সময়ের পরশ পাথর

ভূ মি কা
ভূমিকা গ্রন্থের সারসংক্ষেপ। বড় কিছু ছোট করে প্রকাশ করা কঠিন কাজ। একটি বাক্যে যখন অনেক কথা, অনেক জ্ঞান, অনেক তথ্য ও গভীর দর্শন প্রকাশ পায়Ñ তখন সেটি বাণী হয়ে ওঠে। মূল বক্তব্য সহজবোধ্য করে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে বাণীর ভূমিকা সর্বজন স্বীকৃত। সে হিসেবে ভূমিকা গ্রন্থের বাণী। ছয় শতাধিক পৃষ্ঠার এ গ্রন্থটিকে কয়েক পৃষ্ঠায় নিয়ে আসার চিন্তা আরও ছয় হাজার পৃষ্ঠার একটি বই রচনার চেয়ে সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। ভূমিকায় গ্রন্থের সারসংক্ষেপ প্রকাশের মত দক্ষতা আমার নেই। তাই নিজের অদক্ষতা আড়াল করার জন্য শুধু পটভূমিতে বিবরণ সীমাবদ্ধ রাখলাম।

২০০৫ খ্রিস্টাব্দের এক শীতের কথা। পিকনিকে গিয়েছি। সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, সাহিত্যিক, কবি, নাট্যকার, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনবিদ, বিচারক, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা, গায়কসহ বিভিন্ন পেশার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষে জমজমাট। স্পটে পৌঁছার পর এক অংশগ্রহণকারী একটা নতুন প্রতিযোগিতার ধারণা দিলেন। এখনও জীবিত এমন লোকের মধ্যে কে কার ‘প্রিয় মানুষ ও আদর্শ ব্যক্তিত্ব’ এবং কেনÑতা সংক্ষেপে লিখতে হবে। বিচারকমণ্ডলী শ্রেষ্ঠ বিবেচনায় তিনজনকে বিজয়ী ঘোষণা করবেন।

আমি এমন কখনও ভাবিনি। শিশু বেলায় আমার প্রিয় মানুষ ও আদর্শ ব্যক্তিত্ব ছিলেন মা-বাবা। কলেজে এসে আহমদ ছফা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আদর্শ মানুষ ও প্রিয় ব্যক্তিত্বের ধারণা আরও ব্যাপকতা পায়। যাকেই পড়ি শ্রেষ্ঠ মনে হয়। কর্মজীবনে এসে তা আরও বিস্তৃত হয়। রবীন্দ্রনাথ নাকি নজরুল; সেক্সপিয়র নাকি ফ্রান্সিস বেকন, বঙ্গবন্ধু নাকি আব্রাহাম লিংকন, সক্রেটিস নাকি আইনস্টাইন, মহাত্মা গান্ধী নাকি মাদার তেরেসা, কনফুসিয়াস না গৌতম বুদ্ধ! সবাই গত। বঙ্গবন্ধু জীবিত নেই। তাহলে লিখে দিতাম বঙ্গবন্ধু। এখন কার নাম বলি! বেশিক্ষণ ভাবতে হয়নি। কয়েক মিনিটের মধ্যে জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে আমার প্রিয় মানুষ ও ব্যক্তিত্ব নির্ধারণ করে নিলাম।

আমার ‘প্রিয় মানুষ ও আদর্শ ব্যক্তিত্ব’ বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সহনশীল রাজনীতির প্রবক্তা, বিশিষ্ট শিল্পপতি, দানবীর ও লেখক সৈয়দ আবুল হোসেন। কেন তিনি আমার প্রিয় মানুষ ও আদর্শ ব্যক্তিত্ব তা লিখতে মোটেও বেগ পেতে হল না। লিখেছিলাম: ‘তিনি স্ববিকশিত অনুপ্রেরণা। সুন্দর অবয়ব, চমৎকার ব্যবহার। ব্যক্তিত্বে আকর্ষণীয়, সদাহাস্যে অনুপম। অহঙ্কারের লেশমাত্র নেই। সমস্যা ও কারণ দুটোই দ্রুত এবং যথার্থ প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে চিহ্নিত করতে পারেন। বুদ্ধিমান, ধীর ও স্থির। তাঁর রাজনীতি, চিন্তা-চেতনা ও আর্থ-সামাজিক দর্শন সার্বজনীন মূল্যবোধের নির্লোভ মমতায় সৌরালোকের মত উদ্ভাসিত ও বাতাসের মত প্রসারিত। তিনি প্রকৃতির মত সহনশীল, শিশুর মত সরল, জ্ঞানের মত বিশাল আর বৃষ্টির মত নির্লোভ। ক্ষমাশীলতার নান্দনিক ছন্দে আলোড়িত; বুদ্ধি, প্রখর দৃষ্টিভঙ্গীÑ তাঁর রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা ও বিমর্ষতাকে চিরতরে মুছে দিয়েছে। তিনি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের মাঝে আনন্দ খুঁজে পান। দান তাঁর পেশা, শিক্ষাবিস্তার নেশা। তিনি দেশপ্রেমিক, দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন। রাজনীতিকে ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ত্যাগের মহিমায় লাস্যময় করার প্রতিযোগিতায় নিবেদিত। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের প্রতি অপরিসীম মমতায় তিনি সদা সচেতন। কারও সাথে দুর্ব্যবহার করেন না। ধমনীতে উচ্চবংশীয় পবিত্র রক্তের প্রবাহ। তিনি সফল ব্যবসায়ী, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, বিশ্লেষণধর্মী লেখক, তুলনাহীন দাতা, অনাবিল শিক্ষানুরাগী। তিনি পরিশ্রমী, তেজি ও আত্মপ্রত্যয়ী। শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে বিনাশ করেন। তিনি ধর্মপ্রাণ কিন্তু অসাম্প্রদায়িক, ধনী কিন্তু নিরহঙ্কারী। শিক্ষিত কিন্তু উন্নাসিক নন। চিত্ত ও বিত্ত দুটোই তার উচ্চ শিক্ষার মত সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের আর কোন জীবিত ব্যক্তি নেই যিনি এতগুলো প্রত্যয় ও বিশেষণে ঋদ্ধ। এসব গুণাবলীর পরিপূর্ণতা তাঁকে হৃদযোগীতে পরিণত করেছেন। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব।’

প্রতিযোগিতায় আমি প্রথম হয়েছিলাম। সেদিনই আমি সৈয়দ আবুল হোসেনকে নিয়ে একটি গ্রন্থ লেখার সিন্ধান্ত নিই। ভেবেছিলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনী লিখব। বন্ধুবর ওসমান গণির পরামর্শে তা আপাতত স্থগিত রেখে সৈয়দ আবুল হোসেনের পরিচিত বিভিন্ন ব্যক্তির লেখা নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশ করব তা স্থির করি। আমার শিক্ষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. আবদুল করিমের পরামর্শ নিয়ে কাজ শুরু করি ২০০৬ সাল থেকে। কয়েক জনের লেখাও সংগ্রহ করি। তবে ওয়ান-ইলেভেন আমার কাজ পিছিয়ে দেয়। দেশের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে আবার শুরু করি। বিভিন্ন সময়ে অনেকের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ করে একত্রিত করি। এ সংগ্রহের কাজ চলে ২০১২ সাল পর্যন্ত। এই ৬ বছরের সাধনার ফসল এ সংকলন। লেখা সংগ্রহের সময় যাঁরা যে পদে আসীন ছিলেন বইটির লেখক পরিচিতিতে সেই পদমর্যাদাই ব্যবহার করা হয়েছে।

এটি ব্যক্তি নিয়ে বিবর্ধিত আমার প্রথম সংকলন। ভেবেছিলাম সহজ কাজ। কাজে নেমে বুঝলাম সহজ নয়। বিশেষ করে, জীবিত ব্যক্তির ওপর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করা কত যে কঠিন তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝতে পারবেন না। গ্রন্থে নির্ধারিত ব্যক্তির চিন্তা-চেতনা, দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন ও অবিকলন উপস্থাপন আবশ্যক। নইলে তিনি নিজেই এটি প্রত্যাখ্যান করবেন। অধিকন্তু সৈয়দ আবুল হোসেনের মত অতি উঁচু মননশীলতার একজন ব্যক্তিত্বকে তাঁর জীবদ্দশায় আমার মত সাধারণ একজনের প্রয়াসে বিকশিত করাÑ পুরো পৃথিবী উল্টে দেয়ার মতই অসাধ্য ব্যাপার। তবু সাহস করলাম, ষাট শতাংশ নম্বর পেলেই তো প্রথম বিভাগ!

কত জনের কাছে কত জায়গায় যেতে হল। কালকিনি ঘুরলাম, কত জনের সাক্ষাৎকার নিলাম তার ইয়ত্তা নেই। সৈয়দ আবুল হোসেনের আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিজীবনের সহকর্মী এবং নিকটতম লোক ছাড়াও অনেকের সাথেÑ এমনকি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অনেকের সাথেও কথা বলেছি। প্রায় সবাই সহযোগিতা করেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন। কেউ বা আবার এড়িয়ে গিয়েছেন। দু’একজন নিরুৎসাহিতও করেছেন। আমি হতাশ হইনি। হতাশ না হওয়ার কৌশলটা আমি সৈয়দ আবুল হোসেনের কাছ থেকে রপ্ত করেছি।

যদি কেউ অন্যের অভাব কিংবা কষ্টে নির্বিকার থাকেন, তখন লোকে তাকে নিষ্ঠুর, কৃপণ ইত্যাদি কু-বিশেষণে বিশেষায়িত করে। আবার যদি উদার হাতে এগিয়ে আসেন তখন বলে, প্রচারের জন্য করছে, নাম-লোভী। এটি বাঙালি চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমার এ সংকলনকে অনেকে তোষামোদ বলে ভাবতে পারেন। প্রত্যেকের নিজস্ব ভাবনার অলঙ্ঘনীয় স্বাধীনতা আছে। কারও ভাবনা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। আমার চোখে যেটি সুন্দর, মোহনীয় সেটি উচ্ছ্বসিত ভাবালুতায় প্রকাশ করতে কোন অবস্থাতে দ্বিধা করব না, পিছিয়ে যাব না।

সৈয়দ আবুল হোসেন আমার প্রিয় মানুষ ও আমার চোখে তিনি শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। তাই আমি তাঁকে নিয়ে সংকলনটি প্রকাশ করলাম। এখানে কারও প্রশংসার প্রত্যাশা যেমন করি না, তেমনি করি না নিন্দার শঙ্কা। আমার প্রিয় মানুষকে আমি প্রকাশ করব আমার আনন্দের জন্য। এ ছাড়াও সংকলন প্রকাশের অন্য একটি উদ্দেশ্য আছে। সেটি হল, যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে গুণী জন্মায় না। দেশে অনেকের স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে; তাদের কয়জনই বা সার্বিক বিবেচনা ও চূড়ান্ত বিশ্লেষণে সৈয়দ আবুল হোসেনের মত চিত্ত-বিত্ত ও মননশীলতায় তাঁর কাছাকাছি হবার যোগ্যতা রাখেনÑ সে বিষয়ে আমার ভাল ধারণা আছে। যে সকল গুণ মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়কÑ তার সবগুলো গুণ সৈয়দ আবুল হোসেনে বর্তমান।

অনেকে বলেন, মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী। কথাটা আমি পুরোপুরি মেনে নিতে সংশয় বোধ করি। আমার মতে, ব্যক্তিবিশেষ বুদ্ধিমান হতে পারেন, সামষ্টিকভাবে মনুষ্য জাতি শ্রেষ্ঠ নয়। পৃথিবীতে এখনও অনেক মানুষ আছেন যারা বুদ্ধিমত্তা, দৃষ্টিভঙ্গী ও চিন্তাচেতনায় পশুর চেয়ে অধম। ধর্মীয় উন্মাদনায় হায়ে না। মানুষ যদি বুদ্ধিমান প্রাণী হত তাহলে নিউটন, আর্কিমিডিস, সক্রেটিস, এরিস্টটল, আইনস্টাইন, সেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ কিংবা স্টিফেন হকিং-এর পাশে ভূত-প্রেত বা ঝাড়-ফুঁকে বিশ্বাসীদের অবস্থান দেখা যেত না। বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের নিরক্ষরাধিক্য দেশে তা আরও প্রবল। হয়ত তাই সৈয়দ আবুল হোসেন শিক্ষা বিস্তারের আন্দোলনে নেমেছেন। শিক্ষাকে সবার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে তিনি মানুষকে প্রকৃত অর্থে সৃষ্টির সেরা জীবে পরিণত করার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত।

সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে ঘনিষ্ঠ এমন অনেককে তাঁর সম্পর্কে কিছু লিখতে অনুরোধ করেছি। প্রচুর সাড়া পেয়েছি। অনেক লেখা এসেছে। তা থেকে বাছাই করে কয়েকটি মাত্র প্রকাশ করা হয়েছে। হাতে গোনা কয়েকজন আমাকে পরোক্ষভাবে উপহাস করেছেন। একজন নিজেকে সৈয়দ আবুল হোসেনের বন্ধু দাবি করেন। তিনি বরেণ্য শিক্ষাবিদ। তাকে একটা লেখা দেয়ার জন্য অনুরোধপত্র দিয়েছিলাম। অনেকদিন হয় জবাব না পেয়ে ফোন করলাম। বললেন, সময় নেই। অথচ বাংলা সাহিত্যের জীবন্ত কিংবদন্তী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চিঠি দেয়ার তিন দিন পর তিনি লেখা পাঠিয়ে দেন।

খুব উঁচু পদে আছেন এমন একজন বললেন, এত লোক থাকতে সৈয়দ আবুল হোসেন আপনার প্রিয় ব্যক্তিত্ব হল কেন? সবিনয়ে বলেছিলাম, আমার বিবেচনা আমার কাছে। বলেছিলাম, এমন একটি সদ্গুণের কথা বলেন যেটি সৈয়দ আবুল হোসেনের নেই, এমন একটি ক্ষেত্রের কথা বলেন যেখানে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং এমন একটি দোষের কথা বলেন যেটি সৈয়দ আবুল হোসেনের আছে। তিনি অনেকক্ষণ ভেবে বললেন, ‘আমি আপনাকে যাচাই করার জন্য এটি বলেছি। আপনি সঠিক। তাকে আবার আমার কথা বলবেন না যেন।’ আমি বলেছিলাম, আমি তার কাছ থেকে এমন দীক্ষা পাইনি। সৈয়দ আবুল হোসেনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন ব্যক্তি না পাওয়া পর্যন্ত তিনি আমার জীবনে জীবিত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রিয় মানুষ ও শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হয়ে থাকবেন। তাঁর সম্মাননা গ্রন্থ আমাকে এক বার নয় বারবার, হাজার বার চয়ন করতে হবে।

সৈয়দ আবুল হোসেন সম্মাননা গ্রন্থ প্রকাশ করছি জেনে অনেকে আমাকে বাহবা দিয়েছেন। অনেকে আবার মুখটা কালো করে ফেলেছেন। দুটোই আমার কাছে ভাল লেগেছে। যারা বাহবা দিয়েছেন তারা সৈয়দ আবুল হোসেনকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। যারা এড়িয়ে গেছেন তারা এটি করেছেন ঈর্ষাবশত। তার মত হতে না পারার যাতনায় মুখটা কালো করে ফেলেছেন। দুটোই সৈয়দ আবুল হোসেনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে। আমি উভয় দলের চোখেমুখে সৈয়দ আবুল হোসেন যে একজন অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব তার স্বীকৃতি পেয়েছি। এটি আমার প্রয়াসকে যথার্থ প্রমাণিত করেছে। দ্বিতীয় দলের প্রতি আমার নিবেদন, বড় হওয়ার মধ্যে কোন লজ্জা নেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায়, যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য সম্মান প্রদর্শন মহানুভবতার পরিচায়ক। যারা মহানুভব তারাই কেবল এ কাজটি করতে পারেন।

সংকলনটি প্রণয়নে যাঁরা আমাকে লেখা, ছবি, সাক্ষাৎকার, তথ্য, বুদ্ধি ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছেন তাদের সবার প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা। বিভিন্ন ব্যক্তির লেখার সমন্বিত প্রয়াস বলে পুনরাবৃত্তি লক্ষণীয়। লেখকের লেখার প্রতি সম্মান জানিয়ে তা মেনে নেয়া হয়েছে। তথ্যগত বিভ্রান্তি থাকাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাছাড়া মুদ্রণজনিত প্রমাদ অনেকটা মানব জীবনের ভুলের মতই অবশ্যম্ভাবী! এ সব বিষয়ে সদাশয় পাঠকের কাছ থেকে ক্ষমা, পরামর্শ ও সঠিক তথ্য প্রার্থনা করছি।

ড. মোহাম্মদ আমীন
ইস্কাটন রোড, ঢাকা

দ্বি তী য় সং স্ক র ণে র ভূ মি কা

সময়ের পরশ পাথর গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছে। বইটি এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে ভাবা যায়নি। পত্রপত্রিকায় সৈয়দ আবুল হোসেনকে নিয়ে যত লেখালেখি হয়েছে; যত আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে তাতে কিন্তু এমনটি ভাবাই উচিত ছিল। যার বিরুদ্ধে এত সমালোচনা তার অনুকূলে কী প্রশংসা থাকতে পারে, সময়ের পরশ পাথর গ্রন্থে এমন কী পরশ আছে; অন্যদিকে যিনি দেশের একজন অদ্বিতীয় দানবীর, ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসহ শতাধিক শিক্ষালয়ের প্রতিষ্ঠাতা তার বিরুদ্ধে এত সমালোচনা কতটুক যৌক্তিক সে সম্পর্কে সবার আগ্রহই ছিল গ্রন্থটির মূল আকর্ষণ। সৈয়দ আবুল হোসেনের সমালোচকরা গ্রন্থটি নিয়েছেন। তেমনি নিয়েছেন বন্ধু, শুভানুধ্যায়ী, আলোচক এবং সাধারণ মানুষ। প্রথম আলো পত্রিকাসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বইটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, সমালোচনা হয়েছে। যা অনেককে গ্রন্থটির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। একজন বিচারপতি (প্রাক্তন), কয়েকজন সামরিক-বেসামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা; সাহিত্যিক, কলামিস্ট, শিক্ষক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবী ফোন করে বইটি সংগ্রহের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। অনেকে পত্র দিয়েছেন, মেইল করেছেন, ফোন করেছেন, ব্লগে লিখেছেন। কেউ করেছেন প্রশংসা। অনেকে বইটির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে চমৎকার পরামর্শ দিয়েছেন। এদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

পৃথিবীতে কোন কিছু পরিপূর্ণ নয়। তাই সমালোচনা অনিবার্য। কিন্তু সমালোচনা অনেকে সহ্য করতে পারেন না। তবে সমালোচনা কখনও খারাপ নয় বরং কল্যাণকর। এ জন্য বিশ্ব জ্ঞানমণ্ডলে সমালোচনা একটি সাহিত্যকর্ম হিসেবে স্বীকৃত। একটি কথা খেয়াল রাখা দরকার, হিংসা, বিদ্বেষ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রসূত বক্তব্য কখনও সমালোচনা নয়। সমালোচনাকে অনেকে নিন্দা বা কুৎসার সমার্থক মনে করে থাকেন। তবে সমালোচনা আর কুৎসার পার্থক্য আকাশ পাতাল। সমালোচনা গবেষণাময় পর্যবেণের অভিক্ষেপ এবং যুক্তির ভাবার্থ। অন্যদিকে নিন্দা অবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্য; যার উৎস রাগ আর ঈর্ষা।

গ্রন্থটির সমালোচনা করতে গিয়ে প্রথম আলো পত্রিকায় শওকত হোসেন লিখেছেন- “সৈয়দ আবুল হোসেনের সব সময়ের সঙ্গীদের কথা বইটিতে আছে। কিন্তু টিসিবিতে চাকরিকালীন কোনো সহকর্মীর স্মৃতিচারণ এখানে নেই।” এটি অত্যন্ত যৌক্তিক সমালোচনা। অনেক খুঁজে এমন একজনকে পাওয়া গেল। তিনি হচ্ছেন মার্কিন প্রবাসী টিসিবির প্রাক্তন পরিচালক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য জনাব মোবারক এ মোল্লা। তার কাছে সময়ের পরশ পাথর গ্রন্থটির একটি কপি ও প্রথম আলোর সমালোচনা পাঠিয়ে মন্তব্য করার অনুরোধ জানানো হয়। তিনি ই-মেইলে একটি মন্তব্য পাঠান। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় প্রথম আলোর সমালোচনা ও মোবারক এ মোল্লার মন্তব্য দ্বিতীয় সংস্করণে প্রদান করা হল। অনেকগুলো মন্তব্য, সমালোচনা ও আলোচনা পেয়েছি। কলেবর বৃদ্ধি রোধ করার লক্ষ্যে ইচ্ছা থাকা সত্বেও এ সব পত্রস্থ করা সম্ভব হল না। তবে প্রফেসর ফারজানা জে চৌধুরীর ই-মেইলটা দেয়ার লোভ সম্বরণ করতে পারলাম না।

এ সংস্করণের জন্য লেখা আহবান করা না হলেও ইতোপূর্বে প্রাপ্ত অনেক লেখা জমা হয়েছিল। তারপরও অনেক লেখা পেয়েছি। কিন্তু কলেবর বৃদ্ধি প্রতিহত করার জন্য অনেক উত্তম লেখাও যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এগুলোর জন্য আর একটি নতুন বই প্রকাশ করতে হবে। তবে পাঠকদের সমালোচনা ও পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় কবি অসীম সাহার “অপরাধী জানিল না কি বা অপরাধ তারÑ বিচার হইয়া গেল”, অর্ণব রায় এর “শুধু তার বেলা কেন?” এবং সাংবাদিক নির্মল চক্রবর্তীর ‘সৈয়দ আবুল হোসেন, পদ্মাসেতু ও বিশ্বব্যাংক’ শিরোনামের তিনটি রচনা নতুনভাবে যুক্ত করা হয়েছে। অনেকে ছাপার ভুলগুলো সংশোধন করার তাগিদ দিয়েছেন। অনেকে ফোন করে কোথায় ছাপার ভুল হয়েছে তা বলে দিয়েছেন। গ্রন্থে দৃশ্যমান বানান কিংবা কারণিক ত্রুটিগুলো সংশোধন করার চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরও যদি কোন ভুলভ্রান্তি থেকে যায় তা সহৃদ্যতয়র সাথে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার নিবেদন করছি। আশা করি প্রথম সংস্করণের ন্যায় দ্বিতীয় সংস্করণেও গ্রন্থটি পাঠক প্রিয়তা পাবে।

যে সকল মহৎপ্রাণ ব্যক্তির লেখা দিয়ে গ্রন্থটির অবয়ব গ্রন্থের অবয়ব অখণ্ড একটি বিষয় চয়ন করা চরিত হয়েছে এখানে শব্দ ব্যবহার শুদ্ধ নয় এটা রচনা নির্মাণ গঠন জাতীয় শব্দ দিলে সঙ্গত হত। হয়েছে তাদের প্রতি আবারও রইল কৃতজ্ঞতা। যারা গ্রন্থটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করেছেন, ব্যক্তিগতভাবে ফোন কিংবা ই-মেইল বা সামনা-সামনি উপদেশ দিয়েছেন তাদের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। সবার প্রতি রইল শ্রদ্ধা। গ্রন্থটি সম্পর্কে যে কোন পরামর্শ ও সমালোচনা কৃতজ্ঞতার সাথে গৃহীত হবে।

ড. মোহাম্মদ আমীন
তারিখ : ৩০ মার্চ ২০১৩ নিউ সার্কুলার রোড
ঢাকা

সূ চি প ত্র

প্র থ ম অ ধ্যা য় : সৈয়দ আবুল হোসেন : জীবন ও কর্ম ……………………..
ড. মোহাম্মদ আমীন

সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্মস্থান কালকিনির ইতিকথা ২৩
কালকিনির ইতিহাস ২৭
কালকিনির জনমিতি ও ঐতিহ্য ৪১
আধুনিক কালকিনির জনক ৪৮
সৈয়দ আবুল হোসেনের বংশ পরিচয় ৫২
সৈয়দ আবুল হোসেনের বংশলতিকা ৬০
সৈয়দ আতাহার আলী ও সৈয়দা সুফিয়া খাতুন ৬৪
সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষাজীবন ৬৯
সৈয়দ আবুল হোসেনের পারিবারিক ও কর্মজীবন ৭৯
সৈয়দ আবুল হোসেনের কৃতিত্ব, অবদান ও স্বীকৃতি ৮৩
জনতার চোখে সৈয়দ আবুল হোসেন ৯৩
সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনের মহামানবীয় কয়েকটি ঘটনা ১০০
সৈয়দ আবুল হোসেন : তেজময় সিংহপুরুষ ১০৬
আলাপচারিতায় দার্শনিক নান্দনিকতা ১১২

দ্বি তী য় অ ধ্যা য় : সময়ের পরশপাথর …………………………………………

সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্য শুভেচ্ছা কবীর চৌধুরী ১২৫
ধন্যবাদ সৈয়দ আবুল হোসেন বেগম সুফিয়া কামাল ১২৮
শুভেচ্ছা আনিসুজ্জামান ১৩০
নিপাট ভদ্রলোক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ১৩১
আমার ভালোলাগা একজন আবদুল মান্নান সৈয়দ ১৩৩
সৈয়দ আবুল হোসেন : ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হাসনাত আবদুল হাই ১৩৯
অপরাধী জানিল না কি বা অপরাধ তারÑ
বিচার হইয়া গেল অসীম সাহা ১৪৪
সৈয়দ আবুল হোসেন, মান্যবরেষু ইমদাদুল হক মিলন ১৫০
পদ্মা সেতু প্রকল্প এবং আমাদের করণীয় আইনুন নিশাত ১৫২
সৈয়দ আবুল হোসেন গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার নির্মল চক্রবর্তী ১৫৭
সুশোভিত সুমন আতাউর রহমান খান কায়সার ১৬৯
পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রাসঙ্গিক বাস্তবতা মো. মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া ১৭৪
সৈয়দ আবুল হোসেন : আপনাকে মো. মোজাম্মেল হক খান ১৯৩
বলতে চাই তারই কথা ড. এম এ মাননান ১৯৭
কিছু স্মৃতি কিছু কথা শফিক আলম মেহেদী ২০১
একজন স্বয়ংসিদ্ধ মানুষ সম্পর্কে আবদুল গাফফার চৌধুরী ২০৪
সৈয়দ আবুল হোসেনের রাজনীতিক দর্শন ড. আবদুল করিম ২০৬
সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা এম মতিউর রহমান ২১৬
বন্ধু আমার উদার নিদাঘ আকাশ আবুল হাসান চৌধুরী ২২২
বিশ্বব্যাংকের পিঠটান :
বাংলাদেশের উত্থান মুন জনি ২৩২
শুধু তার বেলা কেন? অর্ণব রায় ২৩৬
মহাঋত্বিক মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ ২৪৬
যেমন তাকে দেখেছি সৈয়দ আলমগীর ফারুক চৌধুরী ২৫৩
মননে উদ্ভাসিত অনুজপ্রতীম এম আজিজুর রহমান ২৫৭
একটি দরদি হাত রয়েছে বাড়ানো অজয় দাশগুপ্ত ২৬২
বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়া ও
সৈয়দ আবুল হোসেন অজিত সরকার ২৭৭
মিসরের আসওয়ান বাঁধ এবং পদ্মা সেতু মেজর জেনারেল এ কে
মোহাম্মাদ আলী শিকদার (অব.) ২৮৬
আমার আলেকজান্ডার অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মো.
তমিজ উদ্দিন ২৯২
সৈয়দ আবুল হোসেন,
পদ্মা সেতু ও বিশ্বব্যাংক মোবেশ্বের হোসেন ৩০৪
অবগুণ্ঠনে খুঁজে ফিরি কে এম ইফতেখার হায়দার ৩১৪
আবুল হোসেনের সৌভাগ্য বনাম
পদ্মা সেতুর দুর্ভাগ্য গোলাম মাওলা রনি এমপি ৩১৭
পদ্মা সেতু উপাখ্যান : সত্য বনাম কল্পনা ড. মোজাম্মেল খান ৩২২
সতত বিভাময় মোহাম্মদ মোস্তফা ৩২৬
বহুমাত্রিক প্রজ্ঞা সিরাজ উদ্দীন আহমেদ ৩৩৩
সময়ের বরপুত্র ড. হাসমত আলী ৩৩৭
ম্যাগনেটিক ব্যক্তিত্ব ফরহাদ রহমান ৩৪০
পঞ্চমণি ড. মো. আবদুল জলিল ৩৪৬
পদ্মা সেতু প্রকল্প বৃত্তান্ত জামিলুর রেজা চৌধুরী ৩৫৩
শতাব্দীর স্মৃতি আব্দুল কাদের ৩৫৭
বিশাল মনের মাটির মানুষ মজিবর রহমান ৩৬৫
মহান এক মানুষ ওসমান গণি ৩৬৮
সৈয়দ আবুল হোসেনকে যেমন দেখেছি তরুন তপন দেওয়ান ৩৭২
অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য ব্যক্তিত্ব অধ্যক্ষ হযরত মৌলানা
মো. ইউনুস আলী ৩৭৬
এক আদর্শ সংসদ সদস্যের কথা অধ্যাপক মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ ৩৮৩
মহাকালের যাত্রী দুলাল সরকার ৩৯০
মনের মুকুরে আবদুল আজিজ হাওলাদার ৩৯৬
নেতার মতো নেতা আলহাজ্ব উপাধ্যক্ষ মুহাঃ
জালাল উদ্দিন ৪১১
আধুনিক কালকিনির বিনির্মাতা অধ্যক্ষ মো. খালেকুজ্জামান ৪১৮
আমার ভাই আমার আদর্শ ড. সৈয়দ এ হাসান ৪২৪
সার্বজনীন রাজনীতিবিদ ড. একেএম আখতারুল কবীর ৪৩৪
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু অধ্যাপক ইবনে হাসান আলম ৪৪০
আমার বাল্যবন্ধু মো. লাল মিয়া ৪৪৩
প্রেরণাদায়ী সহধর্মিনী খাজা নার্গিস আহমদ হোসেন বীরপ্রতীক ৪৪৯
ছাত্রনং অধ্যয়নং তপোঃ মো. শামশুল আলম মিয়া ৪৫৫
আমার দেখা সৈয়দ আবুল হোসেন অধ্যক্ষ মো. জসিম উদ্দিন ৪৫৯
খুঁজে বেড়াই তারে অধ্যাপক মনোরঞ্জন দাশ ৪৭০
মহানুভব এক মহানায়ক অধ্যক্ষ প্রকাশ চন্দ্র নাগ ৪৭৪
মননশীল ভাষা বিজ্ঞানী নির্মল চন্দ্র পাল ৪৮৪
পরিশ্রমী এবং করিৎকর্মা একজন
ব্যক্তির প্রতিকৃতি ফোরকান বেগম ৪৮৮
সৈয়দ আবুল হোসেন : কাছ থেকে দেখা সমীর রঞ্জন দাস ৪৯৩
গধহ ড়ভ ফুহধসরংস, ঢ়ৎঁফবহপব ধহফ
ধংংরফঁড়ঁং অযসঁফঁষ ঐধংধহ ৪৯৭
সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ খোয়াজপুর মো. রফিকুল ইসলাম কোতোয়াল ৫০৪
কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন
বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ জিয়াউল হাসান ৫০৯
ডি কে সৈয়দ আতাহার আলী
একাডেমি এন্ড কলেজ মো. শফিউল আজম ৫১৪
দার্শনিক নান্দনিকতা শফিকুল ইসলাম ইউনুস ৫২০
সময়ের পরশপাথর মোহাম্মদ আমীন ৫৩০
সৈয়দ আবুল হোসেনের বাণী এস এম আবীর চৌধুরী মীম ৫৪৭

তৃ তী য় অ ধ্যা য় : সৈয়দ আবুল হোসেনকে নিবেদিত কবিতাগুচ্ছ …………

মানবাধিকার অরুণাভ সরকার ৫৫৭
এক স্বপ্নজয়ী মানুষের জন্য আসাদ মান্নান ৫৫৮
তুমি মো. মনিরুজ্জামান ৫৬০
চিরগঙ্গাতীরে মুহম্মদ নূরুল হুদা ৫৬১
ভালো মানুষ আলম তালুকদার ৫৬২
মুঠোগুলো খাঁচা হয়ে যায় মাহমুদ কামাল ৫৬৩
ধৃতিতত্ত্ব রহমান হেনরী ৫৬৪
এই এখনো নাসির আহমেদ ৫৬৫
সেদিন প্রকাশ চন্দ্র নাগ ৫৬৬
যাঁর মন আছে এস এম নুর মোহাম্মদ ৫৬৭
তোমার নি®প্রাণ ছবিটি মো. বরকত উল্লাহ্ পাঠান ৫৬৮
হে শ্রদ্ধাভাজন রোমেনা আফরোজা ৫৬৯
সুহৃদ প্রাজ্ঞ বিদগ্ধ জন ফয়সল শাহ ৫৭০
হৃদ্যিক চয়ন সিন্থিয়া অণুপ্রভা ৫৭১
অনিমেষ সদাসয় আহম্মদ কামাল ৫৭২
পহেলা আগস্ট এস এম আবীর চৌধুরী মীম ৫৭৩
মহামহিম রফিকুল ইসলাম ৫৭৪

চ তু র্থ অ ধ্যা য় : সৈয়দ আবুল হোসেনের কলম থেকে ……………………

বঙ্গবন্ধু ও ইসলাম ৫৭৭
খেলার সাথী থেকে জীবন সাথী ৫৮২
অন্তরঙ্গ আলোকে শেখ হাসিনা ৫৮৫
নেতৃত্ব ও উন্নয়ন ৫৯২
তারুণ্য ও শিক্ষা ৫৯৫
একুশের নতুন প্রেক্ষিত : ভাষা নীতির স্বপক্ষে ৬০১
সত্য ও ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লায় আমি নির্দোষ ৬০৪
কালকিনি : আমার প্রেম ৬২৯

গ্রন্থালোচনা ৬৩৪

প্র থ ম অ ধ্যা য়

সৈয়দ আবুল হোসেন : জীবন ও কর্ম

ড. মোহাম্মদ আমীন

সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্মস্থান
কালকিনির ইতিকথা

কালকিনির নামকরণ প্রবাদ
১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১ আগস্ট মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার ডাসার গ্রামে সৈয়দ আবুল হোসেন জন্মগ্রহণ করেন। আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্মস্থান নদীলালিত কালকিনি ভূখন্ডটির প্রাচীন নাম কি ছিল, তা সঠিকভাবে বলা যায় না। তবে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায় কৃষ্ণনগর, গোপালপুর, গোপাল সেন, লক্ষিপুর, বিভাগদি, রামনগর ইত্যাদি এ অঞ্চলের প্রাচীন নামসমূহের অন্যতম। রাঢ় গোষ্ঠীভুক্ত জনসংখ্যার বসতির জন্য কালকিনি একসময় রাঢ় বা আড়ুয়াকান্দি নামেও পরিচিত ছিল। কোনো কোনো ঐতিহাসিক এ অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, পুয়ালি বর্তমান কালকিনি অঞ্চলের একটি প্রাচীন নাম। পুণ্ড্র শব্দের আঞ্চলিক অপভ্রংশ পোদ বা পুয়া হতে পুয়ালি শব্দের উৎপত্তি। এ অঞ্চলে পুণ্ড্রগণ বসতি স্থাপন করায় নাম হয় পুয়ালি। বস্তুত, তখন পুরো মাদারীপুর অঞ্চলটিই পুয়ালিভিত্তিক ছিল। কালকিনির আর একটি প্রাচীন নাম ভাটবিলা, বর্তমানে যা ভাটবালি নামে পরিচিত। মাগধ জনগোষ্ঠীভুক্ত লোক ভাট নামে পরিচিত ছিল। মাগধ জনগোষ্ঠীভুক্ত লোকজন যে এলাকায় বসতি স্থাপন করত তা ভাটবিলা বা মাগধ জনগোষ্ঠীভুক্ত লোকের এলাকা নামে পরিচিত হতো।
ব্রিটিশ বিরোধি আন্দোলন প্রতিহত এবং নদীবিধৌত দুর্গম এলাকায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে খেজুরতলা নামক স্থানে একটি থানা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তৎকালীন ধনাট্য ব্যবসায়ী আবদুল করিম সরদার থানা প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রশাসনের ঊর্ধ্বমহলের সাথে বহুদিন যাবৎ আলোচনা করে আসছিলেন। প্রয়োজনীয় জমি ও অবকাঠামোর প্রতিষ্ঠার ব্যয়ভার তিনি নিজে বহন করেন। ফলে থানাঞ্চলের নাম রাখা হয় করিমগঞ্জ।
কালকিনির বর্তমান নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন প্রবাদ প্রচলিত। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের চর পলার্দি নদীর পশ্চিম তীরে চর পাঙ্গাশিয়া, চর বিভাগদি ও ঝাউতলা সমন্বয়ে একটি থানা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ক্যালির নামানুসারে স্থানটির নাম কালকিনি হয়েছে মর্মে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। মিস্টার ক্যালি ১৮৭০-১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফরিদপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কিন্তু থানা করা হয় ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে। সুতরাং তাঁর নামে নামকরণের কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। অধিকন্তু ক্যালি হতে কালকিনি হবার সম্ভাবনা প্রায় অবিশ্বাস্য। সর্বোপরি কালকিনি নাম ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের অনেক পূর্বে, এমনকি সুলতানি আমলেও ছিল। সুতরাং এটি নিছক প্রবাদ মনে হয়।
অনেকে মনে করেন, রানী কঙ্কাবতী হতে কালকিনি নামের উৎপত্তি। এটিরও কোনো ভিত্তি নেই। আবার অনেকের মতে, কোলাহাকানি শব্দ হতে কালকিনি শব্দের উৎপত্তি। কোলাহা শব্দের অর্থে নদীর কোণে অবস্থিত। কানি শব্দের অর্থ ভূখণ্ড বা ভূমি। নদীর কোণে অবস্থিত ভূখণ্ড তাই নাম কোলাহকানি, যার অপভ্রংশ কালকিনি। ‘কাল কাহিনী’ শব্দ হতে কালকিনি শব্দের উৎপত্তি হবার কথাও অনেকে বলে থাকেন। কাল শব্দের অর্থ সময়, আবার কালো বর্ণকেও বোঝানো হয়ে থাকে। ধ্বংসকারীকে কাল বলা হয়। এলাকাটি যমুনা নদীর কোলঘেঁষে বিদ্যমান ছিল। বাকলা, ত্রিপুরা, ফরিদপুর ও বিক্রমপুরÑ এ চারটি প্রভাবশালী রাজ্য ও উন্নত সভ্যতার মধ্যিখানে ছিল কালকিনি। এ তিন রাজ্যের বহু কালের বহু কাল-কাহিনীর সাথে জড়িত ভূখণ্ডটি কাল-কাহিনী নামে পরিচিত। এ ভূখণ্ডটি নিয়ে প্রভাবশালী রাজ্যগুলোর মধ্যে লড়াই লেগেই থাকত। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হত, কাল হতো জনগণের। কাল বা ধ্বংসের কাহিনী হতে নাম হয় কালকিনিÑ এটি অনেকের ধারণা।
কারও কারও মতে, কুলিক শব্দ হতে কালকিনি নামের উৎপত্তি। কারুশিল্পীদের বলা হয় কুলিক এবং কানি মানে স্থান। কুলিক সম্প্রদায়ের লোকজন এ স্থানে প্রথম নিবাস গড়ে তোলেন। তাই নাম কুলিককানি এবং অপভ্রংশে কালকিনি। অনেকে মনে করেন, কিঙ্কিণী শব্দ হতে কালকিনি। কিঙ্কনী শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রাকৃতিক লাস্যে বহুমাত্রিক শব্দ দ্যোতনায় বিভূষিত নৃত্যময় সঙ্গীতের যোজনা। কালকিনির প্রাকৃতিক পরিবেশের বহুমাত্রিক যোজনা তথা পাখির গানের সাথে নদী-সবুজের অনাবিল সুরে স্বর্গীয় সুরের সৃষ্টি করত বলে এটি কিঙ্কনী নামে পরিচিতি পায়, যা কালক্রমে কালকিনি।
কালকিনি একসময় পাটের ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে বিখ্যাত ছিল। কলকাতা হতে পাট ব্যবসায়ীরা (মাড়ুয়া) পাটক্রয়ের জন্য মাদারীপুরের বর্তমান কালকিনি নামে পরিচিত আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরে আসত। মাড়ুয়ারা টাকা শেষ হলে পাট কিনতে পারত না। পাটবিক্রেতারা পাট ক্রয়ের জন্য অনুরোধ জানালে তারা বলত: আজ নেহি, কাল কিনে গা। অনেকে মনে করেন, এ ‘কাল কিনে গা’, শব্দ হতে কালকিনি নামের উৎপত্তি।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বাকেরগঞ্জ, চন্দ্রদ্বীপ, বিক্রমপুর, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও ত্রিপুরার প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কলকনি নাম হতে কালকিনি নামের উৎপত্তি হয়েছে। সদ্য উত্থিত চরের পাশে ছিল একটি নদী। গঙ্গার জল একদিক হতে অন্যদিকে গিয়ে আবার গঙ্গার শাখায় পতিত হতো। নদীর কলকল শব্দে চারিদিক মুখরিত হত। লোকে চরটির নাম তাই দিয়েছে কলকনি। অধিকাংশ লোকের মতে, এই কলকনি শব্দ হতে কালকিনি নামের উৎপত্তি।

