সময়ের পরশপাথর

সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্য শুভেচ্ছা
কবীর চৌধুরী

রাজনীতি ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ক্ষেত্র। এতে লক্ষ্য থাকে, উদ্দেশ্য থাকে, থাকে তা পূরণের কৌশল, পদ্ধতি ও কার্যক্রম। যে বিষয়টি এককভাবে সম্ভব হয় না, যা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে সর্বসাধারণের সমর্থন প্রয়োজন, সেটি মানুষ রাজনীতিক দলের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পূরণের চেষ্টা করে। এর মাধ্যমে এক দল মানুষ আর্থ-সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোসহ দৈনন্দিন জীবনের সাবলীল পরিসঞ্চালনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি ও স্বাচ্ছ্যন্দময় সমাবেশ ঘটানোর মাধ্যমে জীবনযাত্রা শান্তিপূর্ণ করে তুলতে চেষ্টা করে।
যত মত তত পথ- এ প্রবাদের মতো রাজনীতিক দলও বহু। মতভিন্নতার কারণ দলভিন্নতা। এতে ক্ষতি নেই, বরং আছে বৈচিত্র্য, যা পৃথিবীকে নানা সম্ভারে সমৃদ্ধ করেছে। বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্র পরিচালনার জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে গণতন্ত্র। এটি নিয়ে যতই আলোচনা-সমালোচনা থাকুক না কেন, এখনও এর চেয়ে উত্তম কোনো উপায় মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি। আব্রাহাম লিংকনের ভাষায়- গভর্নমেন্ট অব দি পিপল, বাই দি পিপল অ্যন্ড ফর দি পিপল- শব্দগুলিই গণতন্ত্রের ভিত্তি। তাই এখানে প্রয়োজন পরমত সহিষ্ণুতা প্রকাশের মতো উদার মন।
রাষ্ট্র সবার জন্য, ধর্ম ব্যক্তির। রাষ্ট্রকে ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ করে দিলে সমষ্টির সামষ্টিকতা ব্যক্তির মতো ক্ষুদ্র গণ্ডিতে এসে অর্থহীন হয়ে যায়। রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য উন্নয়ন সহায়ক ঐক্য। যেখানে ব্যক্তি সমষ্টিতে এসে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু আত্ম-অহমিকা ও গোঁড়ামি ঐক্যকে নষ্ট করে দেয়। ধর্মীয় গোঁড়ামি, উগ্রজাতীয়তাবাদ ও আত্ম-অহমিকা মানুষকে হিংস্র পশুর চেয়েও নৃশংস করে তোলে। এটা আমরা দেখেছি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, পঁচাত্তরের কালো রাত্রে, ২১ আগস্টে। ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি ও মৌলবাদীরা পৃথিবীর অন্যতম শত্রু, প্রগতির বাধা। এরা স্বাধীন চিন্তার লোকদের বিকশিত হতে দেয় না।
রাজনীতিতে দলীয়করণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না, যেমন অস্বীকার করা যায় না জাতীয়তাবাদের তত্ত্বকে। তবে অতিমাত্রার দলীয়করণ উগ্র-জাতীয়তাবাদের মতোই ভয়ঙ্কর। গণতন্ত্রে রাজনীতিক দলের উদ্দেশ্য থাকে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে অধিক লোকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এটি কার্যকরভাবে নিশ্চিত করতে হলে অতিমাত্রায় দলীয়করণ অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। নিজের দলের লোকের সাথে সাথে ভিন্নমতাবলম্বীদেরকেও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে হবে। তাদের কাছে টেনে আনার প্রয়াস সযত্নে অব্যাহত রাখতে হবে। সবার প্রতি সহনশীল মনোভাব পোষণ না-করলে, ভিন্নমতাবলম্বীদের গুরুত্ব না-দিলে, গণতন্ত্র কেন, সব তন্ত্র নিষ্ফল হতে বাধ্য। রাজনীতির রুক্ষ মাঠে খেলতে গিয়ে অনেক রাজনীতিবিদকে ভণ্ডামির আশ্রয় নিতে দেখি। রূপ বদলায় প্রতিনিয়ত, সংকীর্ণ স্বার্থের জন্য আদর্শকে জলাঞ্জলি দিতে, এমনকি মানবতার কলঙ্ক ঘটাতেও, দ্বিধাবোধ করে না তারা সৈয়দ আবুল হোসেনের মধ্যে এমন ভণ্ডামি নেই। তিনি রাজনীতি আদর্শের জন্য কারও প্রতি তার বিদ্বেষ নেই। দল মত ও জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবার প্রতি সম-আচরণ দ্বারা এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন তিনি দেখেন, যেখানে সহনশীল অবস্থানের মাধ্যমে প্রত্যেকে অপরকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করার পরিবেশ খুঁজে পাবে।
গ্রাম দেশের প্রাণ। কিন্তু আমরা অনেকে ভুলে যাই গ্রামের কথা, গ্রামের মানুষের কথা। এটি আমাদের দেশের শহরমুখী প্রবণতার অন্যতম কারণ। ফলে গ্রামগুলি আজ অনেকটা মেধাশূন্য, কর্মশূন্য। ভালো শিক্ষালয় নেই গ্রামাঞ্চলে। নেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির উপযুক্ত ক্ষেত্র। ঢাকা আজ মানুষের চাপে প্রায় বিধ্বস্ত। এ অবস্থার জন্য শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দায়ী করলে চলবে না। গ্রামের প্রতি বুদ্ধিমান ও সামর্থ্যবান মানুষের অবহেলাও কম দায়ী নয়। মানুষের অত্যাবশ্যকীয় সুবিধাসমূহ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে পারলে, শহরের উপর মানুষের চাপ কমবে। উন্নয়ন বিকশিত হবে সর্বত্র। কেবল তখনি দেশ প্রকৃত উন্নয়নের স্বাদ পাবে। সৈয়দ আবুল হোসেন নিজ গ্রামে আধুনিক মানসম্পন্ন স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, হাসপাতাল এবং অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সে পথে অগ্রসর হচ্ছেন। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে তিনি ৬টি কলেজ এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার এ উদ্যোগ দেশের পশ্চাদপদ এলাকা মাদারীপুর-কালকিনি ও নিকটবর্তী অঞ্চলসমূহের নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান- সন্ততিদের শিক্ষা লাভের সুযোগ করে দিয়েছে। বিত্তবানরা সৈয়দ আবুল হোসেনের উদাহরণ অনুসরণ করলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
সৈয়দ আবুল হোসেন প্রতিষ্ঠিত কলেজসমূহের মধ্যে ডিকে সৈয়দ আতাহার আলী অ্যাকাডেমি অ্যান্ড কলেজ অন্যতম। কলেজ প্রতিষ্ঠার পর শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। কলেজে দু’জন মহিলা শিক্ষিকার থাকার মতো কোনো সুবিধাজনক আবাস ছিল না। তারা ভীষণ অসুবিধায় পড়ছিলেন। বিষয়টা জানতে পেরে সৈয়দ আবুল হোসেনের মা সুফিয়া খাতুন শিক্ষিকা দু’জনকে নিজের ঘরে কন্যার মতো স্থান দেন। শিক্ষিকা দু’জন ছিলেন হিন্দু। সুফিয়া খাতুন প্রাচীন কালের মহিলা। লেখাপড়া বেশি করেননি। এ রকম অবস্থায় ডাসারের মতো অজপাড়া গাঁয়ে তিনি তাঁর কক্ষে দু’জন হিন্দু মহিলাকে রাখার যে স্বতঃস্ফূর্ত সাহসিকতা দেখান তা বিস্ময়কর। তারই গর্ভে জন্ম সৈয়দ আবুল হোসেনের। মায়ের মৃত্যুর পর সৈয়দ আবুল হোসেন মায়ের সে ঘরটিকে পরিণত করেছেন শিক্ষিকা হোস্টেলে। সৈয়দ আবুল হোসেন ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি। তিনি জানেন, ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি ন্যাক্কারজনক। মানুষের বড় পরিচয় মনুষ্যত্বে।
ভদ্র, মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন, সহৃদয় ও সুশীল আচরণ মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশের প্রধান উপায়। মানুষ ও পশুর মধ্যে যতই পার্থক্য থাকুক না কেন, আচরণ দ্বারাই বোঝা যায়, কে মানুষ আর কে পশু। শক্তি পশুকে যেমন হিংস্র করে তোলে, তেমিন অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতাও অনেক মানুষকে হিংস্র করে তুলতে দেখা যায়। ইতিহাসে এর অনেক প্রমাণ আছে। কিন্তু যারা মানুষ, মনুষ্যত্ববোধে যাদের অন্তর উজ্জীবিত, তারা অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের সাথে সাথে বিনয়ী হয়ে ওঠে। শুধু পরিব্যাপ্তি নয়, পরিব্যাপ্তির সাথে সাথে গভীরতা থাকতে হয়। গভীরতাহীন পরিব্যাপ্তি ও পরিব্যাপ্তিহীন গভীরতা দুটোই বিপজ্জনক। সৈয়দ আবুল হোসেন যেমন গভীর তেমনি পরিব্যাপ্ত। তিনি অমায়িক। ক্ষমতা ও বিত্ত তাঁকে বিনয়ী করেছে। এক সময় তাঁর সঙ্গে আমার মোটামুটি ভালো পরিচয় ছিলো। পরে তা শিথিল হয়ে যায়। কিন্তু এখনও আমি তাঁর বিভিন্ন কর্ম ও উদ্যোগের খবর রেখেছি। আমি তার জনকল্যাণমূলক কাজের সফলতা কামনা করি।

কবীর চৌধুরী : জাতীয় অধ্যাপক

ধন্যবাদ সৈয়দ আবুল হোসেন
বেগম সুফিয়া কামাল
বিস্তারিত সিন্ধুর মতো মানব জীবন। কত বর্ণে, ছন্দে-হিল্লোলে, তরঙ্গে তরঙ্গে তার গতি। তেমনি প্রত্যেক মানুষেরই জীবন প্রবাহ বিচিত্ররূপে প্রবাহমান। তারই মধ্যে ব্যতিক্রমও আছে, এক একটি মানুষের জীবন থেকে সহস্রদল পদ্মের মতো বিকশিত বিস্তারিত হয় নানাবর্ণ। নানা রূপ, নানা কথা, হয়ে ওঠে ইতিহাস, হয়ে যায় কিংবদন্তি। সেই মানুষের কয়েক জনের মধ্যে একজন জন্মেছিলেন যার নামই ইতিহাস। সেই নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচয় দিতে বা তাঁর জীবনী আলোচনা করার জন্যে তার কথা বলা হচ্ছে না, বাংলাদেশকে স্বাধীন করে আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়ে শূন্য হাতে তিনি শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে রেখে গিয়েছেন।
শেখ হাসিনা আজ সর্বজন প্রিয় সংগ্রামী নেত্রী। আমাদের একান্ত আপন। সকলের মিলিত মঙ্গল প্রার্থনা তার জন্য সতত উচ্চারিত হচ্ছে। তার গুণগ্রাহীর অভাব নেই, তেমনি তার দোষ ত্রুটি নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রƒপ করার লোকেরও অভাব নেই। বিশ্বে যারাই প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন, তাদের জীবনের এ ঘটনা অপরিহার্য।
শেখ হাসিনার জীবন ঘটনাবহুল। বড় দুঃখ, বড় সংকটের মধ্য দিয়ে তার পদচারণা। তাকে নিয়ে আজ আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেন যে প্রশস্তি রচনা করেছেন, তাতে করে হাসিনার প্রতি হোসেন সাহেবের অপরিসীম মমতা ও শ্রদ্ধার অনাবিল প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু হাসিনার জীবন বহু কর্তব্য, বহু বক্তব্য, বহু কর্মকাণ্ডে এখন ব্যস্ত; বিকশিত, বিস্তারও হবে। কঠোর, কুটিল, বক্র, সর্পিল পথ ধরে বহন করে হাসিনার বহমান জীবনের প্রতিচ্ছবি আমাদের উপহার দিবেন প্রত্যাশা করি।
এ গ্রন্থে সৈয়দ আবুল হোসেন আমাদের যতটুকু দিয়েছেন, তার জন্য বার বার তাকে ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছা হয়। আল্লাাহ তাকে এ পথযাত্রায় সাহসী পাথেয় দান করুন, এ প্রার্থনা করি।

বিশেষ দ্রষ্টব্য : আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের লেখা ‘শেখ হাসিনা সংগ্রামী জননেত্রীর প্রতিকৃতি’ নামক গ্রন্থের ভূমিকায় বাংলাদেশের প্রখ্যাত মহিলা কবি বেগম সুফিয়া কামাল।

শুভেচ্ছা
আনিসুজ্জামান
সৈয়দ আবুল হোসেনের সম্মাননায় একটি সংকলনগ্রন্থ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সেই উপলক্ষে দু’টি কথা।
তিনি যখন প্রথম দফায় বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী নিযুক্ত হন, তখন তাঁর সঙ্গে আমার যথাযথ পরিচয় ঘটে। তাঁকে সদালাপী ও সুরসিক মনে হয়।
তারপর কী এক গোলযোগে তিনি পদত্যাগ করলেন। ব্যাপারটা যে গুরুতর নয়, তা বোঝা গেল মন্ত্রীর পদে তিনি দ্বিতীয়বার অধিষ্ঠিত হওয়ায়। এবার তিনি নিলেন যোগাযোগ মন্ত্রণায়ের দায়িত্ব। তারপর একদিন বললেন, তিনি যাত্রাবাড়ি ঘুরে এসেছেন, কোথাও যানজট পাননি। আমরা হতবাক।
এক আমন্ত্রণে তাঁর দেখা পেয়ে কথাটা পাড়লাম। জানতে পারলাম, তিনি খুব সকালে অফিসে রওয়ানা হন, বেশ রাত করে ঘরে ফেরেন। তাই যানজট দেখতে পান না। মনে প্রশ্ন এলো, দিনের মধ্যে কখনো কি তাঁকে বের হতে হয় না? মনে এলেও প্রশ্নটা আর করা হয়নি।
আমার আগের প্রশ্নের উত্তর যে তিনি প্রসন্নভাবে দিলেন, তাতেই বাধিত হলাম। তারপর আবার যখন দেখা হয়েছে, সহাস্যবদনেই তিনি আলাপ করেছেন। বোঝা যায়, তিনি অতি ভদ্র মানুষ।
এখন জানছি, শুধু তাই নয়, তিনি একজন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিও। তাঁর এলাকায় তিনি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, জ্ঞানের আলো ছড়াতে সাহায্য করেছেন। শুধু ধন থাকলেই যে মানুষ সৎকাজ করতে পারে, তাই নয়। মনও থাকা চাই। সৈয়দ আবুল হোসেনকে তাই আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। জনহিতে তিনি নিরলস থাকুন, দীর্ঘজীবী হোন।

আনিসুজ্জামান : এমেরিটাস অধ্যাপক ও গবেষক

নিপাট ভদ্রলোক
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার আমগাঁও গ্রামে আমার জন্ম। প্রশাসনিক বিবর্তনে আমগাঁও এখন মাদারীপুর জেলার কালকিনি উপজেলায় ঠাঁই পেয়েছে। এটি সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেবের সংসদীয় এলাকা। দেশ বিভাগ না-হলে আজ আপনাদের মতো আমিও বলতে পারতাম- আমার দেশ বাংলাদেশ।
প্রত্যন্ত আমগাঁও ছিল সবুজ শ্যামলে অপরূপ। মনে হয় এখনও তেমন আছে। মনে পড়ে আমগাঁও; ছোট ছোট মেটো পথ, সারি সারি গাছ, নদীর তীর, পাখির নীড়। দেখতে পাই সহজ সরল কৃষাণ-কৃষাণীরা রূপোলি ধানের হাতছানিতে ছুটে যাচ্ছে মাঠে। মনে পড়ে শীতের সকাল, শরতের দুপুর। সোদা গন্ধভরা বাংলাদেশ আমাকে এখনও টানে, জন্মভূমির টান, নাড়ির টান। ভুলতে পারি না ছেলেবেলার সে আমগাঁও, পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি। কত সুখ, কত স্মৃতি, কত বন্ধু, কত প্রীতি ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশে। সময়ের স্রোতে অনেক কিছু আস্তে আস্তে স্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। শুধু জেগে আছে কান্নায় মোড়া একঝাঁক দুঃখ।
সৈয়দ আবুল হোসেন বয়সে আমার ছোট। তাঁকে আমি কয়েক বার দেখেছি। উনি খুবই শ্রদ্ধেয় এবং বিরাট মাপের মানুষ। শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ আমাকে মুগ্ধ করেছে। অর্থ আর ক্ষমতা অনেককে অহমিকার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে দেয়। সৈয়দ আবুল হোসেন অর্থ ও ক্ষমতা দুটোর অধিকারী। তবু তিনি বিরাট মনের নিপাট ভদ্রলোক। কোনো অহমিকা নেই। শিশুর মতো সরল। জ্ঞানীর মতো বিনয়ী। যতবার দেখেছি তাই মনে হয়েছে। সদাহাস্য প্রফুল্ল মনের এ মানুষটির মুখ আমার স্মৃতিকে নাড়া দেয়। মনে পড়ে যায় বাংলাদেশের কথা, বাংলাদেশের মুখ।
উনি উচ্চ শিক্ষিত আবার স্বশিক্ষিত। তাই মনটা অনেক বড়। যারা বড় মনের তারা অন্যকেও বড় ভাবতে পারেন। জ্ঞানী ও যোগ্য লোককে সম্মান দিতে জানেন। আমি মাদারীপুর গিয়েছিলাম। তার আতিথেয়তার কথা ভুলব না। বাংলাদেশের মানুষ আমাকে উজাড় করে দিয়েছিলেন সবটুকু ভালোবাসা।
সৈয়দ আবুল হোসেন একজন জনদরদি নেতা। সাধারণ মানুষের প্রতি রয়েছে গভীর ভালোবাসা। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি লাভ করতে পারে না। তাই শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি গ্রামাঞ্চলে অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। শিক্ষার মাধ্যমে জাতিকে মুক্তির প্রচেষ্টা সৈয়দ আবুল হোসেনকে স্মরণীয় করে রাখবে।
শিক্ষা মানুষকে উদার করে। সৈয়দ আবুল হোসেন একজন শিক্ষিত মানুষ। তাই উদারমনা। তিনি ধর্মপরায়ণও বটে। ধর্মপরায়ণতা অনেককে সংকীর্ণ করে তোলে। তবে উনাকে সংকীর্ণ করতে পারেনি বরং উদার করেছে। প্রকৃত ধার্মিকেরা জ্ঞানীর মতোই উদার। অসাম্প্রদায়িক চেতনা উনাকে আরও বড় করেছে। আমি যখন মাদারীপুর গিয়েছিলাম তখন দেখেছি দলমত ধর্মনির্বিশেষে সবাই সৈয়দ আবুল হোসেনকে কেমন গভীর শ্রদ্ধা করেন।
সৈয়দ আবুল হোসেন সম্মাননা গ্রন্থ ‘সময়ের পরশপাথর’ প্রকাশ একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এটি সময়ের একটি দাবি পূরণ করল। যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্য সম্মান প্রদর্শন মহানুভবতার পরিচায়ক। যারা মহানুভবÑ তারাই কেবল এ কাজটি করতে পারেন। গুণীর কদর কম হলে গুণীর সংখ্যাও কমে যায়। সৈয়দ আবুল হোসেনকে সম্মান প্রকাশের এ উদ্যোগে আমি খুশি হয়েছি। তার সম্মাননা গ্রন্থ প্রকাশ উপলক্ষে আমাকে স্মরণ করায় সবাইকে সবিনয় শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আমি এ শুভ উদ্যোগের সাফল্য কামনা করি। দীর্ঘায়ু কামনা করি সৈয়দ আবুল হোসেনের।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় : কবি ও উপন্যাসিক

