হোম » ৪৫ বছরে বাংলাদেশ : প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

৪৫ বছরে বাংলাদেশ : প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

admin- Friday, December 16th, 2016

বিজয়ের ৪৪ বছর পার করে জাতি ৪৫ বছরে পা রেখেছে। আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছি সেসব বীর মুক্তিযোদ্ধাকে, যারা দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় পেয়েছে, অর্জন করেছে স্বাধীনতা, স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঘোষিত স্বাধীনতা পূর্ণতা পায় একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে। আমাদের স্বাধীনতা এসেছে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে জয়লাভের মধ্য দিয়ে। এখানেই আমাদের বিজয় দিবসের গৌরব।

বিজয়ের ৪৫ বছরে আমাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে মতভেদ থাকা স্বাভাবিক। তবে প্রাপ্তির পাল্লা অপ্রাপ্তির চেয়ে অনেক বেশি ভারি। স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি হলেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকায় অল্পদিনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান বঞ্চনার শিকারে পরিণত হয়। তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বাংলাদেশের যোগাযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমুদ্র বন্দরগুলোয় ধ্বংসপ্রাপ্ত জাহাজের কারণে আমদানি-রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়। সর্বোপরি খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব, কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া ইত্যাদি কারণে দেশে কলকারখানায় উৎপাদনে স্থবিরতা দেখা দেয়। এককথায়, অর্থনীতি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দ্বি-বার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৮-৮০) বলা হয়, অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।

ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে শুরুতে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ সাহসের সঙ্গে সে সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে এবং অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় এগিয়ে চলেছে।

৪৫ বছরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাঙ্খিত সফলতা অর্জন করতে না পারলেও অর্জিত সাফল্য মোটেই কম নয়। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৪ অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আমাদের জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ১৩,৫০,৯২০ কোটি টাকা, ১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ১২,৩০৭ কোটি টাকা। মাথাপিছু বার্ষিক জাতীয় আয় দাঁড়িয়েছে ৯২,৫১০ টাকা, মার্কিন ডলারে যার পরিমাণ ১১৯০ ডলার। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৮০-৮৫) অনুযায়ী সত্তরের দশকের শেষদিকেও আমাদের মাথাপিছু বার্ষিক জাতীয় আয় ছিল ১৯৯২ টাকা। দেশের ৭৫ শতাংশ মানুষের অবস্থান ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দারিদ্র্যসীমার নিচে। ১৯৯০ সালে দারিদ্র্যের হার ৫৬.৬ শতাংশে নেমে আসে এবং ২০১০ সালে তা দাঁড়ায় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে। সার্বিক খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জন না করলেও আমরা প্রধান খাদ্য চালে স্বনির্ভরতা অর্জনে প্রায় সক্ষম হয়েছি। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে যেখানে চালের উৎপাদন ছিল ৯৯ লাখ ৩০ হাজার টন, সেখানে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চালের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৪২ লাখ টনে। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা দ্বিগুণ হলেও চালের উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণের বেশি। মাছে-ভাতে বাঙালি- এ প্রবাদের যথার্থতা প্রমাণ করতে আমরা গত তিন দশকে মাছের উৎপাদন ৭ দশমিক ৫ লাখ টন থেকে ৩৫ লাখ টনে উন্নীত করতে পেরেছি। বিশ্বে মাছ উৎপাদনে আমাদের অবস্থান চতুর্থ। আমাদের ওপরে অবস্থান করছে চীন, ভারত ও মিয়ানমার। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্প খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। জিডিপিতে এ খাতের অবদান ক্রমশ বাড়ছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৪ অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জিডিপিতে এ খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ২৯ দশমিক ৬১ শতাংশে। সত্তরের দশকে জিডিপিতে এ খাতের অবদান ছিল মাত্র ৮.১ শতাংশ।

বাংলাদেশ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি করেছে। স্বাধীনতার প্রাক্কালে ২৫ শতাংশ শিক্ষিতের হার এখন ৬০ শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে তাকে বিপ্লব বললেও হয়তো বেশি বলা হবে না। প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে বাংলাদেশ জেন্ডার বৈষম্য বিলোপ করে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীর মধ্যে সংখ্যাসাম্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। ২০১১ সালে প্রাথমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীর অনুপাত দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৯.৬০ ও ৫০.৪০ শতাংশ।

স্বাস্থ্য খাতের কিছু সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। শিশুমৃত্যুর হার (প্রতি হাজার জীবিত জন্ম) ১৪৬ থেকে নেমে এসেছে ৩৩-এ। মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি এক লাখে হ্রাস পেয়ে ১৯৪ জনে উপনীত হয়েছে। ম্যালেরিয়া বলা যায় নির্মূল হয়েছে। চার দশক আগে যেখানে নারী-পুরুষ উভয়ের প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল ছিল ৪৪ বছর, এখন তা দাঁড়িয়েছে ৬৯ (পুরুষ ৬৭.৯ ও মহিলা ৭০.৩) বছরে।