সৈয়দ আবুল হোসেনের গ্রাম ‘ডাসার’
দেশখ্যাত শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ ও লেখক বর্তমান যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের নিবাস হিসেবে খ্যাত ডাসার ইউনিয়ন কালকিনি উপজেলার একটি বিখ্যাত ইউনিয়ন। ডাসার একটি বিখ্যাত এলাকা। শাহ আলী বোগদাদী ও হযরত শাহ বোরহান লাহোরী এ অঞ্চলে আগমন করেন। শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র হযরত শাহ সৈয়দ ওসমান। তিনি এমন কামেল ছিলেন যে, যে কোনো দায় বা বিপদাপদ থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তার কাছে এলে সেরে যেত। তাই লোকে দায়সারার জন্য তার কাছে ছুটে যেতেন। তাই এলাকাটির নাম হয়ে ওঠে দায়সার, যার অপ্রভ্রংশ ডাসার। অনেকে মনে করেন, এখানে এক ধরনের বাঁশ পাওয়া যেত। এর নাম ছিল ডাসা বাঁশ। এ ডাসা বাঁশ হতে এলাকাটির নাম ডাসার হয়।
ডাসার ইউনিয়নের গ্রামগুলো হলো- গোপাল সেন, পশ্চিম কমলাপুর, ডোমরা, পূর্ব-কমলাপুর, আইসার, পূর্বদর্শনা, আড়ুয়াকান্দি, পশ্চিম দর্শনা, ধামুসা, উত্তর খিলগ্রাম, দক্ষিণ খিলগ্রাম, ডাসার, বাকাই, বেতবাড়ি এবং পূর্ব বনগ্রাম।
কমলাপুর ডাসার ইউনিয়নের একটি বিখ্যাত গ্রাম। অতীতে এটি ছিল ব্যবসায়িক স্থান। হিন্দু দেবী লক্ষ্মীর অপর নাম কমলা। সে সময় দেবী লক্ষ্মী স্থানীয়ভাবে কমলা নামে বেশি পরিচিত ছিল। তার নামানুসারে স্থানটির নাম হয় কমলাপুর। তবে অনেকে মনে করেন, দনুজমর্দন দেবর চতুর্থ অধস্তন ছিলেন জয়দেব, পিতা হরিবল্লভ। জয়দেবের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তিনি মারা গেলে ত্বদীয় কন্যা কমলা দেবী কিছুদিন রাজ্য পরিচালনা করেন। কমলা ছিলেন অত্যন্ত প্রজাপ্রিয়। তাঁর নামানুসারে এলাকাটির নামকরণ করা হয় কমলাপুর। আবার কেউ কেউ মনে করেন, কালকিনি অঞ্চলে অনেক বিল ছিল। ঐ সকল বিল কুমলাবন ও বেতালোহায় সমাকীর্ণ ছিল। গ্রামীণ গরিব গৃহস্থগণ বিল হতে কুমলাবন সংগ্রহ করে খড়ের ঘর নির্মাণ করত। ঐ কুমলাবন হতে কমলাপুর। আধুনিক গবেষণায় জানা যায়, পর্তুগিজরা কালকিনি অঞ্চলে কমলা চাষের প্রচলন করে। এখানে এক পর্তুগিজ স্থায়ী নিবাস করে বিশাল এক কমলা বাগান সৃজন করে। তাই এলাকাটির নাম হয় কমলাপুর।
বাঁক শব্দ হতে বাকাই। নদীর বাঁকের গ্রাম। তাই নাম বাকাই। কাজি বংশের প্রতিষ্ঠাতা হযরত শাহ বোরহান লাহোরি নদীর বাঁকে বসতি স্থাপন করার পর বাকাই নাম পায়। বেতবাড়ি নামে পরিচিত অঞ্চলটি বেতালোহা ও বেত-এর জন্য বিখ্যাত ছিল। তাই নাম বেতবাড়ি। অনেকে মনে করেন, এখানে এক সময় বেত দিয়ে বাড়ি তৈরি করা হতো তাই বেতবাড়ি। খিল শব্দের অর্থ চাষাবাদের অযোগ্য জমি বা চাষাবাদে আংশিক যোগ্য কিন্তু চাষ করা হয় না, এরূপ অপেক্ষাকৃত উঁচু ভূমিকে বোঝায়। এরূপ খিলভূমিতে বসতিস্থাপন করায় নাম হয় খিলগ্রাম। খিলগ্রামের উত্তরাংশ উত্তর খিলগ্রাম এবং দক্ষিণাংশ দক্ষিণ খিলগ্রাম।
অনেকে মনে করেন, আড়ুয়াকান্দি নামটি নাকি আড়াইয়াকান্দি হতে সৃষ্ট। আড়াইটি কান্দি নিয়ে এটি গঠিত। তাই আড়াইয়াকান্দি, অপভ্রংশে আড়ুয়াকান্দি। তবে এটি ঠিক নয়। বস্তুত রাঢ় গোষ্ঠীভুক্ত জনসংখ্যার বসতির জন্য কালকিনি একসময় রাঢ় বা আড়ুয়াকান্দি নামে পরিচিত ছিল। দর্শন হতে দর্শনা নামের উৎপত্তি। এলাকাটিতে প্রাচীন পুরকীর্তিময় অনেক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান ছিল। এগুলো দর্শন করার জন্য প্রচুর লোকজন আসত। তাই নাম দর্শনা। বন হতে গ্রাম, তাই বনগ্রাম। বন কেটে গ্রামের পত্তন ঘটানো হয়েছিল বলে বনগ্রাম। মুসলমান সুলতানগণ প্রায় শতাধিক বছর বাংলাদেশে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। এ সময় সেন বংশের বিভিন্ন রাজকুমার ও উত্তরাধিকারীগণ বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। সেন রাজাদের প্রতিনিধি হিসেবে গোপাল সেন নামক এক রাজকুমার মাদারীপুর-কালকিনি অঞ্চল শাসন করতেন। পুরো ফরিদপুর ছিল তার শাসনক্ষেত্র। তিনি প্রথমে ইদিলপুর ও পরবর্তীকালে গৈলা-ফুল�শ্রীতে রাজধানী স্থাপন করেন। গোপাল সেন-এর নামানুসারে এলাকাটির নাম হয় গোপাল সেনপুর। গোপালপুর ইউনিয়নও তার নামানুসারে হয়েছে।

কালকিনির ইতিহাস
খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দের মধ্যভাগে বাকলা অঞ্চল মৌর্য শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। চতুর্থ শতকে কালকিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। বৃহত্তর ফরিদপুর ও বিক্রমপুরের বিভিন্ন এলাকায় সমুদ্রগুপ্তের (৩৪০-৩৮০ খ্রি.) এলাহাবাদ স্তম্ভের শিলালিপি ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তযুগের স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কার হয়েছে। এ আবিষ্কার কালকিনিতে গুপ্ত রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রমাণ বহন করে। কোটালীপাড়ায় আবিষ্কৃত দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত আমলের স্বর্ণমুদ্রা গুপ্ত সাম্রাজ্যের অস্তিত্বকে আরও সুদৃঢ় করে। বৃহত্তর ফরিদপুর ও বিক্রমপুরের বিভিন্ন এলাকায় যে সকল তাম্রলিপি আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে প্রতীয়মান হয় যে, ষষ্ঠ শতকে কালকিনি ধর্মাদিত্যের বিশাল সাম্রাজ্যের আওতাধীন ছিল। ধর্মপ্রাণ ও দয়ালু সম্রাট ধর্মাদিত্য প্রজাদের পানীয়জলের সুবিধার জন্য কালকিনিতে অনেক পুকুর খনন করেছিলেন। চিনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণ বিবরণ অনুযায়ী সপ্তম শতকে কালকিনি ও আশেপাশের এলাকা রাজা শশাঙ্ক ও হর্ষবর্ধনের রাজ্যভুক্ত ছিল। তৎকালীন কালকিনিসহ বর্তমান বৃহত্তর ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় তাদের রাজ্য ও শাসনের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন এখনও দেখা যায়। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া হতে তিন চতুর্থাংশ মাইল দূরে গোয়াখোলা গ্রামের সোনাকান্দুরী মাঠ খননকালে প্রাপ্ত মুদ্রা এ সব তথ্য প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতার স্মারক।
৮১৫ খ্রিস্টাব্দ হতে কালকিনি এলাকায় বৌদ্ধ রাজত্ব শুরু হয়। বৌদ্ধদের রাজ্য শাসন দশম শতকের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত বলবৎ ছিল। প্রায় দুইশত বছর কালকিনি বৌদ্ধ রাজত্বের অধীনে ছিল। ভাটি অঞ্চলে বৌদ্ধ রাজবংশের প্রভাবশালী কেউ নিবাস গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়নি।। বৌদ্ধ শাসকেরা পুরোনো হিন্দু কর্মচারী দিয়ে রাজ্য পরিচালনা করেছেন। কয়েকটি এলাকায় বৌদ্ধ রাজকর্মচারীদের কেউ কেউ অস্থায়ী নিবাস গড়ে তুললেও পরবর্তীকালে হিন্দু রাজাদের আমলে রাজরোষের কারণে এলাকা ত্যাগ করে নিরাপদ স্থানে চলে যেতে বাধ্য হয়। ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে বৌদ্ধ রাজাদের রাজধানী ছিল। তাঁরা চন্দ্র নামে খ্যাত ছিল। ইদিলপুর ও কেদারপুরে বৌদ্ধযুগের চন্দ্র আমলের তাম্রলিপি পাওয়া গেছে।১ হিন্দু আগ্রাসনের কারণে দশম শতকের শেষভাগে বৌদ্ধ যুগের অবসান ঘটে। এরপর ক্ষমতায় আসে বর্মণ রাজবংশ। ৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে কালকিনি এলাকায় ব্রাহ্মণ রাজাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১০৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কালকিনিতে ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ন থাকে। পরবর্তী ৯৩ বছর কালকিনি বিভিন্ন সামন্ত রাজা ও জমিদারদের অধীনে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে শাসিত হয়। এ সময় কোনো একক রাজা বা ভূ-স্বামী কালকিনির ওপর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
১১৫০ খ্রিস্টাব্দে সেন রাজবংশ ক্ষমতা দখল করার কিছুকাল পর, ফরিদপুরসহ কালকিনিতে সেনবংশের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১২৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কালকিনি প্রথমে সেন এবং পরে পাল রাজাদের অধীনে শাসিত হয়। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি বঙ্গদেশ দখল করে নদিয়ায় রাজধানী স্থাপন করেন। নদিয়ায় সেনবংশের পতন ঘটলেও কালকিনি বখতিয়ার খিলজির নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ বাইরে ছিল। সে সময় কালকিনি লক্ষ্মণ সেনের অনুগত সামন্তশাসক দ্বারা শাসিত হতে থাকে। নদিয়া হতে লক্ষণ সেনের রাজ দরবারের অনেক অমাত্য কালকিনি অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
বখতিয়ার খিলজির হাতে বাংলায় মুসলিম যুগের সূচনা। এরপর বাংলাদেশের ইতিহাসে মুহম্মদ তুঘলক, ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ, শামসুদ্দিন ইলিয়াশ শাহ, সিকান্দর শাহ, আজম শাহ, মাহমুদ শাহ প্রমুখ মুসলিম শাসকগণ বঙ্গদেশে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেও, ভাটি অঞ্চল কালকিনির প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। আগ্রহ থাকলেও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংকট ও নিরাপত্তার কারণে বাংলার মুসলিম শাসকগণ কালকিনিতে একচ্ছত্র প্রভাববলয় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ফলে ১৪৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তারা বঙ্গদেশ শাসন করলেও কালকিনি সেন ও পাল বংশ প্রভাবিত বিভিন্ন হিন্দু জমিদার ও সামন্ত প্রভুদের নিয়ন্ত্রণে থেকে গিয়েছিল।
আরব বংশোদ্ভুত হুসাইন শাহ শাসন ক্ষমতা অধিকার করার পর ভাটি অঞ্চলের দিকে নজর দেন। ব্লককম্যানের ভাষ্য মতে, হুসাইন শাহ সিংহাসনে (১৪৯৩ খ্রিঃ-১৫১৯ খ্রিঃ) আরোহনের কিছুদিন পর ফরিদপুর দখল করে নেন। কয়েক মাসের মধ্যে মাদারীপুর হয়ে কালকিনি পর্যন্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। এরপর এখানে মুসলমানদের আনাগোনা ও নিবাস গড়ে তোলার প্রক্রিয়া জোরেসোরে শুরু হয়। ইতোমধ্যে ফতেয়াবাদ (বর্তমান নাম ফরিদপুর) দখল করে হুসাইন শাহ নতুন মুদ্রা চালু করেন। ক্ষমতাকে সুসংহত করার সাথে সাথে তিনি তাঁর ও তাঁর ভাইদের নামে খুলনা, যশোর, পাবনা, ফরিদপুর ও মাদারীপুরের বিভিন্ন পরগনার নামকরণ করেন। বৃহত্তর ফরিদপুর ও কালকিনির বিভিন্ন এলাকায় হুসাইন শাহের আত্মীয়স্বজনের নামকরণ সংবলিত এলাকা এখনও বিদ্যমান। তৎকালীন ফতেয়াবাদ ছিল হুসাইন শাহের অন্যতম প্রধান শহর। পরবর্তীকালে জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহ ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, কালকিনি, ঢাকা ও বাকেরগঞ্জের কিয়দংশ, দক্ষিণ শাহবাজপুর এবং সন্দ্বীপ-হাতিয়া নিয়ে একটি সরকার গঠন করেন। উল্লেখ্য ‘সরকার’ বলতে বর্তমান বিভাগের মর্যাদাস¤পন্ন প্রশাসনিক এলাকা বোঝাত। নবরত্নের অন্যতম আবুল ফজল বিরচিত আইন-ই-আকবরি গ্রন্থের ভাষ্যমতে-এ সরকার অঞ্চলটির নাম ছিল মাহমুদাবাদ। সরকার মাহমুদাবাদে বৃহত্তর ঢাকা জেলা, ফরিদপুর, কালকিনি ও কুষ্টিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এরপর কালকিনিতে মোগল যুগের সূচনা ঘটে। আকবরনামা অনুসারে, ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে মোগল সেনাপতি মুরাদ খান ফতেয়াবাদ ও সরকার বাকলা (বাকেরগঞ্জ) আক্রমণ করে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বর্তমান ফরিদপুর, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর অঞ্চলকে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। মুরাদ খান ফতেয়াবাদ হতে তেরো মাইল দূরে খানখানাবাদ গ্রামে আবাসস্থল নির্মাণ করেছিলেন। ছয় বছর পর তিনি খানখানাবাদ প্রাসাদে মারা যান। প্রবাদ আছে, ভূষণা ও ফতেয়াবাদের হিন্দু জমিদার মুকুন্দ দাওয়াত করেন মুরাদ খানকে । মুরাদ খান সপরিবারে দাওয়াত গ্রহণ করে মুকুন্দ রায়ের বাড়িতে এলে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাঁদের হত্যা করা হয়। সম্রাট আকবরের শাসনামলে কালকিনিতে আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের পূর্বপুরুষ শাহ ওসমানের আগমন ঘটে।
মোগল সম্রাট আকবর উপমহাদেশে বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করলেও তাঁর শাসনের মধ্যভাগ পর্যন্ত বঙ্গদেশের সর্বত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। ষোড়শ শতকে বারো ভুঁইয়া নামে পরিচিত বারোজন জমিদার বঙ্গদেশকে বারোটি ভাগে বিভক্ত করে প্রায় স্বাধীনভাবে শাসন করতে শুরু করেন। বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম চাঁদ রায় এবং কেদার রায় তাদের রাজ্যসীমা ঢাকার রাজবাড়ি হতে শুরু করে কালকিনি হয়ে শরীয়তপুর জেলার পালং থানার অন্তর্ভুক্ত কেদারবাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সম্রাট আকবরের পর সম্রাট জাহাঙ্গীর (১৬০৬-১৬২৭খ্রি.) দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। বঙ্গদেশে নিয়োজিত গভর্নর ইসলাম খান পূর্ববঙ্গে মোগল শাসনকে সুসংহত ও বিস্তৃত করে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস নেন। বস্তুত ইসলাম খানই প্রথম ফরিদপুর-কালকিনি অঞ্চলে মোগল সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এর পূর্বে বঙ্গদেশে মুসলিম সম্রাটগণ রাজ্য শাসন করলেও বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত কালকিনি ছিল মুসলমান সম্রাটদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এখানে হিন্দু জমিদারেরাই ছিল প্রকৃত শাসক। ইসলাম খান গভর্নর হয়ে আসার স্বল্প সময়ের মধ্যে ফরিদপুর দখল করে নেন। এরপর তিনি অতি দ্রুত বৃহত্তর ফরিদপুর এলাকার সর্বত্র ক্ষমতা সুসংহত করে নিতে সক্ষম হন। তখন হতে কালকিনি এলাকা প্রকৃত অর্থে মুসলমান শাসকদের নিয়ন্ত্রণে আসে। সম্রাট জাহাঙ্গীরের পর থেকে মোগলদের পতন পর্যন্ত কালকিনি মোগল শাসকদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।

ইংরেজ ও পাকিস্তান আমল
আলিবর্দি খান (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দ) দেশে রাজনীতিক স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হন। ব্রিটিশ, ফারসি ও ডাচ বণিকেরা তাঁর শাসনকে দুরূহ করে তোলে। পলাশির যুদ্ধে সিরাজউদৌল্লা পরাজয় বরণ করার পর বঙ্গদেশে ইংরেজ শাসন প্রসারিত হওয়ার পথ সুগম হয়। মীর জাফর ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২০ ডিসেম্বর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চব্বিশ পরগণা অঞ্চলটি উপহার দেন। চব্বিশ পরগণার জমিদারি লাভের পর ইংরেজরা এলাকার ঐশ্বর্য বিশেষ করে কাষ্ঠ সম্পদের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। চব্বিশ পরগণার কালেক্টর ক্লড রাসেল ও টিলম্যান হেঙ্কেলসহ আরও কয়েকজন ইংরেজ শাসক কালকিনি এলাকার অনাবাদি জমি আবাদের উদ্যোগ নেন। ক্লড রাসেল ১৭৭০ হতে ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কিছু জমি লিজ দেন। জঙ্গলাবৃত জমি জমিদারদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ১৭৮৩ খ্রিস্টাব্দে হেঙ্কেলের নেতৃত্বে কালকিনির জমিকে ছোট ছোট প্লটে বিভক্ত করে কৃষকদের মধ্যে বিতরণের প্রস্তাব দেয়া হয়। হেঙ্কেল কালকিনির জমিগুলোকে ভবিষ্যৎ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভাবনায় বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। জঙ্গল পরিষ্কার করে যারা চাষাবাদ শুরু করবেন হেঙ্কেল তাদের অগ্রাধিকার দেয়ার কথা ঘোষণা করলে অনাবাদি জমি চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। হেঙ্কেলের অনুমোদন নিয়ে অধীনস্তরা জমি বিলিবণ্টন করা শুরু করেন। বণ্টিত জমিকে খাস আবাদ তালুক ও হেঙ্কেলের তালুক বলা হতো। তালুকগুলোর শাসন ও রাজস্ব সংগ্রহের জন্য চৌকি স্থাপন করা হয়। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে হেঙ্কেলের প্রস্তাব গভর্নর জেনারেলের অনুমোদন লাভ করে। প্রস্তাবে প্রথম তিন বছরের জন্য জমি চাষে কোনো রাজস্ব আরোপ করা হয়নি। চতুর্থ বছর বিঘা প্রতি দু’আনা দু’সিক্কা রাজস্ব নির্ধারিত হয়। বছর বছর রাজস্ব বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে নবাব সিরাজউদৌল্লাার পরজয়ের পর বঙ্গদেশে ইংরেজ শাসনের সূত্রপাত ঘটে। তবে ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারেনি। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুন লর্ড ক্লাইভ মীর জাফর আলী খানকে গদিতে বসান। সপ্তাহব্যাপী রাজনৈতিক শূন্যতায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও অন্যান্য সম্পদের ব্যাপক লুটতরাজ হয়। সিরাজউদৌল্লার পতনের পর মুসলমানগণের প্রভাব ও আভিজাত্য হ্রাস পেতে থাকে।
১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর ইংরেজ কোম্পানি মীর জাফরের জামাতা মীর কাশিমের সাথে গোপন আঁতাত করে একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। চুক্তি অনুযায়ী সিংহাসনের পরিবর্তে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম এ তিনটি জেলার বিনিময়ে নবাবের কাছে পাওনা অর্থ পরিশোধ হয়েছে মর্মে ঘোষণা করা হয়। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের ২০ অক্টোবর মীর কাশিম নবাব ঘোষিত হয় কিন্তু তিনি পুতুল নবাব হিসেবে থাকার পাত্র ছিলেন না। ইংরেজদের সাথে তাঁর দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ১৭৬৪ খ্রিস্টাব্দের ২৩ অক্টোবর বক্সারের যুদ্ধে সেকেলে রণকৌশল ও প্রাচীন অস্ত্রাধিকারী সম্মিলিত বিশাল বাহিনী স্বল্প সংখ্যক অথচ আধুনিক রণকৌশল ও মারণাস্ত্রের অধিকারী ইংরেজদের হাতে পরাজয় বরণ করে। ইংরেজগণ মীর জাফরকে পুনরায় নবাবের গদিতে বসায়। ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে লর্ডক্লাইভ দিল্লি গিয়ে বাদশাহ শাহ আলমকে প্রচুর নজরানা ও রাজস্ব আদায়ের লোভ দেখিয়ে এলাহাবাদ দিওয়ানি চুক্তি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। চুক্তির ফলে ইংরেজগণ বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে।
লর্ড ক্লাইভ সৈয়দ মোহাম্মদ রেজা খানকে দিওয়ানি শাসন পরিচালনার পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করেন। ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ মে নবাব নাজমউদৌল্লার মৃত্যু হয়। নতুন নবাব সাইফউদৌল্লাহ অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছিলেন। এ অজুহাতে তাঁর ভাতা হ্রাস করা হয়। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে সাইফউদৌল্লাাহ মারা গেলে অপ্রাপ্ত বয়স্ক মোবারকউদৌল্লা নবাব হন। ব্রিটিশ আধিপত্যকে কলকাতা-মুর্শিদাবাদ হতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তারের লক্ষ্যে ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট প্রতি জেলায় একজন করে ইউরোপীয় সুপারভাইজার নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। যশোর জেলায় মিস্টার হেঙ্কেলকে নিয়োগ দেয়া হয়। উল্লেখ্য, এ সময় গোয়ালন্দ মহকুমা ও গোপালগঞ্জের কিছু অংশ যশোর জেলার অধীন ছিল।
নবাবের সঙ্গে কোম্পানির ক্ষমতা ভাগাভাগির ফলে দেশে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। জমিদারগণ ইচ্ছেমতো খাজনা আদায় ও প্রজাদের ওপর শোষণ চালাতে থাকে। প্রশাসন ভেঙে পড়ে, জনজীবন হয়ে ওঠে দুর্বিসহ। চাষাবাদসহ আর্থনীতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে আসে। কোম্পানির কর্মচারীরা ব্যক্তিগত ব্যবসার প্রসারের জন্য রাজনীতিক ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে। তারা নিজেদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে গণ্য করে মফস্বলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাদের সাথে যোগ দেয় জমিদার ও স্বার্থান্বেষী দেশীয় কিছু লোক। ফলে ১৭৬৯-৭০ খ্রিস্টাব্দে দেখা দেয় মহাদুর্ভিক্ষ। কালকিনির এক তৃতীয়ংশ লোক দুর্ভিক্ষে মৃত্যুবরণ করে। ইংরেজরা দুর্ভিক্ষের জন্য রেজা খানকে দায়ী করে। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ এপ্রিল রেজা খানকে বহিষ্কার করে দুর্নীতির দায়ে বন্দি করা হয়। নায়েব দিওয়ানের পদ বিলুপ্ত করে দিওয়ানি দপ্তর কলকাতায় স্থানান্তর করা হয়। দিওয়ানি শাসন সরাসরি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দ হতে মুর্শিদাবাদের মসনদ প্রহসনে পরিণত হয়। নবাব ক্ষমতাহীন সাজসর্বস্ব পুতুল হয়ে যায়। ১৭৭১ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট হতে প্রশাসন থেকে দেশীয় কর্মকর্তাদের উচ্ছেদ করে ইউরোপীয় কর্মকর্তা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৭৭২-৭৩ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস রেজা খানসহ দেশীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করে ইউরোপীয়ানদের সমন্বয়ে একটি প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ করেন। তিনি প্রতি জেলায় একজন ইউরোপীয় কালেক্টর ও কয়েকজন ইউরোপীয়ান কর্মকর্তা নিয়োগ করে ইংরেজ শাসনকে আরও সুসংহত করেন। প্রতি জেলায় ইউরোপীয়দের পাশাপাশি সমমর্যাদার একজন দেশীয় দিওয়ান পদ সৃষ্টি করে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়।
১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে রেগুলেটিং এ্যাক্ট-এর অধীনে ভারতে কোম্পানির বিষয়াদি নিয়ন্ত্রণের জন্য একজন গভর্নর জেনারেল নিয়োগ করা হয়। গভর্নর জেনারেলকে সভাপতি করে চার সদস্যবিশিষ্ট কাউন্সিল গঠন করা হয়। কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ১৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে রেজা খানকে মুক্তি দিয়ে নায়েব সুবা ও নায়েব দিওয়ান নিযুক্ত করা হয়। ফৌজদারি আদালত পুনরায় কলকাতা হতে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করে মুর্শিদাবাদকে সুবার রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। রেজা খান এবার আগের মতো স্বাধীনচেতা হওয়ার সাহস দেখাতে পারলেন না, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাস্তবতাকে মেনে নিতে বাধ্য হন। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস দিওয়ানি ও নেজামত ক্ষমতা পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ করতে শুরু করেন। ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে জেলা সুপারভাইজার নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনে প্রথম শ্বেতাঙ্গদের অনুপ্রবেশ ঘটে। ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দ হতে পুনরায় ইউরোপীয় প্রশাসক নিয়োগ শুরু হয়। ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে কর্নওয়ালিস সকল দেশীয় কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে ইউরোপীয় কর্মকর্তা নিয়োগ দেন। জেলা কালেক্টরকে জেলার রাজস্ব, পুলিশ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা দেয়া হয়। ব্রিটিশ স্টার্লিং হারে একজন জেলা কালেক্টরের বেতন ছিল মাসিক দুই হাজার úাউন্ড, যা ব্রিটেনের সর্বোচ্চ সচিবের বেতনের দ্বিগুণ।
১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করা হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হলে তাদের জমিদারি নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করে সূর্যাস্ত আইন জারি করা হয়। এ নীতিতে কালকিনির অনেক জমিদারের জমিদারি হস্তচ্যুত হয়। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে লর্ড কর্ণওয়ালিসের ব্যবস্থায় নবাবের ফৌজদারি ক্ষমতা সম্পূর্ণ রহিত করে তাঁকে পেনশন ভোগীতে পরিণত করা হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দশ বছরের মধ্যে বর্ধমান রাজার জমিদারি ব্যতীত বঙ্গদেশের সকল বড়বড় জমিদারি এস্টেট নিলামে ওঠে। কালকিনির জমিদারগণের অর্ধেকের বেশি জমিদারি নিলামে ওঠে এবং অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক দ্রুততায় তারা অনেকে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। লাখেরাজ সম্পত্তি ব্যতীত অনেক জমিদারের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তারপরও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কালকিনিসহ বঙ্গদেশে যথাযথ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়। তারা বুঝতে পারে যে, সরকারি রাজস্বের বেশির ভাগ মাদাদ-ই মাআশ নামের ফন্দিবাজ জমিদারেরা বাগিয়ে নিচ্ছে। ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে সপ্তম আইন জারির মাধ্যমে জমিদারগণকে খাজনা আদায়ের জন্য কৃষকদের মালামাল, গরুবাছুর, শস্য ইত্যাদি ক্রোক করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমিদারগণ গ্রেফতারের অধিকারও লাভ করে। ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে প্রজাকে গ্রেফতারের ক্ষমতা রহিত করা হলেও ফসল আটকের ক্ষমতা বহাল থাকে। ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে সূর্যাস্ত আইন পাশ করা হয়। এ আইন অনুসারে ৩০ চৈত্রের মধ্যে বার্ষিক রাজস্ব খাজনা প্রদানের সর্বশেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এ আইন জারির ফলে জমিদারগণ যে কোনো উপায়ে প্রজাদের নিকট হতে খাজনা আদায় করে রাজস্ব প্রদানের ব্যবস্থা করতেন। ফলে প্রজা সাধারণ আরও নিগৃহীত হতে থাকে।
১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেস গঠিত হয়। মুসলমানগণ ক্রমশ সচেতন হয়ে ওঠে এবং নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তোলার প্রয়াস নেয়। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে নবাব আহসানউল্যার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নবাব সলিমুল্লাহ এস্টেটে গদিনশিন হন। মুসলমানদের সহানভূতির প্রত্যাশায় সরকার তাঁর প্রতি যথেষ্ট অনুকূল ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ঘোষণার পরপরই কংগ্রেসের নেতৃত্বে হিন্দু সম্প্রদায় আন্দোলন শুরু করে। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ করা হলে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন আরও জোরদার হয়ে ওঠে। কংগ্রেস ও হিন্দুসম্প্রদায় বঙ্গভঙ্গ রোধ করার জন্য আন্দোলন শুরু করে এবং ব্রিটিশ পণ্যবর্জনের ডাক দেয়। মুসলমানেরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নিলে দুই সম্প্রদায় মুখোমুখি হয়। কালকিনির হিন্দু সম্প্রদায় অর্থবিত্ত ও শিক্ষাদীক্ষায় মুসলমানদের থেকে অনেক এগিয়ে থাকায় হিন্দুদের সাথে পেরে ওঠা কষ্টকর হচ্ছিল। ইতোমধ্যে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম লিগ গঠন করা হয়। কালকিনির অনেক প্রভাবশালী লোক কংগ্রেস ছেড়ে মুসলিম লিগে যোগদান করেন। হিন্দু জমিদারগণের অত্যাচার ও নিপীড়নে অতিষ্ঠ মুসলমানেরা মুসলিম লিগে আশ্রয় নিয়ে নিজেদের মুক্তির পথ খোঁজে।
১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা শুরু হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দাঙ্গা চরম আকার ধারণ করে। কিন্তু কালকিনির মুসলমানগণ পরম ধৈর্যে পরিস্থিতি অবলোকন করে। হিন্দু জমিদারগণ মুসলমানদের বঙ্গভঙ্গ রদের বিপক্ষে আন্দোলন না-করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। জমিদারগণ কৃষকদেরকে আন্দোলন হতে বিরত না-থাকলে উচ্ছেদ করার হুমকি দেয়। অনেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বঙ্গভঙ্গের পক্ষে প্রকাশ্যে আন্দোলন করা হতে বিরত থাকতে বাধ্য হয়। হিন্দুরা বন্দেমাতরম ধ্বনি দিয়ে মুসলমানদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিদেশি পণ্য বিক্রয়ে বাধা প্রদান করে। এ অবস্থায় কালকিনির নেতৃবৃন্দ সংগঠিত হয়ে ‘আল্লাহু আকবর’ শ্লোাগানের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের প্রয়াস নেন। জামালপুরে মুসলমানদের আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়। বকশীগঞ্জ হতে প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তি বাংলাদেশের অনেক জায়গায় প্রচার করা হয়। এতে লেখা ছিল-

“মুসলমান ভাইদের এতদ্বারা বলা হচ্ছে যে, তারা সকলে জানে কি করে জামালপুরের মুসলমানেরা আহূত হয়ে স্বদেশী আন্দোলনে নিযুক্ত হিন্দুদের দমন করেছে। হে মুসলমান ভাইয়েরা, তোমরা কি জানো যে, সরকার এবং নবাব সলিমুল্লাহ সাহেব সম্পূর্ণভাবে আমাদের সমর্থক? সুতরাং, আমরা আর কার পরোয়া করবো? লাঠি ধর, হিন্দুদের বিতাড়িত কর, খামা হিন্দুদের মাথা ভেঙ্গে দাও এবং ধুলায় মিশিয়ে দাও। যে এ বিজ্ঞপ্তি ছিড়বে সে তার মাকে অপহরণ করেছে বলে সাব্যস্ত করা হবে।”
এতকিছুর পরও কালকিনির কোনো মুসলমান হিন্দুদের ওপর কোনো আক্রমণাত্মক ব্যবহার করেনি।
১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে কৃষক প্রজা পার্টির নেতা এ কে ফজলুল হক বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিয্ক্তু হন এবং ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকেন। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ফজলুল হকের নেতৃত্বে দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা গঠিত হয় এবং ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বহাল থাকেন। এরপর নাজিমুদ্দিন মুখ্যমন্ত্রী হন। তিনি ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৪৫ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী থাকার পর ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। তিনি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন। ১৯৪৩ হতে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মুসলিম লিগ বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন থাকে। ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন ও কৃষিখাতক আইন; ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে মহাজনি আইন এবং ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় চাকুরি নিয়োগ বিধি বা সম্প্রদায়ভিত্তিক বণ্টনবিধি আইন জারি করে সাধারণ মানুষের প্রভূত কল্যাণ সাধন করেন। প্রজাস্বত্ব আইন পাশ করে জমিদারদের জমি হস্তান্তর সংক্রান্ত ফি, জমিদারদের জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার, সার্টিফিকেট প্রথার মাধ্যমে খাজনা আদায় ও চাষিদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ আদায় বা আবওয়াব প্রথা বাতিল করা হয়। বিশ বছর সময় অতিক্রান্ত হওয়ার আগে মাত্র চার বছরের খাজনা পরিশোধ করে চাষিরা সিকস্তি জমি পুনরুদ্ধারের সুযোগ লাভ করে। বকেয়া খাজনার ওপর ধার্যকৃত সুদের হার ১২.৫% হতে ৬.২৫% নামিয়ে আনা হয়। জমির ওপর খাজনা বৃদ্ধি দশ বছরের জন্য স্থগিত ও ঋণসালিসি বোর্ড গঠন করা হয়। বঙ্গীয় মহাজনি আইন পাশ করে সুদের হার স্থির করে দিয়ে সকল মহাজনের জন্য ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়। সাম্প্রদায়িক বণ্টনবিধি অনুসারে ৫০% চাকুরি মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়। এসব আইনে সাধারণ কৃষক প্রজাগণ সন্তুষ্ট হলেও প্রভাবশালী মহল কৃষক প্রজাপার্টির উপর নাখোশ হয়। ফলে এ কে ফজলুল হক ও কৃষক প্রজাপার্টির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়। পরবর্তী নির্বাচনে কৃষক প্রজাপার্টি পরাজিত হয়।
তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর লেখা কয়েকটি গ্রন্থ ও প্রবীণ ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ত্রিশ-চল্লিশের দশকেও কালকিনিতে মুসলমানগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থা শোচনীয় ছিল। জমিদার ও অভিজাত হিন্দুদের নিপীড়ন, নির্যাতন, অবহেলা ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ করার সুযোগ ছিল না। সিরাজউদৌল্লার পতনের পর হতে আস্তে আস্তে মুসলমানদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থনীতিক অবস্থার পতন হতে হতে বিশের দশকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে আসে। জমিদারগণ কৃষকদের নিকট হতে নির্ধারিত খাজনা ছাড়াও প্রতিনিধির বকশিস, খালবন্দি (বাঁধ খরচ), দাখিলা খরচ (খাজনা আদায় খরচ), পোল খরচ (সেতু তৈরি), ডাক খরচ, ভাণ্ডারি খরচ (হাটবাজারের রক্ষণাবেক্ষণ), শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খরচ, চিকিৎসালয় ও বেগার খরচ (মজুরিবিহীন শ্রম) ইত্যাদিসহ আরও বহুবিধ খাজনা আদায় করতেন। এছাড়া ব্যক্তিগত পালকি ব্যবহারের অনুমতি লাভের জন্য ১০ হতে ২৫ টাকা, ছাতা ব্যবহারের জন্য ২ হতে ৫ টাকা, হাতিতে চড়ার অনুমতি লাভের জন্য ৩০ হতে ৪০ টাকা, পুকুর খনন করার অনুমতির জন্য ২০ হতে ৪০ টাকা, কোনো বড় অনুষ্ঠান করার অনুমতির জন্য ১৫ টাকা খাজনা প্রদান করতে হতো। এক কথায়, মুসলমান কৃষকদের সর্বপ্রকার সামন্তবাদী বৈষম্যমূলক নিপীড়ন বিনা প্রতিবাদে সহ্য করতে হতো। জমিদারগণের আইন অমান্য করলে বেত কিংবা জুতো দিয়ে পেটানো হতো। ফরিদপুর কালেক্টরেটের জমির মালিকানা দলিল পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে কালকিনিতে ১৩৫টি গ্রামে ৮৯০ জন গাঁতিদারের মধ্যে মুসলমান গাঁতিদার ছিল মাত্র ১৯৭ জন। তাও ক্ষুদ্র গাঁতিদার। জমির পরিমাণ বিবেচনায় সমস্ত জমির মধ্যে মুসলমানগণের মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ছিল মাত্র ১৪.০৯ শতাংশ। অধিকাংশ মুসলমান ছিল হিন্দু মালিকদের জমির ভাগচাষি ও দিনমজুর। হিন্দুরা মুসলমানদের নিম্নশ্রেণির হিন্দু হতে ধর্মান্তরিত হিসেবে গণ্য করত। নিচু শ্রেণি হতে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে আরও নিচুশ্রেণিতে পরিণত হওয়ায় তাদের সামাজিক মর্যাদা বলে কিছু ছিল না। জমিদারগণ হিন্দু ডোমদের চেয়েও মুসলমানদের নিকৃষ্ট মনে করতেন। কোনো মুসলমান ব্রাহ্মণের বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটতে পারত না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলমান ছাত্রদের পেছনের ভাঙা বেঞ্চে বসতে দেয়া হতো। হিন্দু ছেলেরা তাদেরকে চণ্ডালের চেয়েও ঘৃণার চোখে দেখত। কয়েকজন হিন্দু জমিদার দাড়ির জন্য প্রতি বছর ২ টাকা খাজনা আদায় করতেন। যারা খাজনা দিতেন না, তাদের দাড়িতে গরম আলকাতরা লাগিয়ে শাস্তি দেয়া হতো। গ্রামে প্রকাশ্যে কোনো গরু জবাই করতে দেয়া হতো না। জমিদার বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠানের দাওয়াতে মুসলমান গাঁতিদারদের নিচু শ্রেণির হিন্দু দিনমজুরদের সাথে মাদুরে বসতে দেয়া হতো; অন্যদিকে মুসলমান কৃষকদের মাটিতে কিংবা শুকনো ঘাসের উপর বসতে দিত। কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানে গরু জবাই করতে হলে জমিদারকে প্রায়শ্চিত্য স্বরূপ ৩০ টাকা খাজনা দিতে হতো। তাও সহজে অনুমতি পাওয়া যেত না। জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে জুতো পায়ে ও ছাতা মাথায় চলা নিষিদ্ধ ছিল। কেউ আদেশ অমান্য করলে জমিদার বাড়ির অন্ধ কুটিরে বন্দি করে রাখা হতো। অন্ধকুটিরে প্রজাদের বন্দি করে বিভিন্ন কায়দায় শাস্তি দেয়া হতো। জমিদারগণ ধর্মের ষাঁড় ছেড়ে মুসলমান প্রজাদের ক্ষেত খাইয়ে দিত। প্রতিবাদ করলে তাঁকে উচ্ছেদ করার হুমকি দেয়া হতো।
পাকিস্তান হওয়ার পর মুসলমান সম্প্রদায় এরূপ নির্যাতন হতে মুক্তি পাওয়ার প্রত্যাশায় আনন্দ উচ্ছ্বাসে উদ্বেল হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট মধ্য রাতে পাকিস্তান রাষ্ট্র ঘোষণা হওয়ার সাথে সাথে রাত বারোটায় কালকিনির হাজার হাজার লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে নারায়ে তাকবির- আল্লাহু আকবর মিছিল সহকারে বাড়ি হতে বেরিয়ে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করে। আনন্দ উচ্ছ্বাসবহুল মিছিল-সমাবেশ সপ্তাহব্যাপী বহাল থাকে। ঘরে ঘরে মিষ্টি ও শিরনি বিতরণ করা হয়। মহিলারাও গ্রামে গ্রামে নিজস্ব পরিমণ্ডলে আনন্দ শুরু করে। আবালবৃদ্ধবণিতার চোখে মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির নিশ্বাস। এতদিন পর কালকিনির মানুষের মুখে হাসি ফোটে। বিপুল সংখ্যক উঁচু বর্ণের হিন্দু কালকিনি ত্যাগ করে পশ্চিমবঙ্গ চলে যায়। নিচু বর্ণের অনেক হিন্দুও ভারত চলে যায়। এখানে প্রবল প্রতাপ ও সহায় সম্পদ থাকার পরেও সামাজিক পরিস্থিতি, ধর্মীয় ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির শঙ্কা এবং পূর্বেকার আচরণের কথা ভেবে তারা বাংলাদেশ ত্যাগ করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে সিংহভাগ শিক্ষক ছিল হিন্দু। তাদের গণহারে দেশত্যাগের ফলে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও ছাত্রশূন্য হয়ে পড়ে। অনেকগুলো মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। মুসলমানদের মধ্যে এমন শিক্ষিত ছিল না, যাদের দিয়ে স্কুল পরিচালনা করা সম্ভব। অভিজাত হিন্দুদের গণহারে দেশত্যাগের পর চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়। তবু মানুষ সামাজিক নিপীড়ন ও ধর্মীয় বাস্তবতায় উদ্বেল হয়ে ওঠে। তাদের অতীত বিষাক্ত, ভবিষ্যতের স্বপ্নীল প্রত্যাশার ডাক বিভোর করে রাখাটা অপ্রত্যাশিত কিছু ছিল না।
অল্পদিনের মধ্যে মানুষের আনন্দ উচ্ছ্বাস আফসোসে পরিণত হয়। অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যেতে থাকে। বেড়ে যেতে থাকে বেকারত্ব। অনেক মুসলমান পশ্চিমবঙ্গ হতে এখানে চলে আসে। হাজার হাজার রিফিউজি কালকিনির বিভিন্ন খাস ও পরিত্যক্ত জমি দখল নিয়ে বসতবাড়ি গড়ে তোলে। পশ্চিমবঙ্গে যারা চাকুরি করত তারা চাকুরি ছেড়ে এখানে চলে আসে। দেশ বিভাগের পূর্বে নেতৃবৃন্দ যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা সোনার হরিণে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত অধিকাংশ সময় জুড়ে পাকিস্তান ছিল সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৭ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক আইন জারি করা হলেও, এর পূর্বে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা প্রদানের জন্য বেশ কয়েকবার স্থানীয় পর্যায়ে স্বল্পমেয়াদী সামরিক আইন জারি করা হয়েছিল। শাসকশ্রেণি পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশকে উপনিবেশ হিসেবে শাসন করতে শুরু করে। প্রথমে আঘাত হানে ভাষার ওপর। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তারা ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য শহিদ হয় অনেকে। এখনকার মতো তখন এত পত্রিকা ছিল না। রাজধানীর পত্রিকার মধ্যে কালকিনি আসত শুধু দৈনিক আজাদ। ইত্তেফাক তখনও সাপ্তাহিক। মাঝে মাঝে আসত। শিক্ষিতদের কেউ কেউ স্টেটসম্যান পড়তেন। রেডিওতে আন্দোলনের কোনো খবর আসত না। তবু কালকিনিবাসী বিভিন্নভাবে খবর সংগ্রহ করে নেয়। ২১ ফেব্রুয়ারি কালকিনিতে পরিপূর্ণ হরতাল পালিত হয়। পাকিস্তানি উপনিবেশ হতে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যে প্রত্যেকটি আন্দোলনে কালকিনির নেতৃবৃন্দ সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

