সরকারের ফরমালিনবিরোধী যুদ্ধের পরিণতি কী দাঁড়াল?

বাংলাদেশে এখন বিরামহীনভাবে নানা অন্যায়ের ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। এর মধ্যে কিছু কিছু মারাত্মক বিপজ্জনক ঘটনা সংবাদপত্রের পাতায় বড় বড় অক্ষরে স্থান করলে তা নিয়ে তুমুল হুলস্থূল হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। এ হুলস্থূল, প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে সরকার অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে ছাড় দেয়া যাবে না ইত্যাদি গালভরা কথা বলে এবং অপরাধীদের পাকড়াও ও শাস্তির কথা বলে জনমত, বিশেষত বিভিন্ন মহলে অবস্থিত কিছু বুদ্ধিজীবীকে সামাল দেয়ার ব্যবস্থা করছে। এ ক্ষেত্রে সরকার কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপও গ্রহণ করছে। কিন্তু ব্যস ওই পর্যন্তই। এরপর সরকার যে খেলা প্রত্যেক ক্ষেত্রে রুটিন ব্যাপার হিসেবে দেখাচ্ছে তা হল, নানা কৌশলের মাধ্যমে সব শাস্তিমূলক প্রক্রিয়াকে সক্রিয়ভাবে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা থেকে নিয়ে খাদ্যে বিষ ব্যবহার পর্যন্ত প্রত্যেক ক্ষেত্রে এই একই খেলা এখন সরকারের এক ধাপ্পাবাজি হিসেবে জনগণের কাছে সুপরিচিত হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনার সঙ্গে সরকারের আইনশৃংখলা বাহিনী তথাকথিত এলিট ফোর্স র‌্যাবের সম্পৃক্ততার অকাট্য প্রমাণ উদ্ঘাটিত হওয়ার পর রাস্তায় রাস্তায় তাদের টহলদারি ও তল্লাশির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। কিন্তু সাত খুনের মামলা ঝুলে থাকা অবস্থাতেই এখন সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অজুহাতে রাস্তায় রাস্তায় র‌্যাবের টহলদারি আবার শুরু হয়েছে! এসব এত পরিচিতি ও রুটিন ব্যাপার যে, এ নিয়ে সংবাদপত্রে দুই-এক ছত্র রিপোর্ট ছাড়া আর কোনো প্রতিক্রিয়া ঘটনার সময় উত্তেজিত মধ্যবিত্তের মধ্যে যেভাবে দেখা গিয়েছিল, এখন সেটা আর নেই। সরকার নিজের সিদ্ধান্ত পাল্টে র‌্যাবকে আবার রাস্তায় নামিয়ে নিজেদের ইজ্জত রক্ষার যে ব্যবস্থা করেছে, তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে র‌্যাবকে আবার রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার কোনো দাবি নেই! এ পরিস্থিতিতে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী নামে অভিহিত র‌্যাবের কিছু অফিসারের অপরাধমূলক কাজ এবং সাধারণভাবে তাদের বেপরোয়া জনবিরোধী কার্যকলাপের কারণে এই বাহিনীকে বিলুপ্ত করার যে আওয়াজ নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার পর জনগণের মধ্য থেকে উঠেছিল, তা এখন আর নেই।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার থেকে নিয়ে অন্য কমিশনাররা এখন যে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসেবে নির্বাচন পরিচালনার কাজ করেন, এটা বিগত ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের সময় অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়েছিল। কয়েক দিন আগে নারায়ণগঞ্জের উপনির্বাচনে এটা যেভাবে আবার প্রমাণিত হল, তাতে মনে হয় সরকার ও তার তাঁবেদার এই নির্বাচন কমিশন যতদিন আছে, ততদিন কোনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানেই জনগণের নিজেদের স্বাধীন ভোটের দ্বারা কোনো প্রতিনিধি নির্বাচনের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। বড় বড় ক্রাইম যতই হোক, তা নিয়ে সাময়িকভাবে যতই হুলস্থূল হোক, ক্রাইম কমে আসার কোনো সম্ভাবনা বাংলাদেশে নেই। যেখানে ক্রাইমের জন্য কোনো শাস্তি নেই অথবা ক্ষেত্রবিশেষে থাকলেও তার সংখ্যা নগণ্য, সেখানে এটাই স্বাভাবিক।