ফলে বাংলাদেশ সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে প্রশংসনীয় সাফল্য লাভ করেছে। এমডিজির মোট ৮টি লক্ষ্যের মধ্যে ৪, ৫ ও ৬নং লক্ষ্য অর্থাৎ শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, এইচআইভি এইডস ও ম্যালেরিয়া দমনে বাংলাদেশ সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। এছাড়া ১, ২ ও ৩নং লক্ষ্য যথা- দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্ষুধা নিবারণ, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা এবং নারী-পুরুষের বৈষম্য দূরীকরণ ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের সাফল্য এমডিজির লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। আমাদের ছেলেমেয়েরা- মুসা ইব্রাহিম, মুহিত, নিশাত মজুমদার এবং ওয়াসফিয়া নাজনীন বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করে দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন।

আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গনে আমাদের অর্জন কম নয়। আমাদের ছেলেরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ২০১১ সালে বিশ্বকাপ এবং ২০১৪ সালে টি২০ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসর বসেছিল বাংলাদেশে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমাদের মেয়েরাও পিছিয়ে নেই। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গনে অন্যান্য ইভেন্টেও আমাদের ছেলেমেয়েরা তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।

অনেক সাফল্যের সঙ্গে রয়েছে ব্যর্থতাও। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত বাংলাদেশের সংবিধানে বিধান করা হয় প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হবে। সংবিধান গৃহীত হওয়ার দুবছর পার হতে না হতেই ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে গণতন্ত্রের টুঁটি চেপে ধরা হয়। বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয় একদলীয় শাসন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ১০ বছরের বেশি সময় সামরিক শাসনামলে গণতন্ত্র থাকে নির্বাসিত।

নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিকে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও বড় দুদল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সংঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে ১৯৯১-২০১৩ সময়কালে তাদের প্রায় পালাক্রমিক শাসনামলে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় গণপ্রত্যাশার কেন্দ্রস্থল জাতীয় সংসদ বহুলাংশে অকার্যকর থেকে যায়। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে একতরফা ও ভোটারবিহীন দশম সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কপালে এঁটে দেয় কলংকের তিলক। নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এ কলংক-তিলক মুছে ফেলতে হবে। সমুন্নত রাখতে হবে সংবিধানের নির্দেশনা।

শাসক দল আওয়ামী লীগের নেতারা একতরফা দশম সংসদ নির্বাচনের সাফাই গাইতে এখন গণতন্ত্রের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের চেষ্টা করছেন। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে তারা গণতন্ত্রকে কাটছাঁট করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছেন। একজন বিতর্কিত কলামিস্টও একই সুরে কথা বলছেন। তিনি বলেছেন, জঙ্গিবাদের চেয়ে সীমিত গণতন্ত্র ভালো। বলা বাহুল্য, বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রাখাই এর উদ্দেশ্য। তবে এ উদ্দেশ্য সফল হবে কি-না, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

গত ৪৩ বছরে মানবাধিকার বারবার লংঘিত হয়েছে। একদলীয় শাসন, সেনাশাসন ও সেনাসমর্থিত শাসনামলে মানুষের বাকস্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারসহ অনেক মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ, ২০০৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত দি ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রটেকশন অব অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিসাপিয়ারেন্সেস (আইসিপিপিইডি) এবং আমাদের সংবিধানের নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে ঘটানো হচ্ছে আটকাবস্থায় খুন, আইনবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ। আটকাবস্থায় খুন ও আইনবহির্ভূত হত্যা আগে সংঘটিত হলেও গুমের ব্যাপকতা লক্ষ করা গেছে শাসক দলের অব্যবহিত আগের ও বর্তমান শাসনামলে।

দারিদ্র্যের হার কম-বেশি ৩১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এলেও সরকারি হিসাবমতে বর্তমানে সাড়ে চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। বাজারে খাদ্য থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার অভাবে এরা উচ্চমূল্যে প্রয়োজনীয় সুষম খাদ্য সংগ্রহ করতে পারে না। এদের মধ্যে চরম দরিদ্র ৮ শতাংশ মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে।

দুর্নীতি আজ বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। গত দেড় দশকের কম সময়ে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি তালিকায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান লজ্জাজনক।

আগেই বলেছি, কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতা থাকলেও আমাদের প্রাপ্তির পাল্লা অপ্রাপ্তির চেয়ে অনেক বেশি ভারি। ব্যর্থতাগুলোকে জয় করে সফলতা অর্জন করতে পারলে তা বাংলাদেশের এগিয়ে চলার পথকে আরও মসৃণ করে তুলবে। সার্থক হবে বিজয় দিবস উদ্যাপন।