প্রশাসনিক বিবর্তন
ব্রিটিশ শাসনামলের প্রারম্ভে ফরিদপুরের উত্তর-পশ্চিমাংশ রাজশাহী জমিদারির আওতাভুক্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে কালকিনিসহ ফরিদপুরের বাকি অংশ একজন নায়েব সুবেদার বা নায়েব নাজিমের আওতায় “ঢাকা নিয়াবত”-এর অধীনে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়। ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রচলন হলে গোয়ালন্দ ও গোপালগঞ্জের অধিকাংশ এলাকা যশোর প্রশাসনিক এলাকার সাথে যুক্ত করা হয়। বৃহত্তর ফরিদপুরের বাকি অংশ ঢাকা-জামালপুর জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ঢাকাকে সদর দপ্তর করে ঢাকা, বাকেরগঞ্জ ও ফরিদপুরের অংশ নিয়ে ঢাকা-জামালপুর জেলা গঠন করা হয়। ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে বাকেরগঞ্জকে ঢাকা-জামালপুর হতে বিচ্ছিন্ন করে নতুন জেলা গঠন করা হয়। অন্যদিকে, ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা-জামালপুর থেকে সদর দপ্তর ফরিদপুরে স্থানান্তর করা হয়। এ সময় ঢাকা শহর ও ঢাকা জেলাকে ‘ঢাকা-জামালপুর’ জেলা হতে বিচ্ছিন্ন করা হয়। একই সাথে ফরিদপুর জেলার পশ্চিমাংশের কিয়দংশ যশোর জেলা হতে বিচ্ছিন্ন করে ফরিদপুর জেলার সাথে যুক্ত করা হয়। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলাকে নতুন কালেক্টরেট অঞ্চলের মর্যাদায় উন্নীত করে একজন সহকারী কালেক্টরের অধীনে ফরিদপুর জেলার শাসন ন্যস্ত করা হয়। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলাকে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদায় উন্নীত করে একজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টরেট নিয়োগ প্রদান করা হয়।
১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে মাদারীপুর মহকুমা প্রতিষ্ঠা করা হয়। নবগঠিত মাদারীপুর মহকুমাকে বাকেরগঞ্জ হতে আলাদা করে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলার সাথে যুক্ত করা হয়। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর জেলায় পূর্ণাঙ্গ জেলা জজ নিয়োগ করা হয়। সদর মহকুমা থেকে মকসুদপুর থানাকে, মাদারীপুর মহকুমা হতে গোপালগঞ্জ ও কোটালীপাড়াকে বাদ দিয়ে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে গোপালগঞ্জ মহকুমা গঠন করা হয়। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান শরীয়তপুর জেলাকে মাদারীপুর মহকুমার অংশ গণ্য করে বাকেরগঞ্জ জেলার অধীনে ন্যস্ত করা হয়। কোটালীপাড়া ও গোপালগঞ্জ মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে মাদারীপুর মহকুমা গোপালগঞ্জ, গোয়ালন্দ ও ফরিদপুর সদরকে নিয়ে ফরিদপুর জেলা গঠন করা হয়। মাদারীপুর, কালকিনি, শিবচর, রাজৈর, পালং, জাজিরা, নড়িয়া, ভেদরগঞ্জ ও গোসাইরহাট নিয়ে মাদারীপুর মহকুমা গঠিত হয়েছিল। মহকুমা সদর দপ্তর মাদারীপুরে স্থাপন করা হলেও এটি পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল নামের দু’টি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। প্রশাসনিক সুবিধার্থে দু’জন আইসিএস অফিসার দ্বারা এ মহকুমার প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হত।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কালকিনির জনগণ প্রথম পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করেন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার সাথে সাথে কালকিনির হাজার হাজার জনগণ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পথে নেমে আনন্দ উল্লাস শুরু করেছিল। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাদারীপুর মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করেন। ভেদরগঞ্জ উপজেলার এডভোকেট আবিদুর রেজা খান এমপি-কে জেলা গভর্নর নিয়োগ করা হয়। তবে, ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট কালোরাত্রির নৃশংস ঘটনার পর মাদারীপুর জেলাকে পুনরায় মহকুমায় পরিণত করা হয়। কালকিনি থানা পুনরায় ফরিদপুর জেলার আওতায় চলে যায়। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে মাদারীপুর মহকুমার পালং, নড়িয়া, ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা, গোসাইরহাট থানা নিয়ে শরিয়তপুর মহকুমা গঠিত হয়। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১ আগস্ট মাদারীপুর ও শরিয়তপুর দুটি পৃথক জেলায় উন্নীত হয়। কালকিনি সঙ্গতকারণে প্রথম বারের মত মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের আওতায় চলে আসে। জনাব আবদুর রশীদকে মাদারীপুর জেলার প্রথম জেলাপ্রশাসক নিয়োগ করা হয়। তিনি ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১ মার্চ হতে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত মাদারীপুর জেলার জেলাপ্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকরেন।
বর্তমান কালকিনি নামে পরিচিত উপজেলা ভূখণ্ডটির আয়তন ২৭৯.৯৮ বর্গ কিলোমিটার। উত্তরে মাদারীপুর সদর ও শরিয়তপুর সদর উপজেলা, দক্ষিণে গৌরনদী এবং মুলাদি উপজেলা, পূর্বে গোসাইরহাট, মুলাদি ও ডামুড্যা উপজেলা, পশ্চিমে কোটালীপাড়া ও গৌরনদী উপজেলা। প্রধান নদী পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ। বর্তমান কালকিনি থানা যেখানে অবস্থিত, সেটি এর পূর্বে খাজুরতলা নামে পরিচিত ছিল। ওখানে প্রচুর খেজুরগাছ ছিল বলে এলাকাটি খাজুরতলা নাম পায়। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে কালকিনি থানা প্রতিষ্ঠা হয় এবং ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ অক্টোবর উপজেলায় উন্নীত হয়। আনোয়ার হুসাইন কালকিনি উপজেলার প্রথম উপজেলা নির্বাহী অফিসার। তিনি ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ অক্টোবর হতে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট পর্যন্ত কালকিনির উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। বিখ্যাত আড়িয়াল খাঁ নদীর ঐশ্বর্যময় বাঁকে ৮টি ও পলারদি নদীর পশ্চিম পারের ৬টি মোট ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে বর্তমান কালকিনি উপজেলার অবয়ব। উপজেলাগুলো হচ্ছে: ১নং কয়ারিয়া, ২নং সাহেবরামপুর ইউনিয়ন, ৩নং রমজানপুর, ৪নং চরদৌলত খান ইউনিয়ন, ৫নং শিকারমঙ্গল ইউনিয়ন ৬নং বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন, ৭নং লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন, ৮নং এনায়েতনগর ইউনিয়ন, ৯ নং আলীনগর ইউনিয়ন, ১০নং গোপালপুর ইউনিয়ন, ১১ নং ডাসার ইউনিয়ন, ১২ নং নবগ্রাম ইউনিয়ন, ১৩ কাজি বাকাই ইউনিয়ন এবং ১৪নং বালিগ্রাম। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে কালকিনিতে একটি পৌরসভা প্রতিষ্ঠা পায়।

১. মাদারীপুর জেলা পরিচিতি, আবদুল জাব্বার মিয়া, প্রকাশকাল: ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪, পৃষ্ঠা: ৭।

কালকিনির জনমিতি ও ঐতিহ্য

২৭৯.৯৮ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট কালকিনি উপজেলার মোট জনসংখ্যা ২,৭২,১২০, তন্মধ্যে পুরুষ ও মহিলা যথাক্রমে ১,৩৮,৫৮০ ও ১,৩৩,৫৪০ এবং মোট পরিবার ৫৩,১৪০। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক লোকের সংখ্যা ১,৩৫,৯৮০। মোট জনসংখ্যার মাত্র ১২.৩ ভাগ লোক শহরে বাস করে।১ ১৯৯০ সালে কালকিনির লোকজনের শিক্ষার হার ছিল ২৮ ভাগ; সৈয়দ আবুল হোসেনের একক প্রচেষ্টায় যা ২০০১ খ্রিস্টাব্দে ৪৪.৮৯ এবং ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে ৭৪ ভাগে এসে দাঁড়ায়।
কালকিনি পৌরসভার মোট ৬,৫৬০টি পরিবারের লোকসংখ্যা ৩০,৬৬০। তন্মধ্যে পুরুষ ১৫,৫৮০ এবং মহিলা ১৫,০৮০। পৌরবাসীর মধ্যে ৬৮.১৬ ভাগ পরিবার নিজ মালিকানাধীন বাসায় এবং ১৭.৭২ ভাগ লোক ভাড়া বাসায় বসবাস করে। ভাড়াহীন বাসায় থাকেন ১.৯০ ভাগ। গ্রামীণ পরিবারের মধ্যে ৯৬.৮২ ভাগ লোক নিজ মালিকানাধীন বাসায় এবং ০.৭০ ভাগ লোক ভাড়া বাসায় এবং ১.৪৫ ভাগ লোক ভাড়াহীন বাসায় বসবাস করেন। পৌরসভা এলাকায় ৪৯.৫৪ ভাগ লোকের এবং গ্রাম এলাকায় ৭৬.৫৪ ভাগ লোকের নিজস্ব কৃষি জমি আছে।
গ্রামীণ পরিবারের মধ্যে ৯৬.৮২ ভাগ লোক নিজ মালিকানাধীন বাসায়, ০.৭০ ভাগ লোক ভাড়া বাসায় এবং ১.৪৫ ভাগ লোক ভাড়াহীন বাসায় বসবাস করেন। শহর এলাকায় ৪৯.৫৪ ভাগ এবং গ্রাম এলাকায় ৭৬.৫৪ ভাগ লোকের নিজস্ব কৃষি জমি আছে। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে কালকিনি উপজেলার জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল প্রতি বর্গমাইলে ১৯০ জন এবং ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে তার ২১০- এ এসে দাঁড়ায়।২ ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে কালকিনির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ০.৮৭, ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ০.৫২, এবং ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ০.৬৮। তবে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের তা ১.৬৫ এ উন্নীত হয়। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১.৯৯, যা ২০০১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারিতে ১.৫৩ মর্মে দেখা যায়। এ উপজেলায় ০-৪ বছর বয়স্ক শিশু মোট জনসংখ্যা শতকরা ১৩.১ ভাগ। ৫-৯ বছর বয়স্ক জনসংখ্যার শতকরা ১৩.৬; ১০-১৪ বছর বয়স্ক জনসংখ্যা শতকরা ১২.৮। অন্যদিকে ২৫-২৯, ৩০-৩৪, ৩৫-৩৯ এবং ৪০-৪৪ বছর বয়স্ক জনসংখ্যা শতকরা যথাক্রমে ৮.৭, ৭.১, ৬.৫ এবং ৫। এ উপজেলায় সত্তরোর্ধ্ব জনসংখ্যার হার মোট জনসংখ্যা মাত্র শতকরা ২.৭ ভাগ।৩
কালকিনি উপজেলার শহর এলাকার ৮.৫০ ভাগ লোক ট্যাপ-এর পানি, ৭৭.৩৮ ভাগ লোক নলকূপের পানি, ১০.৬০ ভাগ লোক গভীর নলকূপের পানি, ০.৪৫ ভাগ লোক পুকুরের পানি এবং ৩.০৭ ভাগ লোক অন্যান্য উৎস হতে প্রাপ্ত পানি পান করে। গ্রাম এলাকার ০.২০ ভাগ লোক ট্যাপ, ৯১.৩৪ ভাগ লোক নলকূপ, ৪.৩২ ভাগ লোক গভীর নলকূপ, ১.১৭ ভাগ লোক পুকুর এবং ২.৯৭ ভাগ লোক অন্যান্য উৎস হতে প্রাপ্ত পানীয় জল ব্যবহার করেন। কালকিনি উপজেলার শহর এলাকায় ৫৫.৭৪ ভাগ এবং গ্রাম এলাকার ২৮.০০ ভাগ লোক বিদ্যুৎসুবিধা ভোগ করেন।
কালকিনির বাতাসের গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ৭.৯ কিলোমিটার এবং আদ্রতা সর্বনিু ৩৯% এবং সর্বোচ্চ ৮৫%। বৃষ্টিপাতের সর্বনিু ও সর্বোচ্চ পরিমাণ যথাক্রমে ২৭২০ মিলিমিটার ও ৪৭৯৪ মিলিমিটার। তাপমাত্রার পূর্বাপর রেকর্ড বিশ্লেষণে কালকিনির আঞ্চলিক তাপমাত্রা এ পর্যন্ত ৩৮.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেনি দেখা যায়। সর্বনিু তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত রেকর্ড হয়েছে। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আদ্রতা ও বাতাসের স্বাভাবিক গতিবেগ বিবেচনায় কালকিনির আবহাওয়া মানুষের মন ও স্বাস্থ্যের অনুকূলে। তবে ভূগর্ভস্থ পানির লবণাক্ততা মানুষের রঙকে কিছুটা মলিন করে দেয়। ১২.৭ হতে সর্বোচ্চ ৩৩ ফুট গভীরে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর বিন্যাস বিন্যস্ত। গড় স্তর দৈর্ঘ্য ২০ ফুট। তাই গভীর এবং অগভীর উভয় প্রকার নলকূপ এখানে স্বল্পব্যয়ে কার্যকর ও ক্রিয়াশীল।
ব্রিটিশ আমলে সারা উপমহাদেশে কালকিনি বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল। তাদের স্বাধিকার চেতনা ও দেশপ্রেম ব্রিটিশ সরকারকে তটস্থ রাখত। জনসাধারণের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতিক ঐতিহ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দেশপ্রেম ইত্যাদি কালকিনিকে বিখ্যাত করে তুলেছিল। আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রসমূহে কালকিনিবাসী মেধা-শ্রম ও মননশীলতার মাধ্যমে নিজেদের পরিপূর্ণ মাত্রায় বিকশিত করতে সক্ষম হয়েছিল। স্বাধীনতাপূর্ব ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে খ্যাত গোপালপুর ও ডাসার দ্বিতীয় চাঁটগা হিসেবে খ্যাত ছিল। উপমহাদেশের বিখ্যাত বিপ্লবীদের অনেকে আত্মগোপন কিংবা আত্মগোপনরত বিপ্লবীদের নিকট হতে দীক্ষা নেয়ার জন্য কালকিনি এসেছিলেন। মাস্টারদা সূর্যসেন, অধ্যাপক পুলিন দে, বাঘা যতীন, সুভাষ বসু, সরোজিনি নাইডু ও জওহরলাল নেহেরুর মত নেতাগণ এখানে অবস্থান করেছেন বলে প্রবাদ আছে। উৎস হিসেবে কালকিনি উপজেলার অধিকাংশ লোক বিক্রমপুর, ঢাকা, চাঁদপুর, বরিশাল, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা ও দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল হতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে এসে বসতি গড়ে তুলেছে। এলাকাভিত্তিক অবস্থান অভিবাসন প্রক্রিয়া বহুলাংশে নিয়ন্ত্রণ করত। কালকিনি উপজেলায় বরিশাল, ত্রিপুরা ও চাঁদপুর অঞ্চলের লোক বেশি।
উপজেলার বিভিন্ন অংশে বিক্রমপুর, ঢাকা ও ফরিদপুর অঞ্চলের লোকেরা অধিক সংখ্যায় নিবাস গড়ে তুলেছে। পৌরসভার আশেপাশের সবগুলো অঞ্চলের লোকের নিবাস লক্ষ করা গেলেও বিক্রমপুর, ফরিদপুর, বরিশাল ও চাঁদপুরের লোকদের প্রাধান্য অধিক। আন্তঃসাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি কালকিনি উপজেলার অধিবাসীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে কিংবা স্বাধীনতার পূর্বে দেশে কয়েকবার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল। দাঙ্গায় বহু হিন্দু পরিবার দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকা হতে কালকিনি উপজেলাকে নিরাপদ ভেবে আশ্রয় গ্রহণ করে স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলে। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লেও কালকিনিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। অধিবাসীদের সহনশীলতা ও বহুজাতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এখানে সাম্প্রদায়িকতা কোনো সময় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অবকাশ পায়নি। তবে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশ বিভাগের কারণে কিছু বনেদি হিন্দু পরিবার কালকিনি ত্যাগ করে ভারতে চলে যায়।
মানসিক বিকাশ ও চেতনা বিবেচনায় কালকিনি এলাকার অধিবাসীরা সাধারণত প্রতিভাবান ও প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী। দৈনন্দিন জীবন পরিচালনায় প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদা অন্নের সহজলভ্যতার কারণে লোকজন প্রকৃতিগতভাবে শ্রমকাতর। তবে যারা পরিশ্রমী তারা যেমন মেধাবী তেমনি অধ্যবসায়ী। শ্রম, মেধা, আভিজাত্য, জনপ্রিয়তা ও সাফল্য বিবেচনায় সৈয়দ আবুল হোসেন কালকিনিবাসীর গর্ব।
পদ্মা-মেঘনার মোহনা, কীর্তিনাশা ও আড়িয়াল খাঁ-এর কোলঘেঁষে গড়ে ওঠা নদী ‘দুলালী’ কালকিনি যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব কেতন। অবস্থানগত কারণে ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও মাটিধস ইত্যাদি কালকিনির নৈমিত্তিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রতি বছর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা ছোট বড় জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা ভূমিধ্বস কালকিনিকে আঘাত করে। ভূমি-ক্ষয় নদীবেষ্টিত কালকিনির স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মত জনজীবনকে বিষিয়ে রাখে। অনবরত ভাঙনের ফলে আয়তন ও আকার পরিবর্তন কালকিনির অন্যতম ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। চর এলাকার মানুষ ভাঙনকে ভয় পেলেও অস্বাভাবিক মনে করে না।
কালকিনি অঞ্চলের মাটি পলিমিশ্রিত বলে প্রাকৃতিকভাবে উর্বর। অধিকাংশ জমি দুই ফসলি। অতি সহজে প্রচুর পরিমাণ ধান ও অন্যান্য ফসলাদি উৎপন্ন হয়। ভাটি এলাকা বলে অধিকাংশ চাষযোগ্য জমি বছরের ৫ মাস পানির নিচে থাকে। মাটি যে কোনো ফসলের জন্য উপযুক্ত। চতুর্দিকে ছড়িয়ে প্রচুর সবুজ বৃক্ষ। তবে প্রাচীনকালের বয়স্ক কোনো বৃক্ষের অস্তিত্ব চোখে পড়ে না। ঝড় এবং ভাঙন সব শেষ করে দিয়েছে। প্রতিটি বৃক্ষ-লতাই ঘন সবুজ ও পুষ্ট। এখানকার নারিকেল দেশের অন্যান্য এলাকার নারিকেলের তুলনায় আকারে বড় ও সুস্বাদু। বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সহজলভ্যতা প্রাকৃতিক গর্ব। এটি স্রষ্টার অনবদ্য নৈবদ্য হিসেবে কালকিনিকে সমৃদ্ধতর করে রেখেছে।
জনসংখ্যার ৮০ ভাগ কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবী। মূলত কৃষি ও মাছ কালকিনির আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মূল বুনিয়াদ। প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখানে কোনো শিল্পকারখানা নেই। এমনকি কুটিরশিল্পও তেমন একটা চোখে পড়ে না। অথচ অভ্যন্তরীণ প্রায় আড়াই লক্ষ লোকের নিজস্ব প্রয়োজনে মাঝারি আকারের শিল্প কারখানা পর্যাপ্ত লাভজনক বলে গবেষণায় দেখা যায়। নদীভাঙন ও কষ্টকর যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না। কালকিনির বিভিন্ন লোক দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শিল্পকারখানা গড়ে তুললেও নিজ এলাকার দিকে নজর দিচ্ছে না। যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এখানে শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কাঁচা-মাল ও বিদ্যুতের অভাবে শিল্প কারখানা গড়ে তোলা যাচেছ না বলে যোগ্যতাস¤পন্ন ও ইচ্ছুক কয়েকজন শিল্পপতি জানান। অনেক শিল্পপতি বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটানো সম্ভব হলে এখানে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
মাদারীপুরের অধিকাংশ লোক দরিদ্র। তবে ঢাকার ন্যায় চরম দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থান করে এমন লোক নেই বললে চলে। অল্প পরিশ্রমে দৈনিক খরচের আয় উঠে আসে বলে কাউকে উপোস থাকতে হয় না। তাই এরা প্রকৃতিগতভাবে অলস ও সুখপ্রিয়। আর্থিক দীনতার কারণে ৪০% গার্ডিয়ান সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর চেয়ে ক্ষেতে বা জাল নিয়ে নদীতে পাঠিয়ে দিতে উৎসাহী। তবে সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষা প্রসার কালকিনির শিক্ষার হারকে দ্রুত বৃদ্ধি করছে। নারী শিক্ষায় এখনও কালকিনিবাসীর অবস্থান অনেক পিছিয়ে। শিক্ষার নিুহারের কারণে বহুবিবাহ, যৌতুকপ্রথা, অল্পবয়সে বিবাহ ও পারিবারিক বিবাদ সামাজিক জীবনকে অক্টোপাশের মত আঁকড়ে রেখেছে। কুসংস্কার যেন ৮০ভাগ শরীয়তপুরবাসীর সংস্কৃতি। জিন, ভূতপ্রেত ও ঝাড়ফুকের কবলে নিপতিত কালকিনিবাসীর গড় বয়স জাতীয় মাত্রার চেয়ে ৫ বছর কম। অথচ প্রাকৃতিক নির্মলতা ও প্রোটিন প্রাপ্তির সহজলভ্য উৎস বিবেচনায় গড়আয়ু জাতীয় হারের চেয়ে ১২ বছর বেশি হওয়াই ছিল সংগত। ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে গোঁড়ামিও লক্ষণীয়। তবে এ গোঁড়ামি অসাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করলেও নিজেদের আর্থ-সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত ব্যবস্থার প্রতি হুমকিস্বরূপ।
কালকিনির আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডের বুনিয়াদ মূলত কমবেশি ৩০০ পরিবারের আয়ত্ত্বে। কৃষি, মৎস্য ও যানবাহন সেক্টরসহ আর্থ-সামাজিক প্রক্রিয়ার প্রায় সবকিছু মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরিবারে সীমাবদ্ধ। এ তিনশ’ পরিবার কালকিনির মূল নিয়ন্ত্রক ও সামাজিক ব্যবস্থার প্রভাবক। বাকিরা তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ইশারায় তাড়িত হয় বা হতে বাধ্য হয়। অধিকাংশ লোক মুসলিম, হিন্দুও রয়েছে। তবে এলাকায় কোনো ধর্মীয় সহিংসতা বা সাম্প্রদায়িকতা নেই। বিগত ৫০ বছরে এখানে কোনো ধর্মীয় হানাহানি হয়নি। লোকজন ধর্মভীরু। মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনামূলক প্রাধান্য লক্ষণীয়।
প্রাচীনকাল হতে কালকিনির অধিবাসীরা স্বাধীনচেতা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় তারা অনাদিকাল হতে রাজনীতিকভাবে সচেতন ও দেশপ্রেমে উদ্বেল চেতনার অধিকারী ছিল। এ কারণে মোগলদের মতো শক্তিশালী পরাশক্তিও তাঁদেরকে সহজে পরাভূত করতে পারেনি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যে সকল অঞ্চল প্রথম গর্জে উঠেছিল তন্মধ্যে কালকিনি প্রথম সারিতে। এ এলাকার জনগণের রাজনীতিক সচেতনতা ব্রিটিশরাজ পর্যন্ত সমীহ করে চলত। প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা তাদেরকে যেমন সাহসী তেমনি আত্মপ্রত্যয়ী করে তুলেছে। আর্থ-সামাজিক অবস্থার মতো কালকিনির রাজনীতিও কয়েকটি পরিবারে সীমাবদ্ধ। জমিদারি প্রথা না-থাকলেও এখনও তার পুরনো রেশ নতুন মাত্রায় ক্রিয়াশীল। সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা বৃহৎ পরিসরে নেয়া হয়নি। এলাকার রাজনীতিক কর্মকাণ্ডের প্রভাবও স¤পদশালী কয়েকটি পরিবারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। সারাদেশের ন্যায় এখানেও রাজনীতিক বিভক্তি আছে। তবে সুখের কথা যে, রাজনীতিক হানাহানি তেমন মারাত্মক রূপ পরিগ্রহ করে না। মাঝে মাঝে রাজনীতিক হানাহানির ঘটনা ঘটলেও তার মাত্রা নগণ্য। বলা যায় সহনীয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকূল আবহাওয়া কালকিনিবাসীর সাহস ও ধীশক্তির উৎস। দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে কালকিনির বহুলোক সমৃদ্ধ অবস্থানে অবস্থান করছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকায় কালকিনিতে জন্মগ্রহণকারী ১০৮ জন কোটিপতি বসবাস করছে। অধিকাংশ লোক সহজ-সরল ও অতিথিপরায়ণ। প্রত্যন্ত এলাকার অনেক লোক এত সহজ-সরল যে, পিতার নাম পর্যন্ত মনে রাখা প্রয়োজন বোধ করে না। প্রত্যন্ত চর এলাকায় পরিচালিত একটি জরিপে দেখা যায়, ২০ বছর হতে ৬৫ বছর বয়সী ১০০ জন লোকের মধ্যে ১১ জন তাদের জন্মদাতার নাম বলতে পারেনি। স্মরণ করিয়ে দিতে হয়েছে তিন জনকে। এর মধ্যে ২ জন সম্পূর্ণ ভুলে গেছে পিতার নাম। বয়স বলতে পারেনি ৫৬ জন। মহাজন এবং মৎস্য দাদনের যাঁতাকলে দরিদ্র মৎস্যজীবীরা কুরে কুরে মরছে। এখানে বিদ্যার্জন ও আর্থিক সচ্ছলতা আভিজাত্য অর্জনের পূর্ব শর্ত। ‘জন্ম নয়, কর্মই বড়’ নীতি দ্বারা অভিজাত-অনভিজাত নির্ধারিত হয়। সহজে গাড়ি প্রবেশে সক্ষম পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা পায়খানার ব্যবস্থা সমন্বিত সামনে-পেছনে পুকুরওয়ালা বড় রাস্তার পাশে পাকা বা টিনের বাড়ি অভিজাত বাড়ি বলে পরিচিত। অভিজাত বাড়ির মালিক আভিজাত্যের মর্যাদা ভোগ করে থাকেন। তবে জমির অভাবে আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অভিজাত বাড়ি তৈরি করা দুঃসাধ্য। অভিজাত পরিবারের সাথে স¤পর্ক স্থাপন করাও আভিজাত্যের সোপান। অভিজাত-অনভিজাত বৈবাহিক স¤পর্ক এখন আগের মতো কড়াকড়ি না-হলেও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়। এমন অনেক পরিবার আছে যারা বৈবাহিক স¤পর্ক স্থাপনে আভিজাত্য তথা পূর্বপুরুষদের সামাজিক মর্যাদাটাকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আবার অনেকে মনে করেনÑ কর্ম ও বর্তমান অবস্থানই মূল বিষয়।
১৯৫০-এর দশকেও কেউ চরে বাড়ি করলে তাঁকে অনভিজাত ও চউররা বলে আখ্যায়িত করা হতো। বর্তমানে কিন্তু ‘চউররা’ বলে মুখ সিটকানোর বা অনভিজাত ভাবার দিন শেষ। এখন অভিজাতদেরও চরে বাড়ি না-করে উপায় নেই। মলঙ্গী এবং তেলীদেরকে মুসলমানদের মধ্যে নিচুজাত ভাবা হতো। অতীতে সারেং, ঘাটসারেং, সুকানী প্রমুখদের যথেষ্ট মর্যাদা ছিল। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের দিকে অবশ্য সারেং সুকানীদের মর্যাদা কমে যায়। চাকুরির সুলভতা, কতিপয় নাবিকের বিলাসিতা ও অসামাজিক আচরণ এর জন্য দায়ী। এখানে অনেকে জন্মসূত্রে অভিজাত দাবি করেন। জন্মসূত্রে অভিজাত দাবিদারেরা নিজেদেরকে মোগল বংশোদ্ভুত কিংবা মোগল শাসনামলে শাসক কর্তৃক জায়গির প্রাপ্ত সৈনিকদের বংশধর বলে মনে করেন। তবে সবচেয়ে অভিজাত সৈয়দ পরিবার। বিক্রমপুর কিংবা ত্রিপুরা জমিদারের বংশধর অথবা চাঁদরায় কেদার রায় এর রাজত্বে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীনদের উত্তর পুরুষগণও অভিজাত বলে স্বীকৃত। তাছাড়া আরব বংশোদ্ভুত পরিবারগুলোও সবচে অভিজাত হিসেবে চিহ্নিত।
ফরায়েজি আন্দোলন, ওহাবি আন্দোলন, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের স্বাধীনতা আন্দোলন (সিপাহী বিদ্রোহ), সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলন, ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, হিন্দু-মুসলিম ঐক্য প্রয়াস, ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের মুসলিম লিগ গঠন, ১৯৪০-১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তান আন্দোলন, ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতার দাঙ্গা হতে শুরু করে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিটি আন্দোলনে কালকিনিবাসীর অবদান ছিল অনন্য। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনেও কালকিনিবাসী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে যুক্তফ্রন্ট সাধারণ নির্বাচনে কালকিনির জনগণের রাজনীতিক সচেতনতা ছিল বিস্ময়কর। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে অ্যাডভোকেট আদিল উদ্দিন যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে কলকাতায় শপথ গ্রহণের পরপরই প্রেসিডেন্ট মন্ত্রিপরিষদ বিলুপ্ত করায় দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি ছিলেন কালকিনি প্রথম অধিবাসী, যিনি মন্ত্রী হয়েছিলেন। দ্বিতীয় সৈয়দ আবুল হোসেন। ১৯৬২ ও ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচন ও ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ছয় দফা আন্দোলন হতে শুরু করে ১৯৬৮-৬৯ খ্রিস্টাব্দের গণআন্দোলনে কালকিনিবাসীর সচেতন জনগণের দেশপ্রেম অনন্য স্বকীয়তায় বিকশিত হয়েছিল। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের সাধারণ নির্বাচন ও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের স্বাধীনতা যুদ্ধে কালকিনিবাসী সাহসী জনগণের প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল দেশপ্রেম ও স্বাজাত্যবোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১. ২০০১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারি।
২. ঊংঃরসধঃবফ ভৎড়স চড়ঢ়ঁষধঃরড়হ ঈবহংঁং, ২০০১.
৩. চড়ঢ়ঁষধঃরড়হ ঈবহংঁং, ২০০১.

আধুনিক কালকিনির জনক
ডাসার একটি প্রত্যন্ত ইউনিয়ন, তবে এখন থানা। উল্লেখ্য গত ২ মার্চ ২০১৩ মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা ডাসারকে থানায় উন্নীত করেন। এ জেলায় জনবসতির আগমন সম্পর্কে জানা গেছে, সুদূর অতীতে প্রখ্যাত আউলিয়া হযরত শাহ আলী বোগদাদী (র.)-এর জ্যেষ্ঠ সন্তান শাহ ওসমান (র.) বাঘের পিঠে চড়ে ডাসার এলাকায় শুভাগমন করে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিলেন। সময়ের স্রোতে এ গ্রামে বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের জন্ম হতে থাকে, যাঁরা দেশ-বিদেশে মেধা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে খ্যাতিমান হয়েছেন। তবে শিক্ষার দিক হতে এলাকাটি পশ্চাতে পড়ে থাকে। যারা বড় হয়েছেন তারা আর গ্রামে থাকেননি, গ্রামের দিকে তাকাননি। উৎসমূলকে অবহেলায় রেখে শহরে চলে গেছেন জৌলুসময় জীবনে। তবে সৈয়দ আবুল হোসেন বড় হলেও গ্রামকে ভোলেননি। যে গ্রামের আলো-হাওয়ায় তিনি মানুষ, সে গ্রামকে যিনি ভুলে যান, অবহেলা করেন তিনি কখনও মহৎ হতে পারেন না। কালকিনির অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর উন্নয়নের সম্ভাবনাকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পূর্ণ নিজ অর্থায়নে কালকিনিতে একের পর এক নির্মাণ করেছেন রাস্তাঘাট। গড়ে তুলেছেন স্কুল-কলেজ, ক্লাব, কর্মমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। মানুষের বিভিন্ন অভাব-অভিযোগের তাৎক্ষণিক সমাধানার্থে উদার হস্তে ব্যয় করেছেন অর্থ, সময় ও প্রজ্ঞা।
কালকিনির উন্নয়নে সৈয়দ আবুল হোসেনের অবদানের কথা বলতে গিয়ে কালকিনি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ মো. খালেকুজ্জামান সাহেব বলেন, ‘পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, পলারদি বিধৌত ফরায়েজি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হাজি শরিয়তল্লাাহর স্মৃতি বিজড়িত ও উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফি শাহ মাদারের পুণ্যভূমি মাদারীপুর জেলার একটি প্রত্যন্ত উপজেলা-জনপদ কালকিনি। এটি সমুদ্র উপকূলবর্তী উপজেলা। নদীমাতৃক হওয়ায় বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল হতে অপেক্ষকৃত নিচু। ভৌগোলিক কারণেই এলাকাটি ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক অভিশাপে অভিশপ্ত। তাছাড়া রাজনৈতিক কারণেই এলাকাটি দীর্ঘ দিন জাতীয় উন্নয়নের সার্বিক অবস্থা থেকে অনেক অনুন্নত এবং পিছিয়ে। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী বা পরবর্তীকালে সৈয়দ আবুল হোসেনের পূর্বে কালকিনি উপজেলার কোনো অধিবাসী সংসদ সদস্য ছিলেন না। অন্য এলাকার লোক সংসদ সদস্য ছিলেন। ফলে প্রত্যন্ত এ জনপদটির উন্নয়নের লক্ষ্যে আন্তরিকভাবে কাজ করার, এলাকার সমস্যা সম্পর্কে জাতীয় পর্যায়ে কথা বলার মতো কেউ ছিল না। সংগত কারণে কালকিনি দেশের অন্যান্য এলাকা, এমনকি পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের চেয়েও শিক্ষাদীক্ষা, যোগাযোগ, অবকাঠামো এবং আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডে অনেক পিছিয়ে পড়েছিল। কালকিনির এ ক্রান্তিকালে প্রচণ্ড প্রতাপের সাথে আবির্ভূত হলেন চিরভাস্বর একটি নক্ষত্র, যাঁর নাম আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন।১
বিশ বছর আগেও কালকিনি ছিল সাংঘাতিক প্রত্যন্ত একটি পশ্চাদপদ গ্রাম। বিগত শতকের নব্বই-এর দশক হতে সৈয়দ আবুল হোসেনের একক প্রচেষ্টায় কালকিনি আবার সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় চলে আসে। বিশ শতকের নব্বই-এর দশকের আগে কালকিনি কেমন ছিল তা কালকিনির অধিবাসী ছাত্রনেতা জনাব ইকবাল হোসেনের জবানিতে শোনা যাক- ‘হারিকেনই ছিল আমাদের বিদ্যুৎ। কেরোসিন আনতে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হতো। বিদ্যুৎ জ্বলবে এটি ভাবতেও পারতাম না। জলে কুমির ডাঙায় বাঘ- এ ছিল কালকিনি।’ কালকিনি কীভাবে পশ্চাদপদতা ছেড়ে আধুনিকতার আবহে চলে আসে তাও ইকবাল হোসেনের জবানিতে শোনা যেতে পারে-‘এ রকম একটা প্রত্যন্ত এলাকা সৈয়দ আবুল হোসেনের মায়াময় ছোঁয়ার মধুর স্পর্শে আমার চোখের সামনে আধুনিক বিশ্বের যে কোনো মফস্বলের সাথে পাল্লা দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করল। আধুনিক জীবনযাত্রার সকল উপাদানে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল মধ্যযুগের কালকিনি। দশ বছর আগের কালকিনি আর বর্তমানের কালকিনির তুলনা করতে গিয়ে আমি অবিশ্বাসে হতবাক না-হয়ে পারি না। শিক্ষা, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বিনিয়োগ, উৎপাদন, ঐক্য, প্রগতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, চিকিৎসা, বস্ত্র, বাসস্থানÑ এক কথায় বলতে গেলে আদর্শ জীবনযাপনের জন্য যা যা প্রয়োজন, সৈয়দ আবুল হোসেনের বদান্যতায় তার সব কিছু এখন কালকিনি-মাদারীপুরের জনগণের দোরগোড়ায়। কালকিনির লোক এখন ঢাকায় এসে অবাক হন না, বরং ঢাকার লোক কালকিনি গিয়ে অবাক হন।’
আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন দানে হাজি মহসিন, শিক্ষানুরাগে এক অনন্য ব্যক্তিত্ত্ব। আগের দিনে হিন্দু শিক্ষানুরাগীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতেন। বিশেষ করে, হিন্দু জমিদারদের অনেকে নিজ নিজ অধিকারভুক্ত জমিদারিতে একটি-দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতেন। সৈয়দ আবুল হোসেন তার চেয়ে বেশি। তিনি জমিদার নন, তবু নিজের শ্রমে অর্জিত অর্থ ব্যয় করে গড়ে তুলেছেন একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। একটি নয়, দু’টি নয়- অসংখ্য, অগণিত। শিক্ষা বিস্তারে সৈয়দ আবুল হোসেন যে উদারতার পরিচয় দিয়েছেন তা বাংলাদেশে বিরল। অল্প বয়সে তিনি ব্যবসা করে ধনবান হয়েছেন। তিনি শুধু ধনবান নন, মনবান এবং চরিত্রবানও বটে। তাঁর চরিত্র মহামানবের মতো মহীয়ান।
অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে তাঁর আপোসহীন মনোভাব, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, স্বজনপ্রীতিহীন আপাদমস্তক নির্ভেজাল চিন্তা-চেতনা এবং সমাজে এর সঠিক বাস্তবায়ন- কালকিনি এলাকায় প্রশংসনীয় শান্তি বিরাজ করছে। অথচ এই এলাকা একদিন ছিল সন্ত্রাসীদের চারণভূমি, সর্বহারাদের শক্তঘাঁটি। তাঁর এই নিরপেক্ষতার কারণে, পূত-পবিত্র স্বচ্ছ চিন্তাধারার ফলে এলাকার মানুষ দলাদলি, হানাহানি ভুলে এক দলে পরিণত হয়েছে, এক ব্যানারে সমবেত হয়েছে। আর সে ব্যানার হচ্ছে- শান্তির ব্যানার, উন্নতির ব্যানার, প্রগতির ব্যানার, ভ্রাতৃত্বের ব্যানার এবং অহিংসার ব্যানার। সহনশীলতা, নিরপেক্ষতা, উদারতা, দানশীলতা, পরোপকারে নিজেকে সবসময় ব্যস্ত রাখা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, মূল্যবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, নিরহঙ্কার মনোভাব, ধর্মীয় চেতনায় সমৃদ্ধ নির্ভেজাল সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা- এ সমস্ত দুর্লভ ও প্রশংসনীয়।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী। শিক্ষার মাধ্যমে একটি গ্রাম, সমাজ তথা জাতিকে যত দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, অন্য কোনো কিছু দিয়ে তা সম্ভব নয়। সংখ্যায় অল্প হলেও শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখর লক্ষ্যে কিছু শিক্ষানুরাগী মহাপ্রাণ ব্যক্তি নিরলস ও আত্মনিবেদিতভাবে কাজ করেনÑ মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন এমপি তেমনই একজন। তাঁর নির্বাচনী এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং করছেন। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাঙ্গনগুলোতে নিবিড় তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিক প্রেক্ষাপটে এটি অসম্ভব বলে মনে করা হতো। ফলে প্রায় বছরই বোর্ড পরীক্ষায় তঁাঁর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মেধা তালিকার শীর্ষস্থানসমূহের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থান লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। ডি কে আইডিয়াল সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমি এন্ড কলেজ তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত এরূপ একটি কলেজ। এটি তিনি তাঁর পিতার স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করেছেন। ডাসারের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হলেও এটি আজ প্রত্যন্ত নয়, স্বীয় সাফল্যে শিক্ষার নির্বাণ আলো ছড়িয়ে সারা দেশে বিখ্যাত হয়ে আছে।
এক সময় যে কালকিনিতে পায়ে হাঁটা পথেরও অভাব ছিল, সে কালকিনি এখন আধুনিক রাস্তাঘাটে সুসজ্জিত। জনস্বার্থে যেখানে যা প্রয়োজন, তা নিরলস প্রচেষ্টায় করে যাচ্ছেন সৈয়দ আবুল হোসেন-সরকারি সহযোগিতার জন্য বসে না থেকে নিজের অর্জিত অর্থ দিয়ে সংস্কার ও নির্মাণ করছেন রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও কালভার্ট। অধ্যক্ষ মো. খালেক্জ্জুামানের ভাষায়, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন এককভাবে কালকিনির উন্নয়নের জন্য যে অবদান রেখেছেন তা আবুল হোসেনকে বাদ দিয়ে কালকিনির সকল জনগণের পক্ষেও সম্ভব হতো না। এলাকার উন্নয়নে তাঁর ইচ্ছা, প্রয়াস ও গতি যেমন অবিরাম, তেমন নিবিড় ও নিরলস। কালকিনিকে তিনি দিয়েছেন অনেক, দিয়ে যাচ্ছেন অবিরল।’ বস্তুত কালকিনিতে সৈয়দ আবুল হোসেন নামক মানুষটি জন্ম না-নিলে কালকিনি কখনও আধুনিকতার ছোঁয়া পেত না। তিনি এবং কেবল তিনিই আধুনিক কালকিনির বিনির্মাতা।
আজকের কালকিনি আগের সে প্রত্যন্ত কালকিনি নয়। আজকের কালকিনি আবুল হোসেনের কালকিনি, শিক্ষা, যোগাযোগ, উন্নয়ন, অবকাঠামো আর সমৃদ্ধির কালকিনি। সারা দেশের মধ্যে একটি অন্যতম উন্নত ও খ্যাতনামা উপজেলা। আর আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন নিষ্কলুষ গগনের মত চির উন্নত শিরে অনির্বাণ দিনমণি।২

১. অধ্যক্ষ খালেকুজ্জামান, আধুনিক কালকিনির বিনির্মাতা।
২. সৈয়দ আবুল হোসেন : আধুনিক কালকিনির বিনির্মাতা অধ্যক্ষ খালেকুজ্জামান, কালকিনি
বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ।

