২০০ কোটি টাকার ৩১ বিলাসবহুল গাড়ির নিলাম হচ্ছে

কারনেট সুবিধাসহ নানা জালিয়াতির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে জব্দ হওয়া ৩১ বিলাস বহুল গাড়ি নিলামে তোলা হচ্ছে। যার বাজার মূল্য রয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

শিগগিরই এ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। নানা জালিয়াতির অভিযোগে জব্দ হওয়া ৩১টি গাড়ি আজ (বৃহস্পতিবার) কাস্টমসের বিমানবন্দর এলাকায় নিজস্ব গুদামে জমা দেওয়া হবে। এরপরই শুরু হবে নিলাম প্রক্রিয়া। তবে গাড়ির মালিক চাইলে জরিমানাসহ শুল্ক পরিশোধ করে গাড়ি ফেরত নিতে পারবেন বলেও শুল্ক বিভাগ সূত্র রাইজিংবিডিকে জানিয়েছে।

জব্দকৃত গাড়িগুলোর মধ্যে অধিকাংশ কারনেট সুবিধায় এনে বিদেশে ফেরত না নিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়। ফলে উচ্চ সিসির গাড়িগুলো থেকে সরকার মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারায়। এ ছাড়া মিথ্যা ঘোষণা ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমেও শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে এসব বিলাস বহুল গাড়িতে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর এসব অভিযোগে গত ৮ মাসে ৩১ গাড়ি জব্দ করে। যার সবগুলোই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নামি ব্রান্ডের। এর মধ্যে রয়েছে বিএমডব্লিউ, বিএমডব্লিউ এক্স ৫, মার্সিডিজ বেঞ্জ।

বিলাস বহুল গাড়িগুলো মধ্যে রয়েছে ধানমন্ডিস্থ বেলায়েত হোসেন বেলাল নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে অবৈধভাবে বা চোরাচালানের মাধ্যমে জাল কাস্টমস দলিলাদি ব্যবহার করার অভিযোগে ৭ কোটি টাকার মূল্যের একটি মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়ি।

রাজধানীর গুলশান-২ এলাকা থেকে জাফর সাদেক চৌধুরীর নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি জব্দ করা হয়। যেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

গুলশান এলাকা থেকে দুবাই এভিয়েশন করপোরেশনের নামে এয়ার সার্ভিসেস এগ্রিমেন্টের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানির সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও সঠিক তথ্য গোপন করে ল্যান্ডরোভার জিপ, রেঞ্জ রোভার জিপ, রোলস রয়েস সিডান কার এবং মার্সিডিজ বেঞ্জ সিডান কার ব্র্যান্ডের চারটি গাড়ি আমদানি করা হয়। যার মাধ্যমে প্রায় ৩৪ কোটি ১৪ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

গত ৪ এপ্রিল গুলশান-২ এলাকা থেকে কাজী রেজাউল মোস্তফার কাছ থেকে ভুয়া রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ করার অভিযোগে ৩ কোটি টাকা মূল্যের বিএমডব্লিউ এক্স ৫ জব্দ করা হয়।

৬ এপ্রিল মডেল জাকিয়া মুন ও তার স্বামী শফিউল আজম মহসীনের বাড়ি থেকে ৩ কোটি টাকা মূল্যের একটি পরসি জিপ জব্দ করা হয়।

৯ এপ্রিল সিলেট এয়ারপোর্ট রোড থেকে আব্দুল মালেক নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে সিলভার রংয়ের মার্সিটিজ বেঞ্জের একটি গাড়ি জব্দ করা হয়। এতে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে দেড় কোটি টাকা।

১২ এপ্রিল বনানী থেকে জাকির হোসেন নামে একজনের কাছ থেকে ৩ কোটি টাকা মূল্যের বিএমডব্লিউ সিডান গাড়িটি জব্দ করা হয়।

১৯ এপ্রিল সিলেটের লামাবাজার থেকে মনসুর মিয়া নামের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৪ কোটি টাকার মূল্যের লেক্সাস গাড়ি জব্দ করা হয়।
lambo

২৪ এপ্রিল ঢাকার গুলশানের এবিকো লিমিটেড থেকে ৩ কোটি টাকার মূল্যের একটি পোরশে ব্রান্ডের গাড়ি জব্দ করা হয়।

কারনেট সুবিধায় আনা অ্যাপোলো হাসাপাতালের পার্কিং এলাকা থেকে রেঞ্জ রোভার একটি গাড়ি জব্দ করা হয়। বিলাস বহুল গাড়ির মূল্য সাড়ে ৩ কোটি টাকা।

