সুষমা স্বরাজ ও নারায়ণগঞ্জ উপনির্বাচন

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ক. পিতা, তোমাকে জানাই রমজানুল মোবারক। এক সপ্তাহ হলো কুশিমণি বাড়ি ফিরেছে। বিছানায় পা উঁচিয়ে বেশ কিছু দিন পড়ে থাকতে হবেÑ এটাই যা কষ্ট। কোনো কষ্টের কথা সে আমায় বলে না, যা বলার মাকে বা বোনকে বলে। ছোট্ট মানুষ অথচ মারাত্মক চাপা স্বভাব। পরম করুণাময় আল্লাহকে শুকরিয়া জানাই, অপারেশনের ব্যথায় তেমন কষ্ট পায়নি। বড় মেয়ে কুঁড়ি কুশিকে লালনপালন করে এমনিতেই মা হয়ে গিয়েছিল। এবার অপারেশনের সময় রাত-দিন দেখাশানা করে হাফ ডাক্তার, হাফ নার্স হয়ে গেল। কুশি বাড়ি এসে হাসিখুশি থাকায় আমাদের আর তেমন উৎকণ্ঠা নেই। মোটামুটি স্বস্তি আর শান্তিতেই আছি। কেন জানি না, ছোটকালে তোমাকে নিয়ে যেমন পাগল ছিলাম, এখন শেষ বয়সে যাবার কালে পরিবারের সবাই ওকে নিয়ে পাগল হয়েছি। কুশিমণির ছায়ায়-মায়ায়, লতায়-পাতায় জড়িয়ে গেছি। দেশের চরম অশান্তির মাঝেও যখন ঘরে ফিরি, মোটামুটি স্বস্তিতে থাকি। তখন আর বাইরের কষ্ট গায়ে লাগে না। তুমি দোয়া করো, মামণি যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে।

খ. ২৫ জুন রাতে ভারতের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তিন দিনের সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। নতুন সরকারের বিদেশমন্ত্রীর এটাই প্রথম বাংলাদেশ এবং প্রথম বিদেশ সফর। সুষমা স্বরাজ এক সময় জর্জ ফার্নান্দেজের সাথে রাজনীতি করতেন। তার খুব বিশ্বস্তও ছিলেন। একজন খুবই যোগ্য-অভিজ্ঞ মানুষ। আমি যখন ভারতে, তখনই তিনি বেশ ভালো অবস্থানে ছিলেন। এখন তো প্রথম কাতারের নেতা। বহু বছর পর ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের প্রশ্নে বড়সড় কোনো পরিবর্তন আসবে কি নাÑ এ নিয়ে নানা মনির নানা মত। শ্রী নরেন্দ্র দামাদোর দাস মোদির সরকার গঠন নিয়ে নানা কথা ছিল। কিন্তু এই প্রথম বাংলাদেশের সব দল ভারতপন্থী হয়ে গেছে। আগে আওয়ামী লীগ ছিল ভারতপন্থী, বিএনপি বিরোধী। এখন বিএনপি আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি ভারতপন্থী। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ আওয়ামী লীগের সাথে বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে কংগ্রেসের একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল। মুখে যে যাই বলুক, কংগ্রেস সরকার না থাকায় আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী জননেত্রীর যথেষ্ট অসুবিধা হবে। এখন আর তেমন সময়ে অসময়ে দাদা-দিদি বলে ইচ্ছেমতো ফোন করা যাবে না। তবে রাতারাতি সম্পর্ক আকাশ পাতাল বদলে যাবেÑ তেমনটা আশা করা বোকার স্বর্গে বাস করার মতো।

ভারতের কাছে সবাই সমান। ভারত চায় তার দেশের সুস্থিতি, নিরাপত্তা। ১০ ট্রাক ধরা পড়বে, আরো ১০০ ট্রাক লুকিয়ে রাখবেনÑ এরকম কর্মকাণ্ড যারা করবেন তারা যেই হোন ভারত তাদের সাথে কোনো মতেই সম্পর্ক রাখবে না। মনে হয় বিএনপি এখন কিছুটা এগিয়ে, আওয়ামী লীগ পিছিয়ে। ৫ জানুয়ারির ব্যর্থ নির্বাচনে জননেত্রী হাসিনার নেতৃত্ব কর্তৃত্ব অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ভারত কখনো ভাবেনি এমন পরিস্থিতি হবে, যাতে ১৫৪ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যাবে। সংসদে অনেকের ভাষণ শুনলাম। আত্মপ সমর্থন করতে গিয়ে ভোট ছাড়া নির্বাচিতরা আফসোস করছেন, তাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করায় দোষারোপ করেছেন বিরোধী দলকে। সত্যিকার বিরোধী দলহীন সংসদে বক্তৃতা হচ্ছে, বিরোধী দল নাকি গুলি করে, আগুন জ্বালিয়ে মানুষ মারে। পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য সংস্থার গুলিতে মানুষ মরে, দায় পড়ে বিরোধী দলের। বিশ্বের সেরা অযোগ্য প্রধান বিরোধী দল তাদের ওপর আনা অভিযোগ অস্বীকার করতেও পারে না। চোরের মায়ের বড় গলার মতো সরকার বলে চলেছে কিন্তু বিরোধী দল জুতসই জবাব দিতে পারছে না। সংসদে কোনো কোনো নেতা, বিশেষ করে জাসদ নেতারা যারা ‘৭৫-এ তোমার হত্যার জন্য রাজনৈতিকভাবে দায়ী, তারা তোমাকে নেতা বলে তার স্বরে বক্তৃতা করছে। ভাগ্য আর কাকে বলে! আমরা যারা তোমার জন্য জীবন কয়লা করলামÑ তারা শত্র“, হত্যাকারীরা এখন মিত্রÑ এ এক অভাবনীয় কাণ্ড! বেগম মতিয়া চৌধুরীর ক্রোধ, তার কালো মুখের ভেঙচিতে পিত্তি জ্বলে যায়। কিন্তু কিছুই বলতে পারি না, কারণ সে তোমার মেয়ের ছায়ায়-মায়ায় নিরাপদ। প্রতি মুহূর্তে ভয়ে থাকি, বিপদের সময় এরা কিভাবে গাঢাকা দিয়ে শত্র“ শিবিরে গিয়ে মীরজাফর, রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফের মতো দাঁত বের করে হাসবেÑ তখন আমরা কী করব? চার দিকে অসঙ্গতি আর অন্ধকার, ঠিক এ সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের দেশে এসেছিলেন। অন্য সময় তিস্তাতে পানি থাকে না, বর্ষায় আবার ভাসে। ফেলানীরা কাঁটাতারের বেড়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুলে থাকে, দেহে প্রাণ থাকে কি নাÑ খবর নেয়ার কেউ নেই। তারপরও প্রতিবেশী। অনেক কিছু বদলানো যাবে কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো যায় না। আশা করব, ভারতের নতুন সরকার সুপ্রতিবেশীর মতো আচরণ করবে, বড় ভাই বা মুরুব্বির মতো নয়। মহান ভারতের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর সফল হোক এই কামনাই করি।