আমার ভালোলাগা একজন
আবদুল মান্নান সৈয়দ
মফিজ চৌধুরী ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রীসভার অন্যতম সদস্য। ভদ্রলোক ভালো লিখতেন, ভালো বলতেন। কয়েকটি বিদেশি ভাষা জানতেন তাই ভালো অনুবাদকও ছিলেন। তবে অনুবাদ করতেন জাহাঙ্গীর চৌধুরী নামে। বয়সে বড় হলেও ছিলেন অনেকটা বন্ধুর মতো। আড্ডায় মাঝে মাঝে সৈয়দ আবুল হোসেনের কথা বলতেন; বলতেন- মাদারীপুরের ছেলে, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষানুরাগী। মফিজ চৌধুরীর মুখে আমি প্রথম সৈয়দ আবুল হোসেনকে জানার সুযোগ পাই। এরপর পত্র-পত্রিকা বা পর্দায় সৈয়দ আবুল হোসেন প্রসঙ্গ আসলে মনোযোগ না-দিয়ে পারতাম না।
১৯৮৯ সালে মাদারীপুর জেলার খোয়াজপুরে সৈয়দ আবুল হোসেন একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন- মফিজ চৌধুরীর কথাটি আমি খুব হালকাভাবে নিই। কলেজ অনেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং করে যাচ্ছেন। তাই প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গটি তেমন গুরুত্বের দাবি রাখে না। তবে এ কলেজটি গুরুত্বের দাবি রাখে। এর কারণ প্রতিষ্ঠাগত নয়, প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী ফলগত, পরিচর্যা এবং উদ্দেশ্যগত। ১৯৯১ সালে কলেজটির ছাত্রছাত্রীরা প্রথম বারের মতো বোর্ড পরীক্ষায় অংশ নেয়। প্রথম বারেই বাজিমাত। বোর্ডের মেধা তালিকার দু’টি শীর্ষ স্থান দখল করে নেয়- সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ, খোয়াজপুর। সারা বাংলাদেশে সাড়া পড়ে যায়, আসলে সাড়া পড়ারই ঘটনা। এর পরের বছর আরও ভালো রেজাল্ট করে কলেজটির ছাত্র-ছাত্রীরা, পরের বছর আরও, পরের বছর আরও…। সংগত কারণে ১৯৯২ সাল হতে সৈয়দ আবুল হোসেন দেশব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠে তার সৃষ্টির মাধ্যমে। এ জন্য বলা হয়-
স্রষ্টার কৃতিত্ব সৃষ্টি
জাতির ঐতিহ্য কৃষ্টি।
সাকো ইন্টারন্যাশনাল লিঃ সৈয়দ আবুল হোসেনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
বিশ্বস্ততা ও দক্ষতার জন্য বিদেশেও এর সুনাম রয়েছে। শুধু ব্যবসা করার জন্য তিনি সাকো প্রতিষ্ঠা করেছেন, এটি ঠিক নয়। সাকো প্রতিষ্ঠার পেছনে তার উদ্দেশ্য ছিল জনকল্যাণ। তাই সাকো শুধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়। একই কারণে সৈয়দ আবুল হোসেনও অন্য দশজন ব্যবসায়ীর মতো শুধু ব্যবসায়ী নন। অনেকে মুখে বড় বড় বুলি আউড়ে থাকেন, কিন্তু কাজের সময় ডুমুরের ফুল হয়ে যায়। ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা- এ বিষয়ে বড় সেয়ানা। মুখে বলেন একটা, কাজ করেন অন্যটা। সৈয়দ আবুল হোসেন কিন্তু কথা ও কাজে এক। দেশে তার চেয়ে ধনী অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি আছেন। তাদের কয়জন সৈয়দ আবুল হোসেনের মতো শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন?
ছাত্রজীবন শেষ করে (১৯৭২) টিসিবি-তে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন। বেশিদিন চাকুরি করেননি। চাকুরি করে ভাত খাওয়া যায়, খাওয়ানো যায় না কাউকে। যারা খেতে ও খাওয়াতে চান তাদের জন্য চাকুরি উপযুক্ত পেশা হতে পারে না। মনে হয় তিনি এটি বুঝেছিলেন। তাই সময় থাকতে চাকুরি ছেড়ে ব্যবসায় নেমেছিলেন। সরকারি চাকুরি করে অঢেল অর্থের মালিক হয়েছেন- এমন অনেক লোক দেখা যায়। অভিজাত এলাকায় আলিশান বাড়ি, বিদেশে পরিবার, বিলাসবহুল গাড়ি…। সরকারি চাকুরি করে এসব করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ চাকুরেদের বেতন টেনে-টুনে খেয়ে-পরে চলার পক্ষেও যথেষ্ট নয়। তো ওগুলো আসবে কোত্থেকে? সুতরাং তাদের কেউ ঐ ধন বৈধ পথে আয় করেনি। অবশ্য জানতে চাইলে বলেন- শ্বশুর দিয়েছেন, শ্যালিকার স্বামী দিয়েছেন। মিথ্যা কথা। অবৈধ আয় কখনও ভালো কাজে ব্যয় করা যায় না, মিথ্যুক জন সৎ কাজ করতে পারেন না। যাদের ভালো কাজ করার ইচ্ছা থাকে, তারা ঘুষ নিতে পারেন না। যদি কোনো ঘুষখোর কিংবা অবৈধ উপার্জনকারী কল্যাণমূলক কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেন, তার উচিত ঘুষ কিংবা অবৈধ উপার্জন ত্যাগ করা। তাদের জন্য এর চেয়ে ভালো কাজ আর কিছু হতে পারে না।
এবার প্রসঙ্গে ফেরা যাক। অর্থ উপার্জন করে সমাজ সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার জন্য সৈয়দ আবুল হোসেন ব্যবসায় নেমেছেন- এটি তার নিজের উক্তি। অন্যান্য ব্যবসায়ীর মতো তার উক্তি শুধু শব্দমালায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়নি। অন্তত পরবর্তী কার্যক্রম তা-ই বলে। সমাজসেবায় উৎসর্গিত হবার জন্য তিনি ব্যবসায় নেমেছেন- এটি তিনি কার্যে পরিণত করে প্রমাণ করেছেন। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীর মতো সৈয়দ আবুল হোসেন কথা ও কাজের মধ্যে ফাঁক রাখতে পারেননি। এ জন্য তার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল, প্রচ্ছন্ন একটা শ্রদ্ধাবোধও ছিল।
১৯৯৪ সালের শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সৈয়দ আবুল হোসেনের সহমর্মিতা শিক্ষক সমাজে তিনি স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন। বিরতিহীনভাবে সাত দিন চলেছিল সমাবেশ। সে আন্দোলনের মঞ্চে উপস্থিত হয়ে তিনি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, ক্ষুধার্ত শিক্ষকদের খাবার ও ঔষধ পথ্যের ব্যবস্থা করেছিলেন। অনশনরত শিক্ষকগণের বৃষ্টিতে ভেজার খবর পেয়ে ব্যবস্থা করেছিলেন পলিথিনের। বরিশাল হতে সমাবেশে আসার পথে একজন শিক্ষক অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। সৈয়দ আবুল হোসেন সে শিক্ষকের স্ত্রীকে নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা প্রদান এবং সন্তান-সন্ততিদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার এসব কাজ শিক্ষকগণ অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করেছিলেন। যা তাকে শিক্ষক সমাজে মহানুভব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। শিক্ষক সমাজের প্রতি সৈয়দ আবুল হোসেনের শ্রদ্ধা ও মমত্ববোধের কথা অনেক সহকর্মী আমাকে উচ্ছ্বসিত প্রশংসার সাথে বলেছেন। শিক্ষক হিসেবে এটি আমাকে অভিভূত করেছে। শিক্ষকদের কেউ গুরুত্ব দেয় না- সৈয়দ আবুল হোসেন গুরুত্বহীন শিক্ষকদের গুরুত্ব দিয়েছেন, বিপদে কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাই তিনিও গুরুত্বের দাবি রাখেন। এ বিষয়টি শিক্ষক হিসেবে আমাকে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলেছে। তাই তাকে আমার ভালো লাগে।
প্রায় সাড়ে তিনশ শিক্ষক-কর্মচারী তার বিভিন্ন কলেজে অধ্যয়ন পেশায় নিয়োজিত। শিক্ষকগণ তার অধীনস্ত। তবে তিনি তাদের অধস্তন মনে করেন না, মনে করেন তার শিক্ষক। তাই সব শিক্ষককে নিজের শিক্ষকের মতো শ্রদ্ধা করেন, গুরুত্ব দেন, তাদের জাতি গঠনের কারিগর আখ্যায়িত করে প্রকাশ্যে স্বীকৃতি দেন। ছাত্রজীবনেও তিনি শিক্ষক-অন্ত-প্রাণ ছিলেন। মন্ত্রী হয়েও পা ছুঁয়ে সম্মান দেখান শিক্ষকদের. বিপদে-আপদে সহায়তা দেন আন্তরিক আগ্রহে। শিক্ষক সমাজ এখন ছাই ফেলার ভাঙা কুলোর মতো, শিক্ষক পেশাকে ভাবেন ঢেঁকি গেলা। ক্ষমতা ও বিত্ত অর্জনের ক্ষেত্র কম থাকায় সাধারণ লোকেরাও শিক্ষকদের গুরুত্ব দেন না। গুরুত্বহীন শিক্ষক সমাজের প্রতি যার সহমর্মিতা রয়েছে, শ্রদ্ধা রয়েছে তিনি ভালো লোক না-হয়ে পারেন না। তাই তাকে আমার ভালো লাগে।
রাজনীতিবিদগণের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট যেমন নিষ্ঠুর তেমন দীর্ঘস্থায়ী। সামন্ত যুগ, রাজা-বাদশা ও জমিদারগণের শোষণ এখনও রূপকথার শিউরে ওঠা প্রচ্ছদ। ব্রিটিশ শাসকদের অত্যাচার ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায়। পাকিস্তান আমলে তা রুদ্ররূপ ধারণ করেছিল। সদ্য স্বাধীন কিন্তু বিধ্বস্ত বাংলাদেশের বিনির্মাণে সহায়তার পরিবর্তে দেশদ্রোহী ও ধর্মান্ধদের নৃশংসতার কথা জাতি কখনও কী ভুলতে পারবে? সামরিক আইনের পর সামরিক আইন গণতন্ত্রকে বিপন্ন করেছে বার বার। কয়টা নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়েছে বাংলাদেশে? রাজনীতিবিদগণের অহংবোধ, ক্ষমতার আস্ফালন, অপব্যবহার, ধর্মীয় গোঁড়ামি কোনোটি জনগণ ভালো চোখে দেখেননি। রাজনৈতিক হানাহানি এক সময় বর্গী আতঙ্কের চেয়েও প্রকট হয়ে উঠেছিল। এ কারণে অধিকাংশ রাজনীতিবিদ জনগণের আস্থার বাইরে রয়ে গেছে। এ সময় সৈয়দ আবুল হোসেন একজন রাজনীতিবিদ হয়েও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংসদীয় এলাকা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, সহনশীল অবস্থান ও উদার মনের পরিচয় দিয়েছেন। প্রতিপক্ষকে বুকে টেনে নিয়েছেন। তা আমাকে অভিভূত না-করে পারেনি। এ জন্য তাকে আমার ভালো লাগে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হলেও সাকো আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, সাকো শুধু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশের আর্থসামাজিক ভিত মজবুত করার একটি খুঁটি। যেটি শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন সৈয়দ আবুল হোসেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ এনজিও সেবার আড়ালে ভোগের ক্যাসিনো, কাবুলিওয়ালাদের মতো সুদের কারবারে নিয়োজিত। চোখে তো তাই দেখি। এক্ষেত্রে এসডিসি একটি সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান- আয়ের জন্য নয়, ত্যাগের জন্যই যেটি নিবেদিত। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যায় জনমত সংগ্রহ, প্রতিবেদন তৈরি এবং প্রায়োগিক গবেষণা পরিচালনা করে সমস্যার উৎস খুঁজে বের করা এর আরেকটি উদ্দেশ্য। শিক্ষা আলোকিত সমাজ ও উন্নত জাতি গঠনের পূর্বশর্ত। শিক্ষা মানুষের পাশবিক গুণাবলীকে দুরীভূত করে মানুষকে যৌক্তিক করে তোলে। আগামী প্রজন্মকে শিক্ষিত ও দক্ষ জনসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে নারী শিক্ষার বিকল্প নেই। সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, ‘দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। অর্ধেককে অন্ধকারে রেখে কোনো জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। সম্ভব নয় সার্বভৌম আর্থ-সামাজিক ভিত প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য প্রয়োজন নারীর ক্ষমতায়ন। কেবল শিক্ষার মাধ্যমে সর্বোত্তম উপায় ও সর্বনিম্ন সময়ে নারীর ক্ষমতায়ন টেকসই করা যায়।’ ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি একটি শিক্ষিত জাতি দেব’- নেপোলিয়নের এ উক্তিটি সৈয়দ আবুল হোসেন খুব গুরুত্বের সাথে মনে রাখেন। একজন শিক্ষিত মায়ের পক্ষে এক জন সন্তানকে যত দক্ষ ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব, একজন শিক্ষিত পিতার পক্ষে তা সম্ভব নয়। কারণ, শিশুরা মায়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও নিবিড় পরিচর্যা যত বেশি সময় পায় পিতার নিকট হতে তত সময় পায় না। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, শিশুদের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মা তথা নারীর বিকল্প আর কিছু হতে পারে না। সৈয়দ আবুল হোসেন আরও মনে করেন, ‘যিনি আত্মসচেতন, পারিপার্শ্বিকতা যথাযথ বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং নিজের জীবন সম্পর্কে নিজেই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম, তিনিই ক্ষমতাবান। এ সব উপাদান পেতে হলে একজন নারীকে শিক্ষিত হতে হবে। শিক্ষিত হলে আত্মসচেতনতা আসে, পরিপুষ্ট হয় আর্থিক স্বাধীনতা।’ এ লক্ষ্য অর্জনের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তিনি এসডিসি-এর মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের কর্মমুখী শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করে তুলছেন। আমি নিজেই নারীর ক্ষমতায়নের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক। সৈয়দ আবুল হোসেন আমার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন। তাই রাজনীতি করলেও তাকে ভালো লাগে।
সৈয়দ আবুল হোসেন ডি কে আইডিয়াল সৈয়দ আতাহার আলী একাডেমী এন্ড কলেজ, শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজ এন্ড একাডেমি, ডাসার, কালকিনি; কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, কালকিনি; সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ খোয়াজপুর, টেকেরহাট এবং খাসেরহাট সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজ নামক পাঁচটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। নারী শিক্ষার প্রসারে শেখ হাসিনা উইমেন্স কলেজ এন্ড একাডেমি (১৯৯৫) বৃহত্তর বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এখানে অধ্যয়নরত প্রায় সাড়ে পাঁচশ ছাত্রীর ভর্তি ফি, পাঠ্যপুস্তক ও বেতন ফ্রি। ভালো ফল অর্জনকারী ছাত্রীদের খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত ফ্রি করে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠাতা। প্রত্যেক ছাত্রীর খাট, মেট্রেস, লেপ, তোষক, বালিশ, টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান থেকে দেয়া হয়। লোডশেডিঙের সময় জেনারেটরের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এক মিনিটের জন্যও মেয়েদের অন্ধকারে থাকতে হয় না। কন্যা সন্তানের জন্ম গ্রামীণ পরিবারে সাধারণত অবাঞ্চিত। মেয়েদের লেখাপড়ায় অভিভাবকদের নিরুৎসাহ সর্বজনস্বীকৃত। মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর চেয়ে পাত্রলগ্ন করাকে উত্তম মনে করা হয়। অন্যদিকে অনেক মেয়ে অর্থাভাবে আইবুড়ো হয়ে থেকে যায়। দীর্ঘদিন অবিবাহিত থাকায় সামাজিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হয়। এ সকল সমস্যা সমাধানে সৈয়দ আবুল হোসেন বিভিন্ন প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বাল্যবিবাহ রোধকল্পে এসডিসি নিবিড় গণসচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। গত দুই দশকে সৈয়দ আবুল হোসেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, দক্ষতাবৃদ্ধি ও আয়বর্ধনমূলক সহায়তার মাধ্যমে ১০ হাজারের অধিক নারীকে স্বনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলে ক্ষমতায়নের পথকে প্রশস্ত করেছেন।১ এদের উত্তরণ উৎসাহিত করেছে আরও অনেককে। নাড়া দিয়েছে গোটা সমাজকে। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন একজন সমাজ সংস্কারকও বটে। সমাজ সংস্কারকদের অনেকে পছন্দ করেন না কিন্তু আমি জানি সংস্কার ছাড়া কোনো জাতি সমৃদ্ধি লাভ করতে পারে না। সৈয়দ আবুল হোসেন সংস্কারের কাজে নিয়োজিত- এ জন্য তাকে আমার ভালো লাগে।
সৈয়দ আবুল হোসেন শুধু শিক্ষানুরাগী, ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদ নন, একজন লেখকও বটে। তার কয়েকটি বই পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। রাজনীতি ও সমাজ সংস্কার বিষয়ক লেখা। প্রতিটি লেখা ক্ষুরধার যুক্তি আর হৃদয়গ্রাহী উদ্ধৃতি পরিচ্ছন্ন প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। এটি তাকে আমার ভালো লাগার অন্য আর একটি কারণ। যার মাঝে আমার ভালো লাগার এতগুলো কারণ রয়েছে তাকে ভালো না-বেসে, শ্রদ্ধা না-করে পারা যায় না।
নারীর ক্ষমতায়নে সৈয়দ আবুল হোসেনের একাগ্রতা প্রশংসনীয়। তিনি দুই কন্যার গর্বিত পিতা। উভয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং উদার মনের অধিকারী। আমার মনে হয়, নারীদের প্রতি তার সহমর্মিতা পিতৃস্নেহ উৎসরিত একটি নিখাদ প্রেরণা, অবিরাম প্রবাহ। তার এ প্রেরণায় লক্ষ্যে পৌঁছার তাগিদ আছে কিন্তু অন্ত নেই। তিনি অমায়িক, বিনয়ী ও নিরহঙ্কার চরিত্রের একজন বড় মনের মানুষ- আমার সহকর্মী শিক্ষকগণ এভাবে তাকে মূল্যায়ন করেন। আর কিছু না-হোক, অন্তত কর্ম ও আচরণ তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।

আবদুল মান্নান সৈয়দ : শিক্ষাবিদ, কবি ও কথাসাহিত্যিক

১. গবেষণা জরিপ, জনগণের মানুষ।

অপরাধী জানিল না কি বা অপরাধ তারÑ
বিচার হইয়া গেল
অসীম সাহা
গত ৩১ জুলাই (২০১২) ‘দৈনিক কালের কণ্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘কালান্তরের কড়চা’য় একটি উপসম্পাদকীয় ছাপা হয়েছে, যার শিরোনাম ‘আক্রান্ত আবুল হোসেনÑটার্গেট শেখ হাসিনা’। লেখাটি পড়ে আমার ভালো লাগল এ জন্যে যে, গত এক বছর যাবৎ প্রাক্তন যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে টার্গেট করে কতিপয় পত্রিকা এবং বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট যেভাবে তাকে তুলোধুনো করে ছাড়ছিল, তার কিছুটা মোক্ষম জবাব দিয়ে তিনি অন্তত এইসব জ্ঞানপাপীদের মুখে কিছুটা হলেও কালি লেপন করে দিয়েছেন। গাফ্ফার ভাই এমন একজন কলামিস্ট, যার কলম থেকে সত্য অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো বেরিয়ে আসে, আর সেজন্যেই সকল পত্রিকায় তাঁর কলামের এত কদর।
সৈয়দ আবুল হোসেন যখন ভেতর এবং বাইরে থেকে চতুর্মুখী আক্রমণে দিশেহারা, তখনই আমার মনে হয়েছিল, তাকে নিয়ে কিছু একটা লিখি। ভাবতে ভাবতে গাফ্ফার ভাইয়ের লেখাটা আমাকে অনুপ্রাণিত ও প্ররোচিত করলো আবুল হোসেন সম্পর্কে কিছু সত্য কথা তুলে ধরতে।
শুরুটা হয়েছিল গত ঈদে যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা নিয়ে। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা তখন এতটাই নাজুক ছিল যে, ঈদে ঘুরমুখো মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে প্রায় সকল পত্রিকা একযোগে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, তখন টেলিভিশন চ্যানেলে এবং পত্রপত্রিকায় রাস্তাঘাটের করুণ দশা দেখে আমিও বিব্রত বোধ করেছিলাম। আর চতুর্মুখী আক্রমণে বাধ্য হয়ে ঈদে চলাচলের উপযোগী রাস্তা সংস্কারের কাজে আজকের যোগাযোগ মন্ত্রীর মতো সৈয়দ আবুল হোসেনও রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন। তাতে রাস্তাঘাটের সার্বিক উন্নতি না হলেও কিছুটা হলেও উন্নতি হয়েছিল। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, আবুল হোসেন যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব পাবার পরপরই কেন রাস্তাঘাট সংস্কারের কাজে নামেননি? এই প্রশ্নের উত্তরে এটা বলা যায়, বিএনপির পাঁচ বছর আর সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দু’বছরসহ মোট সাত বছর সারা বাংলাদেশের রাস্তাঘাটের হাল কী ছিল? তখন কি সবগুলো পথঘাট সোনা দিয়ে বাঁধানো ছিল? আমরা কি তখন বাংলাদেশে ছিলাম না? আমরা কী দেখিনি, তখনও রাস্তাঘাটের করুণ এবং দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা? সৈয়দ আবুল হোসেন যোগাযোগ মন্ত্রী হবার পরই তো বাংলাদেশের সকল রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযোগী হয়ে ওঠেনি। এতগুলো রাস্তাঘাট সম্পূর্ণ চলাচলের উপযোগী করে তোলা কি দু’ছরের মধ্যে কারও পক্ষেই সম্ভব? তা হলে এর দায় শুধু তার ওপরই চাপিয়ে দেয়া হলো কেন? আগে যারা এইসব রাস্তাঘাটের উন্নয়নের কাজে তেমন কোনও ভূমিকাই রাখতে পারেনি, তারা কেন এইসব তথাকথিত পত্রিকা, সমালোচক এবং উগ্রপন্থী বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনার হাত থেকে বেঁচে গেলেন? তারা আওয়ামী লীগের মন্ত্রী নয় বলে? আসলে গাফ্ফার ভাই যথার্থই বলেছেন, এদের মূল টার্গেট আসলে সৈয়দ আবুল হোসেন নয়, শেখ হাসিনা।
সামান্য ছিদ্র পেলেই তাতে আঙুল দেয়া যাদের স্বভাব, তারা আবুল হোসেন কেন, আওয়ামী লীগের যে কোনও কাজের খুঁৎ ধরতে পারলে একমুহূর্ত দেরি না করে তাতে আঙুল চালিয়ে দিতে বেশ পছন্দ করেন। এরা আবার নিরপেক্ষতার ভান করেন, প্রগতিশীলতার দোহাই পেড়ে আসলে তলে তলে মৌলবাদের ছাতার নিচে বসে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে হলেও তাদের গুণগান করতে কসুর করেন না। আসলে আওয়ামী লীগ নামেই এদের মধ্যে অরুচি। তাদের ভাব দেখলে মনে হয়, আওয়ামী লীগের এই সাড়ে তিন বছরের আগে যে সকল সরকার ক্ষমতায় ছিলেন, তারা দেশটাকে একেবারে সোনার দেশে পরিণত করে ফেলেছিলেন। মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী দেশ হিসেবে যে দেশটি বিশ্বের মানুষের কাছে ছিল ধিকৃত, সাত সাতবার বিশ্বের এক নম্বর দুর্নীতিবাজ দেশ হিসেবে যারা দেশের কপালে কলঙ্কতিলক লেপন করেছিল, হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করেছিল, তাদের চেয়েও কি আওয়ামী লীগ দেশটাকে অনেক বেশি জাহান্নামের আগুনে ঠেলে দিয়েছে? সাম্রাজ্যবাদের টাকায় ললিত-পালিত এসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের সেটা মনে হতেই পারে।
তারই আর একটি সর্বশেষ দৃষ্টান্ত পদ্মাসেতু নিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসংক্রান্ত বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ নিয়ে তার ওপর আদাজল খেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। বিশ্বব্যাংক অভিযোগ করেছে, তবে আর পায় কে? সাম্রাজ্যবাদের টাকায় লালিত কিছু পোষ্য পত্রিকা এবং তার সম্পাদক ও চ্যালাচামুণ্ডারা পারলে তাকে জবাই করে ছাড়ে। টেলিভিশন চ্যানেল খুললে একটাই আলোচনা, পদ্মাসেতু নিয়ে আবুল হোসেনের দুর্নীতি। এসব চ্যানেলের ‘টক শো’গুলোর সবচাইতে উত্তপ্ত আলোচনার বিষয়ও তাই। আর এতে অংশগ্রহণ করছেন কারা? চিহ্নিত আওয়ামী বিরোধী এবং প্রাক্তন পিকিংপন্থী অর্থাৎ বর্তমানের নব্য রাজাকাররা। আর অদ্ভুত ব্যাপার এটাই যে, এইসব চ্যানেলগুলো যেন দেশে কথা বলার মতো আর কোনও লোকই খুঁজে পায় না। দু’একদিন পরপরই, তারা এমন সব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং শিক্ষকদের ডেকে নিয়ে আসে, আওয়ামী লীগকে ধসিয়ে দেয়াতেই যাদের আনন্দ। এটা যে উদ্দেশ্যমূলক, সেটা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হবার কথা নয়। আমি প্রায় প্রতি রাতেই এইসব টক শো দেখি। সেখানে অধিকাংশ সময় একজন বা দু’জন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. থাকেন, থাকেন একজন পিকিংপন্থী প্রাক্তন বিপ্লবী ও সাংবাদিক এবং বর্তমানে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের ঘোরতর সমর্থক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষক আর একটি ইংরেজি দৈনিকের দাঁত খিঁচোনো সম্পাদক। প্রতিদিন এরা গরু রচনার মতো আওয়ামী লীগের মুণ্ডুপাত করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন, প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিকভাবে আওয়ামী লীগকে টেনে এনে ধোলাই দিতে না পারলে এদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যেতে পারে, এ কথা ভেবে যতটা সম্ভব আক্রমণাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
এদের মনে একটাই প্রতিজ্ঞা থাকে, যে কোনও উপায়ে আওয়ামী লীগকে ধূলিসাৎ করে দিতে হবে। আর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জবাই করার জন্য এরা সব সময় জিভে ধার দিয়েই রাখেন। এর মধ্যে একদিন রাতে কোনও একটি চ্যানেলে পদ্মাসেতুর দুর্নীতির ব্যাপারে আবুল হোসেনকে আক্রমণের এক পর্যায়ে তিনি যে আগেই থেকে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ, তার উল্লেখ করে এতো অল্প সময়ের মধ্যে তিনি কী করে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হলেন, সে ব্যাপারে ক্রূর একটি প্রশ্ন উত্থাপন করলেন। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই আবুল হোসেন দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকা কামিয়েছেন, সেক্ষেত্রে তিনি একথা ভুলে গেলেন কী করে সৈয়দ আবুল হোসেনের চেয়ে অনেক কম সময়ে তার জানের জান তরুণ এক নেতা দুর্নীতি করে, ভয় দেখিয়ে এবং ব্ল্যাকমেইল করে হাজার হাজার কোটি টাকাই শুধু কামানইনি, তা দেশ থেকে পাচার করে এখন কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বিদেশে আরাম-আয়েসে জীবনযাপন করছেন? তার কথা সেই ড. সাহেবের একবারও মনে হলো না কেন? কারণ দুর্নীতিবাজ হলেও তিনি যে ড. সাহেবের পেয়ারের লোক। বাংলাদেশে এক সময় একটি ছবি হয়েছিল ‘সাধু শয়তান’ নামে। এদের কথাবার্তা শুনলে ভঙ্গমি দেখলে আমার বারবার সেই ছবিটার কথাই শুধু মনে পড়ে।
তাই তারা তাদের পেয়ারের লোকদের সম্পর্কে কিছু বলবেন না। বলবেন শুধু বলীর পাঁঠাদের।! কারণ তাদের আসল উদ্দেশ্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা নয়, আওয়ামী লীগকে বেকায়দায় ফেলার জন্য পঙ্গপালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়া। এরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে গলাগলি ধরে যখন তারা অন্যের দুর্নীতি খুঁজতে যান, তখন সেসব দেখে আমার খুব কৌতুক বোধ হয়। আবুল হোসেনকে এরা চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ বলেন। কেন আবুল হোসেন ছাড়া এদেশে আর চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ নেই? রাতের ঘুম হারাম করে যখন এইসব টকাররা বিভিন্ন চ্যানেলে আওয়ামী লীগের গিবত গাওয়ার জন্য যান এবং অনুষ্ঠান শেষে পকেটে দু’তিন হাজার টাকার চেক বা ক্যাশ টাকা নিয়ে বাড়িতে ফেরেন, তার সব টাকাই কি তুলসী পাতায় ধোয়া থাকে? ওর মধ্যে দুর্নীতির ছোঁয়া নেই? সেটা যখন পকেটে পুরে ঘরে ফেরেন, তখন দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে আপনারাও যে গাঁটছড়া বাঁধেন, তখন কি আপনাদের কণ্ঠে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলা মানায়?
এই যে এতদিন ধরে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগকে একেবারে বেদবাক্যজ্ঞানে অন্তরে ধারণ করে ক্রমাগত সৈয়দ আবুল হোসেন, আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তুলোধুনো করে যাচ্ছেন, আপনারাও জানেন, তার মধ্যে সত্যাসত্য কতটুকু। বিশ্বব্যাংক পদ্মাসেতুতে দুর্নীতির আশংকা করেছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা প্রমাণ দিতে পারেনি, দুর্নীতিটা কোথায় হয়েছে। আমাদের এইসব জ্ঞানপাপীরা শুধু আওয়ামী সরকারের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ব্যাপারে যে অভিযোগ তুলেছে, তা প্রকাশ করতে। আওয়ামী লীগ তো বলেছে এ ব্যাপারে কোনও দুর্নীতি হয়নি। যেখানে পদ্মাসেতুর ব্যাপারে কোন টাকাই ছাড় দেয়াই হয়নি, সেখানে দুর্নীতির প্রশ্নই তো অবান্তর। সৈয়দ আবুল হোসেনও একই কথা বলেছেন। যেহেতু বাংলাদেশ সরকার তা প্রকাশ করবে না, সেক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকই তা প্রকাশ করছে না কেন? তাদের হাতে যদি দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ থাকে তা হলে তা প্রকাশ করতে তাদেরই বা বাধা কোথায়? যদি ধরে নেয়া যায় দুর্নীতির কাজটি মৌখিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে অর্থাৎ আবুল হোসেন পদ্মাসেতু প্রকল্প থেকে ঘুষ নেয়ার জন্য কোন বিশেষ প্রতিষ্ঠানের কাছে ঘুষ চেয়েছেন, তা হলে সেটাকে কেউ যুক্তিসঙ্গত বলে মানবেন? উপযুক্ত দালিলিক প্রমাণ ছাড়া শুধু মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে যে কাউকে অভিযুক্ত করা যায় না, এটা বিশ্বব্যাংক বোঝে না, তা কোনও পাগলেও বিশ্বাস করবে?
আসলে বিশ্বব্যাংকই যে দুর্নীতিবাজ এটা আগেও প্রমাণিত হয়েছে, এখনও নতুন করে প্রমাণিত হচ্ছে। তাদের নিজেদের ইচ্ছেমতো অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বাংলাদেশকে চাপের মধ্যে রেখে আসলে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করাই যে তাদের লক্ষ্যের মধ্যে ছিল, তা এখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাছাড়া বিশ্বব্যাংকের বিশেষ বিশেষ কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্যই যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর তারা এ ধরনের চাপ সৃষ্টি করে থাকে, একজন ব্যক্তি আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতুতে তাদের অর্থায়ন বাতিল করার মধ্য দিয়ে তাদের হীনতা, দীনতা, ক্ষুদ্রতা এবং সাম্রাজ্যবাদী ভূমিকার নগ্ন বহিঃপ্রকাশই ঘটেছে, আবুল হোসেন সেখানে বলীর পাঁঠা মাত্র। যদি তা না হতো, তা হলে আবুল হোসেন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে, বিভিন্ন মিথ্যে সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে, পদ্মাসেতুর ব্যাপারে তার স্বচ্ছতার নানা প্রমাণ হাজির করে এবং শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে বিশ্বব্যাংকের মন সামান্য নরম করতে পারলেও সাম্রাজ্যবাদের দোসরদের মন কিছুতেই গলাতে পারেননি। তাই তাকে নিয়ে এখনও ব্যক্তি-আক্রমণ ঘটেই চলেছে।
আর বিএনপি তো তলোয়ারে ধার দিয়ে বসেই ছিল। বিশ্বব্যাংক যখন পদ্মাসেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে, তখন আর যায় কোথায়? সবার আগে লাফিয়ে গিয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের পক্ষে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা এবং সৈয়দ আবুল হোসেনকে একহাত নিয়েই তবে তাদের শান্তি। আর শেখ হাসিনা লন্ডনে গিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেনের পক্ষ নিয়ে যেই তাকে ‘দেশপ্রেমিক’ বলে আখ্যায়িত করলেন, তখন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করলেও তাঁর দলেরই আর এক কেউকেটা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সঙ্গে সঙ্গে বলে বসলেন সৈয়দ আবুল হোসেন দেশপ্রেমিক নন, তিনি হলেন ‘বেহায়া’। খবরটি দেখে আমার চক্ষু কপালে উঠে গেল। ড. সাহেব নাকি একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, তার মুখে এরকম অরুচিকর, অভব্য এবং অশ্লীল শব্দের ব্যবহার দেখে আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটলো না। আমি ভাবলাম, তার ঐ অভব্য শব্দের পাল্টা শব্দ ব্যবহার করে সৈয়দ আবুল হোসেন যদি তাকে আক্রমণ করতেন, তাহলে তিনি সেটাকে কীভাবে নিতেন। আসলে এ জাতীয় অভব্য লোকেরা আমাদের রাজনীতির শীর্ষস্থানে অবস্থান করছেন বলেই বাংলাদেশের রাজনীতির আজ এই অবস্থা। আমি সৈয়দ আবুল হোসেনকে ধন্যবাদ দেই এ জন্যে যে, তিনি তথাকথিত ‘দুর্নীতিবাজ’ হওয়া সত্ত্বেও ড. মোশাররফের মতো অসভ্য হতে পারেননি।
আসলে এটা হয়তো অনেকের পক্ষেই বোঝা মুশকিল, সৈয়দ আবুল হোসেন কী করলে এদের অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা থামবে। আমার ধারণা, এটা সহজে থামবে না। এদের জিভে যতদিন ধার থাকবে, ততদিন তারা সৈয়দ আবুল হোসেন, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে আক্রমণ করতেই থাকে। আর আক্রমণ করতে করতে যদি জিভের ধার কমে যায়, তা হলে আবার জিভে শান দিয়ে নতুন করে আক্রমণ করতে শুরু করবে। এদের লক্ষ্য, শেখ হাসিনার জীবন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকার ফলে বেঁচে যাওয়াতে এদের মধ্যে যে যন্ত্রণার বিষ জমা হয়ে ছিল, এখন তা উগ্ড়ে দেবার জন্য তারা অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। হাসিনা যে বলেছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাঁর জীবন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, সেটা এদের তৎপরতা দেখলেই বোঝা যায়। এরা এক একটা বিষধর সাপ। এরা হাসিনাকে রক্তাক্ত ছোবল দেয়ার জন্য বারবার চেষ্টা করেছে, ভবিষ্যতেও করবে। তাদের লক্ষ্যই সেটা। গাফ্ফার ভাই যে বলেছেন ‘আক্রান্ত আবুল হোসেনÑটার্গেট শেখ হাসিনা’Ñএর চেয়ে চরম সত্যটি এর আগে এমন করে কেউ বলেননি। এ কথা বলে তিনি শেখ হাসিনাকে সাবধান হতে বলেছেন। সেই সূত্র ধরে আমি সৈয়দ আবুল হোসেনকেও সাবধান হতে বলি। আপনি যতই সৎ হোন, যতই শিক্ষানুরাগী হোন, মানুষের জন্য যতোই আপনার হাত উদার করুন, এরা আপনাকে ছাড়বে না। সে আপনি মন্ত্রীই থাকুন, আর মন্ত্রিত্বের বাইরেও থাকুন। শুধু প্রস্থত থাকুন, নেত্রী শেখ হাসিনাকে যেন ওরা ছোবল না দিতে পারে। ওদের সমালোচনায় ভড়কে যাবেন না। যদি আপনি মনে করেন, আপনি সৎ আছেন, তা হলে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান। আওয়ামী লীগের প্রতিটি নিবেদিতপ্রাণ কর্মী এবং দেশের জনসাধারণকে নিয়ে ওদের ষড়যন্ত্রকে রুখে দিন। শহরের অসন্তষ্ট এবং সুবিধাবাদী কিছু বুদ্ধিজীবীর কথায় হতচকিত হয়ে গেলে আখেরে ওদেরই লাভ হবে। সেটা আপনি হতে দেবেন কেন?
আর বিশ্বব্যাংক?
সেটা শুধু পাশ্চাত্যের ধনবাদী আগ্রাসী দেশগুলোর পিতৃসম্পত্তি নয়, এখানে আমাদেরও অংশীদারিত্ব আছে। অতএব ওদের রক্তচক্ষু দেখে ভয় পাবার কিছু নেই। যে জাতি ত্রিশ লক্ষ মানুষের রক্ত ও দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে মাত্র নয় মাসে নিজেদের দেশকে স্বাধীন করেছে, তারা বিশ্বব্যাংকের অন্যায় সিদ্ধান্তের কাছে নতজানু হবে কেন? পদ্মাসেতুর জন্য বরাদ্দ অর্থ বাতিল করে তারা যে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মানুষ একদিন তার দাঁতভাঙা জবাব দেবে। অতএব সৈয়দ আবুল হোসেন, আপনাকে বলি, যদি আপনি সত্যি সত্যি স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করে থাকেন এবং কোনরকম দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকেন, তা হলে আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শুধু সময়ের জন্য একটু অপেক্ষা করুন।