৩ মে রাজধানীর বনানীর ভারসাটাইল অটোমোবাইল বিলাসবহুল সাদা ‘ওডিআর৮’ রেসিং গাড়ি জব্দ করা হয়। ২০১৩ সালে মংলা বন্দর দিয়ে গাড়িটির ছাড় হয়েছে ‘ওডি টিটি ২৫০০ সিসি হিসেবে। কিন্তু পাওয়া গেছে ‘ওডিআর৮’ ৫২০০ সিসি, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা।

এ বছরের ২৫ শে মে তেজগাঁও এলাকায় ৩৪৫ নম্বরের মাল্টিব্রান্ড ওয়ার্কশপ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় বিএমডব্লিউর আরেকটি গাড়ি জব্দ করে শুল্ক গোয়েন্দা। গাড়িতে ঢাকা মেট্রো শ ০০-০৫০১ ভুয়া প্লেট ব্যবহার করা। গাড়িটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা।

৩১ মে ঢাকার উত্তরার সেক্টর-৯ থেকে মেট্টো-ঘ-০২-২০৩২ নম্বরের ৫ কোটি টাকার হার্ড জিপ ল্যান্ড ওভার গাড়িটি জব্দ করা হয়।

চলতি বছরের ৬ জুন চট্টগ্রামের কাস্টমস হাউসের ১ নম্বর ইয়ার্ড থেকে ৬ কোটি টাকা মূল্যের ল্যান্ড রেঞ্জ রোভার নামীয় বিলাস বহুল গাড়ি জব্দ করা হয়।

৯ জুন তমা কনস্ট্রাকসন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের নামে টয়োটা হ্যারিয়ার মডেলের দুই গাড়ি জব্দ করা হয়। ট্যাক্সি হিসেবে আনলেও তা ব্যক্তিগত ব্যবহার করা হতো। গাড়ি দুটির শুল্ক ২১৭ শতাংশ। শুল্কসহ মোট মূল্য এক কোটি টাকা। এতে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

১২ জুন রাজধানীর বারিধারাস্থ স্বদেশ অটো লিমিটেড থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আমদানিকৃত চারটি বিলাসবহুল গাড়ি জব্দ করা হয়। গাড়িগুলো হচ্ছে অডিএ ৫, মার্সিডিজ ই-২৪০ এবং দুটো জিপের একটি মার্সিডিজ এমএল ৩৫০ ও বিএমডব্লিউ এক্স ৫। গাড়ি চারটির বাজার মূল্য ১৫ কোটি টাকা।

১৩ জুন কুড়িল বিশ্বরোড থেকে মার্সিডিজ নিউ ব্র্যান্ডের ১টি গাড়ি জব্দ করা হয়। প্রায় ৬ কোটি টাকা বাজার মূল্যের গাড়িটি সিসি কম দেখিয়ে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে গাড়িটি জব্দ করা হয়।

জুন মাসের শেষের দিকে শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগে মংলাবন্দর ও ঢাকা থেকে দুটি মিনি কুপার ও ব্লু কালারের ভক্সওয়াগন গাড়ি জব্দ করা হয়। যেখানে ২১ লাখ টাকার শুল্ক ফাঁকি ও সিলেট থেকে কারনেট সুবিধায় ছাড় করা ২ কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল লিক্সাস গাড়ি জব্দ করা হয়।

জুলাই মাসের বিভিন্ন সময়ে মিথ্যা ঘোষণায় চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনারের মধ্য থেকে ৫ কোটি টাকার রেঞ্জ রোভার জিপ, জালিয়াতির অভিযোগে রাজধানীর মিরপুর দারুস সালাম থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের বিএমডব্লিউ গাড়ি, প্রায় ১৭ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকি দেওয়া অভিযোগে রাজধানীর কাকরাইল থেকে জার্মানির ভক্সওয়াগন গাড়ি এবং চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে ১১ কোটি টাকা মূল্যের রেঞ্জ রোভার ও পোরশে মডেলে দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়। এ ভাবে সারা দেশ থেকে মোট ৩১টি গাড়ি আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা।

এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মঈনুল বলেন, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে অবৈধভাবে ব্যবহার করায় এসব গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। বর্তমানে আমাদের বিভিন্ন অফিসের পার্কিং স্থানে রাখা হলেও আজ এগুলো বিমানবন্দরের কাস্টমস গুদামে জমা দেওয়া হবে। এর পর যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেগুলো নিলামে তোলা হবে।

তিনি আরো বলেন, চাইলে গাড়ির প্রকৃত মালিক মূল কাগজপত্র প্রদর্শন করে জারিমানাসহ সরকার নির্ধারিত শুল্ক পরিশোধ করে গাড়ি ছাড়িয়ে নিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে শুল্ক গোয়েন্দা ওই সব গাড়ির ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দিতে পারে। নতুবা আইন তার নিজস্ব গাতিতে চলবে। চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকিবাজদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যহত থাকবে।

You Might Also Like