সৈয়দ আবুল হোসেনের বংশ পরিচয়
সৈয়দ আবুল হোসেন মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার ডাসার গ্রামে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আলহাজ্ব সৈয়দ আতাহার আলী ও মা আলহাজ্ব সুফিয়া খাতুনের তিন কন্যা ও তিন ছেলের মধ্যে সৈয়দ আবুল হোসেন তৃতীয়। আতাহার আলী ও সুফিয়া খাতুনের সন্তান-সন্ততিগণ হচ্ছেন যথাক্রমে সৈয়দা শামসুন নাহার, সৈয়দ আবুল কাশেম, সৈয়দ আবুল হোসেন, সৈয়দা জাহানারা বেগম, সৈয়দা মনোয়ারা বেগম এবং সৈয়দ হাসান। ডাসারকে এখন যতই প্রত্যন্ত এলাকা বলা হোক, চতুর্দশ শতকে পলার্দি-আড়িয়াল খাঁ তীরবর্তী এ জনপদটি ছিল জলপথে একটি উত্তম যোগাযোগ ব্যবস্থাসমৃদ্ধ উন্নত এলাকা। সাবলীল যোগাযোগ ব্যবস্থার সূত্র ধরে ডাসার ‘গঞ্জ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে এখানে নিবাস গড়ে তুলেছিলেন শাহ ওসমান। শাহ ওসমান কে? কী তার পরিচয়? তিনি কোত্থেকে এসেছেন? এ সব জানার আগে শাহ আলী বোগদাদীকে জানা প্রয়োজন। কারণ শাহ ওসমানের পিতা হচ্ছেন শাহ আলী বোগদাদী। যিনি বাংলাদেশে আগত সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রথম বংশধর এবং বর্তমানে মিরপুর মাজারে শায়িত।
সিরাজ উদ্দীন আহমেদ মাদারীপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন, “শাহ আলী বোগদাদী ইরাকের রাজধানী বাগদাদের ফোরাত নদীর তীরে কসবায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শাহ ফখরুদ্দিন রাযী। শাহ আলী বোগদাদীর বংশধর অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান একটি বংশ তালিকা দিয়েছেন এবং শাহ আলী বোগদাদীর জন্ম তারিখ নির্ণয় করেছেন।১ শাহ আলী বোগদাদী ১৩৯৩ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। ১৪১৯ খ্রিস্টাব্দে জনৈকা ধর্মানুরাগী রমণীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। ১৪২১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এক কন্যা সন্তানের পিতা হন। ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে বাগদাদের বিখ্যাত সৈয়দ বংশের সদস্য সৈয়দ হাবিবুল্লাহর সাথে কন্যার বিয়ে দেন। ইতোমধ্যে শাহ আলী বোগদাদীর প্রথম স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দেয়। তিনি সংসার কর্মে অনেকটা উদাসীন হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় পিতা তাকে দিল্লি গিয়ে ধর্মপ্রচারে মনোনিবেশের পরামর্শ দেন। মানসিক উত্তরণে পিতার পরামর্শ অত্যন্ত কার্যকর মনে করে শাহ আলী বোগদাদী ইরাক ত্যাগ করে দিল্লি যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।”২
পিতার অনুমতি নিয়ে শাহ আলী বোগদাদী ১৪৪৩ খ্রিস্টাব্দে চল্লিশজন সঙ্গী সমভিব্যাহারে দিল্লি আগমন করেন। চল্লিশ জন সহচরের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শাহ ওসমান। দলে হযরত শাহ আলী বোগদাদীর পর শাহ ওসমানের স্থান ছিল। উভয়ে ছিলেন পরস্পর আত্মীয় এবং একই বংশের। দিল্লির সুলতান সৈয়দ আলাউদ্দিন আলম শাহ (১৪৪৫-১৪৫১ খ্রি.) তাদের সাদরে গ্রহণ করেন। শাহ আলী বোগদাদীর চারিত্রিক মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ স্বীয় কন্যা আয়েশাকে তার হাতে সমর্পণ করার প্রস্তাব দেন। ১৪৪৪ খ্রিস্টাব্দে সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ-এর কন্যা আয়েশার সাথে হযরত শাহ আলী বোগদাদীর শুভ বিবাহ সুসম্পন্ন হয়। ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে শাহ আলী বোগদাদীর ঔরসে এবং সুলতান তনয়া আয়েশার গর্ভে এক পুত্র সন্তান জন্মলাভ করেন। তার নাম রাখা হয় সৈয়দ শাহ ওসমান। সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহের কন্যা আয়েশার গর্ভে ও শাহ আলী বোগদাদীর ঔরসে জন্মগ্রহণকারী এ শাহ ওসমানই হচ্ছেন ডাসারের শাহ ওসমান, যিনি আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের অন্যতম পূর্বপুরুষ।
সন্তান জন্মদানের পর সুলতান তনয়া আয়েশা অসুস্থ হয়ে পড়লে শাহ আলী বোগদাদী ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দে দিল্লির বিখ্যাত ব্যবসায়ী গুল মুহাম্মদ সওদাগরের কন্যা বুজুর্গ বিবিকে বিয়ে করেন। এ বিয়েতে সুলতানের মত ছিল কিনা সে বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে আয়েশা এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করেননি। অবশ্য তখন পুুরুষের একাধিক বিয়েতে আপত্তি বা উচ্চবাচ্য করার কোনো রেওয়াজ ছিল না। পুরুষের বিয়েকে বিনা বাক্যে মেনে নেয়াই ছিল পুণ্য রমণীগণের অনিবার্য দায়িত্ব।
১৪৫১ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব হতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও লোদী বংশের সিংহাসন দখল করার প্রচেষ্টা রাজ্যে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল। এ অবস্থায় সুলতান পরাজয় শঙ্কায় আত্মীয় পরিজনদের দিল্লি ত্যাগের পরামর্শ দেন। সুলতানের নির্দেশে ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দে শাহ আলী বোগদাদী তার দুই স্ত্রী, পুত্র সৈয়দ শাহ ওসমান, ভাগিনা সৈয়দ হাবিব এবং বাগদাদ হতে আগত চল্লিশ সহচরের অন্যতম শাহ ওসমানসহ আরও কয়েকজন অনুচর নিয়ে নৌপথে ফরিদপুর চলে আসেন। পাঠক একটু খেয়াল করলে বুঝবেন, এ দলে ওসমান নামের দুইজন ছিলেন। একজন শাহ আলী বোগদাদীর ছয় বছর বয়সী শিশুপুত্র এবং অন্যজন তার প্রধান সহচর। তারা ফরিদপুর এসে গেরদায় বসতি স্থাপন করেন। দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ জামাতা শাহ আলী বোগদাদীকে ১২০০০ বিঘা লাখেরাজ ভূমি দান করেছিলেন।৩ ফলে তাদের সচ্ছল জীবন যাপনের পথে কোনো বাধা থাকল না।
গেরদায় বসতি স্থাপনের অল্প কিছুদিন পর লোদী বংশ সিংহাসন দখল করে নিলে সুলতান বাদায়ুনে আশ্রয় নেন। গেরদায় আসার পর ১৪৫২ খ্রিস্টাব্দে শাহ আলী বোগদাদীর ঔরসে এবং গুল মুহাম্মদ সওদাগরের কন্যা বুজুর্গ বিবির গর্ভে এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম রাখা হয় সৈয়দ মোহাম্মদ হানিফ। আয়েশার গর্ভে জন্মগ্রহণকারী শাহ ওসমান শাহ আলী বোগদাদীর দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণকারী সৈয়দ মোহাম্মদ হানিফ হতে সাত বছর বড়। উল্লেখ্য, দিল্লি হতে ফরিদপুর আসার পথে অসুস্থ আয়েশা বেগম মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ছয় বছর বয়স্ক শিশু শাহ ওসমান মাতৃহীন হয়ে বিমাতার হাতে পড়ে।
বৈমাত্রেয় ভাই হানিফ সৈয়দ শাহ ওসমানকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারছিলেন না। হানিফের বয়স বাড়ার সাথে সাথে বড় ভাইয়ের প্রতি রুঢ় আচরণ ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিল। শাহ ওসমান ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র, বিনয়ী, নির্লোভ ও ধৈর্যশীল। বিমাতা আর সৎ ভাইয়ের অত্যাচার দিন দিন বাড়লেও তিনি তা নীরবে সহ্য করে পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।
তৎকালে ঢোল সমুদ্র পদ্মা নদীর সাথে সংযুক্ত ছিল। কথিত আছে, একজন ব্রাহ্মণ কন্যা ঢোল সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছে দেখতে পেয়ে শাহ আলী বোগদাদী তাকে উদ্ধার করেন। কিন্তু মুসলমান দ্বারা স্পর্শিত হওয়ায় হিন্দু সমাজ ব্রাহ্মণ কন্যাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। এ অবস্থায় শাহ আলী বোগদাদী অসহায় মেয়েটিকে বিয়ে করে নিজের ঘরে নিয়ে যান। কারও কারও অভিমত, হরিশচন্দ্র শাহ আলী বোগদাদীর গুণে মুগ্ধ হয়ে স্বীয় কন্যাকে তার সাথে বিয়ে দেন এবং তিনি নিজেও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।৪
মজলিশ আবদুল খানের কন্যার সাথে সৈয়দ শাহ ওসমানের বিয়ে হয়। বুজুর্গ বিবির পুত্র তথা বৈমাত্রেয় ভাই হানিফ ও তার পুত্রদের সাথে সুলতানের কন্যা আয়েশা বিবির পুত্র সৈয়দ শাহ ওসমানের বিরোধ ক্রমশ বাড়তে থাকে। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও পিতা শাহ আলী বোগদাদী বিরোধ মেটাতে ব্যর্থ হন। সৈয়দ শাহ ওসমান ছিলেন ইসলামি জ্ঞানে ঋদ্ধ আধ্যাত্মিক প্রকৃতির একজন নিরীহ মানুষ। বিমাতার জন্য তিনি ঘরে শান্তি পেতেন না। তাই অধ্যয়নের মাধ্যমে অশান্তি ভুলে থাকার চেষ্টা করতেন। এ জন্য ছোট বয়সেই তিনি ইসলামি জ্ঞানে পারঙ্গমতা অর্জন করেন। বিষয় সম্পত্তির প্রতি তার কোনো আকর্ষণ ছিল না। তবু সৎ ভাইগণ তাকে শত্রু ভাবতেন। ভ্রাতৃবিরোধ শাহ ওসমানকে অতিষ্ঠ ও বিষণ্ন করে তোলে। পিতা সৈয়দ শাহ আলী বোগদাদীও পুত্রদের বিরোধ মেটাতে না-পেরে মনোকষ্টে ভুগছিলেন। এ অবস্থায় শাহ আলী বোগদাদী প্রিয় সহচর শাহ ওসমানের ওপর গেরদার দায়িত্ব অর্পণ করে মিরপুর চলে যান। সাথে নিয়ে যান তার প্রিয় জ্যেষ্ঠ সন্তান শাহ ওসমানকে। মিরপুর এসে তিনি ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।
শাহ আলী বোগদাদী গেরদা ত্যাগ করার কয়েক বছর পর ত্বদীয় সহচর শাহ ওসমান মৃত্যুবরণ করেন। গেরদায় তাকে সমাহিত করা হয়। পাঠক, এখানে আর একবার একটু দৃষ্টি দেয়ার অনুরোধ করছি। গেরদায় যে ওসমান শায়িত, তিনি শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র নন, সহচর। ডাসারে যে ওসমান শায়িত, তিনি শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র। যার মায়ের নাম আয়েশা বিবি। দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ ডাসারে শায়িত শাহ ওসমানের মাতামহ।
শাহ আলী বোগদাদী সংসার ধর্ম হতে অনেক দূরে চলে যান। তিনি মিরপুর চিল্লায় সারাক্ষণ ধ্যানমগ্ন থাকতেন। কথিত হয়, চিল্লায় অবস্থায় একদিন শাহ আলী বোগদাদীর কক্ষ হতে সংঘর্ষের আওয়াজ ও আর্তচিৎকার শুনে কিছু ভক্ত দৌড়ে যান। দরজা খুলে দেখেন, শাহ আলী বোগদাদীর শরীর ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পড়ে আছে। দেখে মনে হয় জঙ্গল হতে বাঘ এসে তাকে হত্যা করেছে। অনেকে মনে করেন, আল্লাহর ধ্যানে তার দেহ খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেছে। যাই হোক তার মৃত্যু রহস্যাবৃত থেকে যায়। এ বিষয়ে আরও বিভিন্ন মত রয়েছে। এর একটি এখানে উল্লেখ করা হলো: কথিত আছে, প্রায় চারশো বছর আগে শাহ আলী নামে বাগদাদের এক রাজপুত্র সংসারের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে চারজন শিষ্যসহ নানাদেশে ঘুরে ঘুরে ঢাকা মিরপুরের ছোট্ট একটি মসজিদে আশ্রয় নেন। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মসজিদের দ্বার রুদ্ধ করে ধ্যানমগ্ন থাকেন। নির্দিষ্ট সময় পূর্ণ হওয়ার একদিন আগে শিষ্যরা অস্পষ্ট শব্দ শুনে মসজিদের দ্বার খুলে দেখেন শাহ আলী সেখানে নেই। একটি পাত্রে রক্তমাংস পড়ে আছে। শিষ্যরা শাহ আলীর কণ্ঠে নির্দেশ পেল-পাত্রের রক্তমাংস সমাধিস্থ করার। হযরত শাহ আলীর সে সমাধিস্থলই মিরপুরের শাহ আলীর দরগা নামে পরিচিত।৫
বুজুর্গ বিবির পুত্র সৈয়দ মোহাম্মদ হানিফ, সৈয়দ হানিফের পুত্র সৈয়দ শাহনুর, ত্বদীয় পুত্র সৈয়দ শাহ ভিখ। সৈয়দ শাহ ভিখের পুত্র শাহ রাখি। সৈয়দ হানিফের উত্তর পুরুষগণের কয়েকজন ফরিদপুরের গেরদায় বসবাস করতে থাকেন। কয়েক জন যশোর চলে যান। গেরদা মসজিদের সংলগ্ন উত্তরে সৈয়দ হানিফ ও বুজুর্গু বিবির মাজার আছে। সৈয়দ শাহ আলী বোগদাদীর মৃত্যুর পর সৈয়দ শাহ ওসমান মিরপুর হতে গেরদা ফিরে আসেন। বৈমাত্রেয় ভাইয়ের সাথে কোন্দল আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় সৈয়দ শাহ ওসমান গেরদা ত্যাগ করে স্ত্রীপুত্রদের নিয়ে কালকিনির ডাসার গ্রামে নিবাস গড়ে তোলেন। এখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন। ডাসারে তাঁর মাজার রয়েছে।
উপরে বর্ণিত আলোচনায় দেখা যায়, সৈয়দ আবুল হোসেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ এবং শাহ আলী বোগদাদীর রক্তাধিকারী। শাহ আলী বোগদাদীর পূর্বপুরুষের পরিচয় ও বংশলতিকা পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য। আগ্রহী পাঠকগণ তা অবলোকন করতে পারেন। বংশলতিকায় দেখা যায়, হযরত শাহ আলী বোগদাদী হযরত মোহাম্মদ (সঃ)-এর চাচা হযরত আবু তালিবের পুত্র হযরত আলীর অধস্তন। হযরত আলীর স্ত্রী ছিলেন নবী তনয়া ফাতিমা। কথিত হয় শাহ ওসমান বাঘের পিঠে চড়ে ডাসার গ্রামে এসেছিলেন। সৈয়দ ওসমান সম্পর্কে বাংলাদেশ গেজেটীয়ারে লেখা আছে- অ ংধরহঃ ভৎড়স অৎধনরধ, ঝুবফ টংসধহ পধসব ঃড় ঃযরং ারষষধমব ধহফ ংবঃঃষবফ যবৎব. ওঃ রং ংধরফ যব ঁংবফ ঃড় ৎরফব ড়হ ঃরমবৎ. ঐরং মৎধাব রং ষড়পধঃবফ ধঃ উধংধৎ.৬
শাহ আলী বোগদাদীর বংশধর সৈয়দ আলী আহসানের বংশ লতিকায় দেখা যায়, শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র সৈয়দ শাহ ওসমান দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক হন। প্রথম পুত্র সৈয়দ আবদুল ওয়াহিদ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। দ্বিতীয় পুত্র সৈয়দ আবদুল কাদিরের একমাত্র পুত্র সৈয়দ আবদুর রশীদ। আবদুর রশীদের পুত্র সৈয়দ শাহ মোহাম্মদ যাকের একজন কামেল দরবেশ ছিলেন। মোহাম্মদ যাকের বিবাহিত জীবনে চার সন্তানের জনক হন। তার সন্তানগণ হচ্ছেন যথাক্রমে সৈয়দ মুহাম্মদ সাবের, সৈয়দ মুহাম্মদ হুসাইন, সৈয়দ মুহাম্মদ সাকের এবং সৈয়দ মুহাম্মদ হাফিজ।৭
যুবক হবার পর পৈত্রিক উত্তরাধিকারজাত সম্পত্তি দেখাশুনার জন্য সৈয়দ মুহাম্মদ সাবের, সৈয়দ মুহাম্মদ হুসাইন ও সৈয়দ মুহাম্মদ হাফিজ বাংলাদেশে তাদের প্রথম পিতৃনিবাস গেরদা চলে যান। তারা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। অন্যদিকে সৈয়দ মুহাম্মদ সাকের পিতা সৈয়দ শাহ ওসমানের সাথে ডাসার থেকে যান। গেরদার সৈয়দ বশারত আলী শাহ মোহাম্মদ যাকেরের অন্যতম এক অধস্তন। তার পুত্র শাহ ওয়াজেদ আলী কলকাতায় স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলেন। তিনি কামেল দরবেশ হিসেবে সারা কলকতায় খ্যাত ছিলেন। পাবনার শাহ সুফি এনায়েতপুরী তার শিষ্য ছিলেন। তিনি তার নিকট হতে দীক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। তার বংশধরগণ এখন এনায়েতপুরী নামে পরিচিত। সৈয়দ আবুল হোসেনের স্ত্রী খাজা নার্গিস এনায়েতপুর দরবার শরিফের পির খাজা কামাল উদ্দিনের কন্যা।
শাহ আলীর সাথে দিল্লী হতে গেরদায় আগত ভাগ্নে শাহ হাবিব মামার মৃত্যুর পর ফরিদপুরের বোল মন্দিরায় বসতি স্থাপন করেন। এ বংশের অন্যতম অধস্তন পুরুষ সরোয়ারজান বরিশালের বামনার জমিদার ছিলেন। হযরত শাহ আলী বোগদাদীর সাথে শাহ হুসাইন তেগ বরহানা ও ত্বদীয় পুত্র শাহ হাবিবুল্লাও দিল্লী হতে ফরিদপুর এসেছিলেন। শাহ হাবিবুল্লা কামেল ছিলেন। তার সাথে ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে শাহ আলী বোগদাদীর কন্যার বিয়ে হয়। বর্তমানে তার বংশধরগণ বনমালীতে বসবাস করছেন। শাহ আলী বোগদাদীর অধস্তন সৈয়দ শাহ সাবের-এর বংশধরদের একটি প্রশাখা গেরদার নিকটবর্তী গটটি এলাকায় বসতি গড়ে তোলেন। আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এ বংশের একজন বংশধর।
শাহ আলী বোগদাদীর মৃত্যুর ঘটনার ন্যায় মৃত্যু তারিখ নিয়েও মতভেদ ও রহস্য রয়েছে। ড. মোহাম্মদ এনামুল হকের মতে, শাহ আলী বোগদাদী পনেরো শতকে জীবিত ছিলেন এবং ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন। তবে মিস্টার বি.সি এলেন, ড. আহম্মদ হাসান দানি ও ড. মাহমুদুল হাসান মনে করেন শাহ আলী বোগদাদী ১৪৭৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। গেরদায় বসবাসকারী শাহ আলী বোগদাদীর কুরছিনামা অনুযায়ী ১৪৫১ খ্রিস্টাব্দে মতান্তরে ১৪৩৪ খ্রিস্টাব্দে ফরিদপুর আসেন এবং ১৫১৭ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। পারিবারিক বৃত্তান্ত অনুযায়ী শাহ আলী বোগদাদী ১২৪ বছর জীবিত ছিলেন। এত লম্বা সময় বেঁচে থাকার বর্ণনা স্বাভাবিক দৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য। এ অবস্থায় ড. মোহাম্মদ এনামুল হকের মন্তব্য যথার্থ মনে হয়। অর্থাৎ শাহ আলী বোগদাদী ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছেন। সার্বিক বিবেচনায় ইতিহাসবেত্তাগণ এ মর্মে সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, তিনি সম্ভবত ১৪৭৭ খ্রিস্টাব্দে বাঘের আক্রমণে মারা গিয়েছেন।৮
কুরছিনামা অনুসারে দেখা যায়, শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র সৈয়দ শাহ ওসমান ভাঙ্গার মজলিশ আবদুল্লাহ খানের কন্যাকে বিয়ে করেছেন। মজলিশ আবদল্লাহ খানও বাগদাদ হতে এসে এখানে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। তার সাথে শাহ ইসমাইল ও শাহ ইউসুফও বাগদাদ হতে এদেশে এসেছিলেন। সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহ (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ) মজলিশে আউলিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন। এ হিসেবেও দেখা যায়, শাহ আলী বোগদাদী ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে মৃত্যুবরণ করেন।
ঐতিহাসিক বিবরণ ও গবেষণা কর্মে সাধারণত ৪ পুরুষে একশ বছর গণনা করা হয়। সৈয়দ শাহ আলী বোগদাদী হতে বর্তমান কাল পর্যন্ত চৌদ্দ পুরুষ চলছে। এ হিসেবে শাহ আলী বোগদাদী ১৭ শতকের প্রথমভাগে জীবিত ছিলেন বলে অনুমান করা হয়। সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে(১৬০৫-১৬২৭) বঙ্গদেশে প্রচুর মুসলিম ধর্মপ্রচারক ও আউলিয়া দরবেশের আগমন ঘটে। গেরদা মসজিদের শিলালিপিতে ১৬০৪ খ্রিস্টাব্দ খোদিত। এ হিসেবে মনে করা যায়, শাহ আলী বোগদাদী সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে ১৬ শতকে গেরদা আসেন এবং ১৭ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
মাদারীপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে সিরাজ উদ্দীন আহমেদ লিখেছেন-‘ অনেকে বলেন, সৈয়দ ওসমান বড়পির আবদুল কাদের জিলানি ও হযরত শাহ আলী বোগদাদীর বংশধর। তারা বলেন সৈয়দ ওসমান হযরত শাহ আলীর পুত্র। সৈয়দ শাহ আলীর দুই পুত্র শাহ ওসমান ও হানিফ। দুই ভাইয়ের মাজার ফরিদপুর সদর থানার গেরদায় অবস্থিত। লেখক গেরদায় গমন করে দুই ভাইয়ের মাজার দেখেছেন। ডাসারের সৈয়দ ওসমান ও গেরদার শাহ ওসমান এক ব্যক্তি নয়। শাহ আলী বোগদাদীর বংশতালিকায় সৈয়দ ওসমানের উল্লেখ নেই। এক হতে পারে সৈয়দ ওসমান শাহ আলী বোগদাদীর বংশধর। অথবা তার সাথে তিনি এ অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আসেন।
লেখক এখানে শাহ ওসমানের পিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। অধিকন্তু জনাব সিরাজ উদ্দীন আহমেদ দুই ভাইয়ের মাজার দেখেছেন না-বলে সৈয়দ ওসমান ও সৈয়দ হানিফের মাজার দেখেছেন বললে যথার্থ হতো। কারণ তিনি পরে লিখেছেন, “সৈয়দ ওসমান শাহ আলীর বংশধর হতেও পারে আবার নাও হতে পারে।”শাহ আলী বোগদাদীর বংশ তালিকায় সৈয়দ শাহ ওসমানের নাম নেই উল্লেখ করা হলেও একই গ্রন্থের ১২৫ পৃষ্ঠায় প্রদত্ত শাহ আলী বোগদাদীর বংশ তালিকায় শাহ ওসমানের নাম রয়েছে।
বস্তুত ডাসার এর সৈয়দ শাহ ওসমানই শাহ আলী বোগদাদীর পুত্র এবং গেরদায় শায়িত শাহ ওসমান শাহ আলীর সঙ্গী ছিলেন। উপরোক্ত আলোচনায় আমরা এ সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন শাহ আলী বোগদাদীর একজন উত্তরপুরুষ।
. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, পঞ্চম অধ্যায় পৃষ্ঠা ১১৯।
২. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, পঞ্চম অধ্যায় পৃষ্ঠা ১২০।
৩. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ।
৪. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, পঞ্চম অধ্যায় পৃষ্ঠা ১১৯।
৫. ৬৪ জেলা ভ্রমণ, লেয়াকত হোসেন খোকন, অনিন্দ্য প্রকাশ, দ্বিতীয় বর্ধিত সংস্করণ,
ফেব্রুয়ারি, ২০০৯; পৃষ্ঠা-৩০।
৬. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, লেখকের কথা।
৭. মাদারীপুরের ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ।
৮. সৈয়দ সুলতানা বানু- পঁচাশি ও হযরত শাহ আলী বোগদাদীর জীবনী।

সৈয়দ আবুল হোসেনের বংশলতিকা ১
১. মাদারীপুর জেলার ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, পির-আউলিয়ার দেশ ফরিদপুর-
মাদারীপুর, পৃষ্ঠা ১২৫-১২৬, প্রকাশকাল-২০০৬।

সৈয়দ আতাহার আলী ও সৈয়দা সুফিয়া খাতুন
সৈয়দ আলহাজ্ব আতাহার আলী (র) ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ১১ এপ্রিল মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলার ডাসার গ্রামে বিখ্যাত সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হযরত সৈয়দ আজমত আলী এবং মা সৈয়দা লালমন। বংশগতভাবে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও মর্যাদাময় রক্তাধিকারী সৈয়দ আতাহার আলী ইসলামি জ্ঞানে অত্যন্ত ঋদ্ধ ছিলেন। তিনি আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের পিতা।
দেশ বিভাগের পূর্বে সৈয়দ আতাহার আলী বর্ধমান জেলায় সেটেলমেন্ট বিভাগে চাকুরি করতেন। সেটেলমেন্ট বিভাগের চাকুরি ছিল অত্যন্ত লোভনীয়। এ বিভাগের চাকুরেদের প্রচুর অর্থ উপার্জনের সুযোগ ছিল। তবে তা অবৈধ পন্থায়। সৈয়দ আতাহার আলী ছিলেন অন্যরকম। তিনি কোনোদিন এক পয়সাও অবৈধভাবে অর্জন করেননি। ঘুষ গ্রহণকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখতেন। সেটেলমেন্ট বিভাগে চাকুরি করলেও সৈয়দ আতাহার আলী ছিলেন অত্যন্ত সৎ এবং বিনয়ী। এ গুণগুলো পরিবাহিত হয়েছে তাঁর সুযোগ্য পুত্র-কন্যা ও নাতি-নাতনিদের ওপর। দেশ বিভাগের পর চাকুরি ছেড়ে দিয়ে তিনি পাটের ব্যবসা করেন। তখন পাটের ব্যবসা ছিল যেমন সম্মানার্হ তেমনি লাভজনক। সৈয়দ আতাহার আলী পাটের ব্যবসা করে কিছু অর্থ জমা করেন। ঐ অর্থ দিয়ে গ্রামে কিছু জমিজমা ক্রয় করেন। অতঃপর পাট ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে কৃষি খামারে মনোনিবেশ করেন।১
উপমহাদেশে মুসলিম যুগের সূচনা ও বিস্তারে কালকিনির সৈয়দ পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম। সৈয়দ আতাহার আলীর পূর্বপুরুষগণ আরব হতে বঙ্গদেশে ধর্মপ্রচারের জন্য এদেশে এসেছিলেন। মুসলিমগণ উপমহাদেশে শাসন ক্ষমতায় বরিত হবার সূচনালগ্ন হতে ডাসারের সৈয়দ পরিবারের পূর্বপুরুষেরা সম্রাট ও সুলতানগণের দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার ১১তম পূর্বপুরুষ শাহ আলী বোগদাদী ছিলেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন আলম শাহের (১৪৪৫-১৪৫১) দরবারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা এবং সুলতানের কন্যা আয়েশা বিবির স্বামী।২
সৈয়দ আতাহার আলীর পিতার নাম সৈয়দ আজমত আলী। তার পিতার নাম সৈয়দ কালু মিয়া মতান্তরে কান্দু মিয়া। সৈয়দ কালু মিয়ার ছেলে সৈয়দ হউদ বদু। তিনি এলাকায় সমাজসেবী ও সংস্কারক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। সৈয়দ হউদ বদুর পিতার নাম ছিল সৈয়দ মুহাম্মদ গনি এবং তার পিতার নাম মুহাম্মদ সাকের। মুহাম্মদ সাকের ছিলেন সৈয়দ শাহ মোহাম্মদ যাকেরের চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। সৈয়দ শাহ মোহাম্মদ যাকের-এর পিতার নাম আবদুর রশীদ এবং পিতামহের নাম আবদুল কাদির। আবদুল কাদির সৈয়দ শাহ ওসমানের দ্বিতীয় পুত্র এবং সৈয়দ শাহ ওসমানের পিতা হযরত শাহ আলী বোগদাদী। তিনি হযরত আলীর ছেলে হযরত ইমাম হুসাইনের অধস্তন।৩
সৈয়দ আতাহার আলী ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও দানবীর। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী ও বিশ্বনবীর প্রিয়তমা কন্যা হযরত ফাতেমার পবিত্র রক্তের প্রবাহ যার শরীরে তিনি অমন না-হয়ে পারেন না। নবিজির মতো হযরত আতাহার আলীও ভিক্ষুকদের নিয়ে খেতেন। মাঝে মাঝে ভিক্ষুকের সংখ্যা এতো বেড়ে যেত যে নিজের ক্ষিদে মেটাতে পারতেন না। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বলা যায়। রমজান মাস। বাড়ির সদস্যসংখ্যা হিসেব করে ইফতারি তৈরি করা হলো। সৈয়দ আতাহার আলী ইফতার করে মাগরিবের নামাজ আদায় করতেন। একদিন বাইরে হাঁটতে গিয়ে মসজিদ হতে নামাজ আদায় করে বাসায় আসেন, সাথে পাঁচজন ভিক্ষুক। স্ত্রী সুফিয়া খাতুন শুধু একজনের ইফতারি রেখেছিলেন। পাঁচজন অতিরিক্ত লোক দেখে সুফিয়া আলী বললেন, ‘ইফতারি আছে এক জনের, ছয়জন কীভাবে খাবেন?’ আল্লাহ বরকত দেবেন বলে ইফতার শুরু করেন সৈয়দ আতাহার আলী। আশ্চর্যের বিষয়, সবাই ঐ দিন তৃপ্তি সহকারে ইফতার করেছিলেন। কারও কম হয়নি।
ভিক্ষুকদের প্রতি এত দয়া কেন প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন, ‘আল্লাহপাক পরীক্ষা করার জন্য আমার কাছে ভিক্ষুক পাঠান। আল্লাহ আমাকে অনেক দিয়েছেন। স্ত্রী-পুত্র, সহায়-সম্বল, জমি-জিরাত সব অল্লাহর অনুগ্রহের দান। তা যদি হয় তো আমি কেন সামান্য বস্তু আল্লাহর জন্য ব্যয় করতে পারব না! সামান্য অসুখ হলে যেখানে আমরা কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করি না; সেখানে ভিক্ষুককে এক পয়সা না-দেয়ার জন্য বলি, ‘মাফ করেন’। এটি বড় লজ্জার, বড় আফশোসের।’ প্রতিবেশীরা সৈয়দ আতাহার আলীকে উদারতা বিবেচনায় হাতেম তাই-এর সাথে তুলনা করতেন। গ্রামের কেউ বিপদে পড়লে তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ এবং শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সাহায্যের হাত নিয়ে এগিয়ে যেতেন। তিনি বলতেন, ‘মানুষ মাত্র সমান। কে ভালো কে খারাপ, কে বেহেশতি এবং কে জাহান্নামিÑ এটি আল্লাহ বিচার করবেন। আমি তার নগণ্য বান্দা মাত্র।’ গরিব ও অসহায় পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য তিনি সাহায্য করতেন। গ্রামের দুস্থদের সৎকার, ছেলে-মেয়ের বিয়ে ও রোগশোকে তিনি ছিলেন সবার অভিভাবক। সেকালে ডাসার ছিল সর্বহারাদের নিরাপদ স্থল। তবে ডাসার গ্রামে সর্বহারা দল তেমন বেশি অত্যাচার করতে পারত না। সৈয়দ আতাহার আলীকে তারাও শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। তিনি বলতেন, ‘একদিন এ গ্রাম সর্বহারা মুক্ত হবে।’ তার দোয়া সফল হয়েছে। তারই সুযোগ্য পুত্র সৈয়দ আবুল হোসেন কালকিনি হতে সর্বহারাদের অস্তিত্ব নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে। তবে অস্ত্র দিয়ে নয়, পিতা আলহাজ্ব সৈয়দ আতাহার আলীর মতো ভালোবাসা দিয়ে।
সৈয়দ আতাহার আলী ছিলেন মহান ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। মানুষ তাকে বুজুর্গ জ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন। তবে তিনি নিজেকে মনে করতেন, একজন সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন অনেক লোক তার দোয়া নেয়ার জন্য আসতেন। অনেকে আসতেন পানি-পড়া নিতে। তিনি বলতেন: আমি আপনাদের মতো সাধারণ মানুষ। পবিত্র মনে সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনা করুন। সফলকাম হতে পারবেন। আল্লাহর রহমত পেতে হলে তার সৃষ্টির প্রতি রহমত-পরায়ণ হতে হয়।
সৈয়দ আতাহার আলী ছিলেন ইসলামি দর্শনের একজন বোদ্ধা। তিনি বলতেন, আমি আসছি খালি হাতে যাবও খালি হাতে। দুনিয়া আমার শস্যক্ষেত্র। এখানে যা ফলাব আখিরাতে তাই আমার সম্বল হবে। বাকিটুক শূন্য। তিনি তার অর্জিত ভূসম্পত্তির প্রায় সবই এলাকার শিক্ষা বিস্তারের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছেন। আতাহার আলী ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, আতাহার আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়, ডি কে সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমি এন্ড কলেজ এবং শেখ হাসিনা একাডেমি এন্ড ইউমেন্স কলেজে তার পুরো সম্পত্তি দান করে দেয়া হয়েছে।
সৈয়দ আতাহার আলীর স্ত্রীর নাম সুফিয়া আলী। তিনি ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে বরিশাল জেলার বর্তমান আগৈলঝারা উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের সেরেল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পর্দানশীন ও ধর্মপ্রাণ মহিলা। তাঁর দুই ভাই যথাক্রমে আরজ আলী মল্লিক ও রাজ্জাক মল্লিক। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর বেশি ছিল না। তবে প্রাকৃতিক শিক্ষায় তিনি ছিলেন যেমন ঋদ্ধ তেমনি উদার। সাধারণ মানুষ যা কল্পনা করতে পারতেন না, তা তিনি সহজে বাস্তবে পরিণত করতে পারতেন। সবকিছু ধীর মস্তিষ্কে পরিকল্পনা মাফিক করতে পারঙ্গম ছিলেন। তিনি ছিলেন পর্দানশীন এবং অত্যন্ত পরহেজগার। তাঁর বড় ছেলে চেয়ারম্যান ছিলেন, মেজ ছেলে মন্ত্রী, সেজো মেয়ে মনোয়ারা বেগম ঢাকা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন, ছোট ছেলে সৈয়দ আবুল হাসান চক্ষু বিশেষজ্ঞ। সন্তান-সন্ততিদের এ অবস্থা দেখে তিনি খুশি হয়েছেন কিন্তু অবাক হননি। তিনি বলতেন, এতে অবাক হবার কিছু নেই। আমি আমার ছেলেদের ওভাবে গড়ে তুলেছি। কারও অনুগ্রহে নয় বরং যোগ্যতা আছে বলে তারা এ অবস্থানে।’৪ তাঁর মেজো ছেলে সৈয়দ আবুল হোসেন বড় ব্যবসায়ী। পরবর্তীকালে এম পি হয়েছেন; মন্ত্রী হয়েছেন। তার উত্তরণ দেখে মা সুফিয়া আলী অসম্ভব খুশি হয়েছেন। তবে অবাক হননি। বলতেন, ‘এটা আমার কাছে অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। আমি জানতাম আমার মেজো ছেলে অনেক বড় হবে। সে যা হয়েছে এর চেয়ে ঢের বড় হবার যোগ্যতা আমার আবুল হোসেনের আছে।৫
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি না-হলেও সুফিয়া আলী ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও সুজ্ঞানী। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার প্রতি ছিল কড়া নজর। তার কনিষ্ঠপুত্র ড. সৈয়দ আবুল হাসানের ভাষায়, ‘মা আমাদের লেখাপড়ার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। ঠিক সময়ে খাইয়ে-দাইয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দিতেন। স্কুল হতে আসলে খাতাপত্র গুছিয়ে রাখতেন। স্কুলের পড়া ঠিকমতো করেছি কিনাÑ সর্বদা সেদিকে নজর দিতেন। নারী শিক্ষার প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। বলতেন, ‘নারীপুরুষ সবার জন্য বিদ্যা অর্জন ফরজ। লেখাপড়ার জন্য আমাদের কাউকে তেমন বকা খেতে হয়নি। আমরা ভাইবোন সবাই লেখাপড়ার ব্যাপারে সজাগ ছিলাম।’
সুফিয়া আলী ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। কোনো লোকের চোখের দিকে তাকালে ঐ লোককে সুফিয়া আলীর প্রতি শ্রদ্ধায় আনত হয়ে যেতে হতো । তিনি অনুচ্চস্বরে মায়া ভরা কণ্ঠে কথা বলতেন। কোনোদিন উঁ”ু কণ্ঠে কথা বলেননি। তাঁর কথার মধ্যে এমন একটি অলৌকিক গাম্ভীর্য থাকত যা কার্যকর করা ছাড়া শ্রোতার অন্য কোনো উপায় থাকত না। তিনি জীবনে কোনোদিন নামাজ ক্বাজা করেননি। বুদ্ধি হবার পর হতে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করেছেন।৬ সুফিয়া আলী ছিলেন নারী শিক্ষার প্রতি অত্যন্ত আগ্রহী। জীবিতকালে তিনি ডি কে সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমি এন্ড কলেজের দুই জন মহিলা শিক্ষককে দীর্ঘদিন নিজের কক্ষে রেখেছিলেন। উভয়ে ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তিনি তাদের সাথে একত্রে খেতেন, ঘুমোতেন। উভয়কে নিজের কন্যার মতো স্নেহ করতেন। এ ঘটনায় সুফিয়া আলীর উদার মনমানসিকতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে পরিচয় পাওয়া যায়, তাতে সহজে অনুভব করা যায় তিনি কত বড় ও কত উচ্চমানের মহিলা ছিলেন।
১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮ সেপ্টেম্বর রোজ শনিবার আলহাজ্ব হযরত সৈয়দ আতাহার আলী (র.) ঢাকায় ৭১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাকে ডাসারে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। তার স্ত্রী সৈয়দা সুফিয়া আলী ২০০০ খ্রিস্টাব্দের ১০ নভেম্বর শুক্রবার ঢাকায় ৭২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ডাসারে স্বামীর কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। সংসার জীবনের মতো মরণের পরও উভয়ে পাশাপাশি অনন্ত শয্যায় শায়িত। অষধিুং নব হরপব ঃড় ুড়ঁৎ পযরষফৎবহ নবপধঁংব ঃযবু ধৎব ঃযব ড়হবং যিড় রিষষ পযড়ড়ংব ুড়ঁৎ ৎবংঃ যড়সব.
সৈয়দ আবুল হোসেনের পিতামাতা উভয়ে সন্তানদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। সৈয়দ আতাহার আলীর মাজার এখন পুণ্যার্থীদের কাছে তীর্থস্থান। পিতা-মাতার ইচ্ছানুসারে সৈয়দ আবুল হোসেন পিতার মাজারের পাশে এক গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ নির্মাণ করে দিয়েছেন। প্রতি পাঁচ ওয়াক্ত আজান পড়ে মসজিদে। সৈয়দ আতাহার আলী ও তার প্রিয়তমা স্ত্রী আলহাজ্ব সুফিয়া আলীর অন্তিম শয়ান আজানের পবিত্র দোলায় স্বর্গীয় মুর্ছনার আকাশ হয়ে ওঠে। তাঁদের সন্তান সৈয়দ আবুল হোসেনের পুণ্যময় কাজ তাদের নেকির খাতায় অনবরত পুণ্য যোগ করে যাচ্ছে এবং অনুরূপ যোগ করে যাবে অনন্তকাল।

