাংকিং খাতে ১৬৩ মিলিয়ন ডলার, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও জ্বালানি খাতে ৯২ দশমিক ০৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, খাদ্য উৎপাদন খাতে বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে এ খাতে বিনিয়োগ হয়েছে ১২ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার, ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে ছিল ২৪ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য, ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক (৩৫.৫৪ শতাংশ) ছিল। বিগত কয়েক বছরের তথ্য থেকে দেখা যায়, ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে সর্বোচ্চ ১০৮৬ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছিল বাংলাদেশে।৫৮

পোশাকশিল্পে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে ভালো অবস্থান করে নিয়েছে। এটা অনেকেই মেনে নিতে পারছে না বলে কিছু শত্রুও তৈরি হয়েছে। আর মাঝে মাঝে দুই-একটি দুর্ঘটনা ঘটলে তারা এর সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। আবার মাঝে মাঝে একটি শ্রেণি ইন্ধন দিয়ে দেশটাকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। এটা হলে অন্যান্য দেশগুলো বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগ নিতে চায়। এ বিষয়ে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে সরকার বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছে, অবস্থা তুলে ধরেছে। সবচেয়ে বিরক্ত ও অসস্তিকর বিষয় যে, পোশাকশিল্পের শ্রমিকরা যে কারনে, অন্যের ইন্ধনে অচলাবস্থা তৈরি করেÑ তাদের সে দাবির পেছনে কোনো যৌক্তিক ও সুর্নিদিষ্ট কোনো প্রমাণ নেই। তবুও তারা অন্যের ইন্ধনে কাজ করে। এই ব্যাপারে সরকার সবসময় তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে। যারা আমাদেরকে, সরকারকে পছন্দ করে তারা মনে করে সব ঠিক আছে। তবে আমদের শত্রুরা একে হীনস্বার্থে ব্যবহার করে নিজেরা লাভবান হয়।

বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্প খাত রপ্তানির সর্ববৃহৎ অংশ দখল করে রয়েছে। রপ্তানির ৭৮ শতাংশের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা এ খাত থেকে আসছে। জিডিপির ১৭ শতাংশ তৈরি পোশাকশিল্প খাত এনে দিয়েছে। এর ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। বস্ত্রখাতের তিনটি প্রধানতম উপখাত রয়েছে : স্পিনিং, উইভিং ও ডাইং; ফিনিশিং ও প্রিন্টিং খাত এবং তৈরি পোশাক খাত। দেশকে শিল্পবিপ্লবের দ্বারে পৌঁছে দিয়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প খাত। মাত্র ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৪ শতাংশ মোট রপ্তানি দিয়ে তৈরি পোশাকশিল্প তার যাত্রা শুরু করে। এখন মোট রপ্তানির ৭৮.৮৫ শতাংশ শুধু তৈরি পোশাকশিল্প খাত থেকে আসে।

বিটিএমএ-এর ২০১১ খ্রিস্টাব্দের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী দেশে স্পিনিং মিল রয়েছে ৩৮৫টি- যার উৎপাদন ক্ষমতা ৮.৭ মিলিয়ন স্পিন্ডিল, ০.২৩ মিলিয়ন রোটর। উৎপাদিত হচ্ছে ২০৫০ মিলিয়ন কেজি। টেক্সটাইল উইভিং শিল্প রয়েছে ৭২১টি। এর মধ্যে ১,৭২৫টি সাটেললেস, ১,৩৫,০০টি সাটেল। উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে ২৫০ মিলিয়ন মিটার বস্ত্র। বস্ত্রখাতে শুধু উইভিং মিল রয়েছে ৫৮৪টি, ডেনিস মিল রয়েছে ২০টি। হোম টেক্সটাইল ১৭টি, নিট কাপড় তৈরি মিল রয়েছে ২৩৩টি। অন্যদিকে ডাইং, প্রিন্টিং, ফিনিশিং মিল রয়েছে ২৩৩টি। ডাইং প্রিন্টিং মিলে উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে ২,২০০ মিলিয়ন মিটার।৫৯

বর্তমানে দেশে তৈরি পোশাকশিল্পের সংখ্যা ৫,১৫০টি। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১২টি শিল্পকারখানা নিয়ে এদেশে তৈরি পোশাকশিল্পের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৮৩-৮৪ খ্রিস্টাব্দে তৈরি পোশাকশিল্পের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৪টি। ৩৫ লাখ নর-নারী এখানে নিয়োজিত। তৈরি পোশাকশিল্পের আরেকটি দিক হচ্ছে নিটওয়্যার শিল্পখাত। দেশের ওভেন শিল্পের পাশাপাশি নিট শিল্প বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে মোট নিটশিল্পের সংখ্যা হচ্ছে ১,৮২১টি। বিকেএমইএ বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১১ অনুযায়ী এ খাত দেশের রপ্তানিতে ৪১.৩৬ শতাংশ অবদান রাখছে। অন্যদিকে ওভেন তৈরি পোশাকশিল্প খাত রপ্তানিতে অবদান রাখছে ৩৬.৭৮ শতাংশ। ২০১১ অর্থবছরে তৈরি পোশাকশিল্প খাতে মোট রপ্তানি হয়েছে ১৭ হাজার ৯১৪ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওভেন তৈরি পোশাক খাতে ২০১১ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ৮৪৩২.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। নিট খাতে রপ্তানি হয় ৯৪৮২.০৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এক্ষেত্রে নিট পোশাক ওভেন পোশাকের চেয়ে রফতানি বেশি করেছে।৬০

ইপিবি সূত্র অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে তৈরি পোশাকশিল্পে রপ্তানির দেশভিত্তিক চিত্র নিম্নরূপ : ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে ১০৫২০.৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ইউএসএ ৪৬২৫.১৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, জার্মানিতে রপ্তানি হয় ৩১৩০.৯৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ফ্রান্সে রপ্তানি হয় ১৪০৫.৬৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ইউকেতে ১৭৫৯.৮৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, স্পেনে ৮৪৯.৪১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, নেদারল্যান্ডসে ৯৬৫.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ইতালিতে ৭৬১.৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, কানাডায় ৮৯৪.৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, তুরস্কে ৫১৮.৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অস্ট্রেলিয়ায় ১৯২.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, জাপানে ২৪৭.৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ব্রাজিলে ৯৪.৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, রাশিয়া ফেডারেশনে ৫১.৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ও সাউথ আফ্রিকায় রপ্তানি হয় ৪৮.৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।৬১

বস্ত্রখাতের ওভেন, নিট ছাড়াও টেরিটাওয়াল আরও একটি উপখাত রয়েছে। এ খাতে শিল্পের সংখ্যা হচ্ছে ১০৫টি। এর অধিকাংশ শিল্পকারখানা চট্টগ্রাম ইপিজেডে অবস্থিত। কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঢাকায় রয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে টেরিটাওয়াল রপ্তানি হয় ৮৪ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪১ দশমিক ৮২ মার্কিন ডলার। শিল্পকারখানা বন্ধ রয়েছে ৪৮টি। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে এ খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩২ শতাংশ।৬২

প্রথমত, সবিনয়ে কিন্তু দৃঢ়ভাবে বলতে চাই- বাংলাদেশ এখনো প্রথম সারির দেশেরগুলোর একটি দেশ হতে পারিনি। তবে আমরা হতে চাইছি। জাতীয় আয়ের শতকরা হারে, আমরা বৈদেশিক সাহায্যের ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর একটি দেশ হতে আমাদের আরও সময় লাগবে। তবে এখন অনেক আশা আছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা সাময়িক উন্নয়নকে বাদ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই উন্নয়নকে আদর্শ হিসেবে নিয়েছি, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা দূর করতে সহায়তা করবে। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, শিখ প্রভৃতি ধর্মাবলম্বী ছাড়াও আমাদের দেশে ২৭টির অধিক জাতির লোক বসবাস করে। তারা সকলে কাজ করছে, বিনিয়োগ করছে এবং তারা তাদের সর্বোচ্চটাই দেওয়ার চেষ্টা করে। প্রতিবছর সারা পৃথিবী থেকে ২ লক্ষ ৫০ হাজার লোক আমাদের দেশে ভ্রমণ করতে আসে।৬৩

আমাদের এখানে গ্যাসের জন্য বড় বড় কোম্পানি আসতে পারে। রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করতে চায়। অন্যান্য ক্ষেত্রে বহু বিনিয়োগ করা হয়। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যে পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে, বিনিয়োগকৃত অর্থের খুব অল্প অংশই উঠে এসেছে। যারা বলে থাকে, আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশ লাভবান হয়েছে তাদের উদ্দেশ্যে জোর-গলায় বলতে চাই, বাংলাদেশে রাজনীতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে এটা দ্বিগুণ ও তিনগুণ বেশি লাভবান হতো, যদি এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা এবং শান্তি বিরাজ করত।

বাংলাদেশের নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়নের দরকার সমজোতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পূর্বশর্ত  সমজোতা। এ সমজোতা হবে জনগণের সাথে জনগণের। ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির। সমাজপতি, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গুণীজনদের মধ্যেও সমজোতা প্রয়োজন। বিশেষ করে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমজোতা হওয়া খুবই জরুরী। অন্যথায়, আমাদের মধ্যকার অনৈক্য জাতি হিসেবে আমাদের বিশ্বের কাছে ছোট করবে, আমাদের ধ্বংস করে দেবে। প্রবাদ আছে, যে রাজ্যে রাজা ও প্রজার মধ্যে সমজোতা রয়েছে- সেটাই স্বর্গরাজ্য। এ লক্ষ্যে দল-মত-নির্বিশেষে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। রাজনীতিক দলগুলোর মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। গণতন্ত্রকে সুসংহত করে রাজনীতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন করা সম্ভব। রাজনীতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগ বাড়াবে এবং দেশের সামগ্রিক আর্থনীতিক কল্যাণে অবদান রাখবে।৬৪ – ৬৬

২২.সৃজনশীলতা

সৈয়দ আবুল হোসেন: নতুন চিন্তা বা ধারণা সরকারি কাজের অগ্রগতিতে প্রেরণা ও শক্তি জোগায়। এ চিন্তা, ধারণা বা পরিকল্পনা সব স্থান থেকে আসে, আসতে পারে। এমন না যে, শুধু উপরের বড় বড় নেতৃবৃন্দের কাছ থেকেই আসে, একেবারে নিচ থেকেও নতুন চিন্তা-ধারণা ও পরিকল্পনা আসতে পারে এবং যথাযোগ্য হলে আমরা তা গ্রহণ করে থাকি। উদ্ভাবনশক্তি এবং সৃজনশীলতার ওপর বিচার-বিশ্লেষণ করে কর্মচারীদের অবশ্যই ক্ষমতায়ন করতে হবে। নেতৃবৃন্দের এবং দলের বোঝাপড়ার ফল হচ্ছে সৃজনশীল চিন্তা। পরামর্শ এবং সহযোগিতা আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এ ব্যাপারে হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কিছু হতে পারে না। তিনি সর্বদা তাঁর সাথিদের মতামত মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং উপযুক্ত হলে তা গ্রহণ করতেন। মহানবি (সা.) মানুষের বিবেক ও বিশ্বাসের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করে গিয়েছেন। ফলে স্বাধীনভাবে সকলে যার যার ধর্ম-কর্ম পালন করার সুযোগ পায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক কোরানে ঘোষণা করেছেন : দ্বীনের ব্যাপারে জোর নেই, সত্য ভ্রান্ত-পথ হতে সুস্পষ্ট হয়েছে।৬৪ আল্লাহ্ আরও বলেছেন : মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই, সুতরাং তোমরা ভাইদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করো, যেন তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও (হুজুরাত : ১০)। মহানবি (সা.) বলেন, “তোমরা আদমের সন্তান, আর আদম (আ.) মাটির তৈরি।৬৫

শিক্ষা জ্ঞান দেয় বটে; তবে জ্ঞান আমার লক্ষ্য নয়, আমার লক্ষ্য প্রয়োগ। গ্রন্থগত বিদ্যার মতো প্রয়োগহীন জ্ঞানও অর্থহীন। জ্ঞান মানুষের চিন্তাকে শাণিত করে, ধারণাকে করে তীক্ষè ও বুদ্ধিকে কার্যকর এবং মূল্যবোধকে করে সর্বজনীন।

আত্মপরিবর্তন-ভাবনা সৃজনশীলতায় ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর সবাই পরিবর্তন চায়। কিন্তু অবাক হই যখন দেখি- কেউ নিজেকে পরিবর্তন করছে না। তাহলে পৃথিবীতে কীভাবে পরিবর্তন আসবে! নিজেকে পরিবর্তন করলে পৃথিবীর পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যাবে। আসলে নিজেকে পরিবর্তন করা খুবই কঠিন। শিক্ষিত হলে মনের পরিবর্তন আসে। আমি মনে করি, শিক্ষা ছাড়া অন্য কোনোভাবে আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিক্ষা এমন একটি শক্তিশালী অস্ত্র যা আমরা অতি সহজে আমাদের মনমানসিকতা ও সমাজকে পরিবর্তন করার জন্য ব্যবহার করতে পারি। শুধু শিক্ষা যথেষ্ট নয়, প্রায়োগিক শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষা জ্ঞান দেয় বটে; তবে জ্ঞান আমার লক্ষ্য নয়, আমার লক্ষ্য প্রয়োগ। গ্রন্থগত বিদ্যার মতো প্রয়োগহীন জ্ঞানও অর্থহীন। জ্ঞান মানুষের চিন্তাকে শাণিত করে, ধারণাকে করে তীক্ষè ও বুদ্ধিকে কার্যকর এবং মূল্যবোধকে করে সর্বজনীন।

সংস্কার মানে পরিবর্তনশীলতা। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সকল আন্দোলন যেমন উন্নয়ন নয়, তেমনি সকল পরিবর্তনও কল্যাণকর নয়। আমার যা পছন্দ হয় নাÑ তা আমি পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। যা আমি পরিবর্তন করতে পারি নাÑ তা আমি গ্রহণ করার জন্য নিজের মনকে পরিবর্তন করে ফেলি। তবে যেটি পরিবর্তন করলে আমার ভালো লাগলেও অধিকাংশ লোকের ক্ষতি হয়Ñ সেটি আমি পরিবর্তন না করে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করি। আমি জানি, যা আসার তা আসবেই। একটি শক্তিশালী সেনা-আক্রমণকে রোধ করা যায়, কিন্তু একটি ধারণা যার আসার সময় হয়ে গেছে তা কোনোকিছু দিয়ে রোধ করা যায় না। সুতরাং অনড়তা নয়, বরং বিচক্ষণ পরিবর্তনশীলতাই প্রগতির লক্ষণ। প্রগতিশীল সরকার সৃজনশীলতাকে কাছে টেনে নেয়।

সৃজনশীলতা হচ্ছে অভীষ্ট লক্ষ্যের জীবনীশক্তি। এটা আমাদের কাজের উন্নতিতে অবদান রাখে, লোকজনকে সামনে এগিয়ে নেয় এবং আমাদের দেশকে উন্নত করে। একটি সৃজনশীল সরকার হয় একটি জীবন্ত পদ্ধতি, যা দেশের উন্নয়ন করে এবং মর্যাদা বাড়ায়।

চিন্তা, ধারণা এবং পরিকল্পনা সব লোকের কাছ থেকেই আসতে পারে। নাগরিক এবং অধিবাসী, শিশু এবং বয়স্ক, কর্মকর্তা এবং কর্মচারীÑ এদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই চিন্তা, ধারণা এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করা যায়, সে যতই সাধারণ হোক না কেন। আমার অভ্যাস প্রত্যেককে প্রশ্ন করা, নতুন চিন্তা ও ধারণা পাওয়ার জন্য। নতুন ধারণা বা চিন্তা আহরণের জন্য আমি বহু লোকজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। সেই ধারণা ও চিন্তা আমি আমাদের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করি। সৃজনশীলতার গুরুত্ব বোঝাতে আমাকে অল্পবিস্তর অপ্রাসঙ্গিক হতে হবে। সৃজনশীলতা প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সৃজনশীলতা ছাড়া অতীতের অর্জনসমূহকে আপনি কখনও চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন না। অন্যদের পেছনে ঠেলে না দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিকে পরিবর্তন করুন। দেখবেন, অনেক কাজ সহজ হয়ে যাবে; অসম্ভব বলে আর কিছু থাকবে না।

অনেকে মনে করেন, কাজের শেষ আছে। আমি বলি, জীবনের শেষ আছে, তবে কাজের শেষ নেই। প্রত্যেক মানুষ নিজস্ব বলয়ে একজন শিল্পী। শিল্পীর কাজ কখনও শেষ হয় না। একজন শিল্পী যখন তাঁর একটি শিল্পকর্ম শেষ করেছেন বলেন, তখন মূলত তিনি এটি সাময়িক বন্ধ রাখেন কিংবা পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন মাত্র। যতদিন জীবন ততদিন কাজ। কাজহীন মানুষ লাশের নামান্তর। কাজ করতে গেলে ভুল হয়। ভুল কাজের অংশ। তার ভুল হয় না- যে কোনোদিন কোনোকিছু করেনি। তাই আমি ভুলকে সৃষ্টির অনিবার্য অংশ মনে করি। তবে দেখতে হবে ভুল যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়।

মানুষের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হাত হচ্ছে ‘অজুহাত’, কোনো প্রয়াস ছাড়া মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ অজুহাত তৈরি করা যায়। এটা একটা বাজে অভ্যাস। ব্যর্থতাকে ঢাকার জন্য অনেকে অজুহাত তৈরি করে Ñ এটি আরও মারাত্মক। ব্যর্থতা মেনে নিতে হয়। কারণ, ব্যর্থতা অভিজ্ঞতার সোপান এবং সবচেয়ে বড় শিক্ষক। যার মধ্যে ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মানসিকতা নেই Ñ সে কখনও সফলতা আশা করতে পারে না, কারণ সে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হারিয়ে ফেলে। যৌক্তিক অপরাগতা স্বীকার সফল ও প্রতিশ্রুতিশীল মানুষের লক্ষণ।

এজন্যই প্রয়োজন জ্ঞান, অধ্যয়ন, বিচক্ষণতা এবং সততা। তাড়াহুড়ো চিন্তার সময়কে সীমিত করে, বাড়িয়ে দেয় ভুলের মাত্রা। ফলে অনেকে মাঝপথে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। আমি ধীরে হাঁটি, তবে পিছু হাঁটি না। যদি কখনও পিছোই তাহলে ধরে নিতে হবে আগুয়ান হবার জন্য পরিকল্পনামাফিক পিছু হাঁটি। প্রতিষ্ঠানের পরিবেশের মধ্য থেকে সৃজনশীলতা কখনও লাভ করা যায় না। সৃজনশীলতা শেখার কোনো বিষয় নয় এবং জ্ঞানের বিস্তারও ঘটায় না। এটা কেউ একটি প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জন করতে পারে না, বরং প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ করে দেয় অথবা চিন্তা ও লক্ষ্যের পরিষ্কার ও স্বচ্ছ বিনিময়ের জন্য সাহস দিতে ব্যর্থ হয়। তবে, আমি এমন অনেক প্রতিষ্ঠানের কথা জানি, যে সকল প্রতিষ্ঠান সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করার ক্ষমতা রাখে।

কীভাবে সৃজনশীল হওয়া যায়, এই প্রশ্নটা আসতেই পারে। এখানে আমি বলব- সেটা করতে হলে আমাদের নিজেদেরকে অভ্যাস করা  উচিত, অভ্যস্ত হওয়া নয়। পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে অভ্যস্ত করলে, তা আপনাকে স্বস্তি দেবে। অন্যদিকে, পরিবর্তন চাইলে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় এবং আপনাকে স্বস্তির স্থান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। মানুষ সাধারণত বদলাতে পছন্দ করে না এবং চাইলেই কেউ নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে না। কেননা, এর জন্য প্রয়োজন অভ্যাসের পরিবর্তন। সকল সৃজনশীল মানুষের উদ্দেশে বলতে চাই, সবসময় আপনাকে এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে, যিনি আপনার চিন্তাধারাকে বাস্তবায়নের জন্য প্রতিনিয়ত কাজ করে যাবেন। যিনি তাঁর মূল্যবান সময়টুকু ব্যয় করবেন আপনাদের কল্যাণে নিয়োজিত থেকে। যিনি নিজের স্বার্থকে পরের কারণে ত্যাগ করতে পারেন, বিলিয়ে দিতে পারেন- তিনিই প্রকৃত সৃজনশীল মানুষ। কারণ এর মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানসমষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিকেও সমৃদ্ধ করে। ঠিক পথে থাকার এটাই হচ্ছে প্রথম নিদর্শন। সকল কর্মকর্তার উদ্দেশে বলতে চাই- পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন না, বরং একে আলিঙ্গন করে নিন। মনে রাখবেন, যে কোন কাজের শুরু আছে, কিন্তু কাজ অব্যাহত রেখে শেষ না হওয়া পর্যন্ত, কাজের ফল না পাওয়া পর্যন্ত- তাকে সৃজনশীল বা মহৎ কাজ বলা যাবেনা। সৃজনশীল বা মহৎ কাজের শুরু থেকে শেষ করা পর্যন্ত কাজটি করার উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে হবে।

সৃজনশীলতা কী? এটি এমন একটি বহুমুখী ও জটিল বিষয় যাকে কোনো সংজ্ঞায় বা বর্ণনায় পরিষ্কারভাবে আবদ্ধ করা যায় না। সৃজনশীলতা পুরোই অনুধাবনের এবং সঙ্গে সঙ্গে চেষ্টা ও প্রয়োগের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িত একটি সতত পরিবর্তনশীল প্রত্যয়। আসলে ওঃ’ং রসঢ়ড়ংংরনষব ঃড় বীঢ়ষধরহ পৎবধঃরারঃু. ওঃ’ং ষরশব ধংশরহম ধ নরৎফ, ‘ঐড়ি ফড় ুড়ঁ ভষু? ণড়ঁ লঁংঃ ফড়’.৬৬ সুতরাং সৃজনশীলতার কোনো সংজ্ঞা বা গভীর বিবরণে না গিয়ে আমরা বলতে পারি : সৃজনের মন যখন সৃষ্টির জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে এবং সৃষ্টি তার কর্মপ্রক্রিয়ায় নিজেকে মেলে ধরতে সক্ষম হয়, তখনই বিকশিত হয় সৃজনশীলতা।৬৭ – ৮০

২৩.ভিশন-২০২১

সৈয়দ আবুল হোসেন: বিশে^র সেরা দেশগুলোর একটি হওয়ার স্বপ্ন দেখারÑ সব যোগ্যতাই আমাদের আছে। আছে উচ্চাকাক্সক্ষা। তবে আমরা শুধু উচ্চাকাক্সক্ষার ওপর নির্ভর করে বসে নেই। আমরা আমাদের উচ্চাকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা অন্যান্য উন্নত দেশগুলো থেকে পিছিয়ে নেই। আমাদের সক্ষমতা অন্যান্য মানুষের চেয়ে কম নয়। দেশের প্রতি আমাদের ভালবাসা তাদের থেকে কোনো অংশে কম নয়। উচ্চাকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য আমাদের পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে। বাংলাদেশের জনগণকে বোঝা মনে না করে সম্পদ ও শক্তিতে রূপান্তর করা গেলে সফলতা আসবেই। এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

সকল কর্মকর্তার উদ্দেশে বলছি, নিজেদের ওপর এবং সরকারের ওপর আস্থা রাখুন। আমরা বিশে^র প্রথম সারির দেশগুলোর একটি হতে পারি, সর্বদা এ বিশ^াস রাখুন।

আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সারাবিশ্বে প্রাকৃতিক দুর্যোগের নিবিড় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবহার এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে ভূমিকা, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক ও অর্থনীতিক সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন ও শত্রুমুক্ত হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অবকাঠামোবিহীন নতুন দেশটির ৪৩ বছরের অর্জনের পরিসংখ্যান হতবাক করে দেওয়ার মতো। সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৮টি লক্ষ্যের মধ্যে শিক্ষা, শিশু মৃত্যুহার কমানো এবং দারিদ্র্য হ্রাসকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের শিক্ষণীয় প্লাটফর্ম। অমর্ত্য সেনের ভাষায়, “কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বকে চমকে দেওয়ার মতো, বিশেষত- শিক্ষাসুবিধা, নারীর ক্ষমতায়ন, মা মৃত্যুহার, শিশু মৃত্যুহার ও জন্মহার হ্রাস, দরিদ্র জনগণের জন্য শৌচাগার ও স্বাস্থ্য সুবিধা প্রদান এবং টিকাদান কার্যক্রম।”৬৭

ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এ অংশে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলো উপস্থাপন করা হবে। সরকারের কার্যক্রমগুলোতে নেতৃত্বের মূল বিষয়গুলো তুলে ধরা হবে। তার মাধ্যমে সারাবিশে^ সেরা হওয়ার ব্যাপারে আমাদের উচ্চাভিলাষী হতে তাড়িত করবে। আমাদের ওয়েবসাইট-এ আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

প্রতিযোগিতামূলক আর্থনীতিক জ্ঞান

এ বিষয়ে আমাদের প্রচ- উচ্চাকাক্সক্ষা রয়েছে এবং এর ওপর আমাদের আন্তর্জাতিক মর্যাদা নির্ভর করে। এ বিশ^াসের কারণ হচ্ছে, অর্থনীতির উন্নতি মানুষের জীবনকে মর্যাদাশীল করে। আর আমাদের লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষের আর্থনীতিক ভিতকে শক্তিশালী করে তোলা। একটি সরকারের মৌলিক কাজ হচ্ছে, দেশের জনগণকে সুখে রাখা, কারণ তার মাধ্যমে নাগরিকদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত হয়। মর্যাদাপূর্ণ জীবনের প্রধান ভিত্তি হচ্ছে ভালো আয়, যার সঙ্গে জাতীয় আর্থনীতিক শক্তির গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

বৈচিত্র্যময় আয়ের উৎস দিয়ে আমাদের অর্থনীতিকে চিত্রায়িত করা যায়। আর শুরুর দিকে আমরা এই কৌশলকে সফলতার সঙ্গে সম্পাদন করতে সক্ষম হয়েছি। উদাহরণ হচ্ছে, বহু গ্যাস-সমৃদ্ধ দেশ গ্যাসকেই তাদের অর্থনীতির একমাত্র উৎস হিসাবে গ্রহণ করেছে। আমরা তা করিনি। নানা সেক্টরে উৎস তৈরি করার চেষ্টা করছি। আমাদের অর্থনীতির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, সারাবিশে^ নিজেদেরকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলা, অগ্রগতি ও উন্নয়নকে চলমান রাখা। সারাবিশে^র প্রতিপক্ষ প্রতিযোগীদের শক্তির ওপর আমাদের তীক্ষè দৃষ্টি রাখতে হবে। যদি আমরা আমাদের শক্তি হারিয়ে ফেলি, তাহলে আমাদের পশ্চাদপসরণ শুরু হবে। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, ব্যবসায় ও আর্থনীতিক সূচকে বিশ^-র‌্যাঙ্কিঙে প্রথম দশটি দেশের একটি হিসাবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করা।

আমাদের অর্থনীতির দ্বিতীয় লক্ষ্য হচ্ছে, ছোট ও মাঝারি মানের ব্যবসায় উন্নয়নের জন্য সহযোগিতা করা, যাতে এক্ষেত্রে বহু উদ্যোক্তা তৈরি হয়। আমি বিশ^াস করি, নিজস্ব ব্যবসায়ের মাধ্যমে আমাদের নাগরিকরা আর্থনীতিকভাবে শক্তিশালী হবে। যে ব্যবসায়ে থাকবে সৃজনশীলতা, উদ্যোগ এবং আত্মনির্ভরশীলতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আমাদের উচিত- স্কুল, কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়কে উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্র হিসাবে গড়ে তোলা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মাত্র দুই লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসায় শুরু করুন। কারও কাছে চাকরির জন্য যাবেন না। কারও মুখের ঝামটি খাবেন না। আজকের তরুণরাই হয়তো আগামী দিনে আরও বেশি বেশি করে ব্যবসায় করবে, দেশকে সমৃদ্ধশালী করবে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন

আমাদের সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, একটি উন্নত চরিত্রের সমাজ গঠন করা। মানবসম্পদ উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে, বিশেষ করে- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সংস্কৃতিতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। আমরা মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দশটি দেশের একটি দেশ হিসাবে দেখতে চাই। সম্প্রদায়ের সকল সদস্যকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি শক্তিশালী পরিবার গঠন করতে হবে। আমাদের বিশ^াস, সুখী দেশগুলোর সূচকে বিশে^র প্রথম সারির একটি দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ।

সারাবিশে^র প্রতিপক্ষ প্রতিযোগীদের শক্তির ওপর তীক্ষè দৃষ্টি রাখতে হবে। যদি আমরা একদিনের জন্যও আমাদের শক্তি হারিয়ে ফেলি, তাহলে পরাজিত হয়ে আমাদের পেছনে ফিরে যেতে হবে। আজ পৃথিবীটা চলছেই প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে। সে-দৌড়ে ধীরে চলার নীতি অনুসরণ করার কোনো সুযোগ নেই। সেটা করলে পিছিয়ে পড়তে হবে। একবার পিছিয়ে পড়লে দৌঁড়ে গিয়ে আবার তাদের সঙ্গে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। তা হবে কচ্ছপ আর খরগোশের গল্পের মতোÑ যেখানে পরাজয় অনিবার্য হয়ে উঠবে। তাই দ্রুত পৌঁছাব মনে করে ধীরে চললে হবে না।

আমাদের একটি পরিশ্রমী এবং প্রচ- সাহসী প্রজন্ম রয়েছে। আমাদের উচ্চাকাক্সক্ষী তরুণ সৃজনশীল উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে, যারা হবে খুবই দায়িত্বশীল। আমরা আমাদের তরুণদের ওপর আস্থা রাখছি, তারা নিজেদের অর্জনকে উপভোগ করবে এবং তাদের পরিবারের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে। আমাদের সরকারের লক্ষ্য ২০২১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বেসরকারি খাতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব ১০ গুণ বৃদ্ধি করা। সরকারের জন্য চাকরির নিরাপত্তা দেওয়া খুব বড় সমস্যা নয়। অপরদিকে, এটা জাতীয় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর অন্যতম খাত। এই খাতের আরও ব্যাপক উন্নয়ন হতে পারে।

টেকসই পরিবেশ এবং অবকাঠামো

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার অবকাঠামোর উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। আর এটা দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কেননা, মানবসম্পদ উন্নয়নের চেয়ে কম সময় লাগে বস্তুগত উন্নয়নে।

টেকসই উন্নয়ন হচ্ছে এমন একটা উন্নয়ন যা বর্তমান জনসংখ্যার সার্বিক প্রয়োজন শুধু মেটাবে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন মেটাতেও সক্ষম হবে। টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের প্রশ্নটি জড়িত। দারিদ্র্য, ভূমিহীনতা, অপুষ্টি, অবহেলিত মৌলিক প্রয়োজন ও সেবার অভাব প্রভৃতি সমস্যার ফলে প্রতিবেশ, আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন হয়। আর্থনীতিক উন্নয়ন উদ্যোগের ফলে কিছু কিছু সেক্টর লাভবান হলেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিবেশ ও আর্থনীতিক ভারসাম্য নষ্ট করে। পরিবেশের যাতে ক্ষতি না হয় সেটি সচেতনভাবে খেয়াল রাখতে হবে।

একটি জাতিকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সমৃদ্ধ ও স্বকীয় ধারায় সমুন্নত রাখতে হলে টেকসই উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। টেকসই উন্নয়নের ফলে শিকড়বিহীন প্রবৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব হবে। নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় বিসর্জন দিয়ে কোনো সমাজের উন্নয়নকে সাধারণত ‘শিকড়বিহীন প্রবৃদ্ধি’ বলা হয়। আকাশসংস্কৃতির বদৌলতে আমাদের সমাজে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটছে। একমাত্র টেকসই সাংস্কৃতিক উন্নয়ন কৌশলই পারে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা করতে। সাংস্কৃতিক স্বকীয়তার মাধ্যমেই কেবল টেকসই উন্নয়ন ও স্বকীয় মর্যাদায় অভিষিক্ত স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণ সম্ভব।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য টেকসই উন্নয়নের উদ্যোগ একান্ত জরুরি। যে সকল বিষয়ে এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : (১) জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি ও স্থানান্তর, (২) দারিদ্র্য ও অপুষ্টি, (৩) ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, (৪) কৃষি উৎপাদনে বিপর্যয়, (৫) পানির প্রাপ্যতা ও সুষম বণ্টন, (৬) ভূমির ওপর চাপ হ্রাস, (৭) বনাঞ্চল ক্ষয়রোধ, (৮) মৎস্যচাষের উন্নয়ন ও বাধা নিরসন, (৯) জীববৈচিত্র্য হ্রাস, (১০) শিল্পায়নের দূষণ, (১১) জ্বালানি ও পরিবহন, (১২) অপরিকল্পিত নগরায়ণজনিত দূষণ ইত্যাদি।

পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো স্কুলের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ সকল বিষয়ের ওপর কোর্স চালু করবে এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে। সরকারি কর্মকর্তাদের পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। জলবায়ু সমস্যা সমাধানের জন্য জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সরকারের একটি জলবায়ু পরিবর্তন সেল থাকা উচিত, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর গবেষণা কর্মকা- পরিচালনা করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাস্তুহারা লোকদের পুনর্বাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন করে এরূপ যানবাহন বন্ধ করার জন্য এ সকল যানবাহনের ওপর কর আরোপ করতে হবে। নিউক্লিয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা নিতে হবে। আন্তর্জাতিক মহলের সাথে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন সম্পর্কে সমঝোতা করতে হবে।

সারাবিশ্ব টেকসই উন্নয়ন নিয়ে উদ্বিগ্ন। সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের অধীনে বিশ্বের নেতৃবৃন্দ পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। তারা তাদের জিডিপির ০.৭ শতাংশ সরকারি উন্নয়ন সহায়তা হিসাবে মারাত্মক পরিবেশ সমস্যার সম্মুখীন উন্নয়নকামী দেশগুলোকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অতএব আমরা আশা করতে পারি ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও অব্যাহত রাজনীতিক অঙ্গীকার এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, এনজিও, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ সম্পত্তির ব্যষ্টিক ব্যবস্থাপক হিসাবে এ যাবৎ কর্মরত তৃণমূল পর্যায়ের লোকজনের সহায়তায় আমরা টেকসই উপায়ে আমাদের সীমিত সম্পদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা করতে সক্ষম হব।

শিক্ষাব্যবস্থা

একটি দেশের উন্নয়নের প্রথম ও প্রধান শর্ত হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার সূতিকাগার। একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থার মর্মে থাকে এই বিশ্বাস যে, দেশ, মানুষ ও সভ্যতার বিকাশ হয় শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে। দেশের ভবিষ্যৎ গঠন হয় বিদ্যালয়ে।

শিক্ষা হচ্ছে আমাদের আবেগ। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও এ বিষয়ে অবগত আছেন। তাঁর নিজেরও অনেক পরিকল্পনা ও চিন্তা রয়েছে। তা বাস্তবায়নও হচ্ছে। আমাদের সরকার কাজ করছে। এর ফলে এ ব্যাপারে আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভালো শিক্ষাব্যবস্থা ব্যতীত বাংলাদেশের অগ্রগতির অন্য কোনো পথ নেই। শিক্ষার উন্নয়ন হচ্ছে একটি চলমান প্রক্রিয়া- যার শুরু আছে, শেষ নেই। প্রতিদিনই পৃথিবী পরিবর্তিত হচ্ছে, বিজ্ঞানের ক্ষেত্র প্রসারিত হচ্ছে, প্রতিদিন নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার হচ্ছে। আমরা প্রতিযোগী, যে প্রতিযোগিতার শুরু আছে, শেষ নেই। অধ্যবসায়, দেশপ্রেম, কঠোর শ্রম ও নিবিড় নিষ্ঠায় আমাদের এ প্রচেষ্টা চলতেই থাকবে।

স্বপ্ন দেখলেই একদিন স্বপ্নের মহীসোপানে পৌঁছানো সম্ভব হবে। আমরা ছোট দেশ ও উন্নয়নশীল দেশ বলে স্বপ্ন দেখব না, তা তো হয় না।

বিশে^র অন্যতম দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখার সকল যোগ্যতা আমাদের আছে। আজ যেটা স্বপ্ন, তা আগামী দিনে বাস্তব রূপ নেবে না- এটা কে নিশ্চিত করে বলতে পারে। স্বপ্ন দেখলেই একদিন স্বপ্নের মহীসোপানে পৌঁছানো সম্ভব হবে। আমরা ছোট দেশ ও উন্নয়নশীল দেশ বলে স্বপ্ন দেখব না, তা তো হয় না।

যে-কেউ আমাদের শিক্ষাকার্যক্রমের উন্নয়নের ওপর দৃষ্টি দিলে দেখতে পাবে, গত চার দশকে আমাদের শিক্ষাখাতের বিশাল অগ্রগতি হয়েছে। শিক্ষা সকলের অধিকার- এটা আমরা নিশ্চিত করেছি। এটি আমাদের সংবিধানের মাধ্যমে স্বীকৃত একটি অধিকার। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের যাত্রার শুরু থেকে শিক্ষাখাতের অগ্রগতি শুরু হয়েছে। শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহের অন্যতম হলো- শতভাগ ছাত্রছাত্রীর মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ কার্যক্রম। নারীশিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু করা হয়েছে উপবৃত্তি ব্যবস্থা। বর্তমানে ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নতুন করে জাতীয়করণ করা হয়েছে।৬৮ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষকের চাকরি সরকারিকরণ করা হয়েছে। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর শতকরা হার ছিল ৬১, বর্তমানে তা উন্নীত হয়েছে শতকরা ৯৭.৭ ভাগে। শিক্ষার সুবিধাবঞ্চিত গরিব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট আইন ২০১২’ প্রণয়ন করা হয়েছে, গঠন করা হয়েছে ‘শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট’।৬৯