অসীম সাহা : কবি ও সাংবাদিক

সৈয়দ আবুল হোসেন, মান্যবরেষু
ইমদাদুল হক মিলন
সৈয়দ আবুল হোসেনের পাঁচটি গ্রন্থ আমার হাতে পড়েছে। সুন্দর প্যাকেট, সুন্দর করে প্রকাশিত হওয়া বই। সবগুলোই রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী আলেখ্য। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সংকট, গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, আওয়ামী লীগের নীতি ও কৌশল শিল্পায়ন ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ সমাবেশ, শেখ হাসিনা সংগ্রামী জননেত্রীর প্রতিকৃতি, স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সবগুলো বই আমার পড়া হয়নি। তবে ধীরে ধীরে প্রতিটি বই-ই আমি পড়তে চাই। দুটো বই আমি একটু ঘেঁটে ঘেঁটে দেখেছি, দুয়েকটি লেখা পড়েছি, আমার ভালো লেগেছে। সৈয়দ আবুল হোসেনের কোনও লেখা এর আগে আমি পড়িনি। যে লেখকের ভাষা খারাপ তাঁর লেখা আমি পড়তে পারি না। কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেনের ভাষা সুন্দর, তরতর করে পড়ে যাওয়া যায়। বহু তথ্য এবং উদ্ধৃতি তাঁর রচনার মান বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনীতির বাইরে তিনি কিছু লেখেননি। যেহেতু তিনি নিজে একজন রাজনীতিবিদ, সেহেতু রাজনীতি নিয়ে লেখাই তাঁর পক্ষে স্বাভাবিক। রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী রচনা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অতি খটোমটো হয়ে থাকে, সামন্য পড়েই পাঠক ক্লান্ত হয়ে যান। সৈয়দ আবুল হোসেনের রচনায় এই ত্রুটি নেই। আমি যেটুকু পড়েছি, পড়ে তাঁর পাঁচটি বই পড়ার আগ্রহই আমার মধ্যে তৈরি হয়েছে। একজন পাঠককে এইভাবে আকৃষ্ট করবার ক্ষমতা যার আছে, তিনি যে ধরনের লেখাই লিখুন না কেন, তাঁকে অবশ্যই আমি ভালো লেখক বলবো। রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী লেখার ক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল হোসেন অবশ্যই একজন অগ্রগণ্য লেখক। এই লেখককে আমি অভিনন্দন জানাই।
বাঙালি জাতির সবচাইতে বড় গৌরব জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হাজার বছরে এই মাপের নেতা জন্মান না। আমাদের সৌভাগ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশে জন্মেছিলেন। এই মহান নেতাকে নিয়ে বহু গল্প কবিতা নাটক গান রচিত হয়েছে। বাঙালি জাতির শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে মিশে আছেন এই নেতা। আমরা জাতি হিসেবে অকৃতজ্ঞ বলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে প্রাণ দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতির ললাটে “পিতৃহত্যাকারী” শব্দটি খোদাই করে দিয়েছে। বাঙালি জাতি যতদিন টিকে থাকবে, এই জঘন্য অপরাধ তাদের বয়ে বেড়াতে হবে। চে গুয়েভারাকে নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি কবিতা লিখেছিলেন, “চে, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়।” বঙ্গবন্ধুর জন্য চিরকাল বাঙালি জাতি এরকম করে বলবে, “বঙ্গবন্ধু, তোমার মৃত্যু আমাদেরকে অপরাধী করে দেয়।” অনন্তকাল ধরে আত্মগ্লানিতে জ্বলবো আমরা।
এই মহান নেতাকে নিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন লিখেছেন, “স্বাধীনতার জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান”। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা এ যাবৎ রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে সৈয়দ আবুল হোসেনের এই গ্রন্থ এক বিশিষ্ট সংযোজন।
আমি শুনেছি সৈয়দ আবুল হোসেন বহুগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক হিসেবে তিনি শ্রদ্ধেয়। মাদারীপুরের এক বনেদী মুসলমান পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা অতিশয় ধর্মপ্রাণ মানুষ। এলাকার মানুষের শ্রদ্ধারজন। কৃতি ছাত্র ছিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বাণিজ্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তারপর মনোনিবেশ করেন ব্যবসায়। ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন ‘সাকো ইন্টারন্যাশনাল’ নামে বিশাল এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এই সব প্রধান পরিচয়ের পাশাপাশি তার অন্যরকম কিছু পরিচয়ও আছে। একজন লেখক হিসেবে আমার কাছে সেই পরিচয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ্। তিনি ধর্মপ্রাণ, তিনি মানুষ ভালোবাসেন। জাতির দুর্যোগে তো বটেই অন্যান্য নানা প্রকার দুর্যোগের সময় বিপন্ন মানুষের পাশে তিনি তার সবটুকু সামর্থ্য নিয়ে দাঁড়ান। মানুষের কথা ভাবেন এবং তাদের পাশে দাঁড়ান, সেই মানুষকেই আমি মহান মানুষ মনে করি। সততা, নির্লোভ, অকারণ উচ্চাকাক্সক্ষা ইত্যাদি সৈয়দ আবুল হোসেনকে কখনও ম্লান করতে পারেনি। এটাই তার জীবনের মূল সার্থকতা। বাংলাদেশের জন্য যে রকম মানুষের খুব প্রয়োজন, সৈয়দ আবুল হোসেন তেমন একজন মানুষ। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তার সততা, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং দেশ ও জাতির কল্যাণের কাজে নিয়োজিত থাকবেন, এই আমার প্রার্থনা।

ইমদাদুল হক মিলন : কথাসাহিত্যিক

পদ্মা সেতু প্রকল্প এবং আমাদের করণীয়
আইনুন নিশাত
পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে অনেক জল ঘোলা হওয়ার পর আমার কথা একটাই। সরকার যেভাবে নিজস্ব উৎস থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলছে, সেটা সম্ভব হলে এই দেশের নাগরিক হিসেবে আমি গর্বই বোধ করব। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে পারেনÑ এমন বিশেষজ্ঞের অভাব নেই এ দেশে। কিন্তু আমাদের ঘাটতি রয়েছে অর্থে ও প্রযুক্তিতে। প্রযুক্তির বিষয়টি ঠিকাদারের মাথাব্যথা। সরকারের উচিত হবে সম্পূর্ণ অর্থ জোগাড়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া; অর্থের সংস্থান হলেই কেবল নির্মাণ কাজের ব্যাপারে অগ্রসর হওয়া।
পদ্মা সেতু নিয়ে সমকালের পাতায় কয়েকদিন আগে অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর একটি মূল্যবান নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। জামিল স্যার আমার ক্লাসরুম শিক্ষক শুধু নন; তার সঙ্গে পরে বহু প্রকল্পে কাজ করেছি এবং করছি। জটিল কারিগরি জিনিস সহজভাবে ব্যাখ্যা করতে তার জুড়ি পাওয়া দায়। তদুপরি স্যারের মনে রাখার ক্ষমতা এবং বিভিন্ন ঘটনার পরম্পরা বজায় রেখে বর্ণনা করার দক্ষতা অপরিসীম। বলাবাহুল্য, স্যারের ওই লেখাতেও তার ছাপ স্পষ্ট ছিল।
পদ্মা সেতু প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের ঠিকাদার ও পরামর্শক নির্বাচন প্রক্রিয়া কীভাবে এগোচ্ছিল, অধ্যাপক চৌধুরী তার লেখায় তা গুছিয়ে বলেছেন। ওই নিবন্ধের আলোকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে এসএনসি লাভালিনকে সুপারভিশন কনসালটেন্ট হিসেবে নিযুক্তিতে বিশ্বব্যাংকের কোনো আপত্তি ছিল না। বরং উল্টোটাই ঘটেছিল বলা চলে। বাংলাদেশি মূল্যায়নকারীদের মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংক লিখিতভাবে অনুমোদন করেছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংকের একজন সাবেক কর্মকর্তাও যুক্ত ছিলেন।
আমি আজকে কলম ধরেছি এসব বিষয়ে আরও কিছু কথা বলার জন্য। বলে রাখা ভালো, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতুর ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনের সময় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর সঙ্গে আমিও জড়িত ছিলাম। একইভাবে পদ্মা সেতু প্রকল্পেরও আমরা কাজ করেছি। যমুনা সেতু প্রকল্পের অভিজ্ঞতার আলোকে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক বা ঠিকাদার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোথায় কোথায় বিশেষ নজর দিতে হবে, সে সম্পর্কে আমাদের পূর্বধারণা ও অভিজ্ঞতা কাজে এসেছে।
অনেকেই হয়ত জানেন, পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনের জন্য বিশ্বব্যাংক, এডিবি (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) বা আইডিবি (ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক)Ñ সবারই রয়েছে পৃথক পৃথক নীতিমালা। অর্থাৎ কোনো প্রকল্পে যারা অর্থায়ন করবেন তারাই নির্ধারণ করে দেন যে কোন কোন দেশের পরামর্শক বা ঠিকাদাররা দরপত্র জমা দিতে পারবেন। এরপর আসে দরপত্রে কী কী বিষয়ে নজর দেওয়া হবে এবং কী পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হবে, তার নিয়মাবলি। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রে সেই নিয়মাবলি প্রণয়নের দায়িত্বে ছিল ডিজাইন কনসালটেন্ট বা নকশা প্রণয়নের দায়িত্বে থাকা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রণীত নিয়ম ও শর্তাবলি প্রথমে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা অনুমোদন করেন এবং এরপর তা দাতা সংস্থার বিশেষজ্ঞের দ্বারা পর্যালোচিত এবং অনুমোদিত হয়। অর্থাৎ বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকার (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি) অনুমোদন পাওয়ার পরই দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
দরপত্রের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে প্রাক-যোগ্যতার ভিত্তিতে কারা দরপত্র দিতে পারবেন, তা নির্ধারণ করা। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ ও জটিল প্রকল্পে কেবল তাদেরই দরপত্র দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, যাদের এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। অর্থাৎ আগ্রহী ঠিকাদার অথবা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের অভিজ্ঞতা, আর্থিক সচ্ছলতা, দক্ষ কর্মকর্তার তালিকা ইত্যাদি জমা দেন। সেসবের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রে বড় তিনটি চুক্তি বা কন্ট্রাক্ট করা প্রয়োজন ছিল। প্রথম চুক্তি হচ্ছে মূল সেতুটি নির্মাণ বিষয়ে। এ কাজে ঠিকাদারদের প্রাক-যোগ্যতা নিরূপণের পর নির্বাচিতদের তালিকা বিশ্বব্যাংকের দফতরে রয়েছে। তারা অনুমতি দিলে তবেই মূল দরপত্র আহ্বান করা হতো। তার মানে, মূল দরপত্র এখনও আহ্বান করা হয়নি। কাজেই ঠিকাদার নির্বাচনের বিষয়টি অনেক পরের বিষয়।
দ্বিতীয় চুক্তি বা কন্ট্রাক্ট হচ্ছে নদীশাসন সংক্রান্ত। মূল সেতুর মতো এ কাজটিও অত্যন্ত জটিল এবং এতে দক্ষ ঠিকাদার প্রয়োজন। এ কাজটিরও কেবল প্রাক-দক্ষতা যাচাই কাজ শেষ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের দফতরে এই কাজের জন্যও প্রাক-দক্ষতা যাচাইয়ের পর মূল্যায়িত ঠিকাদারদের তালিকা জমা দেওয়া আছে। অর্থাৎ এ কাজেও এখন পর্যন্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।
তৃতীয় কন্ট্রাক্টটি হচ্ছে অ্যাপ্রোচ রোড। অর্থাৎ সেতু সংযোগকারী রাস্তার নির্মাণ বিষয়ে। ওই কাজটির অর্থায়ন করবে আইডিবি। কাজেই তাদের নিয়ম মেনে প্রাক-যোগ্যতার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। ঠিকাদার নির্মাণের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। আইডিবির অনুমোদনের জন্য কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। এ দরপত্র মূল্যায়নে বিশেষ জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এবার আসি কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালটেন্টের বিষয়ে। এ কনসালটেন্টের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতুটি নির্মিত হবে আন্তর্জাতিক নিয়মাবলি মেনে। সংক্ষেপে বলা হয়েছে (ঋওউওঈ) ‘ফিডিক’ মেনে। এর পুরো নাম হচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স। মূল নামটি ফরাসি। এরা বিশ্বজুড়ে যে কোনো নির্মাণ কাজে শর্তাবলি ও কন্ট্রাক্ট বাস্তবায়নের পদ্ধতি ঠিক করে দেয়। এদের নিয়মের বাইরে কোনো আন্তর্জাতিক কন্ট্রাক্ট পরিচালিত হতে পারে না।
ফিডিকের নিয়ম অনুযায়ী কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালটেন্টের (সিএসসি) তত্ত্বাবধানে কন্ট্রাক্ট সম্পর্কিত সব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ কারণে সিএসসি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কাজ শুরু হলে এদের সিদ্ধান্ত অর্থায়নকারী সংস্থাগুলো প্রায়ই মেনে নেয় এবং প্রকল্পের মূল মালিক, অর্থাৎ সরকারও মানতে বাধ্য হয়। ঠিকাদারের দাবি যদি সিএসসি অনুমোদন করে, কিন্তু সরকার পক্ষ যদি সেই দাবিকে অযৌক্তিক মনে করে তাহলে সিএসসির সিদ্ধান্তই বলবৎ হবে। পরে সরকার এ বিষয়ে মামলা করতে পারে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের সিএসসি হিসেবে নিযুক্তির জন্য পাঁচটি কোম্পানি তাদের প্রস্তাব জমা দিয়েছিল। ইতিপূর্বে নির্ধারিত নিয়মাবলি মেনে দরপত্রগুলো মূল্যায়িত হয়। এ মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংক মেনে নিয়েছিল। পরে নির্বাচিত কনসালন্টিং ফার্মের কোনো কাজে বিশ্বব্যাংক ক্ষুব্ধ হয়েছে এবং তাদের কালো তালিকাভুক্ত করেছে। মোদ্দাকথা, আমি বলতে চাচ্ছি, নির্বাচন পদ্ধতি বা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কোনো আপত্তি ছিল না। যে কারণে এখন জটিলতা দেখা দিয়েছে, তা হলো পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা।
এবার আরেকটি বিষয়ের অবতারণা করতে চাই সেটি হচ্ছে, যে কোনো প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, অংশীদারিত্ব বজায় রাখার প্রচণ্ড তাগিদ আছে বিশ্বজুড়ে। কোনো একটি দেশের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ বা কোনো আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নিকারক প্রতিষ্ঠানের অর্থ সবার মধ্যে সব পদক্ষেপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অর্জনের কথা বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে যোগ হচ্ছে যে কোনো কর্মকাণ্ডে প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ এবং সব স্টেকহোল্ডার বা অংশীদারের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ।
বিশ্বের বিভিন্ন অঙ্গনে কথায় কথায় সুশাসন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও আইনের শাসনের কথা এখন উচ্চারিত হয়। সেই আলোকে, সবাই এখন মানে, যে কোনো দাতা দেশ বা দাতা সংস্থা তাদের সব স্টেকহোল্ডারের কাছে এসব বিষয়ে জবাবদিহি করতে বাধ্য। বিশ্বব্যাংক এবং এডিবিতে সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধিরা নিয়মিতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করে। কাজেই কোনো কারণে কেউ যদি সন্দেহ পোষণ করে যে, এ প্রকল্পে দুর্নীতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে বিশ্বব্যাংক বিশেষ নজরদারি করতে বাধ্য। বিশ্বব্যাংকের অফিসে পদ্মা সেতুসহ ৫-৬টি বড় প্রকল্পের জন্য একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট রয়েছেন। তার কাজই হচ্ছে এ প্রকল্পগুলো বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা, যাতে করে কোনো ধরনের অভিযোগ না আসে। আমি যতদূর জানি, পদ্মা সেতুর জমি অধিগ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বিষয়টি তারা খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং সরকারের কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। আমার জানা মতে, বাংলাদেশ সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও তার কাউন্টারপার্ট হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের বিশেষ তদারকির কথা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তার জানা ছিল না। তারপরও দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
খবরের কাগজে পড়ছি, সরকার বিকল্প উৎস থেকে অর্থ পাওয়ার চেষ্টা করছে। সরকারের এমন প্রচেষ্টা অস্বাভাবিক নয়। কারণ দেশের লোকজন সেতুটি দ্রুত নির্মিত হওয়া দেখতে চায়। গত নির্বাচনের অঙ্গীকার এবং সামনের নির্বাচনে সাফল্য তুলে ধরার কথাও ভাবতে হচ্ছে সরকারকে। তার ফলেই বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ জোগাড় করার কথা বলা হচ্ছে।
সত্যি বলতে কি, বিভিন্ন মহলের এ তৎপরতা দেখে আমার ভালো লাগছে। তবে মনে রাখতে হবে, টাকায় কুলাবে না। লাগবে বৈদেশিক মুদ্রা ডলার, ইউরো, ইয়েন, পাউন্ড ইত্যাদি। পুরো অর্থের বন্দোবস্ত করে তবেই মাঠে নামতে হবে। দেশে যেভাবে নির্মাণ কাজ হয়, আমরা দেখি, অর্থের অভাবে ঠিকাদারদের অনেক সময় বসে থাকতে হয়। এটি কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের সঙ্গে চলবে না। ফিডিক আইন অনুযায়ী ঠিকাদার তার রানিং বিল জমা দিলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তা পরিশোধ করতে হবে। কোনো কারণে ঠিকাদারকে কাজ বন্ধ করতে বলা যাবে না। কারণ ঠিকাদার তার যন্ত্রপাতি, লোক-লস্কর মোবিলাইজ করেছেন। সরকারের কারণে কাজের গতি শ্লথ হলে বিপুল পরিমাণ অর্থদণ্ড দিতে হবে।
পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে অনেক জল ঘোলা হওয়ার পর আমার কথা একটাই। সরকার যেভাবে নিজস্ব উৎস থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলছে, সেটা সম্ভব হলে এই দেশের নাগরিক হিসেবে আমি গর্বই বোধ করব। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিতে পারেনÑ এমন বিশেষজ্ঞের অভাব নেই এ দেশে। কিন্তু আমাদের ঘাটতি রয়েছে অর্থে ও প্রযুক্তিতে। প্রযুক্তির বিষয়টি ঠিকাদারের মাথাব্যথা। সরকারের উচিত হবে সম্পূর্ণ অর্থ জোগাড়ের দিকে মনোযোগ দেওয়া; অর্থের সংস্থান হলেই কেবল নির্মাণ কাজের ব্যাপারে অগ্রসর হওয়া।

ড. আইনুন নিশাত : সাবেক অধ্যাপক বুয়েট। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও পানি বিজ্ঞানী, উপাচার্য, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

