হোম » সৈয়দ আলী আহসান : ব্যাক্তি ও কবি

সৈয়দ আলী আহসান : ব্যাক্তি ও কবি

admin- Monday, July 25th, 2016

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন :

`আমার পুর্ব বাংলা’ এই কবিতাটির সাথে আমাদের পরিচয় মূলত কলেজ জীবন থেকে। কি অনবদ্য হৃদয় জাগ্রত করার মতো একটি দেশপ্রেম মূলক কবিতা। এই কবিতাটির নাম উচ্চারিত হলে একজন কালজয়ী মানুষের দীপ্ত মুখায়ব চোখের সামনে ভেসে উঠে। যিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সঙ্গিত লেখক, বিশিষ্ট অনুবাদক ,বরেণ্য শিক্ষাবিদ, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিতের ইংরেজী অনুবাদক, আর্ন্তজাতিক নোবেল কমিটির সাহিত্য বিষয়ক বিভাগের উপদেষ্টা এবং সর্বপরী ১৯৭১ এ বাংলাদেশ অর্জনের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণকারী সাহসী যো তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। এ সময় তিনি “চেনাকণ্ঠ” ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন। যার কথা বলছি তিনি আমাদের প্রিয় কবি সৈয়দ আলী আহসান। এতো গুনে গুনান্নিত আমাদের এই গুনি মানুষটিকে বর্তমান প্রজন্ম কতটুকু মনে রেখেছে তা নিয়ে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গুনিদের প্রতি অবহেলা আজ যেনো বাংলাদেশের কৃস্টিতে পরিণত হয়েছে । উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সঙ্গিত সাধক ওস্তাদ আয়াত আলী খাঁ একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, যে দেশে গুনির কদর নাই সে দেশে গুনি জন্ময়না। সত্যি সাধক এক অলিক সত্যকে সহজভাবে উচ্চারণ করেছিলেন। আজ বাংলাদেশ যেনো দুটি বৃহৎ দলের প্রতিস্ঠাতাদের গুনর্কিতনের মাঝে দেশের গুনিরা হারিয়ে গেছে।
সৈয়দ আলী আহসান আধুনিক বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে আমাদের জাতিকে পরিচয় করিয়েছিলেন। জাতির আগামী ভবিষ্যত বির্নিমানে জাহাঙ্গীরনগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে প্রশংসনীয় ভুমকা রেখেছিলেন। পরর্বতিতে নিজের গড়া বেসরকারী প্রতিষ্ঠান দারুল এহসান বিশ্ববিদ্যালয় দেশের মানুষের কাছে প্রিয় শিক্ষাপীঠ হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে তিনি গৌরবের অধিকারী। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৯ সালে তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে ঘোষণা দেন । মাগুরা জেলার আলোকদিয়া গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। ঢাকার আর্মানী টোলা স্কুলে পড়াকালিন সময় ১৯৩৭ এ স্কুল ম্যাগাজিনে তাঁর প্রথম ইংরেজী কবিতা দি রোজ প্রকাশিত হয়। বাংলা সাহিত্যের ছাত্র পরর্বতিতে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েও ইংরেজী, উর্দু, আরবী ও ফার্সী ভাষায় তাঁর ছিল অনবদ্য দখল। আধুনিক বাংলা ভাষা সম্পর্কে তাঁর ছিল অসম্ভব রকমের প্রগাঢ় অবস্থান। ছোট বড় পঞ্চাশের অধিক তাঁর বই আমাদের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর বিখ্যাত কবিতার বইগুলো হলো -অনেক আকাশ, একক সন্ধ্যায় বসন্ত, আমার প্রতি দিনের শব্দ, সমুদ্রে যাবো। আলোচিত বইগুলো হলো- আমেরীকা আমার কিছু কথা, মহানবী, আলাওল পদ্মাবতী, কবিতার কথা ও অন্যান্য বিবেচনা, চর্জাগীতি প্রসঙ্গ, কবিতা সমগ্র, কথা বিচিত্রাঃ বিশ্ব সাহিত্য। অনুবাদ গ্রন্থের মধ্যে ওয়েডিপাস, আমেরিকার জাতীয় কবি হুইটম্যানের কবিতা, দোয়ায় কোমাইলের অনুবাদ ইত্যাদি। এছাড়া নজরুল, রবিন্দ্রনাথ ও কবি আল্লামা ইকবালের সাহিত্যের উপড় তাঁর বহু আলোচনা গ্রন্থ বের হয়েছে। তিনি ১৯৭২ এ প্রথম স্বাধীনতা স্মারকগ্রন্থের সম্পাদনা করেন। স্বাধীনতা উত্তর বিশ্বিবদ্যালয় মন্জুরী কিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি প্রসংশনীয় ভুমিকা পালন করেছেন। কবি সৈয়দ আলী আহসান ১৯৮৭ এ স্বাধীনতা পদক ও ১৯৮২ এ একুশে পদক পান। এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ইসলামের শ্বাসত বানী ও কবি নজরুল ইসলামের কাব্য চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলা সাহিত্য অঙ্গনে নিজেকে বিকশিত করেছেন।
কবিতা সম্বন্ধে সৈয়দ আলী আহসানের ধ্যান-ধারণা সমকালীন কবিদের চিন্তাভাবনার সঙ্গে তেমন একটা সাজুয্য রক্ষা করে চলেনি। যদিও তার রচনরায় রয়েছে ঐতিহ্য-চেতনা, সৌন্দর্যবোধ এবং স্বদেশপ্রীতি, যা অন্য কবিদের লেখাতেও বর্তমান। কবির অসংখ্য গ্রন্থের মধ্যে ‘একক সন্ধ্যায় বসন্ত’কে সেরা সংকলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একক সন্ধ্যায় বসন্ত’ কাব্যগ্রন্থে প্রধানত গদ্য-কবিতা স্থান পেয়েছে, সেই গদ্য-কবিতা রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিশের কবিদের গদ্য-কবিতা থেকে পৃথক, কেন না তার কবিতায় উপমা ও শব্দ ব্যবহারে রয়েছে নতুনত্ব ও আধুনিকতা। উপমা ব্যবহারে জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে তার পার্থক্য এই যে জীবনানন্দে আছে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য উপমা আর সৈয়দ আলী আহসান প্রধানত ব্যবহার করেছেন বিমূর্ত উপমা। তার উপমার কারুকাজ, স্থাপনা কৌশল সচেতন পাঠককে মুগ্ধ করে। তার ‘একশ সন্ধ্যায় বসন্ত’ কাব্য সংকলনের শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘প্রার্থনা’ ও ‘আমার পূর্ববাংলা’ কবিতাদ্বয়। তার কবি প্রতিভার উদাহরণ পাওয়া যায় নিম্নো:

(এভাবেই আমার দিন রাত্রির অধীরতা
অনেক বনের মধ্য দিয়ে
অনেক নদী সমুদ্রের স্বচ্ছতায়
একদিন হয়তো পাহাড়ের দুর্গমতায়
পাথরের নিশ্চেতন সংকট পার হয়ে
ইউলিসিস ইথাকায় ফিরবে’।
(প্রার্থনা, একক সন্ধ্যায় বসন্ত)

আধুনিক বিশ্ব সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি সুফি দর্শনের প্রতি প্রবল ঝোক ছিল তাঁর।
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট, ফরাসি ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি লিউপোল্ড সেডর সেংঘর ছিলেন কবি সৈয়দ আলী আহসানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সৈয়দ আলী আহসানকে নিয়ে লেখা তাঁর কবিতায় তিনি বলেছিলেন:
‘তুমি এলে।
তোমার চোখ আমার চোখের
সামনে দিয়ে চলে গেল,
তোমার চোখ ঈষদুষ্ণ বাড়ির স্পর্শে
চুম্বকের স্বাদ পেল।’
সেংঘরের এই কথা যে যথার্থ, তার প্রমাণ আমরা পাব অন্নদাশংকর রায়ের লেখায়: “তিনি একজন সত্যিকার কবি। যেমন হৃদয়বান, তেমনি রূপদর্শী। যে ভাষায় তিনি লেখেন, তা খাঁটি বাংলা। তাঁর কবি পরিচয়ই শ্রেষ্ঠ পরিচয়।”
আধুনিক উর্দু সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি কলিম সাসারামী সৈয়দ আলী আহসানের ষাটতম জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন এই বলে: ‘যখন বিধাতা সাহিত্যের জন্য একটি উজ্জ্বল কেন্দ্রবিন্দুর কথা ভাবলেন, সৈয়দ আলী আহসান সাহিত্যের দিগন্তে আবির্ভূত হলেন কিরণসঞ্চারি সূর্যের মতো এবং তখন কাব্যলোক আনন্দের সারত্সার এবং উচ্ছলতা-উত্ফুল্লে নৃত্যরত হলো। স্বর্গ থেকে ধরিত্রী পর্যন্ত উপাদান সঙ্গীতে সমৃদ্ধ হলো।’ আমরাও বলি নীলাভ আকাশের মতো বিশাল কবি সৈয়দ আলী আহসান আমাদের মাঝে অনন্তকাল বেচেঁ থাকুক শ্রোদ্ধা আর ভালবাসায়। আজ ২৫ জুলাই
কবির না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার দিনে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রোদ্ধা ।
লেখকঃ প্রবাস থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।