সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ বেঞ্চ গঠনে প্রত্যাশা

বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে শুনানি করার উদ্যোগ নেওয়ার সময় এখনই। এটা প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগ। নভেল করোনা মহামারির এই সংকটকালে রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভ পুরোপুরি নীরব থাকতে পারে না। বিচারের দুয়ার সর্বদা খোলা। একাত্তরে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় পুরো সময় হাইকোর্ট বসেছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে বাক্‌ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্নের কোনো প্রশ্ন উঠতে পারে।

সার্কভুক্ত আটটি ও আসিয়ানের ১০টিসহ বিশ্বের মোট ৩০টি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ওপর করোনার প্রভাব কী, তা বুঝতে ২১ ও ২২ এপ্রিল এই দুই দিন ওই দেশগুলোর সর্বোচ্চ আদালতের ওয়েবসাইটগুলোতে ভিজিট করে দেখা যায় যে বাংলাদেশই একমাত্র ব্যতিক্রম, তারই সর্বোচ্চ আদালতের দুয়ার বন্ধ রয়েছে। ওই সমীক্ষাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মৃত্যুর মিছিলে শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স ও স্পেন রয়েছে। এটা ইতিবাচক যে সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি এম আমিন উদ্দিন এবং সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল উভয়ে দরজা খোলার পক্ষে। বার সভাপতি বুধবার জানালেন, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এ বিষয়ে তাঁর ফোনে কথা হয়েছে। তিনি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। দুদফায় ১৬ জন আইনজীবীও একই দাবিতে প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি লিখেছেন। ইতিমধ্যে বৃহত্তর সিলেটের ২ কোটি মানুষের জন্য ২০টি ভেন্টিলেটর, স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়িভাড়াসহ নিরাপত্তা, হোম কোয়ারেন্টিন সংশ্লিষ্ট বাড়ির সামনে সতর্কতা সাইনবোর্ড টানানোর মতো বিষয়ে আইনি নোটিশ জারি হয়েছে। এমন সব রিটের দ্রুত শুনানি কাম্য।

আশা করব, ১১ এপ্রিলের সুপ্রিম কোর্টের প্রজ্ঞাপন শুধরে নেওয়া হবে। এতে বলা হয়েছে, ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত সব আদালতে ছুটি থাকবে। স্বল্প পরিসরে আদালত চালাতে হলেও সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি লাগবে। কিন্তু নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয় বিবেচনায় ‘স্বল্প পরিসরেও’ আদালত পরিচালনা সমীচীন হবে না।

আবার স্বল্প বা বৃহৎ যে পরিসরেই হোক, আদালত চালানো যাবে না, কথাটি যথাযথ নয়। কারণ, প্রত্যেক বিচারপতি সতত জাস্টিস অব পিস। তাঁরা ২৪ ঘণ্টা জজিয়তি করতে পারেন। সবচেয়ে বড় কথা, দেশ তথা বিশ্ব একটি নজিরবিহীন স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থায় রয়েছে। এ সময় রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভ নির্বাক থাকতে পারে না। সংবিধান সচল রয়েছে।

যে ৩০টি দেশের কথা উল্লেখ করেছি, তার অধিকাংশ দেশের উচ্চ আদালত সীমিত দৈহিক উপস্থিতি এবং ভিডিও কনফারেন্স—উভয়ের মিশেলে চলছে। উপযুক্ত পিপিই সরবরাহ নিয়ে স্পেনের মতো ভারতের সুপ্রিম কোর্টও নির্বাহী বিভাগের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। বেঞ্চ হলে বাংলাদেশেও এমন রিট হবে। প্রসঙ্গত, জলপাইগুড়িতে থাকা কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চটিও অনলাইনে চলছে। তাই চট্টগ্রাম, বরিশাল ও সিলেটের মতো বিভাগীয় সদরে সার্কিট বেঞ্চ চালুর কথা ভাবা যায়। করোনার ধকল দীর্ঘমেয়াদি হবে। বিচারপ্রার্থীদের যাতায়াতের সুযোগ সীমিত থাকবে।

বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ থাকলেও দেশে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত জরুরি মামলার জন্য খোলা আছে। গত ২২ মার্চে প্রধান বিচারপতি ও আইনমন্ত্রী এবং আপিল বিভাগের বিচারপতিরা করোনাভাইরাস উদ্ভূত পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটর করার সিদ্ধান্ত নেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে লকডাউন এবং সামাজিক দূরত্বের শর্ত লঙ্ঘনের অপরাধে মোবাইল কোর্টের ব্যাপক তৎপরতা নিশ্চয়ই বিচার বিভাগের নজরে এসেছে। গত রোববার চট্টগ্রামের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট একটি টিভিতে বললেন, ‘আমরা প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০টি মামলা দায়ের করছি। কিন্তু লকডাউন মানায় আশানুরূপ উন্নতি নেই।’

আমাদের প্রশ্ন, মাঠে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট থাকলে কী হতো? দেশের সব বিশেষ পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগ বড় ভূমিকা পালন করেন। আদালত বন্ধের আগে হাইকোর্টের রুল জারির পরেই কেবল কোভিড-১৯ নতুন সংক্রামক রোগের স্বীকৃতি পেয়েছিল। সারা দেশে করোনা টেস্ট ল্যাব বসানোর নির্দেশনা চেয়েও রিট হয়েছিল। এই রিট নিষ্পত্তি করে হাইকোর্ট গোটা দেশকে লকডাউন করতে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিনই সারা দেশ গেল ‘সাধারণ ছুটিতে’।

দেখা যাচ্ছে, ২০১২ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে অপরাধের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা শুধু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দেওয়া হয়েছে। আবার ২০১৮ সালের সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইনে নির্দিষ্টভাবে মোবাইল কোর্টের কথা বলা নেই। অথচ গত ২৪ মার্চ সংক্রামক আইনের ২৪, ২৫ ও ২৬ ধারার অধীনে ‘বিচারের ভার’ কেবল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

২৪ ধারায় সংক্রামক রোগের বিস্তার বা তাতে সহায়তাদানের দায়ে ৬ মাস জেল, এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, ২৫ ধারায় ‘দায়িত্ব পালনে বাধাদান’ বা সরকারি নির্দেশ পালনে ‘অসম্মতি’র দায়ে তিন মাস জেল, অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ২৬ ধারায় রোগ গোপন করলে ২ মাসের জেল এবং অনধিক ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে। এসব অপরাধের পূর্ণ শুনানিনির্ভর বিচার হওয়া দরকার, যা বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারভুক্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের পক্ষে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বিশেষ করে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলের উদ্দেশ্যে দেওয়া কোনো ‘নির্দেশ পালনে অসম্মতি’র বিধানটির সঙ্গে ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধারা জড়িত থাকবেন। তাই বিষয়টি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। এই ধরনের অপরাধের বিচারের এখতিয়ার কার থাকা উচিত, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের দিয়ে মাঠপর্যায়ে দ্রুত বিচার করানোর মতো বিষয় আইন মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিবেচনার দাবি রাখে। সুতরাং করোনাকালের বিশেষ বেঞ্চ খুললেই হবে না, এ রকম কতিপয় বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার পড়বে। সবারই এটা জানা যে মোবাইল কোর্ট আদতে কোনো কোর্ট নয়। কারণ, এতে অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনজীবী নিয়োগই দিতে পারেন না। ২০০৯ সালের মোবাইল কোর্ট আইনটি নিজেই বলছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বেচ্ছায় দায় স্বীকার করলেই তবে তাঁকে দণ্ড দেওয়া যাবে। বাস্তবে কী ঘটে, তার উল্লেখ অনাবশ্যক।

সবশেষে বড় আশাবাদের কথা বলব। ভারত সরকার বেসরকারি ল্যাবের করোনা টেস্টের রেট বেঁধে দিয়েছে। বাড়িতে অনধিক সাড়ে চার হাজার রুপি, হাসপাতালে গিয়ে টেস্ট করালে সাড়ে তিন হাজার রুপি। সুপ্রিম কোর্ট প্রথমে বেসরকারি ল্যাবকে সবার জন্য বিনা মূল্যে টেস্ট করানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে ১৩ এপ্রিল সংশোধন করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পের অধীনে দরিদ্র (প্রায় ১১ কোটি পরিবার) এবং সরকার নির্ধারিত সমাজের ‘অন্যান্য অনগ্রসর অংশের’ লোকদের টেস্ট করতে হবে বিনা মূল্যে।

ভারতের প্রতিবেশী হয়ে এ রকম ধাঁচের কিছু আদেশ বা রায় পেতে আমরা অপেক্ষায় থাকব।

মিজানুর রহমান খান : প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক

You Might Also Like