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার স্কুল ও বিশ^বিদ্যালয় নির্মাণের ওপর দৃষ্টি দিচ্ছে, যেখানে সকল নাগরিকদের শিক্ষা নিশ্চিত করবে। সব বয়সের লোকজন এবং সব স্থানের লোকজন শিক্ষার অধিকার সমানভাবে ভোগ করবে। আগামী বছরগুলোতে শিক্ষা প্রদানের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করা হবে, যেখানে আমাদের শিক্ষার্থীরা আধুনিক প্রযুক্তির ওপর বিশেষ দক্ষতা অর্জন করবে এবং মানবিক গুণসম্পন্ন হয়ে গড়ে উঠবে।

আমাদের সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত বিজ্ঞান, গণিত এবং পড়াশুনায় বিশে^র প্রথম সারির দেশের মধ্যে অন্যতম একটি দেশ হিসাবে আমাদের দেশকে গড়ে তোলা। আমাদের শিশুদের মেধার ওপর আমার প্রচ- বিশ^াস ও আস্থা আছে। তারা অন্যদের থেকে কম মেধাবী নয়। তাদের থেকে বেশি মেধা নিয়ে কেউ জন্মগ্রহণ করেনি। আমাদের সরকারের লক্ষ্য শিক্ষাখাতকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়া। আমাদের সরকারি ও বেসরকারি স্কুলগুলোকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হিসাবে গড়ে তুলতে চাইছে সরকার। আমাদের শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। আর এগুলোই হচ্ছে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষাখাতের উন্নয়নের কার্যক্রম। আমিও আমার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছি। শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছি প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

কৃষিখাত ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা

কৃষিখাতে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব সাফল্য সারাবিশ্বের বিস্ময়। কৃষিখাতে বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য সাফল্যগাঁথা বিশ্বদরবারে বারবার আলোচিত হয়েছে। প্রায় ১৬ কোটি জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশ বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন। সম্প্রতি বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম আবিষ্কার করেছেন পাটের জিনোম সিকুয়েন্সিং। সারাবিশ্বে আজ পর্যন্ত মাত্র ১৭টি উদ্ভিদের জিনোম সিকুয়েন্সিং হয়েছে, তন্মধ্যে ড. মাকসুদুল আলম করেছেন তিনটা। অসামান্য এ অর্জন বাংলাদেশকে বিজ্ঞানের দিক থেকেও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে।

২০১২-১৩ অর্থবছরে খাদ্যশস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৭৫ লক্ষ মেট্রিক টন। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ধীরে ধীরে কমে আসছে। এ থেকে কৃষির গুরুত্বকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। ২০১১-১২ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষির অবদান ছিল ১৯.২৯ শতাংশ। ২০১০-১১ অর্থবছরে কৃষির অবদান ছিল ২০.০১ শতাংশ। আর্থনীতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃষির অবদান কমতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে শিল্পখাত ও সেবাখাতের অগ্রগতিতে কৃষিই অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৩.৬ শতাংশ কৃষিখাতে নিয়োজিত। ২০১১-১২ অর্থবছরে কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি হয় ৪০২.৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। কাঁচাপাট, পাটজাতদ্রব্য, চা, হিমায়িত খাদ্য প্রধান কৃষিপণ্য হলেও সরকার অপ্রচলিত কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।৭০

নারী ও শিশু

নারী ও শিশু উন্নয়নে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বের আর একটি বিস্ময়। নারীর সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে “জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১”। নারীশিক্ষাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু করা হয়েছে উপবৃত্তি কার্যক্রম। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীর অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে বহুমুখী পদক্ষেপ। প্রযুক্তিজগতে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণকে সহজ করার লক্ষ্যে ইউনিয়ন ডিজিটাল কেন্দ্রের ন্যায় ইউনিয়নভিত্তিক তথ্যসেবায় উদ্যোক্তা হিসাবে একজন পুরুষের পাশাপাশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একজন নারী উদ্যোক্তাকেও।৭১ “জাতীয় শিশু নীতিমালা-২০১১” প্রণয়নের মাধ্যমে শিশুদের সার্বিক অধিকারকে সুরক্ষিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের ৪০টি জেলার সদর হাসপাতাল এবং ২০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্থাপন করা হয়েছে ‘ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেল’। দুঃস্থ, এতিম এবং অসহায় পথ-শিশুদের বিকাশের জন্য স্থাপন করা হয়েছে ১৫টি শিশু-বিকাশ কেন্দ্র।৭২

বিশ^মানের স্বাস্থ্যসেবা

‘বাংলাদেশের ভিশন-২০২১’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা খাত। আমরা সব অঞ্চলে শতভাগ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকি। আমাদের যুদ্ধ বা প্রতিযোগিতা স্বাস্থ্যসেবায় নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত করায়। সরকার যদি স্বাস্থ্যসেবাকে উচ্চমানসম্পন্ন করতে চায় আমাদেরকে শুধু স্বাস্থ্যখাতকে মানসম্পন্ন করলেই চলবে না, বরং সরকারি এবং বেসরকারি কর্মকর্তাদের একত্রিত করতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মী, স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ, প্রতিষেধক, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্যখাতের অন্যান্য শাখার গুণগত মানোন্নয়ন এবং দেশের প্রতিটি হাসপাতালকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে ভিশন-২০২১-এর উদ্দেশ্য কার্যকর পরিমাত্রায় অর্জিত হবে।

স্বাস্থ্যখাতে আমরা ইতোমধ্যে অনেক অগ্রসর হয়েছি যা আমাদের প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের অনেকের কাছে ঈর্ষণীয় ও অনুকরণীয়। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম আদর্শ দেশ হিসাবে স্থান করে নিয়েছে। স্বাস্থ্যখাতকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে “জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিমালা-২০১১”। তৃণমূল পর্যায়ের দরিদ্র মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয়েছে ১২ হাজার ৭৭৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক। ৩১২টি উপজেলা হাসপাতালকে উন্নীত করা হয়েছে ৫০ শয্যায়। মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালগুলোতে ২ হাজার শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। মাতৃমৃত্যু ও শিশু-মৃত্যুহার এবং জন্মহার হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে নবজাতকের মৃত্যুহার ১৪৯ থেকে নামিয়ে ৫৩-তে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। এটি একটি অবিশ্বাস্য অর্জন। স্বাস্থ্যসেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে নির্মাণ করা হয়েছে নতুন ১২টি মেডিকেল কলেজ, নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৪৭ হাজারেরও বেশি জনশক্তি।৭৩

শিল্প ও বাণিজ্যখাত

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সারাবিশ্বে আজ অদ্বিতীয়। পোশাকশিল্পের পাশাপাশি প্রসার ঘটেছে আবাসন, জাহাজ, ওষুধ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্যশিল্পের। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছে জাহাজ, ওষুধ এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রী। বাংলাদেশের আইটি শিল্প বহির্বিশ্বে কুড়িয়েছে অভূতপূর্ব সুনাম। ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের আইটি শিল্প ২২ কোটি মার্কিন ডলারেরও অধিক রপ্তানি-আয় করেছে।

প্রবাসী শ্রমিকদের উন্নয়ন

বর্তমানে বিশ্বের ১৫৭টি দেশে বাংলাদেশের ৮৬ লাখের অধিক শ্রমিক কর্মরত আছে। বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ স্থাপন করেছে অবিস্মরণীয় মাইলফলক। স্বল্প সুদে অভিবাসন ঋণ প্রদানের লক্ষ্যে প্রবাসী-কল্যাণ ব্যাংক স্থাপন করে দেশের ৭টি বিভাগীয় শহরে শাখা স্থাপন করা হয়েছে। এ ব্যাংকের মাধ্যমে এপ্রিল ২০১৪ পর্যন্ত ২০ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা অভিবাসন ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সারাদেশে তৃণমূল পর্যায় থেকে বিদেশ-গমনেচ্ছু জনগণকে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণকেও এ সেবা গ্রহণের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এর অনিবার্য ফলস্বরূপ মধ্যস্বত্বভোগীদের হয়রানি ছাড়াই স্বল্প ব্যয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের জনসম্পদের প্রবাহ অবারিত হয়েছে।৭৪

বিদ্যুৎখাত

বিদ্যুৎখাতে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছেÑ জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৬ হাজার ৩২৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংযোজন। ফলে বিদ্যুতের সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৪৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৬২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ২২০ কিলোওয়াট/ঘণ্টা থেকে বেড়ে ৩৪৮ কিলোওয়াট/ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। নতুন বিদ্যুৎসংযোগ প্রদান করা হয়েছে ৩৫ লক্ষ গ্রাহককে। নির্মাণ করা হয়েছে নতুন ৬৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকারের নানা পদক্ষেপের কারণে প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।৭৫

ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন

ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বাংলাদেশ সরকার যুগান্তকারী নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশের ৪,৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপন করা হয়েছে- ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিশাল ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টাল। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এ পোর্টালের সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার। দেশের সবকটি উপজেলাকে আনা হয়েছে ইন্টারনেটের আওতায়। টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা ১২ কোটি ৪০ লাখ এবং ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা ৪ কোটি ৫০ লাখে উন্নীত হয়েছে। সেবাপ্রদান প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করার অভিপ্রায়ে চালু করা হয়েছে ই-পেমেন্ট ও মোবাইল-ব্যাংকিং পদ্ধতি। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পাদন করার বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। ৩-জি প্রযুক্তির মোবাইল নেটওয়ার্কের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে পুরোদমে। তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রমকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিদ্যালয়সমূহের পাঠ্যসূচিতে আইসিটিকে যথাগুরুত্বে স্থান দেওয়া হয়েছে। গ্রাম পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়েছে আইসিটিভিত্তিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র।৭৬

নিরাপদ ও বিপদমুক্ত জাতি গঠন

সরকারের ভিত্তি হচ্ছে ন্যায়বিচার। বাংলাদেশ টিকে আছে ন্যায়বিচারের ওপর। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই গুণটি বজায় রাখার সকল প্রচেষ্টা আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। বিচারব্যবস্থায় ন্যায়বিচার শুধু ভালো রায় থেকেই আসে না, আইনি প্রক্রিয়ার সহজ প্রয়োগ ও গতিশীলতা এবং কোর্ট কেসের দ্রুত সমাধানেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায়। আর এগুলো কেবল সম্ভব হয় কার্যপ্রণালির গতিশীলতায়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে এবং স্বচ্ছতা ও দায়িত্বের সর্বোচ্চ মান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

সরকার বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন করে যাচ্ছে। আমাদের অতীত ঐতিহ্য ও ইতিহাস প্রদর্শিত পথের ওপর ভিত্তি করে এই বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও ঝুঁকিমুক্ত করার সম্বন্ধে, আমি ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ট্রাফিক দুর্ঘটনায়- যে কারণে বহু তরুণকে দুর্ভাগ্যবশত হারাতে হচ্ছে। আমি যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালীন সবচেয়ে ভালো রাস্তা, ব্রিজ এবং মেট্রোরেলের কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছি। বেশিরভাগ তরুণ খুব সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালায়ও বটে। তবে দুর্ঘটনার পিছনে মূল কারণ হচ্ছেÑ দ্রুতগতি, রাস্তার পরিসর, জনাধিক্য এবং গাড়ি চালানোয় চালকের অসাবধানতা।

উন্নয়নের দায়িত্ব হচ্ছে ভারী একটি কাজ। রাস্তা পরিষ্কার, ঘড়ি টিকটিক করছে, অতএব, একদিন আমাদের দেশ আমাদের কাজের সাক্ষ্য দেবে। জনগণ আমাদের যে ম্যান্ডেন্ট দিয়েছিল তার কী করেছি, সেটার জবাবদিহি করতে হবে। জবাবদিহির কথাটি সবাই মাথায় রাখলে সমস্যা হবে না।

সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের এখানে একটি বড় সমস্যা। প্রতিবছর অনেক লোক মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ১২ হাজার লোক মৃত্যুবরণ করে এবং ৩৫ হাজার লোক মারাত্মকভাবে আহত হয়। উন্নত বিশ্বে প্রতি ১০ হাজার গাড়িতে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত গাড়ির সংখ্যা দু’শ, বাংলাদেশে তা ৫০-এর ঊর্ধ্বে। ভারত ও পাকিস্তানে তা যথাক্রমে ২০ এবং ১৭.৩।৭৭

ব্র্যাকের ‘প্রমোটি সেফ রোড অ্যান্ড সেফ রোড কোড’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে মোট ১৮১৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ২৩৫১ জন। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে ১৩১৩টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১৮৪৫ জন। এসব দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যা ৫৪০৮ জন।৭৮

এ সমস্যাটির সমাধান দরকার। আমি যখন যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলাম তখন কাজ করেছি। আমার সময়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটলে আমার পদত্যাগ চাওয়া হয়। শহিদ মিনারে অনশন হয়। কিন্তু এখন তো দুর্ঘটনা আরও বেশি হয়; কোনো দায়-দায়িত্ব কারও আছে বলে মনে হয় না। কেবল তাই নয়, এখন কোনো মন্ত্রীরও পদত্যাগ করার দাবিও করা হয় না। এ ব্যাপারে জনগণকেই ঠিক করতে হবেÑ তাঁরা আসলে কী চান। একজন মন্ত্রীর পদত্যাগই সব সমস্যার সমাধান, নাকি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যদিও আমার লক্ষ্য ছিল, ট্রাফিক সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর হারের দিক দিয়ে সবচেয়ে কম মৃত্যুর হারের দেশগুলোর র‌্যাঙ্কিঙে, প্রথম ১০টি দেশের একটি দেশ হিসাবে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ। কারণ, মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান আর কিছু নেই। যাই হোক, কোনোভাবে ট্রাফিক সংশ্লিষ্ট মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না।

যুগোপযোগী ভূমি-ব্যবস্থাপনা

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত ভূমিকেন্দ্রিক। বিশ্ব-অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একথা বহুলাংশে প্রযোজ্য। ভূমি-ব্যবস্থাপনা একটি জাতির আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। তাই সরকার বাংলাদেশের প্রাচীন ভূমি-ব্যবস্থাপনায় আধুনিক সংস্কার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ভূমি-ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়ন করতে ৫৫টি জেলায় বিদ্যমান মৌজা ম্যাপ ও খতিয়ান কম্পিউটারাইজেশনের কাজ শুরু করা হয়েছে। ভূমির পরিকল্পিত ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মোট ২১ জেলার ১৫২ উপজেলায় ডিজিটাল ল্যান্ড জোনিং ম্যাপ সংবলিত প্রতিবেদন প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রণীত হয়েছে “কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন- ২০১২”। অচিরে এ কাজ শেষ হবে। তখন বাংলাদেশের ভূমি-ব্যবস্থাতেও আসবে গতিশীলতা। কমে যাবে ভূমিসংক্রান্ত মামলা। মানুষের ভূমিসংক্রান্ত ভোগান্তি শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।

জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশ

১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যোগদানের পর থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বের ৩৯টি দেশের ৬৪ শান্তি মিশনে খ্যাতি ও সফলতার সঙ্গে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এ যাবৎকালে জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী ১১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। বাংলাদেশের এ কৃতিত্ব বিশ্বের আর কোনো দেশ অর্জন করতে পারেনি। শান্তি মিশনে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের অসামান্য কৃতিত্ব জাতির একটি পরম অহঙ্কার। মিশনে অনেক বাংলাদেশি শহিদ হয়েছেন। আমরা তাঁদের পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।৭৯

মন্দা প্রতিরোধ ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধান

মন্দার প্রচ- প্রকোপে বৈশ্বিক অর্থনীতির চরম বিপর্যয়কালেও বাংলাদেশ বিভিন্ন উপযুক্ত প্রণোদনা প্যাকেজ ও নীতি সহায়তার মাধ্যমে মন্দা মোকাবিলায় শুধু সক্ষম হয়েছে তাই না, সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৬ শতাংশের ওপরে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্ব-অর্থনীতির শ্লথধারার প্রভাবে ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশের অর্থনীতি যেখানে ঝড়ের বেগে নিচে নেমে গিয়েছে, সেখানে অসাধারণ সাফল্যে বাংলাদেশ এগিয়ে গিয়েছে। বিশ্ব-অর্থনীতির শ্লথগতির মধ্যেও বাংলাদেশ আমদানি-রপ্তানি খাতে প্রবৃদ্ধি সম্প্রসারণের পাশাপাশি রেমিট্যান্সের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে।

হত-দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা-বেষ্টনী নিবিড় ও বিস্তৃত করার লক্ষ্যে বয়স্কভাতা, বিধবা-ভাতা, স্বামী পরিত্যক্ত ও দুঃস্থ মহিলা ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী-ভাতা, মাতৃকালীন-ভাতাসহ ভাতার হার ও আওতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করে সরকার বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তাকে সুদৃঢ় ও বিস্তৃত করেছে। ২০০৮-০৯ খ্রিস্টাব্দে এ খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা, বর্তমানে এ কার্যক্রমে বরাদ্দের পরিমাণ ২৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। খানা আয়-ব্যয় জরিপ, ২০১০-এর সমীক্ষা অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৪.৫৭% সামাজিক নিরাপত্তা-বেষ্টনীর আওতাভুক্ত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের মতো ছোট অথচ বিপুল জনসংখ্যার একটি দেশের জন্য এক অবিশ্বাস্য সাফল্য।৮০

ভিশন-২০২১ অর্জনের জন্য, আমি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর ওপর খুব ছোট পরিসরেই বলেছি। সংক্ষিপ্ত বক্তব্য উপস্থাপন করেছি। ছোট পরিসরে এরকম একটি বড় বিষয় আমি সবিস্তারে তুলে ধরতে পারছি না। আমি বিশ^াস করি, রোডম্যাপ, লক্ষ্যসমূহ এবং দেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতসমূহ সম্পর্কে মানুষের জানার অধিকার আছে। আমাদের লক্ষ্যসমূহ নাগরিকদের কাছে স্পষ্ট হলে আমরা এসব অর্জনের খুব কাছে চলে যাব।

সরকার তার লক্ষ্যসমূহ একা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। এটি কোনো দেশের সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। অবশ্যই সামাজিক শক্তিগুলোকে সরকারের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে এবং যুক্ত করতে হবে। বেসরকারি খাত এবং সমাজের সকল যন্ত্র সেখানে অংশগ্রহণ করবে। উন্নয়নের দায়িত্ব হচ্ছে কঠিন ও দায়িত্বশীল একটি কাজ। আমাদের অনেক পথ, তেমনি অনেক রথ। রাস্তা পরিষ্কার, ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করছে, অতএব একদিন আমাদের দেশ আমাদের কাজের সাক্ষ্য দেবে। পৃথিবী জানতে পারবে, বাংলাদেশ আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নয়নের ধারার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে।

আমাদের দেশ ছোট হতে পারে। তবে আমাদের নাগরিকরা অসাধারণ। তারা নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী এবং নিজের ভাগ্য নিজেই গড়ে নিতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে মোকাবিলা করার যথেষ্ট ধৈর্যও আমাদের রয়েছে। আমাদের কৃতিত্ব এবং আমরা যা অর্জন করেছি, তা শুধু অসাধারণ নয়, বরং ঐতিহাসিক। সামনে এগিয়ে যাওয়া আমাদের ব্রত। ভবিষ্যতের বিনির্মাণের জন্য জোরকদমে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই, আমাদের একমাত্র পথ হচ্ছে- যৌথ প্রচেষ্টা, ঐকমত্য এবং একত্রে কাজ করে যাওয়া। আমরা পারিÑ এ স্লোগানকে বাস্তবায়ন করতে।

এক্ষণে আমাদের উচিত সবাই মিলে দেশের উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস অব্যাহত রাখার মাধ্যমে জনকল্যাণমুখী কার্যক্রম পরিচালনায় নিবেদিত থাকা। সম্মিলিতভাবে অগ্রসর হলে আমাদের তরুণ প্রজন্ম উজ্জ্বল, সুন্দর এবং সমৃদ্ধশালী ভবিষ্যৎ তৈরি করতে সক্ষম হবে। আর তখনই দেশ ও জাতি সত্যিকার উন্নয়নে বিভূষিত হবে।৮১

২৪. ঝুঁকি বনাম সাফল্য

সৈয়দ আবুল হোসেন: সম্প্রতি বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ও প্রশংসনীয় উন্নয়নের গতি সারাবিশে^ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভিধায় পরিচিতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন আজ কেবল কোনো কল্পনা নয়, পরিপূর্ণ বাস্তবতা। যখন মানুষ দেখে আমাদের উচ্চাকাক্সক্ষা এবং বিশাল বিশাল অট্টালিকা, যখন মানুষ দেখে আমরা অনেক বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি এবং পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি, এমন সময়ে যখন বৈশি^ক অর্থনীতির অবস্থা সংকটাপন্ন এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা বিরাজ করছে, তখন তারা প্রায়ই জিজ্ঞেস করে- কীভাবে তোমরা এত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো? এবং কেন করো?

আমি বলি : ওভ ুড়ঁ ধৎব হড়ঃ রিষষরহম ঃড় ৎরংশ ঃযব ঁহঁংঁধষ, ুড়ঁ রিষষ যধাব ঃড় ংবঃঃষব ভড়ৎ ঃযব ড়ৎফরহধৎু.৮১ আমাদের অনেক সংকট আছে। অনেক সমস্যা আছে। এত সব সমস্যার মধ্যেও আমাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় আছে। তাই আমরা এগিয়ে যেতে পারছি। আর এর পেছনে যাঁদের ভূমিকা সবার আগে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হয়, তাঁরা হচ্ছেন আমাদের দেশের জনগণ- শ্রমিক, গার্মেন্টস কর্মী, শ্রমজীবী আর সব পেশার লোক। উন্নয়ন কর্মকা-ে অনেক ঝুঁকি আছে, আর আমাদের জনগণ ও নেতৃবৃন্দ এ ঝুঁকি নিচ্ছে বলেই আমাদের পক্ষে অনেক অসাধ্য সাধন করা সম্ভব হচ্ছে।

কোনো প্রকল্পই ঝুঁকি ছাড়া বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। যেকোনো কাজের বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার ঝুঁকি নিতে হয়। সুতরাং আমরা কি আমাদের জীবনকে থামিয়ে রাখতে পারি অথবা আমাদের কাজকে? এমনকি ব্যাংকে রাখা জনগণের টাকাও ঝুঁকিপূর্ণ। তাহলে কি আমরা ব্যাংক পরিচালনা করা বন্ধ করে দিতে পারি? কাজে যেতে যে গাড়ি ব্যবহার করি, তার জন্যও ঝুঁকি নিতে হয়। বিমানে ভ্রমণের জন্যও ঝুঁকি নিতে হয়। সুতরাং আমরা কি আমাদের কাজ ও ভ্রমণ বন্ধ করে রাখতে পারব? অবশ্যই নয়। ঝুঁকিই জীবনের গতি এবং সফলতার সোপান।

জীবনটা ঝুঁকিতে পরিপূর্ণ। আমাদের লক্ষ্যসমূহের বাস্তবায়ন কীভাবে সম্ভব হবে, আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী এবং মানুষের সুখ নিশ্চিত হবে কীভাবে, যদি আমরা নতুন নতুন প্রকল্প হাতে না নিই এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি গ্রহণ না করি? সব স্থানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে এবং ঝুঁকিও। যারা সামনে এগিয়ে যেতে এবং চূড়ান্ত সফলতা অর্জনের জন্য নিরন্তর কাজ করে যাবে, তারা অবশ্যই সফল হবে। আর যারা অগ্রগতিকে থামিয়ে রাখার জন্য ছুতো খোঁজে, তাদের ছুতোর অভাব হয় না। এমন লোক কখনও সফলতার মুখ দেখে না।

পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্পও সরকার নিজস্ব অর্থায়নে করার মতো ঝুঁকি নিয়েছে। এ ঝুঁকি গ্রহণের মধ্যেও রয়েছে সক্ষমতার স্বাক্ষর। এমন ঝুঁকি অনেকের কাছে অবাক ও অচেনা মনে হলেও আমার কাছে তা একেবারেই না। কারণ বাঙালি জাতি সবসময় ঝুঁকির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে এবং এভাবে সফলতা পেয়েছে। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা ভাঙতে পারেন কিন্তু মচকাবেন না কখনও। কারণ নিজের ওপর ও  নিজের অভিজ্ঞতার ওপর তাঁর প্রচ- বিশ্বাস আছে। তিনি যেটা করতে যান, সেটি করার যোগ্যতা কাজে নামার আগেই অর্জন করে নেন।

মন্ত্রী থাকাকালীন আমি দেখেছি, যখন আমরা নতুন প্রকল্প অথবা ধারণার ঘোষণা দিতাম, তখনই কিছু ঝুঁকির প্রশ্নের সম্মুখীন হতাম, এখনও হয়। আমি বারবার একটি কথাই বলি- সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে, কোনো ধরনের ঝুঁকি না-নেওয়া। এটা সত্য যে, আমরা কোনো প্রকল্প কোনো প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণা ছাড়া আরম্ভ করি না, যাতে আমাদের কারও মনে সংশয় বা দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। আমরা আমাদের চারপাশে যেসব ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় রয়েছে, তা এড়িয়ে চলি। আমাদের কাজ, নির্মাণ এবং অগ্রগতিকে সকল প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত রাখি। এমনকি আমাদের চারপাশের উত্তেজনা, অশান্তি, বিশৃঙ্খলা এবং যুদ্ধ আমাদের কোনো কার্যক্রমকে স্পর্শ করতে পারে না। গত তিন দশকে আমাদের এ অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংঘর্ষ সংঘটিত হয়েছে। তবু আমরা থেমে থাকিনি। যদি আমরা স্থিতিশীলতার জন্য অপেক্ষা করতাম এবং আমাদের বিশাল বিশাল প্রকল্পগুলো শুরু না করতাম, তাহলে আজ আমাদের অবস্থান কোথায় থাকত?

আঞ্চলিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে সমস্যা সৃষ্টি করে, আর এ সমস্যার মধ্যেও অপেক্ষাকৃত দ্রুত কাজ এবং আগের থেকেও বড় প্রকল্প সম্পূর্ণ করতে হয়। উন্নয়নের শর্ত হচ্ছে স্থিতিশীলতা। যখন অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা কম থাকে তার মধ্যেও তারা উন্নতিসাধন করতে পারে এবং বড় বড় প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়, যদি ইচ্ছা ও অধ্যবসায় প্রবল থাকে।

বিশ্বে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের নাগরিকরা হচ্ছে সফলতার মূর্ত প্রতীক। এটা তাদের আত্মবিশ^াস দেয় এবং প্রমাণ করে- যুদ্ধে নয়, তাদের একমাত্র দৃষ্টি উন্নয়নে। প্রকল্প বাস্তবায়ন রকেট নিক্ষেপের চেয়ে উত্তম এবং সচেতনতা, সমন্বয়সাধন ও টিম স্পিরিট বা দলীয় শক্তি হচ্ছে ভবিষ্যৎ নির্মাণের একমাত্র পথ। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে- এর মাধ্যমে প্রমাণ করেছে, তারা চাইলে যেকোনো কঠিন কাজও অল্প সময়ের মধ্যে করতে পারে। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের যে বিজয় অর্জন হয়েছে তা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। বাংলাদেশিরা যেকোনো সময় যেকোনো ধরনের বাধা মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখে।

জাতির শক্তি তার জনগণ। প্রত্যেক জাতি তার জনগণের শক্তি ব্যবহার করে গঠনমূলক কাজে, যার মাধ্যমে তারা আশাবাদী ও আত্মবিশ^াসী হয়ে ওঠে। আর তা না হলে উত্তেজনা, বিশৃঙ্খলা, অশান্তি এবং যুদ্ধে ব্যবহৃত হয় জনগণের শক্তি। বাংলাদেশিরা হচ্ছে বুদ্ধিমান লোক এবং আমি এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে  বেশ আশাবাদী। যদিও আমরা কিছু উত্তেজনা, বিশৃঙ্খলা এবং অশান্তি দেখতে পাই, তাহলেও এগুলো কাটিয়ে উঠে আগামী দিনে আরও ভালো অবস্থানে যেতে হবে আমাদের।

যেকোনো কাজের বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার ঝুঁকি নিতে হয়। আমরা কি আমাদের জীবনকে থামিয়ে রাখতে পারি অথবা আমাদের কাজকে- কেবল ঝুঁকির জন্য? পারি না। কারণ জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে ঝুঁকি নিতেই হবে। ঝুঁকিহীন জীবনের কোনো সাফল্যও আসবে না- যা ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও উন্নতির জন্য বারবার ঝুঁকি নিয়েছে। তা না নিয়ে যদি স্থিতিশীলতার জন্য অপেক্ষা করত এবং দেশের বিশাল বিশাল প্রকল্পগুলো শুরু না করত- তা হলে কি হতো? তাহলে আজ আমাদের অবস্থান কোথায় থাকত?

ঝুঁকি ছাড়াও আর একটা জিনিস আছেÑ যেটি আমাদের নতুন প্রকল্প গ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সেটি হচ্ছে সমালোচনা। সমালোচনার ভয়ে অনেক কৃতিত্বপূর্ণ কাজ থেমে গেছে, অনেক জ্ঞানী ব্যক্তি তার সৃজনশীলতা হতে বিরত থেকেছেন। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, সমালোচনা এড়ানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে কোনো কিছু না করে ঘুমিয়ে থাকা। কিন্তু ঘুমন্ত জাতি কি কখনও উন্নতি করতে পারে? যে ঘুমিয়ে থাকে তার ভাগ্যও ঘুমিয়ে থাকে।

ঝুঁকি নেওয়া এবং ব্যর্থ হওয়া- আসলে ব্যর্থতা নয়, বরং ঝুঁকি নিতে ভয় পাওয়াই প্রকৃত ব্যর্থতা। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জনগণ ঝুঁকি নিতে পেরেছে বলেইÑ আজ এগিয়ে যাচ্ছে, সফলতার মুখ দেখছে।

আমি এখন অন্য একটি ঝুঁকি গ্রহণের বিষয়ে কিছু বলতে চাই। এটা হচ্ছে, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঝুঁকি গ্রহণ। অসুবিধা, সমস্যা এবং ক্ষতির আশঙ্কা ছাড়া কোনো ব্যক্তি তার জীবনে ঝুঁকি নিতে পারবে না এবং নতুন কোনো কিছু শিখতেও পারবে না। সে কোনো সময় নিজেকে বদলাতেও পারবে না। সে কখনও ভালবাসার সাহসও দেখাতে পারবে না এবং সে কখনও তার জীবনকে পরিপূর্ণ করতে সক্ষম হবে না। আপনি নতুন কোনো সাগর আবিষ্কার করতে পারবেন না, যদি আপনার সাহসের অভাব থাকে এবং আপনার তীর বা কূল হারানোর ভয় থাকে। জীবন হচ্ছে অভিজ্ঞতার সমষ্টি; জনগণ, স্থান ও দুঃসাহসÑ শক্তি, জয় আর লক্ষ্যভেদের সহায়ক শক্তি। ঝুঁকি গ্রহণ এগুলোকে পুঞ্জীভূত করে। ঝুঁকি এড়াতে চাইলে, এগুলো আপনাকে হারাতে হবে। তাই ঝুঁকি গ্রহণই কেবল ঝুঁকিমুক্ত থাকার উত্তম উপায়।

প্রায়শ আমি দেখি, দুজন লোক, যারা একই পরিবেশে বড় হয়েছে, একই শিক্ষায় শিক্ষিত, সমান মেধাবী কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে একজনের চেয়ে আরেকজন বেশি সফল। এর কারণ কী? বা এমন কেন হয়? কারণ হচ্ছে, একজন তার ধারণা বা চিন্তাকে সত্যে পরিণত করার জন্য ব্যাখ্যা করার সাহস রাখে, উদ্ভাবনকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে এবং তা তার জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। আর অন্যজন এরকম সাহস দেখাতে পারে না। ঝুঁকি নেওয়া এবং ব্যর্থ হওয়া- আসলে ব্যর্থতা নয়, বরং ঝুঁকি নিতে ভয় পাওয়াই প্রকৃত ব্যর্থতা। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের জনগণ ঝুঁকি নিতে পেরেছে বলেইÑ আজ এগিয়ে যাচ্ছে, সফলতার মুখ দেখছে।৮২

২৫.ক্যারিয়ার গঠনে প্রতিযোগিতা

সৈয়দ আবুল হোসেন: জীবন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি প্রবহমান কাব্য। এ কাব্যকে আমরা সাধারণভাবে ক্যারিয়ার নামে অভিহিত করে থাকি। ক্যারিয়ার নামক এ কাব্য রচনায় জীবনের প্রতিটি পর্যায় যেন তীব্র প্রতিযোগিতায় ভরা উত্তেজনাময় একটি মাঠ, যেখানে প্রতিনিয়ত চলে অগণিত প্রতিযোগিতা। আমাদের পিতা, পিতামহ এবং আমাদের জীবনকে বাংলাদেশের সূচনালগ্ন থেকেই বহু প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে এবং হচ্ছে। বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আজ আমরা সাধারণ একটি দেশ থেকে বৈশি^ক বিবেচনায় উন্নত জাতিতে পরিণত হয়েছি। আমরা যদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারতাম কিংবা ব্যর্থ হতাম; তাহলে আমাদের সকল অগ্রগতি থেমে যেত।

বাংলাদেশে আমাদের অনেক নেতা ও আদর্শ ব্যক্তি আছেন, যাঁদের প্রদর্শিত পথের মাধ্যমে আজও আমরা আমাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যাচ্ছি, এগিয়ে যাচ্ছি নানা প্রতিকূলতার মাঝেও স্বচ্ছন্দ গতিতে। আমরা বাঙালিরা কোনো চ্যালেঞ্জেই ব্যর্থ হইনি। আমাদের আছে দৃঢ়সংকল্প এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অসম সাহস। ব্যবসার ক্ষেত্রেও অনেক লোক রয়েছে যারা নানা কাজে সফল হয়েছে। আমাদের নিজস্ব প্রক্রিয়ায় আমরা প্রতিটি চ্যালেঞ্জে জয়লাভ করতে সক্ষম। আমরা কখনও কোনো কিছু সহজে ছেড়ে দিই না।

আমি ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হই তখন, যখন আমাদের লোকজনকে আমার লক্ষ্য ও পরিবর্তনে আস্থা স্থাপনের প্রয়োজন-সম্পর্কিত বিষয়গুলো বোঝাতে ব্যর্থ হই। অবশ্য এটা অনেকটা অনুধাবন-ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। এজন্য আমাদের গুণগত শিক্ষার ওপর সমধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বারবার চেষ্টা করতে হবে এবং একবার চেষ্টা কোনো অবস্থাতে যথেষ্ট নয়। আস্থা আনার জন্য প্রয়োজনে কয়েকবার বুঝতে হবে, লড়তে হবে, যাতে মানুষ বোঝে আপনি সঠিক পথে আছেন। কতগুলো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন তার ওপর বিবেচনা করে মহান পুরুষ তৈরি হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে একজনের একক শক্তি ও ক্ষমতার মূল্যায়ন করতে পারি না, যতক্ষণ-না তার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করি। চ্যালেঞ্জ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমেই বের হয়ে আসে ব্যক্তির সবচেয়ে ভালো এবং খারাপ দিক। একটি দলের পরিমার্জনের জন্য প্রতিযোগিতা হচ্ছে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। উচ্চ তাপমাত্রার মাধ্যমে স্বর্ণ থেকে খাদ অপসারণ করা হয়। ঠিক তেমনি চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে ব্যক্তির শক্তি ও সামর্থ্য বৃদ্ধি পায়, যতবার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা হয় ততবার শক্তি ও সামর্থ্য পরিশুদ্ধ হয়। সত্যি বলেছেন হেলেন কেলার : খরভব রং বরঃযবৎ ধ ফধৎরহম ধফাবহঃঁৎব ড়ৎ হড়ঃযরহম ধঃ ধষষ.৮২ প্রতিটি মানুষের জীবনের সাফল্যের জন্য অবশ্যই প্রতিদ্বন্দ্বিতা দরকার। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন জীবন মানুষকে মানুষ বানায় না, ফলে জাতিও তৈরি হয় না; অপরদিকে, চ্যালেঞ্জ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানুষকে মানুষ বানায়, আর সেই মানুষগুলো একটি জাতি বানায়।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের যাত্রার সূচনাতে দেশের ভিতরের এবং বাইরের অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। সৌভাগ্যবশত, আল্লাহ্ আমাদের শক্তিশালী এবং জ্ঞানঋদ্ধ জনগণ এবং দূরদর্শী অনেক নেতা দিয়েছিলেন, যাঁরা তাঁদের প্রজ্ঞা দিয়ে সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছিলেন। নেতা এবং নেতৃত্ব এমন একটি সত্তা যাকে বলা যায়Ñ শক্তির উৎসের মার্জিত রূপ। যিনি নিজেকে বিলীন করে দিয়ে সমাহিত হন সহ¯্র,ে লাখে আর অসংখ্য বিমূর্তে। তাই নেতা কখনও বিলীন হন না, একজন নেতা অনুক্ষণ নেতা। তিনি বর্তমান থাকেন কল্যাণের বিমূর্ত প্রত্যয়েÑ প্রেরণার উৎস হয়ে চিরকাল।

প্রতিটি চ্যালেঞ্জ বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন কিছু শেখার সুযোগ তৈরি করে দেয় এবং এর মাধ্যমে আমাদের ক্ষমতা, জ্ঞান ও আশপাশের মানুষের চরিত্র পরীক্ষিত, প্রতিফলিত হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা চ্যালেঞ্জ ছাড়া বিজয় ও অর্জন দুটোই অর্থহীন। যা সহজে লাভ করা যায়, তার প্রতি কারও আগ্রহ থাকে না, সেটি যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন। অর্জনে যেটি যত জটিল, সেটি তত আকর্ষণীয় এবং যেটি যত কঠিন সেটি তত মূল্যবান।

প্রতিযোগিতা এমন একটি বিষয়, যাতে জয়ী হলে আসে সাফল্য এবং পরাজয় হলে আসে অভিজ্ঞতা। দুটোর কোনোটাই ফেলনা নয়। প্রতিযোগিতায় পরাজয়ে অর্জিত অভিজ্ঞতা নিষ্প্রভ ও অলস জয়ের চেয়ে অনেক অনেক বেশি মূল্যবান।

