হোম » মাহমুদ দারবিশ : জীবনের প্রয়োজনেই স্বাধীনতা

মাহমুদ দারবিশ : জীবনের প্রয়োজনেই স্বাধীনতা

admin- Saturday, August 13th, 2016

ড. কামরুল হাসান :
মাহমুদ দারবিশ। ফিলিস্তিনের একজন বিখ্যাত কবি। বিশেষত আরব কবিদের যারা স্বাধীনতা, সংগ্রাম ও দেশকবিতার জন্য খ্যাত হয়েছেন; তিনি তাদেরই অন্যতম। শুধু ফিলিস্তিন নয়, গোটা আরবজুড়েই তার সুখ্যাতি। তিনি ছিলেন আরবি কবিতার উন্নয়ন প্রতিভূ। আরবি কবিতার বন্ধ্যত্ব ঘুচাতে তার শ্রম, কৌশল ও সংগঠন ব্যাপক ভূমিকা রাখে। প্রতীকাশ্রয়ী আরবি কবিতার অন্যতম সৃজক ছিলেন তিনি। কবিতায় তিনি প্রেমিকা ও দেশকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন একইসাথে, সমহারে। প্রেমিকা যেমন প্রেম ও আস্থার আধার, দেশমাতাও তেমনি। দেশমাতাকে ভালোবাসা যায়, বিশ্বাস করা যায়। মায়ের মতো সব কিছু প্রাণখুলে বলা যায়। প্রেমিকার প্রতি প্রেম হয় ব্যাষ্টিক প্রয়োজনে। কিন্তু দেশের প্রতি প্রেম হয় সামষ্টিক প্রয়োজনে।
মাহমুদ দারবিশ ১৯৪১ সালে ফিলিস্তিনের গ্যালিলি অঞ্চলের আকা তীরবর্তী এলাকায় বারওয়া নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালে ইসরাইলি প্রশাসন তার পরিবারকে লেবাননে যেতে বাধ্য করে। মাত্র এক বছরের মাথায় ১৯৪৯ সালে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তারা আবারো দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে দেখেন তাদের গ্রাম পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ওই গ্রামকে ইসরাইলি কৃষি এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে তারা সপরিবারে আল-জাদিদ নামক অন্য এক গ্রামে আশ্রয় নেন। মাধ্যমিক পাস করার পরপরই তিনি ফিলিস্তিন কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। জীবিকার তাগিদে আল-ইত্তিহাদ পত্রিকায় চাকরি নেন। এটি ছিল ফিলিস্তিন কমিউনিস্ট পার্টির দলীয় মুখপত্র। পরে তিনি এ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এ সময় তিনি আল-ফাজর নামক একটি পত্রিকারও সম্পাদনা করেন।
১৯৬১-১৯৭২ সাল পর্যন্ত কবি মাহমুদ দারবিশ বারবার কারাবরণ করেন। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা এবং রাজনীতি করার অপরাধে ইসরাইলি প্রশাসক তাকে বারবার কারা প্রকোষ্ঠের অন্ধকারে নিক্ষেপ করে। একটি সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, তিনি জীবনে পাঁচবার কারাবরণ করেন। ১৯৬১, ১৯৬৫, ১৯৬৬, ১৯৬৭ ও ১৯৬৯ এই পাঁচ সালে তিনি রাষ্ট্র কর্তৃক ধৃত হন এবং বিভিন্ন মেয়াদে কারা ভোগ করেন। রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখে লেখাপড়ার নাম করে তিনি সোভিয়েত রাশিয়ায় যান। সেখানে এক বছর অবস্থান করার পর তিনি প্যারিসে যেতে মনস্থ করেন, কিন্তু ফ্রান্স সরকার তাকে বাধা দেয়। কারণ দারবিশ ছিলেন ইসরাইলি নাগরিক। পাসপোর্টে তার জাতীয়তা ছিল অস্পষ্ট। ফলে বিমানবন্দরে তিনি বাধাপ্রাপ্ত হন এবং এক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর বিফল মনোরথে ফেরত যান।