সৈয়দ আবুল হোসেন গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার
নির্মল চক্রবর্তী
পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংকের আনীত তথাকথিত দুর্নীতি নিয়ে পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি হয়েছে। সব লেখা মূলত সৈয়দ আবুল হোসেনকে ঘিরে। বছরাধিক কাল যেন পত্রিকায় প্রকাশের জন্য বাংলাদেশে আর কোন বিষয় ছিল না। অধিকাংশ প্রতিবেদনে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে মর্মে বিশ্বব্যাংকের অযৌক্তিক দাবিকে প্রমাণের চেষ্টা করে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হয়েছে। এ সকল প্রতিবেদনে আবেগ ছিল যুক্তি ছিল না, রসালো বিবরণ ছিল কিন্তু বিশেষায়িত তথ্য ছিল না। যে সকল লেখায় তাঁর বিরুদ্ধে বিষোদগার করা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের কথিত দুর্নীতির শঙ্কাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে সে সকল প্রতিবেদনের লেখকগণ পদ্মা সেতু প্রকল্পের মত জটিল ও উচ্চ কারিগরি অবকাঠামোর পর্যায়ক্রমিক বিষয়টি বিবেচনায় আনেননি। হয়ত অমন ঋদ্ধতাও তাদের ছিল না। তাঁরা শুধু দুর্নীতির অভিযোগটি সত্য প্রমাণের ব্যর্থ প্রয়াসের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে, পক্ষান্তরে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করে তোলার চেষ্টা করেছেন। রাজনীতিক বক্তৃতার মত প্রতিপক্ষকে মনগড়া কাহিনী দিয়ে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছেন। ঋণচুক্তি বাতিল হওয়ায় দেশের ক্ষতির সব দোষ তার উপর চাপিয়ে দিয়েছেন। অথচ সৈয়দ আবুল হোসেন দুর্নীতি করেছেন কিনা কিংবা তার পক্ষে কথিত দুর্নীতি করা আদৌ সম্ভব ছিল কিনা তা অধিকাংশ প্রতিবেদক এড়িয়ে গিয়েছেন। কোন্ পরিস্থিতিতে কখন বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির শঙ্কা প্রকাশ করেছে, যে সময়ে দুর্নীতর শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে সেটি আদৌ যৌক্তিক ছিল কিনা তাও বিবেচনা করা হয়নি। বিষয়ের গভীরে না গিয়ে ‘কাক কান নিয়ে গিয়েছে’ গল্পের মত সবাই কাক এর পেছনে ছুটেছে। গালের পাশে কানটি আছে কিনা কেউ হাত দিয়ে দেখেননি, দেখার চেষ্টা করেননি। সব লেখা তার বিপক্ষে গিয়েছে তা নয়। পদ্মা সেতুর মত বৃহৎ ও জটিল বিষয়ে জ্ঞানসমৃদ্ধ আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞগণের লেখায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, পদ্মা সেতুর কথিত দুর্নীতি যেমন হাস্যকর তেমনি অযৌক্তিক। বিশেষজ্ঞ লেখকগণ পদ্মা সেতু প্রকল্পের সবকটি পর্যায় বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, দুর্নীতি হবার কোন অবকাশ এখানে ছিল না। এরূপ বিশ্লেষণমূলক লেখা যারা লিখেছেন তাদের মধ্যে ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. আইনুন নিশাত, মেজর জেনারেল এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার, পিএসসি (অব.), রাহাত খান, হায়দার আকবর খান রনো, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, মিলু শামস এবং আবদুল গাফফার চৌধুরী সহ আরও অনেকের নাম উল্লেখ করা যায়।
সাংবাদিক হিসেবে সৈয়দ আবুল হোসেনকে কাছে থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। পেশাগত কারণে তাঁকে নিয়ে বি¯তৃত ঘটনাবলী গভীর মনযোগের সাথে অবলোকন করেছি। সৈয়দ আবুল হোসেনের আকর্ষণীয় ব্যক্তি চরিত্র ও আদর্শের সাথে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখালেখির কোন মিল খুজে পাই না। শুধু আমি নই; যারা সৈয়দ আবুল হোসেনকে জানেন সবার একই কথা। তাহলে এ সব কেন? তা ভালোভাবে জানার জন্য প্রকাশিত ঘটনার সাথে রটনা, বাস্তবতার সাথে কল্পনা এবং কার্যকরণের সাথে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদ ও প্রতিবেদনগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি। একজন সাংবাদিক হিসেবে কাছ থেকে, দূর থেকে সৈয়দ আবুল হোসেন এবং আনুপূর্বিক ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করে আমি নিশ্চিত যে, সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে পদ্মাসেতু প্রকল্প ও অন্যান্য বিষয়ে প্রকাশিত অভিযোগ সারবত্তাহীন এবং গভীর ষড়যন্ত্রের নিকৃষ্ট উদাহরণ।
পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচনের জন্য বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি প্রত্যেকের পৃথক নীতিমালা রয়েছে। যে সংস্থা অর্থায়ন করে সে সংস্থা পরামর্শক বা ঠিকাদারগণের দরপত্র সংক্রান্ত যোগ্যতা নির্ধারণ করে থাকে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এ সকল নিয়মাবলী অনুসৃত হয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের বিশেষ কতগুলো পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায় হচ্ছে প্রাক-যোগ্যতা। এ পর্যায়ে প্রাক-যোগ্যতার ভিত্তিতে কোন প্রতিষ্ঠান দরপত্র প্রদান করার যোগ্যতা সম্পন্ন এবং দরপত্র প্রদান করতে হলে কী কী যোগ্যতা আবশ্যক তা নির্ধারণ করা হয়। পদ্মা সেতুর ন্যায় উচ্চ-কারিগরী ও জটিল অবকাঠামোগত প্রকল্পে শুধু সে সকল প্রতিষ্ঠানকে দরপত্র জমা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়, যাদের বর্ণিত কার্য সম্পাদনের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। আগ্রহী প্রতিষ্ঠানকে দরপত্রের সাথে তাদের অভিজ্ঞতা, আর্থিক যোগ্যতা, দক্ষতা, কর্মকর্তাগণের তালিকাও জমা দিতে হয়। প্রতিটি বিষয় দাতা সংস্থার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তদারকি এবং নির্দেশনায় উপস্থাপিত দলিলাদির ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনটি অত্যাবশ্যক বৃহৎ ও জটিল চুক্তির প্রয়োজন ছিল। তম্মধ্যে প্রথম ও প্রধান চুক্তিটি ছিল মূল সেতু নির্মাণ কার্যক্রম। এ কাজে প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণের পর যোগ্য নির্বাচিত ঠিকাদারগণের তালিকা বিশ্বব্যাংকের দপ্তরে জমা দেয়া হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক অনুমতি প্রদান করলে মূল দরপত্র আহ্বান করা হতো। কিন্তু বিশ্বব্যাংক অনুমোদন না দেয়ায় মূল দরপত্র আহ্বান করা যায়নি। ঠিকাদার নির্বাচনের বিষয়টি ছিল আরও অনেক ধাপ পরের বিষয়। দ্বিতীয় চুক্তিটি ছিল নদীশাসন। এখানেও দক্ষ ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণ প্রয়োজন ছিল। এটার কেবল প্রাক-যোগ্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়েছে। এ কাজের প্রাক-দাতা যাচাইয়ের পর ঠিকাদারগণের তালিকা বিশ্বব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে। তা বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে রক্ষিত আছে। বিশ্বব্যাংকের অনুমোদন না পাওয়ায় সেটিরও দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হয়নি। এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাংলাদেশ সরকার অতি অল্প সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে অনুমোদনের জন্য পাঠালেও বিশ্বব্যাংক অনুমোদন না করে দীর্ঘদিন ফেলে রাখে। এ দীর্ঘসূত্রিতায় কী বিশ্বব্যাংকের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে! তৃতীয় হচ্ছে সংযোগ সড়ক নির্মাণ। এ কাজের অর্থযোগান ও দায়িত্বে ছিল আইডিবি। আইডিবির বিধিবিধান অনুসারোক-যোগ্যতার কাজ সম্পন্ন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ঠিকাদার নির্বাচনের কাজ সম্পন্ন করার পর আইডিবির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল। এটিরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
২০০৭ সালে পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নের জন্য এডিবি বাংলাদেশকে কারিগরি সহায়তা দেয়ার উদ্যোগ নেয়। সরকার আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পরামর্শকদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহবান করে। ছয়টি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দাখিল করে। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় অবস্থিত সদর দফতরে এডিবি নিজেদের বিশেষজ্ঞ দিয়ে প্রস্তাবগ্রলো মূল্যায়ন করে। একই সাথে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি এডিবির নিদের্শনা মোতাবেক প্রস্তাবগুলোর মূল্যায়ন চালিয়ে যায়। বাংলাদেশের মূল্যায়নে এডিবির মূল্যায়ন সমীক্ষায় কিছু ভুল ধরা পড়ে। এডিবি ভুলগুলো সংশোধনপূর্বক তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে। তদভিত্তিতে নিউজিল্যান্ডের প্রতিষ্ঠান মনসেল, কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান নর্থ-ওয়েস্ট হাইড্রোলিক ও অস্ট্রেলিয়ান প্রতিষ্ঠান স্মারক পদ্মা সেতুর পরামর্শক নির্বাচিত হয়। সৈয়দ আবুল হোসেন যোগাযোগ মন্ত্রী হবার অব্যবািহত পর এডিবির মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুমোদন করে চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের প্রস্তুতি কাজে ১০ বছর লেগেছে কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেনের বিচক্ষণ ব্যবস্থাপনার কারণে পদ্মা সেতুর প্রস্তুতি ২ বছরে শেষ করতে সক্ষম হয়েছেন। এটি একটি বিরল ঘটনা।
পদ্মা সেতু নির্মাণ একটি জটিল, বৃহৎ ও উচ্চ কারিগরি প্রকল্প। ডিজাইন চূড়ান্ত করার পূর্বে প্রচুর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহসহ অসংখ্য পরস্পর অবিচ্ছেদ্য জটিল উপাদানের সমন্বয়ে নির্ভুল ডিজাইন প্রণয়ন ছিল অত্যাবশ্যক। এ সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০১০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সেতুর ডিজাইন প্রণয়ন শুরু করা হয়। সময় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে একই সাথে প্রকল্পের অত্যাবশ্যক প্যাকেজগুলোর পরামর্শকদের প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণের প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা প্যাকেজসমূহের প্রাক-যোগ্যতার শর্তাবলী নির্ধারণের প্রতিটি পর্যায়ে উপস্থিত ছিলেন। সবার সাথে আলোচনাপূর্বক ঐকমত্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও নির্ভুলতার স্বার্থে ২০০৯ সালের মধ্যভাগে প্রকল্পের কারিগরি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদানের জন্য দশ সদস্য বিশিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল গঠন করা হয়। প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত বিশেষজ্ঞগণের মধ্যে তিনজন জাপানি, একজন নরওয়েজিয়ান বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এদিকে ডিজাইন পরামর্শক সংস্থাসমূহ প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেল কিছু সুপারিশ প্রদান করে। সুপারিশের ভিত্তিতে ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময়ে পদ্মা সেতুর ডিজাইন মোটামুটি চুড়ান্ত করা হয়। উল্লেখ্য, প্রাক-যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য সরকার আরও একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছিল। বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা সর্বসম্মতক্রমে অনুমোদন করে।
বিশ্বব্যাংক প্রথমে বলেছিল, সৈয়দ আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দিলে সেতুর কাজ চালিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু তাঁকে সরানো হলেও বিশ্বব্যাংক স্থগিত কার্যক্রম শুরু করেনি। মন্ত্রণালয় পরিবর্তনের পর তারা জানায়, কানাডায় এসএনসি লাভালিনের বিরুদ্ধে তদন্ত সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সেতুর কাজ শুরু হবে না। পদ্মা সেতু প্রকল্পে কর্মরত বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তাদের অভিমত ‘এ পর্যন্ত যে কাজ হয়েছে তার স্বচ্ছতা সম্পর্কে অভিযোগ নেই।’ এডিবি ও জাইকাসহ অন্য সহযোগী সংস্থা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুঃখ প্রকাশ করে। ২৯ জুন বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল করে প্রেসনোট জারি করে। এর ভাষা ও অভিযোগ ছিল বাংলাদেশের জন্য যেমন বিব্রতকর তেমনি অপমানজনক। কোনরূপ তথ্য প্রমাণ ছাড়া বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিলের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে তা বিরল। সৈয়দ আবুল হোসেন ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ জানুয়ারি যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান। দায়িত্ব গ্রহণের অল্প কিছুদিন পর থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সাথে আলোচনা শুরু করেন। বিশ্ব ব্যাংক বিভিন্ন অজুহাতে বিলম্ব করছিল। সৈয়দ আবুল হোসেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণে বদ্ধপরিকর ছিলেন। তিনি বিশ্বব্যাংককে দ্রুত অর্থ ছাড়ের জন্য তাগিদ দিয়ে যাচ্ছিলেন। মূলত: এটাই হয়েছে তার কাল এবং যাবতীয় সমালোচনার উৎস।
সৈয়দ আবুল হোসেন ৫ ডিসেম্বর ২০১১ পর্যন্ত যোগাযোগ মন্ত্রী ছিলেন। এ-সময় পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ভুমি অধিগ্রহণ, সাইট প্রিপারেশন, স্টক ইয়ার্ড নির্মাণ, তিগ্রস্তদের পূর্ণবাসনসহ প্রস্তুতিমূলক সকল কাজ শেষ করা হয়েছে। মূল সেতু, নদী শাসন এবং সংযোগ সড়কের কাজের জন্য প্রাক-যোগ্য দরদাতাদের নির্বাচন শেষ করা হয়েছে। প্রকল্পের নির্মাণ তদারকি পরামর্শক (ঈড়হংঃৎঁপঃরড়হ ঝঁঢ়বৎারংরড়হ ঈড়হংঁষঃধহঃ) নিয়োগের লক্ষ্যে কারিগরি মূল্যায়নসহ যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ম-কানুন, ক্রয়নীতি, বিশ্ব ব্যাংক ও দাতা সংস্থাদের গাইডলাইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ ব্যতীত প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকের সম্মতির পর পরবর্তী কার্যক্রম গৃহীত হয়েছে। এ সকল কাজ চলাকালীন দাতা সংস্থার কর্মকর্তারা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। দুর্নীতির কোন নিশানা তারা পাননি। হঠাৎ করে দুর্নীতির তথ্য পেয়ে গেলেন, তাও আবার নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নিয়োগে, যা কখনও বিশ্বাসযোগ্য নয়।
নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নিয়োগের জন্য বিশ্বব্যাংক নির্ধারিত নিয়মাবলী অনুসরণ করে প্রথমে আবেদনকারী পরামর্শকদের সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়। এরপর তা অনুমোদনের জন্য বিশ্ব ব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়। বিশ্ব ব্যাংক অনুমোদন করলে সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিকট থেকে দরপত্র আহবান করা হয়। দরপত্রগুলো ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একদল বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে। কমিটিতে ড. আইনুন নিশাতও ছিলেন। বিশ্ব ব্যাংকের মনোনীত সিনিয়র কনসালটেন্ট ড. দাউদও কমিটির সদস্য ছিলেন। জামিলুর রেজা চৌধুরী ও আইনুন নিশাত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিশেষজ্ঞ। বিশ্বব্যাংকের প্রত্যক্ষ তদরকিও ছিল। সৈয়দ আবুল হোসেন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটির কোন সদস্য ছিলেন না। সুতরাং তারপক্ষে কোন পর্যায়ে কোনভাবে পদ্মা সেতু প্রকল্পকে প্রভাবিত করার সুযোগ ছিল না। তাহলে কেন এসএনসি লাভালিন তাঁকে প্রভাবিত করতে আসবেন? তারা এমন কারও কাছে যেতেন, যার প্রভাবিত করার সুযোগ ছিল।
এসএনসি লাভালিনকে নির্মাণ তদারকি পরামর্শক হিসেবে নির্বাচনের জন্য নাকি দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। অথচ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর তারা কোন অবস্থাতে পদ্মা সেতুর নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নিয়োগ কমিটিকে প্রভাবিত করার যোগ্যতা রাখেন না। পদ্মা সেতু প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাজের ঠিকাদার ও পরামর্শক নির্বাচন প্রক্রিয়া যেভাবে এগিয়ে নেয়া হয়েছে তা পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। এসএনসি লাভালিনকে নির্মাণ তদারকি পরামর্শক নির্বাচন ও নিয়োগে বিশ্বব্যাংকের কোনো আপত্তি ছিল না। আপত্তি থাকলে লাভালিন বিশ্বব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেত না। কমিটির মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংক লিখিতভাবে অনুমোদন করেছে। যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়েছে তাতে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিও ছিলেন। সুতরাং এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, বিশ্বব্যাংক নিজেও এসএনসি লাভালিনের পক্ষে ছিল। তাহলে পরে কেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হল? এর সাথে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি, উন্নয়নশীল দেশের প্রতি পুজিবাদী বিশ্ব নিয়ন্ত্রিত আর্থিক সংস্থার ভূমিকা, প্রসাদ ষড়যন্ত্র প্রভৃতি ছাড়াও আরও অনেক বিষয় জড়িত। নইলে যে কারণ দেখিয়ে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করেছে তার নজির বিশ্বে আর নেই। সুতরাং পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির আশঙ্কা যেমন বৈপরিত্যমূলক তেমন সাংঘর্ষিক। এটি ছিল ঋণচুক্তি বাতিলের নিছক একটি অজুহাত মাত্র।
এস.এন.সি-লাভালিন এর প্রতিনিধির সাথে বৈঠকের সূত্র ধরে বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র এবং তার সাথে সৈয়দ আবুল হোসেনের সম্পৃক্ততা উত্থাপন করেছেন। এটি যেমন অযৌক্তিক তেমনি হাস্যকর। মূল্যায়ন কমিটির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার কোন এখতিয়ার সৈয়দ আবুল হোসেনের ছিল না। মূল্যায়নের প্রতিটি স্তরে বিশ্ব ব্যাংকের সম্মতির পর পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। পরামর্শক নির্বাচনে প্রচলিত বিধিবিধান ও বিশ্ব ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী ‘নিরপেক্ষবিশেষ মূল্যায়ন কমিটি’ দরপত্র মূল্যায়নপূর্বক কার্যাদেশ প্রদানের সুপারিশ করেছে। মূল্যায়ন কমিটির কার্যক্রমের প্রতিটি স্তরে বিশ্ব ব্যাংক প্রত্যক্ষভাবে স¤পৃক্ত ছিল। ফলে পরামর্শক নিয়োগে কোন অনিয়ম, ষড়যন্ত্র ও দুর্নীতির সুযোগ সৈয়দ আবুল হোসেনের ছিল না। মন্ত্রীরা জনপ্রতিনিধি হিসেবে আইনের মধ্যে থেকে জনস্বার্থে নানাবিধ কাজ করে থাকেন। দেশের জনসাধারণ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, বিদেশি ডেলিগেট ও কুটনীতিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজন মন্ত্রীর সাথে দেখা করেন। পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল হেসেন মন্ত্রী ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন জনের সাথে বিভিন্ন সময়ে সরল বিশ্বাসে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। এটি ছিল তাঁর দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অধিকন্তু তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। বৈদেশিক বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক রক্ষায় এ ধরণের আলোচনা শিষ্টাচার হিসেবে গণ্য। ফলে এ রকম শিষ্টাচার পালনের নিমিত্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনার জন্য সৈয়দ আবুল হোসেনকে দায়ি করা কোন অবস্থাতে যুক্তিযুক্ত নয়।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী জনাব আবুল হাসান চৌধুরীর অনুরোধে এবং তাঁর উপস্থিতিতে সরকারি অফিসে এস.এন.সি-লাভালিনের প্রতিনিধির সাথে সৈয়দ আবুল হোসেনের সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। এস.এন.সি-লাভালিনের প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশে নিযুক্ত কানাডার প্রাক্তন হাইকমিশনারও দুইবার এস.এন.সি-লাভালিনের বিষয়ে মন্ত্রীর সাথে দেখা করেছেন। প্রাক্তন ব্রিটিশ হাই কমিশনার এবং জাপানের রাষ্ট্রদূতও সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। সৌজন্য সাক্ষাতে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যাপারে মন্ত্রী হিসেবে তিনি সকলকেই টেন্ডারের শর্ত, যোগ্যতা, মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ এবং বিশ্ব ব্যাংকের গাইড লাইন অনুযায়ী যথারীতি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হবে মর্মে আশ্বস্ত করেছেন।
বিশ্ব ব্যাংক বিশেষজ্ঞ প্যানেল বলেছে, দরদাতা নির্বাচন ও কার্যাদেশ প্রদানে মন্ত্রী চুড়ান্ত কর্তৃপক্ষ। প্যানেলের এ মন্তব্য সম্পূর্ণ ভুল। পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগে মন্ত্রী চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ নয়। ক্রয়নীতি অনুযায়ী যে কোন প্রকল্পের উপদেষ্টা নিয়োগের ক্ষেত্রে চুক্তি মূল্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে চুক্তি মূল্য সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা হলে, তা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী অনুমোদন দিতে পারেন। চুক্তি মূল্য এর অধিক হলে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত্র মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করতে হয়। পদ্মা সেতুর পরামর্শক নিয়োগের আনুমানিক চুক্তি মূল্য ৩০০ কোটি টাকার অধিক। তাই এ চুক্তি অনুমোদনে সৈয়দ আবুল হোসেন চূড়ান্ত অনুমোদনদাতা ছিলেন না। সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদই ছিল চুড়ান্ত অনুমোদনকারী। কাজে “মন্ত্রী চুড়ান্ত অনুমোদনকারী”- উল্লেখ করে কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সাথে সৈয়দ আবুল হোসেনের জড়িত থাকার ইঙ্গিত যথার্থ নয়। তাদের এ মন্তব্যের মধ্যে কাউকে দোষী করার ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের ‘পরামর্শক নিয়োগ বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটি’র মূল্যায়ন ও সুপারিশ বিশ্ব ব্যাংকের অনুমোদনের পর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করার কথা। মন্ত্রিসভা কমিটি উপস্থাপিত সুপারিশ পর্যবেক্ষণপূর্বক চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদানের অধিকারী। বিধি অনুযায়ী মন্ত্রী মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংশোধন বা পুনঃর্মূল্যায়ন করতে পারেন না। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করেও দরপত্র পূনঃর্মূল্যায়ন করার এখতিয়ার মন্ত্রীর নেই। অতএব, বিশ্ব ব্যাংক প্যানেলের ধারণা অনুযায়ী মন্ত্রী হিসেবে কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে দর-কষাকষি করে কাজ দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন সুযোগ ও এখতিয়ার সৈয়দ আবুল হোসেনের ছিল না। পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপনের জন্য কোন প্রস্তাব মন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর নিকট উপস্থাপন করা হয়নি। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশের সাথে মন্ত্রী একমত হতে না পারলে মন্ত্রীকে মূল্যায়ন প্রতিবেদন অপরিবর্তিত রেখে নিজস্ব মত কিংবা পর্যবেক্ষণ সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটিতে প্রেরণ করতে হয়। এ অবস্থায় পিপিআর সম্পর্কে সামান্য জ্ঞাত কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কী কারণে মন্ত্রীকে উৎকোচ দিতে আসবেন তা কোনভাবে বোধগম্য নয়।
এস.এন.সি-লাভালিনের স্থানীয় প্রতিনিধি-প্রেরিত ই-মেইল নিয়েও সৈয়দ আবুল হোসেনের সংশ্লিষ্টতা খোঁজা হচেছ। ই-মেইল নাম্বার জানা থাকলে যে কেউ যে কারও কাছে ই-মেইল পাঠাতে পারেন। তাই কথিত ই-মেইল এর সাথে আবুল হোসেনের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের চেষ্টা নিতান্তই হাস্যকর। ই-মেইল দাতা ও গ্রহীতাকে জিজ্ঞাসা করা হলে এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে। যারা অভিযোগ প্রমাণের জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন তারাও তো এমনটি কারতে পারে! এ বিষয়ে এত সমালোচনা সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অপপ্রয়াস বই কিছু নয়। ‘উর্ধ্বতন ব্যক্তি’ হিসেবে সৈয়দ আবুল হোসেনকে ইংগিত করেও যদি ই-মেইল প্রদান করা হয়ে থাকে, তাহলেও প্রমাণের পূর্বে সৈয়দ আবুল হোসেনেকে দায়ি করার কোন সুযোগ নেই। কারণ যে কেউ এরূপ ই-মেইল প্রদান করতে পারেন। এ ধরণের ই-মেইল আদান প্রদানে অন্য কোন উদ্দেশ্যে রয়েছে কিনা- তা খুঁজে বের না করে শুধু সৈয়দ আবুল হোসেনকে সংশ্লিষ্ট করা গভীর ষড়যন্ত্রেরই চিহ্ন।
বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল প্রেরিত চিঠিতে ‘সচিবের মধ্যস্থতা’ বলতে কি বুঝাতে চেয়েছেন- তা রীতিমত অস্পষ্ট। সাবেক প্রতিমন্ত্রীর অনুরোধে এবং তিনিসহ মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সৈয়দ আবুল হোসেন সরকারি অফিসে এস.এন.সি-লাভালিনের প্রতিনিধির সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। মন্ত্রী ইচ্ছা করলে যে কোন বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের সচিব ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণের উপস্থিত থাকা নিতান্তই স্বাভাবিক। বরং তারা না থাকলে বিষয়টি দোষের হতো। এক্ষেত্রে ‘সচিবের মধ্যস্থতা’ – কথাটি হাস্যকর। কোন অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বৈঠকটি হয়নি। অসৎ উদ্দেশ্য থাকলে মন্ত্রী গোপনে বেঠকটি করতেন।
রমেশ শাহের ডাইরিতে সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম অর্ন্তভূক্ত থাকার বিষয়টিকে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির প্রমাণ ধরে নিয়ে আলোচনা করা যেমন হাস্যকর তেমনি বালসুলভ। কেউ নিজ ডায়রিতে যে কোন কিছু লিখতে পারেন। এ জন্য বিনা প্রমাণে কাউকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে হেনস্তা করা নৈতিকতা কিংবা মানবতা উভয়ের পরিপন্থি। রমেশ শাহের ডাইরিতে বর্ণিত- ‘পিসিসি’ তিনি কি উদ্দেশ্যে লিখেছেন তা তিনি নিজেই জানেন। রমেশ শাহকে জিজ্ঞাসা ব্যতীত সৈয়দ আবুল হোসেনকে অর্থ প্রদানের বিষয়টি সত্য ধরে আগাম দোষী সাব্যস্ত করা অন্যায়। কানাডায় পরিচালিত প্রাকমামলার কার্যধারা পর্যবেক্ষণ করে দুদক চেয়ারম্যান রমেশ শাহের ডায়েরিকে ‘বাজারের ফর্দ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ‘বাজারের ফর্দে’ যে পণ্যগুলো কেনা হবে তার সঙ্গে সঙ্গে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত আনুমানিক মূল্যও লিপিবদ্ধ থাকে। সাধারণত ক্রেতারা যান বাজারে পণ্যসমূহ কেনার উদ্দেশে; পণ্যেরা ক্রেতাদের কাছে আসে না নিজেদের বিক্রি করার মানসে। সুতরাং ক্রেতা বাড়িতে বসে যে ফর্দ তৈরি করে সে ফর্দ অনুযায়ী ক্রেতার কাছ হতে পণ্য ক্রয় না করা পর্যন্ত বিক্রেতা বা পণ্যের সাথে ক্রেতার সম্পর্ক সৃষ্টির প্রশ্নই আসে না। রমেশ শাহের যে ডায়েরিতে ঘুষ লেনদেনের লক্ষ্যে কর্মকর্তাদের নাম লেখা রয়েছে বলা হচ্ছে সেটিও সত্যিকার অর্থে একটি বাজারের ফর্দ। কানাডিয়ান আদালতে এসএনসি-লাভালিনের যে দুই প্রাক্তন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাকবিচার পরিচালিত হয়েছে তম্মধ্যে একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মোহাম্মদ ইসমাইল। যার অর্থ প্রদানের কোন মতাই ছিল না এবং অন্যজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত রমেশ শাহ। তারও উর্ধতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া যে ধরণের আর্থিক লেনদেনের কথা উঠেছে সেটার প্রতিশ্রুত দেয়ার প্রশ্ন আসে না। সুতরাং যে ডায়েরি নিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বা বাংলাদেশি অন্যান্য কয়েকজনকে দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার কথা বলা হচ্ছে সেটি পুরোটাই কাল্পনিক, অযৌক্তিক এবং অন্যায্য।
সমালোচকগণ এস.এন.সি-লাভালিন ২য় থেকে ১ম স্থানে উঠে আসার ব্যাপারেও অনিয়মের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে কোন অনিয়ম হয়েছে কিনা- তা সৈয়দ আবুল হোসেনের জানার কথা নয়। কাজটি বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে করা হয়েছে। এসএনসি লাভালিন কেন এবং কীভাবে প্রথম স্থানে উঠে এলো সেটি মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ হুবহু চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সেতু বিভাগ থেকে বিশ্ব ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশে সৈয়দ আবুল হোসেন কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন বা সংশোধন করেননি।এক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল হোসেনের সংশ্লিষ্টতা খোঁজা শুধু অযৌক্তিক নয়; অজ্ঞতাও বটে। মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে সহজে জানা যাবে যে, মন্ত্রী থাকাকালীন সৈয়দ আবুল হোসেন মূল্যায়ন কমিটির কোন সদস্যেকে কোন বিষয়ে প্রভাব কাটানোর চেষ্টা করেছিলেন কিনা। এর জন্য দুদক কিংবা কানাডার প্রাক আদালতের প্রয়োজন নেই।
এবার কমিটি গঠন-পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা করা যাক। অসৎ উদ্দেশ্যে নাকি বার বার কমিটি ভাঙ্গাগড়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে কমিটি ভাঙ্গা-গড়া হয়নি। উপযুক্ততা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির স¦ার্থে কমিটি গঠন কিংবা পুনর্গঠন করা হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তা করা হয়েছে। মূল্যায়ন কমিটি গঠন বা পুনর্গঠনের ব্যাপারে বিশ্ব ব্যাংকের মতামত ও সম্মতিকে সবসময় গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কমিটি গঠন বা পুনর্গঠনের তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায়, সর্বশেষ কমিটিই- পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য সর্বোত্তম বিশেষজ্ঞ কমিটি। ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ সদস্যদের সমন্বয়ে ঐ গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আইনুন নিশাত, বুয়েটের সাবেক ভিসি ড. মো: সফিউল্লাহ, বিশ্ব ব্যাংক মনোনীত পরামর্শক ড. দাউদ আহমেদ ও পদ্মা সেতু প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী ফেরদৌস। এক্ষেত্রে সদস্য-সচিব ছাড়া কমিটির অন্য সদস্যরা সেতু বিভাগ বহিঃর্ভূত।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র নিয়ে কানাডার আদালতে মামলা চলছে। রমেশ শাহের ডায়েরিতে নাকি ঘুষ প্রদানের তালিকা লেখা আছে। যদিও মামলাটি করেছে কানাডিয়ান ফেডারেল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও স্বাধীন সংস্থা আরসিএমপি। এসএনসি-লাভালিনের দুই প্রাক্তন কর্মকর্তাকে আসামি করা হলেও কোম্পানিকে আসামি করা হয়নি। প্রকৃতপক্ষে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে বাংলাদেশকে। আরসিএমপি বিশ্বব্যাংকের অনুরোধে তদন্ত শুরু করছে। এটি সর্বজনস্বীকৃত যে, বিশ্বব্যাংক কোন দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান নয় এবং এক ঝাঁক দেবদূতও এটা পরিচালনা করছেন না। ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রাকবিচার পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকের কাছেও ঐ ডায়েরির কোন কপিও ছিল না। সে অবস্থায় বিশ্ব ব্যাংক কোন দলিলের ভিত্তিতে দুদকের কাছে ডায়েরিতে যাদের নাম রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের দাবি জানিয়েছিল? পদ্মা সেতু প্রকল্পে যে পরিমাণ ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রের কথা উঠেছে সেটি মোট প্রকল্প ব্যয়ের মাত্র এক হাজার ভাগের এক ভাগ। পৃথিবীর অনেক দেশে বিশ্ব ব্যাংকের অনেক প্রকল্পে এর চেয়ে অনেক বেশি ঘুষ লেনদেন হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প বাতিল করা হয়নি। যারা দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিল তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে বিশ্ব ব্যাংক প্রকল্প কাজ চালিয়ে যেত পারত। প্রকৃতপক্ষে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র একটি অজুহাত মাত্র। আসল লক্ষ্য বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনার সরকার। যার প্রথম শিকার সৈয়দ আবুল হেসেন।
তদসত্ত্বেও বাংলাদেশের রাজনীতিক এবং মিডিয়া অঙ্গনে পদ্মাসেতুর দুর্নীতি নিয়ে মহা তোলাপাড় শুরু করে দেয়। এর কারণ হলো ঘটনার বাদি বিশ্বের সর্বশক্তিমান আর্থিক সংস্থা বিশ্ব ব্যাংক এবং আসামি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ। বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন স্বনির্ভর নয় যে, ঐ পরাক্রমশালী সংস্থাকে বিদায় জানাতে পারে। ফলে সংস্থাটির দেয়া বিষময় আর্থনীতিক প্রেসক্রিপশন বাংলাদেশকে বিনাপ্রতিবাদে গলাধঃকরণ করতে হয়। পদ্মা সেতু প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটতো। অথচ বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশের কিছু সংবাদপত্রের জন্য তা হয়নি। গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং সত্য প্রকাশের দায়বদ্ধতা সমান্তরালভাবে চলার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে স্বাধীনতা না বলে স্বেচ্ছাচারিতা বলাই সমধিক যুক্তিযুক্ত। নইলে কীভাবে বিশ্বব্যাংকের ধারণাভিত্তিক দুর্বল ও তুচ্ছ অভিযোগকে এমন ফুলিয়ে ফাপিয়ে তুলে!! দৈনিক প্রথম আলো লিখেছে, “রমেশের হাতে লেখা ডায়েরির এই বিশেষ পৃষ্ঠায় এসএনসি-লাভালিনের আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কেভিন ওয়ালেসের স্বাক্ষর রয়েছে”। এটি কত হাস্যকর সহজে অনুমেয়। সামান্য অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন লোকও বলবে কারও ব্যক্তিগত ডায়েরিতে তার উর্ধতন কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকার কথা নয়। অনেক সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সুশীল সমাজের অনেকে তদন্ত কাজে ধীর গতির জন্য দুদকের সমালোচনায় কেঁদে কেটে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ দুদক সূত্রে জানা যায় কানাডার আরসিএমপিকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও রমেশ শাহের ডায়েরির কপি দুদককে দেয়া হয়নি। যে দলিলটি দুর্নীতি প”মাণের একমাত্র লিখিত সাক্ষ্য সেটা ছাড়া তদন্ত কাজে অগ্রগতি কোনভাবে সম্ভব নয়।
বিশ্বব্যাংক প্যানেল প্রধান মেরিনো ওকাম্পো’র দুদক চেয়ারম্যানকে লেখা চিঠিতেও সৈয়দ আবুল হোসেনকে অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ ও যুক্তি ছাড়া শুধু দাতা সংস্থার নির্দেশে দুর্নীতির আশংকার সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে- এমন দাবি ন্যায় বিচারের পরিপন্থী। অধিকন্তু, বিশ্ব ব্যাংক বিশেষজ্ঞ প্যানেল যখন দুদকে বৈঠক করেন, তখন বিশ্ব ব্যাংকের বাংলাদেশের প্রতিনিধি মিসেস গোল্ড স্টেইন উপস্থিত ছিলেন। যা নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে অগ্রহণযোগ্য। কারণ, বিশ্ব ব্যাংক নিজেই অভিযোগকারী। পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তিতে বিশ্ব ব্যাংককে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। তাই বিশ্ব ব্যাংকের কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। দায়মুক্তির সুযোগ নিয়ে যথেচ্ছ আচরণ সবচেয়ে জঘন্য।
ঋণ সাহায্য সবসময়ই রাজনীতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার। বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তিটিও রাজনৈতিক কারণের বাইরে নয়। সংগত কারণে বাতিলও রাজনীতিক। আমেরিকার সঙ্গে বেশ কয়েকটি কারণে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঠিক সাবলীল যাচ্ছিল না। এক ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল। বিশেষ করে গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে আমেরিকার খোলামেলা পক্ষপাতিত্ব কারও অজানা নয়। একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানোর স্পর্ধা গরিবের বউ সবার ভাবী প্রবাদটি স্মরণ করিয়ে দেয়। নেপথ্যে তেল গ্যাস-কয়লা বিষয়টিও থাকতে পারে। গ্যাস রফতানির জন্য আমেরিকার চাপের কথা সবার জানা। বিশ্বব্যাংকের যে কোন বড় সিদ্ধান্ত আমেরিকার আঙ্গুল নাড়ার দিকে চেয়ে থাকে। সুতরাং ঋণ বাতিল সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনীতিক শক্তি, শক্তিধর লবিস্ট বহুজাতিক কোম্পানি ও হোয়াইট হাউসসহ অপরাপর শক্তির যোগসাজশ ছিল এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়।
নব্বুই এর দশকে রাজনীতিতে সক্রিয় হবার পর থেকে সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে পত্রিকায় অসত্য খবর ও প্রতিবেদন প্রচার হতে শুরু করে। বিএনপি আমলে এসব অভিযোগ তদন্ত করা হলেও কোন সত্যতা খুজে পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে অসত্য খবর প্রকাশিত হয়েছে। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে এসব খবর নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে বিএনপি সরকার ৫ বছর তদন্ত করে। তবে তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। ভয়ংকর ১/১১ এর সময় তার জন্ম থেকে শুরু করে তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত খবর, বেনামি চিঠি ও বিএনপির শ্বেতপত্রের ওপরও তদন্ত হয়। এ শ্বেতপত্রে তার স্বাক্ষর জাল করেও পত্রিকায় ছাপানো একটি চিঠিও ছিল। সার্বিক তদন্তে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন।
বিশ্বব্যাংক একটি অখ্যাত চায়না প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য বার বার তদ্বির করেছে। কমিটি তা অগ্রাহ্য করেছে। বিশ্বব্যাংকের মত প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানকে যেখানে পাত্তা দেয়নি সেখানে আমি সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রভাব বিস্তার করার দাবি উদ্ভট।। বিশ্বব্যাংকের মত একটি প্রতিষ্ঠান এমন বোকামিপূর্ণ অভিযোগ কীভাবে আনয়ন করল তা ভাবতে আশ্চর্য লাগে। আসলে মিথ্যা কখনও গোপন রাখা যায় না। বিশ্বব্যাংকের ঋণ দেয়ার ইচ্ছা থাকলে একজন দুইজনের দুর্নীতির জন্য ষোল কোটি মানুষকে বঞ্চিত করত না। যে প্রতিষ্ঠানটি দুই/তিনজন লোকের তথাকথিত দুর্নীতির ধুয়ো তুলে ঋণচুক্তি বাতিল করতে পারে সে প্রতিষ্ঠান যে কোন অবস্থাতে বিবেচক নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন কাজ করে বিশ্বব্যাংক কী বিবেচনপ্রসূত কাজ করেছে?
এর পরও যদি সৈয়দ আবুল হোসেনকে প্রভাব বিস্তার করার কৃতিত্ব দেয়া হয় তাহলে বলতে হয়, বিশ্বব্যাংকই সৈয়দ আবুল হোসেনের কাছে নতি স্বীকার করেছে। তাহলে বিশ্বব্যাংকের পক্ষে কীভাবে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা সম্ভব! যাদের মধ্যে একটু বিবেচনা বোধা আছে তারও এ অভিযোগ কখনও বিশ্বাসযোগ্য মনে করবেন না। এমন অবিশ্বাস্য অভিযোগের উপর ভিত্তি করে পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল ষোল কোটি মানুষের প্রত্যাশাকে হত্যা করা। এর চেয়ে বেশি অবিবেচনার কাজ, জুলুমের কাজ, দুর্নীতির কাজ আর হতে পারে না।

