৩ দশকের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভয়াবহ ধস

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গত দুই বছর ধরে প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) প্রবাহে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ধসের এই প্রবণতাকে গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। এদিকে বৈশ্বিক বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশেও রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক কমে গেছে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ চলতি বছরের শেষে বাড়ার ইঙ্গিত দিলেও প্রথম তিন মাসেই কমেছে ১৫ দশমিক ২৫ শতাংশ।

যুক্তরাষ্টের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে অভিবাসন ও উন্নয়ন বিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার বিশ্বব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ওয়াশিংটন থেকে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৪২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে নেমেছে। গত ২০১৫ সালে দেশগুলোর রেমিট্যান্স আয় ছিল ৪৪ হাজার কোটি ডলার। ভূ-মধ্যসাগরীয় দেশগুলো ও রুশ ফেডারেশনে তেলের দরপতন ও দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি ইউরোপে দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে আফ্রিকার উত্তর ও সাহারা মরু অঞ্চলের দেশগুলোর প্রবাসী আয় কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেমিট্যান্স গ্রহীতার অবস্থান ধরে রেখেও ভারতের প্রবাসী আয় গতবছর ৮ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ৬ হাজার ২৭০ কোটি ডলারে নেমেছে। ২০১৫ সালে এই আয় ছিল ৬ হাজার ৮৯০ কোটি ডলার। অন্য শীর্ষ রেমিট্যান্স গ্রহীতা দেশগুলোর মধ্যে গতবছর বাংলাদেশের প্রবাসী আয় ১১ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে ২ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে প্রবাসীরা ১ হাজার ৩৬১ কোটি ডলার প্রবাসী আয় দেশে পাঠিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে এসেছিল ১ হাজার ৫৩২ কোটি ডলার। সে হিসাবে গতবছর প্রবাসী আয় আগের বছরের চেয়ে ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ কমেছে।

রেমিট্যান্স সংগ্রহকারী ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে ব্যাংকিং চ্যানেল ও খোলাবাজারে মার্কিন ডলারের দামের পার্থক্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন টাকার বেশি। তাই বেশি লাভের আশায় অনেকেই অবৈধ পথে দেশে প্রবাসী আয় পাঠানোর পথ বেছে নিচ্ছেন। এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে পাউন্ড, ইউরো, রিঙ্গিত, সিঙ্গাপুর ডলার প্রভৃতি মুদ্রার মূল্যমান কমে গেছে। ফলে এসব দেশের শ্রমিকদের আয়ের বিপরীতে বাংলাদেশি টাকা কম পাওয়া যাচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হুন্ডিতে রেমিট্যান্স আসায় প্রবাসী আয়ও কমে গেছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিক পতনে উদ্বিগ্ন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি কয়েক দফায় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুটি প্রতিনিধি দল মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় সরেজমিন তদন্তে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক চলতি বছর শেষে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিলেও বাংলাদেশের প্রবাহ ক্রমাগত কমছে। গত ফেব্রুয়ারিতে এক মাসে গত ৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স এসেছে। সর্বশেষ চলতি বছরের তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ৩০২ কোটি ৭৬ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। গত বছরের এই সময়ে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৫৭ কোটি ২৪ লাখ ডলার। এ হিসেবে গত বছরের একই সময়ে তুলনায় চলতি বছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমেছে ১৫ দশমিক ২৫ শতাংশ।

বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ের নেতিবাচক প্রবণতা প্রথম দেখা দেয় ২০১৩ সালে। ওই বছরে প্রবাসীরা ১ হাজার ৩৮৩ কোটি ডলার পাঠান, যা ২০১২ সালের তুলনায় ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ কম ছিল। এরপর ২০১৪ সালে প্রবাসী আয়ে ৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটে। ওই বছর মোট ১ হাজার ৪৯২ কোটি ডলার আয় দেশে আসে। এরপর ২০১৫ সালেও প্রবাসী আয়ে ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে অনুযায়ী, শীর্ষ রেমিট্যান্স গ্রহীতা দেশগুলোর মধ্যে নাইজেরিয়ার ১০ শতাংশ ও মিশরের আয় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কমেছে। তবে মেক্সিকো ৮ দশমিক ৮ শতাংশ ও ফিলিপাইনে গত বছর রেমিট্যান্স বেড়েছে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ হারে। তেলের মূল্য হ্রাস ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আর্থিক সংকটের কারণে ২০১৬ সালে সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবাসী আয় ৬ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ১১ হাজার কোটি ডলারে নেমেছে। এ অঞ্চলের রেমিট্যান্স ২০১৭ সালে ২ শতাংশ বেড়ে ১১ হাজার ২০০ কোটি ডলারে উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সালে বিশ্বজুড়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ আগের বছরের চেয়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে ৫৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে নেমেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রেমিট্যান্সের প্রবাহে চলতি বছর অগ্রগতি হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৭ সালে এসব দেশে প্রবাসী আয় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৪৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে উঠতে পারে বলে বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস।

বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ইন্ডিকেটরস গ্রুপের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রিতা রামালহো বলেন, উন্নয়নশীল বিশ্বে লাখো পরিবারের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস প্রবাসী আয়। এই আয় প্রবাহ কমে গেলে এসব পরিবারের স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা ও যথাযথ পুষ্টির চাহিদা পূরণের ক্ষমতায় মারাত্মক প্রভাব পড়বে।

You Might Also Like