সোভিয়েত রাশিয়ার রাজধানী মস্কো তার সাহিত্যজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। কবি নিজেই বলেনÑ মস্কোতে আমি প্রথম গ্রামের নিসর্গ প্রকৃতি, বিস্তীর্ণ শস্যভূমি, নদী, জাদুঘর, নাট্যমঞ্চ ইত্যাদির সাথে পরিচিত হই। মস্কোর সার্বিক পরিবেশ ছিল দরিদ্রানুকূল। আসলে মস্কো ছিল দরিদ্রদের স্বর্গভূমি। এখানেই আমি প্রথম কমিউনিজমের তত্ত্বের সাথে বাস্তবের অমিল খুঁজে পাই।
পরবর্তীকালে তিনি মিসরের রাজধানী কায়রোতে যান। কায়রো ছিল দারবিশের সাহিত্যজীবনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ক্ষেত্র। মিসরকে দারবিশ জীবনের মতো ভালোবেসে ফেলেন। সিদ্ধান্ত নেন, তিনি আর কখনো ফিলিস্তিনে ফিরে যাবেন না। যে কারোর জন্য এটি কোনো সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কবি আপাতত তার যাযাবরী জীবনের সমাপ্তি চিন্তা করেন। তার জীবনের অনিশ্চিত যাত্রা থেকে বেঁচে গেলেন বলে হাঁফ ছাড়েন। মিসর হয়ে ওঠে তার স্বপ্নের নগরী। মিসরে তার প্রাতঃপ্রাত্যহিকতা ছিল ঘুম থেকে উঠতেন, জানালা খুলতেন, নীল দেখতেন, নীলের সুবাসিত বাতাসে নাসিকা সিক্ত করতেন তাতে তার মন হয়ে উঠত আর্দ্র। এরপর বাইরে যেতেন। যা দেখতেন, যা শুনতেন তাতে মনে হতো সত্যিই এটি কোনো আরব নগরী। এখানের জনপদের নাম আরবি, রাস্তার নাম আররবি, মানুষ কথা বলে আরবিতে। এই তো আরবী সংস্কৃতি। এখানের পত্রপত্রিকা বের হয় আরবিতে, সাহিত্যচর্চাও চলে আরবিতে। এসবই কবিকে প্রলুব্ধ করত মোহময় মাদকতায়। কবি তখন নিজেকে আবিষ্কার করতেন একজন খাঁটি মিসরীয় সংস্কৃতির পূজারী ও প্রতিভূরূপে। তাই কবি আজীবন মিসরে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কাব্যচর্চা শুরু করেন পুরোদমে। যাদের লেখায় কবি প্রলুব্ধ ও প্রভাবিত হতেন, শিগগিরই তাদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। অনেকের সাথে সাক্ষাৎ করেন। কবি প্রবল আগ্রহ নিয়ে আব্দুল ওহাব, আব্দুল হালিম, নাগিব মাহফুজ, তাওফিক আল-হাকিম, ইউসুফ ইদরিস প্রমুখের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এখানেও তিনি ফিলিস্তিন মুক্তি সংগ্রামের সাথে যুক্ত থেকে ফিলিস্তিনিদের জন্য কাজ করেন।
মিসরীয় কবি-সাহিত্যিকদের সংস্পর্শে দারবিশের নতুন জীবন শুরু হয়। তার কবিতার মোড় ঘুরে যায়। কবিতায় নতুন অবয়ব ও শিল্পমাত্রা যোগ হয়। কবিতার নতুন জগৎ নির্মিত হয়। এ সময় তার কবিতা আল-আহরাম পত্রিকায় প্রকাশিত হলে মিসর জুড়ে ব্যাপক সাড়া পড়ে। কাব্যখ্যাতির উত্তুঙ্গে তার অবস্থান সুনিশ্চিত হয়।
কিছু দিন পর তিনি লেবানন যান। ১৯৭৩-১৯৮২ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০ বছর তিনি লেবাননে অবস্থান করেন। বৈরুত তার সাহিত্যজীবনে গভীর রেখাপাত করে। এখানে তার কাব্যচর্চার পরিবেশ পুরোপুরি অনুকূল না হলেও বৈরুতের প্রতি দুর্বলতা ছিল তার আজন্মের। বলা বাহুল্য বৈরুতকে নিয়ে কবি এক ধরনের নস্টালজিয়ায় ভুগতেন। তার কাব্য সমালোচকেরা মনে করেন, কবির শ্রেষ্ঠ কাব্যকীর্তি কবি লেবাননেই সম্পন্ন করেন। এর বড় কারণ ছিল লেবাননের