১. সৈয়দ আতাহার আলীর কনিষ্ঠ সন্তান সৈয়দ এ হাসান। ৮/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ তারিখ
এক সাক্ষাৎকারে।
২. মাদারীপুর জেলার ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ।
৩. মাদারীপুর জেলার ইতিহাস, সিরাজ উদ্দীন আহমেদ।
৪. সুত্র: ড. সৈয়দ এ হাসান।
৫. সূত্র: ড. সৈয়দ আবুল হাসানের সাথে সাক্ষাৎকার, ৮/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ।
৬. সূত্র: ড. সৈয়দ আবুল হাসানের সাথে সাক্ষাৎকার, ৮/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ।
সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষাজীবন
জন্মস্থান ডাসার গ্রামের পাশে অবস্থিত নবগ্রাম প্রাইমারি স্কুলে সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি এ স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন। পিতা সৈয়দ আতাহার আলী তাঁকে ভর্তি করার জন্য স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। জীবনের প্রথম শিক্ষালয়ের অবস্থান হিসেবে নবগ্রামের স্মৃতি সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনের বর্ণীল ইতিহাস। প্রাথমিক শিক্ষা জীবনের প্রথম দুই বছর এ বিদ্যালয়ে অতিবাহিত হয়। নবগ্রামের কথা উঠলে তিনি বলে থাকেন- জন্ম ডাসারে, অক্ষর জ্ঞান নবগ্রামে।
নবগ্রাম প্রাইমারি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করে তিনি ডাসার প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। এ স্কুল থেকে চতুর্থ শ্রেণি পাশ করে বর্তমান আগৈলঝারা উপজেলায় অবস্থিত মেধাকুল হাই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। মেধাকুল হাই স্কুল সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষা জীবনের আরেকটি স্মরণীয় পর্ব। এ স্কুল থেকে তিনি সপ্তম শ্রেণি পাশ করে গৌরনদী উপজেলায় অবস্থিত বিখ্যাত গৈলা হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। গৈলা হাই স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করে সৈয়দ আবুল হোসেন তৎকালীন মেধা পরিস্ফুটনের কেন্দ্র হিসেবে খ্যাত গৌরনদী কলেজে ভর্তি হন।
নোয়াখালী নিবাসী দুই যমজ ভাই ডাসার গ্রামে থাকতেন। জ্যেষ্ঠ জনের নাম ছিল ক্বারি বোরহান উদ্দিন। তিনি ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক ছিলেন। কনিষ্ঠ জনের নাম শামসুল আলম। তিনি সাধারণ্যে শামশু হুজুর নামে পরিচিত ছিলেন। বাংলা, আরবি, উর্দু ও ফার্সি ভাষায় তার বিশেষ দক্ষতা ছিল। ইংরেজিও মোটামুটি জানতেন। শামসু হুজুর সৈয়দ আবুল হোসেনের বাড়িতে থেকে নবগ্রাম প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। নোয়াখালী নিবাসী ছোট যমজ হুজুরের নিকট সৈয়দ আবুল হোসেনের আনুষ্ঠানিক হাতেখড়ি। হাতেখড়ির দিন পিতা-মাতা শিশু আবুল হোসেনকে ইসলামি শরিয়া মতে যত্নসহকারে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে নতুন পাটিতে বসিয়ে দেন। ছোট হুজুর এসে তালপাতায় লিখিয়ে শিশু সৈয়দ আবুল হোসনকে হাতেখড়ি দেন। এ স্মৃতি তিনি এখনও রোমন্থন করেন: “পাটিতে বসিয়ে এবং তালপাতায় লিখিয়ে ছোট যমজ হুজুর বিছমিল্লাহহ বলে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন।” হাতেখড়ির পূর্বে তিনি বাড়িতে মা-বাবা ও অন্যান্য বড়জনদের কাছে ধর্মীয় পাঠ এবং বাংলা-ইংরেজি বিষয়ে প্রাথমিক অক্ষরজ্ঞান রপ্ত করে নিয়েছিলেন। শামশু হুজুরের অনুরোধে সৈয়দ আবুল হোসেনের পিতা-মাতা তাকে নবগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন।
ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রাথমিক বিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারণ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন আমার শ্রদ্ধাভাজন সুফিসাধক হযরত আতাহার আলীর সন্তান। সে কথা বলতে শেখার আগে আরবি শেখে। তাদের বাড়ির নারীপুরুষ সবাই ছিলেন পরহেজগার। আতাহার আলী এবং সুফিয়া আলী নিজেদের তত্ত্বাবধানে ছেলেমেয়েদের পড়াতেন। তাদের বাড়িতে শামসু হুজুর লজিং থাকতেন। হুজুর সৈয়দ আবুল হোসেনকে নবগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। নবগ্রাম ডাসার থেকে তিন কিলোমিটার। আমি সৈয়দ আতাহার আলী সাহেবকে বলেছিলাম, নবগ্রাম অনেক দূর, আবুল হোসেনকে আমার স্কুলে ভর্তি করান। সৈয়দ সাহেব হেসে বলেছিলেন, শামসু হুজুর শিশু আবুলকে হাতেখড়ি দিয়েছেন, তার ইচ্ছা সে নবগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুক। দূরের পথ হেটে কষ্টসহিষ্ণু হোক। যাই হোক, দুই বছর পর আমি আবুল হোসেনকে আমার স্কুলে পেয়েছিলাম। সে আমার ছাত্র ছিল। তার আলোয় আজ কালকিনি আলোকিত। অবহেলিত ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয় সারা দেশে পরিচিত। আমি তার শিক্ষক ছিলাম, এটি আমার গর্ব। ভর্তি হবার আগে সৈয়দ আবুল হোসেন তার বড় ভাই সৈয়দ আবুল কাশেমের সাথে মাঝে মাঝে স্কুলে আসত। ১৯৫৬ সালের জানুয়ারি মাসে সে আনুষ্ঠানিকভাবে নবগ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। দুই বছর সেখানে পড়ে ডাসার প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়। যেদিন ডাসার প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হয়, সেদিনের কথা এখনও আবছা মনে পড়ে। আতাহার আলী সাহেব আবুল হোসেনকে আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমার কলিজা। তাকে দেখিও, তোমার হাতে দিয়ে গেলাম।’১
সৈয়দ আবুল হোসেন ছাড়া তাঁর অন্য ভাইবোন ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু করেছিলেন। তিনি ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করেন। মেধাকুল হাই স্কুলে তিনি ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। তবে দুই মাস অধ্যয়ন করার পর ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে গৈলা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আবুল হোসেনের ছোট ভাই ড. এ হাসান বলেন, ‘আমার মামার বাড়ি বরিশাল জেলার গৈলার সেরেল গ্রামে। মামারা দুই ভাই, আরজ আলী মল্লিক ও রাজ্জাক মল্লিক। দাদা ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে চতুর্থ শ্রেণি পাশ করে মেধাকুল হাই স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তিন বছর পড়েন। তারপর গৈলা হাইস্কুল। দাদা মামা বাড়ি থেকে গৈলা হাইস্কুলে পড়তেন। মামা বাড়ির সবাই তাঁকে খুব স্নেহ করতেন। গৈলা হাই স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাশ করেন। দাদা ছিলেন যেমন পড়ুয়া তেমন সময়নিষ্ঠ ও অধ্যবসায়ী। মেধাকে তিনি শ্রমের সন্তান মনে করতেন। বড় মামা আরজ আলী মল্লিকের ছেলে মান্নান ভাই ছিলেন দুষ্টের শিরোমণি। লেখাপড়ায় মোটেও মনোযোগী ছিলেন না। দাদা মামাবাড়ি থেকে লেখাপড়া করবেন জানতে পেরে মামা-মামি খুব খুশি হয়েছিলেন। দাদা ছিলেন ভালো ছাত্র। তার দেখাদেখি মান্নান ভাইও ভালোভাবে লেখাপড়া শুরু করবেন- এটি ছিল তাদের আনন্দের বিষয়।’২
১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি আগৈলঝারা উপজেলার বিখ্যাত গৈলা উচ্চ বিদ্যালয় হতে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাশ করে গৌরনদী কলেজে বাণিজ্য বিভাগে আইকম ক্লাশে ভর্তি হন। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে ঐ কলেজ হতে কৃতিত্বের সাথে আই কম পাশ করার পর একই কলেজে বাণিজ্য বিভাগে বিকম ক্লাশে ভর্তি হন। সৈয়দ আবুল হোসেনের সহপাঠী আব্দুল কাদের এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘১৯৬৮ সালে আবুল ভাই আর আমি এইচএসসি পাশ করি। আমাদের ভাগ্য ভালো যে, এর দু বছর আগে ১৯৬৬ সালে গৌরনদী কলেজে কলা ও বাণিজ্য বিভাগ অনুমোদন লাভ করে। পূর্বের ন্যায় উভয়ে বাণিজ্য বিভাগে ডিগ্রি ক্লাশে ভর্তি হই।৩ গৌরনদী কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন সাহেবের ভাষায়, ‘১৯৬৮ সনের জুলাই মাসে কলা ও বাণিজ্য শাখা দিয়া গৌরনদী কলেজে ডিগ্রি ক্লাশ শুরু হইল। সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুর-এর মহান প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন ডিগ্রি ক্লাশের ১৯৬৮ ব্যাচের বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র ছিলেন।৪ ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আবুল হোসেন গৌরনদী কলেজ হতে বিকম পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ৫
প্রাথমিক বিদ্যালয় জীবনে সৈয়দ আবুল হোসেন
সৈয়দ আবুল হোসেন ডাসার প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং চতুর্থ শ্রেণি পাশ করে মেধাকুল হাই স্কুলে চলে যান। ডাসার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন শিশু আবুল হোসেন কেমন ছিলেন তা ঐ স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার সাহেব সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন- ‘পাঁচ/ছয় বছর বয়সের শিশুরা স্বভাবতই চঞ্চল থাকে। শিশু আবুল হোসেন ছিল ধীর-স্থির। সে স্কুল কামাই করেছে এমন ঘটনা মনে পড়ে না। লেখাপড়ায় ছিল একাগ্র। এক সাথে সবগুলো বই নিয়ে স্কুলে আসত। কোনো ছাত্র বই না-আনলে তাকে সাহায্য করত। প্রতিটা বই আগাগোড়া মন দিয়ে পড়ত। পাঁচ বছরে আমি কোনোদিন তাকে কারও সাথে ঝগড়া করতে দেখিনি। কোনো রকম গালমন্দ, অশোভনীয় কথা মুখ দিয়ে বের হতো না। বকা দিলে মুখটা সামান্য মলিন করে হাসত। মলিন মুখটা সুন্দর হাসিতে আরও উদ্ভাসিত হয়ে উঠত। সে কোনো দিন মিথ্যা বলেনি।৬
ছোট-বেলা হতে সৈয়দ আবুল হোসেন সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতেন। বই, খাতা ও জামা-কাপড় সবসময় পরিষ্কার ঝকঝকে থাকত। শিশু আবুল হোসেন নিজে জামাকাপড় পরিষ্কার রাখতেন। বাড়িতে মা-বাবা ব্যস্ত থাকলে নিজ হাতে খাবার নিয়ে খেতেন। পড়ার টেবিল সবসময় থাকত সাজানো-গোছানো। নিজেই প্রতিদিনের পাঠ স্বেচ্ছায় শিখে নিতেন। স্কুলে আসা-যাবার পথে আবুল হোসেন খুব মার্জিতভাবে চলাফেরা করত। মুরুব্বিদের দেখলে সুন্দরভাবে সালাম দিয়ে পথের এক পাশে দাঁড়িয়ে পথ ছেড়ে দিতেন। শিক্ষক, ছাত্র, মুরুব্বি সবাই তাকে স্নেহ করতেন। তাঁর বাংলা লেখার চেয়ে ইংরেজি লেখা ছিল সুন্দর। খুব ভালো ইংরেজি জানত। অন্য ছেলেরা যখন দুষ্টমি এবং খেলায় মগ্ন থাকত সৈয়দ আবুল হোসেন তখন বসে বসে ওয়ার্ড মুখস্থ করত। যে সকল সহপাঠী লেখাপড়ায় কাঁচা ছিল তাদেরকে সে পড়া বুঝিয়ে দিত।৭
সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রাথমিক বিদ্যালয় জীবনের সহপাঠী লাল মিয়ার ভাষায়, ‘স্কুলে যাবার পথে আমরা অনেক দুষ্টমি করতাম। প্রতিবেশীর গাব গাছে ঢিল- সুযোগ পেলে আম, জাম ইত্যাদি চুরি করে খেতে সংকোচ করতাম না, বরং চুরি করে খেতে পারলে গর্ব হতো। তবে আমাদের বন্ধু সৈয়দ আবুল হোসেন চুরি বা অন্য কোনো রকম দুষ্টমি সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলত। সে কোনো দিন কারও গাব গাছে ঢিল ছুঁড়েনি, আম পাড়েনি। আমরা ভাবতাম আবুল হোসেন বোকা। সে বলত, ‘চুরি করা পাপ, চুরির জিনিস খেলে কেউ বড় হয় না।’ তার মধ্যে একটা সম্মোহন ছিল। সে ছিল স্কুলের সবচেয়ে সুন্দর। ছোট বড় সবাই তাকে স্নেহ করত। তার ব্যক্তিত্ব আমাদের মোহিত করত। মুরুব্বিরা আমাদেরকে সৈয়দ আবুল হোসেনের মতো হতে উপদেশ দিতেন।৮
প্রাইমারি স্কুল জীবনে তিনি মনোরঞ্জনের জন্য সময় নষ্ট করতেন না। গ্রামে তখন যাত্রা, পালাগান ইত্যাদি দেখার জন্য শিশুরা কান্নাকাটি করত কিন্তু শিশু সৈয়দ আবুল হোসেনের এসব নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। তার আগ্রহ ছিল শুধু বই, বই আর বই।৯ ঠিক মার্ক টোয়েনের মতো।
মাদারীপুর ইউনাইটেড স্কুলে ভর্তি হবার ইচ্ছা এক সময় তাঁর কাছে প্রবল হয়ে উঠেছিল। সে সময় ঐ স্কুলটি এলাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল। এ সময় তিনি মামা বাড়ি বেড়াতে যান। মামাত ভাইয়ের সাথে গৈলা হাই স্কুলে যান। ক্লাশে হানিফ নামের এক শিক্ষক ইংরেজিতে একটি প্রশ্ন করেন। ক্লাশের প্রথম ছাত্রটির অনেক আগে সৈয়দ আবুল হোসেন প্রশ্নটির উত্তর দিয়ে দেন। হানিফ স্যার অভিভূত হয়ে সৈয়দ আবুল হোসেনকে প্রধান শিক্ষকের রুমে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, একটি মেধাবী ছেলে আমাদের স্কুলে ভর্তি হতে এসেছে। তাকে বিশেষ মনযোগ দিয়ে দেখতে হবে। এরপূর্বে তিনি ইউনাইটেড স্কুল দেখতে গিয়েছিলেন। কেউ তাকে এমন অনুপ্রাণিত করেননি বা অমন কোন ঘটনাও ঘটেনি। গৈলা হাই স্কুলের ঘটনা তাকে উদ্বেল করে। তার মন থেকে ইউনাইটেট স্কুল মুছে যায়, তিনি গৈলা হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে যান।

উচ্চ বিদ্যালয়ে জীবনে সৈয়দ আবুল হোসেন
উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর সৈয়দ আবুল হোসেনের চারিত্রিক সৌন্দর্য আরও বিকশিত হতে থাকে। আব্দুল কাদের সৈয়দ আবুল হোসেনের উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ জীবনের বন্ধু। বন্ধু সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে শতাব্দীর স্মৃতি প্রবন্ধে আব্দুল কাদের লেখেন- আবুল ভাই মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটতেন। তাঁর হাঁটার ভঙ্গী ছিল চমৎকার, মার্জিত এবং ব্যক্তিত্বময়। চলাফেরায় গতি ছিল, তবে কোনো চঞ্চলতা বা অস্থিরতা ছিল না। ছোটবড় সবার সাথে তিনি ভাল ব্যবহার করতেন। প্রতিটা কথা ছিল সাজানো, পরিমিত এবং সুরুচির পরিচায়ক। আধুনিক সাহিত্যের মতো ছোট ছোট সহজ বাক্যে তিনি কথা বলতেন। এটি ছিল তার অভ্যাস। কণ্ঠ ছিল মোলায়েম। বাক্যের প্রতিটা শব্দ স্পষ্টভাবে শোনা যেত। চড়া গলায় কখনও কথা বলতেন না। বিনয় মিশ্রিত ব্যক্তিত্ব ছিল তার কথাবার্তার অলঙ্কার। লেখাপড়া ছাড়া অন্য কিছুতে তেমন আগ্রহ ছিল না, তবে বিকেলে মাঝে মাঝে হাঁটতেন। বিল-ঝিল, নদীনালা, পাখি ইত্যাদি আনন্দের সাথে উপভোগ করতেন। প্রকৃতি হতে তিনি আহরণ করেছেন সৌন্দর্যবোধ ও পরিপাটিত্য এবং অধ্যয়ন হতে অর্জন করেছেন পরিমিতি বোধ ও সহনশীলতা।’
আবুল হোসেনের স্মরণশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। হাই স্কুল জীবনেই তিনি ইংলিশ-টু বেঙ্গলি অভিধানের প্রায় পুরোটা মুখস্থ করে নিয়েছিলেন। তাঁর এত বেশি ইংরেজি ওয়ার্ড মুখস্থ ছিল যে, প্রধান শিক্ষক শ্রীযুক্ত জর্জ অশ্রু বাবু তাকে চলন্ত অভিধান ডাকতেন। কোনো শব্দের অর্থ নিয়ে সংশয় দেখা দিলে প্রধান শিক্ষক আবুল ভাইকে ডাকতেন। বলতেন, ‘হ্যালো মিস্টার ডিকশনারি, হোয়াট ইজ দ্যা মিনিং অব দিজ ওয়ার্ড?’১০
তিনি ছিলেন অত্যন্ত পড়ুয়া এবং সময়নিষ্ঠ। কোনো অবস্থাতে অবহেলায় সময় নষ্ট করতেন না। তিনি কত সময়নিষ্ঠ ছিলেন তা একটি ঘটনা দ্বারা অনুধাবন করা যায়। সেরেলের মামাবাড়িতে সারাক্ষণ লোকজন আর সরগোল লেগে থাকত। ছুটির দিন তিনি ডাসার থাকলে বাড়িতে যখন ইচ্ছা তখন পড়তে পারতেন, মনোযোগ নষ্টের কোনো কারণ ঘটত না। মামা বাড়িতে দিনের বেলা সারাক্ষণ লোক গমগম করত। সরগোলের জন্য লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে পারতেন না। এক বন্ধের দিন তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। মামা-মামি অস্থির হয়ে পড়েন; আবুল হোসেন কোথায়! দুপুর গড়িয়ে গেল। তবু দেখা নেই। অনেক্ষণ খুঁজাখুঁজির পর মামাবাড়ির পাশের জঙ্গলে তাঁকে পাওয়া গেল। তিনি জঙ্গলের মাঝখানে এক টুকরো জমি পরিষ্কার করে পাটি বিছিয়ে একাগ্র মনে পড়ছেন। ছুটির দিন বৃষ্টি না-হলে তিনি অধ্যয়ন করার জন্য পাটি নিয়ে শন খেতে চলে যেতেন।১১
প্রাথমিক বিদ্যালয় জীবনের মতো কলেজ জীবনেও তাঁর কোনো বদভ্যাস ছিল না। তিনি পান কিংবা বিড়ি সিগারেট কোনো দিন স্পর্শ করেও দেখেননি। প্রতিদিন পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়তেন এবং আকর্ষণীয় ছাত্র হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত ছিলেন।১২

কলেজ জীবনে সৈয়দ আবুল হোসেন
১৯৬৬ সালে গৈলা উচ্চ বিদ্যালয় হতে আবুল হোসেন এসএসসি পাশ করে সদ্য প্রতিষ্ঠিত গৌরনদী কলেজে বাণিজ্য বিভাগে এইচএসসি ক্লাশে ভর্তি হন। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ঐ কলেজে অধ্যয়ন করেন। আবুল হোসেন কলেজের অনতিদূরে স্বাস্থ্য বিভাগের অর্ধনির্মিত একটি কমিউনিটি সেন্টারে ওঠেন। কমিউনিটি সেন্টারের পাশে কলেজের অধ্যক্ষ মো. তমিজ উদ্দিন স্যারের বাসা। তাঁর বন্ধু আবদুল কাদেরের ভাষায়, ‘অধ্যক্ষের কাছাকাছি থাকার জন্যই আবুল হোসেন কমিউনিটি সেন্টারে উঠেছিলেন।’ এসএসসি পাশ করার পর তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি হবার সব প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছিলেন। কিন্তু গৌরনদী কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন তাকে এতই প্রভাবিত করেছিলেন যে, তিনি ঢাকা কলেজে ভর্তি না হয়ে গৌরনদী কলেজে ভর্তি হন। তমিজ সাহেবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন: একদিন তিনি পড়শি আনিস মামার সাথে তমিজ উদ্দিন সাহেবের বাসায় যান। দেখেন, একজন লোক বাগানে পানি দিচ্ছে। আনিস স্যার পায়ের জুতো খুলে সালাম দিলেন আমিও পায়ের জুতো খুলে তাকে সালাম দিলাম। পরে জানলাম তিনিই অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন।
গৌরনদী কলেজে ভর্তি হবার অল্প কয়েকদিনের মধ্যে সকল শিক্ষক তাঁর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। ছাত্র হিসেবেও আবুল হোসেন মনোযোগী ও মেধাবী ছিলেন। ব্যবস্থাপনার শিক্ষক মো. মাকসুদ আলী সৈয়দ আবুল হোসেনের আগ্রহ দেখে কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে বিনা বেতনে পড়াতেন।১৩ অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিনের ভাষায়, “আবুল হোসেন ছিলেন অধ্যয়নমুখী সতত সচেতন একজন তুলনাহীন চরিত্রের অধিকারী আদর্শ ছাত্র- মেধাবী, একাগ্র ও ভদ্র। ছাত্র হিসাবে গৌরনদী কলেজে তিনি এত ভালো গুণের অধিকারী ছিলেন যে, কেহ তাঁহাকে ভালো না-বাসিয়া পারিতেন না। ইংরেজি শিক্ষক আবদুল খালেক বলিতেন, সৈয়দ আবুল হোসেন ইংরেজির ডিপো। এমন কোনো ইংরেজি ওয়ার্ড নাই যা সে জানে না।’ তিনি ছিলেন পা হতে মাথা পর্যন্ত একজন আদর্শ ছাত্র। কলেজ পরিচালনা পরিষদ তাঁর ব্যবহারে অভিভূত ছিলেন তাই পুরষ্কারস্বরূপ তার সকল বেতন মওকুফ করে দেয়া হয়েছিল।”১৪
১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আবুল হোসেন আইকম পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার আবেদন করেন। পুরো গৌরনদী কলেজের দুই জন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ পান। তন্মধ্যে একজন সৈয়দ আবুল হোসেন, অন্যজন হলেন শাহ আলম। ভর্তির প্রক্রিয়া প্রায় সমাপ্তের পথে। এ সময় একদিন গৌরনদী কলেজের অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন এবং হিসাব বিজ্ঞানের শিক্ষক ঢাকায় চলে আসেন। তারা সৈয়দ আবুল হোসেন ও শাহ আলমকে গৌরনদী কলেজে ডিগ্রি শ্রেণিতে ভর্তি করার জন্য নিয়ে যেতে এসেছিলেন। সৈয়দ আবুল হোসেন ছিলেন শিক্ষক অন্তপ্রাণ। যে দুজন শিক্ষক তাদের নিয়ে যেতে এসেছেন তারা উভয়ে তার প্রিয় শিক্ষক। তাদের কথা তিনি ফেলতে পারেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে তিনি গৌরনদী কলেজে ভর্তি হন। অবশ্য শাহ আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন।
ডিগ্রি ক্লাশে ওঠার পর মার্চের দিকে সৈয়দ আবুল হোসেন পুরোনো আবাসস্থল ছেড়ে গৌরনদী থানার নিকটবর্তী ভেটেরনারি বিভাগের একটি কমিউনিটি সেন্টারে গিয়ে ওঠেন। তাঁর সাথে ওঠেন পিঙ্গুলাকাটির নুরু। তাঁরা একত্রে নিজেরা রান্নাবান্না করতেন। একই রুমে থাকলে অনেক সময় রান্নাবান্না বা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। আবুল ভাই ছিলেন অন্য রকম। তাঁর সাথে নুরুর কোনোদিন কোনো মনোমালিন্য হয়নি। নুরু বলতেন, ‘আবুল ভাইয়ের মেনে নেয়ার ক্ষমতা এবং বন্ধুবাৎসল্য সব কিছুর ঊর্ধ্বে। তাঁর মত রুমমেট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।’১৫
কলেজ জীবনে অনেকে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, আবার অনেকে উচ্ছৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সৈয়দ আবুল হোসেন ছিলেন এসব হতে যোজন মাইল দূরে। তাঁর কলেজ জীবন কত সুশৃঙ্খল এবং হৃদয়গ্রাহী ছিল তা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন সাহেবের জবানিতে বিধৃত করা হলো, ‘সেই সময় আবুল হোসেন ষোল-সতের বয়সের কিশোর। রবীন্দ্রনাথ এই বয়সকে বালাই বলিয়াছেন। এই বয়স ছিল দুষ্টামির বয়স। অন্য ছেলেরা কত দুষ্টুমি করিত, কোলাহল করিত, মিছিল করিত, ঝগড়া করিত। আবুল হোসেনকে আমি কোনোদিন এই সবের কাছাকাছিও যাইতে দেখি নাই। তিনি কলেজের নিয়মকানুন এবং শিক্ষকগণের উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে মানিয়া চলিতেন। শিক্ষকগণের উপদেশ-নির্দেশ তাঁহার কাছে ছিল অলঙ্ঘনীয়। ঐ বয়সে তিনি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়িতেন। ছাত্র রাজনীতির আড়ালে রাজনীতিক দলের লেজুড়বৃত্তি সৈয়দ আবুল হোসেন পছন্দ করিতেন না। তিনি বলিতেন, ‘আগে লেখাপড়া তারপর অন্য কিছু।’১৬ ছাত্ররাজনীতি তিনি পছন্দ করতেন না কারণ অধিকাংশ ছাত্ররাজনীতির আড়ালে দলের লেজুড়বৃত্তি করে এবং ছাত্র রাজনীতি বিভিন্ন কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হবার ইন্ধন যোগায়। অবশ্য ছাত্রদের রাজনীতি যদি তাদের সামষ্টিক অধিকার সংরক্ষণ এবং ভবিষৎ নেতা হিসেবে গড়ে ওঠার লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ হিসেবে পরিচালনা করা যায়, তাহলে সেরূপ ছাত্ররাজনীতিকে তিনি সানন্দে বরণ করে নেন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সৈয়দ আবুল হোসেন
বিশ্ববিদ্যালয়ে আসায় সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রাথমিক, উচ্চ ও কলেজ জীবনের মার্জিত আচরণ এবং আকর্ষণীয় জীবনযাত্রা আরও শানিত হয়ে ওঠে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন একজন আদর্শ ছাত্র হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম ক্লাশটি নিয়েছিলেন প্রফেসর দূর্গা দাস। কলেজ জীবনে দূর্গা দাসের গ্রন্থ পড়ে আই কম, বিকম পাশ করেছেন। দিব্য-চোখে এমন জ্ঞানী মানুষটাকে দেখে তার অনুভূতি শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে পড়েছিল। এটি তাঁর জীবনের একটি স্মরণীয় ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ তাঁকে আদর্শ ছাত্রের সাথে সাথে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে পরিণত করার উপাদানে বিভূষিত করে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর দৈনন্দিন জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বলতে গিয়ে তৎকালীন সহপাঠী ও বন্ধু ড. আবদুল মাননান বলেন, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন প্রচার-বিমুখ একজন নীরব বন্ধু, ব্যক্তিগত আড্ডায় ঝলমলে হাসিমাখা উচ্ছল এক দীপ্তি, নিজ এলাকায় গরীব-দুঃখীর কাছে বিনম্র মায়াভরা ভালোবাসার প্রতীক, আপামর জনগণের সুখে-দুঃখে বিপদে-আপদে একজন দানশীল সহযোগী, প্রসন্ন চিত্তের ও নিরহংকারী বিত্তের সমাহারে একজন বিনয়ী সুহৃদ। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রমী, সৎ, কর্মনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত এবং বন্ধুবৎসল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার কৃতি ছাত্র আমার সহপাঠী কালকিনির সৈয়দ বংশের কৃতিসন্তান, এনায়েতপুরের খ্যাতিমান পীর বংশের জামাতা সৈয়দ আবুল হোসেনের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ছিল অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব ও আভিজাত্যময় এবং বর্ণীল। একজন ছাত্রকে আদর্শ ছাত্র হতে হলে, যা যা করা প্রয়োজন কিংবা যে সকল কার্যাবলি হতে বিরত থাকা অপরিহার্য, তিনি তা অক্ষরে অক্ষরে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করতেন।১৭
তখনকার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, “একদিন ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে আসছি। একটা ছেলে আমাকে দেখে তড়িঘড়ি চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো। ছেলেটির এমন আচরণের কারণ প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝলাম। ছেলেটি ছিল আমার জুনিয়র। সানগ্লাস পড়ে সিনিয়রদের সামনে দিয়ে হাঁটা শোভনীয় নয়। তাই তড়িঘড়ি সানগ্লাস খুলে ফেলেছিলো। ছেলেটির বাড়ি ছিল গোপালগঞ্জ। শিক্ষালয়ের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে এখনও আমার গোপালগঞ্জের সে ছেলেটির কথা মনে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সে অনিন্দ্যসুন্দর শ্রদ্ধা ও স্নেহময় দিনগুলো বড় গভীর আবেগে টানে।”
বিশিষ্ট দার্শনিক অধ্যাপক মনোরঞ্জন দাশ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সৈয়দ আবুল হোসেনের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করে বললেন, সৌম্যকান্ত চেহারা, অনেকটা আমাদের সবচেয়ে সুদর্শন দেবতা কার্তিকের মতো। গোলাকার মুখে হাসি পুরো লেফটে। চোখে নিষ্পাপ যোজনায় সারল্যের মুখরতা। টিএসসি-র একটি আড্ডায় প্রথম তাঁকে দেখি। আলাপের ফাঁকে ফাঁকে তাঁকে লক্ষ্য করছিলাম। আভিজাত্যময় ভঙ্গিতে ধীরস্থির হয়ে বক্তব্য শুনছেন। তার স্থিরতা দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না। এটি ব্যক্তিত্বের লক্ষণ। এমন ধীরস্থিরগণই শেষ পর্যন্ত সাফল্যের বরমাল্যে ভূষিত হন। ঐ বয়সে আমার সাথে তাকে তুলনা করলাম। আকাশ পাতাল তফাৎ। প্রথম দর্শনে সে আমাকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হলো। আমি বুঝলাম একটি কথা না বলেও মানুষ মানুষকে আর্কষণের জালে জড়িয়ে নিতে পারে। এ জন্য বলা হয়, ফেইস ইজ দ্যা ইনডেক্স অব মাইন্ড।১৮
মনোরঞ্জন দাশ আরও বলেছিলেন, ‘আমি আবুল হোসেনকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করলাম। প্রথমে রাজি না-হলেও সবার অনুরোধে রাজি হলেন। সেদিন তিনি কী বলেছিলেন তা হুবহু বলতে পারব- এমন বলাটা মিথ্যা হবে। তবে যা বলেছিলেন তা আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম। গ্রাম হতে সদ্য ঢাকায় আসা একটি ছেলে আমাদের মতো পোড় খাওয়া সিনিয়রদের অবাক করে দিয়েছিলেন। আমরা অবাক হয়ে তার কথা শুনেছিলাম। বক্তব্য শেষে প্রচন্ড তালিতে তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলাম। তিনি খুব বেশি একটা আড্ডায় আসতেন না, তবে কোনো প্রস্তুতি ছাড়া যে কোনো বিষয়ে ইংরেজি ও বাংলায় সমান অনর্গলতায় বলে যেতে পারতেন।১৯

১. আমার ছাত্র আমার শিক্ষক, আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার।
২. আমার সহোদর, আমার আদর্শ, ড. এ হাসান।
৩. শতাব্দীর স্মৃতি, আব্দুল কাদের।
৪. আমার আলেকজান্ডার, আলহাজ্ব অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন।
৫. পঞ্চম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা আহমাদ উল্লাহ, পৃষ্ঠা- ২১৯।
৬. আমার ছাত্র আমার শিক্ষক, আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার, সাবেক প্রধান শিক্ষক, ডাসার
প্রাথমিক বিদ্যালয়।
৭. মাঠ জরিপ।
৮. মো. মফিজুল হক মেম্বার, সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহপাঠী।
৯. মো. মফিজুল হক মেম্বার, সৈয়দ আবুল হোসেনের বাল্যবন্ধু ও ডাসার প্রাথমিক
বিদ্যালয়ের সহপাঠী।
১০. শতাব্দীর স্মৃতি, আবদুল কাদের।
১১. আমার সহোদর, আমার আদর্শ; ড. এ হাসান; আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের কনিষ্ঠ
ভ্রাতা।
১২. অজয় দাশগুপ্ত ও আবদুল কাদের সাহেবের সাথে সাক্ষাৎকার।
১৩. আবদুল কাদের-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকার ও শতাব্দীর স্মৃতি প্রবন্ধ।
১৪. আমার আলেকজান্ডার, অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন।
১৫. আবদুল কাদের।
১৬. আমার আলেকজান্ডার, অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন।
১৭. ড. এম এ মান্নান: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং সৈয়দ আবুল
হোসেনের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু।
১৮. খুঁজে বেড়াই তারে, অধ্যাপক মনোরঞ্জন দাশ: সাবেক অধ্যাপক, লেখক, কলামিস্ট ও
গবেষক।
১৯. খুঁজে বেড়াই তারে, অধ্যাপক মনোরঞ্জন দাশ: সাবেক অধ্যাপক, লেখক, কলামিস্ট ও
গবেষক।

সৈয়দ আবুল হোসেনের পারিবারিক ও কর্মজীবন

পারিবারিক জীবন
১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ অক্টোবর সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফিসাধক খাজা বাবা এনায়েতপুরী (রঃ)-এর সেজো ছেলে গদিনশিন সেজো হুজুর খাজা কামালউদ্দিন (রঃ)-এর সেজো কন্যা খাজা নার্গিসের শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়। সৈয়দ আবুল হোসেন ও খাজা নার্গিসের দাম্পত্য জীবন পারস্পরিক বোঝা-পড়ার অনাবিল উপন্যাস। এখানে শুধু হৃদয় নয়, আছে পরস্পর নৈকট্য লাভের আকুলতা, যা সবুজাভ অরণ্যের মতো অধরা-মাধুরী আর বিহ্বল ঐশ্বর্যে কাণায় কাণায় ভর্তি। শত ব্যস্ততার মাঝেও সৈয়দ আবুল হোসেন সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার আর রাতের ডিনার বাসায় স্ত্রী-কন্যাদের সাথে সারেন। এটি কাজের সাথে সংসারের প্রতিও সৈয়দ আবুল হোসেনের ঐকান্তিক আকর্ষণের একটি প্রমাণ। স্ত্রী-কন্যা; যাদের সময় নিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন এত বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, এত বিখ্যাত হয়েছেন- তাদের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার সীমা নেই, ভালোবাসার অন্ত নেই। এখানেই স্বার্থক খাজা নার্গিস। এটি অনুধাবন করতে পারেন বলেই খাজা নার্গিস তাঁর স্বামীর প্রতি এত ঐকান্তিক। এখানেই সৈয়দ আবুল হোসেনের স্বার্থকতা।১
ব্যক্তিগত জীবনে আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ। অমায়িক, ভদ্র, সজ্জন, পরোপকারী, দয়ালু ও দানশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাদৃত। তাঁর সহধর্মিণী বেগম খাজা নার্গিস হোসেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব সুফিসাধক হযরত খাজা এনায়েতপুরী (রঃ)-এর পৌত্রী ও এনায়েতপুর দরবার শরীফের বর্তমান গদিনশিন হুজুর পাক হযরত খাজা কামাল উদ্দিন সাহেবের কন্যা। সৈয়দা রুবাইয়াত হোসেন ও সৈয়দা ইফফাত হোসেন নামে তাঁদের দু’টি কন্যা সন্তান রয়েছে। তারা উভয়ে অত্যন্ত মেধাবী এবং আমেরিকার খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয় হতে উচ্চ ডিগ্রিধারী।
তাঁর বিনয় ও সৌজন্যবোধের বর্ণনা দিতে গিয়ে মো. মোজাম্মেল হক খান বলেছেন, সদাচরণের ক্ষেত্রে তিনি এক অনন্য মহান ব্যক্তিত্ব। জন্মগতভাবে ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক শিক্ষা এবং পরবর্তীকালে সামাজিকীকরণের অন্যান্য মাধ্যমে অর্জিত বিভিন্ন গুণের সমাহার তার চারিত্রিক মাধুর্যকে আরও বিকশিত করেছে। পদমর্যাদায় তাঁর কাছেও নেই এমন মানুষকে যে ভাষায় এবং আচরণে তিনি মোহবিষ্ট করছেন তার দৃষ্টান্তও বিরল। তাঁর অকল্পনীয়, অসাধারণ, মুগ্ধকর ব্যবহারের কৌশল ও সৌন্দর্য অবলোকন করার সুযোগ যারা পেয়েছেন তাদের অভিভূত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা তাঁর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত কোনো ব্যক্তিকে (যাঁদেরকে তিনি চেনেন) অথবা গর্হিত অপরাধ করে ফেলেছেন এমন কাউকেও কটু কথা বলতে শেখেননি। কি করে কথার যাদুতে তিনি বিরুদ্ধাচারীকেও বশীভূত করেন তা দেখে তাজ্জব বনে যেতে হয়। আমার সৌভাগ্য চাকুরির সুবাদে আমাকে প্রতিদিনই এগুলোর সাক্ষী হতে হচ্ছে। তাঁর সাহায্য প্রার্থনার জন্য এসেছেন এমন দর্শনার্থীকেও সিঁড়ির/লিফটের গোড়া পর্যন্ত গিয়ে অভ্যর্থনা ও বিদায় জানানোর যে কাজটি তার নিত্যকার ঘটনা তা আমার ২৮ বছরের চাকুরি জীবনে আর দ্বিতীয়টি চোখে পড়েনি।২
মো. মোজাম্মেল হক আরও বলেন, ‘সৌজন্য প্রদর্শন, শ্রদ্ধাবোধ, প্রটোকল এ গুলো ঊর্ধ্বগামী। যাদের থেকে এগুলো উৎসারিত, ত্যাগের আনন্দ ছাড়া বাকি সুফলগুলো বড়রাই ভোগ করেন। এখানেও তিনি ব্যতিক্রম। বয়স, পদমর্যাদা নির্বিশেষে এখানেও তিনি শুধু দাতা, ভোক্তা নন। ছোটদের প্রতিও স্বভাবসুলভ হাসি, আন্তরিকতা এবং যথোপযুক্ত শব্দসম্ভার প্রয়োগ করে তিনি মিথস্ক্রিয়াকে প্রাণবন্ত ও দীপ্তিমান করে তোলেন। ফলে সহযোগীদের কর্মস্পৃহা, পারস্পরিক সমঝোতা ও কর্মসহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে তা খুবই ফলদায়ক হয় । যার সুফল মন্ত্রণালয় ও আমরা প্রতিনিয়ত ভোগ করছি।৩
এ প্রসঙ্গে হাসনাত আবদুল হাই-এর বর্ণনা আরও হৃদয়গ্রাহী, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন প্রথম দৃষ্টিতেই নিকটের একজন হয়ে যান কোনো সচেতন প্রচেষ্টা ছাড়াই। তাঁর চারিত্রিক মাধুর্য, বিনয়ী ব্যক্তিত্ব এবং সদা হাস্যময় মুখ তাঁকে প্রিয় করে তোলে প্রথম পরিচয়েই। বয়সে, সামাজিক অবস্থানে এবং অন্যান্য পার্থক্য না-মনে রেখেই তিনি আলাপচারিতা করেন সবার সঙ্গে একইভাবে, প্রীতি, ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে। এমন অমায়িক, সরল ও আন্তরিক ব্যক্তিত্ব সহজেই মানুষকে কাছে টানে, সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনেও তাই হয়েছে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তার মধুর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়নি, আন্তরিকতার স্পর্শে বিহ্বলতা জাগেনি, সহমর্মিতার অনুভবে একাত্মতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়নি, এমন অভিজ্ঞতায় তাঁকে যারা জেনেছেন ও চিনেছেন তাদের কারো হয়েছে এ কথা বলা দুষ্কর।’৪
সৈয়দ আবুল হোসেন রবীন্দ্র সংগীতের ভক্ত। এক সময় প্রচুর গান শুনতেন। এখন ইচ্ছা থাকলেও সময় পান না। অধ্যয়ন তাঁর নেশা, দান তাঁর পেশা। খ্যাতিমান ব্যক্তিদের জীবনী তাঁর প্রিয় পাঠ্যবিষয়। শিক্ষা বিস্তার এবং মানবসেবাই তার শখ।৫ দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি সৈয়দ আবুল হোসেনের আত্মনিবেদন দেখে আমার আপন মন বার বার বলে ওঠে: ও ৎবধষরুব ঃযধঃ ঢ়ধঃৎরড়ঃরংস রং হড়ঃ বহড়ঁময. ও সঁংঃ যধাব হড় যধঃৎবফ ড়ৎ নরঃঃবৎহবংং ঃড়ধিৎফং ধহুড়হব.

