সিডনিতে বাসভূমির ‘আলোকিত নারী’ ভিন্নমাত্রার অনুষ্ঠান

ইয়াসমীন রীমা :  জীবন মানে যাত্রা। শৈশব থেকে কৈশোরে, তরুন্য থেকে বার্ধ্যক, স্থান থেকে স্থানান্তরে, কাল থেকে অন্যকালে। ফলে মানব  জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য এগিয়ে চলা। মানুষকে এগিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন একটি পরিপূর্ণ জীবনচর্চা।  যে জীবন শুধু দৈনন্দিন কাজের ভেতর আটকে থাকেনা। সেখান থাকে আরও কিছু চর্চা ও চর্যা। মানুষের জীবনের এই চর্চা ও চর্যার জন্য প্রয়োজন পড়ে সমতা ভিত্তি। সে সমতা যদি হয় নারীর জীবন মান উন্নয়নের তাহলে তার মাধ্যমে আসে একটি জাতির সার্বিক উৎকর্ষের জোয়ার। কিন্তু বৈষম্যমূলক সমাজে অধস্তনতা নারীকে নীরবতার সংস্কৃতির মধ্যে বন্দি করে রাখে। যুগের পর যুগ পুরুষতান্ত্রিকতার দাম্ভিকতা প্রকাশ করে  নারীকে ক্ষমতাহীনতার প্রান্তে আবদ্ধ করে রাখার দৃষ্টান্ত অপরিচিত নয়। নারীকে মুখ্য ও অপারঙ্গম করে রাখার ক্ষেত্রে সমতা পরিসর সীমিত করে রাখার চর্চা সেই আদি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বহমান। অনগ্রসর সমাজে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে নারীকে উম্মোচন করতে সমতার ভূমিকা অনিবার্য।

Yasminপ্রতিদিন বিশ্ব জুড়ে আমরা নৃশংস সহিংসতায় ভুক্তভোগী নারীর ঘটনা পড়ি। নারীদের অপহরণ, আএসআইএরর দ্বারা ক্রীতদাস, নাইজেরিয়ার বিদ্যালয়ের মেয়ে শিক্ষার্থীদের অপহরণ ও তাদের বিয়ে করতে বাধ্য করা এই দুঃখজনক ঘটনাগুলো মধ্যযুগীয় মনে হয়। তবে  এটি একুশ শতকের নারীদের গল্পের মাত্র একটি দিক। যদিও নারীরাই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক মোকাবেলা করছে। ফলে শত বছরের অধিক সময় ধরে যে নারী উন্নয়ন অব্যহত আছে, নানারূপে, নানা ছন্দে তার অন্যতম ফলাফল ‘নারী’ শব্দটি আজ চলে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নারীর জীবন, নারীর জীবিকা, নারীর ভাবনা, নারীর কর্ম ইত্যাদি নানা বিষয়ে গবেষণা, নীতি, কর্ম-পরিকল্পনা গুরুত্ব পেয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নারী একটি আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এও সত্য যে এখনও প্রশ্ন ওঠে প্রকৃতপক্ষে এতে নারীর কতোটা উন্নতি অথবা উন্নয়ন ঘটেছে। প্রশ্ন ওঠেছে নারীর এই পরিবর্তিত পরিচয়ে নারীর স্বার্থ কতোটুকু রক্ষিত হয়েছে, কিংবা এই উন্নয়নের কতোটা করা হয়েছে প্রচলিত অর্থনীতি, সমাজ আর রাজনীতির সুবিধার্থে। জমা-খরচের খাতায় সব শেষ হিসাব শেষ পর্যন্ত শূন্যে মিলে যায়। তবে আশার কথা হলো এরকম প্রতিবন্ধকতার বেড়াজাল ডিঙিয়েও নারীদের একটি অংশ ওঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে, কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেদের জায়গা দখল করছে। তাই আমি একটি ভিন্নধর্মী বনর্না করছি-বর্তমান বিশ্বে একটি জীবন্ত সংস্কৃতির সূচনা হচ্ছে এটি হলো সবাইকে সংঙ্গে নিয়ে সমাজ নির্মাণের সংস্কৃতি। তাইতো সূদুর অষ্টেলিয়ার সিডনিতে প্রথমবারের মতো ‘আলোকিত নারী’ আয়োজনটি আমাদের নাড়া দিয়েছে। কারণ আমাদের সমাজে ‘গুণ’ শব্দটি খুব সীমিত সংখ্যক ‘বিশেষ’ ব্যক্তির জন্য সংরক্ষিত থাকে-তাদের প্রতিভা সমাজের অবশিষ্ট সবাইকে চমৎকৃত করে। সবাইকে সাথে নিয়ে তৈরী সমাজের সংস্কৃতি গুণকে খুব ভিন্নভাবে দেখে।  সাংস্কৃতিক সংগঠন বাসভূমি কৃর্ত আয়োজিত গত ২৪ এপ্রিল ২০১৬ রোববার সন্ধ্যায় রকডেলস্থ কস্তুুরি ফাংশন সেন্টারে সম্পূর্ন ভিন্ন মাত্রায় আলোকিত নারী সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। অষ্টেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী নারীদের ঘিরে পরিকল্পিত ও রচিত হয়েছে সাড়ম্বর অনুষ্ঠানটি। অতীতে আমরা তথাকথিত সমবৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে মানুষকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করার ব্যাপারে দক্ষ হয়ে উঠেছিলাম। এখন আমাদের সংগ্রাম হলো সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যের কথা বিবেচনা করে সমাজ জীবন নির্মাণ করা। সংগীত, নৃত্য, খ- নাটক, কবিতা জীবনালেখ্য, খোলামেলা আলোচনার পাশাপাশি প্রবাস জীবনে নারীদের নানা ঘাত-প্রতিঘাত ,আনন্দ-বেদনা এবং সর্বোপরি অভিজ্ঞতা নিয়ে সাজানো হয়েছিল পুরো অনুষ্ঠানটি। এছাড়াও একজন নারীর জীবনের সার্বিক চাওয়া পাওয়ার বিষয়গুলিও অনুষ্ঠানের সাবলীল উপস্থাপনায় এসেছিলো।