যুদ্ধ, যুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানি, রক্তপ্রবাহ, বোমাবাজি, হত্যাযজ্ঞ, লাশের মিছিল ইত্যাদির সাথে ফিলিস্তিনের মিল ছিল অনেক বেশি। এখানেও তিনি ফিলিস্তিন মুক্তিফ্রন্টের শিক্ষণ ও প্রকাশনার দায়িত্বে নিয়োজিত হন। অবশ্য অসলো চুক্তির প্রতিবাদে তিনি ফিলিস্তিন মুক্তিফ্রন্টের নির্বাহী পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এ সময় তিনি আল-কারমিল নামক একটি পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। বৈরুত অবস্থানকালেই তার কবিতার স্বর্ণযুগ শুরু হয়। তার কবিতার বইয়ের কাটতি বেড়ে যায়। সংখ্যায় তা অযুত-নিযুত ছাড়িয়ে যায়। অবশ্য লেবাননের গৃহযুদ্ধ এতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। লেবাননের গৃহযুদ্ধ ১৯৭৫ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এ অবস্থায় তিনি ১৯৮২ সালে বৈরুত ছেড়ে চলে যান। তিনি একই সাথে লেখক সঙ্ঘ ও প্যালেস্টাইন রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি আল-কারমিলের সম্পাদনাও করতে থাকেন। এরপর তিনি স্পেন যেতে মনস্থ করেন। এ সময় তিনি মায়ের সাথে দেখা করতে ফিলিস্তিন যান।
এরিয়েল শ্যারনের লেবানন অবরোধ ও ফিলিস্তিন মুক্তিফ্রন্ট বিনষ্টের পর তিনি হতোদ্যম হয়ে পড়েন। তিনি এক রকম নির্বাসিত হন। এটিকে তার জীবনের দেশান্তরীর পর্যায় বলা যেতে পারে। এ সময় তিনি সিরিয়া, সাইপ্রাস, কায়রো, তিউনিসিয়া হয়ে স্পেন চলে যান। অবশ্য লেবাননি কবি ও দার্শনিক রুবাইর গানিম দারবিশকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। এ সময় দারবিশের কবিতা আল-আনওয়ার নামক পত্রিকায় ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা ছাপানোর সুবাদে মধ্যপ্রাচ্যের সব বিখ্যাত ও প্রখ্যাত কবিদের সাথে তার সখ্য গড়ে ওঠে। তাদের মধ্যে সুদানের মুহাম্মদ ফাইতুরি, সিরিয়ার নাজার কাবানি, ইরাকের ফালিহ হাজ্জি, রা’দ বান্দার প্রমুখ।
১৯৮২ সালের শেষ দিকে দারবিশ দামেস্কে আসেন। সে সময় তার কাছে তিউনিসিয়ার কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছিল। অল্প দিনের মাথায় তিনি দামেস্ক ছেড়ে তিউনিসিয়ায় পাড়ি জমান। তখন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইয়াসির আরাফাত। ইয়াসিরের তখন দুর্দিন চললেও তিনি দারবিশকে আল-কারমিল পত্রিকা প্রকাশের অনুরোধ জানান। দারবিশ জানান, কোথা থেকে তা প্রকাশ করব? তিনি উত্তরে বলেনÑ লন্ডন, প্যারিস, সাইপ্রাস যেখান থেকে পারো সেখান থেকেই প্রকাশ করো। দারবিশ তখনই সাইপ্রাস গিয়ে পত্রিকার লাইসেন্স সংগ্রহ করেন। এবং তা প্যারিস থেকে সম্পাদিত হয়ে সাইপ্রাস থেকে প্রকাশিত হতো। পত্রিকাটি ছাপা হতো নিকোসিয়ায়। প্যারিসে কবির সাহিত্যচর্চা নতুন মাত্রা পায়। প্যারিস সত্যিই সাহিত্যের নগরী। এখানে পড়া যায়, লেখা যায়, কাব্য করা যায় স্বাধীনভাবে। কবি এখানে আল-ইয়াওম আল-সাবউ নামক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখতেন।
