৩ নভেম্বর : ১৫ই আগস্টের পর মধ্যবর্তী আড়াই মাসে কী ঘটেছিল

চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর জেলের অভ্যন্তরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ৪৫ বছর কেটে গেছে। দিবসটি প্রতিবছর পালিত হয় এবং আমরা চার শহীদ জাতীয় নেতাকে স্মরণ করি ও শ্রদ্ধা জানাই। ইতিহাস এখানেই থেমে থাকতে চায় না। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট। তার আড়াই মাস পর ৩ নভেম্বর জেলে বন্দি অবস্থায় চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল। এই আড়াই মাস দেশে কোনো বৈধ অথবা অবৈধ সরকারের অস্তিত্ব ছিল না। বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক আহমদকে সামনে খাড়া রেখে চার খুনি মেজর ও কর্নেলের নির্দেশে ঢাকার শাসন পরিচালিত হচ্ছিল। প্রেসিডেনশিয়াল ডিক্রির জোরে শাসন চলছিল। এই শাসন না সামরিক, না অসামরিক। সারা দেশে এই শাসনের থাবা তখনো বিস্তৃত হয়নি।

তাহলে এই দুই হত্যাকাণ্ডের মধ্যবর্তী সময়ে দেশে নৈরাজ্য চলাকালে এবং জেনারেল জিয়াউর রহমান ষড়যন্ত্রের হোতা হিসেবে সামনে না আসা পর্যন্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে কী চলছিল? তখন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগ বিমূঢ় হয়ে পড়লেও তার সাংগঠনিক শক্তি হারায়নি। আবদুল মালেক উকিল, মহিউদ্দীন আহমদ, ড. কামাল হোসেনের মতো শক্তিশালী নেতারা তখনো বাইরে ছিলেন। কেউ হয়তো দেশে এবং কেউ বিদেশে ছিলেন। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতৃত্ব ছিল অটুট। তাঁরা প্রতিরোধের ডাক দিতে পারতেন। দিলেন না কেন?

বাকশালের অন্তর্ভুক্ত সিপিবি তখনো অত্যন্ত শক্তিশালী দল ছিল। শক্তিশালী ছিল ছাত্র ইউনিয়ন। মওলানা ভাসানী ও কমরেড মণি সিংহের মতো রাজনৈতিক নেতা তখনো জীবিত ও প্রভাবশালী নেতা। বঙ্গবন্ধু হত্যা এবং চার জাতীয় নেতার হত্যার মধ্যবর্তী সময়ে তাঁদের ভূমিকা কী ছিল? মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জেনারেল খালেদ মোশাররফ কেন ক্ষমতা দখল এবং জিয়াউর রহমানকে বন্দি করার পরও চার জাতীয় নেতাকে কারামুক্ত করতে দেরি করলেন এবং নিজে ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন?

তখন নবগঠিত জাতীয় সমাজতন্ত্রী দল অত্যন্ত শক্তিশালী। জিয়াউর রহমান তাদের সাহায্যে ক্ষমতা দখলের পর হঠাৎ তাদের ওপর সামরিক অভ্যুত্থানের দায় চাপিয়ে কেন জেলে ঢোকান এবং বিচার প্রহসনে তাদের অন্যতম নেতা কর্নেল তাহেরকে হত্যা করেন? বঙ্গবন্ধু হত্যা ও জেলহত্যার মধ্যবর্তী আড়াই মাস জাসদের ভূমিকা কী ছিল? সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, যাঁরা একসময় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, পরে তাঁর রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ, তাঁরা এই মধ্যবর্তী সময়টা কী করছিলেন? জাসদ তখন অবিভক্ত এবং দেশের তরুণসমাজের কাছে অত্যন্ত প্রিয়, তা জেনেও জাসদের একাধিক নেতাকে ফাঁসির আদেশ দিতে জিয়াউর রহমান সাহসী হলেন কিভাবে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বাংলাদেশে তখন আওয়ামী লীগের পর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সবচেয়ে শক্তিশালী। বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রও তাদের পছন্দ নয়। তাদের পছন্দ আরেক পা এগিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। ডানপন্থী সাম্প্রদায়িক দল মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম তখন দেশে নিষিদ্ধ ও ছিন্নভিন্ন। জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ডে। এ অবস্থায় জাসদ বিশ্বাস করত, সেনাবাহিনীর ‘মুক্তিযোদ্ধা’ জেনারেল জিয়াউর রহমান তাদের সমর্থক। তিনি পিপলস আর্মি বা গণবাহিনী গঠনের ব্যাপারে কর্নেল তাহেরের পরিকল্পনার সমর্থক। বঙ্গবন্ধু তাঁর গণবাহিনী গঠনসংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। কিন্তু জিয়াউর রহমান সমর্থন করায় বঙ্গবন্ধু হত্যার পর খালেদ মোশাররফদের পাল্টা অভ্যুত্থানের সময় কর্নেল তাহের তাঁর অনুগত সেনাবাহিনীর একাংশকে নিয়ে জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার করেন এবং তাঁকে ক্ষমতা দখলে সাহায্য করেন।

