হোম » ৬৫ বছরে তুর্কি রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম গ্রিস সফর

৬৫ বছরে তুর্কি রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম গ্রিস সফর

ঢাকা অফিস- Thursday, December 7th, 2017

দীর্ঘ ৬৫ বছর পর তুরস্কের কোনো রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান এই প্রথম গ্রিস সফরে গিয়ে বিরোধপূর্ণ অনেক ঐতিহাসিক ইস্যু নিয়ে দরকষাকষি শুরু করায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে গ্রিক প্রেসিডেন্ট প্রোকোপিস প্যাভলোপুলোসের সঙ্গে বৈঠকে এরদোয়ান দাবি করেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২৩ সালে যে চুক্তির মাধ্যমে তুরস্কের সীমানা নির্ধারিত হয়, তা ন্যায্যভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। এই চুক্তির পুনঃপর্যালোচনা হওয়া উচিত।

নানা ইস্যুতে বিরোধের কারণে দীর্ঘদিন তুরস্কের রাষ্ট্রপ্রধানেরা গ্রিস সফর না করলেও সেই অচলাবস্থা সমাপ্তি ঘটালেন এরদোয়ান এবং তুরস্কের দাবিদাওয়া নিয়ে খোলামেলা কথা বলা শুরু করেছেন। কিন্তু গ্রিক প্রেসিডেন্টও সোজা কথায় তাকে বলে দিয়েছেন, ‘লুজান চুক্তির কোনো পরিবর্তন হবে না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির নাম ‘লুজান চুক্তি’। সুইজারল্যান্ডের লুজানে এই চুক্তির এক পক্ষে তুরস্ক (তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্য) এবং অন্য পক্ষে ব্রিটেন, জাপান, ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস, রোমানিয়া এবং সার্ব, ক্রোট ও স্লোভেনিজ সাম্রাজ্য (সাবেক যুগোশ্লাভিয়া) স্বাক্ষর করে। যে কারণে চুক্তিটি ইতিহাসে লুজান চুক্তি নামে পরিচিত। ওই চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের সীমানা নির্ধারিত হয়। কিন্তু এরদোয়ানের দাবি, চুক্তি ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা হয়নি।

লুজান চুক্তি ছাড়াও আরো অনেক ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে গত কয়েক দশক ধরে সম্পর্ক ভালো যায়নি।

উত্তেজনার উৎস কী?
অনেক ইস্যু। এজিয়ান সাগরে জনবসতিশূন্য দ্বীপপুঞ্জের মালিনাসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিলপ্রায়।

বিভক্ত সাইপ্রাস নিয়েও তারা এখনো কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি। এথেন্সের সাহায্যে সামরিক অভ্যুত্থান হলে এর জাবাবে ১৯৭৪ সালে দ্বীপটির উত্তরাংশে আগ্রাসন চালায় তুরস্ক।

তুরস্ক অভিযোগ করেছে, উত্তর-পূর্ব গ্রিসে তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো হচ্ছে না। এথেন্সে এরদোয়ান বলেছেন, নিজেদের জন্য ধর্মীয় নেতা বা মুফতি বেছে নিতে দেওয়া হয় না তাদের। এই দায়িত্বে গ্রিসের পছন্দমতো লোক নিয়োগ দেওয়া হয়।

গত বছর তুরস্কে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় গ্রিসে পালিয়ে আসা আটজন তুর্কি সেনা কর্মকর্তাকে প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে গ্রিক সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তা নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন এরদোয়ান।

তুরস্কের হাতে অনেক ইস্যু থাকলেও গ্রিস অভিযোগ করেছে, তুর্কি বাহিনী বারবার গ্রিক আকাশসীমা ও নৌসীমা লঙ্ঘন করেছে।

প্রতিবেশী এই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার সূত্রপাত আরো আগে থেকে। ১৮৩০-এর দশকে অটোমান সাম্রাজ্যের কাছ থেকে গ্রিসের স্বাধীনতা লাভের প্রচেষ্টা ও স্বাধীনত অর্জনের সময় থেকে তাদের মধ্যে নানা ইস্যুতে উত্তেজনা জিইয়ে রয়েছে।

এই সফরে কী ঘটতে পারে?
এরদোয়ানের দুই দিনব্যাপী গ্রিস সফরের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপ্রধানেরা যৌথ সংবাদ সম্মেলনে লুজান চুক্তি নিয়ে কথা চালাচালি করেছেন। এরদোয়ান দাবি করেছেন, মুসলিমদের প্রতি যে আচরণ করা হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, লুজান চুক্তি মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে এথেন্স। তিনি দাবি করেন, বিনিয়োগের দিক থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সমর্থন দেওয়া হচ্ছে না… বৈষম্য করা হচ্ছে। লুজান চুক্তির কিছু বিষয় আরো পরিষ্কার করার আহ্বান জানান তিনি।

গ্রিক প্রেসিডেন্ট প্যাভলোপুলোস এরদোয়ানের বক্তব্যের জবাবে বলেছেন, ‘আমাদের কাছে এই চুক্তি অলঙ্ঘনীয়, চুক্তিতে কোনো ফাঁক নেই, এর পর্যালোচনা বা সংস্কারেরও প্রয়োজন নেই। চুক্তি যেমন আছে, বৈধভাবেই আছে।’

বিভিন্ন বিষয়ে মতদ্বৈততা থাকলেও এই চুক্তিকে ঐতিহাসিক বলে অভিহিত করেছেন এরদোয়ান। তার এই সফরে দুই দেশের মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে বেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। এরদোয়ানের সফরকে তুরস্ক-গ্রিসের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য নুতন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র : বিবিসি অনলাইন