৯ আগস্ট ২০০৮। আমেরিকার হেরমান মেমোরিয়াল হাসপাতালে তৃতীয়বারের মতো ওপেন হার্ট সার্জারির সময় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ইতোমধ্যে তার আরো দু’বার ১৯৮৪ ও ১৯৯৮ সালে সফল ওপেন হার্ট সার্জারি করা হয়। তবে তৃতীয়বারে ডাক্তার তাকে জানায়, এবারের অপারেশন খুবই ভয়াবহ। ফলাফল মৃত্যু অথবা প্যারালাইসিস। অপারেশন ব্যর্থ হয়। ফিলিস্তিনিদের কাঁদিয়ে তিনি পরপারে পাড়ি জমান। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট আব্বাস মাহমুদ আল-হাদ্দাদ ফিলিস্তিনের জাতীয় কবির মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন।
তিনি এ মহান কবিকে ‘ফিলিস্তিনের প্রেমিক’, ‘আধুনিক সভ্যতার পথিকৃৎ’, ‘জাতীয় নেতা’ প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত করেন। রামাল্লা প্রাসাদের একটি অংশ তাকে দান করা হয়। সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। তাকে ওই ভবনে দাফনের পর তার নামই হয়ে যায় ‘মাহমুদ দারবিশ সাংস্কৃতিক ভবন’। তার নামাজে জানাজায় লাখ লাখ ফিলিস্তিনি যোগ দেয়। তার জানাজায় প্রায় চল্লিশটি দেশ থেকে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ যোগদান করে। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট আব্বাস মাহমুদ আল-হাদ্দাদও অংশ নেন।
মাহমুদ দারবিশের সমাধি উপত্যকায় তিন একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আল-বিরওয়াহ পার্ক বা মাহমুদ দারবিশ জাদুঘর। যেখানে রয়েছে কবির মনুমেন্ট, জাদুঘর, মিলনায়তন, নাট্যমঞ্চ এবং একটি সুদৃশ্য বাগান। যার পুরোটাই করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায়।

মাহমুদ দারবিশ প্রাথমিকের ছাত্র থাকাকালীন তার প্রথম কবিতা প্রকাশ পায়। তবে প্রথম কাব্যসঙ্কলন বের হয় ১৯৬০ সালে। আধুনিক আরবি সাহিত্যের ক্ষণজন্মা প্রতিভা মাহমুদ দারবিশ পৃথিবীর কল্যাণে আরবি গদ্য-পদ্যের এক বিশাল সম্ভার রেখে গেছেন। তার প্রায় ত্রিশটির মতো দিওয়ান বা কাব্য সঙ্কলন রয়েছে।
মাহমুদ দারবিশ অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে কবিতা রচনা করলেও তিনি ছিলেন সব সময় জননন্দিত। নিচের পুরস্কারগুলো তারই ইঙ্গিতবহ। তার অসংখ্য পুরস্কারের কয়েকটি :
ক. আফ্রো-এসিয়ান লেখক সঙ্ঘ কর্তৃক লোটাস পুরস্কার, ইন্ডিয়া ১৯৮৯, খ. দি মেডিটেরিয়ান পুরস্কার, ইতালি ১৯৮০, গ. এভিসিনা পুরস্কার, রাশিয়া ১৯৮১, ঘ. দি সুলতান বিন আলি আল-ওয়াইস পুরস্কার, দুবাই ২০০৩, ঙ. ফ্রান্সের সর্বোচ্চ চারু কারু পুরস্কার, ফ্রান্স ১৯৯৭
এর বাইরেও তার আরো পুরস্কার রয়েছে। বিভিন্ন দেশের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংস্থা তাকে নানা পুরস্কারে ভূষিত করেছে। তার নামে একাধিক স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছে। ফিলিস্তিনের বারজিত বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেলজিয়াম ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাকে অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে তার প্রতি অসীম শ্রদ্ধা জানিয়েছে।
গ.