ব্যাংক লুটপাট, ভূমিদস্যুতা, বিহারি, সাঁওতাল, খাসিয়া, রাখাইন, চাকমা ইত্যাদি সংখ্যালঘু জাতিসত্তার ওপর নির্মম নির্যাতন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সরকারি দলের গুণ্ডাবাহিনীর অপরাধমূলক তৎপরতা থেকে নিয়ে খাদ্যে বিষ প্রয়োগ পর্যন্ত কোনো কিছুই বন্ধ হওয়ার নয়। যতদিন এই ক্ষমতাসীনরা আছে, ততদিন এসবই থাকবে এবং থাকতে বাধ্য। কারণ একদিকে এরা এসব অপরাধের জন্য যেমন সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে তেমনি আবার এ সবের মাধ্যমেই এরা নিজেদের সরকারি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। যে অপরাধীরা এসব সমাজবিরোধী কাজ করে, এরাই হল বাংলাদেশের শাসকশ্রেণী ও তাদের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সামাজিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি।

এ ধরনের অপরাধী এবং পুলিশ ইত্যাদি তথাকথিত আইনশৃংখলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান সরকার। দুনিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগ দেখিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশনকে এবং এসব শক্তিকে চাকরবাকরের মতো ব্যবহার করে কীভাবে একটি দেশে গণতন্ত্রের নামে বেসামরিক অভ্যুত্থান বা মিডিয়া ক্যু ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করা যায়। আইন-কানুন রক্ষা করেই নাকি এই অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটানো হয়েছে! দেশের অবস্থা যে এ রকম, এটা অপরাধীদের থেকে বেশি আর কে জানে? অপরাধ করার জন্য পেশাগতভাবেই তাদের এটা জানতে হয়। বাংলাদেশে এখন একটা বড় সমস্যা দাঁড়িয়েছে নানা ধরনের খাদ্যদ্রব্যে বিষ প্রয়োগ এবং এমন সব ভেজাল মেশানো যা বিষতুল্য। এ বিষয় নিয়ে কথাবার্তা শুরু হওয়ার পর প্রথম প্রথম মিষ্টির দোকান ও রেস্তোরাঁগুলোতে, বিশেষত মিষ্টির দোকানে সরকারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদারকি শুরু হয়। মাঝে মাঝে এ কাজ করতে গিয়ে কিছু দোকানিকে অল্পবিস্তর জরিমানাও করা হয়। কিন্তু তাতে বিশেষ কাজ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সে শুদ্ধি অভিযান পরিত্যক্ত হয়। পরবর্তীকালে ধরা পড়ে যে শুধুু মিষ্টি নয়, ফলমূলের মধ্যেও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক জিনিস মেশানো হচ্ছে। কাজেই মিষ্টির মতো ফলমূল পরীক্ষার কাজ এবং কিছু কিছু ফল বিক্রেতাকে জরিমানা করা শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় ব্যাপার ছিল এই যে, হোল সেলার, আমদানিকারক ও আড়তদারদের ওপর এ ধরনের কোনো তদারকি না করে শুধু খুচরা বিক্রেতাদের ক্ষেত্রেই এটা করা হয়। কাজেই আসল সমস্যার কোনো সমাধান এর দ্বারা হয়নি এবং হওয়ার কথাও ছিল না, কারণ খুচরা দোকানদাররা নিজেদের পণ্য তাদের কাছ থেকেই নিয়ে আসে। কাজেই ফলমূল ইত্যাদিতে বিপজ্জনক জিনিস মেশানো অব্যাহত থাকে।