গ. গত পরশু ২৬ জুন ছিল নারায়ণগঞ্জে এক গুরুত্বপূর্ণ উপনির্বাচন। সরকারদলীয় লাঙ্গলের প্রার্থী সেলিম ওসমান বিজয়ী হয়েছে। এটা অনেক আগেই ভাবা গিয়েছিল। কারণ স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আকরামের এলাকার সাথে তেমন যোগাযোগ নেই। ৫ বছরে একবারও নিজের উপজেলা বন্দরে যায়নি। উপরন্তু বন্দরের রান্নার গ্যাসের সংযোগ কেটে দিতে বিদ্যুৎমন্ত্রীর কাছে লেখা চিঠি ফাঁস হওয়ায় নির্বাচনে খুবই প্রভাব পড়েছে। আমাদের একেবারে নতুন দল, আমাদের প্রার্থী শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার তেমন রাস্তাঘাটও চেনে না, তবু যতটা ঘুরেছি তাতে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচনে সরকারি দলই দু’ভাগে ভাগ হয়ে নির্বাচন করেছে। জোহা পরিবারের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ, সেটা কাজে লাগিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী অনেক ভোট পেয়েছে। এই নির্বাচনে এস এম আকরাম সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রার্থী না হয়ে অন্য কারো প্রার্থী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারলে সর্বশক্তি দিয়েও সেলিম ওসমানদের পার পাওয়া খুবই কঠিন ছিল; কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন দেখেছে, আওয়ামী লীগের শামীম ওসমানের প্রার্থী যেমন লাঙ্গল, সেলিনা হায়াৎ আইভীর প্রার্থী আনারসও আওয়ামী লীগ। মানুষকে বড় ধোঁকায় ফেলেছিল। একজন রাতে, আরেকজন দিনে আওয়ামী লীগ। বলা হচ্ছিল একজন ভালো, আরেকজন খারাপ। আসলে ব্যাপারটা তেমন নয়। দীর্ঘ সময় নির্বাচনী প্রচারণা করে অনেক কিছু প্রত্য করেছি। পরে নিশ্চয়ই সেসব তোমাকে বিশদ জানানোর চেষ্টা করব। পোস্টার ফেস্টুনে ব্যবসায়ী সেলিম একাকার করে ফেলেছিল। তার ধারের কাছেও ছিল না অন্য কেউ। অন্য দিকে সেলিম ওসমানের শান্তিপ্রিয় ব্যবসায়ী লোক হিসেবে অতকিছুর পরও একটা সুনাম ছিল। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে রাজনীতি এখন ডালে-চালে খিচুড়ি হয়ে গেছে। কোনো নীতি-নৈতিকতা নেই। কত মায়ের বুক খালি করে স্বৈরাচার এরশাদকে হটানো হয়েছিল এবং তা তোমার কন্যার নেতৃত্বেই। সেই আওয়ামী লীগ এরশাদের সাথে ভাগ-বাটোয়ারা করছে। নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেয়নি, প্রার্থী দিলে লাঙ্গল ভোট পেত ৩০টি। নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে লাঙ্গলের প্রধান এরশাদ ছিলেন না, ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্য দিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী আকরামের চাবিকাঠি ছিল মাহমুদুর রহমান মান্না, সিপিবি, বাসদ, গণফোরাম। বিএনপিও তলে তলে কেউ আকরামের আনারস, কেউ সেলিমের লাঙ্গল। মানে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিও আওয়ামী লীগ হয়ে গিয়েছিল। বিরোধী দল বলতে ছিলাম আমরা গামছা মার্কা। গামছা খুবই নগণ্য ভোট পেয়েছে।

কিন্তু রাস্তাঘাটে প্রচুর সাড়া পেয়েছি। নতুন দল করেছি সংগ্রামের জন্য, সুখে দুঃখে মানুষের পাশে থাকার জন্যÑ শুধু নির্বাচনের জন্য নয়। আমরা চাই সাধারণ ভোটারেরা নির্বিবাদে ভোট দিতে পারুক- সেখানেই আমাদের সার্থকতা। নারায়ণগঞ্জের উপনির্বাচনে আমরা না থাকলে সাধারণ ভোটাররা ঘর থেকে বেরুতো কি না সন্দেহ।

You Might Also Like