লৈখক পরিচিতি: কলামিস্ট, সাংবাদিক; দৈনিক উত্তরবঙ্গ সংবাদ, শিলিগুড়ি, ভারত।

সুশোভিত সুমন
আতাউর রহমান খান কায়সার
যোগাযোগ একটি বিশাল পরিধির মন্ত্রণালয়। এটি কেউ অস্বীকার করবেন না যে, যোগাযোগ অবকাঠামো বিনির্মাণ যে কোনো দেশের জন্য প্রাকৃতিক, আর্থিক ও কৌশলগত কারণে বেশ জটিল। বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক একটি গরিব দেশের জন্য এটি মহাজটিল। অনেকগুলো মন্ত্রণালয়কে নিয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে কাজ করতে হয়। অর্থের জন্য অন্য দেশের সাহায্যের উপর নির্ভর করতে হয়, স্বভাবতই কার্যকর সমন্বয় সাধনের উপর যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সফলতা বহুলাংশে নির্ভর করে। আমি মনে করি, সৈয়দ আবুল হোসেন অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও এ কাজগুলো সুচারুভাবে সম্পন্ন করে যাচ্ছেন।
তিনি কোনোরূপ প্রটোকল বা ইগোর তোয়াক্কা না-করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও কর্মকর্তা এমনকি অফিস সহকারীর সাথে সরাসরি আলাপ করে উদ্ভুত সমস্যা সমাধান করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। নিজের ব্যক্তিগত অফিস সাকো-তেও এমন আচরণ লক্ষণীয়। এলাকার উন্নয়নের প্রশ্নে, প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশ্নে, প্রয়োজন হলে, বিরোধী-দলীয় লোকদের সাথে কথা বলতেও তিনি সংকোচ বোধ করেন না। প্রকল্পের সাথে বৈদেশিক যোগসূত্র থাকলে তিনি তা দক্ষতার সাথে সম্পন্ন করতে পারেন। সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের সহায়তায় আন্তঃদেশীয় বৈঠকের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত প্রকল্প যথাসময়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়নের সম্ভাব্য সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। বিদেশি সহায়তা সংগ্রহে তিনি অত্যন্ত কুশলী এবং যত্নবান। এটি সবার জানা।
রাজনীতি গণিত নয়। এখানে ভুলত্রুটি থাকবেই। রাজনৈতিক প্রশাসনে একশ ভাগ মার্ক পাওয়ার দাবি করা এবং সে রকম কারও কাছ হতে প্রত্যাশা করা দুটোই হাস্যকর ও বোকামি। আমাদের দেখতে হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কতটুকু আন্তরিকতার সাথে কাজ করছেন, তার উদ্দেশ্য এবং কার্যপদ্ধতি। আন্তরিকতা বিবেচনায় সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রচেষ্টায় কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবেন বলে মনে হয় না। পদ্মা সেতুর কাজ যথাসময়ে সম্পন্ন করার জন্য তার নিরলস প্রচেষ্টা সত্যি প্রশংসনীয়। এর সফলতা নির্ভর করবে সহায়ক শক্তিগুলো তাকে কতটুকু সহায়তা করে তার উপর। আশা করি, তিনি এ কাজে সফল হবেন।
মন্ত্রণালয়ের কাজে কোনো বিষয়ে জটিলতা দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে তা নিরসনে তিনি নিজেই এগিয়ে আসেন। যথার্থ সমালোচনাকে তিনি উপদেশ গণ্যে সাদরে গ্রহণ করেন। যা তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপকে সহজ করে দেয়। তবে সমালোচনা যদি শুধু সমালোচনার জন্য হয়, তাহলে তা অবশ্যই নিরুৎসাহের এবং মনোকষ্টের। এ নিয়ে তিনি কষ্ট পেলেও আবার সাহসী হয়ে ওঠেন।
রাষ্ট্রীয় এমনকি ব্যক্তিগত কাজেও যে কোনো সময় তাঁকে পাওয়া যায়। সমস্যার সমাধান করতে পারুন বা না-পারুন, চেষ্টা করেন এবং ভদ্রোচিত ব্যবহারে সবাইকে মুগ্ধ করেন। চট্টগ্রামের প্রতি তার দরদ রয়েছে। বাণিজ্য নগর এবং বারো আউলিয়ার পুণ্য-ভূমি, সর্বোপরি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে তিনি চট্টগ্রামের প্রতি, চট্টগ্রামের উন্নয়নের প্রতি তাকে আমি সবসময় আন্তরিক দেখতে পেয়েছি। চট্টগ্রামের উন্নয়নমূলক কাজে যখনই সহায়তা চেয়েছি, পেয়েছি।
বিভিন্ন সভায় সৈয়দ আবুল হোসেন নিজের দলের লোকের ন্যায় বিরোধী দলের লোকদের প্রস্তাবও গুরুত্বের সাথে শোনেন এবং বিবেচনার আশ্বাস দেন। আওয়ামী লীগ মনে করে আওয়ামী লীগের সব কাজ ভালো, আবার বিএনপি মনে করে বিএনপির সব কাজ ভালো। কিন্তু সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, দেশ ও জাতির কল্যাণ এবং সাধারণ মানুষের মঙ্গলের জন্য নিবেদিত সকল কাজই ভালো- তা যে দলই করুক না কেন। যারা কিংবা যে কাজ দেশ ও জাতির ক্ষতি করে, মানুষে মানুষে হানাহানি সৃষ্টি করে, সন্ত্রাস বাড়ায়- তা দল নির্বিশেষে কোনোরূপ প্রশ্ন ব্যতীত খারাপ কাজ। সংগতকারণে পরিত্যাজ্য।
আমি যতটুক জানি, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সবার সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক বন্ধুসুলভ। সবার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে প্রশাসনিক ও কার্যগত সম্পর্কও চমৎকার। মন্ত্রী হিসেবে তাকে চারিপাশের মানুষ যতটুক সম্মান করেন তিনি তার চেয়ে বেশি সম্মান করেন তাদেরকে- যারা তার কাছে আসেন। এটি অবশ্য শুধু হোমরাচোমরাদের বেলায় করেন তা নয়, সবার প্রতি তিনি সৌজন্যমূলক আচরণ করেন। তিনি অত্যন্ত প্রাণবন্ত, হাসিখুশি এবং ব্যক্তিত্বময়। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয় সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে ন্যায্য আচরণ করেছেন। বাইরের জগতের মতো তিনি সংসদেও সহনশীল, আন্তরিক ও রুচিশীল। প্রতিপক্ষ আহত হতে পারে কিংবা মনোকষ্ট পেতে পারে- এমন কথা বলতে শুনিনি। মিডিয়াতেও তার কথাবার্তা ও বাচনভঙ্গি আকর্ষণীয় এবং ব্যক্তিত্বময়। তাই দলমত নির্বিশেষে সবাই সৈয়দ আবুল হোসেনকে ভালো জানেন এবং ভালোবাসেন।
একটি মন্ত্রণালয় চালানো সহজ কথা নয়। একজন মন্ত্রীকে অনেক দূরদর্শী হতে হয়। তাঁর থাকতে হয়ে ধৈর্য, কমিটমেন্ট, নিষ্ঠা, দেশপ্রেম, সততা, স্বচ্ছতা এবং নেতৃত্ব প্রদানের দূরদর্শিতা। মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের প্রতিটি কাজে এ সকল গুণাবলীর সমাবেশ দেখা যায়। সর্বোপরি, একজন মন্ত্রীর সার্থকতা নির্ভর করে প্রশাসনিক দক্ষতার উপর। অনেকে মন্ত্রী আমলাদের প্রস্তাবে শুধু ডিটু মেরে যান, বোঝেন না; কিংবা বুঝলেও গভীরে যাবার চেষ্টা করেন না। সৈয়দ আবুল হোসেন তার কাজের ব্যাপারে যেমন অভিজ্ঞ, তেমন সচেতন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সকল নীতিমালা, বিধি, সাকুর্লার, সরকারি আদেশ ও পিপিআর সম্পর্কে তার অগাধ পাণ্ডিত্য রয়েছে। তার সাথে কাজ করেছেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তার কাছে আমি এমনই শুনেছি। কাজে কাজেই তিনি প্রতি নথির আগাগোড়া সহজে বুঝে নিতে পারেন দেখার সাথে সাথে।
তার আত্মসংযম ক্ষমতা প্রবল। ফলে যে কোনো পরিস্থিতি তিনি খুব সহজে কোনোরূপ মনোমালিন্য ব্যতিরেকে সমাধান করতে পারেন। অনেকে দায়-দায়িত্ব অন্যের উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকেন এবং ব্যর্থতার দায়ভার অধস্তনদের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে সাফাই নেবার চেষ্টা করেন। সৈয়দ আবুল হোসেনকে আমি এমন দায় এড়ানো মনোভাব নিয়ে কাজ করতে কখনও দেখিনি। মন্ত্রণালয়ের সবার একই মত- তার মতো মানুষ বেশি একটা দেখা যায় না, তার মতো মন্ত্রীও খুব কম। তিনি মন্ত্রণালয়ের কাজকে ব্যক্তিগত কাজের মতো গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থকে স্বচ্ছতার সাথে অথচ সর্বনিম্ন খরচে শুধু জনকল্যাণে ব্যয় করার চেষ্টা করেন। সৈয়দ আবুল হোসেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চুপ বসে থাকেন না। নিবিড় তদারক করেন। কাজ আদায় এবং যথাসময়ে কাজটির সফল সম্পাদনের জন্য সবার সাথে নিজেও সামিল হয়ে যান কাজে এবং ব্যর্থতার দায়ভার অন্যের উপর চাপিয়ে না-দিয়ে নিজে বহন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেন না। এটি একজন নেতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে আমি মনে করি।
সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ইত্যাদি পদালঙ্করিক হলেও মূলত এর প্রকাশ ঘটে মনে। কেউ মর্যাদা ও ক্ষমতায় যত বড় হোন না কেন, মানসিক দিক দিয়ে বড় না-হলে সে বড়ত্ব দামি অথচ বাসী খাবারের ন্যায় দুর্গন্ধ ছড়ায়, তাই পরিত্যাগ করা ছাড়া উপায় থাকে না। সৈয়দ আবুল হোসেন যত বড় তার চেয়ে বড় তার মন; তার চেয়ে উদার তার ব্যবহার। ফলে তার বড়ত্বে অহঙ্কার এসে বসতে পারে না। তিনি যত বড় হচ্ছেন তার মনে তত বেশি বিনয় শোভা পাচ্ছে। মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকে। শিশুর মতো নিষ্পাপ হাসির মাঝে সরলতার আলোর স্ফুরণ যে কাউকে বিগলিত করে দিতে পারে। তিনি চারিত্রিক অলঙ্করণে সুশোভিত মনের একজন সুন্দর মানুষ।
সৈয়দ আবুল হোসেনের যে গুণটি সবচেয়ে বেশি আমাকে আকর্ষণ করে সেটি হচ্ছে উদারতা। দল-নির্বিশেষে সবাইকে তিনি প্রশাসন ও আইনের দৃষ্টিতে অভিন্ন মনে করেন। বিশেষ করে, উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি সম্পদের বণ্টনকে সমভাবে বণ্টনের চেষ্টা করেন। হয়ত তার ইচ্ছামতো সব কিছু সম্ভব হয় না। কিন্তু তিনি চেষ্টা করেন- এ ব্যাপারে কারও কোনো সন্দেহ নেই। কালকিনি এলাকার উন্নয়নে সৈয়দ আবুল হোসেন দলীয় চেতনাকে কখনও গুরুত্ব সহকারে দেখেননি। তার মানে এ নয় যে, তিনি তার সমর্থকদের অবহেলা করেন। তিনি নির্বাচিত হবার পর শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবাইকে কাছে টানার চেষ্টা করেন। এ যে চেষ্টা তা-ই বা কয়জন দেখাতে পারেন? মন্ত্রী হবার পর কালকিনিবাসী কর্তৃক প্রদত্ত বিশাল সংবর্ধনা সভায় তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছেনÑ তার একটি কপি আমি পড়েছি। এ বক্তৃতায় তিনি ওয়ান-ইলেভেনের সময় যারা তার প্রতি চরম ঘৃণ্য ব্যবহার করেছেন তাদেরকেও ক্ষমা করে দিয়ে জাতীয় উন্নয়নে একাত্ম হবার উদাত্ত আহবান করেছেন।
দলের প্রতি পূর্ণ অনুগত থেকেও সবার প্রতি ভালো আচরণ করা যায়- সৈয়দ আবুল হোসেন এর জ্বলন্ত উদাহরণ। শুধু জিহ্বাটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে- শত্রুর মনের গভীরেও রেখাপাত করা যায়; এটির উদাহরণও আমরা সৈয়দ আবুল হোসেনের কাছ হতে নিতে পারি। অমায়িক ব্যবহার দিয়েও বঞ্চিত ভাবেন এমন কাউকে সন্তুষ্ট করা যায়-এটিও আমরা তার আচরণে দেখতে পাই।
বাংলাদেশে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার মতো সংস্কৃতি কিংবা পরিবেশ এখনও সৃষ্টি হয়নি। এটি আওয়ামী লীগ-বিএনপি বা অন্য যে কোনো দলের বেলায় প্রযোজ্য। যে ক্ষমতায় যায়, সে নিজেকে বড় ভেবে বসে, যে বিরোধী দলে থাকে সে নিজেকে বঞ্চিত ভেবে বসে। পরস্পর কাদা ছোড়াছুড়ি, একে অন্যকে দোষারোপ ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এগুলো ঠিক নয়, তবু আমরা কেউ এগুলো ছাড়তে পারিনা। ভিন্ন মতাবলম্বীর দোষের সাথে সাথে গুণ প্রকাশের সংস্কৃতি চালু হলে গণতন্ত্রের ভিত আরও মজবুত হবে। সৈয়দ আবুল হোসেন এ দুটির সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেন। এটি শুধু দূরদর্শিতা নয়, মহত্তের পরিচায়কও বটে।
ব্যক্তি বিবেচনায় মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন একজন চমৎকার মানুষ। সততা, বিশেষ করে, অর্থিক সততা একজন মন্ত্রীর সুনাম ও সফলতার জন্য অপরিহার্য। আর শুধু সৎ হলে হয় না, সততার সাথে থাকতে হয় নিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও দ্রুততা। সৈয়দ আবুল হোসেন সততার সাথে নিষ্ঠার সমন্বয় ঘটিয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কে একটি কার্যকর মন্ত্রণালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যোগ্য লোককে যোগ্যস্থানে অধিষ্ঠিত করে যোগ্যতার যে মূল্যায়ন করেছেনÑ এটি আমাদের সবার জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। আমি তার সাফল্য কামনা করি।

আতাউর রহমান খান কায়সার : বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রাসঙ্গিক বাস্তবতা
মো. মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া
ইদানিং দেশের প্রায় সব পত্রপত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় পদ্মা-সেতু প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তর লেখা-লেখি ও আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সিভিল সোসাইটি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও বিষয়টিতে কৌতুহলী হয়ে পড়েছেন। বিশ্বব্যাংক গত ২৯ জুন তারিখে প্রকল্পের ঋণচুক্তি বাতিল করায় বিষয়টিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে এবং এটি ‘টক অব দি কান্ট্রি’-তে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় অনেক ক্ষেত্রেই পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আলোচকবৃন্দ প্রাসঙ্গিক বাস্তবতা যথার্থভাবে না জেনেই ধারণাপ্রসূত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে অসত্য, অর্ধসত্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে কাল্পনিক তথ্যাদি উপস্থাপন করছেন। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের সচিব পদে দু’বছর কাজের সুবাদে আমি সরকারি দায়িত্বপালনের কারণেই প্রত্যক্ষভাবে পদ্মা-সেতু প্রকল্পের বিষয়ে অবহিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সময়ের প্রয়োজনে এবং দেশের স্বার্থে সে অভিজ্ঞতালব্ধ প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলী জনসাধারণকে অবহিত করার লক্ষ্যে বিবেকের তাড়নায় এ লেখার প্রয়াস। বিনয়ের সাথে জানাতে চাই-দীর্ঘ ৩২ বছর ন্যূনতম কোন অভিযোগ ব্যতীত পরিপূর্ণ আন্তরিকতা, সততা ও নিষ্ঠার সাথে সরকারি চাকরির শেষ পর্যায়ে অসত্য, অর্ধসত্য এমনকি কাল্পনিক তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে জড়িয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত নানাবিধ সংবাদ/নিবন্ধ এবং বিভিন্ন টেলিভিশনের ‘টক শো’-তে কতিপয় আলোচকবৃন্দের মন্তব্যে আমি মর্মাহত হয়েছি সত্য; তবে আত্মপক্ষ সমর্থন করা বা অন্য কাউকে দোষারোপ করা এ লেখার উদ্দেশ্য নয়।

পদ্মা-সেতু প্রকল্পের কাজের শুরু
আমরা সকলেই জানি বর্তমান সরকার ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই পদ্মা সেতু নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করে। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯ জানুয়ারি, ২০০৯ তারিখে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় পদ্মা সেতুর ডিজাইন পরামর্শক হিসেবে গধঁহংবষষ অঊঈঙগ খঃফ.-কে নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজের সর্বোচ্চ মেয়াদ ছিল ২ বছর; তবে প্রতিষ্ঠানটি ১৭ মাসের একটি ধপপবষবৎধঃবফ কর্মসূচি প্রণয়ন করে কাজ শুরু করে। বাস্তবে উক্ত সময়সীমা উত্তীর্ণ হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কৌশলে তাদের পরামর্শক সেবার মেয়াদ বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হলেও তাদেরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যক্রম সম্পদান এবং ফবষরাবৎধনষবং হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। পদ্মা-সেতু প্রকল্পে একাধিক উন্নয়ন সহযোগী থাকায় প্রকল্পের স্বার্থে তাদের মধ্যকার সমঝোতা ও সমন্বয়ের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কাজের শুরুতেই বিশ্বব্যাংক ও জাইকা’র মধ্যে মূলসেতু নির্মাণের ব্যাপারে একটি বড় কারিগরি বিষয়ে মতদ্বৈততার সৃষ্টি হয় এবং প্রায় অচল অবস্থা সৃষ্টি হলে সচিব হিসেবে আমার যোগদানের পর সেতু বিভাগের পক্ষ হতে উদ্যোগ গ্রহণ করে বিষয়টির সম্মানজনক সমাধান করা সম্ভবপর হয়। অবশ্য টেগর ডকুমেন্ট এর ক্লিয়ারেন্স প্রদানের পূর্বেই বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের কার্যক্রম স্থগিত করে।
এছাড়া, ০১ জুলাই, ২০১১ তারিখে বিশ্বব্যাংক সেতু কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত প্রিকোয়ালিফিকেশন প্রস্তাব অনুমোদন করে। তবে সেতু কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত (ডিজাইন পরামর্শক ও মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশে) টেন্ডার ডকুমেন্ট (বিড ডকুমেন্ট) অনুমোদন নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়। বিশ্বব্যাংক উক্ত ডকুমেন্টে শুধুমাত্র তাদের ‘নিজস্ব এন্টিকরাপশন’ গাইডলাইন এর নির্দেশাবলী অন্তর্ভূক্ত করে। এতে অন্য দুটি উন্নয়ন সহযোগি যেমন এডিবি ও জাইকা আপত্তি প্রদান করে এবং তাদের গাইডলাইনের নির্দেশাবলীও অন্তর্ভূক্ত করার দাবী জানায়। সেতু বিভাগ হতে ৩টি উন্নয়ন সহযোগি সংস্থার সাথে দীর্ঘ নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে বিষয়টি সমঝোতা করা সম্ভবপর হয়। অবশ্য টেগর ডকুমেন্ট এর কিয়ারেন্স প্রদানের পূর্বেই বিশ্বব্যাংক প্রকল্পের কার্যক্রম স্থগিত করে।

প্রকল্পে সম্পাদিত কার্যাদি
পদ্মা-সেতু প্রকল্পের কাজে সময়ক্ষেপণ পরিহার করে একইসাথে বিভিন্ন কাজ এগিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছিল। একদিকে ডিজাইন প্রণয়ন, অন্যদিকে আনুষঙ্গিক কাজের প্রস্ততি যেমনÑ জমি অধিগ্রহণ ও এর মূল্য প্রদান, ৪টি পুনর্বাসন সাইট উন্নয়ন, পরিকল্পনা মাফিক রাস্তাঘাট ও ইউটিলিটি সার্ভিস স্থাপনসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থাকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রম স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সাথে সম্পাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। জমি অধিগ্রহণের দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল শরিয়তপুর, মাদারিপুর ও মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উপর। দু’একটি ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের অর্থ প্রদান বিষয়ে অভিযোগ/আপত্তি উত্থাপিত হলে তাৎক্ষণিক জেলা প্রশাসকদের সাথে যোগাযোগ করে এর প্রতিকারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অধিগ্রহণকৃত জমির সঠিক মূল্য পুণঃ নির্ধারণের ও প্রদানের ক্ষেত্রে সেতু বিভাগের পদক্ষেপ ও ভূমিকা মাওয়া ও জাজিরা সাইটের ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ ও জনপ্রতিনিধিগণের নিকট বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়। এ সব কাজে নূ্যূনতম কোন দুর্নীতি, অনিয়ম বা অভিযোগ ব্যতীত সরকারি বাজেটের প্রায় ১২০০ কোটি টাকারও বেশী ব্যয়িত হয়। বিশ্বব্যাংকসহ প্রকল্পের সকল উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিনিধিবর্গ উক্ত কার্যাদি পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