আমরা কত বছর কাজ করেছিÑ তার ওপর নির্ভর করে সত্যিকার অভিজ্ঞতা নির্ণয় হয় না। তবে আমরা কতগুলো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিÑ তার ওপর নির্ভর করে সত্যিকার অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা। ব্যর্থতাই অভিজ্ঞতার জনক, যদি ওই ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে আমরা সময় দিই। মাঝে মাঝে আমাকে এমন ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে নানা প্রতিযোগিতায় যেতে হয়, যাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। তবে তারা প্রবল প্রজ্ঞা ও বিশাল মনের অধিকারী। ফলে তাদের মধ্যে সাফল্য ও বিচক্ষণতা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার মাধ্যমে অর্জিত এ জ্ঞানকে অন্যান্যদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষতায় কাজে লাগিয়েছে। অধিকন্তু তারা অন্যান্যদের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। আর এগুলোই তাদের যোগ্যতা ও কৃতিত্বের পরিচায়ক।

যে যত বেশি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়Ñ সে তত বেশি দক্ষ, তত বেশি অভিজ্ঞ- হোক জয়ী বা পরাজিত। প্রতিযোগিতা ক্যারিয়ারকে টেকসই এবং জীবনযুদ্ধকে সহজসাধ্য করে তোলে। প্রতিযোগিতা এমন একটি বিষয়, যাতে জয়ী হলে আসে সাফল্য এবং পরাজয় হলে আসে অভিজ্ঞতা। দুটোর কোনোটাই ফেলনা নয়। প্রতিযোগিতায় পরাজয়ে অর্জিত অভিজ্ঞতা নিষ্প্রভ ও অলস জয়ের চেয়ে অনেক অনেক বেশি মূল্যবান।

প্রতিযোগিতা ব্যক্তিকে করে শাণিত, প্রতিষ্ঠানকে করে দক্ষ, লক্ষ্যকে করে তীব্র আর প্রাপ্তিকে করে তোলে যথার্থ। তাই প্রতিযোগিতা যত বাড়ছে, মানবসভ্যতার উন্নয়নও তত বিস্তৃত হচ্ছে। এজন্য সবার উচিত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রকে বহুমুখী করে তোলা। তাতেই নিশ্চিত হবে আমাদের জাতীয় কল্যাণ। আমাদের নিরাপত্তা।

২৬.বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া

সৈয়দ আবুল হোসেন: মহানবি (সা.) বলেছেন, জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন হলে সুদূর চীন দেশে যাও। তিনি কেন চীনের কথা বলেছিলেন? এ নিয়ে অনেকে অনেক ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। চীন পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম পাদপীঠ। চীনের জনগণ যেমন কর্মঠ, তেমনি দূরদর্শী। বিশাল আয়তনের ভূখ- চীনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সীমাহীন বৈচিত্র্য পুরো পৃথিবীর সারসংক্ষেপ যেন। আমি চীনে ছাত্র হিসাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন করিনি। তবে ব্যবসার সূত্রে চীনের সাথে আমার একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ সুবাদে চীন, চীনের মানুষ, প্রকৃতি এবং বিশাল বৈচিত্র্যময় প্রাসঙ্গিকতা আমাকে যা শিখিয়েছে, যা দিয়েছে- তা কখনও পরিমাপযোগ্য নয়।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমার ব্যাপক যোগাযোগ ও গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় আমাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন আমি দক্ষতার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করি। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ব্যবসার কারণে আমার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ছিল প্রসারিত। দিন দিন তা আরও পরিব্যাপ্ত হয়। প্রতিবছর আমি ষাটের অধিক বৈদেশিক আমন্ত্রণ পেতাম; তবে যেতাম দুই-একটায়। মন্ত্রী হওয়ার পর বিদেশ ভ্রমণ আরও কমিয়ে দিই। যোগাযোগ ও আইসিটি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সাড়ে তিন বছর সময়ে আমি ২১ বার বিদেশ গিয়েছি। তন্মধ্যে দুটি ছাড়া আর বাকিগুলো আমার নিজস্ব অর্থে। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ব্যবসায় উপলক্ষে আমার বিদেশ ভ্রমণ শুরু। এরপর আমার জন্য বিশ্বটাই হয়ে ওঠে একটা বিচরণক্ষেত্র। যাই হোক, এ বিষয়ে আমি বেশি কিছু বলব না, শুধু বোয়াও ফোরাম সম্পর্কে কিছু বলব। কারণ এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফোরাম, তবে অনেকে এ বিষয়ে তেমন জানেন না।

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আমি ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’র সাথে জড়িত ছিলাম। ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনারে আমি চেয়ারপারসন হিসাবে দায়িত্ব পালন ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সুযোগ লাভ করি। বাংলাদেশে কেবল আমিই এ সুযোগ লাভের অধিকারী। এ সুযোগ আমাকে আন্তর্জাতিক পরিম-লে ব্যাপকভাবে পরিচিত করে তোলে। আর্থনীতিক বিশ্বায়নের যুগে এ ফোরামটি ইতোমধ্যে একটি কার্যকর ফোরাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

এ ফোরাম গঠনের একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন অব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (অ্যাপেক), অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথ ইস্ট এশিয়ান ন্যাশনস (আসিয়ান) + চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া (১০ + ৩), ডেভোস ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামসহ বহু আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক ফোরাম এশিয়ার দেশগুলোতে অর্থনীতির ক্ষেত্রে অবদান রাখার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এসব আঞ্চলিক বা উপ-আঞ্চলিক ফোরাম সীমিত গ-ির মধ্য থেকে কাজ করে যাচ্ছে। এসব থেকে আলাদা কিছু করার লক্ষ্য নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে এশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এশিয়ার অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’ গঠন করা হয়।

চীন তার দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নিতে চায়। এ লক্ষ্যে এশিয়ার দেশগুলোতে চীন তাদের আর্থনীতিক কর্মকা-কে আরও সুসংগঠিতভাবে সম্প্রসারিত করার তাগিদ অনুভব করে। এজন্য প্রয়োজন পারস্পরিক আর্থনীতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি। এমনি এক বাস্তবতা থেকে চীন-অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়ার ২৬টি দেশ এশিয়ান ফোরাম গঠনের উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত হয়। মূলত ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিডেল ভি. রামোস, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বব হক, জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরিহিতো হোসাকাওয়া একটি কার্যকর এশিয়ান ফোরাম গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। চীনের আন্তর্জাতিক মর্যাদা, সম্ভাবনা এবং হাইনান প্রদেশের অপরূপ সৌন্দর্য ও পরিবেশের কথা বিবেচনায় নিয়ে উদ্যোক্তরা ‘বোয়াও’ নামক স্থানে এ ফোরামের প্রধান কার্যালয় স্থাপনের জন্য নির্ধারণ করেন। ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের তিন সাবেক রাষ্ট্রনায়কের কাছ থেকে এ ধরনের প্রস্তাব পাওয়ার পরপরই চীন তা সাদরে গ্রহণ করে। হাইনান প্রদেশের নৈসাঙ্গিক স্থান ‘বোয়াও’-এর নামানুসারে গঠিত এ আন্তর্জাতিক সংগঠনটির নাম রাখা হয় ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’। অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়ার ২৬টি দেশ এ ফোরামের সদস্য। বাংলাদেশ, চীন, জাপান, ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল এ ফোরামের সদস্য। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে বাংলাদেশ থেকে এ ফোরামের প্রধান প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব পালনের জন্য চীন সরকার আমাকে মনোনীত করে। এরপর থেকে ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’-র উদ্যোগে আয়োজিত প্রতিটি সম্মেলনে আমি বাংলাদেশের পক্ষে প্রধান ও স্থায়ী প্রতিনিধির ভূমিকা পালন করে আসছি।

২০০১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ ফেব্রুয়ারি চীনের হাইনান প্রদেশের বোয়াও এলাকায় শুরু হয় দুইদিনব্যাপী ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’-র প্রথম সম্মেলন। এ উপলক্ষে বোয়াও সাজে বর্ণাঢ্য সাজে। অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়ার ২৬টি দেশের সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানসহ প্রায় দুই হাজার প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়োসোহিরো নাকাসোনে, ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিডেল ভি. রামোস, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বব হক, কাজাখিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী সের্গেই টেরেক সেনকো, মঙ্গোলিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট পুনসালমা অরকিরবাট, চীনের প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড. মাহথির বিন মোহাম্মদ, নেপালের প্রয়াত রাজা বীর বিক্রম শাহ দেব, ভিয়েতনামের উপ-প্রধানমন্ত্রী নওয়েন মান ক্যাম। তাঁরা সবাই সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। এছাড়াও বিভিন্ন দেশের বহু রাজনীতিক ও ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে অভিনন্দনবার্তা পাঠান।

বাংলাদেশ থেকে আমিসহ কয়েকজন রাজনীতিক ও ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ সম্মেলনে যোগদান করি। এ সম্মেলনে আমাকে ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’-র প্রধান বাংলাদেশ প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়। এশিয়ার বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধানের উপস্থিতি গোটা সম্মেলনকে প্রাণবন্ত করে তোলে। এশিয়ার নেতৃবৃন্দ আর্থনীতিক অগ্রগতির স্বার্থে একযোগে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অধিকাংশ নেতৃবৃন্দের বক্তব্যে ফোরাম গঠনের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য প্রকাশ পায়।

ফোরাম গঠনের উদ্যোক্তাদেরই একজন ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিডেল ভি. রামোস। তিনি ফোরাম গঠনের যৌক্তিকতা সম্পর্কে বলেন, ‘‘এটা সত্য যে এশিয়াতে অনেক ফোরাম রয়েছে। কিন্তু তাদের কেউই এশিয়ার মেধা ও কূটনীতিক অভিজ্ঞতার সমাবেশ ঘটাতে পারেনি যেটা আমরা এ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ঘটাতে পেরেছি।” চীনের প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন বলেছিলেন, এ ফোরাম আর্থনীতিক বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে সংলাপ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি অভিন্ন উন্নয়নে এশিয়ার দেশগুলোর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। কফি আনান তাঁর বাণীতে ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’-র ভূমিকা সম্পর্কে উঁচু ধারণা পোষণ করে লিখেছিলেন, ‘যে সকল নেতা এ ফোরামের সাথে যুক্ত রয়েছেন তাঁদের সম্মিলিত প্রয়াস শুধু এশিয়াকে নয়, সমগ্র বিশ্বকে উপকৃত করবে।’ এ সম্মেলনেই গৃহীত হয় ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’-র চার্টার। ঘোষণা (ডিক্লারেশন) অনুয়ায়ী প্রতিবছর ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথম বার্ষিক সম্মেলন হয় ২০০২ খ্রিস্টাব্দের ১২-১৩ এপ্রিল।

‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’-এর বার্ষিক সম্মেলন ছাড়াও সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে চীনের গুইলিনে পর্যটন সম্মেলন এবং তেহরানে জ্বালানি বিষয়ক সম্মেলন উল্লেখযোগ্য। চীনের গুইলিনে অনুষ্ঠিত পর্যটন সম্মেলনে ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’-র স্পোক্স্ পার্সন হিসাবে বাংলাদেশ থেকে আমি যোগদান করি। ২০০২ খ্রিস্টাব্দের ১৮ নভেম্বর এ সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনের সমাপ্তি অধিবেশনে আমাকে সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করার বিরল মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। এ সম্মেলনের সভাপতি হিসাবে আমার ভূমিকা ও কার্যক্রম চীনসহ ২৬টি সদস্য রাষ্ট্রের পত্র-পত্রিকায় উচ্চ প্রশংসাসহ প্রকাশিত হয়।

১৯ নভেম্বর, ২০০২ খ্রিস্টাব্দে ২৬টি দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে ‘গুইলিন ঘোষণা ২০০২’ গৃহীত হয়। অন্যান্যের মধ্যে ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’-এর সেক্রেটারি জেনারেল ড. ঝ্যাং সিয়াং এ অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন। বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া, চায়না ন্যাশনাল ট্যুরিজম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং এশিয়া কো-অপারেশেন ডায়ালগ যৌথভাবে এ সম্মেলনের আয়োজন করে। এশিয়ার ২৬টি দেশের পর্যটনমন্ত্রীসহ ৫ শতাধিক প্রতিনিধি এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বোয়াও ফোরামের স্পোক্স্ পার্সন এবং মাস্টার অব সেরিমনি হিসাবে আমি ১৯ নভেম্বর গুইলিন ঘোষণা-২০০২ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হওয়ার পর দুটি পৃথক প্রেস কনফারেন্সে ট্যুরিজম সম্মেলনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং বিভিন্ন দিক সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরি। এ সময় আমাকে সহায়তা করেন চায়না ন্যাশনাল ট্যুরিজম অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ভাইস মিনিস্টার মি. সান গ্যাং, বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ইয়াও ওয়াং এবং গুইলিন মিউনিসিপ্যাল গভর্নমেন্ট-এর ভাইস মেয়র প্যান জিয়ানমিং।

‘গুইলিন ঘোষণা-২০০২’ উপস্থাপনকালে চায়না ন্যাশনাল ট্যুরিজম অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের চেয়ারম্যান মি. হি গুয়াংওয়ে এশিয়ার দেশগুলোতে ভ্রমণকারীদের অবাধ চলাফেরা নিশ্চিত করার জন্য আঞ্চলিক এবং আন্তঃআঞ্চলিকভাবে বিদ্যমান সকল ধরনের বাধা অপসারণের আহ্বান জানান। সমাপনী ভাষণে আমি যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলাম তা এখনও মনে আছে : “পর্যটন থেকে সর্বোচ্চ সামাজিক এবং আর্থনীতিক সুবিধা আদায়ের জন্য পর্যটনশিল্প এবং পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। আর কোনো বিষয় যাতে পরিবেশের ক্ষেত্রে পর্যটনশিল্পখাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তোলা আবশ্যক। পর্যটন হলো একটি তথ্যনির্ভর শিল্প। সেজন্য তথ্যের আদান-প্রদানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ট্যুরিস্টদের আকৃষ্ট করে পর্যটনশিল্পের ব্যাপক বিকাশ সাধন করা সম্ভব। পর্যটনশিল্পে গতিশীলতা আনয়ন এবং এ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়ার জন্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো, ট্যুরিস্ট পণ্য উন্নয়ন এবং ট্যুরিজম সার্ভিসের আরও উন্নয়নের প্রয়োজন রয়েছে।” বিকেলে রাউন্ড টেবিল বৈঠকে বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন অংশগ্রহণ করেন। শেষ দিনে ২৬টি দেশের অতিথিদের সম্মানে চীনের লী জিয়াং নদীভ্রমণের ব্যবস্থা করা হয়।

২০০৪ খ্রিস্টাব্দের ২৩ এপ্রিল আমার স্মরণীয় দিনসমূহের একটি। এ দিন বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়াসহ এশিয়ার ২৬টি দেশের বর্তমান এবং সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদরা এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আর্থনীতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের লক্ষ্য নিয়ে চীনের হাইনান দ্বীপে সমবেত হন। ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’ আয়োজিত হাইনানে সোফিটাল বোয়াওতে চারদিনব্যাপী এ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন চাইনিজ পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান চিয়া ছিং লিং। বোয়াও ফোরামের প্রধান বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসাবে আমাকে ২৫ এপ্রিল ‘আর্থনীতিক প্রবৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ীদের সামাজিক দায়িত্ব’ শীর্ষক অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য মনোনীত করা হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের পক্ষে একটি বিরল সম্মানের বিষয়।

এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ১ হাজার প্রতিনিধি এ সম্মেলনে যোগ দেন। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা এ সম্মেলনে যোগদান করেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেনÑ মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতকু আবদুল্লাহ আহমেদ বাদাবি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড, সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বব হক, নেপালের রাজা জ্ঞানেন্দ্র, ইউরোপিয়ান কমিশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোমানো প্রোদি, পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফারুক লেঘোরি প্রমুখ। ২০টি অধিবেশনে বিভক্ত এ সম্মেলনের প্রথম প্লানারি সেশনে ২৩ এপ্রিল তিনটি বিষয় উত্থাপন করা হয়। আর্থনীতিক বিশ্বায়নের যুগে এশিয়ার ভূমিকা, সুনামি-পরবর্তী পুনর্গঠন ও এশিয়ার আর্থনীতিক উন্নয়ন এবং এশিয়ার সামাজিক উন্নয়নে খাপ খাওয়ানো- শীর্ষক তিনটি বিষয়বস্তুর ওপর মুখ্য আলোচক ছিলেন চীনের পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান চিয়া ছিং লিং, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ আহমেদ বাদাবি, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জন হাওয়ার্ড, সিঙ্গাপুরের মন্ত্রী লি কুয়ান ইউ, নেপালি কাউন্সিল অব মিনিস্টার ও এর ভাইস চেয়ারম্যান কীর্তি নিধি বিসতা। এর আগে ২২ এপ্রিল আমি সম্মেলনে আগত ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিডেল ভি.রামোস, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বব হক, সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ, মালয়েশিয়ার সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী দাতোস মুসা বিন হিতাম ও শ্রীলংকার দক্ষিণ অঞ্চলের গভর্নর কিংসলে উইক্রামারাতনে এবং চীনের পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান চিয়া ছিং লিং-এর সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। আলোচনায় আমি বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে সবার আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হই, যার সুফল এখন বাংলাদেশ ভোগ করছে।

২৪ এপ্রিল “ইকোনমিক গ্রোথ অ্যান্ড এন্ট্রিপ্রিউনিয়ারস সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটিস এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন লেবার অ্যান্ড চ্যারিটি” শীর্ষক সেমিনারে আমি সভাপতিত্ব করি। সেমিনারে এশিয়ার দেশগুলোতে আর্থনীতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। এশিয়ার দেশগুলো আর্থনীতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে যেভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তা অতীতে আর কখনও দেখা যায়নি। অথচ সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে দেখা যায়, আর্থনীতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে গিয়ে পরিবেশকে বিনষ্ট করা হয়। এমনকি পশ্চিমা দেশগুলোর উন্নয়নের ফর্মূলা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এশিয়ার দেশগুলোতে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। সেমিনারে বক্তারা বলেন, আমাদের সামনে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ। ধনী এবং দরিদ্রের ব্যবধান বাড়ছে, দারিদ্র্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের যথাযথ ভূমিকা রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সেমিনারে বক্তব্য রাখেন ইউপিএস এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিকের সভাপতি কেনেথ আর্থার তোরক, এনওয়াইকে চেয়ারম্যান এবং ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’-এর বোর্ড অব ডিরেক্টর জিরো নেমেটো প্রমুখ।

২০০৪ খ্রিস্টাব্দের ২৬ এপ্রিল। চীনের হাইনান প্রদেশের বোয়াওতে বিএফএ-এর উদ্যোগে দুইদিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ফোরামের সদস্যভুক্ত দেশের প্রায় ১ হাজার প্রতিনিধি ছাড়াও বিশ্বের কয়েকটি দেশের নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। দুইদিন পরিব্যাপ্ত এ সম্মেলনকে চারটি অধিবেশনে বিভক্ত করা হয়। বিশ্বনেতৃবৃন্দের মধ্যে যাঁরা এ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন চীনের প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মীর জাফরুল্লাহ খান জামালি, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী সামদেদুন সেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ, ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিডেল ভি. রামোস,

মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বব হক, নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিরতি নিধি বিসতা এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফারুক আহমেদ খান লেঘারি।

এশিয়ার সংস্কৃতির মূলমন্ত্র হবে মানুষে মানুষে সাহচর্য, সমঝোতা, একে অপরের প্রতি সমবেদনা, মানুষের প্রতি ভালবাসা, সৌহার্দ্য, শান্তি ও সম্প্রীতি।

অধিবেশনের শেষ দিনে ‘এশিয়ান কালচারাল এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো-অপারেশন’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এ বৈঠকে সভাপতি হিসাবে বৈঠক পরিচালনা ছাড়াও আমাকে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। বৈঠকে আমি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানোর পাশাপাশি সহযোগিতামূলক উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই। আমি আমার বক্তব্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়, পারস্পরিক সহযোগিতা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানের মাধ্যমে বিশ্বায়নকে পরিপূর্ণভাবে সার্থক করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিই। সেদিন আমি বলেছিলাম : “সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যক্তি এবং জাতি সমৃদ্ধ হয়। সংস্কৃতি-সমৃদ্ধ এশিয়ার দেশগুলো প্রতিনিয়ত তা বিনিময়ের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমান শতক শুধু আর্থনীতিক বিশ্বায়নের শতকই নয়, এটি সাংস্কৃতিক বিশ্বায়নের যুগ। এশিয়ার সংস্কৃতির মূলমন্ত্র হবে মানুষে মানুষে সাহচর্য, সমঝোতা, একে অপরের প্রতি সমবেদনা, মানুষের প্রতি ভালবাসা, সৌহার্দ্য, শান্তি ও সম্প্রীতি। এশিয়ার মানুষের কাছে এ মন্ত্র পৌঁছে দেওয়া আজ বড় বেশি প্রয়োজন।”

১৬ জুলাই, ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে তেহরানে জ্বালানি বিষয়ক দুই দিনব্যাপী সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারের বিষয়বস্তু ‘জ্বালানি এবং টেকসই আর্থনীতিক উন্নয়ন’। এ সেমিনারের অন্যতম আয়োজক ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’-এর পক্ষ থেকে আমাকে পূর্ব থেকে সেমিনারের শেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার অনুরোধ জানিয়ে পত্র পাঠানো হয়। আমি অনুরোধে সম্মতি প্রকাশ করি। ইরানের জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় এবং ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’ যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

১৭ জুলাই দুইদিনব্যাপী সম্মেলনের শেষ দিনে ‘জ্বালানি এবং টেকসই আর্থনীতিক উন্নয়ন’ বিষয়ক সেমিনারে আমি সভাপতি হিসাবে বক্তব্য রাখি। এ সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ইরানের জ্বালানি উপমন্ত্রী ড. আমরোলাহি, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ড. অরডেকোনিয়ান এবং আহমদিয়ান চায়না একাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিং-এর অধ্যাপক ঝাই গুয়াংমিন। এ সম্মেলনে বক্তারা ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা পূরণে বিশ্বকে জ্বালানি খাতে আরও বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, আর্থনীতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে জ্বালানি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নতুন উপায় খুঁজে বের করতে হবে। সেমিনারে বক্তারা এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি চাহিদার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য ব্যবসায়-বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, জ্বালানি সমস্যা সমাধানে এ মুহূর্তে এশিয়াব্যাপী একটি স্বচ্ছ এবং উন্মুক্ত জ্বালানি বাজার সৃষ্টির প্রয়োজন রয়েছে। আর্থনীতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য এবং টেকসই পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য জ্বালানি সক্ষম প্রযুক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে এবং খনিজ সম্পদ আহরণে পরিবেশগত উন্নয়ন এবং পুনরুজ্জীবিত জ্বালানি প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিতে হবে।

বক্তারা বলেন, স্থানীয় পরিবেশ দূষণ এবং বিশ্ব-পরিবেশগত সমস্যা যেমন এসিড বৃষ্টির মতো সমস্যার উদ্ভব না ঘটায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একমাত্র ভূগর্ভস্থ জ্বালানির ওপর বর্তমান নির্ভরতা কমাতে হবে। জ্বালানি ব্যবহার ও সংগ্রহে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া পরিহার করার কৌশল আবিষ্কারে উদ্যোগ নিতে হবে। টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে জ্বালানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এর আগে প্রথম অধিবেশনে ইরানের পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী ড. আদেলি, পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী জানজেনেহ, বোয়াও ফোরামের মহাসচিব ইয়ং টু লং এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বব হক বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

২০১৩ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে চীনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’-এর বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উদ্দেশ্য- এশিয়ার অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। তার নাম দেওয়া হয় এশিয়ান ইনফ্রাস্টাকচার ইনভেষ্টমেন্ট ব্যাংক- এআইআইবি। মূলত এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্যই শীর্ষ সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এখানে অংশগ্রহণ করেছিল বিশ্বের ৩০টি দেশের বিশেষজ্ঞ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তবে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর মতো ব্যাংকের কোনো প্রতিনিধিকে এ সম্মেলনে ডাকা হয়নি। বস্তুত তাদের একচেটিয়া আধিপত্যকে খর্ব করার জন্যই এ ব্যাংক গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে চীন। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ তাঁদের সৃষ্টিশীল চিন্তা-চেতনাকে উপস্থাপন করেছেন। আলোচনা হয়েছে- কীভাবে নিজ নিজ দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে সরকারের সেবাসমূহ আরও ইতিবাচক, কার্যকর এবং জনবান্ধব করা সম্ভব।

এ শীর্ষ সম্মেলনের একটি সেশন আমি মডারেট করি। প্রশ্ন-উত্তর পর্বেও আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানে তাৎপর্যপূর্ণ ও উত্তেজনামূলক নানা আলোচনা হয়েছে। এখানে মুক্ত আলোচনার জন্য ছিল নানাবিধ বিষয়। ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব, সফলতা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন- কোনোটাই বাদ পড়েনি। গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সীমা-পরিসীমা নির্ধারণ করার জন্য ছিল বহু মুহূর্ত। যেখানে জাতির জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ চিন্তা-চেতনা ও দর্শন। এ সম্মেলন আমাকে অনেক বিষয়ে উপলব্ধি করতে ও ভাবতে শেখায়, যা আমাকে বইটি রচনায় উদ্বুদ্ধ করে।

‘বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া’র যে বর্ণনা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে তা আন্তর্জাতিক পরিম-লে আমার কাজের একটি খ-িত চিত্র মাত্র। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার জন্য আমি নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। ৪/ ৮৩ – ৮৮

২৭. ‘অসম্ভব’: একটি ভৌতিক শব্দ

সৈয়দ আবুল হোসেন: ‘অসম্ভব’ বলে কোনো শব্দ আমি আমার অভিধানে রাখতে চাই না। ঠিক এমনই বলেছিলেন, নেপোলিয়ন : ঞযব ড়িৎফ রসঢ়ড়ংংরনষব রং হড়ঃ রহ সু ফরপঃরড়হধৎু.৮৩ তবে আমি নেপোলিয়ন নই, আমি আমার স্বকীয় বিদ্যমানতায় অন্য একজন মানুষ। শিশুবেলা থেকে আমি মনে করি ইচ্ছা থাকলে সবকিছুই জয় করা সম্ভব। যে ব্যক্তি কাজ করতে চায় না তার জন্য ‘অসম্ভব’ শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে। অথবা যারা আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চায় না, তাদের জন্য। আজকাল কেবল আমার নয়, বাংলাদেশের অনেকের মনোগত অভিধানে অসম্ভব শব্দটি খুঁজে পাওয়া যায় না। এ শব্দটি শুধু তাদের জন্য, যারা বড় স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। এটা শেকলের মতো, যা তাকে আটকে রাখে এবং তার প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা প্রদান করে। এটা মানুষকে আটকে রাখতে পারে, যেমনিভাবে কারাগারে মানুষকে আটক রাখা হয়। যেখানে চলাচল করতে, প্রাণবন্ত জীবন এবং সফলতা অর্জনে তাকে বাধা প্রদান করে। যার কোনো ইচ্ছা নেই, প্রত্যাশা নেই। প্রকৃতপক্ষে, ঘড়ঃযরহম রং রসঢ়ড়ংংরনষব ঃড় ধ রিষষরহম যবধৎঃ.৮৪

আমি আমার স্বকীয় বিদ্যমানতায় অন্য একজন মানুষ। শিশুবেলা থেকে আমি মনে করি ইচ্ছা থাকলে সবকিছুই জয় করা সম্ভব। যে ব্যক্তি কাজ করতে চায় না তার জন্য ‘অসম্ভব’ শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে। অথবা যারা আমাদের সঙ্গে কাজ করতে চায় না, তাদের জন্য। আজকাল কেবল আমার নয়, বাংলাদেশের অনেকের মনোগত অভিধানে অসম্ভব শব্দটি খুঁজে পাওয়া যায় না। এ শব্দটি শুধু তাদের জন্য, যারা বড় স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়।

বাংলাদেশে প্রথম ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেসরকারি উদ্যোগে পর্যটনশিল্পের সূচনা হয়। বেসরকারিভাবে প্রধানত চারটি বিষয় নিয়ে পর্যটন শিল্পের সফল সূচনা ঘটেছিল। এগুলো হলোÑ আতিথেয়তার জন্য হোটেল-রেস্টুরেন্ট, থাকার জন্য রিসোর্ট, থিমপার্ক ও যাতায়াতের জন্য পরিবহন-সুবিধা।৮৫ প্রতিবছর অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা গড়ে ৫০ লাখ। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে মোট জিডিপির ৪.৩ শতাংশ এসেছে পর্যটন খাত থেকে। টাকার অঙ্কে এটি প্রায় ৩৯ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে তা বেড়ে ৭.৫ শতাংশ হয়। ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এর পরিমাণ গড়ে তা ৬.৮ শতাংশে দাঁড়াবে। যা টাকার অঙ্কে প্রায় ৮১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে পর্যটন খাত থেকে যে পরিমাণ টাকা এসেছে, এর অর্ধেকেরও অধিক প্রায় ১৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা এসেছে অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাত থেকে। এটি মোট জিডিপির ২.১ শতাংশ। শুধু ২০১২ খ্রিস্টাব্দে পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত ছিল ১২ লাখ ৮১ হাজার ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী, যা মোট চাকরি খাতের ১.৮ শতাংশ। এটি ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে ৪.৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পায়। এ বছর পর্যটন খাতে ১.৩ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে এ খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে ৪ শতাংশ। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ২.৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। এই হিসাবে ২০২৪ সালে মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে পর্যটন খাতের অবদান দাঁড়াবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ।৮৬

অন্যদিকে, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ১০ লাখ পর্যটক বাংলাদেশে আসবে বলে ধারণা করা যায়।৮৭ অথচ আমরা ট্যুরিজমের উন্নয়নের জন্য বলতে গেলে কিছুই করিনি। বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত বাংলাদেশে। এটি আমাদের প্রকৃতি প্রদত্ত এক মহা সম্পদ। অনেকে বলে থাকেন, আমাদের এ অঞ্চলে নাকি উত্তেজনা বিরাজ করছে। তাই এখানে ব্যবসায়ের পরিবেশ নেই এবং ব্যবসায় নাকি সম্ভব নয়। কিন্তু তা যথার্থ নয়। আমাদের দেশে ব্যবসায়ের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে। বর্তমানে আমরা দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটন শিল্পের মধ্যে বড় ব্যবসায়ের ও বৈশি^ক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এটা আগামী দিনে আরও বাড়বে।

বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নীতিগতভাবে ও উন্নয়নের চিন্তা-চেতনার দিক থেকে একত্র করা অসম্ভব। বর্তমানে এই ব্যাপারে অনেক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ভিসা ছাড়া ভ্রমণ, অভিন্ন মুদ্রা চালু করারও চেষ্টা চলছে। ভারতও এই ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এসে চুক্তি করে গেলেন মহাযোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার। সব মিলে আমরা প্রমাণ করব, জোটভুক্ত থাকলে অসাধারণ ও আশ্চর্যজনক সফলতা অর্জন করা সম্ভব। এই অঞ্চলের শক্তি বাড়ানোর জন্য সবাইকে এক হতে হবে। সবাই মিলে যদি আর্থনীতিক উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া যায়, তাহলে এটা হবে পশ্চিমা দেশের জন্য একটি বড় প্রেশার।

অসম্ভব শব্দটি তাদের জন্য, যারা বড় স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়। এটা শেকলের মতো, যা তাকে আটকে রাখে এবং তার প্রতিটি পদক্ষেপে বাধা প্রদান করে। এটা মানুষকে আটকে রাখতে পারে, যেমনিভাবে কারাগারে মানুষকে আটক রাখা হয়।

আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হলেও আমাদের শক্তি ও সম্ভাবনার মাত্রা নির্ণয় সম্ভব হবে না। কেননা আমাদের নিজেদের ওপর এবং আমাদের সক্ষমতার ওপর প্রচ- বিশ^াস ও আস্থা আছে। ‘অসম্ভব’ শব্দটি আমাদের জীবনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এই শব্দটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, তুমি দুর্বল এবং তোমার চারপাশে যারা আছে তারাও দুর্বল। আমরা তা নই, এটি প্রমাণ হয়েছে এবং হচ্ছে। সত্য হচ্ছে- মানুষের শক্তি অথবা দুর্বলতার বিষয় নয়, বরং সত্য হচ্ছে একজন ব্যক্তির ইচ্ছা অথবা অনিচ্ছার বিষয়। আমার মনে পড়ছে অঁফৎবু ঐবঢ়নঁৎহ-এর সে অমিয় বাণী : ঘড়ঃযরহম রং রসঢ়ড়ংংরনষব, ঃযব ড়িৎফ রঃংবষভ ংধুং ‘ও’স ঢ়ড়ংংরনষব!৮৮

কোন্ ব্যক্তি ‘অসম্ভব’ শব্দটি আবিষ্কার করেছে, তার কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। তবে এটা পরিষ্কার, কেউ একজন খুঁজছিল এমন এক জীবনের, যে-জীবনে থাকবে শুধু আরাম, ঘুম এবং কর্মহীনতা। এ শব্দটিতে আমাদের কখনও বিশ^াস ছিল না। আজ আমি এমন কিছু শব্দ শুনেছি তা হলো, হে ‘অসম্ভব’ তুমি আমাদের সম্ভবনার আওতা থেকে দূর হয়ে যাও। দূর হয়ে যাও বহুদূরে।

যেখানে ঐকান্তিক ইচ্ছা ও বিশ^াস থাকে, সেখানে অসম্ভব বলে কোনো জিনিস থাকতে পারবে না। জীবনে অসম্ভব বলে কিছু নেই। অসম্ভব ধারনাটি মানুষের জন্য কলঙ্কজনক। এটি যত দূরে ছুড়ে দেওয়া যায় ততই মঙ্গল।

জীবনে তিনটি অবাস্তব বা কাল্পনিক জিনিস রয়েছে। প্রথমত, কল্পনার পাখি- এটি এমন এক পাখি, যে কখনও মাটিতে নামে না, সব সময় উড়ে বেড়ায়। যখন সে আকাশে ডিম পাড়ে, সে ডিম মাটিতে পড়ার আগেই বাচ্চা ফুটে উড়তে থাকে। দ্বিতীয়ত, রাক্ষস- যা আমরা কখনও দেখি না। এটাও একটি অবাস্তব বা কাল্পনিক গল্প। এবং তৃতীয়ত, বিশ^স্ত বন্ধু। মনে রাখুন, এটা আমার কোনো কথা নয় এবং বহু মানুষ অন্য আরও কয়েকটি অবাস্তব বা অসম্ভব বিষয় এর সঙ্গে যোগ করেছে, তাদের প্রত্যেকের চিন্তা ও ধারণা অনুযায়ী। পরিশেষে, আমি বলতে চাই, যেখানে ঐকান্তিক ইচ্ছা ও বিশ^াস থাকে, সেখানে অসম্ভব বলে কোনো জিনিস থাকতে পারে না। জীবনে অসম্ভব বলে কিছু নেই। ‘অসম্ভব’ ধারণাটা মানুষের জন্য কলঙ্কজনক। এটি যত দূরে ছুঁড়ে দেওয়া যায় ততই মঙ্গল।

আমি মনে করি, ‘অসম্ভব’ ভূতের কার্যকলাপের মতো কাল্পনিক ও ভৌতিক একটি প্রত্যয়। ভয়, অনিচ্ছা, নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, অনীহা, মানসিক রোগ, অস্থিরতা কিংবা অলসতা হতে ‘অসম্ভব’ শব্দের উৎপত্তি। ভূতের যেমন প্রকৃত কোনো অস্তিত্ব নেই, তেমনি ‘অসম্ভব’ শব্দেরও কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই। কেবল অজ্ঞতাই ভূতের মতো ‘অসম্ভব’ শব্দকে ধারণ করে রাখে। ভয়কে জয় করে এগিয়ে যান, দেখবেন ‘অসম্ভব’ ভূতের মতোই মিলিয়ে যাচ্ছে বাস্তবতায়। কর্ম, অধ্যবসায়, নিষ্ঠা আর আন্তরিকতার কাছে সব ‘অসম্ভব’ ছুটে আসে সম্ভবের বিমূর্ত সৌরভ হয়ে।

ব্যবসায়ীদের বিশ্বসমাবেশ

সারাবিশে^র বড় বড় কোম্পানির প্রায় দুইশতাধিক নির্বাহী চীনের একটি কনফারেন্সে যোগ দিয়েছিলেন। সেসময় আমি তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম। তাঁরা আমাকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তখন আমি আমার বক্তব্যে বলেছিলাম, আমি যে কাহিনি বলতে চাই, সংক্ষেপে বলতে গেলে, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আমরা ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের মধ্যে পেয়ে থাকি।

ব্যবসা হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি ভীষণ যুদ্ধক্ষেত্র। এটি কখনও ভয়ঙ্কর কখনও-বা আনন্দে ভরপুর উত্তেজনাক্ষেত্র, ঠিক খেলার মতো। আনন্দের হলে তা হয় সর্বজনীন আর ভয়ঙ্কর হলে হয় পাশব। যখন কেউ জয়ের জন্য মানবিক মূল্যবোধগুলোকে বিসর্জন দেয়, তখন প্রতিযোগিতা হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর আর যখন তা সর্বজনীন কল্যাণের জন্য নিবেদিত থাকে তখন তা হয়ে ওঠে আনন্দ আর উত্তেজনার বিহ্বল ক্ষেত্র। সুন্দর প্রতিযোগিতা দক্ষতা অর্জন ও সুকুমারবৃত্তি প্রকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, পক্ষান্তরে অসুন্দর প্রতিযোগিতা মানুষকে মানবীয় গুণাবলি হতে দূরে সরিয়ে অসুরে পরিণত করে।

এটা সবার মনে রাখতে হবে যে, প্রতিযোগিতা আপনাকে করবে শক্তিশালী ও সেরা। দুর্বলরা প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়। তারা কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় না এবং নিজেকে গুটিয়ে রাখে।

