সংলাপ, দেশবাসীর প্রত্যাশা….

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান

বর্তমানে দেশে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে সহজে বের হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কিন্তু চলমান রাজনৈতিক সংকট দ্রুত সমাধান হোক এটা সাধারণ মানুষের একান্ত চাওয়া৷ কারণ, সাধারণ মানুষের ওপরই রাজনৈতিক সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বেশি৷আর সমঝোতায় যত দেরি হবে, সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এবং উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তত বাড়বে৷ তাই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু সমাধান হওয়া প্রয়োজন। আর এ কারণে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো ‘সংলাপ’। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংকট নিরসনে ‘সংলাপের’ প্রয়োজনীয়তা অনুভব নতুন কিছু নয়। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো কঠিন সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনাই সবচেয়ে বড় পন্থা হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে যুগে যুগে।

ইতোমধ্যেই সমস্যা সমাধানে রাষ্ট্রপতিকে একটি অর্থবহ সংলাপের উদ্যোগ নেয়ার জন্য জন্য অনুরোধ জানিয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। চলমান সংকট নিরসনে সব রাজনৈতিক দল নিয়ে সংলাপের তাগিদ দিয়েছেন সাবেক দুই রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ ও ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিকরাও। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইও সংলাপের তাগিদ দিয়েছে। এফবিসিসিআই’র নেতারা প্রয়োজনে সংলাপের আয়োজন করতে প্রস্তুত আছেন। রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নামতেও রাজি। এদিকে বিরোধীপক্ষও জানিয়েছে, সংলাপের উদ্যোগ না নেয়া পর্যন্ত তারা অবরোধ কর্মসূচী চালিয়ে যাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। তবে সরকার পক্ষে সংলাপের বিষয়টি একেবারে নাকোচ করে দিয়ে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবেলার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বলা যায়, উভয়পক্ষে শক্তি প্রয়োগের একটা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এতে দেশ ও দেশের জনগণের বিশাল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে।

দেশের চলমান জটিল এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট সংকটের যখন কোনো সমাধানের সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না, তখনই বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের মাধ্যমে এ সমস্যা নিরসনের প্রয়োজনীয়তার নিরিখেই আলোচনার অপরিহার্যতা অনুভূত হচ্ছে। এই ‘সংলাপ’ নিয়ে অস্পষ্টতা এবং বিভ্রান্তি বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান থাকলেও, এই ‘সংলাপ’ নিয়েই বিরাজ করছে সীমাহীন আশাবাদ। কেননা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। দেশে-বিদেশে এই পরিস্থিতির প্রতিফলন পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনৈতিক চিত্র নিয়ে জাতিসংঘ এবং পূর্ব-পশ্চিমা বিশ্ব পর্যন্ত উদ্বিগ্ন। কেননা একটি উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির অনেকাংশেই নির্ভর করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ৪৩ বছরে জাতির অগ্রযাত্রা যেমনটি হওয়ার কথা ছিল, তা বহুলাংশেই হয়নি। এর পেছনে অন্যতম কারণ বারবার রাজনৈতিক সংকটে ঘুরপাক।

সংলাপ নিয়ে নানা বিতর্ক এবং বিভ্রান্তি থাকলেও বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংকট নিরসনে সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ ভ’মিকা করে আসছে। কারণ, এর প্রভাব কখনো কখনো ফলপ্রসূ না হলেও নেতিবাচক হয় না। অনেক সময় সংলাপের ফলে সংকট নিরসন না হলেও অন্তত: একটা সুস্থ আবহাওয়া তৈরি হয়। অতি সাম্প্রতিকালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিম-লে সংলাপের মাঝ দিয়ে অনেক সমস্যা নিরসনের চিত্রটা বেশ উৎসাহব্যঞ্ছক বলেই আমরা উল্লেখ করতে পারি।

উদারণস্বরূপ উল্লেখ করাত পারে- অতি সম্প্রতি পাকিস্তানে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট নিরসন হয়েছে সংলাপের মাধ্যমে, বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘সাট ডাউন’ নিয়ে শাসক ডেমোক্রেটিক ও বিরোধী রিপাবলিকান পার্টির মতবিরোধের কারণে আমেরিকার মতো দেশের মৌলিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থার সৃষ্টি হয় এবং নাগরিকরা চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আমেরিকার সেই অচলাবস্থাও সংলাপের মাঝ দিয়ে সমাধান সম্ভব হয়েছে।

অতি সম্প্রতি ইসরাঈল-ফিলিস্তিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতি, সিরিয়াকে নিয়ে মার্কিন সম্ভাব্য সামরিক হামলা সংলাপের মাধ্যমেই রোধ করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের দেশেও অতীতে অনেক সংকটের সমাধানও হয়েছে সংলাপের মাধ্যমেই। যেমনটি বাংলাদেশে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সমস্যার জন্য চুক্তি সম্ভব হয়েছে সংলাপের মাধ্যমে। বাংলাদেশ-ভারত দ্বি-পাক্ষিক পানি চুক্তি সম্ভব হয়েছে সংলাপের মাধ্যমে। ‘তিস্তা’ চুক্তি বিষয়েও দ্বিপক্ষীয় সংলাপ চলছে। আশা করা যায় অচিরেই এর একটা সুরাহা সম্ভব হবে।