কর্মজীবন
মাস্টার্স পাশ করার পর আবুল হোসেন টিসিবি-তে কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করলেও অল্পসময় পর চাকুরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। তখন সুতো ও সুতো-সম্পর্কিত রাসায়নিক দ্রব্যাদি টিসিবি-এর মাধ্যমে আমদানি করে বিসিক কর্তৃক তাঁতিদের মধ্যে বণ্টন করা হতো। ঢাকায় সুতোর গুদাম ছিল মিটফোর্ড হাসপাতালের পেছনে নলগোলা নামক স্থানে। ১৯৭৪ সালের বন্যায় গুদামে পানি ঢুকে সুতো নষ্ট হয়ে যায়। এ অবস্থায় ‘বঙ্গবন্ধু সরকার’ সুতো আমদানি সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন। অন্যদিকে নলগোলা গুদামের সুতো টেন্ডারে বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সৈয়দ আবুল হোসেন, পাবনার আবদুল মান্নান ও আলহাজ্ব টেক্সটাইলের মালিক আবদুল হাই সম্মিলিতভাবে নলগোলা গুদামের সুতো ক্রয়ের টেন্ডার দেন। ভাগ্য ভালো তারা টেন্ডার পেয়ে যান। এ প্রাপ্তি আবুল ভাইয়ের জীবনের একটি মাইল ফলক। সুতো বিক্রি করে তিনি প্রচুর লাভ করেন। কিছু নগদ অর্থ হাতে আসে এবং এ অর্থ দিয়ে তিনি ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে সাকো ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন।৬
তিনি ব্যবসায় দ্রুত সফলতা লাভ করেন এবং উত্তরোত্তর এর শ্রীবৃদ্ধি ঘটতে থাকে। তাঁর ব্যবসায় সফলতার কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ হতে পরবর্তী সাত বছর এক নাগাড়ের বাণিজ্য সচিবের দায়িত্বপালনকারী এম মতিউর রহমান বলেন, ‘প্রথম যখন আবুল হোসেনের সাথে আমার পরিচয় হলো তখন তিনি এত বড় ব্যবসায়ী ছিলেন না। ব্যবসা শুরু করেছিলেন মাত্র। পুঁজিও ছিল যৎসামান্য অধিকন্তু তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান। তাহলে কীভাবে তিনি এত বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন? উত্তর, অনেস্টি ইজ দ্যা বেস্ট পলিসি। আসলে সততার মতো বড় মূলধন আর নেই। তাঁর আর্থিক পুঁজি কম ছিল, এটা ঠিক, তবে তাঁর এমন কিছু পুঁজি ছিল যা পৃথিবীর সকল অর্থ একত্রিত করলেও হার মানবে। এ পুঁজি হচ্ছে পরিশ্রম, সততা, সময়নিষ্ঠা আর ভদ্রতা।
পেশাগতভাবে সৈয়দ আবুল হোসেন ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও স্বচ্ছ। ব্যবহারে ছিলেন ব্যক্তিত্বময়, বিনয়ে পরিপূর্ণ মার্জিত। তিনি মিথ্যা বলতে পারেন- এমন কেউ ভাবতে পারত না। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন যা বলতেন তা সবাই কোনোরূপ দ্বিধা ছাড়া সত্য মর্মে মেনে নিত। শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নয়, পুরো সচিবালয়ে এবং যাদের সাথে তিনি ব্যবসা করতেন, যারা তাঁর কাছে আসতেন-যেতেন, কথা বলতেন, কথা শুনতেন সবার কাছে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মানুষের পূর্ণ প্রতিচ্ছবির আদর্শিক নান্দনিকতায় গড়ে ওঠা একজন সৎ ব্যবসায়ী। সংগত কারণে তিনি পুরো সচিবালয়ে ছোটবড় সবার এবং পরিচিত সব মহলের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। আমি মনে করি সৈয়দ আবুল হোসেনের বড় হবার পেছনে এটি কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ঢাকা বাণিজ্য ও শিল্প অনুষদ এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাথে আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি ন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট এসোশিয়েশন, বাংলাদেশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা বিভাগ এলাম নাই এসোশিয়শনের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব। তিনি সাকো ডেভেলপমেন্ট সেন্টার নামে একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সাহায্য সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এ বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে তিনি হাজার হাজার দুঃস্থ নরনারীকে স্বনির্ভর ও দক্ষ মানব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অসংখ্য কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। এ সংস্থাটি সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত।
সৈয়দ আবুল হোসেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেছেন। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বাসে অনুষ্ঠিত বিশ্ববাণিজ্য সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিত্ব করেন। একই বছর জাপানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব সোস্যাল ডেমোক্র্যাট সম্মেলনে তিনি জননেত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে তাঁর মিডিয়া কভারেজের সার্বিক দায়িত্ব পালন করে দেশব্যাপী বিপুল সাড়া জাগান। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে আয়োজিত শিশু সংক্রান্ত সেমিনারের তিনি সফল উদ্যোক্তা। তিনি সমাজসেবা ও শিক্ষানুরাগিতার স্বীকৃতিস্বরূপ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তাঁর কর্ম, অধ্যবসায়, দেশপ্রেম ও সততার পুরস্কারস্বরূপ জননেত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে দুই বার মন্ত্রী- একবার প্রতিমন্ত্রী এবং বর্তমানে পূর্ণমন্ত্রী পদে ভূষিত করেন।

১. প্রেরণাদায়িনী খাজা নার্গিস; আহমদ হোসেন বীরপ্রতীক: বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতা
যুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত। তিনি এনায়েতপুরের গদিনশিন
পির হযরত খাজা কামালউদ্দিনের অসংখ্য ভক্ত-শিষ্যদের একজন।
২. সৈয়দ আবুল হোসেন- আপনাকে, মো. মোজাম্মেল হক খান, সচিব, সড়ক ও রেলপথ
বিভাগ।
৩. ঐ
৪. সৈয়দ আবুল হোসেন: ব্যক্তিগত মূল্যায়ন, হাসনাত আবদুল হাই।
৫. পঞ্চম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা আহমাদ উল্লাহ, পৃষ্ঠা- ২১৯।
৬. শতাব্দীর স্মৃতি, আবদুল কাদের।

সৈয়দ আবুল হোসেনের কৃতিত্ব, অবদান ও স্বীকৃতি
মানুষের জীবনে কর্ম, মর্ম, সফলতা, সুনাম ও খ্যাতির যতগুলো অভিধা রয়েছে তার সব ক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল হোসেনের কৃতিত্ব ঈর্ষণীয় সাফল্যের অমিয় সুধায় কানায় কানায় পরিপূর্ণ। তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, দূরদর্শী সমাজ সংস্কারক, জনপ্রিয় নেতা, বিচক্ষণ আইন প্রণেতা, মহান দাতা, চৌকষ মন্ত্রী। দেশখ্যাত শিক্ষানুরাগীই শুধু নন, ভদ্রতা, অমায়িক ব্যবহার, সৌজন্যবোধ, উচ্চ শিক্ষা, অতি উঁচুমানের বংশমর্যাদা এবং শারীরিক অবয়বেও অতীব মনোহর একজন অসাধারণ ব্যক্তি। ইকবাল হোসেনের ভাষায়, ‘আমার নেতা সৈয়দ আবুল হোসেন বাংলাদেশের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক, শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, খ্যাতিমান লেখক। পারিবারিক ঐতিহ্য এমনকি চেহারা বিবেচনায়ও বাংলাদেশে আমার নেতার সাথে তুলনা করার মতো লোক খুব বেশি নেই। কেউ হয়ত বড় রাজনীতিক কিন্তু বড় ব্যবসায়ী নন; কেউ বড় দানবীর কিন্তু বড় ব্যবসায়ী বা রাজনীতিক নয়; কেউ-বা হয়ত রাজনীতিক, ব্যবসায়ী এবং দাতা কিন্তু পারিবরিকি ঐতিহ্য নেই, শিক্ষা নেই। কিন্তু আমার নেতা সৈয়দ আবুল হোসেন এমন একজন রাজনীতিবিদ যিনি সবদিক দিয়ে পরিপূর্ণ। মানব চেতনার এমন কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই যা আমার নেতার কাছে নেই। তাই তিনি তুলনাহীন এবং অনন্য। আমার নেতা নিঃসন্দেহে তুলনাহীন মর্যাদার অধিকারী এক মহান ব্যক্তি।’১
আল্লাহ তাকে দিয়েছেন উজাড় করে। তিনিও মানুষকে দিয়ে যাচ্ছেন উদার হস্তে। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের প্রাকৃতিক দুর্যোগে উড়িরচর ও মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়ার দুর্গত মানুষদের তিনি যে উদার সাহায্য করেছেন তা এখনও সেখানকার মানুষের স্মৃতিপটে দেদীপ্যমান। পার্থিব বা অপার্থিব যাই হোক- মানুষ কোনো না কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে দান করেন। তবে দানের পশ্চাতে সৈয়দ আবুল হোসেনের কোনো পার্থিব উদ্দেশ্য ছিল না। দুর্গত মানুষের কান্না তাঁর আত্মাকে বিগলিত করেছিল। অসহায় মানুষের সেবার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে মহাপ্লাবনের সময় মাদারীপুরের দুর্গত মানুষকে নিজের পরিবারের মতো নিবিড় মমতায় বুকে টেনে নিয়েছিলেন। দুর্গত মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর জন্য যা প্রয়োজন, তা বিলিয়েছেন অকাতরে। এখানেও তাঁর রাজনীতিক বা পার্থিব অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে সৈয়দ আবুল হোসেন দুর্গতদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। অসহায় মানুষকে তিনি যেভাবে সহায়তা করেন, তা কারও বিত্তের সাথে চিত্তের সুবিশাল সমন্বয় না-ঘটলে কখনও সম্ভব নয়।
দেশে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে সৈয়দ আবুল হোসেনের ভূমিকা রূপকথার গল্পের মতো। বলা হয়ে থাকে, দেশে আর দশজন সৈয়দ আবুল হোসেন জন্ম নিলে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটত। তাঁর একক প্রচেষ্টায় যতগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়েছে, বাংলাদেশে আর কারও একক প্রচেষ্টায় এত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হয়নি। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি তাঁর পিতার নামে সৈয়দ আতাহার আলী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে প্রয়াত পিতার নামে প্রতিষ্ঠা করেন সৈয়দ আতাহার আলী ইবতেদায়ি মাদ্রাসা। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে মাদারীপুরের খোয়াজপুরে প্রতিষ্ঠা করেন সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ। শিক্ষার মান, অবকাঠামো, পরিবেশ ও সফলতা বিবেচনায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের যে কোনো শ্রেষ্ঠ কলেজের সাথে পাল্লা দেয়ার সকল যোগ্যতার অধিকারী। বিশেষ করে, সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুর-এর লেখাপড়ার মান এত উন্নত ছিল যে, প্রথম ব্যাচের একজন ছাত্র বাণিজ্য বিভাগে প্রথম স্থান এবং আর একজন চতুর্থ স্থান অধিকার করে।
মাদারীপুর জেলা লিগ্যাল এইড-এর প্রাক্তন কর্মকর্তা, বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও শিক্ষাবিদ ড. একেএম আখতারুল কবীর বলেছেন, ‘আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কলেজগুলো এত সুনাম অর্জন করেছিল যে, মাদারীপুর এলাকার প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুরোনো নাম পরিবর্তন করে সৈয়দ আবুল হোসেনের নামে নামকরণ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। সবার মনে এমন বিশ্বাস জাগ্রত হয়ে উঠেছিল যে, সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের দায়িত্ব নিলে শিক্ষার্থীরা জাতীয় মেধা তালিকায় স্থান পাবে। তিনি শিক্ষক নিয়োগে এত নিরপেক্ষতা পালন করতেন যে, তার কলেজে মেধাবী শিক্ষকই সবসময় নিয়োগ পেত। সংগতকারণে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষার পরিবেশও থাকত মেধাময়।’২
কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি গর্ব। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি এ কলেজটি নতুন আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠা করেন। এমন চমৎকার পরিবেশ ও আভিজাত্যময় অবকাঠামো এবং আদর্শ ক্যাম্পাস বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। এ কলেজের শিক্ষার মান ও সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় সরকার কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করেছে। উল্লেখ্য, থানা পর্যায়ে বেসরকারি কলেজের মধ্যে এটি প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত হবার গৌরব অর্জন করে।
নিজ গ্রাম ডাসারে পিতার পুণ্য স্মৃতি রক্ষার্থে প্রতিষ্ঠিত ডি কে আইডিয়াল একাডেমিকে আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন নিজ অর্থে কলেজে উন্নীত করেছেন। এ প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান নাম ডি কে আইডিয়াল সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমী এন্ড কলেজ। পুরো মাদারীপুর জেলার মধ্যে এটাই একমাত্র কলেজ যেখানে বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও মানবিক শাখা ছাড়াও ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা কোর্স চালু করা হয়েছে। গ্রামের একটি কলেজের এতদূর উন্নীত হবার পুরো কৃতিত্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের।
কালকিনির প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম কেউ মুছে দিতে পারবে না। তিনি মনে করেন, প্রাথমিক শিক্ষা সারা জীবনের শিক্ষার ভিত। এটি বিস্তৃত করা না-গেলে জাতিকে স্থবিরতা হতে মুক্তি দেয়া সম্ভব নয়।’ প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি ১০০টির অধিক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। স্থানীয় অংশগ্রহণকারীদের অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনে যত টাকা প্রয়োজন জনগণের পক্ষ হতে সমুদয় অর্থ সৈয়দ আবুল হোসেন একা পরিশোধ করেছেন। তাঁর এ অবদান কয়েক বছরের মধ্যে কালকিনির শিক্ষার হার ও মান দুটোকে বহুগুণে বর্ধিত করেছে। এক হিসেবে দেখা গেছে, তিনি এ পর্যন্ত প্রায় দুই শতেরও অধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় প্রত্যক্ষভাবে অবদান রেখেছেন।
ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও উপাসনালয় প্রতিষ্ঠাতেও তাঁর অবদান অপরিসীম। সৈয়দ আবুল হোসেন তাঁর পিতার মাজার সংলগ্ন মসজিদ ও মাদ্রাসা ছাড়াও কালকিনি ও মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ৩৭টি মাদ্রাসা ও ৪৫টি মসজিদ প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন। তাঁর অর্থানুকূল্যে ২৯টি মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হারিয়ে যাবার হাত হতে রক্ষা পেয়েছে। ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত সব দিকে তিনি শিক্ষার উন্নয়নে উদার। হাজার হাজার দরিদ্র মেয়ে তার দানে সংসার খুঁজে পেয়েছে।
তাঁর এলাকায় তিনি শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ও স্থাপন করেছেন। এসব বিদ্যালয়ের কমিউনিটি পার্টিসিপেশনের অংশ হিসেবে প্রতিটি বিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত সমুদয় অর্থ এলাকার জনগণের পক্ষ থেকে তিনি নিজ তহবিল থেকে দান করেছেন। পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত কলেজটির ছাত্রাবাস ও শিক্ষকদের বাসস্থানও নিজ অর্থে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি গরিব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানের নিমিত্ত ‘সৈয়দ আবুল হোসেন কল্যাণ ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করেন।৩ এক গবেষণায় দেখা যায়, সৈয়দ আবুল হোসেন এ পর্যন্ত ৩৪১২ জন অসহায় দরিদ্র মহিলার বিয়েতে আর্থিক সাহায্য দিয়েছেন। গত বিশ বছরে সৈয়দ আবুল ১৯৪৬৫ জন ছাত্রছাত্রীকে লেখাপড়ার জন্য সাহায্য করেছেন। তাঁর অর্থানুকূল্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৩৭০০-এর অধিক।৪
শিক্ষা বিস্তারের কথা শুনলে সৈয়দ আবুল হোসেনের মন আপনা-আপনি উদার হয়ে যায়। তিনি সব কিছু বিলিয়ে দেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকেন। তিনি মনে করেন, শিক্ষার চেয়ে ভালো বিনিয়োগ আর নেই। এটি অবিনশ্বর। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আবুল হোসেনের একটি উদ্ধৃতি স্মর্তব্য-“আমি আমার মরহুম পিতা সৈয়দ আতাহার আলীর নামে ডাসার গ্রামে একাডেমি কলেজ, খোয়াজপুর কলেজ, কালকিনি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ডাসার শেখ হাসিনা একাডেমি কলেজ প্রতিষ্ঠা করি। দক্ষিণ বাংলার অনেক মেয়ে উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। অর্থের অভাবে তাদের কলেজে পড়া হয় না। নারী শিক্ষা বিস্তারে আমি দেশরত্ন শেখ হাসিনা একাডেমি কলেজ প্রতিষ্ঠা করি। শত শত গরিব মেয়ে শেখ হাসিনা একাডেমিতে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। খোয়াজপুর কলেজ থেকে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। কালকিনি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্স ও এমএ পড়ানো হয়। মফস্বলে বাংলাদেশে প্রথম অনার্স ও স্নাতকোত্তর ক্লাস মাদারীপুর জেলার কালকিনিতে শুরু হয়। নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য আমার চেষ্টায় অনেক বেসরকারি প্রাথমিক প্রাইমারি ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”৫
সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষানুরাগিতার কথা বলতে গিয়ে কালকিনি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ খালেকুজ্জামান বলেন, ‘কালকিনির এই রত্ন আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের সবচেয়ে বড় সাফল্য কালকিনি অঞ্চলের শিক্ষা প্রসারে সীমাহীন অবদান। তিনি বিশ্বাস করেন, যে জাতি বা অঞ্চল যত বেশি শিক্ষিত সে অঞ্চল তত বেশি উন্নত। তাই সামর্থ্য অর্জনের সাথে সাথে তিনি শিক্ষার প্রসারে নিজেকে নিবেদিত করে দিয়েছেন। একক প্রচেষ্টায় ১৯৮৯ সালে মাদারীপুর থানাধীন অনুন্নত অঞ্চল খোয়াজপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন দেশের উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্যতম খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ। অতঃপর কালকিনি উপজেলা সদরে তৎকালীন ক্ষীণপ্রভার কালকিনি কলেজ তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এর সুরম্য ভবনের খ্যাতি দেশজোড়া। কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ এখন কোনো সাধারণ কলেজ নয়, দক্ষিণ বঙ্গের অন্যতম খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এ ছাড়া উপজেলাধীন ডাসার গ্রামে সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমি এন্ড কলেজ, শেখ হাসিনা একাডেমি এন্ড উইমেন্স কলেজ প্রতিষ্ঠিত করে প্রত্যেকটিকে খ্যাতি, অবয়ব ও শিক্ষার মান ও মননে শীর্ষে তুলে দিয়েছেন। তাঁর উদারতার ছোঁয়ায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে শশীকর শহিদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়, সাহেবরামপুর কবি নজরুল ইসলাম কলেজ প্রভৃতির সার্বিক উন্নয়ন। এ বছরেই আড়িয়ালখাঁর অপর পাড়ের প্রত্যন্ত জনপদের শিক্ষা বিস্তারের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন খাসেরহাট সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ। কলেজ ছাড়াও উপজেলার সব মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও প্রাথমিক বিদ্যালয় তাঁরই তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া তিনি শতাধিক স্বল্পব্যয়ী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। মাদরাসা শিক্ষার প্রসারেও তাঁর ভূমিকা অনন্য। তাঁর একক প্রচেষ্টা সমগ্র অঞ্চলকে নিরক্ষরতা মুক্ত আলোকপ্রাপ্ত অঞ্চলে পরিণত করেছে।’৬
‘কালকিনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবন’ তৈরিতে সৈয়দ আবুল হোসেনের একক অবদান সবচেয়ে বেশি।৭ কালকিনি উপজেলা এখন আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতাভুক্ত। যে কালকিনিতে নৌকা ছাড়া চলাচল অবিশ্বাস্য ছিল, সৈয়দ আবুল হোসেনের ছোঁয়ায় তার আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। গত ১৫ বছরে তিনি কালকিনি উপজেলা সদর হতে বিভিন্ন ইউনিয়নে যোগাযোগ নিরবিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে ১৪ টি সড়ক প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন করেছেন। স্থাপন করেছেন অসংখ্য রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট। যুব সমাজের নৈতিক ও সাংগঠনিক শ্রীবৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি অনেকগুলো পাঠাগার, ক্লাব, সামাজিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন ও প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছেন।৮ কালকিনির আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিক উন্নয়নে এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যা সৈয়দ আবুল হোসেনের উদারতায় সমৃদ্ধ হয়নি।
প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রতিজ্ঞা ও প্রয়াস দুটোই আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। সৈয়দ আবুল হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘গ্রামই আমাদের আসল ঠিকানা। অথচ এই গ্রাম আজ অবহেলিত। শহরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। কিন্তু গ্রামের লোকের লেখাপড়ার প্রতি কারও তেমন মনোযোগ নেই। গ্রামের জনগোষ্ঠীর শিক্ষার বিপুল চাহিদা মেটানের লক্ষ্যেই আমার এ প্রয়াস।’৯
লেখক ও সম্পাদক হিসেবেও সৈয়দ আবুল হোসেন স্মরণীয় ও বরণীয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন তিনি ‘দি পলিটিসিয়ান’ নামক একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। দেশের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন এবং এখনও লেখেন। আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন বোদ্ধা সমাজে দূরদর্শী রাজনীতিক বিশ্লেষক হিসেবে পরিচিত। তিনি কবি সাহিত্যিকের পৃষ্ঠপোষকতার জন্যও খ্যাত। তার অর্থানুকূল্যে অনেকের রচিত বই আলোর মুখ দেখেছে।১০
সৈয়দ আবুল হোসেন একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ৯ নং সেক্টরের আওতায় থেকে হানাদারের বিরুদ্ধে বেশ কটি সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। একবার তিনি গ্রেনেডসহ গৌরনদীতে ধরা পড়েন। তবে ভাগ্যক্রমে রক্ষা পান।১১ তবে হানাদার বাহিনী তাঁর ওপর নির্যাতন চালায়। মুক্তিযোদ্ধারা কোথায় আছেন তা বলে দেয়ার জন্য নির্যাতন। তিনি বলেননি, দেশপ্রেমের অনুভূতি সব নির্যাতনকে ফুলেল ভালোবাসায় আরও তেজি করেছে। রাজাকার-আলবদরগণের নির্যাতনে সৈয়দ আবুল হোসেনের বাম হাত ভেঙে গিয়েছিল। এখনও হাতে সে চিহ্ন আছে। এটি যাতে দেখা না যায় এ জন্য তিনি সবসময় ফুলশার্ট পরে তা ঢেকে রাখেন।১২
সৈয়দ আবুল হোসেন এসডিসি নামক একটি এনজিও-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এর প্রধান অফিস মাদারীপুর জেলার কালকিনি থানার ডাসার গ্রামে অবস্থিত। এ প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে তিনি প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার মান উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবেশের উন্নয়ন, গরিব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নসহ আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক অবদান রেখে যাচ্ছেন। শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান রয়েছে। তিনি গণচিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংগঠন বোয়াও ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

লেখক সৈয়দ আবুল হোসেন
সৈয়দ আবুল হোসেন লেখক হিসেবে কেমন? এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান শিক্ষক ড. এ মাননান বলেন, দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলতে চাই, তিনি একজন মননশীল সৃজনশীল চিন্তাবিদ, চিন্তনে-লিখনে যাঁর রয়েছে অগাধ ব্যুৎপত্তি। লেখায় যাঁর সাবলীলতা ঈর্ষণীয় বিষয়। যাঁর লেখায় পাওয়া যায় কান্নার সুর, যখন তিনি কালির আঁচড়ে বলেন স্বাধীনতার জনক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর লড়াকু জীবন আর দেশদ্রোহী ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে শহিদ হওয়ার কাহিনি। যাঁর লেখনীর গুণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্্রষ্টা কোটি কোটি বাঙালির প্রাণ-পুরুষ সিংহ-হৃদয় ‘বাংলার মুজিব’-এর সংগ্রামী জীবন, তাঁর জীবনের বঞ্চনার কাহিনী, নৃশংসভাবে তাঁকে সহ তাঁর পরিবারের শাহাদাত-বরণের কথা। আমি তাঁরই কথা উচ্চকণ্ঠে বলতে চাই, যাঁর লেখায় দীপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলার জনগণের চরম বিপদে সদা-সর্বদা সংগ্রামী মন নিয়ে আপোসহীন এগিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু-তনয়া সংগ্রামী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি যিনি প্রবল বিরূপতার মধ্যে থেকেও সততার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ও দিচ্ছেন। আমি তারই কথা বিনা দ্বিধায় বলতে চাই যাঁর শানিত লেখায় বাক্সময় হয়ে উঠেছে বঙ্গজননী বেগম ফজিলাতুন্নেছার সংগ্রামময় পারিবারিক জীবন এবং শত কষ্টের মধ্যেও বঙ্গবন্ধুর জেল-জীবনের সময়ে মাসুম সন্তানদের গড়ে তোলার ইতিকথা। শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর এখানেই, তাঁর লেখার মধ্যে।
আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন একজন মননশীল গ্রন্থকার হিসেবে লব্ধ প্রতিষ্ঠিত। লেখক ছাড়াও তিনি সাহিত্যানুরাগী হিসেবে অনেক কবি-সাহিত্যিককে গ্রন্থ প্রকাশে সহায়ত করেছেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সমাজ চিন্তামূলক অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলো উল্লেখযোগ্য :

১. স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান;
২. শেখ হাসিনা সংগ্রামী জননেত্রীর প্রতিকৃতি;
৩. গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন;
৪. গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সংকট;
৫. আওয়ামী লীগের নীতি ও কৌশল- শিল্পায়ন ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ সমাবেশ;
৬. শেখ হাসিনার অক্ষয় কীর্তি- পার্বত্য শান্তি চুক্তি;
৭. বঙ্গজননী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব;
৮. শেখ হাসিনার অসামান্য সাফল্য এবং
৯. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সুবর্ণ জয়ন্তী স্মারকগ্রন্থ।

সৈয়দ আবুল হোসেনের গ্রন্থের সমালোচক ড. আবদুল জলিল বলেছেন, তাঁর প্রতিটি গ্রন্থ ভিন্ন স্বাদ ও ব্যতিক্রমী যোজনায় পরিসজ্জিত। রাজনীতি, স্বাধীনতা, আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ড, পররাষ্ট্র ও ব্যক্তিগত জীবন পরম্পরায় মানবিক মূল্যবোধ উন্মোচনের মধ্য দিয়ে জীবনের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত কণিকা সৈয়দ আবুল হোসেনের লেখায় অপূর্ব ব্যঞ্জনায় দ্যোতিত। আবেশিত লেখা বাস্তবতার কোড়কে পরিশুদ্ধ করা গেলে তা কী পরিমাণ কার্যকর হয়, তা পাঠকমাত্রই অনুধাবন করতে পারেন। সৈয়দ আবুল হোসেনের গ্রন্থগুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। মনের মাধুরী মিশিয়ে অনেক বড় বড় গ্রন্থ লেখা যায়, কিন্তু বাস্তবতার লেশমাত্র পাওয়া যায় না। সে বিবেচনায় সৈয়দ আবুল হোসেন ব্যতিক্রমী। গ্রন্থগুলোকে লেখক তথ্য, ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্র, গ্রহণযোগ্য উদ্ধৃতি দিয়ে সত্যিকার অর্থে মণির মতো আকর্ষণীয় আলেখ্যে উদ্ভাসিত করেছেন। চোখ বুলালে বোঝা যায়, প্রতিটি বই লিখতে সৈয়দ আবুল হোসেনকে প্রচুর পড়তে হয়েছে। কিছু কিছু বিষয় আরও চমৎকার, যা পড়ে অর্জন করা যায় না। এগুলো জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার মধুর প্রাপ্তির প্রগাঢ় অনুভব ছাড়া হয় না। পরিসরে ছোট হলেও তথ্য-তত্ত্ব ও বিষয়াবলিতে বেশ সুস্বাদু ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ প্রতিটি বই, যা পাঠকের মনে দাগ কাটতে বাধ্য।১৩

স্বীকৃতি
সাহিত্য, সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান এবং শিক্ষা প্রসারের জন্য সৈয়দ আবুল হোসেন জাতি ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। শিক্ষা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখার জন্য তিনি শেরে বাংলা পদক, মোতাহার হোসেন পদক এবং জাতীয় স্বীকৃতিসহ অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সার্বিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আমেরিকার বায়োলজিক্যাল ইন্সটিটিউট তাঁকে ‘ম্যান অব দ্যা মিলেনিয়াম’ পদকে সম্মানিত করে। সেবামূলক কাজে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান পুরস্কার লাভ করেন।১৪ তাঁর বন্ধু ও সাকো ইন্টারন্যাশনাল-এর প্রাক্তন কর্মকর্তা জনাব আব্দুল কাদিরের ভাষায়, সৈয়দ আবুল হোসেন কমপক্ষে বাইশটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার বা সম্মাননা পেয়েছেন।
জীবনের প্রথম সংসদ নির্বাচনে তিনি মাদারীপুর-৩ নির্বাচনী এলাকা হতে ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন মোল্লাকে ৩৬ হাজার ভোটে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার।১৫ ঐ নির্বাচনের সময় তিনি শুধু একবার নির্বাচনী এলাকায় গিয়েছিলেন। তাও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাথে। তবু তিনি জয়ী হয়েছেন। কারণ তিনি ক্ষমতার জন্য নির্বাচনে যাননি, জনসেবার প্রাতিষ্ঠানিক ভিতকে মজবুত করে জনকল্যাণে শক্তিশালী ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে জনগণের কাছ হতে ভোট চাওয়ার চেয়েও জনগণের মনের গভীরে তার অবস্থান কতটুকু রেখাপাত করেছে তা সর্বাগ্রে জানা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়: “আমি সমাজ উন্নয়নের সাথে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে জড়িত আছি। জনগণের আহবানে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে আমি ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে কালকিনি উপজেলা ও মাদারীপুর উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছি।”১৬
২০১২ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রন্থটি যখন প্রকাশিত হয় তখন সৈয়দ আবুল হোসেন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সংখ্যা ছিল একটি। এখন তিনটি। এ কয়েক মাসের মধ্যে তিনি স্বীয় একক প্রচেষ্টায় প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে আরও দুটি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করেছেন। বাংলাদেশে এমন আর কোন নজির নেই। কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাড়া তিনি যে দুটি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করেছেন সে দুটি কলেজ হলো : (১) মাদারীপুর সদর থানার খোয়াজপুর গ্রামে অবস্থিত সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ এবং কালকিনি উপজেলার ডাসার গ্রামে অবস্থিত শেখ হাসিনা একাডেমি এন্ড উইমেন্স কলেজ। সরকার যখন কলেজ দুটিকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করে তখন সৈয়দ আবুল হোসেন মন্ত্রী ছিলেন না; কলেজ দুটির সামগ্রিক অবকাঠামো, অবয়ব, শিক্ষার মান ও অনবদ্য পরিবেশ বিবেচনায় নীতিমালার আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত করা হয়েছে। কাজ করতে হলে মন্ত্রী হওয়া যে অত্যাবশ্যক নয় তার জলন্ত প্রমাণ সৈয়দ আবুল হোসেন। তিনি মন্ত্রীত্ব হতে পদত্যাগ করার পরও দেশ ও জাতির শিক্ষা ব্যবস্থায় অনবদ্য অবদান রেখে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, ব্যক্তি আবুল হোসেন মন্ত্রী আবুল হোসেনের চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য, সামর্থ্যবান ও কর্মোদ্যম।
শুধু শিক্ষা কেন, প্রশাসনিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সৈয়দ আবুল হোসেন আপন আলোয় চিরন্তন।মন্ত্রীত্ব হতে পদত্যাগ করার পর তার জনকল্যাণমূলক কাজের গতি কোনভাবে কমেনি। বইটি প্রকাশকালে ডাসার ছিল একটি ইউনিয়ন। সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রচেষ্টায় ডাসার এখন পূর্ণাঙ্গ থানা। গত ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ২ মার্চ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবগঠিত ডাসার থানার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করে সৈয়দ আবুল হোসেনের অনবদ্য কৃতিত্বের স্বীকৃতি প্রদান করেন।
সৈয়দ আবুল হোসেনের নির্বাচনী এলাকা মাদারীপুর-৩ কালকিনি উপজেলা এবং মাদারীপুর সদর উপজেলার ৫টি থানা যথা : মোস্তফাপুর, খোয়াজপুর, কেন্দুয়া, ঘটমাঝি এবং ঝাউদি ইউনিয়ন নিয়ে বিস্তৃত। তাঁর নির্বাচনী এলাকার আইনÑশৃঙ্খলা, যোগাযোগ অবকাঠামো, অধিবাসীগণের জীবনযাত্রার মান এবং মৌলিক চাহিদার প্রাচুর্য্য দেশের অনুরূপ অন্যান্য এলাকার চেয়ে যে কোন বিবেচনায় সন্তোষজনক। সৈয়দ আবুল হোসেনের বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও নিঃস্বার্থ জনকল্যাণমূলক কাজের ফলে তার পুরো নির্বাচনী এলাকা আধুনিকতার মহারথে সাবলীল গতিতে এগিয়ে। নিরাপত্তা ও শান্তি বিবেচনায় তার নির্বাচনী এলাকা আদর্শস্থানীয় হিসেবে বিবেচিত।

১. আমার নেতা, তুলনাহীন মর্যাদা, ইকবাল হোসেন।
২. ড. আখতারুল কবীর, তার চেম্বারে এক সাক্ষাৎকারে; তারিখ- ৩/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ।
৩. পঞ্চম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা আহমাদ উল্লাহ, পৃষ্ঠা- ২১৯।
৪. মাঠ জরিপে প্রাপ্ত তথ্য।
৫. সিরাজ উদ্দীন আহমেদ-এর মাদারীপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে সৈয়দ আবুল হোসেনের
লেখা ভূমিকায়।
৬. সৈয়দ আবুল হোসেন: আধুনিক কালকিনির বিনির্মাতা অধ্যক্ষ খালেকুজ্জামান, কালকিনি
বিশ্বদ্যিালয় কলেজ।
৭. ফরহাদ হোসেন, সাবেক জেলাপ্রশাসক, মাদারীপুর, তিনিই এ শহিদ মিনারটি ১৯৯১
খ্রিস্টাব্দে উদ্বোধন করেছিলেন।
৮. কালকিনি উপজেলা প্রশাসনের নথি হতে সংগৃহীত।
৯. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা- ৮০ তারুণ্য ও শিক্ষা।
১০. সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, মাদারীপুর জেলার ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৪৫৯।
১১. পঞ্চম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা আহমাদ উল্লাহ, পৃষ্ঠা- ২১৯।
১২. সৈয়দ আবুল হোসেন নিজ এবং কালকিনির যুদ্ধকালীন কমান্ডার ও কমান্ডার কালকিনি
উপজেলা কমান্ড এস্কান্দার শিকদার।
১৩. ড. মো : আবদুল জলিল: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক ইসলামি ইউনিভার্সিটি,
মালেশিয়া; গবেষক ও লেখক।
১৪. পঞ্চম জাতীয় সংসদ সদস্য প্রামাণ্য গ্রন্থ, সম্পাদনা আহমাদ উল্লাহ, পৃষ্ঠা- ২১৯।
১৫. পঞ্চম জাতীয় সংসদ প্রামাণ্য গ্রন্থ, সুচয়ন প্রকাশন, আগস্ট- ১৯৯২, পৃষ্ঠা ২১৯।
১৬. সিরাজ উদ্দীন আহমেদ-এর মাদারীপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থে সৈয়দ আবুল হোসেনের
লেখা ভূমিকায়।