দুই পর্বে অনুষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। প্রথম পর্বে ছিলো প্রবাস জীবনের স্মৃতিচারণ করে জীবনের গল্পে অংশ নেন, কানিতা, নুসরাত জাহান স্মৃতি, বেবি, মিলি অন্যান্যরা। গান পরিবেশন করেন শুভ্রা মুস্তারিন, শুক্লা মুস্তারিন, ইভানা খালেদা, ডেইজি বিশ্বাস, আরিফিনা মিতা, প্রিয়াঙ্কা, মুস্তাকিন সিদ, রুখসানা ও সাকিনা আখতার। কবিতা পাঠে অংশ নেয়, তানজিদা জাহান তানি, ও কাজী সুলতানা সিমি। নৃত্যকলা পরিবেশন করেন ,অর্পতা সোম ও অন্তরা দাশ। ভিন্নমাত্রার ফ্যাশন ‘শো’ করেন শম্পা ঘোষ ও তার দল।

দ্বিতীয় পর্বে বাসভূমির কর্ণধার আকিদুল ইসলাম নির্বাচিত তিনজন নারীকে পুরস্কার প্রদান করেন স্ব-স্ব ক্ষেত্রে অবদানের জন্য। সামাজিক কর্মকান্ডে অবদান রাখার জন্য বাসভূমি আলোকিত নারী পুরস্কার গ্রহন করেন ডাঃ রোকশানা হোসেন জেবা-জন্ম কুমিল্লায় জেলায়। পড়াশোনা জেলার ইসপাহানী পাবলিক স্কুল থেকে মাধ্যমিক, সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক। এমবিবিএস সম্পন্ন হয় চট্রগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ থেকে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন(বিসিএস-স্বাস্থ্য)পরীক্ষা উর্ত্তীণ শেষে চাঁদপুর উপজেলার স্বাস্থ্য অফিসার। স্থায়ী নিবাস অর্জন করে নিউজিল্যান্ডে অবস্থান, ২০০১ সালে অস্টেলিয়ায় বিজ্রবেনে পাড়ি। বিজ্রবেনে জেনারেল প্র্যাকটিশনার হিসাবে কাজে যোগদান। এএএমসি সকল পর্ব সম্পন্ন করেন ২০০৪সালে। কুইসল্যান্ডে ও নিউ সাউথ ওয়েলস এর বিভিন্ন হাসপাতালে,মেডিক্যাল সেন্টারে কর্ম। এফ.আর.এসিজিপি সম্পন্ন করেন ২০০৮সালে। অষ্টেলিয়ার রয়েল কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনার থেকে ফ্যামিলি মেডিসিন ফেলোশিপ অর্জনের পর সিডনিতে মেডিসিন স্পেশালিস্ট (ভিআরজিপি) হিসাবে কর্মরত রয়েছে। বিবাহিত জীবনে স্বামী সন্তান নিয়ে বসবাস করছেন। স্বামীও ফ্যমিলি মেডিসিন স্পেশালিষ্ট একমাত্র পুত্র চলতি বছরে ইন্টার্নি ডাক্তার হিসোবে সিডনি হাসপাতালে কাজ আরম্ভ করেছেন। কুমিল্লা ও রাজবাড়ী জেলাতে সমাজের সুবিধা বঞ্চিত মানুষের আর্থিক সহেেযাগীতা করা ছাড়া সিডনি কিছু সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সাথে জড়িত।

