স্টোকসের ব্যথাটা বুঝছেন মাশরাফি

যেন টাইম মেশিনে চড়ে বসলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা! এক মুহূর্তে ফিরে গেলেন ২০০৬-এর ২ আগস্টে হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠের সেই অভিশপ্ত ওভারে। জেতার জন্য ১ ওভারে ১৭ রান প্রয়োজন জিম্বাবুয়ের। বোলার মাশরাফিৃ।
এতক্ষণে নিশ্চয়ই ঘটনাটা আপনারও মনে পড়ে গেছে। ব্রেন্ডন টেলরের ঝোড়ো ব্যাট সেদিন হতাশায় ডুবিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশের এই পেসারকে। শেষ বলে দরকার ছিল ৫ রান। টেলরের ছক্কা শুধু সেই দূরত্বটুকুই পার করায়নি জিম্বাবুয়েকে, মাশরাফির বুকে এঁকে দেয় নির্দয় এক ক্ষতচিহ্ন। এখনো শেষ ওভারে কোনো বোলারকে ও রকম অসহায় অবস্থায় পড়তে দেখলে যন্ত্রণাটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মাশরাফি অবচেতনে উঠে বসেন টাইম মেশিনে।
পরশু রাতে ইডেন গার্ডেন ইংলিশ পেসার বেন স্টোকস তাঁকে আরেকবার মনে করিয়ে দিলেন হারারের দুঃস্মৃতি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল নিয়ে কথা বলার সময় কাল মাশরাফি নিজেই টেনে আনলেন সে প্রসঙ্গ, ‘আমার মনে হয় আমিই সবচেয়ে বেশি অনুভব করতে পেরেছি ওই সময় স্টোকসের কেমন লেগেছে। হয়তো আমার জীবনেও এ রকম ঘটেছে বলেইৃ।’
ম্যাচ জিততে শেষ ওভারে ১৯ রান নিতে হতো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। প্রথম বলেই কার্লোস ব্রাফেটের ছক্কা। ওই ছক্কা দেখেই মাশরাফি বুঝে গিয়েছিলেন, স্টোকসের পক্ষে আর ম্যাচে ফেরা সম্ভব নয়, ‘শেষ ওভারের আগে বলছিলাম, প্রথম বলটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই বলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। প্রথম বলে যদি এক বা দুই হতো, বোলারের আত্মবিশ্বাস অন্য পর্যায়ে চলে যেত। কিন্তু প্রথম বলে ছয় হয়ে গেলে যেকোনো বোলারের আত্মবিশ্বাস নড়ে যেতে বাধ্য।’
স্নায়ুক্ষয়ী ম্যাচে শেষ ওভারের প্রথম বলে ছয় খাওয়ার মানসিক ধাক্কা সামলাতে সক্ষম, বাংলাদেশের ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক এমন মাত্র দুজন পেসারই দেখেন বিশ্ব ক্রিকেটে। একজন তাঁর দলেরই মুস্তাফিজুর রহমান। অন্যজন শ্রীলঙ্কার লাসিথ মালিঙ্গা, ‘আমার মনে হয়, এই দুজন ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো পেসারই প্রথম বলে ছয় খাওয়ার চাপ সামলাতে পারত না।’
২০০৬-এর ধাক্কা অবশ্য পরে মাশরাফিও ভালোভাবেই সামলে ওঠেন। তবে স্টোকসকে সাহস দিতে নিজের কথা না বলে উদাহরণ টেনেছেন আরেক ইংলিশ বোলার স্টুয়ার্ট ব্রডের। ২০০৭ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তার ১ ওভারে যুবরাজ সিংয়ের ছয় ছক্কার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ক্যারিয়ারের শুরুতে স্টুয়ার্ট ব্রডের এর চেয়েও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। পরে তো সে টেস্টে তিন শর বেশি উইকেট নিল। ইংলিশদের যে সংস্কৃতি তাতে স্টোকসও দ্রুতই এই ধাক্কা সামলে উঠবে বলে আশা করি।’ অবশ্য স্টোকস ইংলিশ না হয়ে বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের খেলোয়াড় হলে কাজটা কঠিন হতো বলেই তার অনুমান, ‘শ্রীলঙ্কা ছাড়া উপমহাদেশের অন্য যেকোনো দেশের ক্রিকেটার হলে স্টোকসের জন্য এই ম্যাচের পর ফিরে আসা অনেক কঠিন হতো। ও যদি পারত, মানুষ তাকে তা করতে দিত না। প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়ে যেত।’
ফাইনালের এক পিঠে যখন বেন স্টোকসের জন্য শোকগাথা, অন্য পিঠেই তখন ক্যালিপসোর মাদকতা। চতুর্থ বলেও ছক্কা খেয়ে স্টোকসের ইডেনের উইকেটের ওপর বসে পড়ার দৃশ্য থেকে মাশরাফির চোখও চকিতে সরে যায় সেদিকে, ‘ফাইনালে বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই চেয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতুক। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল তাদের উদ্যাপন এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, সবাই ওটা দেখেই মজা পাচ্ছে। অনেকে ওটা দেখার জন্যও চেয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ জিতুক।’
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা জেতায় পরশু রাতেই ফেসবুক স্ট্যাটাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল, অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের মহিলা দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মাশরাফি। স্টোকসের জন্য সমবেদনাও সেখানে আছে। আর আছে ব্রাফেট-স্যামুয়েলসের প্রশংসা। স্যামুয়েলস তো এখন মাহেলা জয়াবর্ধনের মতোই ‘ফাইনালের খেলোয়াড়ে’র মর্যাদা পাচ্ছেন তাঁর চোখে।
এ নিয়ে মাশরাফি গর্বও করতে পারেন ড্যারেন স্যামির মতো। গত বিপিএলে স্যামুয়েলস খেলেছেন চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের হয়ে। স্যামুয়েলসের অধিনায়ক তো তিনিও!

You Might Also Like