শুধু তাই নয়, এ অবস্থায় চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি সবকিছুর বিক্রেতারাই ফলমূলের মতো নিজেদের জিনিসে বিষ মেশাতে শুরু করে। এর ফলে আজ এমন কোনো বাজারজাত খাদ্যদ্রব্য নেই যাতে ফরমালিন, কারবাইড থেকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে না। দেশে উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূলের ক্ষেত্রে এখন এসব বিষাক্ত রাসায়নিক জিনিসের ব্যবহার খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার। আগে যখন পরিবহন ব্যবস্থা ভালো ছিল না, এক জায়গা থেকে দেশের অন্য জায়গায় পণ্যদ্রব্য পরিবহনের অসুবিধা ছিল, তখনও এ ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়নি। কিন্তু এখন পরিবহন ব্যবস্থার প্রভূত উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যপণ্যে বিষ মেশানো হচ্ছে। এর কোনো সাধারণ যৌক্তিক কারণ নেই। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে, যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি যত বেশি সম্ভব মুনাফা কামিয়ে নেয়া। এ কাজ করতে গিয়ে ক্রেতা ও সাধারণ ভোক্তাদের জীবন বিপদাপন্ন হলেও এই ব্যবসায়ীদের কিছুই যায় আসে না। তাড়াতাড়ি বেশি মুনাফা কামানোর স্বার্থে তাদের পক্ষে কোনো কাজই তারা হিসাব করে না।

মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন তো তাদের এ অপরাধমূলক কাজের ক্ষেত্রে কোনো হিসাবের মধ্যেই আসে না। এর থেকেই বোঝা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থায় মানুষের অপরাধ প্রবণতা কী পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এদের শাসন সামগ্রিকভাবে দেশের জনগণের জন্য কতখানি বিপজ্জনক হয়েছে। একদিকে দেশে সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা খাতে বিশেষ কিছু নেই এবং গরিবদের কোনো বড় বা মাঝারি অসুখের চিকিৎসা তাদের আর্থিক সঙ্গতি ও সুযোগ-সুবিধার বাইরে। কিন্তু এভাবে খাদ্যে ভেজাল ও বিষ দেয়ার ফলে তারাই সব থেকে বড় আকারে আক্রান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

পরিস্থিতি আজ এ অবস্থায় এসে দাঁড়ালেও এর প্রতিকার তো দূরের কথা, একে মোটামুটি নিয়ন্ত্রণের কোনো ইচ্ছা ও চেষ্টাই সরকারের নেই। কারণ এসব ফলমূল, শাকসবজির বড় ব্যবসায়ী, আড়তদার ও উৎপাদকরা হল সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এদের লুটপাটের ভাগ যেমন সরকারি লোকেরা পায়, তেমনি এদের ওপর দাঁড়িয়েই সরকার ক্ষমতায় আছে। এটা যদি না হতো তা হলে খুচরা বাজারে, কোটি কোটি দোকান ও স্টলে তদারকি চালানোর পরিবর্তে এরা বড় ব্যবসায়ীদেরই পাকড়াও করত। যেখানে তারা পাইকারি হারে ফলমূল, শাকসবজিতে বিষ মেশায়, সেসব জায়গায় তারা হামলা করত। তাদের মজুদ মালামাল ধ্বংস করত, তাদের গ্রেফতার করত ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা করত। এর ফলে খাদ্যদ্রব্য তাদের মুনাফাখোরীর জন্য যেভাবে বিষাক্ত করা হচ্ছে, সেটা সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব না হলেও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হতো। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই শাসকশ্রেণী ও তাদের সরকারের শাসন আমলে এর কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কারণ সাধারণভাবে দেশে আইনশৃংখলা রক্ষার নামে আইনের বাইরে দাঁড়িয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সব ধরনের বে আইনি কাজ করা, চারদিকে সরকারের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন চালিয়ে যাওয়া, সর্বোপরি চুরি-দুর্নীতি-ঘুষখোরি অবাধ হওয়ার যে অরাজক পরিস্থিতি এখন দেশে বিরাজ করছে, তাতে সরকারের ফরমালিনবিরোধী যুদ্ধের পরিণতি কী দাঁড়াল? এখানে প্রথমেই কোনো ঘটনার বিরুদ্ধে তুমুল হুলস্থূলের পর কৌশলের সঙ্গে সরকার কর্তৃক স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনার যে কথা বলা হয়েছে, সরকারের ফরমালিনবিরোধী যুদ্ধের পরিণতি সেটাই হয়। সংগঠিত প্রতিরোধের অনুপস্থিতিতে বর্তমান পরিস্থিতিতে এছাড়া অন্য কিছু হওয়ার আর কি সম্ভাবনা আছে?

You Might Also Like