সাম্প্রতিক হত্যার তদন্ত-অগ্রগতি জানতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি নাগরিক, মার্কিন মিশনের কর্মকর্তাসহ চাঞ্চল্যকর ৩৪ হত্যাকাণ্ড তদন্তের অগ্রগতি জানতে চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে দেশি বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তায় সরকারের তরফে যেসব ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বা হচ্ছে সেই তথ্যও জানতে চায় ওয়াশিংটন। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লাইট চালুর প্রেক্ষাপটে এখানকার এভিয়েশন সেইফটি নিয়েও দেশটির উদ্বেগ রয়েছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে আগামী ২৩শে জুন থেকে ওয়াশিংটনে শুরু হওয়া পার্টনারশিপ ডায়ালগে আলোচনা হবে বলে আভাস মিলেছে। সূত্র মতে, সেখানে এসব বিষয়ে বাংলাদেশ তার অবস্থান তুলে ধরবে। আপটেড তথ্যও দেশটির নেতৃত্বের সঙ্গে শেয়ার করা হবে। সে মতেই ডায়ালগ প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়েছে। সূত্র মতে, ৩ ধাপে দুদিনের এ ডায়ালগ বা সংলাপ হবে। সেখানে নিরাপত্তার বিষয়টি টপ এজেন্ডায় থাকছে। নিরাপত্তার আলোচনায় উল্লিখিত বিষয়গুলো স্থান পাবে বলে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছে। সূত্র মতে, বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র পঞ্চম পার্টনারশিপ ডায়ালগ এটি। এতে অংশ নিতে আজই ওয়াশিংটনের উদ্দেশে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের ১৩ সদস্যের প্রতিনিধি দল রওনা করবেন। ডায়ালগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিবেন দেশটির স্টেট ডিপার্টমেন্টের রাজনীতি বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি থামাস এ শ্যানন। ২০১২ সাল থেকে নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা- ওই ৩ ধাপে আলোচনা হয়ে আসছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না জানিয়ে সংলাপ প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত ঢাকার কর্মকর্তারা মানবজমিনকে বলেন, পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় এবারের সংলাপে কিছু বিষয় যুক্ত হবে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে উগ্রবাদীদের হামলা ও হুমকির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এখানে নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের তাগিদ রয়েছে। সেটি ফলোআপ হয়তো তারা জানতে চাইবে। বাংলাদেশ তার অবস্থান তুলে ধরবে। সেখানে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান, আটকের বিষয়টি তুলে ধরা হবে। সেই অভিযানের আলোচনায় এটি মোটেও রাজনৈতিক নয় বলে স্পষ্ট করা হবে। একই সঙ্গে এখানে অস্ত্র উদ্বার এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দেশের এক লাখ আলেমের ফতোয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হবে। ক্রসফায়ারে সন্দেহভাজন জঙ্গি নিহত হওয়া বিশেষ করে হাতকড়া পরা প্রকাশিত ছবি নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা। সেই আশঙ্কায় সংলাপ প্রস্তুতির চূড়ান্তপর্বে এ নিয়ে পুলিশের বক্তব্য চাওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ যে জঙ্গি কিংবা উগ্রপন্থিদের দমনে করা হচ্ছে সেটি অত্যন্ত স্পষ্ট করেই তুলে ধরা হবে বলে জানান এক কর্মকর্তা। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রপন্থিদের সম্ভাব্য উত্থানে আশঙ্কায় বরাবরই বিচলিত যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দুনিয়া। এ নিয়ে বহু দিন ধরে সতর্ক বার্তা দিয়ে আসছেন তারা। গত এপ্রিলে মার্কিন সাহায্য সংস্থার কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান নিজের বাসায় নির্মমভাবে খুন হওয়ার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে নিজেদের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য সমপ্রতি নিজেদের নিরাপত্তারক্ষীদের অস্ত্র বহনসহ নিজস্ব নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলার অনুমতি চেয়েছে ওয়াশিংটন। জুলহাজ হত্যার বিষয়টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছে বলে জানান দেশটির রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট। আর এ নিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। তার জরুরি বার্তা দিয়ে আলোচনায় ঢাকায় আসেন মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল। তার সফরের সময় আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে তা বাস্তবায়নে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার জন্য ঢাকা সফর করেন মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক মুখ্য উপসহকারী মন্ত্রী উইলিয়াম ই টড। এরপর ঢাকায় আসেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কূটনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী গ্রেগরি স্টার। সরকারি একাধিক সূত্র জানায়, গ্রেগরি স্টারের সফরের সময় বাংলাদেশে মার্কিন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করতে নিজস্ব নিরাপত্তাবলয়ের কথা বলা হয়। ওই সময় বাংলাদেশকে দেয়া এক প্রস্তাবে মার্কিন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত একটি বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের (বাংলাদেশি নাগরিক) জন্য প্রকাশ্যে আধুনিক অস্ত্র বহনের অনুমতি চাওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ওই অনুরোধ বাংলাদেশের পক্ষে যে রাখা সম্ভব নয়, সেটি তাৎক্ষণিকভাবে বলা হয়নি। তখন বলা হয়- কোনো দেশকে এখন পর্যন্ত এ ধরনের সুবিধা দেয়ার বিধান নেই। বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা গতকাল বলেন, আসন্ন ওয়াশিংটন সংলাপে এ বিষয়ে বাংলাদেশ তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে পারে বলে জানা গেছে। সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। সেখানে শ্রম অধিকার ও কর্মপরিবেশের বিষয়েও কথা হতে পারে। এ নিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতির বিষয়টি সেখানে তুলে ধরা হতে পরে।

You Might Also Like