আমি সবসময় সমক্ষেত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিশ^াস করি, সংরক্ষণবাদে নই, যা আমাদের জন্য ভালো। যা সহজে অর্জন করা যায় তাতে কোনো আনন্দ নেই, তৃপ্তি নেই। এ কারণে যখন যে-ক্ষেত্রেই সাফল্য পেয়েছি তা প্রতিযোগিতা করেই পেয়েছি। প্রতিযোগিতা ছাড়া কেউ সফলতা পায় না, পেতে পারে না। প্রতিযোগিতাহীন অর্জন যতই প্রয়োজনীয় হোক না কেন, আলো-বাতাসের মতো কেউ তাকে নিয়ে ভাবে না। সবাই সফলতা চায়, কিন্তু পায় মাত্র গুটিকয়েক। তাই প্রতিযোগিতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। মূলত তারাই সফল হয় যারা প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়। প্রতিযোগিতা ছাড়া অর্জিত সফলতা ভিক্ষার মতো লজ্জাকর এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদের ন্যায় গৌরবহীন প্রাত্যহিক বিষয় মাত্র। আমি যা অর্জন করেছিÑ তা প্রতিযোগিতা করেই অর্জন করেছি। তাই আমার প্রতিটি প্রাপ্তি তা যতই ক্ষুদ্র বা বৃহৎ হোক না কেন, আমার আনন্দ, গৌরব আর অহঙ্কারের প্রতীক। আমার দুই মেয়ে রুবাইয়াৎ ও ইফকাতকেও আমি এটি বলে থাকি। সেভাবেই গড়ে তুলেছি তাদের।

শিক্ষালাভের প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রতিযোগিতা করা, যা আপনাকে সবসময় আরও শক্তিশালী ও আরও আত্মবিশ^াসী করে গড়ে তুলবে এবং আপনাকে করে তুলবে সেরাদের সেরা। দুর্বলেরা সবসময় প্রতিযোগিতাকে ভয় পায়। এজন্য আমাদের দেশ শ্রেষ্ঠ, কারণ প্রতিযোগিতা এখানে উন্মুক্ত। আমাদের কর্মকর্তারা আরও ভালো, কেননা তারা সবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। আমাদের রাস্তাঘাট প্রাকৃতিক পরিচর্যা বিবেচনায় খুব খারাপ বলা যাবে না। আমরা এগুলোকে আমাদের বুদ্ধি ও কৌশল দিয়ে আরও ভালো করে তোলার চেষ্টায় রত। কেননা আমরা রাস্তাঘাটের অবকাঠামোর উন্নয়নে এগিয়ে যেতে চাই। এমনকি আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ সেরাদের সেরা হয় যখন তাদেরকে পুরস্কৃত করা হয়, যা প্রথম হতে সাহস জোগায়।

সৃজনশীলতা এবং আইডিয়ায় দেশ ও দেশের প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়ন সাধন হয়। ভবিষ্যৎ তো তাদেরই জন্য, যারা নতুন নতুন আইডিয়া বা ধারণা সৃজন করতে সক্ষম। নতুন নতুন ধারণা বা আইডিয়াই পারবে নতুন কিছু তৈরি করতে। নতুন নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমেই দেশ এগিয়ে যাবে।

কয়েক বছর আগের কথা। একটি ব্যবসায়ী দল আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসে। তারা আমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া একটি প্রকল্পের বিষয়ে আলোচনা করে। আমি চেষ্টা করেছিÑ ওই প্রকল্প যারাই বাস্তবায়ন করুক না কেন তারা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে আসবে। এ কারণে সবাই এসেছে পদ্মা সেতুর পরামর্শক হওয়ার জন্য। কিন্তু আমি সবাইকে একটা কথাই বলেছি- কাজটা যারাই পাক সেটা স্বচ্ছভাবেই হবে, যোগ্যতার বাইরে কোনোকিছুই গণ্য হবে না। আমি কারও একক অনুরোধ রক্ষা করিনি। তা করিনি এজন্য যে, আমি ওই প্রতিযোগিতা সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে চেয়েছিলাম। কারণ এমন রাখলেই কেবল আমি শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানটাকে পাব। শ্রেষ্ঠ অবকাঠামো বিনির্মাণের জন্য শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই।

প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কমিটি এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু কী হলো! যারা অংশগ্রহণকারী তারা আমাকে অনুরোধ জানাল। আমি বললাম- স্বচ্ছ হবে। আর দুর্নীতির অভিযোগ এলো আমার ওপর। এতবড় একটি প্রকল্প যা নিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আমি জানতাম যে, এ প্রকল্প ও যা নির্মাণ করছি, সেই পদ্মাসেতু বর্তমানের জন্য নয়, ভবিষ্যতের জন্য। ভবিষ্যতের জন্য আমাদের কিছু করে যাওয়া উচিত। বর্তমানে পদ্মা সেতু সারাবিশে^র মানুষের কাছে একটা উদাহরণ হয়ে থাকবে।

এ আলোচনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য স্থির, উচ্চাকাক্সক্ষী এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন করে আমাদের নিজেদের গড়ে তোলা। লক্ষ্যহীন বা গন্তব্যহীন হলে আমরা পথ হারিয়ে ফেলব। আমাদের অবশ্যই সীমাহীন উচ্চাকাক্সক্ষী হতে হবে। যেকোনো কাজের ও যেকোনো মানুষের জীবনে উদ্দেশ্য ও উচ্চাকাক্সক্ষা ছাড়া পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেটা না থাকলে আগামী প্রজন্মের জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণ করাও সম্ভব নয়। আগামী প্রজন্মের কথা বিবেচনা করেই এমনভাবে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ঠিক করতে হবে যাতে করে আগামীতে একটি সুন্দর জাতি গঠন করা যায়- যারা সাফল্যের তরী বেয়ে সামনে এগিয়ে যাবে।

আমরা বিশ^াস করি, সৃজনশীলতা এবং আইডিয়া দেশ ও দেশের প্রতিষ্ঠানসমূহকে নির্মাণ করে। ভবিষ্যৎ তো তাদেরই জন্য, যারা নতুন নতুন আইডিয়া বা ধারণা সৃজন করতে সক্ষম। বর্তমানে এ অঞ্চলে বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে জ্ঞানভিত্তিক এবং উদ্ভাবনমূলক অর্থনীতির মাধ্যমে কর্মকর্তাদের শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়। আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, পৃথিবীর প্রথম সারির দেশগুলোর মধ্যে স্থান করে নেওয়া। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রবল প্রতিযোগিতা, সৃজনশীলতা এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে আমরা সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল দেশে পরিণত হব। আমরা নিশ্চিত চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছবই।

 

২৮. সরকারি কাজের পর্যবেক্ষণ

সৈয়দ আবুল হোসেন: মানুষের জীবনের সবচেয়ে সাফল্যের কারণ হচ্ছেÑ নিজের কাছে নিজের জবাবদিহি উপস্থাপনের মানসিক সদিচ্ছা ও নিয়ামক মূল্যবোধের প্রয়োগ। জবাবদিহি নিজের কাছে না থাকলে, সে সফল হতে পারে না। এই কারণে নিজেকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। কেবল মানুষের জীবনের বেলায় নয়, সরকারের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। একটি সফল সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হচ্ছে সরকারি কাজের পর্যবেক্ষণ করা। আমরা সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমতায়ন করেছি, তাদের নেতৃত্ব এবং আয়-ব্যয় করার ক্ষমতা দিয়েছি। একই সঙ্গে তাদের কাজের অগ্রগতি এবং তাদের দায়িত্ব পর্যবেক্ষণও করছি। সুতরাং যখন কোনো কর্মকর্তা ভুল করে অথবা কোনো অন্যায় করে, তখন কী অবস্থার সৃষ্টি হয় এক্ষেত্রে এবং তাকে কতবার সুযোগ দেওয়া যায়?

এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, আমাদের নিয়ম বা আইনের মাধ্যমে এবং তা সরকারি কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমস্যার সমাধান করা। আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, ব্যক্তিপর্যায়ের অনিচ্ছাকৃত ভুলগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা উচিত।

কৌশলগত পরিকল্পনার অগ্রগতির পরিমাপ করাই হচ্ছে প্রথম ধাপের পর্যবেক্ষণ। আমরা ব্যাপকভাবে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করি, যার মাধ্যমে মন্ত্রণালয়গুলোর পরিকল্পনার বাস্তবায়নের হাজার হাজার অগ্রগতির সূচক পরিমাপ করা যায়। আর এভাবে, আমি নিজে যখন দায়িত্বে ছিলাম তখন সরাসরি মন্ত্রণালয়গুলোর কাজের অগ্রগতির খোঁজখবর নিতাম। মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতির পরিমাপ করার জন্য তার নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। সরকারের উচ্চমহল থেকে এটা করা দরকার যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় তাদের কাজের যে অগ্রগতির প্রতিবেদন প্রেরণ করে তার ত্রুটি চিহ্নিত করে মন্ত্রনালয়ে প্রেরণ করা যাতে তারা দ্রুত তাদের কাজের ত্রুটিগুলো দূর করতে পারে।

দ্বিতীয় ধাপের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে মাঠপর্যায়ের। যার অর্থ হচ্ছে- গ্রাহক সেবার পর্যবেক্ষণ বা খোঁজখবর নেওয়া। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের জন্য আমাদের গোপন ক্রেতা ও গ্রাহক থাকতে হবে। তারা গ্রাহক-সেবার মানের ওপর প্রতিবেদন তৈরি করে এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয় এ প্রতিবেদন বিচার-বিশ্লেষণ করে যে ভুল-ত্রুটি পায়, তা দ্রুত সমাধান করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরামর্শ দেবে।

সরকারি কাজের পর্যবেক্ষণের জন্য প্রচুর প্রতিবেদন গ্রহণ করতে হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তৃতীয় স্তরের পর্যবেক্ষণ শেষ না হয়। সরকারের এমন কাউকে দায়িত্ব দিতে হবে যিনি ব্যক্তিগতভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শন করবেন। সরকারি কাজের প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির খোঁজখবর নেবেন। আমি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাককালীন তা করেছি। সরকারি কাজে বাস্তবায়িত কিছু সফল নীতির সঠিক বাস্তবায়নের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাই এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কাজের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করি। কাজের অগ্রগতির পর্যবেক্ষণ শুধু অফিস থেকে হবে, সেটা আমি বিশ্বাস করি না। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে কাজের মান সম্পর্কে নতুন নতুন ধারণা দেয়, নীতি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখে এবং কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা পাওয়া যায়। যেখানে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেখানে ব্যবস্থা নিয়েছি।

চতুর্থ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ অর্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। মহাহিসাবনিরীক্ষা অধিদফতর এ কাজটি করে থাকে। হিসাবনিরীক্ষা অধিদফতরের প্রতিবেদন সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ করে, যদি কোনো ভুল-ত্রুটি পায়, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। এই হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

আমি মনে করি, সরকারের কাজগুলো ঠিকমতো হচ্ছে কিনা এজন্য ফেডারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের মতো একটি কাউন্সিল করা দরকার, যারা কাজের পঞ্চম স্তরের পর্যবেক্ষণ করবে। এটা অতিরিক্ত ও ভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে এবং আমাদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এ কাউন্সিলের সকল পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। আমাদের চলমান উন্নয়ন এবং অগ্রগতির মাধ্যমে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে কাউন্সিলের প্রায় সকল পরামর্শ অনুমোদন করতে হবে। এটা করা জরুরি মনে করছি। আশা করছি সরকার তা করবে। আমি আরও বলতে চাই, আমাদের সকল কার্যক্রমের এবং আন্দোলনের একটাই জাতীয় লক্ষ্য, তা হচ্ছে আমাদের নাগরিকদের সুখে, শান্তিতে এবং নিরাপদে রাখা। এটা শুধু অর্থ দিয়ে সম্ভব নয়; তার সঙ্গে প্রয়োজন মূল্যবোধ এবং সামাজিক ন্যায়বিচার।

মানুষ মাত্রই ভুল করে। আর তাই, মাঝে মাঝে আমাদের কাজের ভুল হয়ে থাকে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমরা কোনো কাজে অবহেলা, অবজ্ঞা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করার চেষ্টা করি না। এটাই আমাদের প্রত্যয় এবং দৃঢ়সংকল্প, যা আমাদের বিবেচনাবোধকে জাগ্রত রাখে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করার পূর্বে কয়েকবার সুযোগ দেওয়া যায়।

ভুল করেই মানুষ শেখে। যখন মানুষ ব্যর্থ হয়, তৎক্ষণাৎ সে বুঝতে পারে না, কিসে তার ভুল হয়েছে। পরবর্তীকালে তার ভুল বুঝতে পারে। অতএব, একজন ব্যক্তি তার ভুল থেকেই জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এর অর্থ এই নয় যে, ইচ্ছাকৃত ও সহজে ভুল করে যাক। তবে এটা ঠিক- কিছু ভালো কর্মকর্তা, যারা কাজপাগল ও পরিশ্রমী তাদের জন্য কিছুটা নমনীয়তা প্রয়োজন। কাজ করে বলেই ভুল হয় এবং যে বেশি কাজ করবে তার ভুলও বেশি হবে। আমি পুনরায় বলছি, মানুষ মাত্রই ভুল করে। তবে ভুলের ভয় থাকা ভালো। কারণ ভুলের ভয় শুদ্ধতা ও সৃজনশীলতার পথ দেখায়। তবে সেটা নিয়ে বসে থাকলে হবে না। নতুন নতুন সৃজনশীল কাজ করতে হবে। একজন মানুষ এ জীবনে যতটুকু কাজ করার সুযোগ পায় তার প্রতিটাতে সৃজনশীল কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করা দরকার।

যারা কাজে ভুল করে, তাদের প্রতি আমি অত্যন্ত নরম আচরণ করি। তবে, যারা কোনো কাজই করে না, প্রচেষ্টাও চালায় না, তাদের প্রতি আমি অত্যন্ত কঠোর। আমাদের কর্মকর্তৃবৃন্দ ভুল করার ভয়কে অতিরঞ্জিত করুকÑ সেটা আমি পছন্দ করি না। কেননা ভুলের ভয় আমাদের কর্মকর্তাদের সৃষ্টিশীল, উদ্ভাবনক্ষম হতে এবং বদলাতে সাহায্য করে না। যারা কিছু ভুল করে, তারা আরও পরিশ্রমী এবং উৎপাদনশীল হয়। অপরদিকে, যারা অলস ও ভয়কাতুরে তাদের এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। যারা ভুল হওয়ার ভয়ে কোনো কাজ করে না তারা বদ্ধ জলাশয়ের মতো অবশেষে কেবল গন্ধই  উৎপাদন করে।

উদ্ভাবন-শক্তি একজন সরকারি কর্মকর্তাকে একইসঙ্গে নেতা ও ত্রাতায় পরিণত করতে পারে। সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ভাবন-শক্তিকে বিকশিত করার জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অবশ্য এখন সরকার ‘এ টু আই’ প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা ছাড়াও সাধারণ জনগণের মাঝে উদ্ভাবন-শক্তির বিকাশ ঘটানোর প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। এটাকে অব্যাহত রাখতে হবে।

রাজনীতিবিদগণের মতো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণও জনগণের সেবক। সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সকল সময় জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। তাই আমি বলি, আপনারা যে যেখানেই কাজ করবেন, আপনাদের সামনে থাকবে শুধু বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষ। আপনাদেরকে আপনাদের প্রিয় মাতৃভূমির ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে হবে। জানতে হবে আমাদের পূর্বসূরিরা কী অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করে এ দেশকে স্বাধীন করেছেন। এলাকার উন্নয়ন নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তৃবৃন্দের ওপর। তাঁদের মনে রাখতে হবে, শুধু রুটিনমাফিক কাজ করাই যথেষ্ট নয়। মাঠপর্যায়ে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের উদ্ভাবন-শক্তি থাকতে হবে এবং তাঁদের সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোন কাজটি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত তা খুঁজে বের করতে হবে।

দেশের কীভাবে উন্নয়ন করা যেতে পারে- সরকারি কর্মকর্তাদের এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাঁদের কাজ করতে হবে। অবশ্য এজন্য তাঁদের দায়িত্ব ও ক্ষমতাকেও তেমনভাবে সজ্জিত করতে হবে। বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তৃবৃন্দ যে নীতির আওতায় কাজ করেন তাতে উদ্ভাবন-শক্তি বিকাশের সুযোগ তেমন একটা নেই। তাই সরকারের উচিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্ভাবন-শক্তির বিকাশমূলক কার্য সম্পাদনে উৎসাহমূলক নীতি প্রণয়ন করা।

২৯. প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের গুরুত্ব

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমি মনে করি, যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তার ক্ষমতায় আসার দিনটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হিসাবে পালন করা প্রয়োজন। আমাদের এখানে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তেমনভাবে পালন করা হয় না। অথচ অনেক দেশেই তা হয়। আমি মনে করি, বাংলাদেশ সরকার গঠনের দিনটি দেশের মানুষ পালন করবে। তবে এ দিনটিতে শুভেচ্ছা-স্মারক প্রকাশ করা যেতে পারে। গণমাধ্যমগুলো বিশেষ অভিবাদনপত্র প্রকাশ করতে পারে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও রাস্তাঘাট নতুন সাজে সজ্জিত করা যেতে পারে। সেসঙ্গে এটা করার পেছনে একটি কারণ থাকবে, তা হলো বিগত বছরগুলোর অর্জনসমূহ পর্যালোচনা করা হবে। সরকারকে বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে অভ্যর্থনা জানানো হবে। জনগণের অনুভূতিকে সমাদৃত করে প্রত্যেক বছর সেই একটি দিন তাদের জন্য উৎসর্গ করবেন সরকার-প্রধান। ওই দিন তিনি তাদের সঙ্গে কাটাবেন। আর দেশের ও সমাজের যেসব বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া দরকার সেসব বিষয়ে পরিবর্তনের চিন্তা করে পরবর্তী বছরের আরও কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করবেন। গণমাধ্যমে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।

আমাদের দেশ ও দেশের জনগণকে আমি ভালবাসি। দেশের মানুষের সেবা করতে এবং তাদের জন্য একটি সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়তে আমার সত্যিকার ইচ্ছা সম্পর্কে আল্লাহ্ ভালো জানেন। আমার প্রতি আমার বন্ধুদের অনুভূতি এবং আমার কাজের প্রতি তাদের উপলব্ধিÑ আমাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলামÑ শিক্ষিত একটি সমাজ গড়ে তুলব। তাদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করব। মাঝে মাঝে ছাত্র-ছাত্রী ও জনগণের সঙ্গে সময় কাটাব। আমি আমার জেলা ও উপজেলায় পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি। আমার এলাকার ছেলেমেয়েরা এখন নিজের বাড়িতে থেকে আমার গড়া প্রতিষ্ঠানে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। এজন্য তাদের অতিরিক্ত কোনো ব্যয় করতে হচ্ছে না।

আমি এতিমদের সঙ্গে দেখা করি। আমি অসহায়, দুঃস্থ ও দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের জন্য বৃত্তি দিয়ে লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে থাকি। কারণ তারা আমাদের কারও-না-কারও সন্তান, গোটা বাংলাদেশের সকল মানুষের সন্তান। এ কারণে তাদের দায়িত্ব আমাদের সবাইকে নিতে হবে। আমি আশা করি, আমার এই বইটি প্রকাশের পর আমার এই আহ্বানে সমাজ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাবে। দুঃস্থ, অসহায়, দরিদ্র ও এতিমদের জীবন-মান উন্নয়নে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। এখনও অনেকেই দিচ্ছে। আশা করি, তা আরও বাড়বে।

আমি আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যারা এ ধরনের, তাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা করি। কারণ আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তারা পড়ার সুযোগ পাবে। সেসঙ্গে এরকম সুযোগ পেয়ে সমাজে তারা নিজেদের শক্তি ও ধৈর্যের উদাহরণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। তাদের কর্ম হতে উপকৃত হবে দেশ, জাতি ও সমাজ। মূলত এটাই হবে আমার সফলতা।

আমার একটা পরিকল্পনা আছে, এটি যেমন সুদূরপ্রসারী তেমনি কার্যকর। যারা আমার কলেজ থেকে পাস করে গেছে, ভালো অবস্থায় আছে, দেশের সুনাম বৃদ্ধি করছে- তাদের মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ধন্যবাদসূচক একটি সার্টিফিকেট দেব। ছাত্রদের প্রতি আহ্বান জানাব, তারা যেন এ ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপক সার্টিফিকেটটি তাদের মাকে উপহার দেয়। একসময় ওই সার্টিফিকেটটি তাকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেবে। তেমনি অনুপ্রাণিত করবে তার অনুজদের।

গৃহকর্মী, রাস্তা পরিষ্কারকারী, নির্মাণ-শ্রমিক, গণপরিবহনের চালক এবং এরকম আরও অনেকেই আছে যারা প্রতিদিন আমাদের জীবনকে সহজতর ও আরামপ্রদ করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ সময় তাদের এ অবদান সম্পূর্ণরূপে ঊহ্য থাকে। মাঝে মাঝে সরকারের ও দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে যখন অনুষ্ঠান হয়Ñ এ প্রচারাভিযানে হাজার হাজার শ্রমিক আসে। তাদের সম্মানিত করা প্রয়োজন, মূল্যায়ন করা আবশ্যক। তাহলে তারা আনন্দিত ও খুবই খুশি হবে। এই প্রচারাভিযানের মাধ্যমে শ্রমিকদের বোঝাতে হবে যে, আমরা তাদের কাজের মূল্যায়ন করি। তারা সাধারণ কেউ নয়, দেশের নির্মাতা এবং তাদের কাজের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। তবেই তারা আরও বেশি করে কাজ করবে।

সুখ লাভের প্রথম পন্থা হচ্ছে অন্যের অন্তরে সুখ স্থাপন। একটা মানুষ যখন অন্য আরেকজনের দ্বারা উপকৃত হয়, সুখী হয়, তখন বুঝতে হয়- তার জন্ম সার্থক। এ কারণে যে, সে মানুষকে খুশি ও সুখী করতে পেরেছে। এটা সবাই পারে না।

সমাজের সর্বস্তরে জাতীয় এ উদ্যাপন পৌঁছে দেওয়ার অভিজ্ঞতা বড় ধরনের সাফল্যে পরিণত হতে পারে। কেবল দেয়ালে একটি ছবি ঝুলিয়ে বা পত্রিকায় অভিবাদনপত্র ছাপালেই কাক্সিক্ষত ফল বা সুখ পাওয়া যাবে না- এমনটি প্রত্যাশা করাও উচিত নয়। বরং মায়েদের মুখে হাসি ফুটিয়ে বা দুঃস্থ, অসহায়, দরিদ্র ও এতিমদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে অথবা সমাজের সর্বস্তরের শ্রমিকদের কাজের মূল্যায়ন করে বা কৃতজ্ঞতা জানানোর মাধ্যমেই প্রকৃত সুখ পাওয়া সম্ভব। আমি মনে করি, সুখ লাভের প্রথম পন্থা হচ্ছে অন্যের অন্তরে সুখ স্থাপন। যাঁরা অন্যের অন্তরে সুখ স্থাপনের চেষ্টায় রত থাকেনÑ বিনিময়ে তাদের নিেেজদের সুখ তখনই অনিবার্য হয়ে যায়। আমাদের অন্যকে সুখ প্রদানের ব্যবস্থা করে নিজের সুখ নিশ্চিত করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।৮৯ – ৯৫

৩০. বাংলাদেশের সফলতা

সৈয়দ আবুল হোসেন: বাংলাদেশের সফলতা দিন দিন বাড়ছে। আর এটা বাড়ানোর জন্য অনেক কাজও হচ্ছে। তারপরও মনে হয়, এটা খতিয়ে দেখা দরকার- বাংলাদেশের সফলতার পেছনের আসল রহস্য কী? এ প্রশ্ন জনগণের মনেও আসতে পারে। আমি মনে করি, সাফল্য কোনো গন্তব্য নয় বরং এটি একটি ভ্রমণের সূচনা মাত্র। এই ভ্রমণে সর্বোচ্চ চূড়ায় উপনীত হওয়া প্রকৃত অভিযাত্রীর লক্ষ্য। আর পরবর্তী ভ্রমণের জন্য প্রত্যেককে সামনের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সুতরাং কেউ যদি প্রশ্ন করে, সাফল্যের রহস্য কী? তাহলে এই প্রশ্ন শোনার পর আমি আমাদের দেশের সাফল্যের গোপন রহস্য বর্ণনা করি। প্রথমে বলি, আমরা এখনও সাফল্যের পথে ভ্রমণ করছি। যেহেতু আমাদের সব চাওয়া এখনও পূর্ণ হয়নি তাই সবসময় আমরা সাফল্যের পথেই ভ্রমণ করতে চাই। আসল কথা হচ্ছে সব চাওয়া কখনও পূর্ণ হয় না। তাই সফলতা হচ্ছে আর-একটি সফলতা অর্জনের বাধ্যবাধকতা।

স্বল্প সময়ের এ ভ্রমণে আমরা কিছু মহামূল্যবান গুণাবলি অর্জন করেছি। সেসব গুণাবলির মধ্যে অন্যতম গুণ হচ্ছে ভালবাসা। এর মাধ্যমে আমি বোঝাতে চাচ্ছি দেশের জন্য প্রত্যেক নাগরিকের ভালবাসা আছে। হ্যাঁ, আমরা আমাদের বাংলাদেশকে ভালবাসি। যেটাকে বলে দেশপ্রেম।

দলীয় ঐক্যের শক্তি আমরা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা-যুদ্ধে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি এবং আজও তা অন্তরে ধারণ করছি। এটি আমরা যতদিন লালন করতে পারব, ততদিন আমরা সফলতার ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হব।

প্রতিবছর আমার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট এবং মার্কেটের হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। আমি তাদের চোখের কোণে বাংলাদেশের জন্য ভালবাসা দেখতে পাই। দেশের সেবা করতে এবং দেশের উন্নয়নে কাজ করতে তাদের মধ্যে প্রবল ইচ্ছাশক্তি কাজ করে। এমনকি আমি এমন প্রবাসীদেরও দেখেছি যাঁদের দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে প্রখর ইচ্ছাশক্তি রয়েছে, কারণ তাঁরা দেশকে সত্যি ভালবাসেন। দেশের জনগণ নিজেদের সন্তানের জন্য বাংলাদেশকে রক্ষা করতে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, শিক্ষক, সৈনিক, ব্যবসায়ী অথবা সরকারি বা বেসরকারি কর্মকর্তা হিসাবে কাজ করবে। তারা বাংলাদেশকে ভালবাসে, যেন তাদের সন্তানরা তার পিতামাতার জন্য এবং দেশের জন্য নিজেদেরকে উৎসর্গ করতে পারে। আমরা আমাদের গভীর অনুভূতি নিয়ে দেশের সকল কাজ করে থাকি। আর এটিই হচ্ছে আমাদের সাফল্যের প্রধান কারণ।

বাংলাদেশের সাফল্যের দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে টিম-স্পিরিট বা দলীয় শক্তি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ সরকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সরকারি আমলা, প্রশাসন ও সরকারের বিভিন্ন স্তরে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনগণ একটি টিম হিসাবে কাজ করে। মাঝে মাঝে কিছুটা সমন্বয়হীনতা কাজ করলেও প্রত্যেকেই সুখী-সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে একসঙ্গে কাজ করে। এ দলীয় ঐক্যের শক্তি আমরা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা-যুদ্ধে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি এবং আজও তা অন্তরে ধারণ করছি। এটি আমরা যতদিন লালন করতে পারব, ততদিন আমরা সফলতার ধারা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হব। এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।

স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সংঘবদ্ধ হয়ে কাজ করা খুব সহজ কাজ নয়। আমরা অনেক প্রতিষ্ঠানকে দেখেছি একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ব্যতিক্রম কিছু প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। এটি হচ্ছে আমাদের টিম-স্পিরিট, দেশের জন্য আমরা ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি যা আমাদের প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরও গতিশীল করে তুলেছে এবং এটি আমাদের শক্তিশালী, অনুপ্রাণিত ও উদ্যমশীল করে তুলেছে। এগুলোকে আমরা চ্যালেঞ্জ হিসাবে বিবেচনা করি। এগুলো আমাদের সক্ষমতার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী করেছে। আমাদের দূরদৃষ্টি, প্রেরণা, কর্মশক্তি এবং গতিশীলতা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে আমাদের দেশগঠনে ফলপ্রসূ পদক্ষেপ হিসাবে কাজ করেছিল।

আমরা মানুষকেই সম্পদে পরিণত করে এগোতে পারি। শিক্ষা হচ্ছে মানবসম্পদ বৃদ্ধির প্রথম ও প্রধান উপায়। আর প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে শিক্ষার মূলভিত্তি এবং শিক্ষা হচ্ছে সকল সফলতার নিয়ামক।

আমি একটা প্রবাদ মনে রাখার চেষ্টা করি, তা হচ্ছে : যদি আপনি এক বছরের জন্য বিলাসিতা চান তাহলে ধান-গম উৎপাদন করুন। যদি এক যুগের বিলাসিতা চান তাহলে আপনি গাছ রোপণ করুন। আর যদি শতবর্ষের বিলাসিতা চান তাহলে মানুষ বাড়ান। আমাদের মানুষ বাড়ানোর দরকার নেই। এখন যা আছে তাই যথেষ্ট। আমরা মানুষকেই সম্পদে পরিণত করে এগোতে পারি। শিক্ষা হচ্ছে মানবসম্পদ বৃদ্ধির প্রথম ও প্রধান উপায়। আর প্রাথমিক শিক্ষা হচ্ছে শিক্ষার মূলভিত্তি এবং শিক্ষা হচ্ছে সকল সফলতার নিয়ামক। তাই সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে সার্বিক উন্নয়ন-সফলতার মূলমন্ত্র হিসাবে গণ্য করে অগ্রসর হচ্ছে।

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার দৌঁড়ে প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতিতে বাংলাদেশ বিশ্বের মডেল দেশে পরিণত হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে শিক্ষাক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য পূরণ হবে। বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে ইউনেস্কোর ডিরেক্টর জেনারেল এডজয়েন্ট গেটাচিউ বলেছেন, ‘প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের সংখ্যাসমতা, বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে বই-বিতরণ, শিক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির নিবিড় ব্যবহার প্রভৃতি সারাবিশ্বে বাংলাদেশকে অনুসরণীয় দেশে পরিণত করেছে।’

১৯৯০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে সবার জন্য শিক্ষা- বাধ্যতামূলক। প্রাথমিক শিক্ষা আইন ও সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যে বাংলাদেশের কমিটমেন্টের কারণে সরকারকে এ সেক্টরে বিশেষ নজর দিতে হয়েছে। দেশকে নিরক্ষরতামুক্ত করতে, বিশেষত দরিদ্র-পরিবারের ঝরে পড়া ছেলেমেয়েদের পুনরায় শিক্ষার ব্যবস্থা করতে এনজিওরাও এসময় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। সব মিলিয়ে প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশের সফলতা ঈর্ষণীয় স্থানে পৌঁছেছে। বিভিন্ন বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রাথমিকে প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থী ভর্তি, প্রাথমিক-মাধ্যমিকে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাসমতা অর্জন, শিক্ষাবর্ষের প্রথম ক্লাসে পাঠ্যবই প্রদান ও ক্লাস শুরুসহ নানা ক্ষেত্রে সফলতা এসেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার সর্বোচ্চ। ঝরে পড়ার হার আস্তে আস্তে কমছে। প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের প্রভাব ক্রমশ মাধ্যমিক শিক্ষাসহ অন্য স্তরগুলোতেও পড়ছে।

১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তির হার ছিল ৬১ ভাগ। কিন্তু ২০১১ খ্রিস্টাব্দে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮ দশমিক ২ ভাগ এবং ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ৯৯ দশমিক ৪৭ ভাগে উন্নীত হয়েছে। বিগত ৪০ বছরে বাংলাদেশে মেয়ে শিক্ষার্থীর প্রাথমিকে ভর্তির হার ৩২ থেকে ৫১ ভাগ এবং মাধ্যমিকে ১৮ থেকে ৫৪ ভাগে উন্নীত হয়েছে। গত দুই-দশক ধরে মেয়ে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ২.৯ মিলিয়ন ছাত্রীকে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের জরিপ অনুযায়ীÑ দেশে প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা লক্ষাধিক। তার ওপর স্কুল না-থাকা প্রত্যন্ত অঞ্চলে নতুন আরও ১ হাজার ৫০০ স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সরকারের সহায়তায় পাবলিক-প্রাইভেট অংশগ্রহণে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক আট লক্ষাধিক শিক্ষার্থীকে স্কুলে ভর্তি করেছে। ৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন দরিদ্র শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের ৫৭ ভাগ থেকে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে ২৯ দশমিক সাত ভাগে নেমে এসেছে।৮৯

শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নেও বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ প্রদান, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু করা, ৫ম ও ৮ম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা চালু করা, সর্বস্তরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করাসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার এ পর্যন্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৭১ হাজার শিক্ষক নিয়োগ করেছে। বিদ্যালয়ের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে ছোট ছোট শিশুপার্কও করা হচ্ছে। সরকার বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে বিদ্যালয় নির্মাণের জন্য ৭৫০ কোটি টাকায় ১৫০০ গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।৯০ সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার অগ্রগতি সম্পর্কে বলা হয়েছে : বছর দশেক আগেও যে পরিমাণ শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে মাধ্যমিকে ভর্তি হতো, সে সংখ্যা এখন বহুগুণে বেড়েছে। ফলে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।৯১

সরকারও বার্ষিক বাজেটে শিক্ষাখাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ ছিল ১১ হাজার ৮৫৯ কোটি টাকা, যা ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং বাজেটের ১৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২১ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা, যা প্রাক্কলিত জিডিপির ২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ এবং বাজেটের ১১ দশমিক ১৭ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে শিক্ষাখাতে বরাদ্দের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮০ দশমিক ৩৭ শতাংশ, বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।৯২

প্রাকৃতিক সম্পদের স্বল্পতা, স্বল্প মাথাপিছু আয়, জনসংখ্যার আধিক্য ও সুশাসনের অভাব সত্ত্বেও গত দুই দশক ধরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের সীমায় ধরে রাখা, রপ্তানি আয়ের ঊর্ধ্বমুখিনতা এবং বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও ব্যষ্টিক অর্থনীতির ধীরগতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারার কারণে বাংলাদেশ সারাবিশ্বে এক অপার সম্ভাবনার দেশ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মূল কৃতিত্বের অধিকারী হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা।৯৩

বিশ্বব্যাংকের মতে, স্বাধীনতার ৫০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্যআয়ের দেশে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। বর্তমান বিশ্বের ১১টি সম্ভাবনাময় দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি, যে দেশ সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে ২০৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।৯৪ সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম’-এর ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যবসায় প্রতিযোগিতার সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশ গত এক বছরে আট ধাপ এগিয়ে ১৪৪টি দেশের মধ্যে ১১৮তম স্থান থেকে ১১০তম স্থানে পৌঁছেছে।৯৫ আমি একটা কথা বলি এবং বার বার বলি, আমাদের ১৬ কোটি মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস নিবেদিত থাকলে আমরা আমাদের সফলতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারি।

৯৬ – ১০০

৩১. বৈশ্বিক সহায়তা

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমাদের দেশের আরেকটি গর্বিত রেকর্ড হচ্ছে- বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সাহায্যের জন্য বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি প্রেরণ। এদের মধ্যে এমন অনেক আছে, যারা বিভিন্ন দেশে গিয়ে নিপীড়নের শিকার হয়েছে বা আমাদের চেয়ে কম ভাগ্যবান হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। আমরা তাদের প্রতি জানাই সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা।

১৯৭২ থেকে ২০১১ খ্রিস্টাব্দের জুন পর্যন্ত গত চার দশকে বাংলাদেশ মোট তিন লাখ ৯৬ হাজার ৯৩০ কোটি টাকার বৈদেশিক সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে ঋণ হিসাবে ২ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা এবং অনুদান বাবদ ১ লাখ ৭০ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। প্রকাশিত বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, স্বাধীনতার পর প্রথম ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে মোট ২৭ কোটি ডলার ঋণসহায়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ। এরপর ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে ৫৫ কোটি, ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে ৪৬ কোটি ডলার ঋণসহায়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ।৯৬

সাধারণত খাদ্য, পণ্য ও প্রকল্প- এ তিন খাতে উন্নয়ন-সহযোগীরা ঋণসহায়তা দিয়ে থাকে। গত চার দশকে খাদ্যে ৪২ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা অনুদানসহ মোট ৪৮ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছে। চাল, গম ও ভুট্টা বাবদ এসব ঋণসহায়তা পাওয়া গিয়েছিল। পণ্য খাতে ৪১ হাজার ২৫১ কোটি টাকা অনুদানসহ মোট ৭৯ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা ঋণ পাওয়া গেছে। এছাড়া প্রকল্প-সাহায্য বাবদ গত চার দশকে ২ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছে।৯৭

তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত চার দশকে উন্নয়ন-সহযোগী দেশ ও সংস্থা থেকে ৫ লাখ ১৪ হাজার ১৩৯ কোটি টাকার সহায়তা পাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। এর মধ্যে ঋণ হিসাবে ৩ লাখ ২০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা এবং অনুদান হিসাবে ১ লাখ ৯৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রতিশ্রুতির চেয়ে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার কম বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান পেয়েছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ প্রতিশ্রুত প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার এখনও পাইপলাইনে রয়েছে।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবাসী কর্মীরা ৪১৪ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠাবেন বলে ধারণা করছে বিশ্বব্যাংক, যার মধ্যে বাংলাদেশে আসবে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এই হিসাবে রেমিটেন্স আকর্ষণের দিক দিয়ে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের সপ্তম দেশ।৯৮ অভিবাসী-অধিকার নিয়ে নিউইয়র্কে চলমান জাতিসংঘ সম্মেলন উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ খ্রিস্টাব্দের জুলাই থেকে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের জুন পর্যন্ত এক বছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১ হাজার ৪৬০ কোটি ডলারের রেমিটেন্স দেশে পাঠিয়েছেন, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। আর ২০১১-১২ অর্থবছরে ১ হাজার ২৮৪ কোটি ডলারের রেমিটেন্স দেশে আসে।৯৯

১৯৯০-এর দশক থেকে ২০ বছরে বাংলাদেশিদের বিদেশে পাড়ি জমানোর হার বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রায় ১৪ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী হয়েছেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। এদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। ২০০০ থেকে ২০১০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা বছরে ২ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে, যেখানে ১৯৯০ থেকে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এ হার ছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ। গত এক দশকে জীবিকার তাগিদে অথবা নিরাপত্তার জন্য সারাবিশ্বে মোট ২৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিয়েছে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩ দশমিক ২ শতাংশ।১০০

বাংলাদেশে রেমিটেন্স আসে বিদেশ থেকে। এ বিষয়ে গর্ব করা আমাদের প্রথা ও নীতির বিরোধী, তবুও আমি এই অগ্রগতির অগ্রসর-ধারা ও পরিমাণ বর্ণনা করার প্রয়োজন অনুভব করছি। আমদের রেমিটেন্সের অগ্রগতি বিভিন্ন দেশ এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের নাগরিকরা জৌলুশপূর্ণ, বিলাসী ও আনন্দময় জীবনযাপন করে। তারা সারাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনযাপন করেন না। অন্যভাবে বললে, আমরা সংবেদনশীল মানুষ। অন্যের দুঃখ-কষ্ট ও ব্যথা-বেদনা আমাদের স্পর্শ করে। আমরা তাদের ব্যথা দূর করতে ইতিবাচক অবদান রাখার চেষ্টা করি, তাদের সাহায্যের প্রয়োজনে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিই। এই পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং অসুস্থতা দূর করতে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছি। শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও দেশের উন্নয়নে কাজ করে চলেছি।

আমরা কোনো প্রকার সংশয় ও দ্বিধা ছাড়া কোনো দেশকে সাহায্য করি ও দান করি। বিশ্বের যেকোনো দেশে নানা দুর্যোগে দুর্গত এলাকায় সাহায্য-সহযোগিতায় বাংলাদেশ তার সাধ্যমতো সহায়তা করে উদার হস্তে। নেপালসহ বিভিন্ন দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশ এগিয়ে গিয়েছে উদার মনোভাব নিয়ে। আমাদের বিশ্বাস, দানের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আমরা যতটুকু সহায়তা দিই তা আর্থনীতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলতে না পারলেওÑ  আমরা তাদের পাশে আছি এটাই বড় পাওয়া। কারণ আমাদের সামর্থ্য কম। তবে বাড়ছে দিনে দিনে। আর এই কারণে আগামী দিনেও তা বাড়বে।

আমরা কোনো প্রকার শর্ত ছাড়াই দান করে থাকি। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য মানবসেবা। আমাদের মানবসেবা করার পেছনে কোনো রাজনীতিক উদ্দেশ্য থাকে না এবং থাকে না কোনো ভৌগোলিক সীমা, জাতিগত দৃষ্টিভঙ্গি, সাম্প্রদায়িকতা এবং ধর্মীয় ভেদাভেদ। সবার জন্যই কাজ করতে চাই আমরা- এটাই আমাদের পররাষ্ট্র নীতির মূল উদ্দেশ্য।

নিঃস্ব এবং অভাবগ্রস্ত ভাই ও বোনদের জন্য আমাদের সাহায্যের হাত বাড়ানোই থাকবে। আর তাঁরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন। আমাদের এই সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের জন্য। তাঁরা সবাই হয়তো নিজের সামর্থ্য বিবেচনা করেই কাজটি করবেন।

৩২. কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছে প্রত্যাশা

সৈয়দ আবুল হোসেন: একজন ভালো কর্মকর্তার কাছে তার কাজ ও দেশ নিজের চেয়ে প্রিয় এবং যে অফিসার এ বোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করেনÑ তিনি আর অফিসার থাকেন না, বিলীন হয়ে যান অনিবার্য দেশপ্রেমের বিশাল পরিম-লে। আমার অফিসে যাঁরা আমার সঙ্গে কাজ করেন তাঁরা আমাকে জিজ্ঞেস করেনÑ  আমাদের কাছ থেকে আপনি কী প্রত্যাশা করেন?