তার কবিতা ছিল জীবনধর্মী ও জীবনস্পর্শী। জন্মের পর থেকেই তিনি ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলিদের নির্মমতা, বর্বরতা নিজ চোখে অবলোকন করেছেন। তাই তিনি কবিতায় হয়ে উঠেছেন প্রতিবাদী কিংবা বিপ্লবী। ‘আমাকে ছেড়ে যেও না’ কবিতায় কবির আকুল আকুতি প্রকাশ করেছেন এভাবেÑ
ও আমার দেশ
প্লিজ আমাকে তুমি ফেলে যেও না
বেষ্টনীর ওপারে
শুকনো কাঠের মতো
পরিত্যক্ত পারাবতের মতো।
প্লিজ আমাকে তুমি ফেলে যেও না
হতভাগ্য চাঁদের মতো
করুণাপ্রার্থী তারার মতো যে ডালে ডালে করুণা যাঞ্চা করে
প্লিজ আমাকে তুমি ফেলে যেও না
আমি চিন্তামুক্ত হতে চাই
আমি স্বাধীন হতে চাই
সূর্য¯œাত হাতে আমাকে জাপটে ধরো
কারাবাস থেকে মুক্ত করো
তুমি যদি আমার হও তবে জ্বালাবার শক্তি দাও
প্রতিবাদের সাহস দাও
ও আমার দেশ আমি তোমাকে চাই
তবে আর ভয় কিসের
প্লিজ আমাকে তুমি ফেলে যেও না॥
এভাবেই দারবিশ দেশের প্রতি তার মমত্ব, কর্তব্য ও অনুভূতি প্রকাশ করেছেন অমৃত ব্যঞ্জনায়, অনুপম সুষমায়।
শত্রু কর্তৃক স্বদেশী নিধন কবির শোনা নয়, চাক্ষুষ। এ যে অসহ্য। কী দুর্বিষহ সে দৃশ্য! স্বদেশকে সম্বোধন করে লেখা ‘যেন তোমাকেই ভালোবাসি’ কবিতায় তারই অনবদ্য চিত্রায়ন :
সমুদ্র থেকে আমার দৃষ্টি ফেরালে তুমি
জ্বালিয়ে দিলে কবিতাগ্নি
কেন আমরা চেষ্টা করবো?
আমরা বলি না আমাদের বের করে দিয়েছে তারা
সব দেশে চলছে বিবাদ
বিবাদের অর্থ রক্তারক্তি, অস্ত্রের মহড়া
তবে কেন আমরা চেষ্টা করবো?
তারা তোমাকে হত্যা করবে, আমাকেও হত্যা করবে
আর আমি দেখবো রক্তনদী
রক্তে নদীর বিরক্তি নেই
নদি কথা বলে না
নদি কষ্ট পায় না
প্রতিদিন লাশের মিছিল দেখি
প্রতিদিন
প্রতিক্ষণ॥
ফিলিস্তিনের প্রতি কবির আবেগ দুর্নিবার, আজন্মের। শয়নে, জাগরণে, স্বপনে কিংবা বিচরণে শুধুই ফিলিস্তিন। ‘ফিলিস্তিনের প্রেমিক’ কবিতায় কবির আপ্লুত উচ্চারণ :
তোমার দৃষ্টি যেন হৃদকণ্টক
আমার কষ্টদায়িনী
সমীরণ থেকে আমি তাকে বাঁচাই, তার সেবা করি
রাত্রিতে চোখ মুদি
আর কষ্টরা আমাকে ঘিরে ধরে
আমার কষ্টের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে
আমার ভবিষ্যৎ উদ্ভাসিত হয়
স্বর্ণালি ভবিষ্যৎ ডানা মেলে ধরে।
হায়! খানিক পর সব ভুলে যাই
চোখাচোখিতে, রক্তচক্ষুর সামনে…
স্বপ্ন হয়ে যায় দুঃস্বপ্ন
কষ্ট বেড়ে যায় হাজার গুণ॥
দেশপ্রেমের আজ বড় আকাল। দেশ তার প্রেমিকের কাঙাল। কিন্তু দারবিশের দেশপ্রেম ছিল অনবদ্য, সুস্পষ্ট। তাই দেশ নিয়ে তার উচ্চারণও দ্ব্যর্থহীন, নির্ভীক। ‘আক্রান্ত জমিন’ কবিতায় কবির দুঃসাহসী ব্যঞ্জনা :
শত্রুরা আমাদের দেশ দখল করেছে
অবরুদ্ধ হয়েছি আমরা, পথ-ঘাট সব অবরুদ্ধ
ফেরত চাই আমাদের জমিন, উত্তরণ চাই এ দুরবস্থার।
আমাদের দেশ আজ দখলী
আমরা শুধু চাষাবাদ করি
যেন জতৃন্মৃত॥
পিতৃপুরুষরা সামান্যতম লাঘব করেনি আমাদের
হতে হবে প্রস্তরদৃঢ়, নিশ্চিত স্বপ্নের স্ফুরণে
আত্মত্যাগে সদা প্রস্তুত, সম্মুখ সমরে॥
দেশপ্রেমের উজ্জীবন কবিকে এভাবেই সাহসী করে তুলেছে। কবির বিক্রমী উচ্চারণে জালেম শাহীর তখতে তাউস কেঁপে উঠেছে। কবির প্রতি উচ্চকিত হয়েছে অত্যাচারীর খড়গ। কবি হয়েছেন দেশছাড়া, নির্বাসিত। তবুও কবি লিখেছেন দেশের পক্ষে, নিজস্ব জাতীয়তা ও সংস্কৃতির পক্ষে। কবিতা ও শিল্পের প্রয়োজনে প্রতীকের আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু কোনোভাবেই তার পরিচয় ভুলে যাননি। তেমনই একটি কবিতা ‘পরিচয় পত্র’:
শোনো
আমি এক আরব
আমার কার্ড নম্বর ৫০০০০
আমি আট সন্তানের জনক
নবমটিও আসবে গ্রীষ্মের পর
আমার পরিচয়ে তুমি কি ক্ষুব্ধ?