বিশেষজ্ঞ কমিটি ও ডিজাইন পরিবর্তন
বিশ্বব্যাংক, এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও জাইকা প্রত্যেকেই পদ্মা সেতুর কাজের জন্য একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করেন। সার্বিক কাজ সমন্বয়ের জন্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার মধ্যে বিশ্বব্যাংককে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। তদপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংক তাদের একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা জনাব মাসুদ আহমাদকে ‘টাস্ক টীম লিডার’ হিসেবে মনোনীত করে। উক্ত মনোনীত ব্যক্তিগণ সার্বক্ষণিক পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালকসহ অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ারগণের এবং ডিজাইন পরামর্শকের সাথে যোগাযোগ ও সভার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় নিষ্পত্তি করেন। প্রকল্পের কারিগরি বিষয়াদি পর্যলোচনা ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষকে সহায়তার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ টীম (চধহহবষ ড়ৎ ঊীঢ়বৎঃং) গঠন করা হয়। প্রফেসর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত উক্ত বিশেষজ্ঞ টীমে বুয়েটের আরও চারজন অধ্যাপক নিয়োজিত রয়েছেন; তারা হলেনÑ প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত, ড. মু. সফিউল্লাহ, ড. ফিরোজ এবং ড. আলমগীর মুজিবুল হক। এ’ছাড়া জাপান, নেদারল্যান্ড ও নরওয়ের ৫ জন পানি বিশেষজ্ঞ এই প্যানেলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এদের অধিকাংশই বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু নির্মাণকালীন সময়ে প্যানেল সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। ডিজাইন প্রণয়ন, সেতুর প্রতিটি প্যাকেজের ব্যয় নির্ধারণ, টেন্ডার প্রাক-যোগ্যতার ডকুমেন্ট তৈরী, মূল টেন্ডার ডকুমেন্ট তৈরী ইত্যাদি প্রতিটি ক্ষেত্রে ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রণীত ডিজাইন/দলিলে উন্নয়ন সহযোগীদের কিয়ারেন্স গ্রহণ করা হয় যার নেতৃত্ব দেন বিশ্বব্যাংকের নিয়োজিত টাস্ক টীম লিডার। সেতু বিভাগের পক্ষ হতে দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রদান, নথি অনুমোদন, বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয় ইত্যাকার বিষয় উন্নয়ন সহযোগী, প্যানেল অব এ্যাক্সপার্টস, ডিজাইন পরামর্শক এবং সর্বোপরি সরকারের নিকট ব্যাপক প্রশংসিত হয়। মূল সেতুর ঠিকাদার প্রাকযোগ্যতার জন্য টেন্ডার আহবান করা হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১১টি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দাখিল করে। এরমধ্যে মূল্যায়ন কমিটি ৫টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাক্্যোগ্য হিসেবে নির্বাচন করে। টেন্ডার আহবানের পর ডিজাইন আংশিক পরিবর্তনের অজুহাতে বিশ্বব্যাংক পুণঃ টেন্ডার আহবানের প্রস্তাব দেয়। পূর্বের ডিজাইনেÑ দরপত্রে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানসমূহের নদীতে ইড়ৎবফ এবং/অথবা জধপশরহম চরষরহম-এর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে মর্মে উল্লেখ ছিল। পরবর্তীতে চূড়ান্ত ডিজাইনে শুধুমাত্র জধপশরহম চরষরহম-এর প্রভিশন রাখা হয়। বিশ্বব্যাংকের সাথে বিবাদ এবং লেখালেখিতে সময়ক্ষেপন হতে পারে বিবেচনায় পুনঃটেন্ডার বিজ্ঞপ্তির প্রস্তাবে সম্মত হয়ে এপ্রিল’২০১০ এ পুনরায় টেন্ডার আহবানের প্রেক্ষিতে ১০টি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয় এবং পূর্বের প্রাক-যোগ্য বিবেচিত ৫টি প্রতিষ্ঠানই মূল্যায়ন কমিটি কর্তৃক প্রাকযোগ্য বিবেচিত হয়।

প্রকল্পের কাজের মোটাদাগের প্যাকেজ, মূল্যায়ন কমিটি ও মূল্যায়ন
পদ্মা-সেতু সংশ্লিষ্ট কাজ (ঢ়ধপশধমবং) গুলো হল-মূল সেতু, নদীশাসন, সংযোগ সড়কসহ যাবতীয় পূর্ত কাজ এবং ঈড়হংঃৎঁপঃরড়হ ঝঁঢ়বৎারংরড়হ ঈড়হংঁষঃধহঃ ও গধহধমবসবহঃ ঝঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ ঈড়হংঁষঃধহঃ নিয়োগ।
আমার সেতু বিভাগের সচিব হিসেবে যোগদানের পূর্বেই দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা থাকলেও স্বচ্ছ ও বস্থনিষ্ঠ মূল্যায়নের উদ্দেশে মাননীয় মন্ত্রী এবং উন্নয়ন সহযোগী সমন্বয়ক বিশ্ব ব্যাংকের সাথে আলোচনাক্রমে উক্ত কমিটি পরিবর্তন করে পদ্মা-সেতু সংশ্লিষ্ট কাজ যথাÑ মূল সেতু, নদীশাসন, সংযোগ সড়কসহ যাবতীয় পূর্ত কাজের দরপত্র মূল্যায়নের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ এবং প্রশ্নাতীত সুনামের অধিকারী প্রফেসর ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. আইনুন নিশাত ও ড. আবু সিদ্দিকসহ ৭ জন কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। এছাড়া ঈড়হংঃৎঁপঃরড়হ ঝঁঢ়বৎারংরড়হ ঈড়হংঁষঃধহঃ ও গধহধমবসবহঃ ঝঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ ঈড়হংঁষঃধহঃ দরপত্র মূল্যায়নের জন্য সচিবের নেতৃত্বে অপর একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির অন্যান্য সদস্যগণ ছিলেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী জনাব তরুণ তপন দেওয়ান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক প্রকৌশলী মকবুল হোসেন, বুয়েটের অধ্যাপক, ড. ইসতিয়াক আহমেদ ও পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক জনাব রফিকুল ইসলাম, ড. দাউদ আহমেদ এবং সেতু কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মোঃ ফেরদৌস।
মূল সেতু, নদীশাসন, সংযোগ সড়কসহ যাবতীয় নির্মাণ প্যাকেজের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অঊঈঙগ। প্রথমে উক্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত কারিগরি বিশেষজ্ঞগণ দর প্রস্তাবগুলো পুঙ্খনাপুঙ্খ পরীক্ষা করেন। অতঃপর অঊঈঙগ-এর নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াস্থ চৎরহপরঢ়ধষ ঙভভরপব-এর উচ্চ পদস্থ বিশেষজ্ঞগণের সম্মতি গ্রহণের পর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির নিকট উপস্থাপন করা হয়। মূল্যায়ন কমিটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করেছে; তাঁদের কাজে কোনভাবেই কোন প্রভাব বিস্তার বা সেরূপ প্রচেষ্টা হয়নি; এমনকি মূল্যায়ন কমিটির কোন সিদ্ধান্ত বা মতামত সচিব কিংবা মন্ত্রী কর্তৃক কখনো অগ্রাহ্য করা হয়নি। দ্বিতীয় বার টেন্ডার আহবানের পর মূল সেতুর প্রাক্ যোগ্যতা মূল্যায়ন প্রতিবেদন, ডিজাইন পরামর্শক এবং মূল্যায়ন কমিটি কর্তৃক চূড়ান্ত করার পর ০৮ জানুয়ারি, ২০১১ তারিখে বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করা হয়। প্রথম টেন্ডারের পর যে ৫টি প্রতিষ্ঠান প্রাক্্ যোগ্য বিবেচিত হয়েছিল দ্বিতীয় টেন্ডারের মূল্যায়নেও সে ৫টি প্রতিষ্ঠানই কমিটি কর্তৃক প্রাক্্ যোগ্য হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংক উক্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন পরীক্ষান্তে টাস্ক টীম লিডারের ২৯ মার্চ ও ০৬ এপ্রিল তারিখের ই-মেইলের মাধ্যমে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (ঈজঈঈ)-কে প্রাক্্ যোগ্য হিসেবে বিবেচনার অনুরোধ করে। মূল্যায়ন কমিটি তথা সেতু বিভাগ ০৭ এপ্রিল এক পত্রে (ঈজঈঈ)-কে যোগ্য হিসেবে বিবেচনায় অসম্মতি জানায়। পুনরায় বিশ্বব্যাংক ১৩ এপ্রিল তারিখের ই-মেইলে ঈজঈঈ-এর কাছ থেকে কিছু অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করে প্রস্তাব পুনর্মূল্যায়নের অনুরোধ জানায়। তদপ্রেক্ষিতে সেতু কর্তৃপক্ষ ঈজঈঈ এর কাছে তাদের পূর্ব কাজের অভিজ্ঞতার স্বপক্ষে ড্রয়িং, ফটোগ্রাফ, নির্মাণ সামগ্রী এবং বৃহৎ ডায়মিটারের রেকিং পাইল-এ ব্যবহৃত হ্যামারের বর্ণনা দেয়ার জন্য চিঠি লেখেন। তারা যেসব তথ্য প্রেরণ করে তাতে ডিজাইন পরামর্শক ও মূল্যায়ন কমিটি বড় রকমের অসঙ্গতি দেখতে পায়। ঈজঈঈ অন্য প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ করা ব্রিজের ছবি পরিবর্তন করে ঈজঈঈ-এর নামে জমা দেয়। তাছাড়া পাইলিং ইকুইপমেন্টস্্ ও অন্যান্য কারিগরি বিষয়ে যেসব তথ্যাদি হাজির করে তাতে পদ্মা সেতুর মত বড় ব্রিজের পাইলিং করার মত যোগ্যতা প্রমাণ করে না। ০৭ মে, ২০১১ তারিখে ডিজাইন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান তার প্রতিবেদনে উরেøখ করে যে, ঈজঈঈ মিথ্যা তথ্য ও অন্য প্রতিষ্ঠানের নির্মিত ব্রীজের ছবি প্রদান করেছে। এতদপ্রেক্ষিতে ঢাকাস্থ চীন দূতাবাসের ইকোনোমিক কাউন্সিলরকে ০৮ মে তারিখে বিবিএ অফিসে আমন্ত্রণ করে এনে ঈজঈঈ’র চিঠি দেখানো হলে তিনি জানান যে, চিঠিতে উল্লেখিত চীনা কর্মকর্তার নামের স্বাক্ষর চীনা ভাষার নকল স্বাক্ষর। ০৯ মে, ২০১২ তারিখে ঈজঈঈ সেতু কর্তৃপক্ষকে পত্র দিয়ে মূল সেতুর প্রাক যোগ্যতার আবেদন প্রত্যাহার করে নেয় এবং তাদের স্থানীয় এজেন্ট ঠবহঃঁৎব ওহঃবৎহধঃরড়হধষ খরসরঃবফ এর এজেন্সিশীপ বাতিল করে। এতে প্রতিয়মান হয় যে, ঈজঈঈ-এর পক্ষে স্থানীয় এজেন্ট ঠবহঃঁৎব ওহঃবৎহধঃরড়হধষ খরসরঃবফ ঈজঈঈ এর একটি শাখা অফিসের মাধ্যমে বিভিন্ন জাল তথ্য পরিবেশন করেছে। ১৮ই মে, ২০১১ তারিখে পুনরায় ৫টি প্রতিষ্ঠানের প্রিকোয়ালিফিকেশনের সুপারিশ বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করা হয়। ঈজঈঈ প্রাক্্ যোগ্যতার প্রতিযোগীতা হতে নাম প্রত্যাহার করায় বিশ্বব্যাংক আর তাদের পক্ষে চাপ প্রয়োগ করেনি।
নদীশাসন কাজের প্রি-কোয়ালিফিকেশন টেন্ডার ২৪ জুলাই, ২০১০ তারিখে আহবান করা হয়। টেন্ডার কমিটি ৬টি প্রতিষ্ঠানকে প্রি-কোয়ালিফিকেশনের মূল্যায়ন প্রস্তাব ২৪ ডিসেম্বর, ২০১০ তারিখে বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করে। বিশ্বব্যাংক আরও ২টি চীনা প্রতিষ্ঠানকে প্রাক-যোগ্য বিবেচনা করা যায় কিনা তা পরীক্ষা করতে বলে। ডিজাইন পরামর্শক ও মূল্যায়ন কমিটি বিশ্বব্যাংকের এ প্রস্তাবেও সম্মত হয়নি। অক্টোবর পর্যন্ত নদীশাসন কাজের প্রি-কোয়ালিফিকেশন চূড়ান্ত করা যায়নি। উল্লিখিত ২টি প্যাকেজে বিশ্বব্যাংকের সুপারিশ গ্রহণ না করার কারণে বিশ্বব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ মৌখিকভাবে যোগাযোগ মন্ত্রীকে দোষারোপ করেন, যদিও এব্যাপারে যোগাযোগ মন্ত্রীর কোন কিছু করার ছিলনা। ঈজঈঈ’র স্থানীয় এজেন্ট ঠবহঃঁৎব ওহঃবৎহধঃরড়হধষ খরসরঃবফ যোগাযোগ মন্ত্রী কর্তৃক মূল্যায়ন কমিটিকে প্রভাবিত করা হয়েছে মর্মে বিশ্বব্যাংকের নিকট অভিযোগ করে মর্মে অনেকে ধারণা করেন।
কনষ্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালটেন্সির (ঈঝঈ) প্রস্তাব মূল্যায়ন বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। এ প্যাকেজের জন্য প্রকল্পে প্রায় ৩৪৫ কোটি টাকা (৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ধরা আছে। বিশ্বব্যাংকের গাইড লাইন অনুসরণ করে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের জন্য ০৮.১২.২০০৯ তারিখে ঊীঢ়ৎবংংরড়হ ড়ভ ওহঃবৎবংঃ (ঊঙও) আহবান করা হলে প্রস্তাব দাখিলের শেষ দিন (১৪.০১.২০১০) পর্যন্ত ১৩ টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দাখিল করে। আমি সেতু বিভাগে যোগদান করার পূর্বে গঠিত প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটি ০৫টি প্রতিষ্ঠানকে ‘শর্ট লিস্টিং’ করে। এ ০৫টি প্রতিষ্ঠান হ’ল :
১. ঐরময চড়রহঃ জবহফবষ খঃফ. ট. ক. ২. ঙৎরবহঃধষ ঈড়হংঁষঃধহঃং ঈড়সঢ়ধহু খঃফ, ঔধঢ়ধহ. ৩. ঐধষপৎড়ি এৎড়ঁঢ় খঃফ. টক ৪. ঝঘঈ- খধাধষরহ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ওঘঈ. টক, ঈধহধফধ. ৫. অঊঈঙগ ঘবুিবধষধহফ খঃফ. প্রতিটি কোম্পানীর সাথে ৩/৪ টি করে দেশী-বিদেশী কোম্পানী জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানী হিসেবে সংযুক্ত রয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমা অর্থাৎ ৩০.০৬.২০১০ তারিখ পর্যন্ত শর্ট লিস্টেড ০৫টি প্রতিষ্ঠানই ‘দুই ইন্্ভেলপ’ পদ্ধতিতে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব দাখিল করে। জুলাই মাসেই আমার নেতৃত্বে গঠিত কমিটি মূল্যায়নের কাজ শুরু করে। প্রসঙ্গক্রমে বলা ভাল যে, কমিটিতে আমি একমাত্র নন্্টেকনিক্যাল ব্যক্তি। অন্যান্য সকলেই ইঞ্জিনিয়ার এবং অনুরূপ প্রস্তাব মূল্যায়নে অভিজ্ঞতা রয়েছে মর্মে দাবী করেন। ২/১টি সভা অনুষ্ঠানের পরই আমি মূল্যায়নের বিভিন্ন খুঁটিনাটি বুঝতে পারি। তবে প্রায় ৪ মাস অতিক্রান্ত হলেও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। এর কারণ সকলেই দায়িত্বপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। মূল্যায়ন করার জন্য যথেষ্ট সময় দেয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। বেশ কয়েকজন সদস্য বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপন করতে থাকেন। কয়েকজন সদস্যের মতামত ও কথাবার্তায় বুঝা যায় তারা একটি বিশেষ কোম্পানীকে সবচেয়ে যোগ্যতা সম্পন্ন বিবেচনা করছেন। বুয়েটের অধ্যাপকসহ অন্য কয়েকজন সদস্য ভিন্ন মত পোষণ করেন, তবে তারা কেউই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করে নম্বর প্রদান করেননি। আমি সময় বেঁধে দিলাম যে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ২টি সভা করে সম্পূর্ণ মূল্যায়ন চূড়ান্ত করে বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করতে হবে। ইত্যবসরে দেখা যায় কয়েকজন সদস্য তাদের মূল্যায়ন ই-মেইলে আদান-প্রদান করছে। আমার ই-মেইলেও ২/১টি মূল্যায়ন পাওয়া যায়। উক্ত মূল্যায়ন খুবই পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। আমি দেখলাম, অন্য সদস্যগণ সুষ্ঠুভাবে মূল্যায়ন করলেও চূড়ান্ত মূল্যায়ণে স্বচ্ছতা আসবে না। সেকারণে মাননীয় মন্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে আমি সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নিম্নরূপ একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করি :
১। অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, সাবেক অধ্যাপক, বুয়েট -আহবায়ক
২। অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, ভিসি ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয় – সদস্য
৩। ড. মোঃ সফিউল্লাহ, সাবেক ভিসি, বুয়েট – সদস্য
৪। ড. দাউদ আহমেদ, বিশ্বব্যাংক কর্তৃক মনোনিত পরামর্শক ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা – সদস্য
৫। কাজী ফেরদৌস, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, পদ্মা সেতু প্রকল্প – সদস্য সচিব

উক্ত কমিটি পূর্বের প্রেক্ষাপট বুঝতে পারে এবং নতুনভাবে মূল্যায়নের কাজ শুরু করে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, এ মূল্যায়নে ডিজাইন কন্্সালটেন্ট কর্তৃক কমিটিকে সহায়তার সুযোগ নেই, কারণ অঊঈঙগ নিজেই ঈঝঈ এর একজন প্রতিদ্বন্দ্বি। মূল্যায়ন কমিটি বেশ কয়েকটি সভায় মিলিত হয়ে তাঁদের কারিগরি মূল্যায়ন প্রতিবেদন ডিসেম্বর, ২০১০ মাসে বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করে। বিশ্বব্যাংক ১০.০৩.২০১১ তারিখে উক্ত কারিগরি মূল্যায়নের উপর সম্মতি প্রদান করে। কারিগরি মূল্যায়নে ঐচজ, টশ প্রথম স্থান, ঝঘঈ-খধাধষরহ, ঈধহধফধ দ্বিতীয় স্থান, অঊঈঙগ, ঘবুিবধষধহফ তৃতীয় স্থান, ঐধষপৎড়,ি টক চতুর্থ স্থান এবং ঙৎরবহঃধষ, ঔধঢ়ধহ পঞ্চম স্থান অধিকার করে। উক্ত কারিগরি মূল্যায়ন অনুমোদনের সময় বিশ্বব্যাংক বিবিএকে এমর্মে অনুরোধ করে যে, আর্থিক মূল্যায়নের স্কোর যোগ করে চূড়ান্ত মূল্যায়নের সময় মূল্যায়ন কমিটি যাতে সর্বোচ্চ নম্বরধারী প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত পরামর্শক সদস্যদের (গধহঢ়ড়বিৎ) জীবনব”ত্তান্ত ভালভাবে পরীক্ষা কওে বিশ্বব্যাংক জানায়। বিশ্বব্যাংকের সম্মতি প্রাপ্তির পর মূল্যায়ন কমিটি আর্থিক প্রস্তাব উন্মুক্ত করে। বিশ্বব্যাংকের গাইড লাইন অনুযায়ী কারিগরি মূল্যায়নের উপর ৯০% এবং আর্থিক প্রস্তাবের উপর ১০% ‘ওয়েটেজ’ রাখা হয়। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন ফলাফল সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সামনে ঘোষণা করা হয়। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনবৃত্তান্ত যাচাইকালে বেশ কিছু ব্যক্তির জীবনবৃত্তান্তে কিছু অসংগতি পাওয়া যায়। ঐধষপৎড়ি আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে তাদের প্রস্তাবের অসংগতি স্বীকার করে। উল্লিখিত অসংগতি দূর করতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি প্রস্তাব (ঝঘঈ-খধাধষরহ এবং ঐধষপৎড়)ি আংশিক পুনঃমূল্যায়ন প্রয়োজন হয়। উক্ত মূল্যায়নে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবের গাণিতিক ভুল ও জীবন-বৃত্তান্তে উল্লেখিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা পরীক্ষা করা হয়। কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব যুক্ত করে সার্বিক মূল্যায়নে এসএনসি-লাভালিন প্রথম হয়। এর কারণ কারিগরি মূল্যায়নে প্রথম স্থান অধিকারী ঐচজ-এর আর্থিক দর এসএনসি-লাভালিনের প্রায় দ্বিগুণ। মূল্যায়ন কমিটির চূড়ান্ত মূল্যায়ন আগস্ট, ২০১১ মাসে বিশ্বব্যাংকে প্রেরণ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী কর্তৃক উক্ত মূল্যায়নের বিষয়ে লিখিত একটি নিবন্ধ গত ০২ জুলাই, ২০১২ তারিখ দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত নিবন্ধে তিনিও এ বিষয়ে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন।

যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন প্রসঙ্গ
তৎকালীন মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের কার্যক্রম বিষয়ে আমি কিছু উল্লেখ করতে চাই। সেতু বিভাগে যোগদান করার পর থেকেই আমি তাঁকে একজন ভদ্র, সদালাপী, অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী ব্যক্তি হিসেবে পেয়েছি। তিনি একদিন আমাকে বলেন, “আমরা যখন নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেই, সেদিন শপথ অনুষ্ঠান শেষে গাড়িতে উঠার সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে বলেন, ‘আবুল, পদ্মা ব্রিজ করার দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে। তখনই আমি বুঝতে পারি আমাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হবে। এরপর থেকে আমি নিরলসভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে সচেষ্ট হই”। বাস্তবেও তার কার্যকলাপে আমি তাঁর সদিচ্ছা ও নিরলস কর্মতৎপরতা লক্ষ্য করেছি। যখনই তাঁকে বলতাম, ‘স্যার, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি আছে, আপনার অনুমোদনের প্রয়োজন; তখনই তিনি সেতু বিভাগে চলে আসতেন এবং নথি সই করে দিতেন। এমনকি বাসায় চলে গেলেও অসময়ে ফোন করলে বলতেন, “আমি কি আসবো?” পদ্মা সেতুর প্রতিটি স্টেজেই কাজের অগ্রগতি মনিটর করতেন, প্রয়োজনে মাঠ পর্যায়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করতেন। বিভিন্ন সময়ে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সিনিয়র কর্মকর্তা, রাষ্ট্রদূত, সাংবাদিক প্রমুখকে নিয়ে চলমান কাজ পরিদর্শন করেছেন। মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের অগ্রগতি সম্পর্কে ডিজাইন পরামর্শক ও মূল্যায়ন কমিটির সাথেও আলোচনা করতেন। কমিটি বিভিন্ন বিষয়ে তাঁকে খুটিনাটি ব্যাখ্যা করত। মন্ত্রী মহোদয় মূল্যায়ন কমিটির সদস্যগণ বিশেষ করে প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরীকে খুবই শ্রদ্ধা করতেন। মূল্যায়নের বিষয়গুলো এমন টেকনিক্যাল ধরণের যে, মাননীয় মন্ত্রী কিংবা অন্য কারো মূল্যায়ন প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার কোন সুযোগ ছিল না। আমাদের কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাগণ মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর কর্মতৎপরতার প্রশংসা করেন, তবে কেউ কেউ ধারণা করেন, তিনি প্রকল্প পরিচালকের মাধ্যমে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে চেষ্টা করেন। এবিষয়টি তাঁরা আমাকেও বলেন। তাঁরা জানতেন যে, সৈয়দ আবুল হোসেন ‘সাকো ইন্টারন্যাশনাল’ নামক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারী। তাদের ধারণা, পদ্মা সেতুর কাজ পেতে আগ্রহী কোম্পানীগুলির সাথে মন্ত্রীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগ থাকতে পারে। বাংলাদেশের প্রিন্ট মিডিয়া বা বিভিন্ন সংবাদপত্রে মাননীয় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রচুর লেখালেখি হতে থাকে। বিশ্বব্যাংকের হেড্্ কোয়ার্টারের কর্মকর্তাগণও বিষয়টি অবহিত হন। সংবাদপত্রে এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে লিখিত প্রতিবাদে মাননীয় মন্ত্রী জানান যে, সরকারের মন্ত্রী হওয়ার পর তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন, যদিও তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণ সে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে বহাল রয়েছেন। যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে নিয়োজিত হওয়ার পর থেকে মন্ত্রীর এ প্রতিষ্ঠানটি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কোন প্রকল্প কিংবা কোন পূর্ত কাজ বা পরামর্শক কাজে অংশ গ্রহণ করেনি। এদিকে প্রকল্প পরিচালক জনাব রফিকুল ইসলামের পূর্বতন চাকরিস্থল সড়ক ও জনপথ বিভাগে কথিত দুর্নীতির বিষয়েও সংবাদপত্রে ব্যাপক লেখালেখি শুরু হয়। পদ্মা প্রকল্পের পরিচালক নিযুক্ত হওয়ার পূর্বে তিনি সড়ক ও জনপথ বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন। ২০০৭-২০০৮ সালে কেয়ারটেকার সরকারের সময় সামরিক বাহিনী অন্যান্য প্রকৌশলী কর্মকর্তার সাথে তাঁকে দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করে। তিনি বেশ কিছুদিন জেলে ছিলেন। সংবাদপত্রে আরও খবর পরিবেশিত হয় যে, তিনি তৎকালে গঠিত “ট্রুথ কমিশন” সমীপে হাজির হয়ে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা পেয়েছেন। এরূপ খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হওয়ার পর জনাব রফিকুল ইসলাম প্রতিবাদ পাঠিয়ে জানান যে, তিনি ’ট্রুথ কমিশনে’ যাননি। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তার সাথে সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন, তবে পরবর্তীতে সসম্মানে ছাড়া পান। বিশ্বব্যাংকের ঢাকায় নিয়োজিত কর্মকর্তাগণ এবং প্রকল্পের টাস্ক টীম লিডার আমাকে জানান যে, এরূপ একজন আত্নস্বীকৃত ও চিহ্নিত দুর্নীতি পরায়ন কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত করা ঠিক হয়নি। মাননীয় মন্ত্রীর সাথে এ বিষয়ে আলাপ করা হলে তিনি জানান যে, ‘লোকটি কাজ বুঝে এবং ব্রিজ নির্মাণে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁর চেয়ে ভাল লোক আমি সড়ক বিভাগে কোথায় পাব? অধিকাংশ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।’

