হোম » সৃষ্টির সেবায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি

সৃষ্টির সেবায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি

ঢাকা অফিস- Tuesday, August 2nd, 2016

ইসলাম শুধু একটি ধর্মেরই নাম নয়; জীবনের পরিধি যেমন ব্যাপক, তেমনি ইসলাম ধর্মের শাখা-প্রশাখাও ব্যাপক ও বিস্তৃত। বহু শাখাবিশিষ্ট কোনো জিনিসের যেকোনো একটি শাখা নিয়েই ব্যস্ত থাকলে যেমন সেটা পূর্ণ হয় না, তেমনি ইসলাম ধর্মের কোনো একটি শাখা নিয়েই ব্যস্ত থাকলে এতে পরিপূর্ণতা আসবে না। বরং সামর্থ্য অনুযায়ী সব কয়টি শাখায়ই অংশ নিতে হবে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘ইমানের ৭২টি শাখা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হলো রাস্তা থেকে কোনো কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া।’ (মুসলিম শরিফ)

এককথায় যাকে বলা যায় মানবসেবা। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানবসেবাও ইসলাম ধর্মের একটি শাখা। পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই কোনো না কোনোভাবে মানবসেবায় জড়িত। তবে হ্যাঁ, সবার জড়ানোটা একপর্যায়ের না। কারোটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক, কারোটা সমাজকেন্দ্রিক আর কারোটা দেশকেন্দ্রিক। অমানবের চেয়ে মানব শ্রেষ্ঠ কেন? প্রাণের কারণে? বুদ্ধির কারণে? মোটেও না। প্রাণের বৈশিষ্ট্যে মানুষ ও জীবজন্তু প্রায় অভিন্ন। মানুষ বুদ্ধিমান জীব বলে অন্য সব জীবজন্তু একেবারে বুদ্ধিহীন নয়;বরং বুদ্ধির সঙ্গে বিবেক ও নিজ চাহিদার সঙ্গে মানবিকতার সংমিশ্রণেই অন্য সব জীবজন্তুর ওপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। তাই ইসলাম মানবসমাজে বৈষম্য ও প্রভেদের কোনো সুযোগ রাখেনি। ইসলাম মানুষকে সর্বোচ্চ মানবিকতা, পরহিতৈষণা, সহমর্মিতা ও মহানুভবতার শিক্ষা দিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে ধনী ও গরিব দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। কিছু মানুষকে বিশেষ দয়ায় বহু নিয়ামত দিয়েছেন আর কিছু মানুষকে বিশেষ হিকমতের কারণে সম্পদ থেকে বঞ্চিত করেছেন, যারা স্বভাবতই ধনীর সম্পদের মুখাপেক্ষী। ধনী ও গরিবের এ ব্যবধান কারো প্রতি জুলুম নয়। আল্লাহ তাআলা ইচ্ছা করলে সবাইকে সমান করতে পারতেন; কিন্তু তা করেননি। কারণ এ ব্যবধান পৃথিবীর ভারসাম্যের জন্য অপরিহার্য। নিজের যোগ্যতা আর বুদ্ধির বলে আসলে কেউ সম্পদশালী হতে পারে না। বুদ্ধি আর যোগ্যতাই যদি সম্পদশালী হওয়ার মাপকাঠি হতো, তাহলে সব বুদ্ধিমানই সম্পদশালী হয়ে যেত। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক বুদ্ধিমান শিক্ষিত মানুষ অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র হয়ে আছে। আবার অনেক অশিক্ষিত, হাবাগোবা ধরনের মানুষ বহু সম্পদের অধিকারী হয়ে বসে আছে। সম্পদের এই বণ্টনব্যবস্থা মূলত আল্লাহ কর্তৃক বিশেষ উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে।
আল্লাহপাক মূলত মানুষকে পরীক্ষা করার জন্যই ধনী-গরিবের এই ব্যবধান সৃষ্টি করেছেন। ধনী তার ধন পেয়ে মহান আল্লাহকে ভুলে যায় কি না? আর গরিব তার অভাবের কারণে নাফরমানিতে লিপ্ত হয় কি না? এ পরীক্ষা করাই হলো ধনী-গরিবের ব্যবধানের মূল কারণ। আমাদের করণীয় হলো, সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর ওপর সন্তুষ্ট থাকা। তবে সন্তুষ্ট থেকে ঘরে বসে থাকলে চলবে না; বরং নিজের সাধ্যানুযায়ী হালাল উপার্জন করাও একটি ইবাদত।
মহান আল্লাহর ঘোষণা হলো, ‘যখন নামাজ শেষ হয়ে যাবে, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো এবং অনুসন্ধান করো আল্লাহর অনুগ্রহ (রিজিক)।’ (সুরা : জুমআ, আয়াত : ১০)