শোনো
আমি এক আরব
আমি এক বিতাড়িত চাকরিজীবী
আমি আট সন্তানের জনক
আমি তাদের রুটি, পোশাক, বই কিনে দেই
আমি পাথরের শরণাপন্ন হই
কিন্তু তোমাদের দাক্ষিণ্য চাই না।
আমি কখনো আত্মমর্যাদা বিনষ্ট করে
তোমার দিকে কদম বাড়াব না
এতে কি তুমি ক্ষুব্ধ?
মা এবং দেশমাতা কবির কাছে এক ও অভিন্ন। মাকে নিয়ে কবির আবেদন অত্যন্ত সপ্রতিভ ও সতেজ। ঘর হারা, দেশ ছাড়া দারবিশের মায়ের কাছে যাওয়ার করুণ আর্তি :
কত দিন! মায়ের হাতে রুটি পাই না
কিংবা মায়ের হাতের কফি
মায়ের স্পর্শ
বাল্যস্মৃতি আমাতে প্রকট
দিনের পর দিন
আমাকে যোগ্য হতে হবে মৃত্যুর পূর্বেই
মায়ের নয়নাশ্রুর যোগ্য আমি হতে চাই।
আমি যদি কোনো এক দিন তোমার কাছে যাই
আমাকে চোখে চোখে রেখো
তোমার পালকে আমায় জড়িয়ে রেখো
সারাক্ষণ আগলে রেখো মা…
যদি কখনো তোমার কাছে যাই॥
এমনই আবেগস্পর্শী ও মমতাস্পর্শী ছিল দারবিশের কবিতা। মাহমুদ দারবিশের প্রতিটি কবিতার জনপ্রিয়তাই ছিল আকাশছোঁয়া। তার কবিতা মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হতো। ফলে ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের নামীদামি সুরকাররা তার কবিতায় সুরারোপ করে দারবিশকে করেন আরো জনপ্রিয়। এনে দেন সুখ্যাতি। তারাও আরোহণ করেন খ্যাতির শীর্ষে। তার কবিতা ছিল জননন্দিত। সুরের স্পর্শে কবিতা হতো গান। সেই গান হয়ে উঠত মোহময়। তার কবিতা হয়ে উঠত স্বাধীনতার বিস্ফোরক, মানবতার উদ্বোধক।
মাহমুদ দারবিশ ফিলিস্তিনের মানবতাবাদী কবি। তার কবিতার প্রতিটি বর্ণ স্বর্ণছোঁয়া। সৌন্দর্যে অবিনশ্বর। সৌকর্যে অনুপম। শৈল্পিক সুষমায় চিরন্তন, যা কোনো দিনই মুছে যাবে না। তিনি ছিলেন একজন প্রতিবাদী কবি। তার বেশির ভাগ কবিতাই ফিলিস্তিনকে ঘিরে আবর্তিত। ফিলিস্তিনের প্রকৃতি, প্রেম, সঙ্কট, প্রত্যাশা, ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ ইত্যাদিই তার কবিতার মূল উপজীব্য। স্বাধীনতার জন্য জাগরণ, প্রয়োজনে বিদ্রোহ। জীবনের প্রয়োজনেই স্বাধীনতা, পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্তি প্রভৃতির আহ্বান ছিল তার কবিতার মূল সুর। স্বাধীনতাকামী দেশপ্রেমিক সব হৃদয়ে কবি মাহমুদ দারবিশ তার শক্তিমান কবিসত্তা নিয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকালব্যাপী।

সর্বশেষ সংবাদ