জাসদ যদি বিশ্বাসঘাতক জিয়াউর রহমানের মিথ্যা আশ্বাসের ওপর বিশ্বাস স্থাপন না করে রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে অথবা মাও জেদংয়ের কায়দায় বিশাল জনতা নিয়ে লংমার্চ করে ক্ষমতা দখল করত, তাহলেও বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির এত ক্ষতি ঘটত না।

এখানেই কি জাসদ রাজনীতিতে লেনিন কথিত ইনফেনটাইল অ্যাডভেঞ্চার বা শিশুসুলভ বিপ্লব ঘটাতে যায়নি? এবং নিজেদের রাজনৈতিক মূর্খতায় জিয়াউর রহমানের মতো এক পাকিস্তানপন্থী সেনাপতির হাতে দেশের সর্বময় ক্ষমতা তুলে দেননি? ক্ষমতা হাতে পেয়ে জাসদকে ধ্বংস করে জিয়াউর রহমান কি পাকিস্তানপন্থী ও একাত্তরের পরাজিত রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় এনে তাদের শক্তি সঞ্চয় করতে দেননি? তখন কোথায় ছিল জাসদের তাত্ত্বিক ‘কার্ল মার্ক্স’ সিরাজুল আলম খানের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব? আরো বিস্ময়কর কথা, জাসদের মূল আদর্শ যদি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র হয়, তাহলে দল গঠনের সময় তারা তাজউদ্দীন আহমদকে তাদের সভাপতির পদ গ্রহণের অফার দিয়েছিল কিভাবে?

তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর মতো গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। তিনি জাসদের অফার প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে রাজি হননি। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রমাণ করার জন্যই সম্ভবত তিনি আরো তিনজন জাতীয় নেতাসহ আত্মদান করেন। কিন্তু প্রশ্নটি রেখে যান, বঙ্গবন্ধু হত্যায় জাসদের কি ভূমিকা ছিল? ত্রিধাবিভক্ত জাসদ নেতারা কোনো ভূমিকা ছিল না বলে দাবি করেন। তাহলে প্রশ্ন, মুক্তিযুদ্ধের চার জাতীয় নেতাকে জিয়াউর রহমান ও মোশতাক আহমদের হত্যা চক্রান্ত থেকে বাঁচাতে প্রতিরোধ আন্দোলনে তাঁরা নামেননি কেন? আড়াই মাস সময় তাঁদের হাতে ছিল। নাকি তাঁরা বুঝতে পারেননি, জিয়াউর রহমানের বিশ্বাসঘাতকতার খড়্গ এবার কর্নেল তাহেরসহ তাঁদের অন্যান্য নেতার মাথায় নেমে আসবে?

বিখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক লুই ফিশার ‘তৃতীয় রাইখের পতন’ নামের বইয়ে লিখেছেন, ‘যখন কোনো দেশের বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা ভুল করেন এবং দেশটির শক্তিশালী বাম রাজনীতিতে কোন্দল তুঙ্গে ওঠে, তখন ফ্যাসিবাদী ডিক্টেটরশিপের সহজ আবির্ভাব হয়। তিনি দেখিয়েছেন, ত্রিশের জার্মানিতে ক্ষমতায় যাওয়ার মতো শক্তি ও প্রভাব কোনোটাই হিটলারের ছিল না। এই সময় জার্মানিতে খুবই শক্তিশালী ছিল কমিউনিস্ট ও সোশ্যালিস্ট পার্টি। কিন্তু এই দুই দলের মধ্যে প্রচণ্ড কলহ বিরাজিত ছিল। কলহের বিষয়টি কি ছিল? সদ্য প্রতিষ্ঠিত সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো ষড়যন্ত্র আঁটছে এবং এই ষড়যন্ত্র থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করাই জার্মান বাম রাজনীতির একমাত্র কর্তব্য বলে তারা দাবি করে এবং সোশ্যালিস্ট দল তার বিরোধিতা করে। দুই দলের মধ্যে এই বিরোধ দৈহিক মারামারিতেও রূপান্তরিত হয়েছিল।