মানুষ সামাজিক জীব হওয়ায় একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। মানুষের এই নির্ভরশীলতাই মানুষকে জানিয়ে দিতে চায় যে তুমি অন্যের সেবার ওপর নির্ভরশীল। ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ সবাইকে কারো না কারো সেবা গ্রহণ করতেই হবে। জন্মের সূচনায়ই মানুষ অন্যের সেবায় নির্ভর করে বেড়ে ওঠে। অনুরূপভাবে জীবনের শেষ বেলায় কাফন-দাফনের সময়ও মানুষ পুরোপুরি অন্যের ওপর নির্ভরশীল।

মানুষের এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা মানুষকে একে অপরের সেবা করার শিক্ষা দিতে চায়। সৃষ্টির প্রতি সেবা করার বিভিন্ন ধরন আছে। মানুষের এই সেবা করার মানসিকতা থাকলে অন্যের আত্মিক সেবা, শারীরিক সেবার পাশাপাশি রাজনীতি, অর্থনীতি, দর্শন, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়েই সেবক ও কল্যাণকামী হওয়া যায়। স্মরণ রাখতে হবে, কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যেই সৃষ্টির সেবা করতে হবে। সেবার প্রতিদান সৃষ্টির কাছ থেকে আশা করা বোকামি।
কেননা যে নিজেই সেবার মুখাপেক্ষী, সে কিভাবে সেবার প্রতিদান দেবে; বরং যিনি কারো কোনো রকম সেবার মুখাপেক্ষী নন, যাঁকে তন্দ্রা ও নিদ্রা স্পর্শ করে না, তাঁর কাছ থেকেই সেবার প্রতিদান আশা করা উচিত। মনে রাখতে হবে, সৃষ্টির সেবায় লুকিয়ে আছে স্রষ্টার সন্তুষ্টি।
আল কোরআনে মানবসেবা আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা তাদের খাবারের প্রতি ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও সে খাবার অসহায়, এতিম এবং বন্দিদের খাওয়ায়।’ (সুরা : দাহার, আয়াত : ৮) এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা অসহায়, মিসকিন ও বন্দিদের খাবার দান করাকে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন। অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা কাফিরদের মন্দ স্বভাব বর্ণনা করে বলেন, কাফিরদের যে কয়টা মন্দ স্বভাব আছে, সেগুলোর মধ্যে একটি হলো, ‘সে মিসকিনকে খাবার খাওয়ানোর ব্যাপারে মানুষকে উৎসাহিত করে না।’ (সুরা : মাউন, আয়াত : ৩) অন্যত্র আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর যারা কাফির, তারা ইমানদারদের বলে—আল্লাহ যাদের ইচ্ছা করলে খাবার দিতে পারেন, আমরা কি তাদের খাবার খাওয়াব? (সুরা : ইয়াসিন, আয়াত : ৪৭) উল্লিখিত দুটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা কাফিরদের মন্দ স্বভাবের আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ অসহায়ের পাশে না দাঁড়ানো, তাদের খোঁজখবর না রাখা, মানবসেবায় এগিয়ে না আসা কাফিরদের স্বভাব।

পক্ষান্তরে মুমিনরা মানবসেবায় থাকে সদাতত্পর। নবীজীবনে মানবসেবা হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ওই ব্যক্তি পরিপূর্ণ মুমিন নয়, যে তৃপ্তি সহকারে আহার করে আর তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (মুসতাদরাকে হাকেম, আদাবুল মুফরাদ) হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তাঁর পিতা ওহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। তিনি ছয় কন্যা ও অনেক ঋণ রেখে যান। তারপর যখন খেজুর কাটার মৌসুম এলো, তখন তিনি মহানবী (সা.)-এর দরবারে গমন করেন এবং রাসুল (সা.)-কে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি তো জানেন যে আমার পিতা ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন এবং তিনি অনেক ঋণ রেখে গেছেন। তাই আমি চাই যে এ ব্যাপারে আপনি পাওনাদারদের কাছে সুপারিশ করবেন। তখন মহানবী (সা.) বললেন, তুমি চলে যাও এবং তোমার যত খেজুর আছে, সবগুলো এক স্থানে স্তূপ করো। হজরত জাবের (রা.) বলেন, আমি স্তূপ দিয়ে মহানবী (সা.)-কে ডাকলাম। পাওনাদাররা যখন এই স্তূপ দেখল, তখন তাদের ভাবটা এমন ছিল যে তারা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে। মহানবী (সা.) যখন তাদের এই অবস্থা দেখলেন, তখন বললেন, ‘তুমি তোমার পাওনাদারদের ডাকো।’ তারপর মহানবী (সা.) তাদের মেপে মেপে খেজুর দিতে লাগলেন। এমনকি একপার্যায়ে আল্লাহ আমার পিতার ঋণ পারিশোধ করে দিলেন। অথচ আমি এতটুকুতেই সন্তুষ্ট ছিলাম যে আমার পিতার ঋণ পরিশোধ হয়ে যাবে আর আমার বোনদের জন্য একটি খেজুরও ফেরত নেব না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা পুরো স্তূপটাই রাখলেন যেন এই স্তূপ থেকে একটি খেজুরও কমে নাই। (সহিহ বুখারি শরিফ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৫৮০)