জনতার চোখে সৈয়দ আবুল হোসেন
আমরা জানি, সৈয়দ আবুল হোসেন একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, ব্যাংকার। নিজ হাতে গড়া সাকো ইন্টারন্যাশনাল দেশের পরিধি ছড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিধিতে বিস্তৃত। তিনি রাজনীতিক, এমপি এবং মন্ত্রী। বিত্ত ও চিত্তে আকাশের মতো উদার। খ্যতিমান প্রাবন্ধিক, বিচক্ষণ বিশ্লেষক। বংশে বড়, কর্মে পরিচ্ছন্ন। চৌকষ কাজে, বিনয়ী ব্যবহারে। দর্শনে স্বচ্ছ। যারা সৈয়দ আবুল হোসেনকে কাছ হতে দেখেন তারা তাঁকে এভাবে মূল্যায়ন করেন। যে সকল মানুষ, বিশেষ করে, তাঁর নির্বাচনী এলাকার সাধারণ মানুষ, যাঁরা তাঁকে কাছ হতে দেখার সুযোগ বেশি পাননি সে সকল মানুষের দৃষ্টিতে সৈয়দ আবুল হোসেন কেমন তা জানা প্রয়োজন ছিল। এটি জানার জন্য তাঁর নির্বাচনী এলাকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি গবেষণা জরিপ পরিচালনা করা হয়। এ জরিপে কৃষক, কুলি, মজুর, জেলে, রিক্সাচালক ও ভিক্ষুক হতে শুরু করে শিক্ষক, ছাত্র, পেশাজীবী, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধিগণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। জরিপে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আলোচ্য অধ্যায় চয়িত।
মাদারীপুর জেলা শাখার যুবলীগ নেতা এমদাদুল হক সর্দার। তার কাছে সৈয়দ আবুল হোসেন একজন অসাধারণ নেতা। কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন: সৈয়দ আবুল হোসেন জাতিকে শিক্ষিত করার প্রত্যয়ে অনড়। যে কাজ গত ৫০০ বছরে কালকিনির সব লোক সম্মিলিতভাবে পারেননি, সৈয়দ আবুল হোসেন তা দশ বছরে একাই সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই তিনি আমার কাছে অসাধারণ নেতা। নেতার সব গুণাবলী তাঁর মধ্যে রয়েছে। কালকিনির ইতিহাসে তাঁর মতো দেশপ্রেমিক আর জন্মায়নি। ভবিষ্যতেও জন্মাবে কিনা সন্দেহ।
কালকিনি সার্কিট হাউজের নৈশ প্রহরী উজ্জ্বল। সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম শুনে শ্রদ্ধায় মাথাটা অবনত করে বললেন: তার মতো লোক আমি দেখিনি। তিনি ভোরে উঠে নামাজ পড়েন। মন্ত্রীরা ক্ষমতার দাপট দেখায়, সন্ত্রাসী লালন করে। সৈয়দ আবুল হোসেনকে ক্ষমতার দাপট দেখাতে কখনও দেখিনি। আমাদের মতো সাধারণ লোকের সাথেও তিনি বিনয়ের সাথে কথা বলেন। কেয়ার-টেকার রেজাউল করিমের ভাষায়: সৈয়দ আবুল হোসেনকে আমি কোনোদিন রাগতে দেখিনি, বড় করে কথা বলতেও দেখিনি। আমাদের দিকে তাকিয়ে হেসে হেসে কথা বলেন। গরিব-দুঃখীদের জন্য তাঁর হাত সবসময় অবারিত থাকে। তিনি কালকিনিবাসীর সার্বজনীন গার্ডিয়ান।
লুৎফর রহমান জেলা পর্যায়ের একজন নেতা। সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন: কালকিনির মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর সম্পর্ক নিবিড়। কালকিনির জনগণ তাঁকে কত ভালোবাসে, তা তিনি নিজেও জানেন না। কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেনকে বেশি দিয়েছে নাকি সৈয়দ আবুল হোসেন কালকিনিকে বেশি দিয়েছে? এর উত্তরে লুৎফর সাহেব বললেন: কালকিনিকেই সৈয়দ আবুল হোসেন বেশি দিয়েছেন। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দ হতে কালকিনির জন্য, কালকিনির জনগণের জন্য যে অর্থ তিনি ব্যয় করেছেন তা ব্যবসায় লাগালে তিনি আরও তিনটি সাকো প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। অথচ এ দানের পেছনে তাঁর কোনো রাজনীতিক উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি কোনো দিন এমপি হতে চাননি। কালকিনির আপামর জনগণ অনশন করে তাকে এমপি ইলেকশনে রাজি করিয়েছে।
একজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী। নাম প্রকাশ না-করে বললেন: আমি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার বডিগার্ড ছিলাম। এখন ক্যান্সারে আক্রান্ত। আমার চিকিৎসার জন্য সৈয়দ আবুল হোসেন আমাকে নগদ এক লক্ষ টাকা দিয়েছেন। এ কথা আমি ভুলব না। আমি হয়ত বাঁচব না কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেন আমার মৃত্যুকে তাঁর দয়া দিয়ে জীবনের আলোয় ভরিয়ে দিয়েছেন। শুধু আমাকে নয়, অনেক লোককে তিনি এমন সাহায্য করেছেন। তিনি তাঁর দানকে গোপন রাখতে চান। এমনভাবে দান করেন যেন, দাতা আর গ্রহীতা ছাড়া আর কেউ জানতে না-পারেন।
শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজ এন্ড একাডেমি-এর বাবুর্চি লুৎফর রহমান হাওলাদার। তার কাছে প্রশ্ন ছিল: সৈয়দ আবুল হোসেন কেমন মানুষ? আবেগাপ্লুুত কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন মানুষ নন, ফেরেশতা। কলেজ পরিদর্শনে আসলে আমাদের রান্নাঘরে চলে আসেন। মাথায় হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো!’ শিক্ষার জন্য তিনি নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকেন।
খুলনা নিবাসী শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজ এন্ড একাডেমির পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শিবপদ মণ্ডলের মতে, সৈয়দ আবুল হোসেন একজন আদর্শ মানুষ। তাঁর চরিত্রে যে গুণাবলী রয়েছে তার সহস্রাংশও কারও মধ্যে প্রকাশ পেলে তিনি মহামানব হয়ে উঠতে পারেন। নারী শিক্ষার প্রতি সৈয়দ আবুল হোসেনের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, আমি চাই না নারীরা শুধু পাশ করুক; আমি চাই পাশের সাথে সাথে তারা কিছু জেনে পাশ করুক। তাদের পাশ যেন শুধু অলংকার না হয়, পাশ যেন তাদের সত্যিকার ক্ষমতায়নে সহায়ক এবং স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
মো. মোস্তাফিজুর রহমান শেখ হাসিনা একাডেমি এন্ড উইমেন্স কলেজের ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষক। বাড়ি কুষ্টিয়া। তাঁর মতে সৈয়দ আবুল হোসেন শিক্ষার আলো, বিশেষ করে, নারী শিক্ষাকে প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে দেয়ার জন্য অজপাড়া গায়ে মহিলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ কলেজের ছাত্রছাত্রীদের হোস্টেলে থাকা-খাওয়া হতে, এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে যাবতীয় ব্যয় তিনি বহন করেন। এটি আমাকে বিমোহিত করেছে। আমি নিজ দেশ ছেড়ে এখানে পড়ে আছি। তাঁর মহান কাজের সহযোগী হতে পারায় নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। এমন লোকের সহযোগী হতে পারা যে কোনো মানুষের জন্য ভাগ্যের ব্যাপার।
সৈয়দ আলমগীর কালকিনি উপজেলা ভূমি অফিসের এমএলএসএস। তাঁকে সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই তিনি শ্রদ্ধায় নুইয়ে পড়েন। জোরালো কণ্ঠে বললেন, ‘আমি একজন জঘন্য খারাপ লোক ছিলাম। সৈয়দ আবুল হোসেন আমাকে মানুষ করেছেন। তাঁর বদান্যতায় আমার এক ছেলে এখন গ্র্যাজুয়েট। সৈয়দ আবুল হোসেন কালকিনিতে জন্ম না নিলে আমার ছেলের মতো হাজার হাজার ছেলে উচ্চ শিক্ষা হতে বঞ্চিত হত। আমি প্রত্যহ পাঁচ বার নামাজ পড়ে তাঁকে দোয়া করি।’
মীরা বাড়ির আনিসুর রহমানের বয়স পঁয়ষট্টি। কোনো কাজ করতে পারেন না। লুঙ্গি পরে রাস্তার পাশে চায়ের দোকানের সামনে একটি টুলে বসে বিড়ি টানছিলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো: সৈয়দ আবুল হোসেনকে আপনার কেমন লাগে? তিনি বললেন, ভালো লাগে। কেন? এ প্রশ্নের উত্তরে আনিসুর রহমান বললেন, তিনি ভালো লোক তাই ভাল লাগে। তিনি এত ভালো যে কেন ভালো লাগে বলতে পারব না। তিনি আমাদের চামড়ার মতো, আমাদের মাংশের মতো, আমাদের রক্তের মতো, চোখের মতো। এ রাস্তা, এ দোকান, এ কলেজ সব আবুল হোসেনের অবদান। তাঁকে বাদ দিলে কালকিনি আমার মতো অথর্ব এক বুড়ো। আল্লাহ্ তাঁকে আরও বড় করুক।
আবু সাইদ মো. দিদারুল আলম ডি কে সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমি এন্ড কলেজের শিক্ষক। ডাক নাম মুরাদ। তিনি বললেন: শিক্ষকের প্রতি সৈয়দ আবুল হোসেনের শ্রদ্ধা অপরিসীম। ঢাকায় তাঁর সাথে দেখা করতে গেলে যতই ব্যস্ত থাকুন, সব ব্যস্ততা ছেড়ে আমাদের সময় দেন। শিক্ষকদের প্রতি তাঁর সম্মান, শ্রদ্ধা ও মমত্ব প্রবাদপ্রতীম। তিনি বলেন: শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, শিক্ষার মেরুদণ্ড শিক্ষক। তাই শিক্ষাকে কার্যকরভাবে পরিব্যাপ্ত করতে হলে শিক্ষককের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় জাতি মূর্খ হয়ে থাকবে। শিক্ষকের প্রতি সৈয়দ আবুল হোসেনের এমন শ্রদ্ধা আমাকে অভিভূত করে, শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে। শিক্ষক নিয়োগে তিনি মেধা ও যোগ্যতা ছাড়া আর কিছু চিন্তা করেন না।
আলমগীর সর্দারের বাড়ি পাঙ্গাসিয়া। তিনি একজন দিনমজুর। কথায় কথায় এক ফাঁকে বলে ওঠেন: সৈয়দ আবুল হোসেন ছাড়া আর কেউ এখানে এমপি হবে না। তিনি যদি মারা যান তার ছেলেকে আমারা এম পি বানাব। তার কোনো ছেলে নেই বলতে আলমগীর সর্দার বললেন: ছেলেমেয়ে একই কথা। তার বংশের কলাগাছ দাঁড়ালেও এমপি হবে। তিনি কি আপনার কোনো উপকার করেছেন? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, দেশের উপকার করাই আমার উপকার। তিনি না থাকলে আমি কি এ রাস্তা পেতাম, আপনি কি গাড়ি চড়ে ঢাকা হতে আসতে পারতেন? আমি দিনমজুর কিন্তু আমার মেয়ে কলেজে পড়ে। তিনি আমার মেয়ের শিক্ষা সংক্রান্ত সব খরচ বহন করছেন।
এনায়েতনগর ইউনিয়নের মাঝেরকান্দির মনির হোসেন একজন সাধারণ লোক। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো: আপনি সৈয়দ আবুল হোসেনকে চেনেন? আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘ঐ দেখুন আকাশ। ওটাকে চেনেন? তিনি আমাদের জীবনের আকাশ, আমাদের বাতাস। তাকে ছাড়া আমরা কিছু বুঝি না।’ মনির হোসেনের কাছে এমন উপমা অবিশ্বাস্য। আসলেই কালকিনির মানুষের কাছে সৈয়দ আবুল হোসেন আকাশের মতো বিশাল।
দেলোয়ার হোসেন কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। বাড়ি ঝিনাইদহ। তিনি বললেন, কোনো বেসরকারি কলেজে তদ্বির ছাড়া, ঘুষ ছাড়া চাকুরি হয় এটা আমি বিশ্বাস করতাম না। ঝিনাইদহ হতে এসে এখানে কোনো তদ্বির ছাড়া শুধু মেধার জোরে চাকুরি পেলাম। এটি এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। সৈয়দ আবুল হোসেন আমার ধারণা পাল্টে দিয়েছেন। তেমনি পাল্টিয়ে দিয়েছেন আমার মতো অনেকের সনাতন ধারণা। তাঁর মতো সৎ, নির্লোভ ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি বাংলাদেশে আর আছে কিনা জানি না।
সবুজ হোসেন একজন গ্র্যাজুয়েট। গরিব ঘরের ছেলে। সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে তিনি বললেন, ‘এ লোকটি আমাদের ত্রাণকর্তা। তিনি জন্মগ্রহণ না-করলে আমি গ্র্যাজুয়েট হতে পারতাম না। তিনি কলেজ প্রতিষ্ঠা না করলে আমি পিতা-মাতার মতো আমিও মূর্খ থেকে যেতাম। আমি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছিলাম। লিখিত পরীক্ষায় পাশ করেছি। মন্ত্রী মহোদয়কে বলবেন, আমার জন্য যেন একটু দোয়া করেন। আমি যেন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতার চাকুরিটা পেয়ে যাই। বলবেন তো!
আবুল বাশার, বাড়ি রাজদি, পেশা শিক্ষকতা। আবুল হোসেনের সাথে তার কোনোদিন কথা হয়নি। দূর হতে দেখেছেন। তবু তিনি সৈয়দ আবুল হোসেনের ভক্ত। তিনি বললেন, বর্তমান যুগে তাঁর মতো মানুষ হয় না। সৈয়দ আবুল হোসেনের হিংসা নেই, প্রতিহিংসা নেই। শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে চিরদিনের মত অবসান ঘটান শত্রুতার। রমজানপুরে আওয়ামী লীগ- বিএনপি-এর মধ্যে একবার তুমুল সংঘর্ষ হয়েছিল। আওয়ামী লীগের সদস্যরা সৈয়দ আবুল হোসেনকে বিএনপি-এর লোকদের উচিত শাস্তি দেয়ার অনুরোধ করেন। সৈয়দ আবুল হোসেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বললেন, ‘এমনভাবে মীমাংসা করবেন যাতে বিএনপি-দলীয় লোকজন নিজেদের বঞ্চিত না ভাবেন। আমার দলের লোক বঞ্চিত ভাবলে আমার আপত্তি নেই। কারণ তারা ক্ষমতাসীন। বিএনপি-র লোকজন ন্যায় বিচার হতে যেন বঞ্চিত না-হয়। আইন অনুযায়ী কাজ করবেন।’
পাঙ্গাসিয়ার জাহিদুর রহমান সৈয়দ আবুল হোসেনের একজন ভক্ত। সৈয়দ আবুল হোসেনের বক্তব্য তাঁকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তার ভাষণ খুব সুন্দও, প্রতিটি কথা হৃদয় কেড়ে নেয়ার মতো। বক্তব্যে সৈয়দ আবুল হোসেন নিন্দুকদের উদ্দেশে একটি কথা প্রায় বলে থাকেন। সেটি হলো: নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো, যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো। তিনি শুধু বক্তব্যে নয়, কাজের মধ্য দিয়েও এটি প্রমাণ করেন। যারা এক সময় তাঁর ঘোর বিরোধী ছিল, তারা এখন তাঁর বন্ধু। সৈয়দ আবুল হোসেন ভালোবাসা দিয়ে সকল শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে নিয়েছেন।
পাঙ্গাসিয়ার সেকান্দর আলী উকিল একজন নিরীহ মানুষ। বয়স পঁচাত্তর। ভালোভাবে কথা বলতে পারেন না। অস্পষ্ট কণ্ঠে বললেন: সৈয়দ আবুল হোসেন গরিবের বন্ধু। জনারদন্দির মোশাররফ হোসেন হাওলাদার-এর বক্তব্য অবাক করার মতো, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন এত বড় মানের মানুষ যে, তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করার মতো জ্ঞান আমার নেই। কালকিনির তিন লক্ষ লোক সম্পর্কে বলা সম্ভব হতে পারে কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে নয়। কারণ তিনি কালকিনির তিন লক্ষ লোকের অভিভাবক।’ তিনি কালকিনিতে জন্মগ্রহণ না-করলে কালকিনির বর্তমান উন্নয়ন আরও একশ বছরেও হতো না। তিনি আমাদের কমপক্ষে একশ বছর এগিয়ে দিয়েছেন।
দক্ষিণ রাজর্দির আবদুল মালেক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সৈয়দ আবুল হোসেনকে তিনি শান্তির পায়রা অভিহিত করে বললেন, ‘কালকিনি এক সময় ছিল সন্ত্রাসী এলাকা। সর্বহারাদের ভয়ে কেউ বের হতে পারত না। দিন-দুপুরে খুন হতো। এখন কালকিনি সন্ত্রাসবিহীন এলাকা। চাঁদাবাজি নেই, টেন্ডারবাজি নেই, নেই মারামারি ও সর্বহারার উৎপাত। এখানে সব দলের নেতা-কর্মীরা সৌহার্দ্যময় পরিবেশে পরম সম্প্রীতিতে বাস করেন। গত দশ বছরের আইন শৃঙ্খলার খতিয়ান দেখলে সহজে বোঝা যাবে, এ উপজেলার অপরাধ কত কমেছে।’ এগুলো করার জন্য সৈয়দ আবুল হোসেন কাউকে হাজতে দেননি। শুধু ভালোবাসা দিয়েছেন।
তিনি মুক্তিযোদ্ধা। আওয়ামী লীগ সমর্থক নন, তারপরও আবুল হোসেনকে শ্রদ্ধা করেন। নাম প্রকাশ না-করার শর্তে বললেন, আবুল হোসেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবদান অসামান্য। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রভূত সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। একদিন রাজাকারদের সহায়তায় পাক সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। মু্িক্তযোদ্ধাদের খবর দেয়ার জন্য তার উপর প্রচণ্ড অত্যাচার চালানো হয়। কিন্তু তিনি কোনো কিছু ফাঁস করেননি। তাদের অত্যাচারে সৈয়দ আবুল হোসেনের বাম হাত ভেঙে যায়। এ চিহ্ন তাঁর হাতে এখনও স্পষ্ট। এজন্য তিনি সবসময় ফুল-শার্ট পরেন। এ বিবেচনায় তিনি একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাও বটে।
মো. সাইদুর রহমানের বাড়ি ভবানীপুর। ইজি ওয়াকারের ড্রাইভার। তার তিন মেয়ে স্কুলে পড়েন, ছেলে কলেজে। কীভাবে সম্ভব? তার সহজ উত্তর, কালকিনিতে সৈয়দ আবুল হোসেনের এলাকার লোকের জন্য এটি খুবই সহজ। তিনি শিক্ষার সকল উপায় এবং উপকরণকে আমাদের কাছে সহজলভ্য করে দিয়েছেন। আজম একজন মাছ বিক্রেতা। তিনি বললেন, ‘আমি কোনোদিন তাঁকে দেখি নি তবে যেখানে যাই সেখানে তাঁকে পাই- রাস্তায়, শিক্ষায়, রাজনীতিতে, অফিসে, আদালতে, কথায় এবং সবখানে।’ তার কথা শেষ হবার সাথে সাথে বাঁশগাড়িয়ার জেলে তাপস জলদাস বললেন, ‘তিনি ঈশ্বরের মতো সর্বত্র বিরাজমান। তাঁর ছায়া সবাতে সমভাবে পরিব্যাপ্ত। আমাদের কাছে তিনি দেবতা। ঈশ্বর তার মঙ্গল করুন।’
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি রফিক কোতোয়াল বলেন, তিনি অত্যন্ত পাংচুয়াল। প্রতিদিন সকাল নয়টার পূর্বে মন্ত্রণালয়ে আসেন। যেখানে যখন যাবার সময় নির্ধারিত থাকে, ঠিক সে সময় হাজির হন। তিনি ব্যবহারে বিনয়ী, আচরণে অমায়িক। কাজের প্রতি একাগ্রতা, উন্নয়নের কৌশল প্রণয়নে বিচক্ষণতা আমাকে আকৃষ্ট করে। আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং উদার সহায়তার যে প্রমাণ আমি পেয়েছি তা স্বচক্ষে না-দেখলে বিশ্বাস করার মতো নয়। তিনি নেত্রী আর দলের প্রতি এত অনুগত যে, নেত্রী বললে হাসতে হাসতে জীবনটা পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারেন। রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর মতো উদার ও সহনশীল নেতা আমাদের এখন বড় প্রয়োজন।
সিডি খান ইউনিয়নের নুরুল ইসলাম ফুটপাথে বসে আতর বিক্রি করছিলেন। তিনি বললেন, ‘আবুল হোসেন ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য কিছুই করেননি। তবে আমার ছেলেমেয়ে, আমার আত্মীয়-স্বজন যারা লেখাপড়া করার কথা কোনো দিন ভাবেনি, তারা এখন পান্তাভাত খেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। আমার ছেলেও তাঁর কলেজ হতে ডিগ্রি পাশ করেছে। আমার ছেলে-মেয়েরা তার গড়া রাস্তায় হাঁটে, তার গড়া স্কুলে পড়ে। এর চেয়ে বেশি কী করবেন তিনি!
মাদারীপুর জেলার প্রাক্তন জেলাপ্রশসক আবদু সাত্তার। আবুল হোসেন সম্পর্কে তার মন্তব্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। তিনি বললেন, ‘যে বয়সে বাঙালিরা আকামে অর্থ ব্যয় করে, কুপথে খরচ করে, ফুর্তিতে মেতে থাকে, বিদেশ গিয়ে টাকা উড়ায়, সে বয়সে সৈয়দ আবুল হোসেনের মতো বিপুল অর্থের মালিক শহর-ছেড়ে প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায় ছুটে এসেছেন দুর্গতদের সেবায়; এ আমার কাছে অসাধারণ মনে হয়েছে। তিনি বিয়ের আগে হজ করেছেন। হজ অনেকে করেন। আমি মনে করি তিনি নিজের বিবেককে আরও সচেতন ও সতর্ক রাখার জন্য অল্প বয়সে হজ করেছেন। আমি স্কুল কলেজে ছাত্রদের যে পুরস্কার দিতাম তা ক্রয় করে দিতেন আবুল হোসেন। বক্তৃতায় বলতাম, আমার দেয়া জিনিসগুলো কিনে দিয়েছেন সৈয়দ আবুল হোসেন। আমার আনন্দ আমি একজন ভালো লোকের জিনিস আপনাদের হাতে তুলে দিতে পারছি।’
টুঙ্গীপাড়ার হাজি মো. চান মিয়াকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘সৈয়দ আবুল হোসেনের একটি ভালো দিক বলবেন? তিনি বললেন: তার ভালো দিক এত বেশি যে, আমি তার ভালো দিকের কথা এত অল্প সময়ে বলতে পারব না। তবে তার কোনো খারাপ দিক নেই, এটি নির্দ্বিধায় বলতে পারি। তার ভালো দিক এত বেশি যে, তা বলতে অনেক সময় লাগবে। অনেক দিন। এর চেয়ে এক কথায় বলি, তিনি সর্বাঙ্গীন সুন্দর মনের একজন আদর্শ মানুষ।’
জরিপের আরও অনেকের কথা লেখা যেত। কিন্তু পরিসর বড় করার সুযোগ নেই। বাকি যাদের কথা পৃথকভাবে লেখা হলো না তাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে জরিপ দল সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে নিম্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে: সৈয়দ আবুল হোসেন ঝড়ের আশ্রয়, বিপদের বন্ধু। তিনি ছাতার মতো সবার মাথার উপর স্থির অপলক। তিনি রোদের আশ্রয়। যার ছাতা যত বড় সে ছাতায় তত বেশি লোক আশ্রয় নিতে পারে। বিশাল ছাতা বহন করার যোগ্যতা যার আছে, সেই বিশাল ছাতা বহন করতে পারে। আবুল হোসেনের বিশাল ছাতা বহন করার ক্ষমতা রয়েছে। সৈয়দ আবুল হোসেনের এ ছাতা শুধু বিশাল নয়, মহাবিশাল। তাঁর কাছে সবাই সমান। শিকারমঙ্গলে জামায়াতের লোক বেশি। তারা সবসময় সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরোধিতায় অবতীর্ণ হন। নির্বাচনে জেতার পর তিনি প্রথমে শিকারমঙ্গলের উন্নয়নে হাত দিয়েছেন। এত বড় বিশাল মনের অধিকারী ব্যক্তিকে কী বলে সম্বোধন করা যায় তা আমাদের জানা নেই। এক কথায় বলতে পারি তিনি একজন মহামানব।

সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনের
মহামানবীয় কয়েকটি ঘটনা
উইলিয়াম ওয়ার্ডস ওয়ার্থ-এর একটি বিখ্যাত ও স্বতঃসিদ্ধ উক্তি- ঞযব নবংঃ ঢ়ড়ৎঃরড়হ ড়ভ ধ মড়ড়ফ সধহ’ং ষরভব, ঐরং হধসবষবংং ধহফ ৎবসবসনবৎবফ ধপঃং ড়ভ শরহফহবংং ধহফ ড়ভ ষড়াব. সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনে মানুষকে দয়া ও ভালোবাসা দেখানোর এমন অনেক ঘটনা আছে যা কেউ জানেন না, দেখেননি। এরূপ ঘটনা অসংখ্য, অগণিত। সুতরাং ওয়ার্ডস ওয়ার্থের ভাষায় বলা যায়Ñ তার পুরো জীবনের সিংহভাগই শ্রেষ্ঠ। প্রত্যেক মহামানবের জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা সাধারণ মানুষের জীবনে ঘটার অবকাশ হয় না। এ সকল ঘটনা একদিকে শিক্ষণীয় এবং অন্যদিকে জনকল্যাণমূলক। অধিকন্তু, এ সব দুর্লভ ঘটনা পৃথিবীর মানুষকে চিন্তাচেতনা ও মননশীলতায় সমৃদ্ধ করে মানুষের মানবীয় গুণাবলীর লালনে সহায়তা করে। সৈয়দ আবুল হোসেনের জীবনেও এমন কিছু ঘটনা আছে যা শুধু বিস্ময়কর নয়, তারও অধিক। এ সকল ঘটনার কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হলো :

১.
আবদুর রশিদ কালকিনিতে একটা ছোট্ট টং দোকানের মালিক। তিনি সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেবের কাছে একটি চিঠি লিখলেন। চিঠির ভাষা যা মনে আছে বলছি- ‘আপনার কর্মী মজিদ (ছদ্মনাম) আমার দোকান থেকে নগদ টাকা এবং বাকিতে কাপড়-চোপড় কিনিয়া গরিবের মধ্যে বিলি করিয়াছে। বলেছিল টাকা সাহেবের কাছ থেকে আনিয়া পরিশোধ করিবে। অনেকদিন হইয়া গেল আজ পর্যন্ত টাকা পরিশোধ করে নাই। আপনি কালকিনি আসিলে আপনার সামনে দাঁড়াইয়া টাকা চাহিব। না দিলে পেপারে লেখালেখি করিব। মোট পঞ্চাশ হাজার টাকা।’ মজিদ ছিলেন আবুল হোসেন সাহেবের একজন কর্মী। চিঠিটা হাতে নিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন আমাকে বললেন, ‘রশিদ আর মজিদ দু’জনেই সাংঘাতিক দুষ্ট। ষড়যন্ত্র করে কাজটা করেছে, যাতে আমি টাকাটা দেই। দিলে উভয়ে ভাগ করে নেবে। তাদের চালাকি বুঝতে পারলেও আমি টাকা দিয়ে দিয়েছি। তবে তারা বুঝতে পারেনি, তাদের চালাকি আমি ধরে ফেলেছি। আমিও বুঝতে দেইনি। লজ্জা দিলে কী ভালো হতো! নেতা হলে অনেক সময় সমর্থকদের সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখতে হয়। মজিদের দোষ আছে, তবে গুণও তো আছে! কী বলেন মাস্টার সাহেব?’১

২.
জনসভার বক্তব্য নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। সদর উদ্দিন (ছদ্মনাম) সৈয়দ আবুল হোসেনকে বললেন: জনসভায় আপনি এ কথাটা বলেছেন।
সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন: আমি বলিনি।
উপস্থিত তিনজন লোক সদর উদ্দিনের পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন। প্রত্যেকে উপজেলা পর্যায়ে মোটামুটি গণ্যমান্য ব্যক্তি। আবুল হোসেন কিছুক্ষণ চুপ থেকে তাদের তিনজনের কাছে জানতে চাইলেন: সত্যি কি আমি এমন কথা বলেছি?
তিনজন সমস্বরে বললেন: জি।
সৈয়দ আবুল হোসেন হেসে বললেন, ‘বক্তৃতায় নিজের অজান্তে হয়ত এ কথাটি আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। আমার কিন্তু মনে পড়ছে না। আমি একজন, আপনারা তিনজন। একজনের স্মরণশক্তি তিনজনের চেয়ে কম। যদি অমন কথা বলে থাকি তো অজান্তে বলে ফেলেছি। মনে কিছু নেবেন না। আবারও বলছি অমন কথা আমার মুখ দিয়ে বের হবার নয়।’
প্রকৃতপক্ষে সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেব অমন কথা বলেননি। ঐ জনসভায় আমি আবদুল আজিজ মাস্টার নিজে উপস্থিত ছিলাম। আমি শুনিনি তারা কীভাবে শুনলেন? পরে সৈয়দ আবুল হোসেন আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, তিনি অমন মন্তব্য করেছিলেন কিনা। আমি বলেছিলাম, ‘কখনও না।’ সৈয়দ সাহেব বলেছিলেন, ‘আমিও জানতাম তবু তাদের ছোট করতে ইচ্ছা করছিল না। আমি নিজে ছোট হয়ে গেলাম। এটি আমাকে আরও সতর্ক করল। ছোট না-হলে আমি বড় হবার কৌশল রপ্ত করব কীভাবে বলুন তো মাস্টার সাহেব!’২

৩.
খোয়াজপুরে আবুল হোসেন কলেজ প্রতিষ্ঠা হলো। প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আবুল হোসেন। কলেজের প্রথম ব্যাচের দুই জন ছাত্র সবাইকে অবাক করে দিয়ে জাতীয় মেধা তালিকায় প্রথম ও চতুর্থ স্থান দখল করে নিল। কলেজ এখনও অনুমোদন পায়নি। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনসহ যাবতীয় খরচ সৈয়দ আবুল হোসেন একাই বহন করে চলেছেন। বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত নয়। গভর্নিং বডির সদস্যরা অধ্যক্ষ হিসেবে আমাকে বিষয়টি সৈয়দ আবুল হোসেনকে অবগত করানোর পরামর্শ দেন। আমি বলেছিলাম, ‘আর কত চাইব, সব কিছু তো তিনি দিচ্ছেন, লজ্জা করে।’ প্রয়োজন লজ্জা মানে না। একদিন সাকো অফিসে গিয়ে বললাম, ‘কলেজের জন্য সায়েন্সের যন্ত্রপাতি লাগবে।’ একটু থেমে আবার বললাম, ‘অবশ্য পরে হলেও চলবে। তাড়া নেই।’ আমার কথা শেষ হতে না-হতে সৈয়দ আবুল হোসেন বিনয় মিশ্রিত কণ্ঠে বললেন: ‘পরে কেন, এক্ষুনি নয় কেন। আগামীকাল কখনও আসে না স্যার। কত টাকা লাগবে নিয়ে যান। যন্ত্রপাতির জন্য আমার ছেলে-মেয়েরা পড়তে পারবে না, তা হয় না।’৩

৪.
সৈয়দ আবুল হোসেনের একজন ভক্ত, নাম ধরুন আফজাল (ছদ্মনাম)। আর একজন শত্রু। তিনি ইউপি চেয়ারম্যান, নাম ধরুন হিরণ (ছদ্মনাম)। আফজাল জানতে পারল সৈয়দ আবুল হোসেন হিরণকে তার চেয়ে বেশি সাহায্য করেন। ক্ষুব্ধ আফজাল একদিন সৈয়দ আবুল হোসেনকে বললেন, ‘হিরণ সবখানে আপনার বদনাম করে বেড়ায়। সারাক্ষণ আপনার ক্ষতির চিন্তা করে। কীভাবে আপনার বিপদ হয় সে চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে। আপনি তাকে একের পর এক সাহায্য করে যাচ্ছেন। শুধু তাকে নয়, যারা আপনার শত্রু, তাদের প্রত্যেককে আপনি একের পর এক সাহায্য করে যাচ্ছেন।
সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, ‘আমি তার উপকার করছি।’ আফজাল বললেন, ‘আমি তো সবসময় আপনার পক্ষে কথা বলি। আপনার ভালো চাই। আপনি আমাকে অত সাহায্য করেন না।’ সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন: তুমি আমার উপকার করেছ, আমিও তোমার উপকার করেছি। এটি বিনিময়। হিরণ আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, সে আমার শত্রু। তবু আমি তাকে সাহায্য করছি। এটি বিনিময় নয়, উপকার। তোমারটা বাণিজ্য আর তারটা দান। শত্রুর উপকার করে আমি তাকে আমার বন্ধু বানিয়ে নিতে চাই।
কিছুদিন পর আফজাল অবাক হয়ে দেখলেন হিরণ চেয়ারম্যান সৈয়দ আবুল হোসেনের ভক্ত হয়ে গেছে। আরও কিছুদিন অতিবাহিত হবার পর আফজাল হতবাক। কালকিনির যে সকল লোক সৈয়দ আবুল হোসেনকে বন্যায় সাহায্য দিতে বাধা দিয়েছিল এবং কালকিনিতে কলেজ প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছিল তারাও সৈয়দ আবুল হোসেনের পরম ভক্ত হয়ে গেছে।৪

৫.
রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন কালকিনি আসবেন। সৈয়দ আবুল হোসেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। মন্ত্রী মহোদয় কালকিনি সার্কিট হাউজে। একজন লোক অনেকদিন হতে তার সাথে দেখা করতে চাইছিলেন। পারছিলেন না। ঢাকা যাবার সামর্থ্য তার নেই। আজ যেভাবে হোক দেখা করবেই। কিন্তু ভেতরে আসতে পারছিল না। হঠাৎ আবুল হোসেনের চোখ যায় গেইটের দিকে। দেখামাত্র ভিড় ঠেলে ধীরপদে নিচে নেমে সোজা গেইটের কাছে চলে যান। লোকটির হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে আসেন। সে ছিল একজন বুড়ো ভিক্ষুক। নাম কানা জলিল। সৈয়দ আবুল হোসেন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কানা জলিল বলল: আমাকে একশ টাকা দেন। সৈয়দ আবুল হোসেন তাকে একশ টাকা নয়, এক হাজার টাকা দিয়েছিলেন।৫

৬.
জমকালো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কঠোর নিরাপত্তা। প্রধানমন্ত্রী আসার সময় হয়ে গেছে। অনুষ্ঠানে সৈয়দ আবুল হোসেনও এসেছেন। প্রবীণ এক লোক সৈয়দ আবুল হোসেনের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘আবুল হোসেন, তোমার ব্লেজারটা ভারী সুন্দর। প্রবীণ লোকটির কথা শেষ হতে-না-হতে সৈয়দ আবুল হোসেন নিজের শরীর হতে ব্লেজারটা খুলে প্রবীণ লোকটার গায়ে চড়িয়ে দিলেন। জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আপনাদের জন্যই আমার ব্লেজার এত সুন্দর হয়েছে। আপনারাই আমার ব্লেজারকে সুন্দর করেছেন। আপনাদের স্বীকৃতিই আমার গৌরব। আমি আলো আপনারা সলতে। আপনারা জ্বলেন বলেই আমি আলোকিত। আপনাদের ঋণ শোধ আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনাদের আলো দিয়ে অন্যকে আলোকিত করতে পারলে ঋণভার হয়ত কিছুটা শোধ হবে।’৬

৭.
২০০১ খ্রিস্টাব্দ। সৈয়দ আবুল হোসেন গাড়িতে। শেরাটনের সামনে সিগন্যাল পেয়ে গাড়ি থেমে যায়। একটা লোক খোঁড়াতে খোঁড়াতে গাড়ির কাছে আসে। তার হাতে কিছু বই, কিছু ম্যাগাজিন। সৈয়দ আবুল হোসেন জানালা নামিয়ে খোঁড়া লোকটার হাতে দশ হাজার টাকা দিলেন। ব্যাপার কী জানতে চাইলে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছিলেন: কিছু দিন আগে এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সিগন্যাল পেয়ে ড্রাইভার গাড়ি থামায়। ঐ লোকটির কাছ হতে একটা ম্যাগাজিন নিই। বাড়ি কোথায় জিজ্ঞাসা করলে জানায় মাদারীপুর। লোকটি খোঁড়া। তবু ভিক্ষা না-করে অনেক কষ্টে হেঁটে হেঁটে বই আর ম্যাগাজিন বিক্রি করছে। আমার ভালো লাগল। বসে বসে এ ব্যবসা করলে কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে সে ছয়-সাত হাজার টাকার প্রয়োজন বলে জানায়। আজ দিয়ে দিলাম। বসে বসে ব্যবসা করুক। অত কষ্ট করে হাঁটতে হবে না।৭

৮.
অজয় দাশগুপ্ত। নামকরা সাংবাদিক। কে না চেনে তাকে। তার আরও একটি পরিচয় আছে। তিনি সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে গৈলা স্কুলে একই সাথে পড়েছিলেন। বন্ধু অজয় দাশগুপ্তের ছেলে স্কলারশিপ নিয় আমেরিকা যাবে। আমেরিকা যেতে হলে পর্যাপ্ত ব্যাংক ব্যালেন্স দেখাতে হয়। এত টাকার ব্যাংক ব্যালেন্স দেখানো অজয় দাশগুপ্তের পক্ষে সে মুহূর্তে সম্ভব হচ্ছিল না। এখন উপায়! ঘটনার আগাগোড়া জানতে পেরে সৈয়দ আবুল হোসেন অজয় দাশগুপ্তকে ডেকে নিয়ে বললেন: টাকার জন্য ছেলের স্কলারশিপ বাতিল হতে পারে না। সৈয়দ আবুল হোসেন অজয় দাশগুপ্তের ছেলের নামে পঞ্চাশ লক্ষ টাকার একটা একাউন্ট করে চেক-বহিসহ অন্যান্য কাগজপত্র অজয় দাশগুপ্তের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সৈয়দ আবুল হোসেন এরূপ মহানুভবতার সাথে এগিয়ে না-আসলে ছেলেকে আমেরিকা পাঠাতে পারতেন কিনা সন্দেহ ছিল।৮

৯.
সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন ঢাকা হতে কালকিনি যাবার সহজ উপায় ছিল লঞ্চ। ঢাকার লঞ্চ বরিশাল হয়ে মাদারীপুর যেত। একদিন সৈয়দ আবুল হোসেন বাড়ি যাবার জন্য লঞ্চে ওঠেন। অসাবধানতাবশত লঞ্চ ভাড়া দিতে ভুলে যান। বাড়িতে ঢোকার পর লঞ্চ ভাড়া না-দেয়ার কথা মনে পড়ে এবং মনে পড়ার সাথে সাথে কাপড়-চোপড় না-খুলে আবার লঞ্চঘাটে চলে যান। যে লঞ্চে এসেছিলেন সেটি ততক্ষণে চলে গেছে। আর একটি লঞ্চে করে তিনি ঢাকা ফেরেন। ঢাকায় এসে ঐ লঞ্চটি খুঁজে নেন। তারপর প্রাপ্য ভাড়া মিটিয়ে পরের লঞ্চে আবার গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।৯
১০.
আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের ছোট ভাই ডা. সৈয়দ এ হাসানের জবানিতে একটি ঘটনা শোনা যাক- ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের অব্যবহিত পরের ঘটনা। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ। চারিদিকে অভাব। পাকিস্তানি বাহিনির অত্যাচারে হিন্দুদের অবস্থা শোচনীয়। আমাদের গ্রামের হিন্দুদের অবস্থাও এর বাইরে নয়। এক হতদরিদ্র হিন্দু ভদ্রলোক আমাদের বাড়ির পাশে বর্ষার জলে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতেন। সন্ধ্যায় বড়শি দিয়ে যেতেন। সকাল-বেলা এসে মাছ তুলতেন। একদিন সকালে মাছ তুলতে এসে হাজি চাচার ভিটির পেঁপে চুরি করতে যান। আওয়াজ পেয়ে লোকজন বেরিয়ে এসে তাকে বেঁধে রাখে। অনেক লোক জড়ো হয়। খবর পেয়ে আমিও যাই। চোর দেখার আগ্রহই ছিল আলাদা। শুনতাম চোর ধরলে মাথার চুল কেটে দেয়া হয়। আমি আরও কয়েকজন বন্ধু চোরের মাথার চুল কেটে দেই। ঐদিন দাদা (সৈয়দ আবুল হোসেন) ঢাকা হতে বাড়ি এসেছিলেন। আমাকে বাড়ি না-পেয়ে জানতে চান আমি কোথায়। খবর পেয়ে বাড়ি যাই। আমার কাছে ঘটনা শুনে দাদা আঁতকে ওঠেন। তাড়াতাড়ি হাজি চাচার উঠোনে এসে চোরের বাঁধন খুলে দিয়ে আমাদের বাড়ি নিয়ে আসেন। আমাকে দিয়ে চোরের পা ধরিয়ে ক্ষমা চাওয়ান। হাতমুখ ধোয়ার ব্যবস্থা করে চোরকে পেট পুরে খাইয়ে দেন। অতঃপর হাতে টাকা দিয়ে নাপিতের দোকান হতে চুল কাটানোর ব্যবস্থা করেন।১০

১. সূত্র কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আবদুল আজিজ মাস্টার।
২. সূত্র কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আবদুল আজিজ মাস্টার।
৩. সূত্র: মো. তমিজ উদ্দিন. সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষক এবং প্রাক্তন অধ্যক্ষ, সৈয়দ
আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুর
৪. সূত্র কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আবদুল আজিজ মাস্টার এবং
মাঠ জরিপ।
৫. সূত্র : কালকিনি সার্কিট হাউজের কেয়ারটেকার রেজাউল করিম।
৬. এমদাদ হাওলাদার, সহসভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি।
৭. ইকবাল হোসেন, ছাত্রনেতা, কালকিনি; তিনি ঐ গাড়িতে সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে
ছিলেন।
৮. তথ্য সূত্র: অজয় দাশগুপ্ত এবং অজিত; তারিখ ১/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ।
৯. ড. এ হাসান, সৈয়দ আবুল হোসেনের ছোট ভাই।
১০. ঐ

সৈয়দ আবুল হোসেন : তেজময় সিংহপুরুষ
অহঙ্কার পতনের মূল
খোয়াজপুর সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের অবকাঠামো সম্পন্ন হয়ে গেছে। অনেক ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগও চূড়ান্ত। কলেজ ক্যাম্পাস মুখরিত। তবু সবার মনে একটা দুঃখ খচ্খচ্ করছে। কলেজ অদ্যাবধি এমপিও-ভুক্ত হয়নি। সৈয়দ আবুল হোসেন চেষ্টা করছেন। শিক্ষামন্ত্রী এ কলেজকে এমপিও-ভুক্ত করার প্রচণ্ড বিরোধী। একদিন পত্রিকায় খবর বের হলো- খোয়াজপুর কলেজ সরকার এমপিও-ভুক্ত করবে না। খবর পড়ে ছাত্রছাত্রী আর অভিভাবকদের মাথায় হাত। শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ হতাশায় নিমজ্জিত। সৈয়দ আবুল হোসেন ত্রিশ লক্ষাধিক টাকা এ কলেজের পেছনে ব্যয় করেছেন। টাকা ব্যয় না হয় পূরণ করা যাবে। ছাত্রছাত্রীদের জীবনের যে অমূল্য সময় নষ্ট হলো তা তো কোনো কিছু দিয়ে শোধ করা যাবে না। এখন উপায়!
আব্দুল কাদের, আজিজ মাস্টার ও অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিনসহ অনেকে সৈয়দ আবুল হোসেনকে গিয়ে ধরলেন। এখন কী হবে? খোয়াজপুর কলেজকে সরকার অনুমোদন দেবে না। ছাত্রছাত্রী যারা ভর্তি হয়েছে তাদের নাকি ফিরে যেতে হবে। অনেকে হাসাহাসি করছে। ছাত্রছাত্রীদের উত্যক্ত করছে। কী করি? এর চেয়ে তো মরে যাওয়া ভালো। আবুল হোসেন তাদের কথা শুনে কোনোরূপ হতাশ প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। হেসে বললেন: আমি কলেজ দিয়েছি, অনুমতি ছাড়া আর সব কিছুতে পরিপূর্ণ। আপনারা ভালোভাবে কলেজ পরিচালনা করুন। বাকিটা আমি দেখছি। আমার নিজের গড়া প্রতিষ্ঠান আমার সন্তানের মতো। আমার সন্তানের অকাল মৃত্যু আমি কিছুতেই মেনে নেব না।
আজিজ মাস্টার বললেন: শিক্ষামন্ত্রী পরিষ্কার বলে দিয়েছেন এ কলেজের অনুমতি তিনি দেবেন না। তিনি শিক্ষামন্ত্রী থাকলে এ অনুমতি হবে না। বিষয়টা জটিল হয়ে গেল না? সৈয়দ আবুল হোসেন আবারও হাসলেন, তার স্বভাবসিদ্ধ অমায়িক হাসি। এ হাসিতে কোনো হতাশা নেই, কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো ঘৃণা নেই, আছে শুধু সৃষ্টির উল্লাস, প্রত্যয়ের ঝাণ্ডা। বললেন, ‘কলেজ অনুমতি পাবে। আর শিক্ষামন্ত্রী সাহেব যদি মনে করেন তিনি শিক্ষামন্ত্রী থাকলে আমার কলেজ এমপিও-ভুক্ত হবে না, তাহলে তিনি অন্য মন্ত্রণালয়ে চলে যাবেন।’ আশা-নিরাশার দোলা নিয়ে সবাই ফিরে যান। ঠিক একমাস পর সবাই অবাক বিস্ময়ে দেখলেন, শেখ শহিদ আর শিক্ষামন্ত্রী নেই। গুটি কয়েক শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে এবং ছাত্রজনতার মুখে হাসি ফুটিয়ে এ ঘটনার কয়েকদিন পর খোয়াজপুর কলেজ এমপিও-ভুক্ত হয়ে যায়।১

কে বড়?২
আগস্ট, ১৯৮৯। সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুর-এর উদ্বোধন উপলক্ষে একটি ক্রোড়পত্র বের করা হবে। আব্দুল কাদের এবং মমতাজ সাহেব তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী শেখ শহিদের কাছে যান। উদ্দেশ্য ক্রোড়পত্রের জন্য একটি বাণী নেবেন। আব্দুল কাদের সবিনয়ে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীকে তাদের আগমনের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেন। তিনি আব্দুল কাদের সাহেবের পরিচয় জানতে চান। আবদুল কাদের বললেন, ‘আমার বাড়ি আগৈলঝারা। সৈয়দ আবুল হোসেনের মালিকানাধীন সাকো ইন্টারন্যাশনাল লিঃ-এর একজন কর্মকর্তা।’
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বিরক্তিস্বরে বললেন, ‘আপনার বাড়ি আগৈলঝারা, আপনি কালকিনির কেউ নন। আমার সংসদীয় এলাকায় কলেজ করার জন্য এত মাথাব্যথা কিসের আপনার?’ কাদের সাহেব সবিনয়ে বললেন, ‘শিক্ষার কোনো এলাকা নেই। এটি আলোর মতো। আপনার এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে, এ তো আপনারই লাভ। আপনার এলাকা উন্নত হবে। অনুগ্রহপূর্বক একটা বাণী দিলে বাধিত হব স্যার।’ শিক্ষামন্ত্রী বললেন, ‘আমি বাণী দেবো না।’ অনেক অনুনয় করেও শিক্ষামন্ত্রীকে রাজি করানো গেল না। তিনি বাণী দেবেন না। এ তার শেষ কথা।
বিফল হয়ে তারা চলে আসেন। সৈয়দ আবুল হোসেন সব শুনতে পেয়ে বললেন, ‘আপনারা মনে কষ্ট পাবেন না। আমি ভেবেছিলাম স্মরণিকায় মাননীয় শিক্ষমন্ত্রীর বাণীকে মুখ্য রাখব। তা আর হলো না। আপনারা স্মরণিকার বাকি কাজ সম্পন্ন করে ফেলুন। আমি বাণীর কী হবে তা দেখছি। তারপর একটু থেমে বললেন, ‘আচ্ছা শিক্ষামন্ত্রী বড় না রাষ্ট্রপতি বড়? প্রধানমন্ত্রী বড় না শিক্ষামন্ত্রী বড়? আমার শিক্ষামন্ত্রীর বাণী আর চাই না। ক্রোড়পত্রে রাষ্ট্রপতির বাণী যাবে।
কিছুদিন পর সৈয়দ আবুল হোসেন একজন বাহক দিয়ে অধ্যক্ষের কাছে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, উপ-রাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদ, প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ এবং উপ-প্রধানমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন-এর ছবিসহ চারটি বাণী পাঠিয়ে দেন। তাদের বাণী নিয়ে স্মরণিকা বের হয়ে যায়।

যারা করিছে প্রত্যাখ্যান
কালকিনিতে কোনো ভালো কলেজ নেই। নিজের এলাকায় লেখাপড়া করতে পারার মজাই আলাদা। যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে সৈয়দ আবুল হোসেনকে গৌরনদী গিয়ে পড়তে হয়েছে। এ দুঃখ তিনি ভুলতে পারেননি। ছাত্রজীবন হতে তাঁর প্রতিজ্ঞা ছিল, সামর্থ্য হলে কালকিনির এ অসহায়ত্ব তিনি দূর করবেন। উদ্দেশ্য সৎ ছিল বলে তা পূরণের যোগ্যতা অর্জন করলেন সৈয়দ আবুল হোসেন।
কালকিনি কলেজের অবস্থা করুণ। নেই ভবন, নেই ভালো শিক্ষক, নেই সুচারু পরিবেশ। তিনি কলেজটিকে জাতীয়মানের একটি শিক্ষালয়ে পরিণত করতে চাইলেন। সনটি ১৯৮৮-এর শেষ প্রান্ত। কলেজ কমিটি এবং এলাকার গণ্যমান্যদের ডেকে কলেজটির আমূল পরিবর্তন ও আধুনিকায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করার প্রস্তাব দিলেন। ভেবেছিলেন এলাকাবাসী খুশি হবেন কিন্তু তাকে হতবাক করে দিয়ে কলেজ পরিচালনা কমিটি ও এলাকার গণ্যমান্য হিসেবে পরিচিত কিছু লোক তাঁর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এ ঘটনায় সৈয়দ আবুল হোসেনের মনে বিরাট দাগ কাটে তবু তিনি নিজেকে সংবরণ করেন। সংবরণ করলেও মনের ইচ্ছা সংবরণ হয়নি। এ পর্যন্ত তিনি যা চেয়েছেন তা হয়েছে, করেছেন। কারণ তার চাওয়ার মধ্যে, ইচ্ছের মধ্যে কোনো ফাঁক ছিল না, কোনো লোভ ছিল না, কোনো পাপ ছিল না।
সাকো অফিসে এ নিয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, ‘আমার মনে কোনো লোভ নেই, আমি এলাকায় শিক্ষা বিস্তার চেয়েছি। কালকিনিবাসী আমার ইচ্ছাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। দেখবেন, অচিরে কালকিনিবাসী, যারা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে তারাই আমার প্রস্তাব বাস্তবায়নের অনুরোধ নিয়ে আসবেন। আমি কিন্তু সেদিন তাদের ফেরাব না।’
খোয়াজপুর মাদারীপুর-শরিয়তপুর-কালকিনির মিলনস্থল খোয়াজপুর টেকেরহাট একটি অবহেলিত অঞ্চল। শিক্ষা-দীক্ষায় মারাত্মক পিছিয়ে। বিল ছাড়া কিছু নেই। সৈয়দ আবুল হোসেন ওখানে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেন। নিজের টাকায় জমি কিনে সাত/আট হাত গভীর বিল ভরাট করে অল্প সময়ের মধ্যে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করলেন। এলাকাবাসী কলেজের নাম দিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ।
১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মহা আড়ম্বরে কলেজ উদ্বোধন করা হলো। যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকার নিরলস শ্রমে কলেজটির সুনাম অল্পদিনে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের প্রথম ব্যাচের পরীক্ষায় নব প্রতিষ্ঠিত এ কলেজের একজন ছাত্র মেধা তালিকায় প্রথম ও আরেকজন চতুর্থ স্থান লাভ করে। কলেজের সুনাম এত ছড়িয়ে পড়ে যে, কালকিনি কলেজে ঐ বছর ছাত্র ভর্তির সংখ্যা ২৩ এ গিয়ে দাঁড়ায়। এবার টনক নড়ে কালকিনির সে সকল লোকদের। যারা সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছিল তারা বুঝতে পারল অচিরে সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রস্তাব গ্রহণ না-করলে কালকিনি কলেজ বন্ধ হয়ে যাবে। নাই অর্থ, নাই ভবন, নাই ভালো শিক্ষক। কীভাবে চলবে কলেজ! ছাত্রছাত্রীরা সব খোয়াজাপুর সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজে চলে যাচ্ছে।
একদিন সৈয়দ আবুল হোসেন আমিন কোর্টের সাকো অফিসে কাজ করছিলেন। এ সময় কালকিনির দেড় শতাধিক গণ্যমান্য লোক এসে সৈয়দ আবুল হোসেনকে ঘিরে ধরেন। তারা বললেন, ‘আমাদের ভুল হয়েছে। আপনার প্রস্তাব আমরা সসম্মানে গ্রহণ করলাম। আপনি কালকিনি কলেজকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিন।’
এলাকাবাসীর ওপর অভিমান করে থাকতে পারলেন না মহামহিম সৈয়দ আবুল হোসেন। শুরু হলো আর এক ইতিহাস। সে ইতিহাস গড়ার ইতিহাস; শিক্ষা বিস্তারে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের ইতিহাস, কালকিনি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ইতিহাস। যার অনুপম সুদৃশ্য ভবন পথচারীদের দৃষ্টি থমকে দেয়।৩ সৈয়দ আবুল হোসেন প্রতিষ্ঠিত কলেজগুলো এত ভালো ফল করছিল যে, শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা হয়ে গিয়েছিল, দক্ষিণাঞ্চলের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সৈয়দ আবুল হোসেনের নামে নামায়িত করার জন্য জনগণ উদগ্রীব হয়ে উঠেছিল। চারিদিকে সৈয়দ আবুল হোসেন নামের একটা হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। লোকজন ভাবত সৈয়দ আবুল হোসেন-এর কলেজে পড়াতে পারলেই তাদের সন্তানের ভালো ফল নিশ্চিত হয়ে যাবে।৪