বামপন্থীদের এই মারামারির আড়ালে ফ্যাসিস্টরা তাদের শক্তি বৃদ্ধি করছিল। বামপন্থীরা সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষা করার চিন্তায় এত বিভোর ছিল যে নির্বাচনে তাদের অনৈক্যের ফলে হিটলার জিতে যান এবং হিন্ডেনবার্গের দুর্বল গণতান্ত্রিক সরকার সহজেই হিটলারের হাতে সর্বময় ক্ষমতা তুলে দেয়। হিটলার ক্ষমতায় বসেই কমিউনিস্ট ও সোশ্যালিস্ট দুই দলের নেতাকর্মীদেরই হত্যা করতে শুরু করেন।

জার্মানিতে হিটলার যা করেছিলেন, বাংলাদেশের জিয়াউর রহমান প্রায় অনুরূপ কাজ করেছেন। একই খড়্গে আওয়ামী লীগ ও জাসদকে খতম করতে চেয়েছেন। সবচেয়ে বড় ভুল করেছে মণি সিংহের কমিউনিস্ট পার্টি। সুবিধাবাদী রাজনীতির এত বড় নজির আর নেই। বঙ্গবন্ধু শহীদ হতেই তারা জিয়াউর রহমানকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে টেনে আনতে পারবে এই আশায় তাঁকে সমর্থন দিতে শুরু করে। কমরেড ফরহাদ জিয়াউর রহমানের খাল কাটা প্রকল্পে এক শ স্বেচ্ছাকর্মী দেওয়ার ঘোষণা দেন। এই সময় জিয়াউর রহমানকে সমর্থন দেওয়া সংগত, এটা দিল্লির কমরেডদের বোঝানোর জন্য সিপিবি নেতারা দিল্লি যাবেন, তার প্রাক্কালে জিয়াউর রহমান কমিউনিস্ট পার্টির ওপর চরম আঘাত হানেন। দলের নেতাকর্মীদের পাইকারি হারে গ্রেপ্তার শুরু হয়। পার্টির ধরা না পড়া নেতারা আত্মগোপন করেন।

এটা চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পরবর্তী ঘটনা। আমি প্রয়াত কমরেড অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, স্যার, চার জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ডের পরও আপনারা কী করে বিশ্বাস করতে পেরেছিলেন জিয়াউর রহমান সোভিয়েত বলয়ের পক্ষাবলম্বন করবে? মোজাফফর আহমদ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ রসিকতার সুরে বলেছিলেন, আমরা ওহি পেয়ে রাজনীতি করি। তাই এই ভুলটা হয়েছে।

চার জাতীয় নেতাকে কেন জেলের ভেতর হত্যা করা সম্ভব হলো তা জানতে হলে লুই ফিশারের মতো কোনো সাংবাদিককে তখনকার গণতান্ত্রিক ও বাম গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভুলগুলো জানতে হবে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল আকস্মিকভাবে; কিন্তু চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল দীর্ঘ সময় কারাগারে রেখে। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁদের রক্ষা করার জন্য দেশে গণতান্ত্রিক শক্তি নিজেদের বিভিন্ন স্বার্থ-সুবিধা ও তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ভুলে কেন এক হতে পারল না? দেশে যে ফ্যাসিবাদ আসছে তা কেন বুঝতে পারল না? এই প্রশ্নের জবাবের মধ্যে ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ডের মূল প্রশ্নের জবাব নিহিত রয়েছে।

চার জাতীয় নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে মুক্তিসংগ্রামের চার অধিনায়ক। তাঁরা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের আদর্শে দৃঢ় বিশ্বাসী এবং তাঁর দৃঢ় অনুসারী। তাঁদের বাঁচিয়ে রাখলে তাঁদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা আবার ঐক্যবদ্ধ হবে এবং জিয়া-মোশতাক চক্রের সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেবে—এই ভয় থেকেই ১৫ই আগস্টের ঘাতকের দল ৩ নভেম্বরের কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির অনৈক্য ও ভুল এই হত্যাকাণ্ডে ঘাতক শক্তিকে সাহস জুগিয়েছে।

ভুল ছিল শহীদ চার জাতীয় নেতারও। বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে সঙ্গে কেন তাঁরা সহজেই ধরা দিলেন? কেন আত্মগোপনে গেলেন না? ১৯৭২ সালে ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত পারস্পরিক মৈত্রী ও নিরাপত্তা চুক্তির (যে চুক্তি সম্পর্কে আওয়ামী লীগ নেতারা অত্যন্ত বিব্রত বোধ করতেন) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশকে রক্ষার কাজে ভারতের সাহায্য কামনা করলেন না?

