হোম » হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা মামলায় ১১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ঢাকা অফিস- Sunday, October 29th, 2017

শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলায় ফ্রিডম পার্টির ১১ নেতাকর্মীকে আলাদা রায়ে যাবজ্জীবন ও ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এর মধ্যে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টায় বিস্ফোরক আইনের মামলায়  ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং হত্যাচেষ্টা ও অপরাধজনক ষড়যন্ত্রের মামলায় প্রত্যেককে ২০ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. জাহিদুল কবির গতকাল পৃথক সময়ে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। বিকেলে বিস্ফোরক আইনের মামলার রায় ঘোষণা করা হয় ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের সংশ্লিষ্ট এজলাসে। আর হত্যাচেষ্টা মামলার রায় দুপুরে ঘোষণা করা হয় পুরাণ ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে স্থাপিত বিশেষ আদালতে।

প্রায় তিন দশক আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টায় বিস্ফোরক আইনের মামলার রায়ে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক আসামি খন্দকার আবদুর রশীদ রয়েছেন।

অন্য ১০ আসামি হলেন- মো. মিজানুর রহমান, জর্জ, মো. শাজাহান ওরফে বালু, গোলাম সরোয়ার ওরফে মামুন, মো. সোহেল ওরফে ফ্রিডম সোহেল, জাফর আহম্মেদ ওরফে মানিক (পলাতক), সৈয়দ নাজমুল মাকসুদ ওরফে মুরাদ, গাজী ইমাম হোসেন, মো. হুমায়ুন কবির ওরফে হুমায়ুন (পলাতক), খন্দকার আমিরুল ইসলাম ওরফে কাজল। এ ছাড়া মামলার অন্য আসামি মো. হুমাউন কবির ওরফে কবিরের বিরুদ্ধে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় আদালতের বিচারক তাকে খালাস দেন। এদিকে শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র ও হত্যাচেষ্টা মামলার ১২ আসামির মধ্যে একই আসামির (১১ জন) দুটি ধারায় দশ বছর করে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেন ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক জাহিদুল কবির। এ মামলাতেও আসামি মো. হুমাউন কবির ওরফে কবিরের বিরুদ্ধে অপরাধের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত না হওয়ায় আদালতের বিচারক তাকে খালাস দেন। হত্যাচেষ্টার মামলার রায়ে বিচারক উল্লেখ করেছেন দুটি সাজাই পর্যায়ক্রমে খাটতে হবে। একই সঙ্গে সাজার মেয়াদ থেকে হাজতবাসকালীন সময় বাদ যাবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। হত্যাচেষ্টা মামলায় ১১ আসামির প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে ৪০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরো ৬ মাস করে এক বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। রায়ে বিচারক বলেছেন, পলাতক আসামি খন্দকার আবদুর রশিদ, জাফর আহমেদ ওরফে মানিক ও মো. হুমায়ুন কবির ওরফে হুমায়ুন আদালতে আত্মসমর্পণ কিংবা গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তাদের সাজা কার্যকর হবে। আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধজনক ষড়যন্ত্র, হত্যার প্ররোচনা, অপরাধমূলক কাজে সহযোগিতা এবং হতাচেষ্টার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালতের বিচারক এ সাজা দিয়েছেন বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন তারা। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানান তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টা মামলার রায়ে আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা এবং শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একই আসামি ও একই ষড়যন্ত্রকারীদের পৃষ্ঠপোষকতায় শেখ হাসিনাকেও হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আসামিরা বিভিন্ন সময়ে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করেছে এবং সেই ষড়যন্ত্রের অংশ থেকেই তারা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করে যা মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণে এসেছে।

মামলার বিবরণে জানা যায়, ১৯৮৯ সালের ১০ই আগস্ট মধ্যরাতে আসামিরা বঙ্গবন্ধুকন্যা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনার অবস্থানস্থল ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু ভবন ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘর) গুলিবর্ষণ, গ্রেনেড ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের নেতৃত্বে গঠিত ফ্রিডম পার্টির নেতা-কর্মীরাই শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে ওই হামলা চালিয়েছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। ঘটনার পর ১১ই আগস্ট ৩২ নম্বর বাড়ির প্রধান ফটক সংলগ্ন ডিউটি পোস্টে দায়িত্বরত হাবিলদার মো. জহিরুল হক মামলা দায়ের করেন। তদন্তের পর এ ধরনের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায়নি মর্মে পুলিশ ১৯৮৯ সালের ৮ই ডিসেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। তবে, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ভবিষ্যতে এ মামলার যদি কোনো সূত্র পাওয়া যায় তবে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে তদন্ত করা হবে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। মামলার তদন্তভার দেয়া হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের সিআইডির (সিটি জোন) তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার এএসপি মো. খালেকুজ্জামানকে। তদন্ত শেষে ১৯৯৭ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. খালেকুজ্জামান। অভিযোগপত্রে ফ্রিডম পার্টির নেতা ও বঙ্গবন্ধুর খুনী সৈয়দ ফারুক রহমান, আবদুর রশীদ ও বজলুল হুদাসহ ১৬ জনকে আসামি করা হয়। তবে, সাক্ষীদের হাজির হতে বিলম্বসহ নানা কারণে মামলার বিচারকাজে বিঘ্ন ঘটে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করলে মামলাটি নিশ্চল হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে মামলার নথিপত্র ২০০২ সালের ১১ই মে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ, ১ম আদালতে বদলিমূলে পাঠানো হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় সরকার গঠন করলে ওই বছরের ২৭শে আগস্ট এ মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। একাধিক বিচারকের হাত ঘুরে ২০১২ সালের ২৯শে মার্চ মামলাটির বিচার ও নিষ্পত্তির জন্য ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বদলিমূলে পাঠানো হয়। এই মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত ১৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। ৫ কার্যদিবস রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ১৬ই অক্টোবর মামলার রায়ের তারিখ (২৯শে অক্টোবর) ধার্য করেন আদালতের বিচারক মো. জাহিদুল কবির। এর আগে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় ৭৬ কেজি বোমা পুঁতে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার আরেকটি মামলার রায় গত আগস্টে ঘোষিত হয়েছে। ওই রায়ে ১০ জন আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক। এছাড়া ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট সংঘটিত ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা মামলাটি এখন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যুক্তিতর্ক শেষে এ মামলার রায়ের জন্য দিন ধার্য করবেন ওই আদালতের বিচারক।