আমার উত্তর : একটি অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ হচ্ছে ওই অফিসের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। তারা আমাদের সত্যিকারের সম্পদ। তারা কাজ করলেই উন্নয়ন হবে, কিন্তু কাজ না করলে প্রতিষ্ঠান লোকসানের মুখোমুখি হবে। তেমনি সরকারি কাজের বেলায়ও একই নিয়ম। সরকারি কাজের উন্নয়নে, আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য বাস্তবায়নে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রয়োজন হয় একটি মহৎ দলের। মহৎ দল ছাড়া কোনো মহৎ কাজ সম্পন্ন হয় না।

সরকারি উন্নয়ন সম্ভব হয় তার কর্মীবাহিনীর উন্নয়নের মাধ্যমে। সৃজনশীল কর্মচারীদের লালন-পালন করলে, পুরো সরকারই সৃজনশীল হয়ে ওঠে। কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ প্রতিষ্ঠানের রক্তস্বরূপ। রক্ত যদি ভালো না হয়, তাহলে পুরো শরীর অকেজো হয়ে যায়। যখন নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কলাকৌশল প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মচারীরা দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত হয়, তখন পুরো সরকার আধুনিক ও কার্যকর সরকারে পরিণত হয়। সরকারের প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে কর্মীবাহিনী। সরকার তাদের উন্নয়নে কাজ করে এবং তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে, যাতে তারা দক্ষ হয়ে ওঠে, সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ অবদানটা রাখতে পারে। এককথায় বলা যায়, কর্মকর্তা-কর্মচারী যেই হোক না কেন, প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। প্রশিক্ষণ শারীরিক কসরতের মতো প্রতিষ্ঠানকে অধিক কর্মক্ষম করে তোলে।

মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য প্রয়োজন হয় একটি মহৎ দলের। মহৎ দল ছাড়া কোনো মহৎ কাজ সম্পন্ন হয় না।

আমার মনে হয়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের কর্মকর্তাদের জন্য একটি লিডারশিপ প্রোগ্রাম আয়োজন করা দরকার। আমাদের সেরা কর্মচারীদের পুরস্কৃত করা দরকার। অনেক ক্ষেত্রে তা করা হয়। পুরস্কার প্রদান ও উদ্দীপনা দানের ক্ষেত্র আরও বাড়াতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে কর্মচারীদের সর্বোচ্চ দক্ষতা বের করে আনতে হবে। আমরা জ্যেষ্ঠতা এবং কর্মদক্ষতার ওপর ভিত্তি করে কর্মচারীদের পদোন্নতি ও নিয়োগ দিয়ে থাকি। তবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা ও কর্মসম্পাদনকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। চুল পাকলে অভিজ্ঞতা হবে, এমন ধারণা সবক্ষেত্রে ঠিক নয়।

সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে আমার কিছু পরামর্শ

প্রথমত দেশপ্রেমিক হিসাবে দেশের জন্য পূর্ণ মমতা রেখে কাজ করুন। প্রকৃত নেতৃত্ব কোনো এক স্থানে থেমে থাকে না। বরং নেতৃত্ব অবস্থান করে চিন্তায় ও কাজে। কারও নেতৃত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থাকে মহৎ। একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক মানুষের সেবায় জীবন বিলিয়ে দেন এবং মানুষকে সুখে ও শান্তিতে রাখতে আজীবন কাজ করে যান। একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিকের সারাক্ষণ কাজে ডুবে থাকার প্রয়োজন নেই, সারাক্ষণ নতুন কিছু উদ্ভাবন এবং বাস্তবায়ন করার প্রয়োজন নেই। বরং সত্যিকার দেশপ্রেমিকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে- সব ক্ষেত্রে দেশকে প্রথম স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। তিনি সহকর্মীদের মধ্যে এ বোধ সৃষ্টি করে সহজে দেশকে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারেন।

একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক ব্যক্তির শক্তি হচ্ছে নেতৃত্ব ধরে রাখা নয়, বরং তাঁর শক্তি হচ্ছে নৈতিকতা; তাঁর প্রতি জনগণের ভালবাসা, জ্ঞান, শিক্ষা এবং তাঁর কাজের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা। সত্যিকার দেশপ্রেমিকের অন্তরে এমন একটি চিন্তা থাকে যে, তিনি আসলে শুধু চালক নন, বরং জনগণই তাঁর চালক, তাই বিচক্ষণতার সঙ্গে জনগণকে অনুসরণ করাও তাঁর অন্যতম কাজ। অন্যদিকে জনগণ মনে করে, এ-ই আমাদের চালক এবং তাকে অনুসরণ করাতেই আমাদের কল্যাণ। পরস্পর এমন বোধ জাগ্রত হলেই কেবল নেতৃত্ব পূর্ণ বিকাশে বিকশিত হয়ে ওঠে। সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে বলতে চাই, দেশপ্রেমিকের মতো কাজ করুন। প্রকৃত নেতৃত্ব কোনো একটি শক্তি ও পদ নয়, বরং নেতৃত্ব অবস্থান করে চিন্তায় ও কাজে। কারও কারও নেতৃত্ব দেওয়ার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য থাকে মহৎ। দেশপ্রেমিক সবাই হতে পারেন না। কিন্তু দেশপ্রেমিক হওয়ার চেষ্টাই এক একজনকে মহান ব্যক্তিতে পরিণত করতে পারে। আপনারা সবাই দেশপ্রেমিক, আপনাদের কাছে জনগণের যেসব প্রত্যাশা আছেÑ সেগুলো পূর্ণ করুন। দেখবেন জনগণ আপনাদের প্রতি কেমন উজাড় করে দেন তাঁদের সব আনুগত্য ও শ্রদ্ধা।

দ্বিতীয়ত, যদি আপনি বেসামরিক সেবাকে কেবল একটি চাকরি হিসাবে দেখেন, তাহলে আপনি কেবল একজন কর্মচারী। চাকরি নয়, কাজ করতে হবে। নিজেকে একজন চাকর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করবেন না, বরং নিজেকে একজন কর্মী ভাবুন, একজন সেবক ভাবুন, যিনি তাঁর দেশকে ভালবাসেন। অপরদিকে, আপনি যদি একজন কর্মচারী না হয়ে দেশপ্রেমিক হন, তবে দেশের জন্য চাকরি থেকে অনেক বেশি অবদান রাখতে পারবেন। এটা একটা সুযোগ। এ সুযোগ ব্যবহার করে আপনি আপনার মেধা ও যোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হবেন এবং আপনার সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। এ সুযোগ আপনার চারপাশের লোকজনকে উৎসাহিত এবং প্রভাবিত করবে। এমনকি, আপনার দেশের ইতিহাস সৃষ্টিতে এ সুযোগ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। সুতরাং নিজেকে শুধু একজন কর্মচারী ভাববেন না। বরং নিজেকে সেবক হিসাবে গড়ে তুলুন- যে দেশকে ভালবাসে। একজন কারুশিল্পীর আবেগ ও ভালবাসা হচ্ছে তার শিল্পকর্ম। একজন শিল্পী তার শিল্পকর্মের মাধ্যমে নিজেকে আলোকিত করে। ঠিক তেমনিভাবে আমরা আপনাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চটা আশা করি।

তৃতীয়ত, দক্ষতা বাড়ান, নিজের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করুন, নয়া দিগন্ত উন্মোচন করুন এবং কখনও কাজকে অবহেলা করবেন না। মেধার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দৃঢ় অধ্যবসায়। আপনার যেকোনো অগ্রগতি, সেটা যেভাবেই হোক না কেন, তা অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ। সুতরাং আত্ম-উন্নয়ন কখনও ছেড়ে দেবেন না এবং পেছনে ফিরে তাকাবেন না। সবসময় সেরা হওয়ার চেষ্টা করবেন এবং দেশ ও সমাজের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবেন। দেখবেন আপনি যা দিচ্ছেন তার চেয়ে অনেক বেশি পাচ্ছেন।১০১

৩৩. প্রেরণা ও উৎসাহ : কর্মক্ষমতা বাড়ায়

সৈয়দ আবুল হোসেন: একটা কথা সব সময় সবার মনে রাখা দরকার। তা হলো, কেউ ভালো কাজ করলে তাকে উৎসাহিত করা। ভালোকে উৎসাহিত করলে অন্যরাও উৎসাহ পাবে। তারাও ভালো হতে চাইবে। আমাদের উচিত মানুষকে সবসময় ভালো হতে উৎসাহিত করা। প্রেরণা ও উৎসাহ কর্মস্পৃহার উৎসমূল। এর মাধ্যমে কর্মীকে তার পূর্ণশক্তিকে বিকশিত করা সম্ভব।

আমরা দেখি, সমাজ বা রাষ্ট্র ভাল কাজকে উৎসাহিত করতে পদক বা সম্মাননা প্রদান করনে। এটা ভাল উদ্যোগ। পদক বা সম্মাননা একজন মানুষের ভাল কাজের স্বীকৃতি। এ স্বীকৃতি ব্যক্তিকে বা প্রতিষ্ঠানকে আরো ভাল কাজ করতে সহায়তা করে। অন্যকে ভাল কাজে উদ্বুদ্ধ করে। তাই আমি মনে করি, একজন মানুষকে যদি সমর্থন জানাতে হয়, স্বীকৃতি দিতে হয়- তাহলে তাঁর জীবদ্দশায় তা দেয়া উচিত। তার মৃত্যুর পর এ জাতীয় স্বীকৃতির তেমন গুরুত্ব থাকেনা। তবে দেরীতে হলেও কাজের ‘মরনোত্তর’ স্বীকৃতি অন্য মানুষকে ভাল কাজে অনুপ্রাণিত করে।

কোনো ব্যক্তি থেকে সর্বোচ্চ ভালো কাজটি আদায়ের জন্য ব্যক্তির ক্ষমতায়ন হচ্ছে অনুপ্রেরণার প্রথম ও প্রধান উৎস। অনুপ্রেরণা ছাড়া একজন কর্মচারীর অন্তর্নিহিত সক্ষমতা পূর্ণতা পায় না। ক্ষমতা দেওয়া হলে একজন কর্মচারী বিশ^াস ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। মাঝে মাঝে আমি আমার ই-মেইলে অনেক কর্মচারীর কাছ থেকে অভিযোগ পাই, তাদের তেমন কর্তৃত্ব দেওয়া হয়নি অথচ প্রকৃত ক্ষমতা ছাড়াই কর্তৃত্বপ্রাপ্তদের তুলনায় ভালো কাজ করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। সুতরাং তাঁদের কোনো প্রকার প্রকৃত অর্জন বা সফলতা নেই, এ অভিযোগ তাঁরা করতেই পারেন। অতএব, আমি আমার সহকর্মী কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, আপনারা কর্মচারীদের প্রকৃত ক্ষমতা দিতে ভয় পাবেন না। কেননা, তাদের নিরন্তর পরিশ্রমের ওপরই নির্ভর করে আমাদের মান-সম্মান ও মর্যাদা।

বাংলাদেশের মানুষের শক্তি ও ক্ষমতার ওপর আমার দৃঢ় বিশ^াস আছে। আমাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে অসাধারণ দক্ষতা, অনুধাবন-ক্ষমতা ও পরিচালনার যোগ্যতা। একজন দক্ষ পরিচালক হচ্ছে সে, যে তার দলের প্রকৃত শক্তি ও ক্ষমতা বের করার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে এবং করে। একজন দক্ষ পরিচালক বহু যোগ্য পরিচালক তৈরি করে এবং একজন ব্যক্তির কারণে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমিয়ে ফেলে না। পরিশেষে, যোগ্য ব্যক্তির হাতে তুলে দিন পরিচালনার দায়িত্বভার। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়Ñ ভিন্ন কিছু। প্রতিষ্ঠানের দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের পরিচালকদের প্রতি লক্ষ্য করলে উল্লেখযোগ্য কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। কেননা তাদের কাউকে পর্যাপ্ত কর্তৃত্ব দেওয়া হয়নি এবং পরিচালনা করার জন্য তাদের যোগ্য করে গড়েও তোলা হয়নি। এমনটি উচিত নয়। এটি হচ্ছে অদূরদর্শী কাজ এবং তা হচ্ছে নিজের জীবনাবসানের পর আর কিছু না থাকার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করে যাওয়া। আমি বিশ্বাস করি, একজন মহান ব্যক্তির মাধ্যমে তৈরি হয় আরও মহান ব্যক্তি এবং তিনি নিজের কাছে সবকিছু আবদ্ধ করে রাখেন না। মহান ব্যক্তিরা নিজে যা শেখেন এর বেশিরভাগটাই তাঁরা অন্যের জন্য বিলিয়ে দেন। কারণ তিনি মনে করেনÑ  এতে তাঁর কাজ টিকে থাকে।

অনুপ্রেরণা ও উদ্দীপনার দ্বিতীয় উৎস হচ্ছে, প্রতিশ্রুতিশীল এবং সৃজনশীল কর্মচারীদের পুরস্কৃত করা। তাদের পুরো প্রতিষ্ঠানের আদর্শ হিসাবে গণ্য করা উচিত। আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের মূলে রয়েছে মানবিক প্রতিযোগিতা। এমনকি আমাদের ধর্মও বলে, ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করতে। আপনি কখনও প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করতে পারবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত সৃজনশীলতার প্রশংসা ও পুরস্কৃত করতে না পারবেন। কর্মচারীদের প্রশংসার অর্থ শুধু নিজের কৃতিত্ব নয়, তাদেরও সফলতার কৃতিত্ব রয়েছে। এর মানে, অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের সম্মান এবং আপনাদের আস্থা ও বিশ^াসই হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের সফলতা। আর এ সফলতার পেছনে প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কর্মচারীর অবদান রয়েছে। যদি কর্মচারীরা দেখে, তাদের নেতা কাজের পুরো কৃতিত্ব নিজে না নিয়ে কর্মীদেরও কৃতিত্ব দিচ্ছেন, তাহলে তারা তাদের নেতাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা দেবে। প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে আরও দীপ্ত হবেÑ দৃপ্ত শপথে। তখন তারা তাকে শুধু তাদের বস্ বা চাকরিদাতা ভাববে না, বরং তাদের নায়ক বা আদর্শও মনে করবে।

অনুপ্রেরণার তৃতীয় উৎস, যা বইয়ের শুরুতেই বলা হয়েছে। সরকারের প্রধান কাজ হচ্ছে, সমাজে সুখ, শান্তি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আর কর্মচারীরা এ সমাজেরই অংশ। সুতরাং সবচেয়ে বড় প্রয়োজন তাদের জীবনে সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কেননা তারা অন্যদের জীবনে সুখ, শান্তি ও নিরাপত্তা আনতে নিরন্তর কাজ করে যায়।

একজন পরিচালক কত বিচক্ষণ ও কত সফল তা তার মন দিয়ে পরিমাপ করা যায়। ক্ষুদ্র পুকুরে যেমন বড় মাছ বাঁচতে পারে না, তেমনি ছোট মনের অধিকারী লোক হতে পারে না মহান কেউ।

একজন সুখী কর্মচারী হয় আরও উৎপাদনশীল, আরও শক্তিশালী এবং আরও সৃজনশীল। তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উচিত আনন্দময় পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া, যাতে কর্মচারীরা সুখে ও শান্তিতে থাকতে পারেন। আমাদের অবশ্যই উচিত তাদের আনন্দ, দুঃখ এবং কষ্ট ভাগ করে নেওয়া, তাদের জীবনকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তোলা এবং তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা এবং প্রেরণা ও উৎসাহ দেওয়া। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, তারা কী বলে, তা মনোযোগ সহকারে শোনা।

একজন সফল পরিচালক তাঁর অধস্তনদের কথা মনোযোগ সহকারে শোনেন, সম্মান করেন এবং মূল্যায়ন করেন। বস্তুত এটাই একজন পরিচালকের মহৎ ও বিচক্ষণ হয়ে ওঠার অন্যতম শর্ত। আমাদের একটা কথা মনে রাখতে হবে : ঙহব’ং ধঃঃরঃঁফব ফবঃবৎসরহবং ড়হব’ং ধষঃরঃঁফব. একজন পরিচালক কত বিচক্ষণ ও কত সফল তা তার মন দিয়ে পরিমাপ করা যায়। ক্ষুদ্র পুকুরে যেমন বড় মাছ বাঁচতে পারে না, তেমনি ছোট মনের অধিকারী লোক হতে পারে না মহান কেউ।

আমি আশা করি, কর্মকর্তৃবৃন্দ এভাবেই কাজ করে যাবেন এবং এভাবে তাঁদের অধীনস্থদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেবেন। সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য আনয়নে একজন মানুষের জীবনে তার কর্ম বা চাকরি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ কর্মস্থলে আসার সময় তাঁর মনটা বাসায় কিন্তু রেখে আসেন না, তাই তাঁর সঙ্গে এমন ব্যবহার করা উচিত যেন তিনি বাসায় আছেন, পরিবারের সঙ্গে অনিন্দ্য হাসিখেলায়। জীবন খুবই মূল্যবান, তাই একে কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। অবশ্যই কর্মচারীদের সুখ নিশ্চিত করতে হবে, কেননা তাঁরা অন্যদের সুখ নিশ্চিত করতে নিরন্তর কাজ করে যান। তাঁদের এখন অনেক সুবিধাই দেওয়া যাচ্ছে না। এই কারণেই তাঁদের কারও কারও মনে কষ্টও আছে। কিন্তু সেটাও দূর করা প্রয়োজন।

বিলি পোর্টারের বিখ্যাত বাণী দিয়ে শেষ করছি অধ্যায়টি :

ঋড়ৎ সব,

খরভব রং ধনড়ঁঃ নবরহম ঢ়ড়ংরঃরাব ধহফ যড়ঢ়বভঁষ,

ঈযড়ড়ংরহম ঃড় নব লড়ুভঁষ,

ঈযড়ড়ংরহম ঃড় নব বহপড়ঁৎধমরহম,

ঈযড়ড়ংরহম ঃড় নব বসঢ়ড়বিৎরহম.১০১ ১ / ১০২ – ১০৪

 

৩৪. জাতিগত ঐক্য : অপরিমেয় শক্তির আধার

সৈয়দ আবুল হোসেন: দেশ ও বিদেশের কিছু লোক বাংলাদেশের সরকার এবং প্রতিটি স্থানীয় সরকার সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতি ও নাগরিকদের প্রকৃতি ও সম্পর্ক নিয়েও তাদের ভুল ধারণা রয়েছে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব অথবা অসুস্থকর প্রতিযোগিতা চলে আমাদের মাঝে, এমন ধারণা পোষণ করে কেউ কেউ এবং কতিপয় বিদেশি পত্রিকা আমাদের এমনভাবে তুলে ধরে, যেন এখানে ঠা-াযুদ্ধ বিরাজ করছে। বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ সারাক্ষণ লড়াই করছে।

এটা কি আসলে ঠিক?

আসলে তারা বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী সম্পর্কে মিথ্যার মায়াজাল তৈরি করছে, যা স্পষ্টতই অজ্ঞতা, মূর্খতা এবং অনাকাক্সিক্ষত। আমাদের ইতিহাস, ভবিষ্যৎ-লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, নাগরিকদের চরিত্র এবং আমাদের নেতাদের নৈতিকতা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, তারা যে স্পষ্টভাবে কিছুই জানে না, সেটাও তারা জানে না এবং বোঝে না। এটা সবার জানা দরকার আমাদের রাজনীতিক দলের মধ্যে যতই মতবিরোধ থাকুক না কেন, দেশপ্রেমের বেলায় আমরা এক হয়েই কাজ করি। জাতীয় স্বার্থগুলো সবাই অভিন্ন চেতনায় বিবেচনা করি। তবে এটা ঠিক যে, তন্মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা আছে। এমন অনেক দল আছে যারা স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গেও আঁতাত করে স্বাধীনতা রক্ষার অজুহাতে। এটি সাংঘর্ষিক।

বিদেশিরা মাঝে মাঝে আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর চেষ্টা করে। তারা অনেক কথাও বলে। তাদের মত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে তাদের এটা মনে রাখতে হবে, আমাদের এক দেশ, এক সংবিধান, এক পতাকা এবং একটিই লক্ষ্য। সরকারের অর্জনে ও সফলতায় স্থানীয় সরকারগুলো গর্ববোধ করে, যা বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিককেও গর্বিত করে তোলে। আমরা বাঙালি, আমরা আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন।

আমরা শুধু বাঙালি নই। আমরা স্বাধীন, আমরা বাংলাদেশি। আমাদের সব নাগরিক তাদের স্বার্থ ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তাদের নেতা এবং সরকারের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিয়ে উপভোগ করে। উন্নয়ন, সহযোগিতা, সমৃদ্ধি এবং অগ্রগতির জন্য দেশ স্বাধীন করা হয়েছিল। আমাদের এক দেশ, কেননা আমরা মনে করি, আমাদের ঐক্য খুবই দৃঢ় এবং শক্তিশালী। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে কেবল কিছু চুক্তি স্বাক্ষর করে আমরা পাকিস্তানকে পরাজিত করে স্বাধীনতা লাভ করিনি। এখনও আমাদের দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটি রক্ষার জন্য প্রত্যেক নাগরিক তার নিজের জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত।

আমাদের স্থানীয় প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হয় পরস্পরের সহযোগিতায়। সরকার দেশের উন্নয়নে সহযোগিতা করে, নিয়ম-নীতি ও আইনি কাঠামো প্রদান করে এবং আন্তর্জাতিকভাবে উপস্থাপন করে। এতকিছুর পরও, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকি একটি সত্যিকার ও নিশ্চিত লক্ষ্যকে সামনে রেখে, আর তা হচ্ছে, এদেশের প্রতিটি ইঞ্চির জন্য প্রবল মমতা এবং পুরো দেশের প্রতিটি কণার জন্য মানবসম্পদের উন্নয়ন।

আমি চীনের বোয়াও ফোরামের সম্মেলনে যখন অংশ নিই, তখন শীর্ষ সম্মেলনে অনুপ্রাণিত হয়ে এই বইটি লেখার পরিকল্পনা করি। জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ঐক্যের মাধ্যমে বিশ্বের উন্নয়নÑ বোয়াও ফোরামের লক্ষ্য। আর এই শক্তির সঠিক উদাহরণ হচ্ছে এটি। এটা বিভিন্ন দেশের সরকার ও সরকারের কর্মকর্তৃবৃন্দকে অভিন্ন ছাদের নিচে নিয়ে এসেছে, যার মাধ্যমে তথ্য, অভিজ্ঞতা এবং সফল অভিজ্ঞতা পরস্পরের মধ্যে আদান-প্রদান সম্ভব হয়েছে। এটাই আমরা চেয়েছিলাম। একই লক্ষ্য নিয়ে আপন শক্তিতে কাজ করে যাব। এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বেড়াজাল থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। এটি খুব সহজে সম্ভব, আমরা বোয়াও ফোরামের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছিÑ এশিয়ান অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক।

আমি আমার অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বলি, তাঁরা যেন প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের কথা ভাবেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করেন। তাহলে প্রতিষ্ঠান দাঁড়াবেই। তেমনি সরকারের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর উদ্দেশে বলতে চাই, আপনারাই হচ্ছেন আমাদের দেশের অগ্রগতি এবং উন্নয়নের চালক। প্রক্রিয়ার অগ্রগতি, সেবার মান উন্নয়ন এবং যৌথনীতির মাধ্যমে আপনারা দেশের নাগরিকদের জীবনকে আরও আরামদায়ক, আরও শান্তিময় এবং আরও সুখী করে তুলতে পারেন। আমাদের এক দেশ, কেননা আমরা মনে করি, আমাদের ঐক্য খুবই দৃঢ় এবং শক্তিশালী। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে কেবল কিছু চুক্তিতে স্বাক্ষর করেই ঐক্যবদ্ধ হইনি। বরং আমরা স্বাধীন হওয়ার পরও নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেই এগিয়ে চলেছি। ভবিষ্যতেও চলব।

২০১১ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত আদমশুমারির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ২.২ শতাংশ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুযায়ী জুন ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে জনসংখ্যা হয়েছে ১৫.৬৪ কোটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (ঈওঅ) প্রাক্কলন অনুযায়ী ১৫.৮৫ কোটি। এই হিসাবে বাংলাদেশ পৃথিবীর ৮ম জনবহুল দেশ। জনঘনত্ব প্রতি বর্গমাইল এলাকায় ২৪৯৭ জনের অধিক।১০২

জাতিগতভাবে বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ অধিবাসী বাঙালি। বাকি ২ শতাংশ অধিবাসী বিহারি বংশোদ্ভূত এবং বিভিন্ন উপজাতি সদস্য। দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ১৩টি উপজাতি রয়েছে। এদের মধ্যে চাকমা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের উপজাতিগুলোর মধ্যে গারো ও সাঁওতাল উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও, কক্সবাজার এলাকায় বার্মা থেকে বিতাড়িত স্বল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে। দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলা, যা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। সরকারি ও ব্যবসায়ী কাজকর্মে ইংরেজিও ব্যবহৃত হয়। তবে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে বৈদেশিক যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সরকারি কর্মকা-ে বাংলা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।১০৩

আমাদের বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর প্রধান ধর্মবিশ্বাস ইসলাম (৮৯ শতাংশ); এরপরই রয়েছে হিন্দুধর্ম (৯ শতাংশ)। বাকি ১ শতাংশ বৌদ্ধ, খ্রিস্টান অথবা অগ্নি-উপাসক। মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশ সুন্নি মতাবলম্বী। মোট জনগোষ্ঠীর ২১.৪ শতাংশ শহরে বাস করে; বাকি ৭৮.৬ শতাংশ গ্রামাঞ্চলের অধিবাসী।১০৪

আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, প্রতিটি নাগরিক যেন সরকারি লেনদেন (কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়) এবং প্রত্যেক সরকারি কর্তৃপক্ষের (কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় ) কাছে সকল কাজ সহজে সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। এ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আমাদের রয়েছে অসাধারণ সম্ভাবনা, আধুনিক পদ্ধতি, সৃজনশীল মনমানসিকতা, দক্ষ লোক এবং শক্তিশালী রাজনীতিক অবস্থান।

আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম জাতিতে পরিণত হওয়া, কারণ, বাংলাদেশের জনগণ সেরাদের সেরা হওয়া ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করে না। তাদের সে যোগ্যতা রয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা এর প্রমাণ দেখিয়েছি। আমাদের নেতৃবৃন্দ এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থানকে আরও সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছেন।

আমরা বাঙালি, বাংলাদেশি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই এক। আমরা একজাতি, একভ্রাতার মতো অভিন্ন জ্ঞাতি- এ বোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বাংলাদেশ ও বাঙালি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হবে। কেউ আমাদের লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে পারবে না। কারণ আমরা আমাদের লক্ষ্যকে ঐক্যের অপরিমেয় শক্তির পতাকা করে রাখতে সক্ষম। ১০৫ – ১০৬

৩৪. সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমি যেকোনো কাজ দ্রুত করতে পছন্দ করি। পছন্দ করি সবদিক বিবেচনা করে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় কাজ পরিচালনা করতে। দ্রুত বলতে এমন দ্রুত নয়, যে-দ্রুতগতি কোনো কাজকে অকাজে পরিণত করে দেয়। এখনকার কাজ পরে করব- এটা আমার চরিত্রের সঙ্গে খাপ খায় না। ছোটবেলা থেকে আমি এমন নীতিবিরুদ্ধ। এ কারণে সব কাজই দ্রুত করি। দ্রুত করি, তবে সবকিছু গুছিয়ে। লোকজন আমার দ্রুত বাস্তবায়নের প্রকল্প নিয়ে মন্তব্য করেন, তাতে আমি দ্রুত সাড়া দিই এবং বলি- ভবিষ্যতের শুরু আজ থেকে নয়, এ মুহূর্ত থেকে, আগামীকাল থেকে নয় বরং এক্ষুনি। যখন লোকজন আমাকে জিজ্ঞেস করেন, এখনই আপনি সবকিছু করতে চাইছেন কেন? আমার উত্তর : কেন নয়? বিলম্ব করার পেছনে কোনো যুক্তি নেই। আমার সময় কম কিন্তু অনেক কাজ। আমি সবসময় মনে রাখিÑ ঞড়সড়ৎৎড়ি রং ধহড়ঃযবৎ ফধু.১০৫ তাই আজকের কাজ আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা যাবে না।

যদি আমরা আগামীকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি, তাহলে আমাদের মধ্যে গড়িমসি ভাব এসে যাবে। যখন আমরা বুঝব, কোন্ প্রকল্প আমাদের দেশের জন্য কাজে আসবে, আমাদের অর্থনীতির উন্নয়ন ঘটাবে এবং দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, আমাদের সে প্রকল্পটি কোনো প্রকার বিলম্ব ছাড়া দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। তাছাড়া, যা আজ শুরু করা দরকার তা আজ শুরু না করলে কাল আর শুরু না-ও করা যেতে পারে। সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা কাজ সময় ও প্রয়োজনের তাগিদে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। আর একটা কাজ সামনে চলে আসার কারণে সেটাই গুরুত্ব পেয়ে যেতে পারে। কিন্তু যেটা শুরু করার কথা ছিল, সেটা ঠিক সময়ে শুরু না-করতে পারায় তা পিছিয়ে গেল। ভিত হয়ে গেল নড়বড়ে। এটা ঠিক হলো না। তাই যে কোনো কাজ সময়মতো সময়ের মধ্যেই করে ফেলা সমীচীন। শেক্সপিয়রের ভাষায় বলতে পারি : ইবঃঃবৎ ঃযৎবব যড়ঁৎং ঃড়ড় ংড়ড়হ ঃযধহ ধ সরহঁঃব ঃড়ড় ষধঃব.