সাহাবিদের মানবসেবা একবার হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) মসজিদে নববীতে ইতেকাফরত ছিলেন। এমন সময় এক লোক তাঁর কাছে এসে সালাম দিয়ে চুপ করে বসে পড়ল। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, কী ব্যাপার, তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি খুবই চিন্তিত! জবাবে লোকটি বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুলের চাচাতো ভাই! নিশ্চয়ই আমি খুব চিন্তিত ও পেরেশান। কেননা অমুক ব্যক্তির কাছে আমি ঋণী আছি।’ তারপর সে রাসুলের রওজা শরিফের দিকে ইশারা করে বলল, ‘এই কবরওয়ালার ইজ্জতের কসম! এই ঋণ আদায় করার সামর্থ্য আমার নেই।’ ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, ‘আমি কি তাঁর কাছে তোমার জন্য সুপারিশ করব?’ লোকটি বলল, ‘আপনি যা ভালো মনে করেন।’ এ কথা শুনে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) তত্ক্ষণাৎ জুতা পরে মসজিদের বাইরে এলেন। লোকটি বলল, হজরত, আপনি কি ইতেকাফের কথা ভুলে গেছেন? তিনি বললেন, না ভুলি নাই। তবে খুব বেশি দিনের কথা নয়, আমি এই কবরওয়ালার কাছ থেকে শুনেছি (এই কথা বলার সময় ইবনে আব্বাসের চক্ষু দিয়ে অশ্রু ঝরছিল), যে ব্যক্তি নিজে অন্য কোনো মুসলমান ভাইয়ের কোনো প্রয়োজনে চলাফেরা করবে এবং তার জন্য চেষ্টা করবে, উহা তার জন্য ১০ বছর ইতেকাফ করার চেয়েও উত্তম হবে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন ইতেকাফ করে আল্লাহ তার মধ্যে ও জাহান্নামের মধ্যে তিন খন্দক দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন। যার দূরত্ব আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্ব হতেও অধিক। (এক দিনের ইতেকাফের ফজিলতই যখন এরূপ, তখন ১০ বছর ইতেকাফের ফজিলত কী পরিমাণ হবে?) (তাবরানি, বায়হাকি, হাকেম ও তারগিব) মানবসেবার গুরুত্ব প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন : ‘কওমের নেতা সফর অবস্থায় তাদের খাদেম থাকবে। যে ব্যক্তি খিদমতের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে অগ্রগামী হবে, কেউ তাকে আমলের মাধ্যমে পেছনে ফেলতে পারবে না। অবশ্য শহীদ ব্যক্তি পারবে।’ জনসেবা ও খিদমতের মূর্ত প্রতীক ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। সেবার এ গুণটি তাঁর মধ্যে নবুয়তপ্রাপ্তির আগেও বিদ্যমান ছিল। প্রথম ওহিপ্রাপ্ত হয়ে তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন এবং ঘটনা হজরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.)-এর কাছে বর্ণনা করলেন। তখন তিনি নিম্নোক্ত বাণী দ্বারা নবী করিম (সা.)-কে সান্ত্বনা দিলেন। ‘আল্লাহর শপথ! আল্লাহ কখনো আপনাকে লাঞ্ছিত করবেন না। কেননা আপনি আত্মীয়ের প্রতি সদাচরণ করেন, অসহায় ব্যক্তির বোঝা বহন করেন, নিঃস্ব ব্যক্তির অন্নবস্ত্রের ব্যবস্থা করে দেন। মেহমানের আপ্যায়ন করেন এবং বিপদগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করেন। মূল কথা হলো, ইসলাম মানুষের সেবা ও খিদমতের জন্য, সমাজের উপকারের জন্য নিজের যথাসর্বস্ব বিলিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করে। যাতে সমাজ থেকে অশান্তি ও অবজ্ঞা দূর হয়ে নেমে আসে সমাজজীবনে শান্তির ফল্গুধারা। ইসলাম শুধু মানুষের সেবার প্রতিই উদ্বুদ্ধ করে না। আল্লাহর সব সৃষ্টির প্রতি সেবাদানের ব্যাপারেও অনুপ্রাণিত করে।