ইতিহাসের প্রারম্ভ
১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ। মহাপ্লাবনে কালকিনিসহ মাদারীপুরের অধিকাংশ এলাকা সাত/আট হাত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। কোথাও আশ্রয়ের মতো এক টুকরো মাটি নেই। সব পানির নিচে। দুর্গত মানুষের কান্নায় আকাশ আরও ভারি হয়ে জল ফেলছে। এ অবস্থায় মানব দরদি আবুল হোসেন নিজেকে ঢাকার আয়েশে আটকে রাখতে পারলেন না। মাত্র তিনজন সহচর নিয়ে কালকিনি রওয়ানা দিলেন।
তখন জাতীয় পার্টি ক্ষমতায়। সৈয়দ আবুল হোসেন সাহায্য করতে এসেছেন শুনে ক্ষমতাসীন প্রতিক্রিয়াশীল স্বৈরশাসক-গোষ্ঠীর আঁতে ঘা পড়ে। সৈয়দ আবুল হোসেনকে সাহায্য দিতে দেবে না। কারণ সৈয়দ আবুল হোসেন আলোর ন্যায় সমুজ্জ্বল, ভালোবাসার ন্যায় অনাবিল, যেদিকে তাকান জয় করে নেন। লোকজন ক্রমশ তাঁর ভক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাঁকে সাহায্য দিতে দিলে শোষণ, সন্ত্রাস আর ভোট ডাকাতির রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। অথচ সৈয়দ আবুল হোসেন কোনো রাজনীতিক উদ্দেশ্য নিয়ে সাহায্য করতে আসেননি। তিনি নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য দিতে এসেছেন। তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে কিছু লোক সৈয়দ আবুল হোসেনকে বাধা দেন। আবুল হোসেন বললেন: আমি আমার এলাকায় দুর্গত মানুষদের সাহায্য দিতে এসেছি, আপনারা বাধা দেবেন কেন?
যাদের উদ্দেশ্য শুধু বাধা দেয়া তারা যুক্তির ধার ধারে না। বাধা পেয়ে তিনি থানায় আশ্রয় নেন। আস্তে আস্তে এ কথা সর্বত্র জানাজানি হয়ে যায়। সাধারণ লোক তাঁর উদারতার সম্পর্কে অনেক পূর্ব হতে অবগত। তিনি অনেক লোককে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করেছেন। চারিদিক হতে তাঁর ভক্তরা ছুটে আসতে থাকেন। থানার সামনে অনেক লোক জড়ো হয়ে যায়। সৈয়দ আবুল হোসেনকে তারা এক নজর দেখতে চান। তিনি বেরিয়ে আসেন। লোকজন উল্লাসের সাথে তাঁকে স্বাগত জানায়। সমবেত লোকদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘আমি আপনাদের সাহায্য করতে এসেছি। এর বেশি কিছু না। কালকিনি আমার জন্মস্থান। আমার এলাকার লোকজন আজ অসহায়। আমি কি দুর্গত লোকদের সাহায্য করতে পারব না? আমি আপনাদেরই লোক, আমি আপনাদের সাথে থাকব। উপস্থিত জনগণ সমস্বরে বললেন, ‘আমরা আপনার পক্ষে আছি। অবস্থা বেগতিক দেখে পালিয়ে যায় প্রতিক্রিয়াশীলরা। সৈয়দ আবুল হোসেনকে দুর্গত লোকজন পরম আদরে বুকে টেনে নেন। শুরু হয় আর এক ইতিহাস। এ ইতিহাস শুধু রাজনীতির নয়, দানের; স্বার্থের নয় ত্যাগের।’৫

নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো৬
কালকিনিতে সৈয়দ আবুল হোসেন একটা সভায় যোগদান করতে এসেছেন। সভার পূর্বে একটি কক্ষে বসে কলেজের উন্নয়ন সম্পর্কে আলোচনা করছেন। সে সময় কয়েকজন লোক সৈয়দ আবুল হোসেনের কাছে এ মর্মে অভিযোগ করলেন যে জনৈক ব্যক্তি তাঁর নিন্দা করছেন। তারা এমনভাবে কথাগুলো বলছিলেন যেন সৈয়দ আবুল হোসেন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু তিনি উত্তেজিত হলেন না, কোনো পরিবর্তনও তার চোখেমুখে দেখা গেল না। স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বললেন, ‘তোমরা যাও। বিষয়টা আমি দেখব।’ বক্তৃতার সময় তিনি বললেন: আমাকে যারা ভালোবাসেন তার শুনে রাখেন, যারা আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রচনা করেন তারা আমার গায়ের ময়লা তাদের নিজের শরীরে মেখে নিয়ে আমাকে পরিষ্কার করে দেন। এতে আপনাদের খুশি হবার কথা, মন খারাপ করার প্রশ্নই আসে না। মনে রাখবেন- নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো; যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো।

মহান যার অনুভব৭
জনৈক ব্যক্তির লাশ পরিবহন ও দাফন-কাফনের জন্য কয়েকজন লোক সৈয়দ আবুল হোসেনের কাছে সাহায্য চাইতে আসেন। মহান দাতা সৈয়দ আবুল হোসেন স্বভাবসুলভ সরলতায় তাদেরকে কাক্সিক্ষত অর্থ প্রদান করে বিদায় করেন। কয়েক বছর পর এক অনুষ্ঠানে সৈয়দ আবুল হোসেন দেখলেন- সেদিন যে লোকটির লাশ পরিবহন ও দাফন-কাফনের জন্য তাঁর কাছ হতে টাকা নেয়া হয়েছিল সে লোকটি দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছেন। তিনি এ বিষয়ে সাহায্যপ্রার্থীদের কিছু বলেননি। শুধু মুচকি হেসেছিলেন।

১. সূত্র কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আবদুল আজিজ মাস্টার, সৈয়দ
আবুল হোসেনের বন্ধু ও সাকোর প্রাক্তন কর্মকর্তা আব্দুল কাদের এবং সৈয়দ আবুল
হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ মো. তমিজ উদ্দিনের প্রদত্ত তথ্য।
২. আব্দুল কাদের, খোয়াজপুর কলেজ প্রতিষ্ঠা সৈয়দ আবুল হোসেনের বন্ধু এবং সাকো-
এর প্রাক্তন কর্মকর্তা।
৩. আবদুল আজিজ মাস্টার, প্রাক্তন শিক্ষক কালকিনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এবং প্রাক্তন
সভাপতি, কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগ।
৪. ড. একেএম আখতারুল আলম, অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, প্রাক্তন কর্মকর্তা লিগ্যাল এইড, শরীয়তপুর।
৫. আজিজ মাস্টার, আবুল কালাম আযাদ, আব্দুল কাদের।
৬. ফরহাদ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জেলাপ্রশাসক মাদারীপুর।
৭. ঐ

আলাপচারিতায় দার্শনিক নান্দনিকতা
এ অধ্যায়ে বর্ণিত ঘটনা ও বক্তব্যগুলো মাননীয় যোগাযোগমন্ত্রীর আলাপচারিতার বিভিন্ন সময়ের কথাবার্তা থেকে সংগৃহীত। এগুলো কোনো বিশেষায়িত বক্তব্য নয়। দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কথাবার্তার টুকিটাকি মাত্র। এসব কথাবার্তায় ছিল না কোনো পূর্বপরিকল্পনা, ছিল না কোনো সমীকরণ। নিতান্তই স্বাভাবিক, নিঃশ্বাসের মতো, প্রশ্বাসের মতো। সাধারণ কথাবার্তায় একজন লোকের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে। মানুষ সভাসমিতিতে নিজেকে লুকিয়ে উঠতে পারেন, কিন্তু স্বাভাবিকতা ভিন্ন। এ সব খোলামেলা কথাবার্তা ও আলাপচারিতায় ব্যক্তি, নেতা, রাজনীতিবিদ ও প্রশাসক হিসেবে সৈয়দ আবুল হোসেনের আদর্শ ফুটে উঠেছে। সংকলনে প্রকাশের উদ্দেশ্যে তথ্যগুলো বিভিন্ন উৎস হতে সংগ্রহ করা হয়েছে।

নেতৃত্ব
কালকিনির লোক। মন্ত্রী মহোদয়ের সমবয়সী। কথাবার্তায় মনে হলো ঘনিষ্ঠ। মাঝে মাঝে তাকে দেখা যায় মন্ত্রণালয়ে। কি একটা তদ্বির নিয়ে এসেছেন। তদ্বিরের বিবরণ শুনে মাননীয় যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, ‘এটি আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’ লোকটি বললেন, ‘আপনি মন্ত্রী, আপনার মন্ত্রণালয়ের কাজ। সম্ভব নয় কেন?’ মন্ত্রী বললেন, ‘তুমি একজন শিক্ষিত লোক। কোন কাজটি করা আমার উচিত, কোনটি উচিত নয়Ñ সে বিষয়ে তোমার ধারণা থাকা উচিত। প্রত্যেকের সীমাবদ্ধতা আছে। ডব ধৎব ধষষ ংড়সবঃযরহম, নঁঃ হড়হব ড়ভ ঁং ধৎব বাবৎুঃযরহম.’ ‘আপনি এত বড় নেতা, এত বড় পদে আছেন, বলে দেন, কাজ হয়ে যাবে।’ মাননীয় মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, খবধফবৎংযরঢ় রং ধপঃরড়হ, হড়ঃ ঢ়ড়ংরঃরড়হ. আমার দায়িত্ব কাজ, তদ্বির করা নয়। লোকটি বললেন, তদ্বির না-করলে হয় না। মন্ত্রী মহোদয় বললেন, যেগুলো হবার সেগুলোই আমি তদ্বির করি। যেগুলো হয় না সেগুলোর তদ্বির করি না।
নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো
মন্ত্রী মহোদয়ের কক্ষ। বিভিন্ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও সংসদ সদস্য উপস্থিত আছেন। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা চলছিল। মন্ত্রী মহোদয় এক সময় বললেন: কেউ একদিনে বড় হয় না, হতে পারে না। আছাড় না খেয়ে কেউ হাঁটতে শেখেনি। বিঘ্ন ছাড়া কেউ লক্ষ্যস্থলে পৌঁছতে পারেনি। একদিন আমাকে অনেকে উপহাস করেছে, ঢিল ছুড়ে আমার প্রত্যাশাকে থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। আমি আমার প্রতি নিক্ষিপ্ত ইট দিয়ে সফলতার ভিত্তি বানিয়েছি। ঐ ইটগুলো আমাকে রক্তাক্ত করার জন্য নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আমি সযত্নে নিজেকে রক্ষা করেছি। প্রতিটি ইট সংগ্রহ করে আস্তে আস্তে ভিত মজবুত করেছি। যারা আমাকে ঢিল ছুড়েছিল তারা এখন ফুল ছোড়ে। এখন আমি তাদের দিয়ে আমার ভবনের বাকি কাজগুলো করিয়ে নিচ্ছি। পৃথিবী ভয়ঙ্কর জায়গা, আমি জানি। তবে এটি খারাপ লোকদের জন্য নয়; বরং তাদের জন্য, যারা কোনো কিছু না-করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে তামাসা দেখে। সহনশীলতা ছাড়া এখানে টিকে থাকার কোনো উপায় নেই। যতবার আমি বাধাগ্রস্ত হয়েছি ততবার আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছি। যে আমার নিন্দা করেছে সে নিন্দার সূত্র ধরে আমি কাক্সিক্ষত পথ খুঁজে পেয়েছি। তাই আমি বিভিন্ন বক্তৃতায় প্রায় বলে থাকি:
‘নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো,
যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো
যিনি আমার প্রশংসা করেন তাকে আমি অগ্রাহ্য করি না, যিনি নিন্দা করেন তাকে ঘৃণা করি না। দু’জন আমার দুটো দিক তুলে ধরেন। দুটোই আমার জন্য প্রয়োজন। প্রশংসা আমাকে উজ্জীবিত করে এবং নিন্দা করে সতর্ক।

আত্ম-পরিবর্তন
রবি বার। নয়টা বাজার পনেরো মিনিট বাকি। ইতোমধ্যে মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী অফিসে এসে গেছেন। তিনি প্রত্যহ নয়টার আগে অফিসে আসেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ যাতে তাকে অনুসরণ করেন এ জন্য এ ব্যবস্থা। নিয়ম-নীতি ও ব্যক্তি চরিত্র সম্পর্কে আলোচনাপ্রসঙ্গে মন্ত্রী মহোদয় বললেন: পৃথিবীর সবাই পরিবর্তন চায়। কিন্তু অবাক হয়ে দেখি কেউ নিজেকে পরিবর্তন করছে না। তাহলে পৃথিবী কীভাবে পরিবর্তন হবে! নিজেকে পরিবর্তন করলে পৃথিবীর পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে যাবে। আসলে নিজেকে পরিবর্তন করা খুবই কঠিন। শিক্ষিত হলে মনের পরিবর্তন আসে। আমি মনে করি শিক্ষা ছাড়া অন্য কোনোভাবে আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব নয়। শিক্ষা এমন একটি শক্তিশালী অস্ত্র যা আমরা অতি সহজে আমাদের মনমানসিকতা ও সমাজকে পরিবর্তন করার জন্য ব্যবহার করতে পারি। শুধু শিক্ষা যথেষ্ট নয়, প্রায়োগিক শিক্ষা প্রয়োজন। শিক্ষা জ্ঞান দেয় বটে; তবে জ্ঞান আমার লক্ষ্য নয়, আমার লক্ষ্য প্রয়োগ। গ্রন্থগত বিদ্যার মতো প্রয়োগহীন জ্ঞানও অর্থহীন।

চাওয়া-পাওয়া
সৈয়দ আবুল হোসেন তখন এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী। মানুষের চাওয়া-পাওয়া, প্রত্যাশা ও লোভ সম্পর্কে আলোচনার এ পর্যায়ে তিনি বললেন, আমি তা-ই করি, যা করতে পারি, তা-ই চাই যা আমার আছে, আমি তা হতে চাই যা আমি ইতোমধ্যে হয়ে আছি। এর বেশি কিছু চেয়ে হতাশ হতে চাই না। হতাশা মানুষের অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব নষ্ট করে দেয়। আমি হতাশ হই না, কারণ আমি হতাশ হবার মতো কোনো উচ্চাকাক্সক্ষায় নিজেকে জড়াই না। তাই আমি সবসময় প্রফুল্ল থাকি। আমার হাসি আমার প্রফুল্লতার প্রকাশ। আমাকে আমার কর্ম দ্বারা বড় হতে হবে। আপনাকে কেউ বড় হবার জন্য অনুগ্রহ করবে না। আপনার দক্ষতাই আপনাকে সহায়তা দেবে। আমার পিতামহ কত লম্বা ছিল সেটি কোনো বিষয় নয়, আসল বিষয় আমি কতটুকু লম্বা হতে পেরেছি। আপনার বোঝা আপনারকে বহন করতে হবে। আপনার শরীরের কষ্ট আপনার নিজের। কেউ এর ভাগ কখনও নেয়নি, নেবে না এবং নিতে পারে না।১

সমালোচনা
সৈয়দ আবুল হোসেন বাস্তববাদী মানুষ। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষ মাত্রই ভুল করবে। এর ব্যতয় ঘটতে পারে না। ভুল আছে বলে কোনো কিছু পরিপূর্ণ নয়, কোনো কিছু ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; তাই কোনো কিছু সমালোচনার ঊর্ধ্বেও নয়। আমি সমালোচনাকে ভয় করি না। আমি যে কাজ করছি সমালোচনা তা প্রকাশ করে। আমি যদি সমালোচনা এড়াতে চাই তাহলে আমার উচিত কিছু না-করে বাড়িতে চুপচাপ বসে থাকা। এটি আমার পক্ষে সম্ভব নয়। লাশের পক্ষে সম্ভব। কীর্তিমানের লাশও সমালোচনায় পড়ে। তাই বলে কী কীর্তিমানেরা চুপ করে ঘরে বসে থাকে! আমি সমালোচনাকে স্বাগত জানাই। ডরঃযড়ঁঃ ফবনধঃব, রিঃযড়ঁঃ পৎরঃরপরংস, হড় ধফসরহরংঃৎধঃরড়হ ধহফ পড়ঁহঃৎু পধহ ংঁপপববফ ধহফ হড় ৎবঢ়ঁনষরপ পধহ ংঁৎারাব.২
কাজের কোনো শেষ নেই
প্রত্যেক মানুষ নিজস্ব বলয়ে একজন শিল্পী। শিল্পীর কাজ কখনও শেষ হয় না। একজন শিল্পী যখন তার একটি শিল্পকর্ম শেষ করেছেন বলেন, তখন মূলত তা তিনি এটি সাময়িক বন্ধ রাখেন কিংবা পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন মাত্র। যতদিন জীবন ততদিন কাজ। কাজহীন মানুষ লাশের নামান্তর। কাজ করতে গেলে ভুল হয়। ভুল কাজের অংশ। তার ভুল হয় না যে কোনো দিন কোনো কিছু করেনি। তাই আমি ভুলকে সৃষ্টির অনিবার্য অংশ মনে করি। তবে দেখতে হবে ভুল যেন মাত্রাতিরিক্ত না-হয়। এ জন্যই প্রয়োজন জ্ঞান, অধ্যয়ন, বিচক্ষণতা এবং সততা। তাড়াহুড়ো চিন্তার সময়কে সীমিত করে, বাড়িয়ে দেয় ভুলের মাত্রা। ফলে অনেকে মাঝপথে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। আমি ধীরে হাঁটি তবে পিছু হাঁটি না। যদি কখনও পিছোই তাহলে ধরে নিতে হবে আগুয়ান হবার জন্য পরিকল্পনামাফিক পিছু হাঁটি।৩

পরিবর্তন ও প্রগতি
নেতা হতে হলে পরিবর্তনশীল মানসিকতা থাকতে হবে। সংস্কার মানেই পরিবর্তনশীলতা। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সকল আন্দোলন যেমন উন্নয়ন নয়, তেমনি সকল পরিবর্তনও কল্যাণকর নয়। আমার যা পছন্দ হয় নাÑ তা আমি পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। যা আমি পরিবর্তন করতে পারি নাÑ তা আমি গ্রহণ করার জন্য নিজের মনকে পরিবর্তন করে ফেলি। তবে যেটি পরিবর্তন করলে আমার ভালো লাগলেও অধিকাংশ লোকের ক্ষতি হয়, সেটি আমি পরিবর্তন না-করে মেনে নেয়ার চেষ্টা করি। আমি জানি যা আসার তা আসবেই। একটি শক্তিশালী সেনা আক্রমণকে রোধ করা যায় কিন্তু একটি ধারণা যার আসার সময় হয়ে গেছে তা কোনোকিছু দিয়ে রোধ করা যায় না। সুতরাং অনড়তা নয় বরং বিচক্ষণ পরিবর্তনশীলতাই প্রগতির লক্ষণ।

সকল শান্তির উৎস
পরিবারের শান্তি সবচেয়ে বড় শান্তি। একজন মানুষ যতই ধনী হোক না কেন, অসুস্থ হলে কোনো শান্তি উপভোগ করতে পারে না, কিছুতে আনন্দ পায় না। তেমনি একজন লোক যতই ধনী, যতই ক্ষমতাশালী হোক না কেন, পারিবারিক শান্তি না-থাকলে তার সবকিছু ব্যর্থ হতে বাধ্য। আমি পারিবারিক জীবনে একজন সুখী মানুষ। আমার সুখের বিনির্মাতা আমি, আমার স্ত্রী, আমার দুই কন্যা। আমি তাদের পর্যাপ্ত সময় দেই, ভালোবাসা দেই। তারাও দেয়। এটি বিনিময় নয়, মর্যাদার অনুভবে ভালোবাসায় সন্তরণ। যেখানে মর্যাদা নেই সেখানে ভালোবাসা নেই। আমি আমার স্ত্রীর প্রতি সর্বদা বিশ্বস্ত এবং মর্যাদাশীল আচরণে অভ্যস্ত। সন্তানদের প্রতি আমি সবসময় সুন্দর ব্যবহার করি। আমি জানি, আমার মৃত্যুর পর তারাই আমার শেষ ঠিকানা স্থির করবে। আমার স্ত্রী পুত্র আমার আনন্দ, বেঁচে থাকার প্রেরণা। এমনকি মৃত্যুর পরও।৪

সূর্য ও জীবন
প্রতি সেকেন্ড আমার কাছে নতুন, প্রতিটি নতুন সূর্য আমাকে একটি নতুন জীবন উপহার দেয়। তাই আমি বর্তমানকে গুরুত্বের সাথে বরণ করি, আনন্দের সাথে উপলব্ধি করি। প্রতিটি মুহূর্তকে অবস্থা বিবেচনায় অভিযোজনীয় কৌশলে উপভোগ্য করে তুলি। শিশুকাল, কৈশোর, যৌবন ও বৃদ্ধকাল- প্রতিটির আনন্দ আছে, সার্থকতা আছে। আমার উপলব্ধিই আমার উপভোগ। মানুষ এককভাবে বাস করতে পারে না। প্রত্যেককে নিয়ে আমি, আমাদের নিয়ে সমাজ, দেশ ও জাতি। আজ যাকে পাব কাল তাকে নাও পেতে পারি। তাই আমার সাথে যারা আছে, যাদের সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে, সবাইকে জীবনের অংশ মনে করে যথাযোগ্য গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করি।

রাগ পাশবিকতার আগুন
আমার মা আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে ধৈর্য ধারণ করতে হয়। রাগ সংবরণ করতে হয়। এক সেকেন্ডের রাগ কারও পুরো জীবনকে বিষিয়ে তুলতে পারে। যে ব্যক্তির ধৈর্য নেই, তার আত্মাও নেই। যার আত্মা নেই, সে মানুষ নয়। রাগ পাশবিকতার নামান্তর। অধৈর্য মানুষকে পশুতে পরিণত করে। মানুষ কেন রাগে? মানুষ যখন ভুল করে এবং সে ভুল স্বীকার করে না, স্বভাবতই তখন সে রেগে যায়। অগভীর মানুষের রাগ বেশি। রাগ অশান্তিকে প্রসারিত করে। রাগের জন্য মানুষের শাস্তি হয় না, তবে রাগ শাস্তি দিয়েই ছাড়ে। তাই আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার অভ্যাস রপ্ত করে নিয়েছি। আমার পিতামাতা এভাবে আমাকে গড়ে তুলেছেন। ভদ্রতা দিয়ে মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। মহাত্মা গান্ধীর ভাষায় বলতে পারি: ওহ মবহঃষব ধিু, ুড়ঁ পধহ ংযধশব ঃযব ড়িৎষফ. রাগ পোশাকের নিচে লুকিয়ে থাকা বিষধর সাপের মতো। এটি পরিহার করতে পারলে নিরাপত্তা ও শান্তিÑ দুটো বহুলাংশে নিশ্চিত হয়ে যায়।
ন্যায় বিচারের গুরুত্ব
এমনভাবে কাজ করবেন যাতে কোনো ব্যক্তি অযথা হয়রানির স্বীকার না-হয়। আমাকে যে বিষয় কষ্ট দেবে, যা করলে আমার ক্ষতি হবে, তা যেন অন্যের বেলাতেও না-হয়। সহকর্মীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন। এটিই ন্যায়বিচার। আমরা যদি ন্যায়বিচারের মাধ্যমে অন্যকে রক্ষা না-করি, তাহলে ন্যায়বিচারও আমাদের রক্ষা করবে না। যে ফাঁদে আমি অন্যকে আটকাব, সে ফাঁদে একদিন আমিও আটকে যাব। মনকে বড় করতে হবে। বড় মন ছাড়া ক্ষমতা, অর্থ, বিত্ত সব কুৎসিত ভিক্ষুকের প্রতিচ্ছবি। ন্যায়বিচার যারা লঙ্ঘন করে, তারাও একদিন অন্যায়ের শিকারে পরিণত হয়। তাই আমাদের উচিত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।৫

সংশয়ে সতর্কতা
এক প্রকৌশলী যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে বললেন: আপনি নিশ্চিত থাকেন আমি সফল হব স্যার। জীবনে এ পর্যন্ত কোনো কাজে ব্যর্থ হইনি। মন্ত্রী বললেন: আমি নিজেও একজন ব্যবস্থাপক। আমার প্রতিষ্ঠানে আপনার মতো অনেক প্রকৌশলী কাজ করে। দেখুন, চিন্তাভাবনা করে আমাকে বলুন। পরে যেন লজ্জায় পড়তে না-হয়। জীবনে ব্যর্থ হয়নি তারা, যারা জীবনে কোনো কাজই করেনি। প্রকৌশলী বললেন: আমি পারব স্যার। মন্ত্রী মহোদয় বললেন: আমার মনে হয়, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। কেন স্যার? প্রকৌশলীর প্রশ্নের জবাবে মাননীয় মন্ত্রী বললেন: কারণ যে নিশ্চিত হয়ে অগ্রসর হয়, তার সমাপ্তি ঘটে সংশয় আর পরাজয়ে; যে সংশয় নিয়ে শুরু করে তার শেষ হয় নিশ্চয়তা আর সাফল্যে। কারণ, সংশয় তাকে সব সময় সতর্ক থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রকৌশলী সাহেব বললেন: আমি স্যার সতর্ক থাকব। আপনাকে যথাসময়ে কাজটি করেই দেবো।” কিন্তু বেচারা কাজটি যথাসময়ে সম্পন্ন করতে পারলেন না। সামান্য কারণে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। মন্ত্রী বললেন : আমি আপনাকে প্রথমেই বলেছিলাম। আপনার নিশ্চয়তা এবং কথা দেখে আমি বুঝতে পেরেছিলাম আপনি পারবেন না। অ ফড়ম রং হড়ঃ পড়হংরফবৎবফ ধ মড়ড়ফ ফড়ম নবপধঁংব যব রং ধ মড়ড়ফ নধৎশবৎ. অ সধহ রং হড়ঃ পড়হংরফবৎবফ ধ মড়ড়ফ সধহ নবপধঁংব যব রং ধ মড়ড়ফ ঃধষশবৎ.

অসুন্দরে নয়, সুন্দরে
এক অফিসার মন্ত্রী মহোদয়কে বললেন: সাদেক সাহেব (ছদ্মনাম) ভালো অফিসার নন। দুর্নীতিপরায়ণ।
মন্ত্রী মহোদয়: তিনি দুর্নীতিপরায়ণ এরূপ কোনো প্রমাণ আপনার কাছে আছে?
অফিসার: এ সব কেউ প্রমাণ রেখে করে না।
মন্ত্রী মহোদয়: তাহলে এমন কথা বলা উচিত নয়। আমার এ বিষয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর আমাকে দুর্নীতিবাজ আখ্যায়িত করে প্রচণ্ড হয়রানি করা হয়েছিল। মামলা পর্যন্ত করা হয়েছে। আমি কী দুর্নীতিবাজ ছিলাম? আমি কোনোদিন অসৎ পথে আয় করিনি। আমার প্রতিটি পয়সা হালাল। তবু আমাকে দুর্নীতিবাজ আখ্যায়িত করে হয়রানির চেষ্টা করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমি প্রমাণ করতে পেরেছি যে, আমি দুর্র্র্নীতিবাজ নই। ততক্ষণে অনেক হয়রানির শিকার হয়ে গেছি। আমাদের উচিত আগে অন্যের ভালোটার দিকে তাকানো। তাহলে পৃথিবী অনেক সুন্দর হয়ে যাবে। কারণ, মানুষ তখন নিজের সুন্দরকে আরও বিকশিত করার প্রতিযোগিতায় নামবে।৬

শত্রু বিনাশের উপায়
ওয়ান-ইলেভেনের সময় পুরো বাংলাদেশ একটি নরকে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। মানবাধিকারের বালাই ছিল না। তবু আমি আশা ছাড়িনি। কারণ, আমি জানি পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকারও ছোট্ট একটি মোমবাতির আলোকে ঢেকে রাখার সামর্থ্য রাখে না। এ সময় আমাকে অনেকে বিপদে ফেলার জন্য চেষ্টা করেছে। এমন অনেকে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে যাদের আমি একদিন উপকার করেছিলাম। আমি তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। আমি জানি, ঞযব নবংঃ ধিু ঃড় ফবংঃৎড়ু সু বহবসু রং ঃড় সধশব ঃযবস সু ভৎরবহফ. শত্রুকে বন্ধু বানিয়ে নেয়া মানে শত্রুকে শেষ করে দেয়া। ওয়ান ইলেভেনে যারা আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে, তাদের সবাইকে আমি জানি। আমি প্রতিশোধ নেব না। প্রতিশোধ এক ধরনের বন্য বিচার, পাশবিকতা। আমি ভালোবাসার মাধ্যমে প্রতিশোধ নেব। এমন প্রতিশোধের পরিণতি খুবই মধুর হয়। শত্রুতা কখনও শেষ হয় না। কারও জীবন শেষ করে দেয়ার জন্য একজন শত্রুই যথেষ্ট। তবে শত্রু এমন একটা শক্তি যে, এটাকে শত্রুতা দিয়ে কোনোদিন শেষ করা যায় না। শত্রু বিনাশের একমাত্র উপায় তাদের বন্ধু বানিয়ে নেয়া।

সহনশীল রাজনীতি, সন্ত্রাস ও শিক্ষাঙ্গন
উন্নয়নের জন্য, শিল্পায়নের জন্য, গণতন্ত্রের সুফল পরিপূর্ণভাবে পরিব্যাপ্ত করার জন্য রাজনীতিক সহনশীলতা অত্যাবশ্যক। রাজনীতি থাকবে রাজনীতির স্থানে। সমাজের বিনির্মাণে রাজনীতির কৌশল প্রতিফলিত হতে হলে তা হবে দলমতের ঊর্ধ্বে।
যদি “চোখের বদলে চোখ, হাতের বদলে হাত” নীতি বিদ্যমান থাকে তাহলে পৃথিবীর সব মানুষ অন্ধ ও ল্যাংড়া হয়ে যাবে। তাই আমি সহনশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী। সন্ত্রাসী জনপদ হতে সুশীল সন্তান পাওয়া যায় না। তাই আমি শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাস ও রাজনীতিমুক্ত রেখে আমার প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করছি। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে কাউকে ক্ষমা করি না। সহনশীল রাজনীতি, সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ ও এ দু’য়ের পরিচর্যায় শিক্ষাঙ্গন পরিচালনা করা গেলে একটি জাতির আর কিছুর প্রয়োজন হবে না।৭

নিরাপত্তা বনাম শান্তি
বুদ্ধিমান লোক সবার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়। জ্ঞানী ব্যক্তির উদ্দেশ্য শান্তি নিশ্চিত করা নয়, কষ্টকে এড়িয়ে চলা। কষ্টকে এড়িয়ে চলা সম্ভব হলে শান্তি আপনা-আপনি জেগে ওঠে। ক্ষোভকে প্রশমন করা গেলে বিচক্ষণতা আসে। আর বিচক্ষণতা এমন একটি গুণ যা মানুষকে সচেতন ও সজীব রাখে, বিপদ হতে উদ্ধার করে। তাই সবার উচিত আগে নিরাপত্তার দিকটা ভেবে দেখা। নিরাপত্তার সাথে যোগাযোগের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। কারণ, যোগাযোগ পারস্পরিক বিনিময়, সহায়তা ও সম্মিলনের পথকে প্রসারিত করে।৮

যোগাযোগ ও উন্নয়ন
যোগাযোগ ছাড়া কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। মানুষ যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সভ্যতার দেখা পেয়েছে। যোগাযোগ শুধু প্রতিষ্ঠা করলে হবে না। প্রকৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মানুষ যখন নিজেকে নিরাপদ মনে করবে তখনই প্রকৃত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা পাবে। এ জন্য আমি নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। আপনারা আমাকে সহায়তা দেবেন। কারণ, যোগাযোগ কোনো একক বিষয় নয়, অনেকগুলো বিষয়কে সমন্বয় করে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হয়। কোনো সংস্থার পক্ষে এককভাবে প্রকৃত যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। যোগাযোগ প্রত্যেকের জন্য, প্রত্যেকের উন্নয়নের জন্য কোনোরূপ সন্দেহ ব্যতিরেকে সার্বজনীন। তাই সবার উচিত সাবলীল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা।৯

লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু
সৈয়দ আবুল হোসেন বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। এককভাবে শতাধিক বার চিন ভ্রমণ করেছেন। জাপান, আমেরিকা, রাশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, লন্ডন, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, সুইজারল্যান্ড- অনেক অনেক দেশ ভ্রমণ করেছেন। দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বললেন: মানুষের চেয়ে বড় সম্পদ আর নেই। জাপানের প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু তারা এখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদশালী দেশ। আমি মনে করি, পৃথিবীতে সম্পদ পর্যাপ্ত নয়। আমি মনে করি, ঞযবৎব রং বহড়ঁময ভড়ৎ বাবৎুনড়ফুদং হববফ, নঁঃ হড়ঃ বহড়ঁময ভড়ৎ বাবৎুনড়ফুং মৎববফ. লোভ পাপ আনে, পাপ মৃত্যু ঘটায়। লোভ সংবরণ করা গেলে পাপ কমে যাবে। পাপ কমে গেলে শান্তি প্রসারিত হবে। আপনারা যদি কোনো কিছু প্রকৃতই করতে চান তাহলে অবশ্যই করতে পারবেন। যদি না-চান তাহলে পাবেন একটি অজুহাত।১০

সফলতার অন্ত নেই
প্রবীণ এক রাজনীতিবিদ মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীকে বললেন: আপনি একজন সফল ব্যক্তি। আর কী চাওয়ার আছে আপনার, আল্লাহ আপনাকে সব দিয়েছেন।
স্মিতহাস্যে মাননীয় মন্ত্রী বললেন: সফলতা গন্তব্যস্থল নয়। ভ্রমণের প্রারম্ভ মাত্র। তাই সফলতা মানুষকে আরও সক্রিয় আরও সাবধান, আরও অধিক পথ পরিক্রমায় দায়বদ্ধ করে তোলে। যারা সফলতার সন্তুষ্টি নিয়ে আত্মতুষ্টিতে আত্মহারা হয়ে থেমে যান, তারা পক্ষান্তরে প্রাপ্ত সফলতাকে গলা টিপে মেরে ফেলেন। সফলতা সন্তানের মতো। একে প্রতিনিয়ত আপন স্নেহে লালন করতে হয়।

শিক্ষক ও শিক্ষা
অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন সৈয়দ আবুল হোসেনের শিক্ষক, আবার খোয়াজপুর সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। এক সাক্ষাৎকারে সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন বললেন, ‘সৈয়দ আবুল হোসেন আমাকে খুব ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন, বিশ্বাস করেন। তার মতে আমি নাকি ভালো শিক্ষক। আমি মনে করি, সে ভালো ছাত্র বলেই আমি ভালো শিক্ষক।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি আমাকে এত শ্রদ্ধা করো কেন?’
সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছিলেন, ‘আপনি আমার শিক্ষক।’
আমি বলেছিলাম, ‘তোমার তো আরও অনেক শিক্ষক আছে।’
এর উত্তরে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছিলেন, ‘তিনিই শিক্ষক যিনি কঠিন জিনিস সহজভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। তিনিই শিক্ষক যিনি শিক্ষক-ছাত্র দূরত্বকে জ্ঞানের রশ্মি দিয়ে একাকার করে দেন। আপনার সে যোগ্যতা আছে।’১১

অন্যায় যে করে
তদ্বির আর তদ্বির। মাঝে মাঝে তদ্বিরকারীদের জ্বালায় মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন প্রাত্যহিক জরুরি কাজেও সময় দিতে পারেন না। তদ্বিরের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি আমার স্বাধীন চিন্তায় বিঘ্ন ঘটায়। আমি ম্যানেজার এবং লিডার। তার চেয়ে বড় কথা আমি পরবর্তী জেনারেশনকে আমার জেনারেশনের চেয়ে আরও প্রগতিশীল, উন্নত এবং আকর্ষণীয় দেখতে চাই। গধহধমবসবহঃ রং ফড়রহম ঃযরহমং ৎরমযঃ; ষবধফবৎংযরঢ় রং ফড়রহম ঃযব ৎরমযঃ ঃযরহমং. আমি ঠিক কাজটাই করব। কোনো প্রভাবের কাছে মাথা নত করব না। একজন প্রকৃত আওয়ামী লীগার কখনও অন্যায় প্রভাবের কাছে মাথা নত করেন না। বঙ্গবন্ধু করেননি, আমার নেত্রী শেখ হাসিনা করেননি। আমি তাঁদের অনুসারী। আমিও করব না। তবে আমি এ সমাজের একজন মানুষ। সমাজকে উপেক্ষা করে চলতে পারি না। তবু যেটি আমি উচিত নয় বলে মনে করি সেটি না-করার চেষ্টা করি। যেটি অন্যায় বলে মনে হয়, সেটি প্রতিহত করার চেষ্টা করি। আমি যেসব পারি বা পারব তা নয়, কিন্তু তাই বলে আমাকে চুপ মেরে বসে থাকলে চলবে না।
অন্যায় যে করে অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।

দেশের চেয়ে বড় কিছু নেই
আলোচনা হচ্ছিল বিভিন্ন বিষয়ে। এক সময় আলোচনায় চলে আসে রাজনীতি ও গণতন্ত্র। আলোচনাক্রমে চলে আসে রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়কের কথা। মাননীয় মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বললেন, আমি রাজনীতি করি সেজন্য রাজনীতিবিদ। তবে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে আমি শুধু রাজনীতিবিদ নই, স্টেটসম্যানও বটে। তাই আমাকে আমার ভোটার, পরবর্তী নির্বাচন ও পরবর্তী প্রজন্ম তিনটার দিকে লক্ষ্য রাখতে হয়। অ ঢ়ড়ষরঃরপরধহ ষড়ড়শং ভড়ৎধিৎফ ড়হষু ঃড় ঃযব হবীঃ বষবপঃরড়হ. অ ংঃধঃবংসধহ ষড়ড়শং ভড়ৎধিৎফ ঃড় ঃযব হবীঃ মবহবৎধঃরড়হ. আমার রাজনীতি দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, বর্তমানের জন্য এবং ভবিষ্যতের জন্য। আগে দেশ তারপর রাজনীতি। নেত্রী আমাকে এ শিক্ষাই দিয়েছেন। দেশের উন্নতি ঘটলে জনগণের উন্নয়ন আসবে। বঙ্গবন্ধুর জীবন হতে আমি এ শিক্ষা পেয়েছি যে, দেশের চেয়ে বড় কিছু নেই। তাই দেশকে গড়ার লক্ষ্যে আমি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছি।

ক্ষমতা
ক্ষমতার বহু সংজ্ঞা আছে। বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্নভাবে ক্ষমতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। দাতা, শিক্ষানুরাগী, রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং সর্বোপরি ব্যবসায়ী ও ব্যাংকার হিসেবে তিনি বহুমাত্রিক ক্ষমতার অধিকারী। এরূপ ব্যক্তিবর্গ সাধারণত ক্ষমতাকে সুসংহতরূপে ব্যবহার করতে পারেন না। সৈয়দ আবুল হোসেন প্রাত্যহিক জীবনে ক্ষমতার প্রয়োগ ও ব্যবহারে যেমন সচেতন তেমনি জনকল্যাণমুখী। তিনি মনে করেন- চড়বিৎ রং ঃযব ধনরষরঃু ঃড় ফড় মড়ড়ফ ঃযরহমং ভড়ৎ ড়ঃযবৎং.

১. এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন অফিসারদের সাথে অনানুষ্ঠানিক আলাপে।
২. কালকিনিতে জনগণের বিশাল সংবর্ধনা দেয়ার পর পত্রিকায় সমালোচনা হলে
তদপরিপ্রেক্ষিতে আলাপ প্রসঙ্গে।
৩. মন্ত্রণালয়ে কয়েকজন অফিসার ও রাজনীতিবিদের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে।
৪. কমিউটর ট্রেন উদ্বোধনের লক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ যাবার পথে ট্রেনে কথাপ্রসঙ্গে
আলাপক্রমে।
৫. মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সৈয়দ আবুল হোসেন।
৬. মন্ত্রণালয়ের অফিসকক্ষে সচিব ও অতিরিক্ত সচিবের সাথে আলাপ প্রসঙ্গে।
৭. মন্ত্রণালয়ে নিজস্ব অফিস কক্ষে, ৯/৬/২০১০ খ্রিস্টাব্দ।
৮. গোপালগঞ্জ যাবার পথে গাড়িতে।
৯. বসিলায় তৃতীয় বুড়িগঙ্গা সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আসার পূর্বে কয়েকজন নেতা
ও প্রকৌশলীগণের সাথে আলাপ।
১০. আবুল হাসান চৌধুরী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
১১. অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন, সাক্ষাৎকারে।

দ্বি তী য় অ ধ্যা য়

You Might Also Like