সম্রাটকে গ্রেপ্তারে যুবলীগে কেউ বেজার, কেউ খোশ

যুবলীগের দাপুটে নেতা ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট গ্রেপ্তার হওয়ার পর যুবলীগের কেউ বেজার কেউ খোশ। বেজারদের ভাষ্য, আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া সম্রাট দলের জন্য ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ, যেসব ‘সুশীলরা’ তার বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তারা দলের দুঃসময়ে কোনো কাজে আসেন না। আর যারা খোশ তারা বলছেন, অপকর্মকারীদের এভাবে বাদ দেওয়ার মধ্য দিয়েই দুর্নাম ঘুচবে যুবলীগের।

সম্রাট যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে যে কোনো জনসভায় লোকসমাগমের জন্য তার উপরই নির্ভর করতে হত আওয়ামী লীগকে।

বিভিন্ন জনসভায় বিশাল মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে আসতে দেখা যেত সম্রাটকে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজির নানা অভিযোগের মধ্যেও তার নেতৃত্বাধীন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ সংগঠনের সেরা শাখা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল।

গত মাসে এক সভায় প্রধানমন্ত্রী যুবলীগের কর্মকাণ্ডে বিরক্তি প্রকাশের পর র‌্যাব ঢাকার ক্রীড়া ক্লাবগুলোতে অবৈধ ক্যাসিনোর সন্ধান বের করলে এগুলোর নিয়ন্ত্রণকর্তা হিসেবে উঠে আসে সম্রাটের নাম।

তখন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী সংগঠনের নেতা সম্রাটের পাশে দাঁড়িয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু রোববার গ্রেপ্তার হওয়ার পর সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয় সম্রাটকে।

ক্যাসিনো বন্ধে অভিযানের পর গ্রেপ্তারের গুঞ্জনের মধ্যে ঢাকার কাকরাইলে নিজের কার্যালয়ে কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন সম্রাট; কিন্তু দুদিন পর নিরুদ্দেশ হয়ে যান তিনি।

এর মধ্যে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে খবর ছড়ালেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা নাকচ করে। রোববার সকালে র‌্যাব জানায়, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের একটি বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সম্রাট ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি এনামুল হক আরমানকে।

গ্রেপ্তার সম্রাটকে র‌্যাব নিয়ে আসে ঢাকায়; দুপুরে তাকে নিয়ে তার কাকরাইলের কার্যালয়ে চলে পাঁচ ঘণ্টার অভিযান। সেখানে পিস্তল, মদ, ইয়াবার সঙ্গে ক্যাঙ্গারুর চামড়া উদ্ধারের কথা জানানো হয়। এরপর বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে ছয় মাসের সাজা দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কারাগারে।

কাকরাইলে রাজমনি প্রেক্ষাগৃহের সামনের নয় তলা ভবন ভূইয়া ট্রেড সেন্টারের পুরোটা জুড়েই ছিল সম্রাটের রাজত্ব; সেখানে যুবলীগের নেতা-কর্মী-সমর্থক বেষ্টিত হয়ে সবসময় থাকতেন তিনি।

কিন্তু রোববার গ্রেপ্তার অবস্থায় যখন তাকে আনা হয় সেখানে, তখন আগের সেই ভিড় ছিল না। তবে শ খানেক গজ দূরে রয়েল কিং ফটোকপির দোকানের সামনে কিংবা বিপাশা হোটেলের সামনে জড়ো হয়েছিল যুবলীগের কিছু কর্মী।

পাঁচ ঘণ্টার অভিযান শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে যখন সম্রাটকে বের করা হয়। তখন ওই যুবলীগকর্মীরা স্লোগান দিতে থাকে তাদের নেতার পক্ষে। তা দেখে শুরুতে হকচকিয়ে যাওয়া পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা তৎপর হয় তাদের ছত্রভঙ্গ করতে।