তবে সংলাপের ব্যর্থতার ইতিহাসও কম নয়, ২০১৩ সালের শেষ দিকে জাতিসংঘের বিশেষ দূত তারানকোর সংলাপ উদ্যোগ সফল হননি। এরও আগে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্নর জেনারেল স্যার নিনিয়ান স্টিফেন কিংবা পরবর্তীতে মান্নান ভূইয়া-জলিল সংলাপেও অগ্রগতি হয়নি।

এতদ সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন সংগঠন এবং অধিকাংশ মানুষ আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান চাইলেও কার্যত সেটা হচ্ছে না। কূটনীতিবিদরা গোপনে তৎপরতা চালালেও দৃশ্যত তেমন অগ্রগতি নেই। এরপরও সংলাপের প্রয়োজনীয়তা সর্বত্র অনুভুত হচ্ছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে প্রধান দুই দলের নেত্রীদের মাঝে টেলিফোনের মাধ্যমে কথাবার্তা হয়। তখন সংলাপটি ফলপ্রসু না হওয়ায় আজকের এই সংকটটা অনেকটা দায়ি। এর পেছনে অবশ্য দু’পক্ষের পরস্পর আস্থাহীনতা কাজ করছিল। কিন্তু বর্তমানে আন্দোলনরত বিরোধীপক্ষ প্রয়োজনে বিশাল ছাড় দিয়েও সংলাপে গিয়ে সংকট নিরসনে আগ্রহী। ফলে একপক্ষের এই ছাড়ের মানসিকতা আসন্ন সংলাপকে সফল করে তুলতে পারে।

তাই সংলাপ বিষয়ে দেশের বিভিন্ন মহলের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন তা দেখার চেষ্টা করি-

চলমান সংকট নিরসনে সংলাপের তাগিদ দিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এমপি বলেছেন, সংঘাত ও গণতন্ত্র একসঙ্গে চলতে পারে না। সংঘাতের রাজনীতির কারণে গণতন্ত্র এখন বিপন্ন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আসুন এক টেবিলে আলোচনায় বসি এবং সংকট নিরসনের উপায় উদ্ভাবন করি।

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সব বিরোধী দলকে নিয়ে সংলাপে বসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ সব বিরোধী দলের সঙ্গে অবিলম্বে সরকারের আলোচনায় বসা। এই সংলাপ যত দ্রুত হবে ততই দেশ, সরকার এবং বিরোধী দলের জন্য মঙ্গলজনক।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের নেতা ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, এ সংকট থেকে বের হতে দৃশ্যত কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তাই সংকট সমাধানে যারা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত তাদের একত্রিত হতে হবে।

কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, দুই ভাগে সমস্যার সমাধান করা যায়। এক. সংলাপের মাধ্যমে। আরেক. জনগণের মাধ্যমে। সংলাপের মাধ্যমে সমাধান না হলে জনগণ ব্যবস্থা নেবে।

চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দেশের সকল নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ ন্যাপ সভাপতি জেবেল রহমান গাণি।

বিশিষ্ট আইনজীবী, সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে দেশের মালিক জনগণ নয়, মালিক তথাকথিত দুই বড় দল। এক দল দেশকে পুলিশি রাষ্ট্র বানিয়ে জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। আর এক দল সহিংসতার পথ বেছে নিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। তিনি বলেন, সংকট নিরসনে অবিলম্বে একটি জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠানের প্রয়োজন। দেশের সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পেশাজীবী সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই সংলাপ হতে হবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আসম আবদুর রব বলেছেন, দুই দলের জেদাজেদি হিংসা-প্রতিহিংসা, রাগ-ক্ষোভের শিকার হচ্ছে জনগণ। এ অবস্থা বেশি দিন চলতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে আলাপ-আলোচনায় বসা। একটি সমঝোতার পথ খুঁজে বের করা। প্রয়োজনে এজন্য গণভোটেরও ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, সংকট নিরসনে সংলাপের বিকল্প নেই। সর্বত্র একটি ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করছে। দেশের অর্থনীতির সর্বনাশ হচ্ছে। নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত। এ নিয়ে দুই দলের কারও মাথাব্যথা নেই। তাদের চাই ক্ষমতার মসনদ। এ অবস্থার অবসান দরকার। এর জন্য শুধু তথাকথিত দুই দলের মধ্যে সংলাপ হলে লাভ হবে না। সংলাপ হতে হবে সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে।

বাসদের আহ্বায়ক খালেকুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, বড় দুই দলের একদল আরেক দলের ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখতে চায়। তাই তারা সংলাপে বসতে চায় না। তবে জনগণের কথা বিবেচনায় এনে সংলাপে বসা উচিত। আর এই সংলাপ হতে হবে স্বাধীনতাবিরোধী উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তিকে বাদ দিয়ে বাকি সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে।