বাংলাদেশ মাত্র সাড়ে চার দশকের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে মধ্যআয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে সারাবিশ্বে। তা নিয়ে ভাবতে হবে। কীভাবে এমন অসাধ্য সাধন করা সম্ভব হয়েছে! কারণ বাংলাদেশে এমন অনেক নেতা ছিলেন এবং আছেন যাঁরা বিলাসিতা করার চেয়ে দেশের কল্যাণে কাজ করাকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আমরা কোনো কাজের বিলম্ব করায় অভ্যস্ত ছিলাম না। আমরা উন্নয়ন প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন চাই, কারণ আমরা বিশ্বাস করি- একটি রাষ্ট্র যখন আর্থনীতিকভাবে শক্তিশালী হয়, তখন তার রাজনীতিক সক্ষমতা বেড়ে যায়।

সবাইকে কাজে, দায়িত্ব পালনে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে হবে। যথাযোগ্য মর্যাদা পেলে ঐক্য বাড়ে, বাড়ে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা এবং কাজ করার স্পৃহা।

বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার সম্মিলত প্রচেষ্টা ছাড়া, আমাদের দেশের এ অভূতপূর্ব অর্জন কখনও সম্ভব হতো না। প্রত্যেকটি নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছাড়া, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবচেয়ে নি¤œপর্যায়ের কর্মচারীর সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কোনো অর্জনই সম্ভব হতো না। তাই কাজে, দায়িত্ব পালনে সবাইকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে হবে। যথাযোগ্য মর্যাদা পেলে ঐক্য বাড়ে, বাড়ে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা এবং কাজ করার স্পৃহা।

দ্বিধাগ্রস্ত মানুষদের জন্য ভবিষ্যৎ বসে থাকে না। আমরা অধিক অর্জন করতে পারি। যে পরিমাণ উপলব্ধি করি, সেই পরিমাণই অর্জন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব। এটা প্রত্যেকের উচিত, যদি তিনি চান অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকতে, সম্পদে আর উন্নয়নে। তবে কাজ শুরু করা কিংবা কাজের সংখ্যা নয়, কতটা কাজ কতটুকু

সফলতার সঙ্গে সমাপ্ত হলোÑ এটাই মূল বিবেচ্য বিষয়। ওঃ’ং হড়ঃ যড়ি সধহু ঃযরহমং ুড়ঁ ংঃধৎঃ ঃযধঃ সধশব ুড়ঁ ংঁপপবংংভঁষ. ওঃ’ং যড়ি সধহু ড়িৎঃযযিরষব ঃযরহমং ুড়ঁ ভরহরংয.১০৬

আমি এখানে আমার একটি ব্যক্তিগত কাহিনি বলতে চাই। আমি যখন এলাকায় যাই, তখন হাজার হাজার মানুষ আমাকে দেখার জন্য, আমার কথা শোনার জন্য জমায়েত হয়। আমি তাদের সঙ্গে যখন কথা বলি- ওই সময়ে, সমাজের বিভিন্ন সমস্যা এবং উন্নয়নের বিষয়ে আলোচনার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়। সেটা আমি করি। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করেÑ  এ পর্যন্ত আপনার লক্ষ্য-অর্জন কতটুকু সম্ভব হয়েছে। একবার একজন জানতে চেয়েছিলেন আমি আমার লক্ষ্যের শতকরা কতটুকু অর্জন করেছি। আমি প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ব্যর্থ হই। প্রশ্নটি সহ¯্র জনতায় ব্যাপ্ত হয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বলেছিলাম, আমার আকাক্সক্ষা ছিল অনেক, ঠিক তেমনিভাবে আমাদের এলাকার জনগণেরও অনেক প্রত্যাশা ছিল বা আছে। আমার লক্ষ্যমাত্রা প্রতিনিয়ত পূরণ হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত আবার প্রত্যাশার পরিবৃদ্ধি ঘটছে। যত প্রাপ্তি তত প্রত্যাশা, আমি অনেক পাচ্ছি এবং প্রাপ্তি আমাকে আরও পাওয়ার উৎসাহে উদ্দীপ্ত করছে। আমাদের আরও অনেকদূর যেতে হবে। আমাদের পথ অনেক, তবে সে পথ ধরে যাবার জন্য অনেক রথ রয়েছে আমার। তাই লক্ষ্যস্থল আমার কাছে অধরা কিছু নয়।

আমি যখন যোগাযোগ মন্ত্রী হই, তখন অনেক নতুন প্রকল্প শুরু করি, যা বাংলাদেশে এর আগে কখনও হয়নি। কয়েক বছরে আমি অনেক কাজ করেছি। আমি স্যাটল ট্রেন, মেট্রো রেলের ঘোষণা দিয়ে কাজ শুরু করার কথাও বলেছি। এখন সেগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে। আমি শুরু করেছি যেগুলো, এত কিছুর পরও আমি সব কাজ শেষ করতে পারিনি। মাঝখান থেকে আমাকে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের কারনে সরে যেতে হয়েছে। অবশ্য দেশের স্বার্থে শেষাবদি সেটা আমি স্বেচ্ছায় করেছি। এই কারণে নিজের কাছেই নিজে প্রশ্ন করিÑ যা করতে চেয়েছিলাম, তার কত শতাংশ অর্জন সম্ভব হয়েছে।

উত্তরে আমি বলি, যা আমি অর্জন করেছি তা আমার, উন্নয়ন একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া, আমি কতটুকু অর্জন করেছি সেটি না-ভেবে বরং এটিই ভাবা উচিত, আমার অবদানের পরবর্তী পদক্ষেপ কীভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার গৃহীত পদক্ষেপগুলো যদি আমার উত্তরসূরি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনÑ তাহলে আমি শতভাগ সফল। আমাদের কাজের পরিধি বেড়েছে, আমাদের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত হয়েছে, আমাদের দিগন্তরেখা আরও প্রসারিত হয়েছে এবং আমাদের উপলব্ধি আরও স্বচ্ছ হয়েছে। তবে দিন দিন স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাড়ছে বলে আমাদের কাজের পরিধি বিস্তৃত হয়ে পড়ছে।

উন্নয়ন ও প্রত্যাশা জীবনের দীর্ঘ যাত্রা, যার শুরু আছে শেষ নেই। প্রতিটি সময়ে আমরা কাজের একটি অংশ সম্পন্ন করি, আর এর মধ্যেই নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়। কোনো প্রকার বিশ্রাম ও থেমে যাওয়া ছাড়াই আমাদের কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। থেমে যাওয়া মানে সময় নষ্ট করা। আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা হিসাবে কাজ করব। আল্লাহ্র কাছে সাহায্য চাই, আমরা যেন দেশের জন্য কিছু রেখে যেতে পারি এবং আমাদের পক্ষে সম্ভব সর্বোচ্চ সেবাটা যেন দেশকে দিয়ে যেতে পারি।

কোনো প্রকার বিশ্রাম ও প্রতিবন্ধকতা ছাড়া আমরা আমাদের কাজ নিরন্তরভাবে করে যাব। থেমে থাকা মানে সময় নষ্ট করা। তাই থেমে থাকা যাবে না। কাজের মাঝে ক্লান্তি এলে বিশ্রাম নেওয়া যাবে। তবে তা যেন আলসেমি না হয়। এটা সবাইকে মনে রাখতে হবে- ভবিষ্যতের শুরু আজ, কাল নয়।

একটি আদর্শ সরকারের লক্ষ্য হচ্ছেÑ  দেশের নাগরিকদের সুখে রাখা। তা করার জন্য দ্রুত কাজ করতে হবে। কোনো কাজে বিলম্ব হলে তাতে কোনো সুখ নেই। গড়িমসি ও অবহেলায় কতগুলো দিন নষ্ট হয়েছে তার হিসাব করতে হবে। সেই হিসাবে একটা মুহূর্ত আর নষ্ট করা যাবে না। দেরিও করা যাবে না।

আবার আমরা বিষয়ে ফিরে যাই, আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে নাগরিকদের সুখে রাখা। সুখের জন্য কোনোকিছু বিলম্বে করা যাবে না। সময় খুবই মূল্যবান, তাই একে নষ্ট করা যাবে না। আমাদের নাগরিকদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা পূরণে সময়কে গুরুত্বের সঙ্গে ব্যয় করতে হবে। আপনাকে অবশ্যই অপেক্ষা বা বিলম্বিত দিনগুলোর সংখ্যা বের করতে হবে এবং গড়িমসি করে কত সময় নষ্ট করা হয়েছে তা গণনা করতে হবে। আমাদের নাগরিকরা কেন লক্ষ লক্ষ দিন দ্বিধায় এবং প্রতীক্ষায় নষ্ট করছে? কেন আমাদের নাগরিকদের বিলাসিতা, সুখ এবং আরামকে বিলম্বিত করছে, এসব বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী চিন্তা করেন। তাই জনগণ এখন অনেক সচেতন। তারা বলে, আমাদের সফল প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতার কারণে তারা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আমি বলি দ্রুত, অগ্রসর হওয়াÑ একটি সফল জাতির গুণ। যারা সময়ের গুরুত্ব দেয় এবং পেছনের দিনগুলোকে মূল্যায়ন করেÑ তাদের সাফল্য সময়ের ব্যাপার মাত্র।

একটি সফল জাতি নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নেয়, চারপাশের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না। পরিস্থিতিকেও সে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। একটি সফল জাতি ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করে না, বরং নিজেকে উপস্থাপন করে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। একটি সফল জাতি আজকের কাজকে আগামী দিনের জন্য রেখে দেয় না, বরং আগামী দিনের কাজ আজই করে ফেলে।

১০৭-১০৯

৩৫. পর্যটন ও ভ্রমণ

সৈয়দ আবুল হোসেন: পর্যটন ও ভ্রমণ জ্ঞান অর্জনের একটি অতি কার্যকর মাধ্যম। আনন্দের সঙ্গে জ্ঞান অর্জনের এমন মাধ্যম পৃথিবীতে আর নেই। প্রতিবছর বাংলাদেশে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আড়াই লাখের বেশি ভ্রমণপিপাসু মানুষ বেড়াতে আসে। আমাদের সফল পর্যটনকেন্দ্র প্রাকৃতিকভাবে বিশাল, সুন্দর, আকর্ষণীয় এবং নিরাপদ; কিন্তু পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে যা করা প্রয়োজন, তা পুরোপুরি এখনও করা সম্ভব হয়নি। তবে উদ্যোগ থেমে নেই। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে আমরা আমাদের জাতীয় অর্থনীতির চাকাকে আরও বহুগুণ গতিশীল করে তুলতে পারি।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের যোগাযোগ ও পর্যটন খাত অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল। আমি যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে সড়ক ও জনপথ, রেল ও সেতু বিভাগ যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে পৃথক একটি মন্ত্রণালয় হিসাবে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা হয়। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে এটি পুনরায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের বিভাগে পরিণত হয়। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে পৃথকভাবে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয় খোলা হয়। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মার্চ এ মন্ত্রণালয়কে বিলুপ্ত করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। তবে ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে এ মন্ত্রণালয়কে পৃথক মন্ত্রণালয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।১০৭

কোরিয়াতে সড়ক, রেল, সেতু, বেসামরিক বিমান ও নৌপরিবহন একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত। তাই এসব বিভাগের কার্যক্রম একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে সুচারুভাবে চমৎকার সমন্বয়ের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে পরিচালনা করা সম্ভব হয়। সমন্বয়ের সুবিধার জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে রেল মন্ত্রণালয়ের বিলুপ্তি ঘটিয়ে ট্রান্সপোর্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়েছে। তুরস্কে এসব কার্যক্রম ট্রান্সপোর্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালনা করা হয়। অথচ বাংলাদেশের মতো ছোট একটা দেশে রেল মন্ত্রণালয়কে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক করে ফেলা হয়েছে। এতে সময়মতো সুচারুভাবে কার্য সম্পাদনের অসুবিধা হতে পারে।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেও এদেশের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা। মানুষের সঙ্গে মানুষের একে অপরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ১২ মাস জুড়ে উৎসব পালিত হয়। প্রবাদ আছে, বারো মাসে তেরো পার্বণ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশ একটি আদর্শ দেশ হিসাবে পরিচিত। এখানে প্রাকৃতিক সম্পদ, তেল, গ্যাস ছাড়াও প্রকৃতি ও মানুষের সমন্বয়ে বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত মানুষের আন্তরিকতা যা বিদেশিদের কাছে অতি পরিচিত। এখানে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে আম-কাঁঠালের অতুলনীয় স্বাদ, শীত ও গ্রীষ্মকালে অপূর্ব স্বাদের শাকসবজি, বিভিন্ন ধরনের দেশীয় ও সামুদ্রিক মাছ, ১২ মাস জুড়ে বিভিন্ন ফলের রস এবং পর্যটনের জন্য দেশব্যাপী অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বিশ্ববিখ্যাত উল্লেখযোগ্য স্থানগুলোর মধ্যেÑ কক্সবাজার ও সুন্দরবনের কথা উল্লেখ করা যায়। কক্সবাজার বিশ্ববিখ্যাত অবিভক্ত সমুদ্রসৈকত। সুন্দরবন হচ্ছে অসম্ভব সুন্দরভাবে সাজানো সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনের জন্য বিখ্যাত। এখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। পাহাড়ে, পর্বতে, বন-জঙ্গলে, সড়ক, রেল ও নৌপথের দুধারে ফল ও ফুলের গাছ পর্যটকদের নিকট বিমল আকর্ষণ সৃষ্টি করে। এছাড়া বিভিন্ন ফল, ফুল, মধু, নদী, মাছ, মাংস, চর, ছোট ছোট সৈকত, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অভূতপূর্ব স্থান রয়েছে বাংলাদেশে।

সেন্ট মার্টিন অসম্ভব সুন্দর একটি কোরাল দ্বীপ। এটি প্রবাল ও অন্যান্য সামুদ্রিক সৌন্দর্য নিয়ে স্বচ্ছ পানির মাঝে যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান। কুতুবদিয়া দ্বীপ- বাতিঘরের জন্য বিখ্যাত। দিন দিন এটি পর্যটকদের বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। মহেশখালী দ্বীপ আর এক সৌন্দর্যের মহিমা। পারকী সৈকত, পতেঙ্গা সৈকত, ফয়’স্ লেক এবং পাহাড় পরিবেষ্টিত বন্দর-নগরী চট্টগ্রামকে মুগ্ধ করে তুলেছে অপূর্ব লালিত্যে। একই স্থানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের জন্য কুয়াকাটা বিশ্ববিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠেছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ অন্যান্য নদী বাংলাদেশকে করেছে শস্যশ্যামল ও সৌন্দর্যের অপূর্ব লীলাভূমি। এ নদীর ভেটকি, চিংড়ি, পাঙ্গাশ, রুই, কাতলা ইত্যাদি ছাড়া শুধু ইলিশ মাছের স্বাদে বিশ্বে পরিচিত বাংলাদেশ। ইলিশ মাছের স্বাদ নেওয়ার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ৪০ বছর পর নিরামিষভোজী থেকে ইলিশ মাছ খেয়ে আমিষভোজীতে পরিণত হয়েছিলেন।

কাপ্তাই লেক এশিয়া মহাদেশে মানুষের তৈরি একটি সর্ববৃহৎ  হ্রদ যা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও লেকের সৌন্দর্যে পর্যটকের বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। হালদা নদী প্রাকৃতিকভাবে মাছ উৎপাদনকেন্দ্র হিসাবে খ্যাত। এটি জাতীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। মহাস্থানগড়, কান্তজীর মন্দির, বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ প্রভৃতি বিশ্ব-হেরিটেজ হিসাবে হাজার বছরের ইতিহাস ধারণ করে রয়েছে পর্যটকদের মনে। এছাড়া পাহাড়পুর, লালমাই, ময়নামতি, খুলনার ফুলতলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি, কুষ্টিয়ায় লালন ফকির এবং শিলাইদহে রবিঠাকুরের বিখ্যাত কুঠিবাড়িসহ অসংখ্য পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

মাত্র কয়েক বছর আগেই আমরা বাংলাদেশে বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় ঘটনা দেখেছিÑ যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও কক্সবাজার বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ। অতঃপর বাংলাদেশে সারা বছরই পারিবারিক পর্যটনের জন্য একটি স্থান হিসাবে ভ্রমণপিপাসুদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। তবে এটা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। আমাদের পর্যটনশিল্পে সম্ভাবনা আছে অনেক বেশি। কিন্তু সেটা কাজে লাগাতে হবে।

আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক মানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ অনিবার্য পূর্বশর্ত। আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহথির মোহাম্মদের ভাষায় বলা যায়, একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত হচ্ছে বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার প্ল্যানারি সেশনে বক্তৃতায় তিনি আরও বলেছেন, বিমানবন্দর বর্তমানে একটি দেশের বিশ্বায়নের দ্বার। এ দ্বার যত আধুনিক, সহজ ও সাবলীল হবেÑ সে দেশের বিশ্বায়নের গতিও তত বৃদ্ধি পাবে। আমাদের দেশেও একটি অত্যাধুনিক মানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রয়োজন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তা অনুধাবন করতে পেরেছেন। এটি বাস্তবায়নের জন্য তিনি যথেষ্ট আন্তরিকও। তবে তিনি জনগণসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দফতর থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন বলে মনে হয় না। যে কারণে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়।

আমাদের নগরীতে পশ্চিমা দেশের পর্যটকদের পদযাত্রা দেখে আনন্দ পাই। তা বাড়লে আরও ভালো হবে। পর্যটকদের সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যবাহী আতিথেয়তার সম্পর্কটি একরকম পারিবারিক বন্ধনের মতোই। সবকিছুর পরও আমরা কোনো ভাই, বোন কিংবা কোনো ব্যক্তিকেও নানা কারণে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করতে পারি না। তবুও মানুষকে তার প্রিয়জনের পাশে দেখে আমরা বেশ আনন্দ পাই। বলা বাহুল্য যে, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের আগত দর্শনার্থী আমাদের পরম বন্ধু ও অতিথি।

প্রত্যেক দেশেরই একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা বা বিশেষত্ব এবং প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য রয়েছে। এ দিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির ছায়ায় অনবদ্য একটি দেশ। উপযুক্ত ব্যবহারে আমরা পর্যটনশিল্পেরপ্রসারের মাধ্যমে অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের দেশকে একটি মডেল হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। এমন বিনিময়ের মাধ্যমে আমরা প্রত্যেকের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতেও পারি।

দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর অন্যতম একটি সুন্দর প্রাকৃতিক ভূমি। ঋতুগত বিবেচনাতেও এমন বৈচিত্র্যময় অঞ্চল পৃথিবীতে খুব একটা বেশি নেই। আমাদের এ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো পর্যটনশিল্পের উন্নতির জন্য সম্ভাব্য অনেক কিছু করতে পারে। এটি আমাদের অঞ্চলকে আরও অনেক বেশি সমৃদ্ধ করতে পারে। সার্ক-এর মাধ্যমে আমরা আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে একটি সমন্বিত প্রকল্প গ্রহণ করতে পারি। অথবা নতুন কোনো আঞ্চলিক জোট গঠন করে পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে পারি। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে পর্যটনশিল্পের অনন্য সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্য সারা বছরই অটুট থাকে, যা পৃথিবীর অনেক দেশে নেই। বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ- শীত যেমন প্রখর নয়, তেমনি প্রখর নয় গ্রীষ্মও। বৃষ্টিরও রয়েছে অপার সৌন্দর্য।

বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকাগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করার জন্য আমাদের সম্পদে এ মুহূর্তে কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে এ সীমিত সুবিধা ও সেবাসমূহের মধ্যে পর্যটকদের আরও কী কী সুবিধা দেওয়া যায়Ñ তা আমাদের সরকার ও প্রধানমন্ত্রী গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন। পর্যটন শুধু অর্থনীতি নয়, সম্পর্কনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এটি মানুষের প্রতি মানুষের এবং এক দেশের প্রতি অন্য দেশের সম্পর্ককে জোরালো করে। ব্যবসায়-বাণিজ্যেও উৎসাহ দেয় এবং সুযোগ বৃদ্ধি করে।

যেকোনো উন্নয়নের জন্য স্থিতিশীলতা আবশ্যক। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নÑ এ অঞ্চলের মানুষের জন্যই। শুধু পর্যটনশিল্পের উন্নতির জন্য নয় বরং কলকারখানা, কৃষি, জ্বালানি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সবকিছুর ক্ষেত্রেই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা আবশ্যক। তাই আমাদের সবার উচিত স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য একযোগে কাজ করা। এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঐক্য। জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা টেকসই হয়ে উঠবে।

পর্যটন ও ভ্রমণের সঙ্গে নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা নিবিড়ভাবে জড়িত। আমাদের দেশে প্রাকৃতিক পরিবেশ, বিদ্যমান যোগাযোগব্যবস্থা, জনসংখ্যার আধিক্য, ট্রাফিক আইনের প্রতি অবহেলা, গাড়ি চালকগণের বেপরোয়া মনোভাব প্রভৃতি কারণে দুর্ঘটনার হার অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছুটা বেশি। আমি যোগাযোগমন্ত্রী থাকার সময় সড়কপথে দুর্ঘটনা হ্রাসের আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম। সড়ক দুর্ঘটনার হার যত কমানো যাবেÑ দেশের সার্বিক উন্নয়নের মানও তত বৃদ্ধি পাবে।

এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর ১২ হাজার সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫ হাজার লোক আহত হন।১০৮ ২০১১ খ্রিস্টাব্দে সারা দেশে ১২,২২৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২,৪৪৭ জন লোক ইন্তেকাল করেন। প্রতিদিন দেশে ৪০০টি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। তার অধিকাংশই চালকের অদক্ষতা, বেপরোয়া গতি ও খারাপ সড়ক-ব্যবস্থার কারণে সংঘটিত হয়।১০৯ বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, প্রতি ১০ হাজার গাড়ির মধ্যে ৮৫.৬টি গাড়ি মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয়। একই সময় পরিচালিত আর-একটি গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিদিন ২০ জন এবং বছরে ৮ হাজার লোক সড়ক দুর্ঘটনায় ইন্তেকাল করেন। বর্তমানে প্রতিদিন ৩০ জন লোক সড়ক দুর্ঘটনায় ইন্তেকাল করছেন।

৩৬. মন্ত্রিসভার রদবদল

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমি মনে করি, একজনকে নিয়ে যখন খুব বেশি বিতর্ক সৃষ্টি হয়, তখন সেই মন্ত্রীর মন্ত্রীগিরি ছেড়ে দেওয়া উচিত। কারণ মন্ত্রিত্ব ধরে রাখলে তার আরও বেশি সমস্যা হয়, সমস্যা হয় দলের এবং সরকারের। এই কারণে আমি নিজেও মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছি। আমার পদত্যাগ করার কারণ এই ছিল না যেÑ  আমি ব্যর্থ ছিলাম। তা ছিলাম না। আমি সফল মন্ত্রী ছিলাম। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি। মিডিয়া অহেতুক আমার পেছনে লেগেছিল। এটি ছিল ¯্রফে ষড়যন্ত্র। আমার সফলতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে কিছু কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি এমন অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছিল, তাদের মিথ্যা প্রচারণায় ভুল বুঝে যোগ দিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। এখন বিশ্বব্যাংক অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছে- আমার বিষয়ে পদ্মা সেতু নিয়ে তাদের মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত যথার্থ ছিল না।

সরকারের মন্ত্রিসভা একবার নয় বারবারও পুনর্গঠন করা যেতে পারে। সরকারে গতি আনার জন্য এটা সরকার-প্রধান করতেই পারেন। এটি সংবিধানসম্মত। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশে এমন হয়।

বিশ্বব্যাংকের কাছে পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছেÑ যার কোনো ভিত্তি ছিল না। এখন প্রমাণিত হয়েছে যে, আমি কোনো অন্যায় করিনি। তাহলেও আমি মনে করি, পদত্যাগ করে আমি যথার্থ সিদ্ধান্তই নিয়েছিলাম। আমার মতো এমন সাহসী দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে আর কেউ স্থাপন করতে পারেননি। আমি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকাই আমার কাছে সব নয়। আমি পদত্যাগ করেছি আর একজন আমার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। তিনি কাজ করছেন। মাঠে মাঠে দৌড়ঝাঁপ করছেন। আমি মনে করি, সরকারের মন্ত্রিসভা একবার নয় বারবারও পুনর্গঠন করা যেতে পারে। সরকারে গতি আনার জন্য এটা সরকার-প্রধান করতেই পারেন। এটি সংবিধানসম্মত। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশে এমন হয়।

আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ার পর মন্ত্রিসভার পুনর্গঠন হবেÑ এমন কথাও শোনা গিয়েছিল। সেখানে মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য নাম হিসাবে গণমাধ্যমে আমার নামও আসে। কিন্তু আমি তো মন্ত্রী হওয়ার জন্য উদগ্রীব নই। বরং আমার সহধর্মিনী ও কন্যাদ্বয় মনে করেন, আমার আর ওই পদে যাওয়া উচিত হবে না। আমি মনে করি, সরকারি কাজ সম্পাদন ও উন্নয়নে সরকার বিবেচনা করবে কতটুকু সে সন্তুষ্ট এবং রাষ্ট্রীয় কার্য সম্পাদন যদি নেতিবাচক হয় তাহলে অবশ্যই মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনতে হবে। আর ইতিবাচক হলে তার প্রয়োজন হবে না। তবে এটা সরকার-প্রধানকে বিবেচনা করতে হবে, তিনি নিকট-ভবিষ্যতে সরকারে কোনো পরিবর্তন আনবেন কিনা। অবশ্যই এর উত্তর বের করে তাঁকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ, মাঝে মাঝে পরিবর্তন দরকার। আর পরিবর্তন না হলে যিনি স্থায়ীভাবে ক্ষমতাসীন থাকেন, তিনি তাঁর প্রথমদিকের উদ্যমতা ও কাজের গতি সমানতালে ধরে রাখতে পারেন না বলে সরকারের কাজে একপর্যায়ে ঢিলেমি চলে আসে। অধিকন্তু ক্ষমতার অহমিকাও মনে ভর করে বসে। সেটা উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে নষ্ট করে। এটা সরকারকে বিবেচনা করতে হবে। তা কেবল মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের বেলায় নয়, অন্যান্য অনেক ক্ষেত্র রয়েছে সরকারের, সেইসবের বেলায়ও এটা হতে পারে।

এটা সবাই স্বীকার করবে, গুরুত্ব ও মর্যাদার দিক দিয়ে, বাংলাদেশ বিশ্বের এমন একটি তালিকাভুক্ত দেশ যার ইতিহাস ও ঐতিহ্য যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি প্রাচীন। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে, প্রযুক্তিগত জ্ঞানে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ প্রদান এবং দ্রুত বিভিন্ন ধরনের বহুমাত্রিক লেনদেন সম্পন্ন করার ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে আমাদের দেশে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। বৈদেশিকবাণিজ্য, কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা এবং অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে বিভিন্ন কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়া। আর এসবই দেশের সফলতার ও উন্নয়নের পিছনের কাহিনি। সেটা দিন দিন আরও বাড়ছে।

নিঃসন্দেহে একসময় শুধু একটি কাজে চলে না। অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। সেগুলোতেও কাজ করতে হয়। আমাদের এখানে সরকারকে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়াও অন্যান্য কিছু বিভাগের উন্নয়নের কাজ চলমান রাখতে হবে। যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সর্বোপরি, মৌলিক মানবাধিকারগুলো নিশ্চিত করার কাজ। সরকারি কাজের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোতে এসব বিদ্যমান ছিল ও আছে।

জন্মগতভাবে পরিবর্তন আমাদের লক্ষ্য নয় বরং ভালো কিছুর জন্যই পরিবর্তন দরকার। যদি আমরা এটা অর্জন করতে পারি তবে সেটাই খুব ভালো। যদি আমরা না পারি তবে আমরা নিজেরাই নিজেদের পরিমার্জিত করে নেব। তবে ‘একলা চল’ নীতি নয়, একটি দেশের উন্নয়নের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে।

আমাদের আরও বেশি সফলতা অর্জনের জন্য প্রতিনিয়ত সরকারি কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা দরকার। আমরা সবসময় বিভিন্ন প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, উন্নয়ন, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক পর্যায়ে জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা ঘোষণা করি। আমরা তাদের নিজেদের বিকাশের জন্য একের পর এক সুযোগ দিয়ে থাকি, তবে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়। একটি সময় আসে যখন আমরা বিভিন্ন সেক্টরের, বিশেষ করে, বিভিন্ন বাহিনীর সফল কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করি এবং ধন্যবাদ জানাই। তাদের জন্য আরও নতুন সুযোগ করে দিই, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও গতিসঞ্চার হয়।

সফলদের মধ্যে যাঁরা তাঁদের পরিবর্তন ধরে রাখতে পারেন, চ্যালেঞ্জ নিতে পারেন এবং শর্ত পালনে শীর্ষে থাকেন, তাঁদেরই সেরাদের সেরা নির্বাচন করা হয়। কেবল উদ্ভাবন ও সৃজনশীল কর্মকর্তা, ইতিবাচক শক্তিসমৃদ্ধ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও যাঁর চিন্তার দিগন্ত ব্যাপক তাঁরাই এ তালিকায় থাকেন। প্রত্যেক কর্মকর্তাই তাঁর নিজের সম্পর্কে জানেন, ফলে তিনি নিজে তাঁর সাফল্যের সাক্ষ্য হয়ে থাকেন। অতএব শুধু আমার একার বিচার করা উচিত হবে না। এবার তাঁদের নিজেদের কাছে নিজেদের এবং গণমানুষের কাছে তাঁদের কর্মের জন্য গ্রহণযোগ্যতার দায়ভার ছেড়ে দেওয়া হোক।

তাই আমাদের মধ্যে কারও যদি আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায় আমি তাকে বলি, “এই মঞ্চ তোমারই”; আবার যে ব্যক্তিগত উন্নয়নের চেষ্টায় লিপ্ত তাকে বলি, “নিজে নিজে একবার স্মরণ করে দেখুন, আপনার কী কী দোষ, ভুল বা অপরাধ আছে।”

সরকার পরিবর্তনের সময় আমি একটি কথা প্রায়শ বলি, যখন আমাদের দেশের প্রতি কারও আগ্রহ নষ্ট হয়ে যাবে তখন আমি এরকম একটি সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করব না। শুধু পরিবর্তনের জন্য পরিবর্তন আমাদের লক্ষ্য নয়, বরং ভালো কিছুর জন্যই পরিবর্তন দরকার। যদি আমরা এটি অর্জন করতে পারি, তবে সেটা খুবই ভালো। যদি আমরা না পারি তবে আমরা নিজেরাই নিজেদের পরিমার্জিত করে নেব। তবে ‘একলা চলো’ নীতি নয়, একটি দেশের উন্নয়নের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, দশজন কখনও হারে না, সম্মিলিত শক্তির জয় অনিবার্য। ১ / ১১০

৩৭. একটি শিশুর স্বপ্ন

সৈয়দ আবুল হোসেন: শিশুর কথা উঠলেই বিখ্যাত লেখক এরিক হোফারের একটা উক্তি আমার মনে পড়ে যায়। তিনি বলেছেন : ঈযরষফৎবহ ধৎব ঃযব শবুং ড়ভ ঢ়ধৎধফরংব.১১০ তাই শিশুদের আমি সবসময় প্রত্যাশার চোখে দেখি। তারা আমাদের প্রত্যাশার মহীসোপান। প্রত্যেকের স্বপ্ন থাকে, আশা থাকে। তেমনি থাকে শিশুরও। একটি শিশুর স্বপ্ন কী তা জানা দরকার। কারণ, একটি শিশু জন্ম থেকে স্বপ্ন দেখে না। জন্ম নেওয়ার পর স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। বলা যায়, পরিবেশ থেকে শিশু স্বপ্ন দেখতে শেখে, স্বপ্নের মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করার অনুপ্রেরণা লাভ করে। সেই স্বপ্ন দেখার জন্য তাকে উদ্বুদ্ধ করতে হয়, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হয়। মনে রাখতে হবে, শিশুদের জন্য বিনিয়োগই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। যে শিশু সুন্দর স্বপ্ন দেখে কেবল সেই শিশুর দ্বারা দেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব। অনেক শিশু প্রশ্ন করে, কীভাবে সফল হওয়া যাবে? কীভাবে নিজেকে স্থাপিত করা যাবে অদ্বিতীয় আসনে? এসব প্রশ্নের উত্তর মুখে দেওয়া যায় না, দেওয়া গেলেও তা প্রকৃত অর্থে কোনো জবাব নয়। বরং তার চারপাশে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা উচিত যা থেকে সে উত্তর পেয়ে যেতে পারে।

পরিবেশ, পরিস্থিতি ও অবস্থা থেকে নিজেই সে যথার্থ পথটি বেছে নিতে সক্ষম হবে। এ বিষয়ে একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। কেউ যদি দৌঁড়বিদ অথবা অন্য খেলাধুলায় বিখ্যাত হতে চায় তাহলে তার মন সেদিকেই নিয়ে যেতে হবে। কারণ, দৌঁড়বিদ অথবা অন্য কোনো খেলোয়াড় হওয়া অতটা সহজসাধ্য নয়। এটি একটি প্রতিভা যা নিজের ভিতরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। নিজের ভিতরের এ সুপ্ত গুণগুলোকে জাগিয়ে তোলা এবং সেগুলোকে সবসময় উজ্জীবিত রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিষয়টি মানুষের ভিতর থেকে হয়। কেউ চাঁদের দেশে অথবা মঙ্গলগ্রহে যেতে চাইলেও তাকে সেখানে যেতে পারার মতো যোগ্য উপাদানে বিভূষিত করে তোলার ক্ষেত্র প্রস্তুতের সুযোগ দিতে হবে। তা হলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে। এজন্য বড়দের অনেক দায়িত্ব রয়েছে।

একটি শিশুর স্বপ্ন কী তা জানা দরকার। কারণ, একটি শিশু জন্ম থেকে স্বপ্ন দেখে না। জন্ম নেওয়ার পর স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। বলা যায়, পরিবেশ থেকে শিশু স্বপ্ন দেখতে শেখে, স্বপ্নের মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করার অনুপ্রেরণা লাভ করে। সেই স্বপ্ন দেখার জন্য তাকে উদ্বুদ্ধ করতে হয়, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্র ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হয়। মনে রাখতে হবে, শিশুদের জন্য বিনিয়োগই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। যে শিশু সুন্দর স্বপ্ন দেখে কেবল সেই শিশুর দ্বারা দেশের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা সম্ভব।

একটি শিশুর স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রথম প্রয়োজন হচ্ছেÑ তার অদম্য ইচ্ছা আর মনোবল। সেইসঙ্গে সাহসিকতা ও জানার আগ্রহ। এগুলো থাকলে সে যে কোনো কাজে সফল হতে পারবে। এজন্য শৈশবে তাকে শেখাতে হবে : নিজের বাবা-মাকে শ্রদ্ধা করতে হবে, নিয়মিত স্কুলে যেতে হবে, শিক্ষক এবং বড়দের শ্রদ্ধা করতে হবে। এছাড়া সে ভবিষ্যতে যেটা হতে চায়Ñ সেক্ষেত্রের সফল ব্যক্তিদের সফলতাকে আয়ত্ত করার কৌশলগুলো রপ্ত করতে হবে। কেউ ফুটবল খেলোয়াড় হতে চাইলেÑ তাকে পেলে এবং ম্যারাডোনার মতো বিখ্যাত খেলোয়াড়দের গুণাবলি সম্পর্কে সম্যক অবগত হয়ে, সেগুলো অর্জনের জন্য অনুশীলন করতে হবে। এটিই হবে তার সবচেয়ে সহজতর অধ্যায়। যদি তার আদর্শ ও নৈতিকতা দেখে তার বাবা-মা, শিক্ষক এবং তার আশপাশের লোকজন অভিভূত হয়, তবে সে কোনো উচ্চতর প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবে। সমাজ

তখন দায়বদ্ধ হয়ে ওঠার প্রেরণা পাবে।

একটি শিশু যদি একজন বিখ্যাত খেলোয়াড় হতে চায় কিংবা দামি একটি গাড়িতে চড়তে কিংবা আকাশে উড়তে ইচ্ছে পোষণ করে, তার মানে হলো- শিশুটির অন্তরে রয়েছে উচ্চাকাক্সক্ষা এবং দৃঢ়সংকল্প। আমি শিশুদের মধ্যে খেলাধুলায় অনেক বেশি আগ্রহ দেখি, তাই তাদের খেলাধুলার জন্য উৎসাহ দিয়ে থাকি। ১৪০০ বছর পূর্বে ইসলামের চতুর্থ খলিফার অন্যতম সহচর উমর ইবনে খাত্তাব বলেছিলেন : “আপনার শিশুকে সাঁতারের কৌশল শেখান”। এখানে সাঁতারের বিষয়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ এতে একটি শিশুর মধ্যে প্রতিযোগিতার মানসিকতা সৃষ্টি হয়। সে অন্যকে পেছনে ফেলে রেখে আরও দ্রুত সামনের দিকে ধাবিত হয়। প্রতিযোগিতা একটি শক্তি, শক্তি অর্জনের কৌশল, উপায়- এটি এমন একটি শক্তি, যা শিশুর মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। অলিম্পিকের মূলমন্ত্রও তেমন- আরও দ্রুত, আরও উচ্চ, আরও শক্তিমান এবং গতিশীল হওয়া।

মানুষ মাত্রই সাধারণ হয়ে জন্মায়, প্রত্যেকেই থাকে শিশু। জ্ঞান-ধ্যান, আচার-আচরণ, প্রেম-ভালবাসা, নির্লোভ-কর্ম, স্বর্গীয়-অনুভূতি, অহিংস-মমত্ব, প্রগাঢ়-অনুভব, সৎ-চিন্তা ও কল্যাণময়-কর্ম ইত্যাদির অনবদ্য সমন্বয়ে একজন মানুষ যখন আলোকিত হয়ে ওঠেন, তখনই তিনি মহামানবে পরিণত হন।

বলা যায়, যে কোনো পর্যায়ে ভালো খেলোয়াড় অথবা উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হতে হলে নিজের মধ্যে ধৈর্য এবং নিয়ন্ত্রণ শক্তিকে যথাযথভাবে ধারণ করতে হবে, যা আমাদের শিশুদের মধ্যে দরকার। ভিতরের নৈতিকতার সঙ্গে বাইরের গুণাবলির একটি সামঞ্জস্য বিধান করতে হবেÑ যেমনিভাবে সামঞ্জস্য রয়েছে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মনোদৈহিক শক্তি ও গতিবিধির। এর সঙ্গে আবেগের শক্তির সম্পর্ক রয়েছে, তা প্রতিফলিত হয় সহনশীলতার বিস্তার এবং ধৈর্যের মাত্রার ওপর। আবেগ প্রাকৃতিক শক্তির মতো, এটি এমন একটি শক্তি যা দেখা যায় না, কিন্তু সীমাহীন। শিশুতে আবেগ আছে, এ আবেগ যথাকার্যে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে, কাজে লাগাতে পারলে, জাতি বিপুল শক্তির কল্যাণকর ক্ষেত্রে পরিণত হবে।

মোগল শাসনামলে এমনকি ইংরেজ আমলেও ঘোড়দৌড় প্রবল জনপ্রিয় ছিল। ওই সময়ের শিশুরা উত্তরসূরি হিসাবে এই গুণ পেয়েছিল। তাদের পূর্বপূরুষেরা এই গুণ নিয়ে এসেছিল যা পরে এখানে স্থায়িত্ব লাভ করেছিল। কিন্তু আজকের দিনে, আমাদের অশ^ারোহণ এখন তেমনভাবে চালু নেই। তবে অতীতে ছিল। এখন এর বিকল্প হিসাবে ঘোড়ার গাড়ি চলে পুরনো ঢাকায়। অশ্বারোহণ একটি উত্তেজনাপূর্ণ খেলা। শুধু ভালো মানুষেরাই, যারা আনন্দ খোঁজে তারাই যতেœর সাথে অশ্বারোহণ করে থাকে।

মানব আর মহামানবের আকৃতি অভিন্ন। তারা মানবিক দুর্বলতা থেকে মুক্তও নয়, তবু পার্থক্য ব্যাপক। এ পার্থক্য ধর্মে নয়, কর্মে; বর্ণে নয়, মর্মে। কর্ম ও মর্মের অভিনন্দিত সমন্বয় ঘটিয়ে যেকোনো মানুষ মহামানব হয়ে উঠতে পারেন। মানুষ মাত্রই সাধারণ হয়ে জন্মায়, প্রত্যেকেই থাকে শিশু। জ্ঞান-ধ্যান, আচার-আচরণ, প্রেম-ভালবাসা, নির্লোভ-কর্ম, স্বর্গীয়-অনুভূতি, অহিংস-মমত্ব, প্রগাঢ়-অনুভব, সৎ-চিন্তা ও কল্যাণময়-কর্ম ইত্যাদির অনবদ্য সমন্বয়ে একজন মানুষ যখন আলোকিত হয়ে ওঠেন, তখনই তিনি মহামানবে পরিণত হন। সুতরাং জন্ম নয়, কর্মই মানুষকে মহান করে, ক্ষুদ্র করে।

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে একসময় নৌকাবাইচের প্রতিযোগিতা বেশ জনপ্রিয় ছিল। প্রায় সর্বত্র এ ধরনের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। এখন সে ঐতিহ্য ও জৌলুশ অনেকটা কমে গেছে। তবে নদ-নদী খাল-বিলে ভরা বিস্তৃত এলাকায় বর্ষা মৌসুমে সীমিত পর্যায়ে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। আমাদের দেশে অনেক ঐতিহ্যমান খেলা রয়েছে, যেগুলোতে পূর্বপুরুষের শৌর্যবীর্য এবং ব্যক্তিত্ব প্রকাশিত হতো। যেমন- কুস্তি, গরুর দৌড়, লাঠি খেলা, হাডুডু, দাঁড়িয়াবান্ধা প্রভৃতি। একটি জাতিকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতাপূর্ণ খেলার ভূমিকা অনস্বীকার্য।

পৃথিবীর অনেক অখ্যাত দেশ অলিম্পিক বা অন্য খেলায় অংশগ্রহণ করে জয়ী হয়ে বিশ্বময় পরিচিতি লাভ করেছে। আমি একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলতে চাই, তা হলো- একজন শিশুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে জাগাতে হলে তার কর্ম ও মর্মের অভিনন্দিত সমন্বয় ঘটিয়ে যেকোনো মানুষ মহামানব হয়ে উঠতে পারেন।