প্রায় শতাধিক কর্মী স্লোগান দিতে থাকে ‘সম্রাট ভাই ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’। পুলিশ তখন রমনা থানার সামনের সড়ক দিয়ে দক্ষিণ দিকে হটিয়ে দেয় তাদের। তিনজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

আটকদের পরিচয় জানতে চাইলে রমনা থানার ওসি মাইনুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এরা নামধারি যুবলীগ, কিন্তু কোনো পদে নেই।”

ক্যাসিনো বন্ধে অভিযানের শুরুর দিনই যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূইয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর সম্রাটের ঘনিষ্ঠ নেতারা আত্মগোপনে চলে যান বলে তাদের এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

সম্রাটের ঘনিষ্ঠ এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অনেকেকেই এখন দেখা যাচ্ছে না। কেউ কেউ গা ঢাকা দিয়েছে, আবার কেউ ইনঅ্যাকটিভ হয়ে গেছে। পরিচিতদের সঙ্গে না পেলে রাজনীতি করাটাই কঠিন হয়ে যায়।”

যুবলীগের আরেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আজ দল ক্ষমতায় আছে। এখন যদি রাজপথে বিরোধীরা কোনো সহিংসতায় মেতে উঠে, প্রশাসন দিয়ে হয়ত তা মোকাবেলা করা যাবে। কিন্তু ক্ষমতা যদি একবার ফসকে যায়, তখন অনুধাবন হবে সম্রাটের মতো ফাইটাদের দলের কতটুকু প্রয়োজন।

“সুশীল দিয়ে রাজনীতি হয় না, রাজনীতি করতে সম্রাট ভাইদের মতো মেগা ফাইটারদের লাগে। মানুষটার জন্য খারাপ লাগে যে এই দলটার জন্য এত শ্রম দিল, তাকেই আজ ছুড়ে ফেলে দিল!”

সম্রাটের স্ত্রী শারমিন চৌধুরীর ভাষ্যে, তার স্বামী দলের পেছনেই সব অর্থ খরচ করতেন বলে তার চেয়ে জনপ্রিয় কেউ ছিল না, তবে জুয়ার অভ্যাস ছিল।

“ওর সম্পদ বলতে কিছুই নাই। ও ক্যাসিনো চালায়া যা ইনকাম করে, তা দলের জন্য খরচ করে। দল চালায়। আর যা থাকে তা দিয়ে সিঙ্গাপুরে বা এখানে জুয়া খেলে।”

গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের একটি কক্ষে ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ছবিও টানানো ছিল।গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়াচক্রের একটি কক্ষে ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ছবিও টানানো ছিল।

এদিকে সম্রাটের গ্রেপ্তারের পর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পাঁচশর মতো নেতা-কর্মীর ভিড় দেখা গেছে রোববার সন্ধ্যায়, যা গত সপ্তাহ দুয়েক দেখা যায়নি। তারা খুশি সম্রাটের গ্রেপ্তারে।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আলী মিন্টু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সম্রাট, খালিদসহ যারা আটক হয়েছে, তাদের সঙ্গে সঙ্গে আনিসের (দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান) মতো পলাতকেদের ধিক্কার জানাই। তাদের জন্য আজকে যুবলীগের দুর্নাম।”

উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, “আজকে যুবলীগ কার্যালয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যে যুবলীগ কার্যালয়ে সারাদিনে গুটিকয়েক লোকজন আসত, এখন আমরা সবাই আনন্দিত।”

‘অনুপ্রবেশকারীদের’ঠেকানোর বিষয়ে তিনি মিন্টু বলেন, “আজকেও কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য নাজমুল হোসেন জুয়েলকে গণধোলাই দিয়ে পার্টি অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যাদের বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের প্রমাণ মিলবে তাকেই গণধোলাই দিয়ে সংগঠন থেকে বের করে দেওয়া হবে।”

এই ‘শুদ্ধি অভিযান’যুবলীগে দাগিদের বাদ দিয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের নেতৃত্বে আসার সুযোগ করে দেবে বলে আশা করছেন সংগঠনটির অনেকেই।

You Might Also Like