বিশ্বব্যাংকের সাথে সম্পর্ক, কথিত অভিযোগ ইত্যাদি
কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সাথে মতদ্বৈততা হলেও আমার সাথে বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পর্ক ছিল খুবই নিবিড়। এই সুসম্পর্কের কারণে সেতু বিভাগের সচিব হিসেবে আমার ২০১০ এর এপ্রিল থেকে ২০১১ এর জুলাই পর্যন্ত কয়েকটি ভ্রমণে বিশ্বব্যাংকের ওয়াশিংটন সদর দপ্তরে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নিকট থেকে প্রকল্পের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ আদায় করা সম্ভব হয়। ২০১০ সনের এপ্রিল মাসে মাননীয় অর্থ মন্ত্রীসহ বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জয়েলিক এর সাথে দেখা করে বিশ্বব্যাংকের ঋণ প্রাপ্তির বিষয়টি চূড়ান্ত করেন।
মূল সেতুর ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০০০ মিলিয়ন ডলার, নদী শাসন প্যাকেজের সম্ভাব্য ব্যয় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার এবং সুপারভিশন কনসালটেন্সি ব্যয় ধরা হয়েছিল মাত্র ৫০ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু শেষোক্ত প্যাকেজের কাজ পাওয়ার জন্যই প্রতিযোগীতা বেশী লক্ষ্য করা গিয়েছে। শুরুতেই ১টি কোম্পানীকে ‘ফেবার’ করার চেষ্টা আঁচ করতে পেরে মূল্যায়ন কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে পরবর্তী কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির মূল্যায়ন চলাকালীন সময়ে একটি মহল ই-মেইলের মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ডিপার্টমেন্টের সাথে যোগাযোগ করতে থাকে। ইন্টিগ্রিটি বিভাগের কর্মকর্তাদের দেয়া ই-মেইলের কপি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট জাপানী একজন কর্মকর্তার কাছেও পাঠানো হয়। শুরু থেকে না হলেও কয়েক মাস পর থেকে উক্ত ই-মেইলের কপি বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে আমার ই-মেইলে ফরওয়ার্ড করা হয়। দেখা যায় যে ২টি প্রতিষ্ঠান (এসএনসি-লাভালিন ও এইচপিআর) কারিগরি মূল্যায়নে বেশী নম্বর পেতে পারে বলে ঐ মহলটি আশংকা করে সেই প্রতিষ্ঠান ২টির বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে থাকে। কোন কোন মেইলে তারা ঐধষপৎড়-িএর ও দোষত্রুটি তুলে ধরে। মূল্যায়ন কমিটির বিভিন্ন সদস্য, মন্ত্রী, সচিব এমনকি বিশ্বব্যাংকের মনোনীত পরামর্শক ও টাস্ক টীম লিডারকে জড়িয়ে বানোয়াট তথ্য প্রদান করে। উক্ত ই-মেইলে আদান-প্রদানের সাথে পদ্মা প্রকল্পের কোন কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারে মর্মে সহজেই অনুমান করা যায়। ইন্টিগ্রিটির কয়েকজন কর্মকর্তা ই-মেইল আদান-প্রদানে ও তথ্য সংগ্রহে বেশ উৎসাহী হয়ে উঠে। ২০১১ সনে পদ্মা সেতুর গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমি ২ বার বিশ্বব্যাংক সদর দপ্তরে গমন করি। প্রথমবার (মার্চ-এপ্রিল, ২০১১ মাসে) টাস্ক টীম লিডারকে জানাই যে, ইন্টিগ্রিটির জুনিয়র ২ জন কর্মকর্তা যেভাবে ই-মেইলের মাধ্যমে একটি ভুল বিষয়ের উপর যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করছে তা নিরসনের জন্য আমি তাদের সাথে কথা বলতে চাই। টাস্ক টীম লিডার ইন্টিগ্রিটি বিভাগের সাথে যোগাযোগ করলে তারা বলে যে, এপর্যায়ে তারা আমার সাথে কোন কথা বলবেনা। দ্বিতীয়বার (জুন-জুলাই, ২০১১ মাসে) ভ্রমণে মাননীয় অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান নেতৃত্ব দেন। উল্লেখ্য ড. মসিউর রহমান ইতোমধ্যে পদ্মা প্রকল্পের ইন্টিগ্রিটি এড্্ভাইজার নিযুক্ত হয়েছেন। অনিয়মের কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রতিকারের জন্য তাঁকে জানানোর কথা। এ সফরে তিনি ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্টের সাথে বৈঠক করেন; কিন্তু কথিত অভিযোগ সমূহের বিষয়ে বৈঠকে কোন আলোচনা হয়নি। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট, মিস ইসাবেল গুরায়রা এর সাথে আমাদের সাক্ষাতের সময় আমি এ বিষয়টি পুনরায় উত্থাপন করি। তিনি জানান, ইন্টিগ্রিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট সরাসরি প্রেসিডেন্টের কাছে রিপোর্ট করেন। যে পদ্ধতিতে তারা কোন বিষয়ের তদন্ত করে তাতে আমাদের কোন কিছু বলার সুযোগ নেই। তবে তাদের তদন্ত চলাকালীন সময়ে পদ্মা সেতুর কাজ থেমে থাকবে না। কাজ এবং তদন্ত – এ দু’টি ইস্যু সম্পূর্ণ পৃথক। শুধু ওয়াশিংটনে নয়, আমি ঢাকাস্থ কান্ট্রি ডাইরেক্টরকেও বিষয়টি অবহিত করি। পরবর্তীতে খবর পেলাম ইন্টিগ্রিটির কর্মকর্তাগণ ঢাকায় এসে অভিযোগকারীদের সাথে দেখা করেছে। বিশ্বব্যাংকের স্থানীয় কর্মকর্তাগণকে আমি বললাম, ‘ইন্টিগ্রিটি যদি তদন্ত করে তবে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ ও মূল্যায়ন কমিটির সদস্য সকলেরই মতামত নিতে হবে’। তারা জানালেন, “ইন্টিগ্রিটি বিভাগের কাজের ব্যাপারে আমাদের বলার কিছু নেই”। জুলাই-আগস্ট, ২০১১ মাসের দিকে আমাকে জানানো হ’ল বিশ্বব্যাংক ইন্টিগ্রিটি সুপারভিশন কনসালটেন্সি ছাড়াও মূল সেতুর টেন্ডারের অনিয়মে মন্ত্রীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও তদন্ত করছে। একপর্যায়ে তারা মাননীয় মন্ত্রীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সাকো ইন্টারন্যাশনালেও গমন করেন। তাদের অভিযোগ ‘এ প্রতিষ্ঠানটি প্রাক্্ যোগ্যতা বহির্ভূত ঈযরহধ জধরষধিু ১৫ ইঁৎবধঁ নামক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে তাদের প্রাক্্ যোগ্য করে দেয়ার প্রস্তাব দেয়’। পরবর্তীতে শুধু ১৫ ইঁৎবধঁ নয়, প্রাক্্ যোগ্য ০৫টি প্রতিষ্ঠানের সাথেও নাকি মন্ত্রীর প্রতিষ্ঠানের লোক গিয়ে দেখা করে। এক পর্যায়ে কান্ট্রি ডাইরেক্টর আমাকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ গিয়েছে। তাঁকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে রেখে এ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। আমি বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে তাঁকে অবহিত করতে চাই’। আমি কান্ট্রি ডাইরেক্টরকে জানাই যে, আমরা যে পদ্ধতিতে পদ্মা সেতুর কাজ করে যাচ্ছি সে পদ্ধতিতে মাননীয় মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ করার কোন সুযোগ নেই। তিনি বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি। বিশ্বব্যাংক কর্তৃক তাঁকে সরানোর প্রস্তাব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভালভাবে নিবেননা। কান্ট্রি ডাইরেক্টর আমাকে বলেন, মন্ত্রিসভায় রদবদল করে তাঁকে অন্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিলেও হবে। আমি মাননীয় মন্ত্রীর বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ভুল ধারণা নিরসনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই। সেপ্টেম্বর, ২০১১ মাসে বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইন্টিগ্রিটির একজন পরিচালকসহ বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে সরকারের সাথে দেখা করে আনুষ্ঠানিকভাবে কথিত দুর্নীতির চেষ্টার বিষয়টি অবহিত করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের সময় মাননীয় অর্থ মন্ত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২ জন উপদেষ্টাও উপস্থিত ছিলেন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ হতে দুর্নীতির স্বপক্ষে প্রমাণ উপস্থানের জন্য বলা হয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন যে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন সভায় প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক গেলে সেখানে প্রমাণ উপস্থাপন করা হবে। তারা প্রধানমন্ত্রীর নিকট নিউইয়র্কে কোন তথ্য প্রমাণ দেয়নি। তবে মাননীয় অর্থ মন্ত্রী একই সময়ে ওয়াশিংটন গেলে তাঁর নিকট একটি চিঠি দেওয়া হয়। উক্ত চিঠিতে মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে বটে, কিন্তু কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ দেয়া হয়নি। বিশ্বব্যাংক বিষয়টি দুদক এর মাধ্যমে তদন্ত করার অনুরোধ করে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে প্রিন্ট মিডিয়ায় মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তুমুল লেখা-লেখি শুরু হয়। বিশ্বব্যাংক ঋণ চুক্তি ও পদ্মা সেতু প্রকল্পে তাদের কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দেয়। সেতু বিভাগ তখন মূল সেতুর প্রি-কোয়ালিফিকেশনের পর টেন্ডার আহবানের জন্য প্রস্থত। আর সুপারভিশন কনসালটেন্সির চূড়ান্ত মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংকের বিবেচনাধীন। এ পর্যায়ে বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রচারিত হয় যে, পদ্মা সেতুর দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতায় রয়াল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ এসএনসি-লাভালিনের অফিসে হানা দিয়ে তাদের কাগজপত্র জব্দ করে। যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে মিডিয়ার অপপ্রচারে নতুন মাত্র যোগ হয় যখন উইকিলিকস্্ এর ফাঁস করা ১টি চিঠিতে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়াটি তাঁকে ‘লেস দ্যান অনেস্ট’ আখ্যায়িত করেন। মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন করে নিজের সততা ও স্বচ্ছতার কথা বলেন, কিন্তু মিডিয়াতে তা গ্রহণযোগ্য হয়না। সে সময়ে মাননীয় মন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে আমি পিআইডিতে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করি। আমি পরিস্কারভাবে উক্ত সাংবাদিক সম্মেলনে আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরি এবং জানাই, যেভাবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কমিটির মাধ্যমে সেতুর কাজ চলে আসছে তাতে মাননীয় মন্ত্রী কেন, তাঁর উর্দ্ধের কোন কর্তৃপক্ষেরও এখানে হস্তক্ষেপের কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া যেখানে ঋণের কোন টাকাই ছাড় হয়নি সেখানে দুর্নীতির কোন প্রশ্নই আসেনা। আমার সাংবাদিক সম্মেলনের বক্তব্য পরদিন মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার পায়। একই সময়ে আমি কয়েকটি টিভি চ্যানেলেও পদ্মা পকল্পের কাজে আমাদের স্বচ্ছতা এবং কতিপয় স্বার্থান্বেষি ব্যক্তির বেনামি অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরি এবং বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই মর্মে জোর দিয়ে উল্লেখ করি। সে সময়ে দেশে কোন কোন মহল আমাকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক তো আপনার (সচিবের) বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করছেনা। আপনি মন্ত্রীর পক্ষে সাফাই গাচ্ছেন কেন?’ আমি বললাম, প্রকল্পের কাজ যে স্বচ্ছতার সাথে সম্পাদিত হচ্ছে কোন অনিয়ম হয়নি আমি তা-ই জনসমক্ষে তুলে ধরছি। আমাদের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে মন্ত্রী কেন, আমরা সকলেই দায়ী হবো। তাছাড়া মাননীয় মন্ত্রীর সাথে কাজ করে আমি দেখছি এপর্যন্ত তিনি আমাদের কোন কাজে হস্তক্ষেপ করেননি, কোন অনৈতিক বিষয়ে সুবিধা দাবী করেননি। ভবিষ্যতে কিভাবে এ থেকে ফায়দা নিবেন তা আমার জানা নেই। তবে তাঁর ব্যক্তিগত চালচলন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা থেকে বুঝা যায় এ সরকারের মন্ত্রী হওয়ার পূর্ব থেকেই তিনি বেশ সম্পদশালী। কাজেই মন্ত্রীত্ব করে সম্পদ কামানোর জন্য তাঁর হাপিত্তেস আমার চোখে পড়েনি। তিনি প্রচলিত ধ্যানধারনার রাজনীতি করেননা। সে জন্য তাঁর দলের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তিও তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ফোরামে এমনকি সংসদেও বক্তব্য প্রদান করেছেন। যোগাযোগ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মিডিয়ার অপপ্রচার তুঙ্গে উঠে যখন দীর্ঘ দেড়মাস বৃষ্টিতে পানি জমে সারা দেশের রাস্তা-ঘাট তথা সড়ক যোগযোগ ভেঙ্গে পড়ে, যানবাহন ধর্মঘট হয় এবং দেশে বেশকিছু সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। একটি দুর্ঘটনায় আরিচা থেকে আসার পথে সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব মিশুক মুনীর এবং চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ নিহত হন। উক্ত দুর্ঘটনা যদিও খারাপ রাস্তার কারণে হয়নি, তথাপি দেশের বুদ্ধিজীবি মহল মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবীতে সোচ্চার হন এবং ঈদের দিনেও শহীদ মিনারে সমবেত হয়ে তাদের দাবীর স্বপক্ষে বিক্ষোভ করেন। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দেশে বিদেশে যতই অভিযোগ থাকুক, দুর্নীতি কিংবা অদক্ষতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া সরকার কোন ব্যবস্থা নিতে চাইলেন না। ইতোমধ্যে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে অফিসের স্বার্থ বিরোধী কাজের কিছু নমুনা পাওয়ায় মাননীয় মন্ত্রীর সাথে আলোচনা করে তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের প্রস্তাব করি। অবশেষে অক্টোবর, ২০১১ মাসের প্রথমদিকে তাঁকে প্রকল্প পরিচালকের পদ থেকে সরানো হয়। একই মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমাকে সেতু বিভাগের সচিব পদ থেকে বদলী করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের ঢাকাস্থ এবং ওয়াশিংটনের কর্মকর্তাগণ এ বদলীর প্রেক্ষিতে বিস্মিত হন এবং মাননীয় অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চ মহলে সেতু বিভাগ থেকে আমাকে বদলী না করার জন্য অনুরোধ করেন। অক্টোবরে বদলী করা হলেও মাননীয় অর্থমন্ত্রী ও যোগাযোগ মন্ত্রীর অনুরোধে আমি নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেতু বিভাগে দায়িত্ব পালন করি।

দূর্নীতির অনুসন্ধান ও পরবর্তী পরিস্থিতি
বিশ্বব্যাংকের পূর্বের প্রস্তাব ছিল জনাব আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরালেই সেতুর কাজ চালিয়ে নেয়া যাবে। কিন্তু পরবর্তীতে মন্ত্রীর পোর্টফলিও বদল করে তাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়ার পরও তারা স্থগিত কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেনি। সরকারের উপরের মহল থেকে বিশ্বব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান বিষয়টি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জয়েলিকের হাতে। শোনা যায়, নীচের দিকে কিছু চেষ্টা হলেও জয়েলিকের অনিহার কারণে কাজ শুরু করা যায়নি। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়ে দেয় যে, কানাডিয়ান পুলিশ কর্তৃক এসএনসি-লাভালিনের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সেতুর কাজ শুরু করা হবেনা। অক্টোবর, ২০১১ মাসে আমি সেতু বিভাগের সচিব থাকা কালীন বিশ্বব্যাংকসহ অন্যন্য উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে পদ্মার কার্যক্রম চালিয়ে নেয়ার বিষয়ে কথা বলি। বিশ্বব্যাংকের যেসকল কর্মকর্তা আমাদের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন তাদের অভিমত এই যে, এপর্যন্ত প্রকল্পের যে কাজ হয়েছে তার স্বচ্ছতা সম্পর্কে আমাদের কোন অভিযোগ নেই। তবে আমরা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারিনা। এডিবি ও জাইকাসহ অন্যান্য সহযোগী সংস্থার কর্মকর্তাগণ উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দুঃখ প্রকাশ করেন। প্রকল্পের কার্যক্রমের মাঝ পথে অর্থ্যাৎ মূল সেতুর টেন্ডার আহবানের চূড়ান্ত মূহুর্তে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক কাজ বন্ধ করে দেয়া যৌক্তিক হয়নি মর্মে মত প্রকাশ করেন। তবে তারা এ-ও বলেন, বিশ্বব্যাংক যেহেতু প্রকল্পের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছে সেহেতু তাদের সিদ্ধান্ত আমাদেরও মেনে নিতে হয়। এদিকে সরকারের উপরের মহল বুঝতে পারে যে, পদ্মা সেতুর কাজে এ যাবৎ কোন দুর্নীতি হয়নি, তথাপি পদ্মা সেতুর কাজ চালিয়ে নেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংকের চাহিদা মাফিক মন্ত্রীকে বদল করা হল। তারপরও কাজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। এ পর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়, যা বিশ্বব্যাংক-কে বিচলিত করে। সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি চিঠির মাধ্যমে অনুরোধ এবং একজন মাননীয় উপদেষ্টার বিশ্বব্যাংক-এ গমন করে নেগোসিয়েট করা সত্ত্বেও কোন কাজ হয়নি। ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের উত্থাপিত দুর্নীতির বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করে। তদন্তে মূল সেতুর বিষয়ে মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর কথিত দুর্নীতির সাথে সংশ্লিষ্টতার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন বিশ্বব্যাংকেও তাদের রিপোর্ট প্রেরণ করে। তবে সুপারভিশন কনসালটেন্সি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য না দেয়ার কারণে এবং বিশ্বব্যাংকে চিঠি লিখে সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়ার কারণে এর তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয়নি। বিশ্বব্যাংক জানায় যে, নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও তথ্য দিতে বিশ্বব্যাংক অপারগ। এ বছরের এপ্রিল মাসে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের নিকট একটি চিঠি লিখে এবং কনসালটেন্সি প্রদানের ক্ষেত্রে কথিত দুর্নীতির সাথে জড়িত কতিপয় সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে। এবারের চিঠিতে অভিযোগের তীর আমার প্রতিও বর্ষিত হয়। চিঠির কপি দুর্নীতি দমন কমিশনেও দেওয়া হয়। উক্ত চিঠিতেও দুর্নীতির কোন সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। শুধুমাত্র এসএনসি-লাভালিনের কেস-এ কানাডিয়ান পুলিশের কাছে তথ্য আছে মর্মে এবং আরও কিছু সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য আছে মর্মে উল্লেখ করা হয়, যদিও সেসকল সূত্রের নাম প্রকাশ করা হয়নি। পত্রের সাথে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারের কিছু করণীয় নির্ধারণ করে দেয়। বিশ্বব্যাংকের সবগুলো দফা সরকারের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয় বিধায় সরকার যতটুকু মানা সম্ভব ততটুকু মেনে নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে নেগোসিয়েশন অব্যাহত রাখে। এ পর্যায়ে গত ২৯ জুন, ২০১২ বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জয়েলিক-এর কার্যকালের শেষ দিকে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল করে একটি প্রেস নোট জারি করে। উক্ত প্রেস নোটটির ভাষা এবং অভিযোগ বাংলাদেশের জন্য খুবই বিব্রতকর ও অপমানজনক। বিশ্বব্যাংকের বক্তব্যে আমার দৃষ্টিতে বেশকিছু অতিরঞ্জন ও অসত্য তথ্য দেয়া হয়েছে। বিগত সেপ্টেম্বর, ২০১১ মাসে দু’টি ইন্্ভেষ্টিগেশনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেয়া হয়েছে মর্মে প্রেসনোটে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা একেবারেই সত্য নয় যা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। এপ্রিল, ২০১২ মাসে ‘ঈড়ৎৎঁঢ়ঃরড়হ ঈড়হংঢ়বৎরপু’-এর সুনির্র্দিষ্ট তথ্য দিতে না পারলেও কতিপয় ব্যবস্থা নিতে বলে যা একটি সার্বভৌম দেশের নিরপেক্ষ ইনষ্টিটিউশনের পক্ষে পালন করা সম্ভব নয়। তারা কথিত ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাদের ছুটি দেয়ার কথা বলে এবং দুদকের তদন্তে বিশ্বব্যাংকের পূর্ণ খবরদারী করার ক্ষমতা চায় যা দুদক আইনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সরকার মনে করে যে, সরকারি কর্মকর্তাগণ সুনির্দিষ্ট আইন, বিধি ও নিয়মের অধীনে প্রজাতন্ত্রের কাজে নিয়োজিত। তদন্ত ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদি ছাড়া কাউকে বিশ্বব্যাংকের কথায় ছুটি দেয়া বা বিদায় করা অযৌক্তিক, যেখানে পুরু অভিযোগটিই প্রশ্নবিদ্ধ। তাছাড়া মন্ত্রীদের বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়ার কোন বিধান নেই। সেক্ষেত্রে মন্ত্রীকে অপসারণ বা পদত্যাগে বাধ্য করতে হবে। সরকারের উচ্চ মহলের সাথে নেগোসিয়েশন চলাকালে হঠাৎ করে ঋণ চুক্তি বাতিল করার বিষয়টি স্বেচ্ছাচারিতার শামিল।
বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে কানাডিয়ান পুলিশ যখন এসএনসি-লাভালিনের অফিস রেইড্্ করে তখন উক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিষ্ঠানের বিগত কয়েক বছরের কার্যক্রম অভ্যন্তরিন নিরীক্ষার ব্যবস্থা করে। উক্ত নিরীক্ষায় এ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিগত কয়েক বছরে লিবিয়াসহ কতিপয় আফ্রিকার দেশে কিছু টহফড়পঁসবহঃবফ ঊীঢ়বহফবঃঁৎব অর্থ্যাৎ আর্থিক লেন-দেন খুঁজে পায়। অবশ্য বাংলাদেশে কোন অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। উক্ত অসঙ্গতির প্রেক্ষাপটে সিইওকে পদত্যাগ করতে হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। উক্ত সিইও বাংলাদেশে পদ্মা সেতুতে এসএনসি-লাভালিন কর্তৃক প্রস্তাব প্রনয়ণ, জমা দেয়া কিংবা এত্্দবিষয়ে বাংলাদেশে এসে কোন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেননি। আমি আগেও উল্লেখ করেছি কনসালটেন্সির বাজেট ছিল মাত্র ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে এসএনসির প্রস্তাব ছিল ৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাদের জয়েন্ট ভেঞ্চারে ছিল আরও ২টি বিদেশী প্রতিষ্ঠান এবং ২ টি বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান। প্রায় ৬ হাজার দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ জনবলের ৫ বছর ব্যাপি ব্রিজ নির্মাণ কার্যক্রমের তদারকির কাজ। এ প্রেক্ষাপটে তাদের দ্বারা মোটা অংকের ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব আমার কাছে একান্তই অমূলক মনে হয়েছে। কারণ প্রতিষ্ঠানটি এ প্রকল্প থেকে মুনাফা করতে না পারলে নিজের পকেট থেকে বাংলাদেশে টাকা দেওয়ার কথা নয়। মূলতঃ মোঃ ইসমাইল নামক একজন বাংলাদেশী কানাডিয় ইঞ্জিনিয়ার এসএনসি-লাভালিনের পক্ষে অন্যান্য জয়েন্ট ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে এ প্রকল্পে প্রস্তাব দাখিল করেন মর্মে জানতে পেরেছি। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোও একই পদ্ধতিতে বাংলাদেশে এসে তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রস্তাব দাখিল করে। এসকল প্রস্তাব দাখিলের পর দরদাতা সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিবৃন্দ বিভিন্ন সময়ে সেতু বিভাগের পদ্মা প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে দেখা করে তাদের প্রস্তাবের শ্রেষ্ঠত্ব, প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বৃটেন, কানাডা ও জাপানের মান্যবর রাষ্ট্রদূতগণও মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর সাথে অনুরূপ উদ্দেশ্যে দেখা করেন। এসব সাক্ষাতের সময় আমরা তাদেরকে বলেছি যে, একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়ন কমিটি রয়েছে যার মাধ্যমে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কেউ ক্ষতিগ্রস্থ হবে না। ‘এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তাগণ সচিব-মন্ত্রীর সাথে কতিপয় ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে দেখা করেন’ খবরের কাগজে এ ধরনের সংবাদ চাঞ্চল্যকর সংবাদ নয় বলে আমি মনে করি; কারণ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সিইও/পরিচালকগণও তাদের বাংলাদেশী এসোসিয়েটদের নিয়ে আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। উল্লেখ্য, দরপ্রস্তাবের কারিগরি মূল্যায়ন বিশ্বব্যাংক কতৃক অনুমোদিত এবং এ বিষয়ে কারো কোন অভিযোগ নেই। যদি মূল্যায়ন সঠিক থাকে, সেক্ষেত্রে কোন বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টির অভিযোগই অবান্তর।
রমেশ সাহা নামক এসএনসির কর্মকর্তা তাদের প্রস্তাবের সাথে প্রথম থেকে যুক্ত ছিলেন না। বিশ্বস্তসূত্রে জানা যায়, ইতিপূর্বে তিনি বাংলাদেশে ২/১ টি প্রকল্পে এসএনসির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন। তার ‘আউট-পুট’ ও আচরণ সুবিধের নয় বিধায় তাকে বাংলাদেশী কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে চায় না। সেজন্যই উক্ত কোম্পানি প্রথমে তাকে এ প্রকল্পের প্রস্তাব প্রণয়ন ও দাখিলের সাথে যুক্ত করেনি মর্মে প্রতীয়মান হয়। জনাব ইসমাইলের সাথে তার সদ্ভাব ছিল না। জানা যায় কারিগরি মূল্যায়নে এসএনসি প্রথম হতে না পারায় রমেশ সাহা কৌশলে এর ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে ইসমাইলকে কারিগরী মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরপরই (এপ্রিল, ২০১১ এর প্রথম দিকে) চাকরি থেকে সরিয়ে দেয় এবং তার পরিবর্তে নিজে বাংলাদেশে এসএনসি’র প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হয়। উক্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি তার উর্দ্ধতন কর্মকর্তা মি. কেভিন ওয়ালেস এর সাথে একবার বাংলাদেশে আসেন। তার আচরণ এবং কাজের সুনাম না থাকায় এসএনসি-লাভালিন কাজ পেলে তার নিয়োগ গ্রহণযোগ্য হবে না মর্মে মি. ওয়ালেসকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মি. ওয়ালেসও এতে সম্মত হন। এসএনসি-লাভালিনের অনুরূপভাবে সম্মিলিত মূল্যায়নে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী ঐধষপৎড়ি এর সিইও বাংলাদেশে এসে আমার সাথে দেখা করলে তাকেও জানানো হয় যে, কাজ পেলে এ প্রকল্পে যোগ্য লোকবল নিয়োজিত করতে হবে। মিঃ রমেশের ডাইরিতে বা নোটবুকে কি লেখা ছিল বা কাদের নাম পাওয়া গিয়াছে তা মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে আমি মনে করি। সে কাকে কী ‘প্রস্তাব’ দিয়েছিল বা তাকে কে কী ‘প্রস্তাব’ দিয়েছিল তা তদন্তের পর বুঝা যাবে। উক্ত ভারতীয় বংশোদ্ভুত মি. রমেশ যদি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে ‘কমিশন’ দেয়ার কথা বলে নিজেই ঐ কোম্পানির অর্থ আত্মসাতের পরিকল্পনা করে থাকে এবং সে কারণেই অসৎ উদ্দেশ্যে নিজের অপরাধ আড়াল করার জন্য বাংলাদেশী কারো নামে কিছু বলে, সঠিক প্রমাণাদি ছাড়া তা স্বতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে বিবেচনা করা আদৌ সুবিবেচকের কাজ নয়। দচ্চতার সাথে আমি বলতে পারি তার নোটবুকে আমার নাম থাকা অবান্তর, কারণ কোন বিষয় নেগোশিয়েট (?) করার জন্য আমার কোন ‘প্রতিনিধি’ নেই। মি. রমেশ সাহা সম্পর্কে আরো জানা গিয়েছে যে, তিনি ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা জরিপ কাজে এসএনসি’র স্থানীয় এসোসিয়েট ইপিসিকে তাদের প্রাপ্য টাকা সম্পূর্ণ পরিশোধ করেননি। উক্ত অর্থ রমেশ এসএনসি’র নিকট থেকে গ্রহণ করে নিজে আত্মসাৎ করেছে কীনা তা জানা দরকার।

পরিলেখ
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য; ই-মেইলে অভিযোগকারীগণ বিশ্বব্যাংকের টাস্কটিম লিডার এবং বিশ্বব্যাংকের মনোনীত মূল্যায়ন কমিটির বিশেষজ্ঞ সদস্যের বিরুদ্ধেও বলেছে আমাদের সাথে নাকি তাদের যোগসাজশ রয়েছে। কিন্তু এসএনসি-লাভালিনকে ‘কাজ পাইয়ে দেয়ার’ জন্য আমরা যদি দায়ী হই তবে যোগসাজসের জন্য তাদেরও দায় থাকা উচিৎ। উল্লিখিত ‘অপরাধের জন্য’ এমনকি মূল সেতু প্যাকেজে একটি অযোগ্য চীনা কোম্পানিকে ‘কোয়ালিফাই’ করার জন্য যারা চাপ প্রয়োগ করেছিল বিশ্বব্যাংক কি তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিয়েছে?
একটি সরকারি কাজে যদি পক্ষপাতিত্ব বা দুর্নীতি সন্দেহ করা হয় তবে প্রথমে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিকার চাওয়া কিংবা অভিযোগ করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু যারা গোপনে ই-মেইলের মাধ্যমে বিশ্ব ব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি কর্মকর্তাদের নিকট দিনের পর দিন অভিযোগ করেছে তাদের উদ্দেশ্য ছিল পদ্মা সেতুর কাজ বন্ধ করে দেওয়া। প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার তার জুন ’১১ মাসের একটি ই-মেইলে এরূপ আশঙ্কাই করেছিলেন। ই-মেইলগুলো পর্যালোচনা করলেই বুঝা যাবে কীভাবে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ইন্টিগ্রিটি অফিসারদেরকে প্ররোচিত করেছে। একইভাবে ইন্টিগ্রিটি বিভাগের কয়েকজন জুনিয়র কর্মকর্তা শুধুমাত্র অভিযোগকারীদের কথা শুনে, প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতার মূল্যায়ন বিচার না করে এবং আমাদের কাগজপত্র দেখে সত্যাসত্য যাচাই না করে সরাসরি কানাডিয়ান পুলিশের নিকট অভিযোগ করে, যা বিশ্ব ব্যাংকের ইতিহাসে বিরল ঘটনা। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অভিযোগকারীগণের ব্যবহৃত ঢ়ধফসধথনৎরফমব@ুসধরষ.পড়স ও ঢ়ধফসধথনৎরফমব@ুধযড়ড়.পড়স এর অনুসন্ধানও অভিযোগকারীদের সঠিক পরিচয় উদ্ঘাটনপূর্বক বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের কারণে আজ বিশ্বব্যাংক কথিত দুর্নীতির অভিযোগ এনে বাংলাদেশের মুখে কালিমা লেপনের সুযোগ পেল। আর এদেশের এক শ্রেণীর মানুষও সত্যানুসন্ধান না করে তথ্য প্রমাণ বিহীন বিশ্বব্যাংকের দেয়া অভিযোগ সঠিক বলে প্রচার শুরু করে যা তথ্য সন্ত্রাসের সামীল। কিছু মিডিয়া ও জ্ঞানপাপী আলোচক আরও একধাপ এগিয়ে “ঘুষ দেয়া-নেয়ার কাল্পনিক গল্পও তৈরি করে ফেলে, যেখানে বিশ্বব্যাংক বা কানাডীয় কর্তৃপক্ষও লেনদেনের অভিযোগ করেনি।
সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই যারা বিনা তদন্তে তাদেরকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়ার কথা বলেন তাদের উদ্দেশ্যে বলব, ‘নিজের অবস্থান থেকে বিচার করবেন। আপনি যদি আমার জায়গায় থাকতেন তাহলে কি এরূপ অন্যায় আবদার মেনে নিতেন?’ আমি একজন অতি সাধারণ মানুষ এবং সৎ জীবন যাপন করি ও দেশ প্রেম বজায় রেখে নিরপেক্ষভাবে সরকারি কাজ করি। বত্রিশ বছরের চাকরি জীবনে যে সকল সচিব, মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও সহকর্মীদের সাথে কাজ করেছি তারা সকলেই আমার সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠার সাক্ষী। চাকরির শেষ পর্যায়ে এসে ইন্্শাআল্লাহ্্ পদস্খলনের আর সম্ভাবনা নেই।