স্বপ্ন মানুষকে উজ্জীবিত করে। আর স্বপ্নের বাস্তবায়ন মানুষকে করে সমৃদ্ধ। বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা মানুষকে করে ঋদ্ধ। শিশুর স্বপ্ন শিশুর মতোই সরল, কিন্তু আধুনিক চেতনায় ভরপুর। তাই শিশুর সকল স্বপ্নকে লালন করার জন্য আমাদের সকল সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে যাওয়া উচিত। উন্নত জাতি গঠন করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। শিশুদের মাধ্যম ছাড়া ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের বিকল্প কোনো উপায় আমাদের নেই। তাই দেশের প্রত্যেক শিশুকে সচেতন পিতামাতার মতো নিজের সন্তান হিসাবে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হবে। আমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়নের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি।

৩ / ১১১-১১৪

৩৮. সুস্থ মানুষ ও সুস্থ নেতা

সৈয়দ আবুল হোসেন: একটা আরবীয় প্রবাদ দিয়ে শুরু করছি, ‘যার স্বাস্থ্য থাকে তার আশা থাকে, যার আশা থাকে তার সবকিছু থাকে এবং যার আশা নেই তার কিছুই নেই।’১১১ একজন মানুষ সুস্থ থাকলে সুস্থ পরিবার গড়ে ওঠে, সুস্থ পরিবার গড়ে তোলে সুস্থ সমাজ এবং সুস্থ সমাজ গড়ে তোলে সুস্থ জাতি। এজন্য প্রয়োজন হয় নেতৃত্ব এবং খেলাধুলা ও শারীরিক কসরত। সুস্থ মানুষের সঙ্গে সুস্থ নেতার সম্পর্ক ঠিক সুস্থ মানুষের সঙ্গে সুস্থ মনের সম্পর্কের মতো অবিচ্ছেদ্য। ‘অ যবধষঃযু ভধসরষু রং ধ ংধপৎবফ ঃবৎৎরঃড়ৎু.’১১২ তেমনি একটি সুস্থ জাতি গঠন করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র। আর এ সুস্থ জাতি ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন সুস্থ নেতা।

আপনারা কি অলস এবং অকর্মণ্য কোনো নেতার কথা চিন্তা করতে পারেন, যিনি একটা শক্তিশালী দেশ দিতে পারেন? কখনও সম্ভব নয়। শক্তিশালী জাতি দিতে হলে একজন নেতাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে যোগ্য থাকতে হবে। যোগ্য হতে হলে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই তাঁকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এবং তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন হতে হবে। স্বাস্থ্যের সঙ্গে বুদ্ধির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। অমিত রায়ের ভাষায় : ঊীবৎপরংবং ধৎব ষরশব ঢ়ৎড়ংব, যিবৎবধং ুড়মধ রং ঃযব ঢ়ড়বঃৎু ড়ভ সড়াবসবহঃং.১১৩

ব্যক্তিগতভাবে খেলাধুলা উপভোগ আমার প্রাত্যহিক রুটিনের একটি অংশ। সময় পেলে আমি বিভিন্ন চ্যানেলে খেলাধুলা উপভোগ করি। ছেলেবেলায় গ্রামে থাকাকালীন আমি বিভিন্ন দেশীয় খেলা খেলতাম। আমি নিজেকে পুরোপুরি স্বাস্থ্যবান এবং শক্তিশালী মনে করি না। তবে আমার স্বাস্থ্য যা আছে, তা ভালো রাখার চেষ্টা করি। অসুস্থ থাকলে আমি চলতে পারব না, কাজকর্ম করতে পারব না।

আপনার বেঁচে থাকাটাই নির্ভর করে, আপনি কতটুকু সুস্থ ও বলবান বোধ করছেন তার ওপর। অর্থ উপার্জনের জন্য স্বাস্থ্যকে বিসর্জন দেওয়ার মতো বোকামি আর কিছু হতে পারে না। এটি মুরগির জন্য গরু শিরনি দেওয়ার মতো হাস্যকর একটি ব্যাপার।

মনকে ভালো রাখতে হলে, স্বাস্থ্যকে ভালো রাখতে হবে। আমার বাইরে এবং পার্কে হাঁটার শখ, কিন্তু তা আমি নিরাপত্তা ও বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে করতে পারি না। উন্নয়ন আর শান্তির জন্য সামাজিক নিরাপত্তা অনিবার্য শর্ত। আইনশৃঙ্খলার পর্যাপ্ত উন্নয়নের মাধ্যমে জননিরাপত্তা পুরোপুরি নিশ্চিত না-করা পর্যন্ত সামাজিক নিরাপত্তা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। বাইরে হাঁটতে পারি না বলে আমি বাসার ট্রেড মেইলে প্রতিদিন আধঘণ্টা করে হাঁটি। তবে অনেক সময় কাজের চাপে প্রতিদিন তা-ও করা সম্ভব হয় না। কিন্তু সপ্তাহে ৩/৪ দিনের কম কখনও হয় না। আমার কিছু ভিন্ন ধরনের শখ আছে, যা আমি সাধারণভাবে প্রতিদিন অনুশীলন করি।

সবার জন্যই আমার একটি পরামর্শ- নিজেকে সুস্থ ও সবল রাখার জন্য নিয়মিত হাঁটাচলা করুন। কারণ আপনার শারীরিক যোগ্যতাই নির্ধারণ করে দেবেÑ আপনি কতটুকু অর্জন করতে পারবেন। তাছাড়া আপনার বেঁচে থাকাটাই নির্ভর করে, আপনি কতটুকু সুস্থ ও বলবান বোধ করছেন তার ওপর। অর্থ উপার্জনের জন্য স্বাস্থ্যকে বিসর্জন দেওয়ার মতো বোকামি আর কিছু হতে পারে না। এটি মুরগির জন্য গরু শিরনি দেওয়ার মতো হাস্যকর একটি ব্যাপার।

আমার নিজের এবং আপনাদের সবার উদ্দেশে বলছি, কার্ডিওভাস্কুলার সংক্রান্ত ব্যাধি, উচ্চ রক্তচাপ এবং বহুমূত্র রোগসহ অন্যান্য আরও অনেক রোগ শরীরচর্চার অভাবেই হয়। আমরা এ যুগের মানুষ যত অসুখ-বিসুখে ভুগে থাকি, তত অসুখ-বিসুখ ভোগ করত না আমাদের পূর্বপুরুষরা। কারণ তাদের সচল জীবন এবং কাজের ধরন যেমন ছিল, তা শরীরচর্চার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। মনে রাখুন, প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর।

যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তারা তাদের চারপাশের পৃথিবীকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আর যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাদের পক্ষে কি সম্ভব অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করা?

যেসব নারী শরীরচর্চা করার জন্য বাইরে হাঁটতে বের হন, তাঁদের দেখে এটা অন্তত ভালো লাগে যে, তাঁরা সংসারের অনেক ঝামেলার মধ্যে নিজেদের জন্য একটু সময় বের করেছেন। এটি শুধু তাঁদের জন্য নয়, পরিবারের জন্যও আবশ্যক। কারণ সুস্থ নারী মানেই সুস্থ পরিবার, আর সুস্থ পরিবার মানে সুস্থ সমাজ এবং সুস্থ সমাজ মানে সুস্থ জাতি। সবচেয়ে বড় কথা নারীরা এখন স্বাস্থ্য-সচেতন। এটি আমাদের পরিবার ও জাতির জন্য একটি কল্যাণকর ইঙ্গিত।

অনেকেই শরীরচর্চা, শারীরিক সুস্থতা এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কথা বলেন না। এটা বলা দরকার। কারণ বেশিরভাগই বলবে, সে চেষ্টা করেও খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। তাই সে হাঁটাহাঁটি শুরু করেছে। কিন্তু মোট কথা হলো- যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তারা তাদের চারপাশের পৃথিবীকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। আর যারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তাদের পক্ষে কি সম্ভব অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করা?

অনেকেই বলে থাকেন, ব্যস্ততার জন্য বাইরে হাঁটাহাঁটি করতে পারেন না। আমি অবাক হই, যদি তাদের স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তারা তাদের টাকাপয়সা দিয়ে কী করবে? অনেক লোক আছে অর্থ আর সুনামের জন্য স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং শেষ পর্যন্ত হারানো স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য অর্জিত অর্থ হাসপাতালে ব্যয় করে ফেলে। এমন হতভাগাদের কাছ থেকে সমাজ ভালো কিছু আদায় করতে পারে না। আবার অনেকেই অজুহাত দেখায়, গবেষণা কিংবা পড়াশুনার জন্য শরীরচর্চা করতে পারছে না- তাদের পড়াশুনা আর গবেষণা তাদের যতই কাজে আসুক, কিন্তু স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারবে না। পরিবারের সঙ্গে সুস্বাস্থ্য নিয়ে যে সময় কাটাতে পারে না, তার জীবন তো ষোলো আনাই বৃথা!

যাই হোক, পরিশেষে ছোট্ট একটি পরামর্শ আপনাদের দিতে চাই : জীবনে আর যাই করুন, শরীরচর্চার জন্য কিছু সময় বের করতে হবে আপনাকে, এটিই হবে আপনার জীবনের সবচেয়ে সুখকর বিনিয়োগ, যা আপনার স্বাস্থ্য, ভবিষ্যৎ এবং সুখকে অটুট রাখবে। মনে রাখবেন : অ ংবিবঃ ষরভব রং ধ ংবিধঃু ষরভব.১১৪ সময়ই যদি জীবন হয়, তাহলে স্বাস্থ্যই কেবল আমাদের সেই সময়কে অর্থবহ ও জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। কারণ প্রতিটি সময়কে কাজে লাগালে মানুষের জীবনে প্রতিমুহূর্তে এক-একটি করে সফল কাহিনি লেখা হয়। সময় কাজে লাগাতে না পারলে সাফল্য কখনও ধরা দেবে না।

সুস্থতা শ্রীবৃদ্ধির জনক এবং পরিতৃপ্তির অফুরন্ত উৎস। এটি পুষ্ট প্রকৃতির মতো মনোরম এবং প্রশান্ত বাতাসের মতো সর্ব-উপভোগ্য একটি সকাল, যৌবনের উন্মাদনায় সৃষ্টির তারল্য এবং শেষ বয়সের জন্য অপূর্ব শান্তির প্রতীক। স্বাস্থ্যের মতো সম্পদ এবং সুস্থতার মতো সুখ আর নেই। কেবল নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে এ দুটি অর্জন করতে হয়। সাধারণ সম্পদের চেয়ে এ দুটির মূল্য কোটিগুণ বেশি। একজন যতই ধনশীল হোক না কেন- স্বাস্থ্য বা সুস্থতা না থাকলে তার অন্য সব সম্পদ অর্থহীন হয়ে যায়।

একজন ব্যক্তি যতই ক্ষমতাবান হোক না কেন, শারীরিক অসুস্থতা তার সবকিছু অর্থহীন করে দিতে পারে। আপনি যদি স্বাস্থ্যবান হন, তাহলে নিঃসন্দেহে আপনি সুখী এবং আপনি যদি ভালো অনুভব করেন, তো পৃথিবীর আর কোনোকিছুই প্রয়োজন নেই আপনার। অসুস্থ ব্যক্তি, সে যত বড় সম্পদশালী বা ক্ষমতাবানই হোক না কেন- সে গভীর সমুদ্রের মাঝখানে তলাফুটো জাহাজের মতোই অসহায় অবস্থায় তলিয়ে যেতে থাকে।

১১৫-১৩১ /

৩৯. বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা : একটি পর্যালোচনা

সৈয়দ আবুল হোসেন: আমি সব সময় বলি, শিক্ষা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। মানুষ কেবল শিক্ষার জন্যই সর্বশ্রেষ্ঠ জীব। এর কোনো বিকল্প নেই। একটি জাতির আর কিছু লাগে না, যদি যথোপযুক্ত শিক্ষা থাকে। তবে আমাদের শিক্ষার ইতিহাস এখন বিশ্বমানের ও বিস্তৃত হলেও এর সূচনা ছিল অত্যন্ত করুণ। বস্তুত দেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর সরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের ঐকান্তিক চেষ্টায় প্রসারিত হয় বাংলাদেশের আধুনিক শিক্ষার পরিধি। প্রাচীনকাল, এমনকি মধ্যযুগেও ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা প্রধানত আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক মতবাদে প্রভাবিত ছিল। এ শিক্ষাব্যবস্থা ছিল সাধারণ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন। উইলিয়াম অ্যাডাম্স্ নামের জনৈক ব্রিটিশ বর্তমানে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা হিসাবে পরিচিত শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তন ও বাস্তবায়ন করেন এ অঙ্গনে। তিনি তাঁর শিক্ষা প্রতিবেদনে যে-বিষয়গুলোর ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন সেগুলো হচ্ছে :

১. জেলাভিত্তিক শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ;

২. নিজ মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তকের প্রচলন ;

৩. শিক্ষা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতি জেলায় ইন্সপেক্টর নিয়োগ ;

৪. শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য সাধারণ বিদ্যালয় স্থাপন ;

৫. জমিদাতাকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগদান করে উৎসাহিত করা ;

৬. প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে বৃত্তি পরীক্ষার প্রচলন।

১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দের উডের ড্যাসপ্যাচ তত্ত্ব ছিল ব্রিটিশ শাসকের বাংলার শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকীকরণ করার প্রক্রিয়ার একটি চমৎকার প্রয়াস। এই তত্ত্বের সুপারিশ অনুযায়ী ১৮৫৫-৫৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ‘পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’ বিভাগ নাম দিয়ে একটি নতুন বিভাগ চালু করা হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিভাগে ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়। লর্ড কার্জন প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে গোপাল কৃষ্ণ গোখলে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার জন্য আইন পরিষদে একটি বিল উত্থাপন করেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে বিলটি খারিজ হয়ে যায়, তৎপরিবর্তে পৌর এলাকায় প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিল পাস হয়। ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ইন্ডিয়ান-পুস্তক আইনে সীমিত আকারে স্বায়ত্তশাসনের বিধান রাখা হয়। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল (পল্লি এলাকা) প্রাথমিক শিক্ষা আইন প্রণীত হয়। এই আইনের অধীনে শিক্ষা সম্প্রসারণ পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রণের জন্য, সর্বোপরি, বিনামূল্যে এবং সর্বজনীন বাধ্যতামূলক শিক্ষার লক্ষ্য-পূরণে জেলা স্কুল বোর্ড গঠন করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষা উন্নয়নের জন্য সার্জেন্ট কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এটাই প্রথম রিপোর্ট যাতে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর সার্জেন্ট কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন বন্ধ হয়ে যায়।

ভারত বিভক্তির পর, সর্বজনীন বাধ্যতামূলক এবং বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একটি রেজুলেশন জাতীয় শিক্ষা সম্মেলনে (১৯৪৭) উপস্থাপন করা হয়। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে সরকার জেলা স্কুল বোর্ড বিলুপ্ত করে প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক নিয়ন্ত্রণ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ওপর ন্যস্ত করে। সাবেক জেলা স্কুল ইন্সপেক্টরগণ জেলা প্রশাসকদের অধীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল (পল্লি এলাকার) প্রাথমিক শিক্ষা আইন সংশোধন করা হয়। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার জন্য সরকার পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। নির্বাচিত ইউনিয়নের ৫,০০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নির্বাচন করা হয় “বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা” পরিচালনা করার জন্য। বাকিগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা

হয়নি। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা ৪ বছর মেয়াদি কোর্স ছিল। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে প্রাথমিক শিক্ষাকে ৫ বছর মেয়াদি কোর্স করা হয়।

‘বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা’ পরিচালনাকারী ও ‘অবাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা’ পরিচালনাকারী বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে নানা কারণে অসন্তোষ ও বিভাজন সৃষ্টি হয়। এ অসন্তোষ ও বিভাজন নিরসনে সরকার ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ৫,০০০ বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালনাকারী বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ‘মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নাম দেয়। বাকিগুলো ‘অমডেল’ প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে পরিচালিত হয়। মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকগণ অমডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন ও তত্ত্বাবধান করতে পারতেন। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। ওই কমিশন, পরবর্তী ১৫ বছরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাকে ৮ বছর মেয়াদি কোর্সে উন্নীত করার সুপারিশ করে এবং বয়সের ভিত্তিতে উদার প্রমোশন পদ্ধতি প্রবর্তনেরও সুপারিশ করে। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে সরকার সম্মিলিতভাবে ‘মডেল’ ও ‘অমডেল’ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামকরণ ‘ফ্রি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ হিসাবে ঘোষণা করে।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মহান স্বাধীনতা-যুদ্ধে জয়ী হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ আমল শুরু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন সংবিধানে প্রাথমিক শিক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিধানগুলো হলো : যে সকল উদ্দেশে রাষ্ট্র একটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে-

১. একটি অভিন্ন, জনসম্পৃক্ত ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা এবং সব ছেলেমেয়ের জন্য বিনামূল্যে ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার যা আইন দ্বারা নির্ণয় করা যেতে পারে ;

২. শিক্ষাকে সমাজের চাহিদার সঙ্গে যুক্ত করা এবং সমাজের ওইসব চাহিদা পূরণে সক্ষম প্রশিক্ষিত ও প্রণোদিত নাগরিক তৈরি করা এবং

৩. একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণ কৌশল একটি কার্যকর আইন দ্বারা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

সরকার জাতীয় দায়িত্ব হিসাবে প্রাথমিক শিক্ষাকে স্বীকার করে এবং শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার যা বাংলাদেশে একটি নতুন যুগের সূচনা করবে। স্বাধীনতার পর প্রতিবেশী দেশগুলোর শিক্ষাপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি স্বাধীন জাতি হিসাবে বাংলাদেশে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এজন্য শিক্ষাব্যবস্থার উদ্দেশ্য, কৌশল এবং কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে সুপারিশ করার জন্য ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৬ হাজারের কম। এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১,০৪,০১৭টি। ¯œাতক ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বেড়েছে ৭০ গুণ। তখন দেশে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল না। কিন্তু এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ছাড়িয়ে গিয়েছে। তখন গ্রামের পর গ্রাম হাঁটলেও মাস্টার্স ডিগ্রিধারীর খোঁজ পাওয়া যেত না, এখন প্রায় প্রতিঘরে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী রয়েছে।১১৫ আজ বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা সারাবিশ্বে আপন কৃতিত্বে ছড়িয়ে আছে। সর্বত্র তারা বিশ্বমানের ফলাফল করছে। আবার অনেকে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পাওয়ার গৌরবও অর্জন করছে। বাংলাদেশের অনেক ছেলেমেয়েই এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে লেখাপড়া করছে। তারা নিজ দেশের

সঙ্গে সঙ্গে ওইসব দেশের উন্নয়নেও অবদান রাখছে। এতে করে বাংলাদেশের মেধাবীগণ বিরল প্রশংসা ও ভূয়সী সম্মানে ভূষিত হচ্ছে।

আজ আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছিÑ তা শুধু গৌরবোজ্জ্বল নয়, বিস্ময়কর উত্থানের অবিরাম ইতিহাস। এটি একদিনে অর্জিত হয়নি এবং তা সম্ভবও নয়। এখানে আসার জন্য আমাদের ৪৫ বছর হাঁটতে হয়েছে, পরিশ্রম করতে হয়েছে অবিরল, ঐকান্তিক। অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, এটা আমাদের গন্তব্যস্থল নয়, গন্তব্যস্থলের লক্ষ্যে ধাবিত হওয়ার সূচনা মাত্র। আমাদের আরও লক্ষ্য অর্জনে অনেক দূর যেতে হবে। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে, আমরা আজ যে পথে হাঁটছি তা আমাদের নেতৃত্ব ও দেশের জনগণের দূরদৃষ্টির কারণে সম্ভব হয়েছে। তাঁরা এই দেশকে মুক্ত করে গেছেন, একটি জাতিকে পূর্ণ অবয়ব দিয়েছেন আপন মহিমার নিপুণ সৌকর্যে। তাঁরা দেখিয়ে গেছেন পরাধীনতার গ্লানি কেমন করে ভাঙতে হয়, কেমন করে একটি পরাধীন জাতি নিজের চেষ্টায় নগণ্য উপাদান নিয়েও বিজয়ের অসামান্য গৌরবের বিশালতায় মিশে যেতে পারে। আমাদের অনেক বাধা-বিঘœ ছিল; জাতি হিসাবে আমাদের স্বকীয় কোনো অস্তিত্ব ছিল না, সেটাও কাটানো সম্ভব হয়েছে সাহসী জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও সাহসী নেতৃত্বের জন্য। জনগণের বিরামহীন পরিশ্রমের কারণে দেশের মানুষ সুখী ও সমৃদ্ধিশালী হতে শুরু করে। তাঁদের ভূমিকার পাশাপাশি আমাদের নেতৃবৃন্দের অবদানও কম নয়। নেতৃবৃন্দের দূরদর্শী চিন্তা-চেতনা দেশের উন্নয়নে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখছে। এই কারণে বলা যায়, জাতি গঠনে আমাদের জনগণ ও নেতৃবৃন্দ সফল।

প্রাথমিক শিক্ষা

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রধানত চারটি ধারায় বিভক্ত। সেগুলো হচ্ছে : সাধারণ শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা ও ক্যাডেট শিক্ষা। সাধারণ শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, অনিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখা প্রভৃতি। ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুল তথা ব্রিটিশ কারিকুলাম, এনসিটিবি কারিকুলাম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতিষ্ঠানসমূহ হচ্ছে- আলিয়া মাদ্রাসা ও কওমি মাদ্রাসা।১১৬

একটি শিশুকে তার অভিভাবক পাঠদানের জন্য কোন ধারায় নিয়ে যাবেনÑ তা সবসময় ঐ অভিভাবকের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। অপেক্ষাকৃত বেশি বেতনের স্কুলগুলোতে ভালো মানের শিক্ষা কিনতে পাওয়া যায়। পিতা যদি সামর্থ্যবান না-হন সন্তানের জন্য অল্প-বেতনের স্কুল থেকে সস্তায় নিম্নমানের শিক্ষা ক্রয় করতে বাধ্য হন। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের ১০ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকা’ গ্রামের তালিকা চূড়ান্ত করে। এতে দেখা যায়, দেশের ১৬ হাজার ১৪২টি গ্রামে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই।১১৭

প্রাথমিক স্তরে এখন মোট শিক্ষার্থী ১ কোটি ৬৩ লাখ ১২ হাজার ৭ জন। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল ৩৭ লাখের বেশি শিশু। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ২৬ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। এই হিসাবে পঞ্চম শ্রেণিতে আসা পর্যন্ত ঝরে পড়েছে প্রায় সাড়ে ১১ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। সরকারি হিসাবে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগেই প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ছে।১১৮ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর পরিচালিত ২০১১ খ্রিস্টাব্দের জরিপ অনুযায়ী, ২০০৬ ও ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিশুদের ঝরে পড়ার হার ছিল ৫০.৫ শতাংশ, ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে ৪৯.৩ এবং ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে ৪৫.১ শতাংশ। ২০১০ খ্রিস্টাব্দে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ঝরে পড়ার হার ৩৯.৮ শতাংশ। ঢাকাসহ শহরগুলোর বস্তিতে নগরবাসীর অন্তত ৪০% দরিদ্র মানুষ বাস করে। তাদের অধিকাংশ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত। ৭ থেকে ১৪ বছরের ১ কোটি ৫০ লক্ষ শিশু স্কুলে না গিয়ে পরিবারকে সাহায্য করতে শ্রমে নিয়োজিত।১১৯

মাধ্যমিক শিক্ষা

নতুন শিক্ষানীতিতে মাধ্যমিক শিক্ষাকে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে। দেশে মাধ্যমিক স্তরে ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, একটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও একটি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডসহ মোট ১০টি শিক্ষা বোর্ড রয়েছে। শিক্ষা বোর্ডগুলোর বাইরেও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয় এসএসসি এবং এইচএসসি প্রোগ্রাম। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডগুলোর সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় না কিংবা ফলও প্রকাশিত হয় না।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেয় ২১ লাখ ৮৫ হাজার ৭৪৭ জন। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৪ লাখ ২০ হাজার ৫৭ জন শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ৭ লাখ ৬৫ হাজার ৬৯০ জন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করার আগেই ঝরে গেছে। এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৭৩ জন। অর্থাৎ ৫ লাখ ২ হাজার ৩৮৪ জন শিক্ষার্থী শুধু দশম শ্রেণি ও দ্বাদশ শ্রেণি এই দুই বছরের মধ্যে ঝরে গেছে। কাজেই শুধু মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়া মোট শিক্ষার্থীর পরিমাণ ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪ জন। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে ঝরে পড়ার মূল কারণটি আর্থিক।১২০

বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ নানা কারণে কমে যাচ্ছে। গত আট বছরে বিজ্ঞান শিক্ষার্থী কমার হার ৩১.৩৩ শতাংশ। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে এসএসসি পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর ৪১.৩৫ শতাংশ ছিল বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী, ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে এ হার দাঁড়িয়েছিল ২৫.৪০ শতাংশ এবং ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে ২৩.৭৬ শতাংশ। বিজ্ঞান পড়ছে এমন শতকরা ৫৮ জন শিক্ষার্থী মনে করে, বিজ্ঞান বিষয়ে পড়তে খরচ বেশি। শতকরা ৬৫ জন মনে করে বিজ্ঞানে বিষয়ভিত্তিক প্রয়োজনীয় শিক্ষক নেই, ৬৯ জন মনে করে বিজ্ঞানে পড়লে প্রাইভেট পড়তে হয় এবং ৫৭ জন প্রাইভেট পড়ে, ৬৫ জন মনে করে বিজ্ঞানের জন্য আলাদা গবেষণাগার নেই, ৫৮ জন মনে করে ব্যবহারিক ক্লাসে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই, ৯৪ জন বলেছে কোনো বিজ্ঞান মেলা হয় না।১২১

মাদ্রাসা শিক্ষা

দেশে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রধান দুটো ধারা রয়েছে। তা হচ্ছে : আলিয়া ও কওমি। এছাড়া রয়েছে নূরানী মাদ্রাসা, ফোরকানিয়া মাদ্রাসা ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা ইত্যাদি। মাদ্রাসা বোর্ডের ২০১২ খ্রিস্টাব্দের দাখিল পরীক্ষায় সারা দেশ থেকে ২ লাখ ৭৩ হাজার ৬৫ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে।১২২

কওমি মাদ্রাসাগুলো স্বীকৃত নয়। যদিও বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে দেশের মাধ্যমিক স্তরে পড়ুয়া শিক্ষার্থীর অন্তত ২.২ শতাংশ কওমি মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করে। এই ধারার মাদ্রাসাগুলো বিভিন্ন কওমি বোর্ড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এসব মাদ্রাসাগুলোর পাঠ্যক্রমে একটির সঙ্গে আরেকটির বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে অনেকগুলো মাদ্রাসায় বাংলা, বিজ্ঞান, অঙ্ক, ইংরেজি ইত্যাদি পড়ানো হয় না। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে দাখিল ও আলিম স্তরকে যথাক্রমে এসএসসি ও এইচএসসির সমমান দেওয়া হয়। তারপর ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে ফাজিল ও কামিল স্তরকে যথাক্রমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সমমান প্রদান করা হয়।১২৩

কারিগরি শিক্ষা

কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের হিসাব মতে, দেশে এখন সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আছে ৪৯টি, ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট আছে ৬৪টি। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বস্ত্র প্রকৌশল ও কৃষি ইনস্টিটিউটসহ মোট ২৫১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় এ বছর মোট ৯১ হাজার ১৭০ জন পরীক্ষা দিয়েছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে উপেক্ষিত কারিগরি শিক্ষা। এ শিক্ষায় শিক্ষিতের হার মাত্র ৩ শতাংশ। অথচ উন্নত দেশগুলোতে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিতের হার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ।১২৪ কারিগরি শিক্ষায় অন্যতম সমস্যা হচ্ছে তীব্র শিক্ষক সংকট এবং নিম্নমানের শিক্ষাব্যবস্থা। কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের সূত্রমতে, স্থায়ী-অস্থায়ী মিলিয়ে বর্তমানে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতেই ৪৬ শতাংশ শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। অন্যদিকে ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলোতে শিক্ষকদের শূন্যপদ ৬৪ শতাংশ। লোকবল সংকটও চরম। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদেও ৫৬ শতাংশ খালি রয়েছে।১২৫ বিজ্ঞানশিক্ষার সমান্তরালভাবে কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ছাড়া আধুনিক বিশ্বের সাথে প্রতিযোগিতায় আমরা টিকে থাকতে পারব না। কিন্তু এই শিক্ষা নিয়ে এক ধরনের অবহেলা দৃশ্যমান। মেধাবীদের আকৃষ্ট করার জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। অভিভাবক মহলে বরং এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান।

উচ্চশিক্ষা

বাংলাদেশে বর্তমানে ৩০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আসনসংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন বিষয়ে আসন সর্বমোট ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৮৫৪টি। ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আসনসংখ্যা ১ লাখ ১৪ হাজার ৫১২টি।১২৬ দেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও মাদ্রাসা সব মিলিয়ে উচ্চশিক্ষায় আসনসংখ্যা ৫ লাখের কিছু বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল কাজ হলো- শিক্ষা, গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা এবং মানবজাতির কল্যাণে তার বিস্তার ঘটানো। কিন্তু সে কাজ এবং শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকাংশে ব্যর্থ হচ্ছে। এর কারণগুলোর মধ্যে- গবেষণা কার্যক্রমের স্বল্পতা, ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ-প্রক্রিয়া, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অসম অনুপাত, শিক্ষকদের কম মনোযোগ, গবেষণা ও শিক্ষা আনুষঙ্গিক খাতে অল্প বরাদ্দ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।১২৭

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

উচ্চশিক্ষার প্রসারে ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাবে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ৪৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ রয়েছে ২ হাজার ২১৬টি। প্রথম বর্ষে ভর্তি হতে পারে প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার শিক্ষার্থী। একসঙ্গে প্রায় ১২ লাখ শিক্ষার্থী এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। এ বিশ্ববিদ্যালয় দেশের উচ্চশিক্ষার শতকরা ৮০ ভাগ দায়িত্ব পালন করে থাকে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন জট একটি গুরুতর সমস্যা। এখান থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করতে একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মূল্যবান ৭/৮টি বছর চলে যায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলোর মধ্যে সরকারি কলেজ রয়েছে মাত্র ২৫৩টি। বাকি কলেজগুলো বেসরকারি অধিভুক্ত কলেজ।১২৮

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়

উচ্চশিক্ষার চাহিদা আর শিক্ষার্থীর অনুপাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কম। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এ যুক্তির ভিত্তিতে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে সরকার জারি করেছিল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় আইন। উচ্চশিক্ষার চাহিদা ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটের বিষয়টি অত্যন্ত সঠিক। কিন্তু এর সমাধান কোনোভাবেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির মধ্য দিয়ে সম্ভব নয়, সেটি এখন প্রমাণিত সত্য। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনেরও এখন সে বোধোদয় ঘটেছে বলে মনে হয়। সম্প্রতি উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ইউজিসি বার্ষিক রিপোর্টে যা উল্লেখ করেছে তা সুখকর নয়।

শিক্ষা-বাজেট

২০০৮-০৯ অর্থবছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ৮৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে শিক্ষা-আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় ধরা হয় মাত্র ১১০ কোটি টাকা। আর প্রকৃত ব্যয় হয়েছে তার চেয়েও কম, ৯৬ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার বেশিরভাগ ব্যয় হয় শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে। ওই অর্থবছরের মোট বরাদ্দের ৭২ ভাগ ব্যয় হয়েছিল এ খাতে। আর শিক্ষা-আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় করা হয়েছে মাত্র ১১ ভাগ। তার ওপর ২০০৭-০৮ অর্থবছরে শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তি ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে তার সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতকে যোগ করা হয়। এতে প্রকৃত অর্থে শিক্ষা-বাজেট হয় আরও সংকুচিত ও সীমিত।১২৯

১৯৭২ খ্রিস্টাব্দের জাতীয় বাজেটের ২১ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ করা হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে তা কমে ২০১২-১৩ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশে। ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে দারিদ্র বিমোচন কৌশলপত্রে শিক্ষাখাতে জাতীয় আয়ের ৫ শতাংশ বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ কৌশলপত্রে ২০১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ২৫ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছিল।১৩০ অপরদিকে ইউনেস্কোর প্রস্তাব অনুযায়ী শিক্ষাখাতে জাতীয় আয়ের ৮ শতাংশ অথবা বাজেটের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকা উচিত।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ সবচেয়ে লাভজনক এবং নিরাপদ রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ, ডেভিড রিকার্ডো এবং মার্শালের মতে, শিক্ষা এমন একটি খাত যার কাজ হলো দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি করে পুঁজির সঞ্চালন ঘটানো। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে একটি জাতিকে অতিসহজে আধুনিকতার সব উপাদান এবং উন্নয়নের সব কৌশলে বিভূষিত করা যায়। শিক্ষার অর্থনীতি নিয়ে মৌলিক গবেষণায় অর্থনীতিবিদ আর্থার শুল্জ্ ও রবার্ট সলো দেখিয়েছেন, প্রাথমিক শিক্ষায় বিনিয়োগ করলে সম্পদের সুফল ফেরত আসে ৩৫ শতাংশ, মাধ্যমিক শিক্ষায় ২০ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষায় ১১ শতাংশ।১৩১

শিক্ষার সঙ্গে মানুষের অর্থনীতি, রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজেকে আবিষ্কার করতে শেখে। তার শ্রেণিচেতনার বিকাশ সাধিত হয়। ফলে, সে তার অবস্থানকেও সচেতনভাবে পরিবর্তন করতে চায়। সে প্রভাবিত করে বাকিদের। যেটি জন্ম দেয় একটি উন্নত রাজনীতিক সংস্কৃতির।

১৩২ – ১৩৩

৪০. আমি, পদ্মা সেতু ও বিশ্বব্যাংক

সৈয়দ আবুল হোসেন: ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে আমি স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাই। পাসপোর্ট সংক্রান্ত একটি অন্যায্য বিতর্কের কারণে আমি মন্ত্রীর পদ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পদত্যাগ করেছিলাম। ‘অন্যায্য’ বলার যথেষ্ট যুক্তি আছে। যে-কারণে আমার পদত্যাগ সে জন্য আমি মোটেও দায়ী ছিলাম না। আমার একজন ব্যক্তিগত কর্মচারীর ভুলের কারণে অবাঞ্ছিত ঘটনাটির

উদ্ভব হয়। এ ঘটনায় পত্র-পত্রিকা হুমড়ি খেয়ে পড়ে, আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রতিবেদন ছাপা হয়। আমি পদত্যাগ না করে স্বপদে বহাল থাকতে পারতাম। অনেকে এর চেয়ে জঘন্য কাজ করেও নির্বিকার থাকেন। আত্মসম্মানে আঘাত লাগায় পদত্যাগ করে নিজের নির্লোভ দৃষ্টিভঙ্গি ও সৎ মানসিকতার প্রমাণ দিয়েছিলাম। বাংলাদেশে এমন আর কেউ কি করেছেন? কেউ আমার পদত্যাগে আমার নির্লোভ দৃষ্টিভঙ্গি ও সৎ মানসিকতার প্রতিফলনের প্রশংসা করেননি।

যোগাযোগমন্ত্রী থাকাকালীন পদ্মা সেতু নিয়েও আমি অন্যায্য বিতর্কের সম্মুখীন হই। অনেকে প্রশ্ন করেন, সে-বারের মতো এবারও পদত্যাগ করিনি কেন? তাঁদের অভিমত- এবার তো পত্র-পত্রিকায় আরও বেশি লেখা হয়েছে এবং ঘটনাটিও গুরুতর। গতবার আমি ভুল না করলেও আমার ব্যক্তিগত কর্মচারী ভুল করেছিলেন। ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসাবে দায়টা পরোক্ষ হলেও আমার ওপর বর্তায়। সে সময় আমি নিজের বিবেচনাপ্রসূত সৌকর্যকে সমুজ্জ্বল রাখার স্বার্থে ব্যক্তিত্ব ও সততার প্রতিভূ হিসেবে পদত্যাগ করেছিলাম। মনে করেছিলাম, বোদ্ধাজন আমার পদত্যাগকে বিরল ঘটনা হিসাবে দেখবেন। প্রশংসা করবেন। তা করেননি। পদত্যাগ না করলেও দোষ, আবার করলেও দোষ।

পদ্মা সেতু নিয়ে উদ্ভূত বিতর্ক সম্পূর্ণ অন্যরকম। এবার আমি কিংবা আমার কোনো ব্যক্তিগত কর্মচারী কোনো ভুল করেননি, অন্যায় করেননি। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পদ্মা সেতু সংক্রান্ত কোনো দুর্নীতির সঙ্গে আমি বা আমার কোনো কর্মচারী জড়িত ছিল না। সৎ বা স্বচ্ছতার অধিকারী কেউ আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেনি। এমন একটি প্রতিষ্ঠান আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে, যেটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে তৃতীয় বিশ্বের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণে অভ্যস্ত। সে প্রতিষ্ঠানটি আমার কোনো কথা শুনতে চায়নি, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের যৌক্তিকতা যাচাইয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার বিনিয়োগ, ব্যবস্থাপনা, ঋণপ্রদান, উদ্দেশ্য- সব প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ দ্বারা চালিত। এখানে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের কথা বলার অধিকার নেই বললেই চলে।

প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন স্বচ্ছতা, ঔদার্য, মহত্ত্ব, মূল্যবোধ এবং নির্লোভতার কারণে পদত্যাগ করলেও তা যথাযথভাবে বিবেচিত হয়নি। আমার পদত্যাগকে প্রশংসার চোখে দেখা হয়নি। কিছু কিছু পত্রিকা পদত্যাগের অন্তর্নিহিত মননশীলতাকে অবমূল্যায়ন করে অমর্যাদাকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আমার অনিমেষ অভিলাষ প্রশংসার পরিবর্তে উপহাসে কলঙ্কিত হয়েছে। পদত্যাগ করলে বলা হয়- দোষ না করলে পদত্যাগ করল কেন? পদত্যাগ না করলে বলা হয় : এত লোভী কেন? এটি এক ধরনের নিষ্ঠুরতা, ক্রুর পরিহাস। আমি মন্ত্রী হওয়ার পর একদিনও ভালোভাবে ঘুমোতে পারিনি। সারাদিন, সারারাত অর্পিত দায়িত্ব আমার ওপর কর্তব্যের বোঝা হয়ে আমাকে তাড়িত করেছে। আমি নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলাম দেশের জন্য; অর্পিত দায়িত্ব সততার সাথে পরিপালনের জন্য। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা যে-দেশের সংস্কৃতি, সে-দেশের মানুষের ভালো দিকগুলো বিকশিত হওয়ার সকল পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। উপযুক্ত পরিবেশ ছাড়া নান্দনিকতার বিকাশ সম্ভব নয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের মোবাইল আর মেইল নম্বর জনসমক্ষে প্রচার করে যে মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছেন তা পৃথিবীতে বিরল। অথচ এটাকে বিরোধী দলের কিছু নেতা এবং গুটিকয়েক বুদ্ধিজীবী প্রতারণা আখ্যায়িত করেছিলেন। যাঁরা এমন মন্তব্য করেন তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও ছিলেন। তিনি মন্ত্রীও হয়েছিলেন। তাঁর মতো একজন লোকের ঠোঁট-জিহ্বা যদি এমন অশালীন শব্দ উচ্চারণ করতে পারেনÑ তাহলে অন্যদের ক্ষেত্রে কী হতে পারে বলাই বাহুল্য। যে দেশে ক্ষমাকে দুর্বলতা, মহত্ত্বকে ভয় হিসাবে উপহাস করা হয়, সে দেশে উদারতা আর মহত্ত্ব কীভাবে বিকশিত হবে? কীভাবে বিস্তৃত হবে মানবীয় গুণাবলির নান্দনিক সৌরভ? কীভাবে প্রসারিত হবে সততার জন্য প্রয়োজনীয় সাহস! তাহলে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে হলো কেন?