সাংবাদিকতায় কাজী  সুলতানা সিমি-লেখিকা ও প্রাবন্ধিক হিসেবে খ্যাতমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিষয়ে কৃতিত্বের সাথে অর্নাস ও মাষ্টার সম্পনের পর দর্শন ও নৈতিকতায় এমফিল ও গবেষণা পড়াকালীন সময়ে২০০সালে বাংলাদেশ থেকে নিউজিল্যান্ডে স্থায়ী নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানে অভিবাসী হন। ২০০৫ সাল থেকে অস্টেলিয়ার সিডনির গিলফোর্ডে একমাত্র পুত্রসন্তান স্বামীসহ বসবাস শুরু করেন।  নিউজিল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ে অ্যাকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিাউটার সায়েন্সে লেখাপড়া করেন। পাশাপাশি বিজনেজ এডমিন ও ফাইন্যান্স বিষয়ে অধ্যায়নসহ অ্যাকল্যান্ড ডিস্টিক কোর্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেন।  এবং স্টুন্ডেট কনসালটেন্ট শামীমা ইয়াসমীন আনোয়ার-ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যে ¯œাতক ডিগ্রী ছাড়া ডিজিটাল মাকের্টিং, স্যোসাল মিডিয়া মার্কেটিং বিষয়ে ডিপ্লোমা অর্জন করেন। স্বামী হোসাইন মোহাম্মদ বাবুর ব্যবসায়ের সাথে জড়িত হয়ে সিডনি, বিজ্রবেন, মেলবোর্ন এর পাশাপাশি ব্রুনাই, বাংলাদেশ ,পাকিস্তান ও চায়নাসহ মোট সাতটি শাখা থেকে একসাথে সফলভাবে ব্যবসায় পরিচালিত করছেন। সংস্কৃতিমনা ইয়াসমীন ছাত্রীজীবনে আকৃত্তিকার, চিত্রাংকন, একক অভিনয়ে অসংখ্য পুরস্কার ও সন্মননা লাভ করেছেন। ২০১০ চট্রগ্রাম জেলা পেট্রেট আয়োজিত ‘মিস চিটাগাং’ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করে মিস চিটাগাং খেতাবে ভূষিত হন। বাসভূমির কর্ণধার তার স্বাগত ব্যক্তবে বলেন, “বাসভূমি সাংস্কৃতিক সংগঠন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভিন্ন আঙ্গিকে বাংলাদেশী নারীদের উৎসাহে প্রদানে এই ধরণের সন্মাননা অনুষ্ঠান অব্যহত থাকবে।”

ডাঃ রোকশানা হোসেন জেবা তার অনুভূতি জানাতে গিয়ে বলেন,“ আমার জন্ম একটি উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে। ছোটবেলা থেকে যা শিখেছি তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। জীবনের যা কিছু শিখেছি সবই অমূল্য। আমার চারপাশের মানুষদের জন্য আজ আমি এখান পর্যন্ত আসতে পেরে সন্মানিত বোধ করছি। আমি অত্যন্ত সৌভাগ্যবতী যে আমার জীবনে তিনজন গুরুত্বপূর্ন পুরুষ- আমার ভাই, স্বামী এবং ছেলে। তারা সর্বদাই আমাকে সমর্থন যুগিয়েছেন এবং সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেছেন।” উপসংহারে লোপা মুদ্রার ‘এই অবেলায়’ সংকলনের গান দিয়ে শেষ করছি-

“ঠিক যেখানে দিনের শুরু, অন্ধ কালো রাত্রি শেষ,

মন যতো দূর চাইছে যেতে, ঠিক ততো দূর আমার দেশ।—-

এ মানচিত্র জ্বলছে জ্বলুক, এই দাবানল পোড়াক চোখ,

আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্যলোক—–

দেশ মানে কেউ ভোরের স্লেটে লিখছে প্রথম নিজের নাম,

হাওয়ার বুকে দুলছে ফসল ,

একটু বেঁচে থাকার দায়।—-

সব মানুষের স্বপ্ন তোমার চোখের তারায় সত্যি হোক,

আমার কাছে দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক।”

You Might Also Like