সিপিবি ও ন্যাপের (মোজাফফর) এবং জাসদের ভূমিকা সম্পর্কে আগেই প্রশ্ন রেখেছি। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আপস করার জন্য খালেদ মোশাররফ কেন নিরস্ত্রভাবে দুজন সহযোগী নিয়ে ‘বিশ্বাসঘাতকের ডেরায়’ গেলেন—সেটাও একটা প্রশ্ন। পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তিনি কেন জেলে বন্দি চার জাতীয় নেতাকে সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি দিয়ে নিরাপত্তা দিলেন না—এটাও এক প্রশ্ন। অনেকের ধারণা, তিনি সময় পাননি। কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর নিজেকে ব্রিগেডিয়ার থেকে জেনারেল র্যাংকে উন্নীত করার অনুষ্ঠান করায় তিনি যদি পুরো একদিন ব্যয় করতে পারেন, তাহলে চার জাতীয় নেতাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে তাঁদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারলেন না কেন?

অনেকে বলেন, তখনকার তথাকথিত চীনপন্থী ও ঘোরতর আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী ‘হলিডে’র এনায়েতুল্লাহ খানের গ্রুপের পাল্লায় পড়ে খালেদ মোশাররফ চার জাতীয় নেতার মুক্তিদানে বিলম্ব করছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের কয়েকজনকে বিদেশে চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। এই খবরটি সঠিক হলে এটা জেনারেল খালেদ মোশাররফের জন্য দারুণ ভুল পদক্ষেপ। প্রশ্ন—এই ভুলটি তিনি কেন করেছিলেন? সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে খালেদ মোশাররফ জেনারেল পদে উন্নীত হওয়ার অনুষ্ঠানে এনায়েতুল্লাহ খান মিন্টু তাঁর বুকে জেনারেলের ব্যাজ পরিয়ে দিচ্ছেন। খালেদ মোশাররফ নিহত হওয়ার পর দেখা গেল, জিয়াউর রহমানের দরবারে এনায়েতুল্লাহ খান হাজির। জিয়াউর রহমান তাঁকে রাষ্ট্রদূত বানিয়েছিলেন।

প্রতিবছর ৩ নভেম্বর এলে আমরা শহীদ চার জাতীয় নেতাকে স্মরণ করি, শ্রদ্ধা জানাই। লুই ফিশারের মতে, শ্রদ্ধা জানানোটাই শেষ কথা নয়। কেন জাতীয় নেতাদের প্রাণ দিতে হলো, এই প্রাণদানের পেছনে কী কী ষড়যন্ত্র ও ভ্রান্তি রয়েছে তার অনুসন্ধান করে ইতিহাসের সব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। নইলে কোনো জাতির সঠিক ইতিহাস তৈরি হতে পারে না, জাতিটির শহীদ নেতাদের আদর্শ ও লক্ষ্যেরও পরিমাপ করা যায় না। ধরে রাখা তো দূরের কথা।

৩ নভেম্বর তাই প্রতিবছর আসে। আমরা শহীদ জাতীয় নেতাদের শুধু শ্রদ্ধা জানাই। তাঁদের আদর্শে পুনরায় দীক্ষা নিতে চাই না। আর এই দীক্ষা নিতে হলে ইতিহাসের জটিল প্রশ্নগুলোর সঠিক ও সাহসী জবাব আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। ৩ নভেম্বরে জাতীয় নেতারা ক্ষমতায় ছিলেন না। ছিলেন বিচারাধীন অভিযুক্ত হিসেবে জেলে বন্দি। তার পরও তাঁদের বিচারে দণ্ড না দিয়ে জেলে পাগলা ঘণ্টি বাজিয়ে হত্যা করা হলো কেন? ঘাতকদের হাতে জেলে ঢোকার জন্য অবৈধ প্রেসিডেন্টের অবৈধ অনুমোদনপত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল কেন, তার জবাব জানার জন্য লুই ফিশারের মতো একজন অনুসন্ধিত্সু সাংবাদিক আমাদের দরকার। যিনি জার্মানিতে ঘাতক ফ্যাসিবাদের উত্থানের পেছনে ইতিহাসের অজানা প্রশ্নগুলোরও জবাব খুঁজে পেয়েছিলেন।

লন্ডন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২০