আর্থিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনীতিক স্বাধীনতা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। কোনো ঋণগ্রহীতার পক্ষে কখনও স্বাধীনভাবে স্বীয় উন্নয়নে নিবেদিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। ঋণচুক্তিতে কোনো দেশকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার অনুুকূল কোনো সুযোগ রাখা হয় না।

পদত্যাগ করতে হলো কথাটা ঠিক নয়। আমাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করতে বলেননি। আমি নিজে পদত্যাগ করেছি। বিশেষ করে, আমার পরিবারের সদস্যবর্গ এমন একটি অবাঞ্ছিত ও বিব্রতকর অবস্থা মেনে নিতে পারছিল না। বিশ্বব্যাংক প্রথমে বলেছিল, আমাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দিলে পদ্মা সেতুর ঋণ অবমুক্ত করবে। সরিয়ে দেওয়া হলো। তারপরও ঋণ অবমুক্ত করা হলো না কেন?

এবার দাবি তুলল আমাকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হবে। নইলে ঋণ দেবে না, পদ্মা সেতু প্রকল্প আটকে থাকবে। পদ্মা সেতু ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্ন। আমার জীবনের চেয়ে অনেক বড়। অনেক মানুষ দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীন করার জন্য ত্রিশ লক্ষ লোক জীবন দিয়েছেন। দেশের জন্য জীবন দেওয়ার চেয়ে কৃতিত্ব আর নেই। তাই বলে কি যুদ্ধক্ষেত্রে সবাইকে মরে যেতে হবে? তাহলে জয় আনবে কে? সবাই শাহাদাতবরণ করলে তো স্বাধীনতা আসত না। লড়ে মরাটাই হচ্ছে বাহাদুরি। শত্রু আমাকে মরে যেতে বলল আর আমি শাহাদাতের মর্যাদা নিয়ে প্রাণত্যাগ করব- এটি দেশপ্রেম নয়, পালিয়ে বেড়ানো; বুদ্ধিমত্তা নয়, মূঢ়তা। যুদ্ধক্ষেত্রে একজন সৈনিক প্রাণ দিতে পারেন, আমি আবুল হোসেন পদত্যাগ করতে পারব না; এমনটি হয় না। আমি পদত্যাগ করেছি চ্যালেঞ্জ দিয়ে। বজ্রকণ্ঠে বলেছি- পদ্মা সেতু নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তবু পদত্যাগ করেছি। যদি আমার পদত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বব্যাংক ঋণ দেয়! পদ্মা সেতু হয়!! ১৬ কোটি মানুষের স্বপ্ন সফল হয়।

যার মধ্যে বিবেচনা-বোধ নেই, সে কখনও ভালো হতে পারে না। যে ভালো নয়, সে কখনও সত্য কথা বলতে পারে না। আমি- একজন ব্যক্তির জন্য বিশ্বব্যাংক ১৬ কোটি মানুষকে কষ্ট দিয়েছে, এটি কতটুকু গ্রহণীয় তা বিবেচনার দাবি রাখে। এখানে ব্যক্তিবিশেষের দুর্নীতি কোনো নিয়ামক ছিল না। তা যদি হতো, তাহলে ১৬ কোটি মানুষকে শাস্তি দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে যাবে কেন? বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বহাল রেখেও দুর্নীতির বিষয়টা খতিয়ে দেখতে পারত। আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তি দেওয়া যেত। এ জন্য পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল তো উদোর পি-ি বুধোর ঘাড়ে চড়ানোর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

আমি তিন বছর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম। আমার সময়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে যতগুলো প্রকল্প পাস হয়েছে বিগত একশ’ বছরেও কিংবা আগামী পঞ্চাশ বছরেও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে পরিমাণ ও গুণগত বিবেচনায় অনুরূপ সংখ্যক প্রকল্প গ্রহণ করা সম্ভব হবে না। এটি আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি। এমনটি সম্ভব হয়েছেÑ আমার কঠোর শ্রম, আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাব, আন্তরিক নিষ্ঠা, অমানুষিক শ্রম, লৌহকঠিন সততা আর বিচক্ষণতার কারণে। কাজের ক্ষেত্রে আমি কর্মী। মন্ত্রী হিসাবে নিজেকে কখনও দেখিনি। কারও সঙ্গে দুর্ব্যবহার করিনি। সরকারি চাকরিজীবী কর্মস্থলে আসার সময় মনটা বাসায় রেখে আসে না। আমি এটি অনুভব করি। তাই সবাইকে ভালবাসা দিয়ে কাজ আদায় করেছি। অনুকূল সাড়া পেয়েছি। কাউকে চড় মারতে হয়নি।

আমি বাংলাদেশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি। ষড়যন্ত্র, পরশ্রীকাতরতা আমার নিষ্ঠা আর সরলতাকে জয়ী হতে দেয়নি। বঙ্গবন্ধুকেও এমন ষড়যন্ত্রের কারণে শাহাদাতবরণ করতে হয়েছে, নিজের দলের বিশ্বস্ত লোকের কাছে।

আমাদের অনেকের কাছে দেশের চেয়ে দল, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়। আমার জন্য পদ্মা সেতু হয়নি, এটার চেয়ে আমার বিরুদ্ধে আনীত তথাকথিত দুর্নীতিটাই সবাই বড় করে দেখেছে। রাস্তাঘাটেও এমন দৃশ্য প্রায় দেখা যায়। দুর্ঘটনায় কাতর লোকটি মৃত্যুযন্ত্রণায় লাফাচ্ছে; তার দিকে কারও খেয়াল নেই। জনগণ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কে তাকে নিয়ে হুল্লোড়ে মেতে ওঠে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এমনটি দেখা যায় না। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটি ঘটেছে। আমার বিরুদ্ধে আনীত তথাকথিত দুর্নীতি নিয়ে আমার বিরুদ্ধে যা লেখালেখি হয়েছেÑ পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের জন্য তার সহস্রভাগ লেখাও পত্রিকায় আসেনি।

আমি যদি সামান্য দুর্নীতি করতাম তাহলে এতগুলো অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে কি টিকতে পারতাম? সবাই বলছে দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু কেউ দেখাতে পারেনি। সবার টার্গেট ছিলাম আমি। অযথা কেন একজন মানুষের ওপর এমন দোষারোপ? এটি কি দুর্নীতি নয়? অথচ আমি পদ্মা সেতু কেন, কোনো বিষয়ে কখনও দুর্নীতির আশ্রয় নিইনি।

জনগণকে আমার বিরুদ্ধে যেভাবে উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়েছেÑ পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য সেভাবে উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করা হলে, এতদিনে পদ্মা সেতু পুরোটাই হয়ে যেত। এসব কারা করেছে? কেন করেছে? বুদ্ধিজীবীরা। যারা দেশের মাথা বলে পরিচিত। মাথা যদি টলে যায়, তাহলে শরীর কীভাবে ঠিক থাকে!

যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবছর সহস্র কোটি টাকার কাজ হয়। কোনো ঠিকাদার বলতে পারবেন না আমি দায়িত্বকালীন কখনও প্রকল্প বাস্তবায়নে সামান্য নিয়মনীতি লঙ্ঘন করেছি। কোনো অনৈতিক সুবিধা দাবি করেছি। মন্ত্রী থাকাকালীন আমি আমার ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সাকোর সাথেও জড়িত ছিলাম না।

বিশ্বব্যাংকের মতো দুনিয়া কাঁপানো একটি প্রচ- শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশের প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া, বিরোধী দল, বুদ্ধিজীবী- সবাই আমার ওপর খড়গহস্ত হয়ে উঠেছিল। তাদের সম্মিলিত দাবি ছিল- পদ্মা সেতু নিয়ে কথিত দুর্নীতির সঙ্গে আমি জড়িত। এজন্য বিভিন্ন মহল থেকে আমার শাস্তি দাবি করা হয়েছে। আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য, সরকারকে বিপদে ফেলার জন্য লেখালেখি হয়েছে, কিন্তু পদ্মা সেতু প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে তেমন কারও মাথাব্যথা লক্ষ্য করা যায়নি।

দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকলে যেকোনো সময় আমাকে ধরা যেত, কিন্তু পদ্মা সেতু প্রকল্পকে বাদ দিয়ে শুধু আমাকে নিয়ে উঠেপড়ে লাগা- এটাই প্রমাণ করে যে এখানে আসলে কোনো দুর্নীতি হয়নি। দুর্নীতির অভিযোগ ছিল ঋণচুক্তি বাতিলের একটি অজুহাত মাত্র। আমি যদি সামান্য দুর্নীতি করতাম তাহলে এতগুলো অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে কি টিকতে পারতাম? সবাই বলছে দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু কেউ দেখাতে পারেনি।

সবার টার্গেট ছিলাম আমি। অযথা কেন একজন মানুষের ওপর এমন দোষারোপ? এটি কি দুর্নীতি নয়? অথচ আমি পদ্মা সেতু কেন, কোনো বিষয়ে কখনও দুর্নীতির আশ্রয় নিইনি।

এত কিছুর পরও কেউ দুর্নীতির সামান্যতম প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। এর অর্থ- পদ্মা সেতু নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি। হয়েছে মিথ্যাচার- বিশ্বব্যাংক বেনামি অভিযোগের ভিত্তিতে আমার মতো একজন নিরীহ ব্যক্তির বিরুদ্ধে নৃশংস খড়গ চালিয়েছে। এমন আচরণকে সিলেটে নৃশংস কায়দায় হত্যা-করা শিশু রাজনের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা যায়। বিশ্বব্যাংক, পত্র-পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া আমার বিরুদ্ধে যেভাবে উঠেপড়ে লেগেছে সামান্য দুর্নীতির আভাস পেলেও আমার অস্তিত্ব থাকত না। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে শুধু একটি অভিযোগ- পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে। তাও আবার ভুয়া, কাল্পনিক। পাঠক, জন্মের পূর্বে জীবনধারণ কীভাবে সম্ভব? আমি দুর্নীতি করলে সরকার অবশ্যই আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিত। ব্যক্তিবিশেষের জন্য সরকার দায় নিতে যাবে কেন? আমি এমন প্রভাবশালীও নই যে, প্রধানমন্ত্রী তার দায় নেবেন। আমি কোনো অন্যায় করিনি, আমার কোনো দুর্নীতির প্রমাণ পাননি বলে প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী এবং সরকার সাহসী গলায় বলতে পারছেন- পদ্মা সেতু নির্মাণে কোনো দুর্নীতি হয়নি। যা শেষ পর্যন্ত প্রমাণ হয়েছে।

যোগাযোগমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর পর আমার বিরুদ্ধে কোটি টাকা খরচ করে মন্ত্রীর কক্ষ নির্মাণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। অথচ কক্ষটি নির্মাণ নয়, মেরামত করা হয়েছিল। সেটি মেরামত যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নয়, করেছিল গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। খরচ হয়েছে মাত্র সাত লক্ষ টাকা। অভিযোগ করা হয়েছে আমি কোটি টাকার গাড়ি কিনেছি, অথচ কোনো গাড়িই কেনা হয়নি।

আমি বাংলাদেশের একমাত্র মন্ত্রী, যে একদিনের জন্যও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করিনি। নিজের গাড়ি চড়ে অফিস করেছি। বিদেশি মেহমানদের নিজের খরচে আপ্যায়ন করেছি। তারপরও যদি এমন মিথ্যা খবর ছাপা হয়, তাহলে সংবাদপত্রের গ্রহণযোগ্যতা কীভাবে থাকে! ভূতের গল্প যেমন মানুষ পরম আগ্রহে পড়ে কিন্তু বিশ্বাস করে না, তেমনি কিছু পত্রিকার অবস্থাও অনেকটা সেরূপ। আমিই বাংলাদেশের একমাত্র মন্ত্রী যে গত সাড়ে তিন বছরে মাত্র দুই বার সরকারি খরচে বিদেশ গিয়েছি। তাও ডেলিগেশনের নেতা হিসাবে। তারপরও আমাকে দুর্নীতির দায় নিতে হয়েছে? আমি নিজের অর্জিত বৈধ অর্থ দিয়ে কেনা গাড়িতে চড়ে অফিস করেছি। পত্রিকা প্রতিবেদন ছাপায়- আমি কোটি কোটি টাকা গাড়ি ক্রয়ে ব্যয় করেছি। মন্ত্রীর কথা বাদ দিলাম, অনেক অফিসারও একাধিক গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়ান; স্ত্রী-পুত্র-কন্যারা সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন। আমার পরিবারের কোনো সদস্য কখনও একদিনের জন্যও সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেনি। বিদেশ ভ্রমণে অনেকে কাঁড়ি কাঁড়ি সরকারি অর্থ ব্যয় করেন। আমি রাষ্ট্রীয় কাজেও নিজের অর্থ খরচ করে বিদেশ গিয়েছি। গ্রামের বাড়িতে আমি একটি রেস্ট হাউস করেছি, আমার রুচিমতো। এটি নিয়েও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিরূপ মন্তব্য করা হয়েছে। কিন্তু কেন আমি ঐ রেস্ট হাউসটি করেছি সে বিষয়ে কেউ লেখেননি। লেখেননি আমি এলাকার উন্নয়নের জন্য কত অবদান রেখেছি, লেখেননি শিক্ষা বিস্তারে আমার অবদান কত অনবদ্য। এটি কি দুর্নীতি নয়? এটি কি নিষ্ঠুরতা নয়? এটি কি পরশ্রীকাতরতা নয়?

যে এলাকায় আমি রেস্ট হাউস করেছি, সেখানে জাতীয়করণকৃত শেখ হাসিনা একাডেমী অ্যান্ড উইমেন্স কলেজ, সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমী অ্যান্ড কলেজ ছাড়াও অনেকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ডাসার থানা কার্যালয়ও এখানে অবস্থিত। যেগুলো আমি প্রতিষ্ঠা করেছি, আমার চেষ্টায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। প্রতিদিন দেশ-বিদেশের বহু লোক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দেখার জন্য আসেন। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়াও অনেক লোক এখানে এসেছেন, প্রতিদিন আসছেন। তাঁদের জন্য এমন একটি রেস্ট হাউস প্রয়োজন। অধিকন্তু আমি নিজের অর্থ ব্যয় করেÑ  এ রেস্ট হাউস করেছি। কোনো সরকারি অর্থ ব্যয়ে নয়। প্রতিটি অর্থের বিপরীতে সরকারি কোষাগারে আয়কর দিয়েছি। আমাকে নিয়ে লেখালেখি যতই হোক- বিশ্বব্যাংকের কাল্পনিক অভিযোগ ছাড়া কেউ কখনও দুর্নীতির অভিযোগ আনতে পারেনি। এমনকি আমার শত্রুরাও। পুরো পৃথিবীর মানুষও যদি বলে পৃথিবী চ্যাপ্টা, তবু পৃথিবী গোল। হায় কপাল, দশচক্রে ভগবান ভূত হয়ে যায়।

বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ- পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে কানাডাভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে অবৈধ অর্থ দাবি করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক প্রথম দিকে আমার প্রাক্তন প্রতিষ্ঠান সাকোর কোনো এক কর্মকর্তার জড়িত থাকার ধুয়া তুলে যথাসময়ে তার নাম প্রকাশের দাবিও করেছিল। তখন আমি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে জড়িত ব্যক্তির নাম প্রকাশ করতে বলেছিলাম। বলেছিল যথাসময়ে নাম প্রকাশ করবে। পারেনি। মিথ্যা কখনও প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অতঃপর তারা সে দাবি থেকে সরে আসে।

আমার প্রতিষ্ঠান সাকো কোন অন্যায়, অবৈধ কাজ করেনি, করতে পারে না। সাকো আমার হাতে শ্রম-নিষ্ঠা আর সততায় গড়া একটি প্রতিষ্ঠান। সাকোর সুনাম, সাকোর দৃঢ়তা বিশ্বের যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। আমার প্রতিষ্ঠানের জড়িত থাকার প্রমাণ দিতে না পারায়Ñ মোড় অন্য দিকে পাল্টে দেয়।

দাবি করা হয়, কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তার ডায়রিতে কিছু সাংকেতিক নাম পাওয়া গিয়েছে। কারও খাতায় সাংকেতিক নাম পাওয়া যদি দুর্নীতি প্রমাণের চিহ্ন হয়, তাহলে যে-কেউ যে-কাউকে দুর্নীতিবাজ বানিয়ে নিতে পারে। ডায়েরিতে সাংকেতিক নাম লিখে রাখলেই হলো। আমার ডায়েরিতে আমি যদি কারও নাম লিখে রাখি, তাহলে সে ব্যক্তিকে কি দুর্নীতিবাজ বলা যাবে?

তর্কের খাতিরে পরামর্শক নিয়োগে কোনো দুর্নীতি কিংবা ঘুষ আদান-প্রদানের কথিত দাবি সত্য বলে ধরে নেওয়া হলেওÑ এর সঙ্গে আমার জড়িত থাকার কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ আমি আমাকে জানি। আমি দুর্নীতি করেছি কিনা তা আমার চেয়ে আর বেশি কেউ জানে না। পৃথিবীর সবাই যদি বলে আমি দুর্নীতি করেছি- তাও সত্য হবে না, যদি আমি দুর্নীতি না করি। আবারও বলছি, এক্ষেত্রে আমার দুর্নীতি করারও কোনো সুযোগ ছিল না।

কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি জানে, পরামর্শক নিয়োগে আমার বিন্দুমাত্র ভূমিকা ছিল না। আমি প্রভাবিত করতে পারিÑ এমন কোনো ব্যক্তি পরামর্শক কমিটিতে ছিলেন না। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হয়েছিল। প্যানেলের দশ জন বিশেষজ্ঞের মধ্যে তিনজন জাপানি, একজন হল্যান্ডের, একজন নরওয়ের এবং বাকি পাঁচজন ছিলেন বাংলাদেশি।

ডিজাইন পরামর্শক সংস্থা যে প্রতিবেদনগুলো জমা দিয়েছিলÑ তা পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞ প্যানেল তাদের মতামত দিয়েছিল। সে মতামতের ভিত্তিতে পদ্মা সেতুর ডিজাইন চূড়ান্ত করা হয়। প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য সরকার আর-একটি কমিটি গঠন করে, যার সুপারিশ বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা অনুমোদন করেছিল। সুতরাং এটি নিশ্চিত যে, পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগের ব্যাপারে আমার কিংবা আমার মন্ত্রণালয়ের অন্য কারও প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ ছিল না।

বিশ্বব্যাংক পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করার পর, হঠাৎ দুর্নীতির কথা তুলে পদ্মা সেতুর প্রত্যাশাকে ধূলিস্যাৎ করে দেয়। এর কারণ হচ্ছে- বিশ্বব্যাংকের কিছু তদবিরের বিরুদ্ধে পরামর্শক কমিটির অবস্থান। বিশ্বব্যাংক একটি চায়না কোম্পানিকে প্রাক্-যোগ্য ঘোষণার জন্য চাপ প্রয়োগ করে আসছিল। চায়না কোম্পানিটি প্রাক্-যোগ্য বিবেচিত না হওয়ায় বিশ্বব্যাংক ক্ষেপে যায়। কোম্পানিটিকে প্রাক্-যোগ্য করার জন্য সরকারের ওপর প্রচ- চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করে। আমাকেও এ বিষয়ে প্রভাব খাটানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিল। আমি জানিয়েছিলাম, এ বিষয়ে আমার কিছু করার নেই। কমিটিই সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারী।

বিশ্বব্যাংকের তথাকথিত দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগকে সবাই বড় করে দেখল; আমার আর বাংলাদেশের অবস্থানকে বাঙালি হয়েও অধিকাংশ বাঙালি বুদ্ধিজীবী আমলে নিল না। এটি আমাদের সাদা-চামড়া প্রীতি আর পুঁজিবাদ-পুজোর পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সাদা চামড়ার লোক যেন কোনো অপরাধ করতে পারে না?

তারপরও বিশ্বব্যাংক অযোগ্য বিবেচিত চায়না কোম্পানিটিকে প্রাক্-যোগ্য করার জন্য সরকার ও কমিটির ওপর চাপ দিয়ে যেতে থাকে। পরামর্শক নির্বাচন কমিটি বার বার যাচাই করেও চায়না কোম্পানিটিকে যোগ্য বলার কোনো হেতু খুঁজে পায়নি। বরং প্রমাণিত হয়, কোম্পানিটি ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ ও জাল কাগজপত্র দিয়ে প্রস্তাব জমা দিয়েছিল। একটি ভুয়া কোম্পানির স্বপক্ষে বিশ্বব্যাংকের ওকালতি এবং তা সরকার কর্তৃক দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়Ñ বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশ্য বিরোধ। তার সঙ্গে ইন্ধন জোগায় কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির ষড়যন্ত্র এবং মিডিয়ার মিথ্যা বিবরণ ও অপপ্রচার।  যে সকল সাংবাদিক মিথ্যা লেখেন, যে জন্যই এমন করা হোক না কেন, পক্ষান্তরে নিজেদেরই ক্ষতি হয়, নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন। আমার বিরুদ্ধে পত্রিকায় যা লেখা হয়েছিল, তার পুরোটাই ছিল মিথ্যা। এসব লেখা যে মিথ্যা তা প্রমাণের চ্যালেঞ্জ আমি প্রকাশ্যে দিয়েছিলাম। কিন্তু পরাজিত হবে জেনেÑ কেউ এগিয়ে আসেননি। তারা জানতেন, আমার বিরুদ্ধে যা বলা হয়েছে সব মিথ্যা ও বানোয়াট।

সরকার বিশ্বব্যাংকের অন্যায় দাবির কাছে মাথা নত না করায়, আমি বিশ্বব্যাংকের অনৈতিক দাবির অনুকূলে সাড়া দিতে অপারগতা প্রকাশ করায়, প্রতিশোধস্বরূপ দুর্নীতির কথা তোলে। দরিদ্র দেশগুলোর ওপর বিশ্বব্যাংকের এমন অনৈতিক চাপ কোনো নতুন বিষয় নয়। ‘গরিবের বৌ সবার ভাবী’Ñ প্রবাদের ন্যায় সুযোগ পেলে সবাই ঠোকা মারে। এ অবস্থায় প্রভাবশালীর অনৈতিক কার্যকে আমলে না নিয়ে গরিবের বৌটাকে সবাই দুষে। বিশ্বব্যাংকের তথাকথিত দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগকে সবাই বড় করে দেখল; আমার আর বাংলাদেশের অবস্থানকে বাঙালি হয়েও অধিকাংশ বাঙালি বুদ্ধিজীবী আমলে নিল না। এটি আমাদের সাদা-চামড়া প্রীতি আর পুঁজিবাদ-পুজোর পরিচয়কে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সাদা চামড়ার লোক যেন কোনো অপরাধ করতে পারে না?

একটি পত্রিকায় ‘ব্যক্তির দায় প্রজাতন্ত্র বইবে কেন’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন দেখলাম। তাতে কী লেখা হয়েছে পুরো পড়িনি। তবে কয়েকজন জানালেনÑ আমাকে লক্ষ্য করে লেখা হয়েছে। শিরোনাম দেখে লেখকের দূরদর্শিতার আর বিচক্ষণতার ঘাটতি দেখে হাসি পেয়েছিল। প্রজাতন্ত্রের প্রধান কর্তব্য প্রজাকে রক্ষা করা। কোনো প্রজা যাতে অন্যায়-অবিচার কিংবা প্রভাবশালী কারও হেনস্তার শিকার না হয়, তা দেখার দায়িত্ব প্রজাতন্ত্রের। যে প্রজাতন্ত্র ব্যক্তিকে রক্ষা করতে পারবে না সে কীভাবে রাষ্ট্রকে রক্ষা করবে? এ বিষয়টি ওই লেখকের বোধে ছিল না হয়তো।

একাত্তরে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানিরা দুর্যোগ সৃষ্টি করেছিল বলে স্বাধীনতার সুযোগ এসেছে। আমরা প্রেরণা পেয়েছিলাম ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল আমাদের আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাপানের মতো, সিঙ্গাপুরের মতো, মালয়েশিয়ার মতো আর্থিকভাবে সার্বভৗম হবার প্রেরণায় উজ্জীবিত হওয়ার বিরল সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।

অত্যন্ত গৌরবের সাথে বলতে পারি, বর্তমান সরকার বিশ্বব্যাংকের অন্যায় আবদার আর আচরণের বিরুদ্ধে প্রবল সাহসে প্রতিবাদমুখর ছিল। একাত্তরে বাংলাদেশের জনগণ বিশ্বব্যাংকের চেয়ে বড় শক্তিকে প্রতিহত করেছিল। রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য অন্যায়-অত্যাচার হতে নিরীহ, সৎ ও সজ্জন ব্যক্তিকে রক্ষা করা, হোক সে একজন কিংবা একশ জন। একশ জন লোক একজন লোককে হত্যা করেছে বলে কি অপরাধীগণ ক্ষমা পেয়ে যাবে!

অনেকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের পদ্মা সেতু প্রকল্প হতে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একটি দুর্যোগ। তা বটে- কিন্তু দুর্যোগ ছাড়া সুযোগ সৃষ্টি হয় না। তাই দুর্যোগ আর সুযোগ সব সময় রাত-দিনের মতো পর্যায়ক্রমিক পরিবন্ধন। একাত্তরে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানিরা দুর্যোগ সৃষ্টি করেছিল বলে স্বাধীনতার সুযোগ এসেছে। আমরা প্রেরণা পেয়েছিলাম ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল আমাদের আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাপানের মতো, সিঙ্গাপুরের মতো, মালয়েশিয়ার মতো আর্থিকভাবে সার্বভৗম হবার প্রেরণায় উজ্জীবিত হওয়ার বিরল সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।

মনে রাখা উচিত, আর্থিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনীতিক স্বাধীনতা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। কোনো ঋণগ্রহীতার পক্ষে কখনও স্বাধীনভাবে স্বীয় উন্নয়নে নিবেদিত হওয়ার সুযোগ থাকে না। ঋণচুক্তিতে কোনো দেশকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার অনুুকূল কোনো সুযোগ রাখা হয় না।

পত্রিকায় বিভিন্নভাবে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা, বানোয়াট ও মনগড়া প্রতিবেদন ছাপা হয়। বিশ্বব্যাংক জানায়, আমি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে থাকলে পদ্মা সেতুর ঋণ প্রদান করা হবে না। দেশের স্বার্থে আমি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরে যাই। তারপরও বিশ্বব্যাংক ঋণ দেয়নি। এতে কী বোঝা যায়? চায়না কোম্পানির নিকট থেকে প্রতিশ্রুত সুবিধা পেতে ব্যর্থ হয়ে বিশ্বব্যাংক প্রচ-ভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। কাল্পনিক দুর্নীতির তদন্ত করার দাবি জোরদার করে। সরকার কোনো দুর্নীতি হয়নি জানানো সত্ত্বেও আর্থিক কারণে বিশ্বব্যাংকের অন্যায় দাবির কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয়। তাহলে, বিশ্বব্যাংক কি সার্বভৌমত্বের চেয়ে বড়? বিশ্বব্যাংকের গ্রহণযোগ্যতা কি বাংলাদেশ সরকারের চেয়ে অধিক? একটি অর্থলগ্নীকারী প্রতিষ্ঠান কখনও দেশের চেয়ে, রাষ্ট্রের চেয়ে, সরকারের চেয়ে বড় হতে পারে না।

বিশ্বব্যাংকের দাবির মুখে দুদক আমার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে কিছু পাওয়া যায়নি। সত্য প্রকাশ হয়ে পড়ায় আরও ক্ষেপে যায় বিশ্বব্যাংক। তার পরও আমার প্রতি হিংস্র থাবা বাড়িয়ে রাখে। বিভিন্নভাবে আমাকে হয়রানি করার চেষ্টা করা হয়। দেশীয় কয়েকটি পত্রিকার মাধ্যমে এটি আরও বিকট করে তোলা হয়। অবশেষে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণে তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ প্রদান এবং চুক্তি বাতিল করে দেয়। আমি দুর্নীতি না করা সত্ত্বেও দুদক যদি দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছি বলত- তাহলে সেটি কি উচিত হতো! দুদক তদন্তের পর তদন্ত করে শেষ পর্যন্ত দেখতে পায়- আমি কোনো অন্যায় করিনি। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তাই চূড়ান্ত বিশ্লেষণে দুদকের তদন্তে ও প্রমাণিত হয় যে, আমি নির্দোষ।

বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল বিশ্বের দুর্বল অবস্থানের কথা জানলেও আমার নৈতিক ও দৃঢ় মনোবল বিষয়ে ধারণা রাখে না। নইলে কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানের কাছে ঘুষ দাবির বিষয়ে আমার সংশ্লিষ্টতার কথা কখনও তুলত না। শিশিরবিন্দুর কাছ থেকে যেমন সমুদ্র জলপ্রত্যাশী নয়, তেমনি কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকেও আমি অর্থপ্রত্যাশী হতে পারি না। আমার নিকট কল্পিত দুর্নীতির বর্ণিত ১০ ভাগ অর্থ সমুদ্রের কাছে শিশিরবিন্দুর ন্যায়। এটি আমার অবস্থান, মনোবল ও সততার প্রতি যাঁরা পরিচিত তাঁরা সহজে অনুধাবন করতে পারবেন।

আমি অর্জিত অর্থ জনগণের কল্যাণে আর শিক্ষা বিস্তারে ব্যয় করেছি। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে যোগাযোগমন্ত্রী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন শিক্ষালয়সহ জনকল্যাণে ব্যয় করেছিÑ তা বিনিয়োগ করলে এ রকম একটা পদ্মা সেতু সহজে একাই নির্মাণ করে দিতে পারতাম।

মূলত আমি ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের শিকার। বিশ্বব্যাংক এখন নিজেই তা অনুধাবন করতে পেরেছে। তারা বুঝতে পেরেছেÑ গুটিকয়েক ষড়যন্ত্রকারীর বেনামি পত্রের ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে এবং ষড়যন্ত্রকারীদের মিথ্যা অভিযোগের ফাঁদে পা দিয়ে বিশ্বব্যাংক ভুল করেছে। এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন তাঁদের অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। যে একজন আইনজীবীকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে আনীত মিথ্যা অভিযোগ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছিল তার কী পরিণতি হয় তা দেখার অপেক্ষায় আছি। বিশ্বব্যাংক নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। অপপ্রচারকারী মিডিয়া ও ষড়যন্ত্রকারীদের সকল মিথ্যা অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা প্রমানিত হয়েছে- এটি আমার এখন বড় সান্ত¦না।

তিল তিল শ্রমে অর্জিত সততার মাধ্যমে ব্যবসায় করে নিজেকে এ অবস্থানে এনেছি। মানুষ অর্জিত আয় আমোদ-ফুর্তি ও আয়-বর্ধনের কাজে লাগায়। আমি অর্জিত অর্থ জনগণের কল্যাণে আর শিক্ষা বিস্তারে ব্যয় করেছি। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে যোগাযোগমন্ত্রী হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন শিক্ষালয়সহ জনকল্যাণে ব্যয় করেছিÑ তা বিনিয়োগ করলে এ রকম একটা পদ্মা সেতু সহজে একাই নির্মাণ করে দিতে পারতাম।

এ অবস্থায় কানাডিয়ান একটি অখ্যাত প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে পরামর্শক নিয়োগের জন্য ঘুষ দাবি করার যুক্তিÑ নিতান্তই অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর। পত্র-পত্রিকায় এটি কীভাবে লেখা হলো, তা ভাবলে আমি অস্থির না হয়ে পারি না। তিল তিল করে গড়ে তোলা আমার সততা ও শ্রম এভাবে ষড়যন্ত্রের শিকারে রক্তাক্ত হয়ে গেল! এ বেদনা আমাকে নিয়ত কুরে কুরে খায়। কোনো দোষ না করেও ষড়যন্ত্রের জালে পড়ে আমার সব অর্জন ধূলিস্যাৎ হয়ে গেল। আমি এ কষ্ট বুকের ভেতর আর কতদিন চেপে রাখব?

বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জুলিক চীনে অনুষ্ঠিত বোয়াও ফোরাম সম্মেলনে মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে- স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন আবাসিক প্রতিনিধি গোল্ড স্টেইন পদ্মা সেতুর তথাকথিত দুর্নীতি নিয়ে যা বলেছেন, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে যা করেছেন, যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন- তা বাংলাদেশের মানুষের কাছে ক্ষমার অযোগ্য বিবেচিত হবে। বিশ্বব্যাংকের নিযুক্ত আইনজীবী ওকাম্পা আমাকে এবং বাংলাদেশকে দুর্নীতিগ্রস্ততার কালিমা লিপ্ত করার অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। আমি দোষী কিনা তা বিবেচনা করা তার উদ্দেশ্য ছিল না, প্রকৃতপক্ষে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল আমাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা। তারপরও আনীত অভিযোগের সামান্য প্রমাণও তিনি উপস্থাপন করতে পারেননি। তৎসঙ্গে আমাদের দেশের কিছু সম্মানিত ব্যক্তি বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, বিশ্বব্যাংকের পক্ষ অবলম্বন করেন। পৃথিবীর আর কোনো দেশের মানুষ নিজের দেশের মানুষের প্রতি এমন আচরণ করতে পারেন বলে আমার জানা নেই। আজ বিশ্বব্যাংকের সকল অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, অবনত মস্তকে বিশ্বব্যাংক তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট কৌসিক বসু বলেছেনÑ দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন থেকে সরে আসা বিশ্বব্যাংকের জন্য একটি খারাপ ইতিহাস। তারপরও তিনি সান্ত¦না খুঁজেছেন এ বলেÑ অনেক সময় ব্যাড নিউজ হিস্ট্রি থেকে গুড নিউজ সৃষ্টি হয়।১৩২

বিশ্বব্যাংক আমার বিরুদ্ধে এ মিথ্যা অভিযোগ না আনলে বাংলাদেশ হয়তো নিজের অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করত না। তাহলে বাংলাদেশ যে, নিজের অর্থায়নে একাই এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেÑ সে শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটত না। যতই কষ্ট হোক, এটাও আমার জন্য কম প্রাপ্তি নয়। বিশ্বব্যাংকের নিষ্ঠুরতা ও অমানবিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে জাগিয়ে দিয়েছে বাঘের শক্তিতে, ঠিক যেমনটি হয়েছিল ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে। তখন আমরা জেগে উঠেছিলাম পাকিস্তানের নিষ্ঠুরতায়, এবার জেগে উঠেছিÑ বিশ্বব্যাংকের নৃশংসতায়। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর মূল সেতুর নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির জনকের মতোই সগর্বে বলতে পেরেছেন, “অনেকের ধারণা ছিল, কোনো কাজ করতে হলে অন্যের কাছে হাত পাততে হবে। এ মানসিকতা আমাদের পেয়ে বসেছিল। অন্যের সাহায্য ছাড়া কিছু করতে পারব না। অমুককে ধরেন, টাকা পাব, তমুককে ধরেন টাকা পাব। আমি বলেছিলাম, এ টাকা বন্ধ করেন। আমরা কারও টাকা নেব না। নিজেদের টাকাতেই করব।”১৩৩ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাশা ও গর্বিত উচ্চারণ সফল হয়েছেÑ এর চেয়ে বড় আর কী হতে পারে! বিশ্বকে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশ কারও মুখাপেক্ষী নয়। নিজের অর্থায়নে বাংলাদেশ যেকোনো কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

১/ ১৩৪

৪১. ওয়ান-ইলেভেনের দুঃসহ স্মৃতি

সৈয়দ আবুল হোসেন: ওয়ান-ইলেভেন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ভয়ঙ্কর কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। এমন কলঙ্কজনক শাসনের পুনরাগমন বন্ধ করার লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ জাতি যুগ যুগ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। মূলত এটি ছিল নতুন আদলে গড়া সামরিক শাসনের এক দুর্বিষহ অধ্যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আড়ালে সামরিক বাহিনীর কতিপয় সদস্য এসময় যে অত্যাচার-অবিচার এবং দুর্নীতি করেছেÑ তা পৃথিবীর আর কোথাও হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

ওয়ান-ইলেভেন ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি দুর্যোগপূর্ণ সময়। এ সময় বাংলাদেশকে একটি সংকটকাল অতিক্রম করতে হয়েছে। অপরাজনীতি দিয়ে রাজনীতি বন্ধের অপচেষ্টা করা হয়েছে। নতুন রাজনীতিক দল গঠনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে। টোপ দিয়ে রাজনীতিক ব্যক্তিদের দলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ থেকে আমিও বাদ যাইনি। ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের ডাকে সাড়া না দেওয়ায় আমাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ সময় গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা আমাকে নতুন দল গঠনে ভূমিকা পালনে বাধ্য করা