প্রবীণ বামপন্থী রাজনীতিবিদ ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, সংকট নিরসনে শক্তি প্রয়োগ সরকারকে কর্তৃত্ববাদী করে তুলবে। তাই তাদের রাজনৈতিকভাবেই সংকট সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সংলাপ-আলাপ-আলোচনাসহ বহুমুখী উদ্যোগ। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিকভাবে সংকটের সমাধান করা না গেলে চরমপন্থী, সুযোগসন্ধানী অপশক্তি এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদীদের উত্থান ঘটবে। গণতন্ত্র বিপন্ন হবে, যা দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনবে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, রাজনৈতিক সংকট রাজনৈতিকভাবেই মোকাবেলা করতে হবে। এজন্য সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। বল প্রয়োগ করে, দমন-পীড়ন চালিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না বরং সংকট প্রলম্বিত হবে। তিনি আরও বলেন, এক্ষেত্রে যারা সরকারে আছেন তাদের দায়িত্ব বেশি। আলোচনার দ্বার উন্মোচন করতে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, দুই দলের কাছে দেশের মানুষ আজ জিম্মি। হিংসা-হানাহানির এই ধারা চলতে থাকলে গণতন্ত্র আবার আঘাতপ্রাপ্ত হবে। অসাংবিধানিক শক্তির রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পথ সুগম হবে। তাই যত দ্রুত সম্ভব একটি জাতীয় সংলাপের আয়োজন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

এদিকে অতি সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকায় ৩ দিনের সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। তিনি বলেছেন, অতিদ্রুত রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসা উচিত।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ২০১৩ বছরের ১৬ নভেম্বর নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে হরতাল, অবরোধ ও রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে প্রথমবারের মতো ঢাকায় এসে সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের চেষ্টাও করেছিলেন বিসওয়াল। এছাড়াও বৃটেন, চীন, রাশিয়া, জাপান, ও ইউরোপিয়সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপের আহবান জানিয়ে আসছে।

তবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করার জন্য সরকারের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। তারা সংলাপেও আগ্রহী নয়। উল্লেখ করা যায়-  বিবিসির সংলাপে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেত্রী কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, গত নির্বাচনের আগে আমরা অনেক চেষ্টা করে খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আনতে পারিনি। এখন আমরা নির্বাচিত সরকার। বিশ্বের সব দেশ আমাদের সমর্থন করছে। গত নির্বাচনের আগে মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা হয়নি। দেশে নির্বাচন হয়ে গেছে। তাই আগামী ৫ বছরে কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা হবে না। যদি সংলাপের প্রয়োজন হয় তবে আগামী নির্বাচনের সময় করা হবে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ সংলাপ প্রসঙ্গে বলেছেন, কিসের সংলাপ, কার সঙ্গে সংলাপ? কি নিয়ে সংলাপ হবে? সংলাপের আলোচ্যসূচিই বা কি? তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলাপ-আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু বিএনপির সঙ্গে কি নিয়ে আলোচনা হবে? আর নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় বসতে চাইলে সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত বিএনপিকে অপেক্ষায় থাকতে হবে।

তবে সাধারণ মানুষ মনে করে আওয়ামী লীগ যেহেতু ক্ষমতায় আছে। আর তারা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে দাবি করে, তাই দেশের রাজনৈতক সংকট নিরসনে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। যেমনটি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী টেলিফোনে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীকে সংলাপের আহবান জানিয়েছিলেন। সেই উদ্যোগ সফল না হলেও আওয়ামী লীগের প্রতি জনসমর্থনের একটা সহানুভুতি সৃষ্টি করেছিল। ফলে সংলাপের বিষয়ে যারাই নমনীয় ভ’মিকা রাখবে, তারা জনগণের আনুক’ল্য পাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

এছাড়াও সাধারণ মানুষ মনে করে, দুই নেত্রীর আন্তরিকতা ছাড়া রাজনৈতিক সংকট নিরসন সম্ভব নয়। কোনো সংলাপও কাজে আসবে না। কেননা, এই সংকট- দুটি বড় রাজনৈতিক দলের মধ্যে ক্ষমতায় যাওয়া আর টিকে থাকার দ্বন্দ্বের সংকট৷ আর এই ধরণের দ্বন্দ্বে স্বাভাবিকভাবেই পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতা থাকবে৷তাই সংলাপেরও আগে প্রয়োজন আস্থার জায়গা সৃষ্টি করা৷

তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী রাজনৈতিক জোটের নেত্রীর প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাবো- নিজ নিজ জেত ও স্বার্থের জায়গা থেকে সরে দেশ-জাতির বৃহত্তর স্বার্থে অবিলম্বে সংকট নিরসনে পারস্পরিক আস্থার জায়গা তৈরি করুন এবং যতদ্রুত সম্ভব সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরসন করে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে দেশবাসীকে মুক্তি দিন।

লেখক: শিক্ষা ও সমাজবিষয়ক গবেষক।

ই-মেইল : sarderanis@gmail.com

You Might Also Like