লেখক পরিচিতি : মোঃ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এনডিসি, সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

সৈয়দ আবুল হোসেন : আপনাকে
মো. মোজাম্মেল হক খান
আমার সীমাবদ্ধতাকে মার্জনা করবেন। তখনও আমি আপনাকে ভালোভাবে চিনে উঠিনি। অথচ সারা কালকিনি উপজেলা আপনার গুণগানে মুখরিত। মাদারীপুর জেলাতেও তার দোলা লাগছে। ক্রমান্বয়ে তা দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করছে। আপনার এ সুখ্যাতির হাজারো কারণ থাকলেও তার অন্যতম মূল কারণ শিক্ষার উন্নয়ন ও বিস্তারের ক্ষেত্রে আপনার অনতিক্রম্য, অসামান্য অবদান বলেই আমার মনে হয়।

প্রিয় শিক্ষানুরাগী,
দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার অপরিসীম গুরুত্বের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। এ চিরন্তন সত্য উপলব্ধিটুকু অনেকের চেতনায় থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে তা বাস্তবায়নের কার্যকর উদ্যোগের সম্মিলনটি তাদের অনেকের মধ্যেই থাকে প্রায় অনুপস্থিত। ফলে এ সকল উন্নয়ন ভাবনা বাস্তবায়নের মুখ দেখে না। এ ক্ষেত্রে আপনি অসাধারণ ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কালকিনি উপজেলার অসংখ্য মসজিদ, স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ (বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসহ) স্থাপনে আপনার ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সমর্থন, মূলত আর্থিক অনুদানের ক্ষেত্রে আপনার মুক্তহস্ত এলাকার মানুষকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। ফলে শিক্ষানুরাগের যে অনুপম দৃষ্টান্ত আপনি স্থাপন করেছেন, তা শুধু মাদরীপুরবাসীদের জন্যই নয়, সারাদেশবাসীর জন্যও এটি একটি বিরল অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। এ ক্ষেত্রে আপনার কাছাকাছি কোনো দ্বিতীয় ব্যক্তির উদাহরণ আপাতত আমার জানা নেই। এ মুহূর্তে ছোট একটি ঘটনা মনে পড়ছে। তা হলো প্রায় দু’দশক আগে একবার কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু আর্থিক সাহায্যের জন্য আপনার নিকট একটি আবেদন পত্র প্রেরণ করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে আপনি প্রার্থিত অর্থের কয়েকগুণ টাকা (টাকার অংক মনে করতে পারছি না বলে দুঃখিত) বেশি প্রদান করেও দারুণভাবে অতৃপ্তিতে ভোগেন। তখন আপনার আর্থিক সমস্যার কথা জানিয়ে প্রদত্ত অর্থ আপনার বিবেচনায় যথেষ্ট নয় বলে আক্ষেপ ও দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। এটি কারও আমি কোনো একটি লেখায় পড়েছিলাম। আমার স্মৃতি আমাকে আজকে এতটা বেকায়দায় ফেলবে অনুমান করতে পারলে পঠিত লেখাটি সযত্নে হেফাজত করতে পারতাম।

সদাচরণের মূর্ত প্রতীক,
সদাচরণের ক্ষেত্রে আপনি এক অনন্য মহান ব্যক্তিত্ব। জন্মগতভাবে আপনার ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক শিক্ষা এবং পরবর্তীকালে সামাজিকীকরণের অন্যান্য মাধ্যমে অর্জিত বিভিন্ন গুণের সমাহার আপনার চারিত্রিক মাধুর্যকে আরও বিকশিত করেছে। পদমর্যাদায় আপনার কাছেও নেই, এমন মানুষকে যে ভাষায় এবং আচরণে আপনি মোহাবিষ্ট করছেন তার দৃষ্টান্তও বিরল। আপনার অকল্পনীয়, অসাধারণ, মুগ্ধকর ব্যবহারের কৌশল ও সৌন্দর্য অবলোকন করার সুযোগ যারা পেয়েছেন তাদের অভিভূত হওয়া ছাড়া উপায় নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা আপনার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত কোনো ব্যক্তিকে (যাদেরকে আপনি চেনেন) অথবা গর্হিত অপরাধ করে ফেলেছেন এমন কাউকেও আপনি কটু কথা বলতে শেখেননি। কি করে কথার যাদুতে আপনি বিরুদ্ধাচারীকেও বশীভূত করেন তা দেখে তাজ্জব বনে যেতে হয়। আমার সৌভাগ্য, চাকুরির সুবাদে আমাকে প্রতিদিনই এগুলোর সাক্ষী হতে হচ্ছে। আপনার সাহায্য প্রার্থনার জন্য এসেছেন এমন দর্শনার্থীকেও সিঁড়ির/লিফটের গোড়া পর্যন্ত গিয়ে অভ্যর্থনা ও বিদায় জানানোর যে কাজটি আপনার নিত্যকার ঘটনাÑ তা আমার ২৮ বছরের চাকুরি জীবনে আর দ্বিতীয়টি চোখে পড়েনি।
সৌজন্য প্রদর্শন, শ্রদ্ধাবোধ, প্রটোকল এগুলো ঊধর্ক্ষগামী। যাদের থেকে এগুলো উৎসারিত, সেবা বা ত্যাগের আনন্দ ছাড়া বাকি সুফলগুলো বড়রাই ভোগ করেন। এখানেও আপনি ব্যতিক্রম। বয়স, পদমর্যাদা নির্বিশেষে, আপনি শুধু দাতা, ভোক্তা নন। ছোটদের প্রতিও স্বভাবসুলভ হাসি, আন্তরিকতা এবং যথোপযুক্ত শব্দসম্ভার প্রয়োগ করে আপনি পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়াকে প্রাণবন্ত ও দীপ্তিমান করে তোলেন। ফলে সহযোগীদের কর্মস্পৃহা, পারস্পরিক সমঝোতা ও কর্মসহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে তা খুবই ফলদায়ক হয়। যার সুফল মন্ত্রণালয় ও আমরা প্রতিনিয়ত ভোগ করছি।
প্রিয় বীর মুক্তিযোদ্ধা,
আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যে কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ যে কাউকেই আপনি আন্তরিক দৃষ্টিতে দেখেন। তাঁদের সুযোগ সুবিধা ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে আপনার আকুলতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার বাহিনীর হাতে আপনার জীবন প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। তাদের নির্মম আঘাত আপনাকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। আপনার সৌম্যকান্তি, মার্জিত আচরণ, সদা প্রফল্ল হাস্যময় মুখশ্রী সে ক্ষতকে আড়াল করে রাখলেও আপনার হাতের কনুইয়ে যে ক্ষত রাজাকাররা সৃষ্টি করে গেছে, তা আজীবন আপনাকে বহন করতে হবে। জানি এ জন্য আপনার প্রকাশ্য কোনো দুঃখবোধ নেই। তথাপি অতীত স্মৃতি রোমন্থনে গিয়ে যখন আপনি মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ফিরে যান তখন নিশ্চয়ই ক্ষণিকের জন্য হলেও আপনি বিষণ্নতার শিকার হন।

প্রিয় কর্মবীর,
কাজের ক্ষেত্রে উদয়-অস্ত পরিশ্রমের যে সর্বোচ্চ মানদণ্ড নির্ধারিত হয়ে আছে, তাও আপনি অতিক্রম করেছেন। এ কর্মগুণ, কর্মদক্ষতা, কর্মস্পৃহা, কর্মপ্রেরণাই আপনাকে এতটা পথ এগুতে সাহায্য করেছে। সকাল থেকে যে কর্মযজ্ঞে আপনি নিমজ্জিত হন, ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। মন্ত্রণালয়, রেলভবন, সেতুভবন, সংসদভবন এগুলো আপনার নিজস্ব কর্মপরিধি সহায়ক সংস্থা ও মন্ত্রণালয়। বোধ করি আপনিই একমাত্র মাননীয় মন্ত্রী যিনি সরকারি কাজের প্রয়োজনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে যে কোনো স্তরের কর্মকর্তাদের শরণাপন্ন হন। কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজও আপনার কার্যকর হস্তক্ষেপে হয়ে যায় সহজ ও অনায়াসসাধ্য। দিবারাত্রি কর্মমুখরতা আপনাকে উজ্জীবিত রাখে। সর্বক্ষণ আপনি থাকেন প্রাণবন্ত। আর তাই ক্লান্তিও আপনার কাছে পরাভূত হয়।

প্রিয় সুজন,
আপনাকে নিয়ে অসংখ্য মধুর স্মৃতি আমার মানসপটে। প্রতিটিই মুগ্ধকর, প্রতিটিই শিক্ষণীয় এবং উদ্দীপ্ত আবেদনে ভরপুর। সেবার বিদেশ যাচ্ছি। আমরা একই ফ্লাইটের যাত্রী। লক্ষ করলাম সকল যাত্রীরা একে একে দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন কুশল বিনিময় করছেন। আমার আগ্রহ বেড়ে যায়। দেখলাম যিনি কুশল বিনিময় করছেন তিনি সৈয়দ আবুল হোসেন। তিনি সে আবুল হোসেন যিনি বিদেশ যাত্রাকালেও সাধারণ যাত্রীদের সাথে কুশল বিনিময় করতে ভোলেন না। তিনি সেই আবুল হোসেন আকাশপথেও যার আজন্ম লালিত বিনয় আর অমায়িকতার প্রকাশ থেমে থাকে না। প্রকৃত বিনয় ও নির্মল অমায়িকতা স্থান-কাল-পাত্র মেনে চলে না। এটি সর্বগামী এবং সার্বজনীন।
রাজনীতি, আমলা এবং সুশীল সমাজ-এর একটি সভা কিংবা ছোট্ট সমাবেশ হচ্ছে। সেখানে অনেকেই কুশলাদি বিনিময় কিংবা সভার প্রাসঙ্গিক আলাপচারিতায় ব্যস্ত। তন্মধ্যে একজনের উপস্থিতি অধিকতর উজ্জ্বল, আন্তরিকতাপূর্ণ এবং প্রশান্তিময়। সেই মহান ব্যক্তিটিও আপনি। এ কথা শুধু আমার নয়। আপনাকে, আমাকে উভয়কে চেনেন এমন বহুজনের। মাননীয় মন্ত্রী আপনাকে নিয়ে বিদগ্ধজনের এরূপ মূল্যায়ন কিংবা মন্তব্য আমার জন্য বরাবরই উপভোগ্য হয়। পোশাক-আশাকসহ অন্য যে কোনো পছন্দের বিষয়ে আপনার রুচির প্রশংসা নাÑহয় আমি নাই বা করলাম। এ ক্ষেত্রেও আপনি অতুলনীয়, মার্জিত এবং মানানসই।

মাননীয় মন্ত্রী,
আপনি দীর্ঘজীবন লাভ করুন। যতদিন বেঁচে থাকুন সুস্থ, সাবলীল ও কর্মক্ষম থাকুন। এ প্রার্থনা যতটা না আপনার জন্য, তার চেয়ে বেশি জরুরি দেশের সে সব মানুষের জন্য; যাদের কল্যাণে আপনার সমস্ত মেধা, কর্ম, শ্রম ও ত্যাগ নিবেদিত। তাদের স্বার্থেই আপনার মতো সেবাপরায়ণ দানবীর, শিক্ষানুরাগী, কর্মী পুরুষের জীবনকাল দীর্ঘায়িত হওয়া প্রয়োজন।
আপনাকে আমার অবিনাশী বিনম্্র শ্রদ্ধা, অকুণ্ঠ গভীর ভালোবাসা ও লাল গোলাপ শুভেচ্ছা। আপনি আমাদের প্রিয় মানুষ, একান্ত সুজন, সর্বসময়ের পরীক্ষিত বন্ধু। আপনার জয় হোক।

মো. মোজাম্মেল হক খান : সচিব, সড়ক ও রেলপথ বিভাগ, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়

বলতে চাই তারই কথা
ড. এম এ মাননান
সেই মানুষটিকে নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই, যার সম্বন্ধে অনেক কিছুই বলা হয়নি, যাকে নিয়ে কথা হয় বন্ধুমহলেÑ উচ্ছ্বসিত আড্ডায় যার নাম আসে সর্বাগ্রে চা-এর টেবিলে কিংবা কফি হাউজে। তাকে নিয়েই কিছু বলতে চাই, যাকে দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ’৭৩-৭৪-এ, টিসিবি’র আঙিনায় ৭৫-৭৭-এ, সাকো’র কর্ণধার হিসেবে ৭৮ থেকে, রাজনীতির মঞ্চে ৯১ থেকে, মন্ত্রীপরিষদে ৯৬ থেকে, পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্বে ২০০৮ থেকে। তাকে নিয়েই বলতে চাই, যিনি একাধারে একজন একনিষ্ঠ কর্মী; যিনি শুধু ব্যবস্থাপনার ছাত্রই ছিলেন না বরং একজন সফল ব্যবস্থাপক এবং উদ্যোক্তা; যিনি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডলে একজন উজ্জ্বল সাংগঠনিক নেতাই নন, পাশাপাশি একজন রাজনৈতিক নেতাও বটে; যিনি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে নামকরা লবিস্ট এবং নেগোশিয়েটর – যিনি আন্তঃরাষ্ট্রীয় বন্ধুত্ব স্থাপনে অগ্রনায়ক, যার স্বাক্ষর এশিয়ান অঞ্চলের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ফোরাম ‘বোয়াও’।
যাকে নিয়ে আরও বলতে চাই, সে-ব্যক্তিটি প্রচারবিমুখ একজন নীরব বন্ধু, ব্যক্তিগত আড্ডায় ঝলমলে হাসিমাখা উচ্ছল এক দীপ্তি, নিজ এলাকায় গরিব-দুঃখীর কাছে বিনম্র মায়াভরা ভালোবাসার প্রতীক, আপামর জনগণের সুখে-দুঃখে বিপদে-আপদে একজন দানশীল সহযোগী, প্রসন্ন চিত্তের ও নিরহংকারী বিত্তের সমাহারে একজন বিনয়ী সুহৃদ। তারই কথা বলতে চাই যিনি অক্লান্ত পরিশ্রম, সততা, দক্ষতা, কর্মনিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শত-সহস্র লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন, সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সুধীজনের প্রশংসা কুড়িয়েছেন, তুখোড় ব্যবস্থাপনাবিদ হিসেবে দেশে-বিদেশে সুখ্যাতি পেয়েছেন এবং পরিশ্রমলব্ধ সম্পদ এলাকার শিক্ষার উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে অকাতরে ব্যয় করেছেন।
আমি বলতে চাই, তারই কথা, যিনি সময়ের নিয়ামক, কর্মের নির্ঘণ্টে নিষ্ঠার বর্তিকা; প্রতিটি নিশ্বাস, প্রতিটি সেকেন্ড যার হিসেবের খাতায় পরম যত্নে সজ্জিত, চরম আদরে শানিত। যিনি প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগান নিজের মাধ্যমে দেশের জন্য, জাতির জন্য, রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের জন্য। আমি বলতে চাই তারই কথা যিনি কর্মের নিবিড় আলয়ে সময়সজ্জিত জীবন-হিসেবের অমূল্য খাতায় নিষ্ঠা নামক অধ্যায়ের অধ্যবসায় নামক পাতায় জ্বলজ্বল সার্থকে ফুটে ওঠা স্বপ্রতিষ্ঠিত এক অনুপম উদাহরণ। আমি তারই কথা বলছি সাফল্য যাকে আরও বহুদূর এগিয়ে যাবার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত করে, যিনি বড় হবার সাথে সাথে কৃতজ্ঞতার অসীম বৈভবে বৈচিত্র্যময় হতে হতে আকাশের চেয়েও বিশাল হয়ে উঠেছেন।
আমি স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসে তারই কথা বলছি, যিনি বিনয়ের মোহনায় প্রশান্তির ঢেউ, মার্জিত রুচির উৎপ্রাসে উৎপ্রাসে ব্যক্তিত্বের রঙন আর প্রকৃতি উদার হৃদয়ের নিপুণ বিন্যাসে অনন্ত সহানুভূতির নন্দিত নায়ক। যিনি নিজের জন্য যেমন ভাবেন তেমনি ভাবেন সবার জন্য, দেশের জন্য, পরিবারের জন্য, আত্মীয়র জন্য; যার ভালোবাসায় রয়েছে সার্বজনীন আহক্ষানের নিত্য সংস্কার এবং প্রগতির আলয়ে সমৃদ্ধির বারতা। যিনি কর্মকে বরণ করেন উৎসব মুখরতায়, জীবনকে বরণ করেন কল্যাণের নবলতায়। আমি তারই কথা বলছি যিনি এমনভাবে কাজ করেন যেন অনন্তকাল বাঁচবেন আর এমন ব্যবহার করেন যেন এক মুহূর্তও সময় নেই আর।
আমি সেই মানুষটির কথা বলতে চাই যে মানুষটি অনেক উঁচুতে উঠেও গ্রামের মাটিময় পরিবেশের কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি, ভুলতে পারেন নি মাটির মানুষগুলোর কথা, আগামী প্রজন্মের কথা, দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের কথাÑ তাই তাদের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে গড়ে তুলেছেন কর্মমুখী ও কারিগরি ব্যবস্থাসহ একের পর এক অনেকগুলো কার্যকর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
আমি তারই কথা বলতে চাই যে, লোকটির সাথে কেউ একবার কথা বললে, যে লোকটির কাছে কেউ একবার গেলে, যে লোকটিকে কেউ একবার কাছে পেলে বিগলিত হয়ে যেতে হয় শ্রদ্ধায়, মোহিত হয়ে যেতে হয় কৃতজ্ঞতায়, অবনত হয়ে যেতে হয় কৃতজ্ঞতায়। আমি তারই কথা বলতে চাই- যে লোকটি মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দীপ্ত প্রত্যয়ে অবিনাশী প্রতীক, সৃষ্টির সেবায় সতত বৈপ্লবিক আর উদারতার মোহনায় বৃষ্টি বৃষ্টি সুর।
আমি বলতে চাই তারই কথা, যার মধ্যে বংশপরম্পরায় রয়েছে নির্মল ধর্মীয় মূল্যবোধ, ইসলামিক চিন্তাধারায় বিধৌত ধর্ম-নিরপেক্ষ মনোবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সুরভিত মন, মানব-কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ, সহানুভূতির নিদাঘ পরশ এবং পরিবার-বান্ধব সংসারি দিল। তিনি সে-ই, যিনি পারিবারিক জগতে নিষ্ঠাবান দায়িত্বশীল কর্তা, বিশ্বস্ত পতি, স্নেহশীল পিতা, সংসারি গুরুজন।
দ্বিধাহীন কণ্ঠে তারই কথা বলতে চাই, যিনি একজন মননশীল মানুষ, সৃজনশীল চিন্তাবিদ-চিন্তনে-লিখনে যার রয়েছে অগাধ ব্যুৎপত্তি। লেখায় যার সাবলীলতা ঈর্ষণীয়, বিষয় নির্বাচনে অনুপম বোদ্ধা। যার লেখায় পাওয়া যায় কান্নার সুর- যখন তিনি কালির আঁচড়ে বলেন স্বাধীনতার জনক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর লড়াকু জীবন আর দেশদ্রোহী ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে শহিদ হওয়ার কাহিনি। যার লেখনীর গুণে জীবন্ত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্্রষ্টা কোটি কোটি বাঙালির প্রাণ-পুরুষ সিংহ-হৃদয় ‘বাংলার মুজিব’-এর সংগ্রামী জীবন, তাঁর জীবনের বঞ্চনার কাহিনি, নৃশংসভাবে তাঁকেসহ তাঁর পরিবারের শাহাদাত-বরণের কথা। আমি তারই কথা উচ্চকণ্ঠে বলতে চাই, যার লেখায় দীপ্ত হয়ে উঠেছে বাংলার জনগণের চরম বিপদে সদা-সর্বদা সংগ্রামী মন নিয়ে আপোষহীন এগিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু-তনয়া সংগ্রামী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিকৃতি যিনি প্রবল বিরূপতার মধ্যে থেকেও সততার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ও দিচ্ছেন। আমি তারই কথা বিনা দ্বিধায় বলতে চাই যার শানিত লেখায় বাঙময় হয়ে উঠেছে বঙ্গজননী বেগম ফজিলাতুন্নেছার সংগ্রামময় পারিবারিক জীবন এবং শত কষ্টের মধ্যেও বঙ্গবন্ধুর জেল-জীবনের সময়ে মাসুম সন্তানদের গড়ে তোলার ইতিকথা। শ্রেষ্ঠত্ব তার এখানেই, তার লেখার মধ্যে।
আমি বলতে চাই সে মানুষটির কথা, যে মানুষটির কাছে অহঙ্কারের সবগুলো উপাদান কানায় কানায় তবু সাদাসিধে, যিনি নিরহঙ্কারের ডালা হাতে বরণের প্রতীক্ষায় থাকেন উঁচু-নিচু, জাতি-ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমক্ষে শ্রদ্ধায় শ্রদ্ধায়, প্রমুগ্ধ তপস্যায়। যিনি বড় হতে হতে এত বড় হয়ে গেছেন যে যার স্বকীয়তা সবার মাঝে একাকার হয়ে গেছে ত্যাগের অনুভবে, মহিয়ান হতে হতে মিশে গেছেন প্রকৃতির লাস্যে নান্দনিক স্বপ্নের বিভাময় হাস্যে।
একদিন হয়ত তিনি হারিয়ে যাবেন রাজনীতি থেকে, হারিয়ে যাবেন জীবন থেকে, হারিয়ে যাবেন সবার থেকে কিন্তু তিনি বেঁচে থাকবেন তার প্রকাশিত নয়টি গ্রন্থের মধ্যে, এমন সব গ্রন্থ যার মধ্যে তিনি দেশকে তুলে এনেছেন, মূর্ত করেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামকে, উজ্জীবিত করেছেন গণতন্ত্রকে; স্বাধীনতার স্রষ্টাকে প্রাপ্য মর্যাদা-সহকারে দেদীপ্যমান আলোতে এনেছেন এবং দেশ-মাতৃকার প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরে নিজকেও সম্মানিত করেছেন। তিনি বেঁচে থাকবেন তার গড়া সে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঝে যেগুলো হতে প্রতি বছর হাজার হাজার গরিব ও অসহায় ছাত্রছাত্রী প্রায় বিনা খরচে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে দেশ ও জাতির বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হবার সুযোগ। তিনি বেঁচে থাকবেন সে সকল অসহায় নরনারীর মাঝে, যারা তার বদান্যতায় মরতে মরতে বেঁচে থাকার উপায় পেয়ে হাস্যে-লাস্যে আবার শুরু করেন নতুন জীবন। তিনি বেঁচে থাকবেন সে সকল মানুষের মাঝে, যারা তার চারিত্রিক মাধুর্য্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তারই মতো দেশ ও জাতির কল্যাণে নিবেদিত হবার প্রয়াস পান।
আমি যার কথা বলতে চেয়েও বলা শেষ করতে পারিনি তিনি হলেন এক কালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার কৃতি ছাত্র আমার সহপাঠী কালকিনির সৈয়দ বংশের কৃতিসন্তান, এনায়েতপুরের খ্যাতিমান পির বংশের জামাতা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন – আমাদের সুপ্রিয় আবুল।

ড. এম এ মাননান : অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
কিছু স্মৃতি কিছু কথা
শফিক আলম মেহেদী
আমি তখন পর্যটন কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান। কোনো এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় ক’বন্ধু কক্সবাজারের হোটেল শৈবালে জমপেশ আড্ডায় মত্ত ছিলাম। মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের টেলিফোন পেয়ে প্রথম জানতে পারি, ওই মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে বদলির কথা। মাত্র সাত-আট মাসের কর্মস্থল আমার ছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে। যদিও এর আগে ঐ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। তবে এবারকার অভিজ্ঞতা ভিন্নতর। কর্মস্থল সবসময় প্রীতিকর হয় না। স্মৃতিও সতত সুখের নয়। তাপরও নির্দ্বিধায় বলতে পারি, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে কাজ এবং কাজের পরিবেশ দুটোই ছিল উপভোগ্য ও আনন্দময়।
একটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান চরিত্র হলেন মাননীয় মন্ত্রী। তাঁকে কেন্দ্র করেই মন্ত্রণালয়ের সবকিছু আবর্তিত হয়। যেখানে মাননীয় মন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের সবাইকে আপন করে নেন, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই বিরাজ করে এক কর্মমুখর ও প্রাণচঞ্চল পরিবেশ। মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের চারিত্রিক বিশালতা ও হৃদ্যিক কমনীয়তার কারণে আমরা সবসময় কর্মমুখর ও প্রাণচঞ্চল পরিবেশে কাজ করতে পেরেছি।
মার্চ থেকে অক্টোবর ২০০৯ আমার কর্মজীবনের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। স্মৃতির অ্যালাবামে যেন অনেক উজ্জ্বল সঞ্চয় জমা হয়ে আছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে যোগদানের প্রথম দিনেই জেনে নিই মাননীয় মন্ত্রীর দিনপঞ্জির নির্ঘণ্ট। সকাল সাড়ে আটটার মধ্যেই তিনি পৌঁছে যান কর্মস্থলে। আমারও পুরোনো অভ্যেস অফিস শুরুর আগে অফিসে যাওয়া। মনে মনে স্থির করি, মাননীয় মন্ত্রীর মতোই অফিসে চলে আসব সাড়ে আটটার মধ্যে। তিনি থাকেন অফিস থেকে অনেক দূরে গুলশানে, আর আমি থাকি কাছের ইস্কাটন গার্ডেনে। সত্য স্বীকারে দ্বিধা নেই, মাননীয় মন্ত্রীর কাছে অফিসে পৌঁছার ব্যাপারে প্রায়শই হার মানতাম। মাননীয় মন্ত্রী প্রতিদিন অফিসে এসেই দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজের বিষয়ে সার্বিক প্রস্তুতি নিতেন। সকাল ন’টার পূর্বে তাঁর কক্ষে সাধারণত কোনো কর্মকর্তার ডাক পড়ত না। হঠাৎ একদিন তাঁর নজরে আসে অফিস সময়ের পূর্বেই আমার অফিসে পৌঁছার বিষয়টি। ডেকে জানিয়ে দেন, অফিস সময়ের আগে আমার আসার প্রয়োজন নেই অর্থাৎ আমি যেন সকাল ন’টায় অফিসে আসি। অবাক হই তাঁর এ মহানুভবতায়।
অফিস শুরু হলে মাননীয় মন্ত্রী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রাত্যহিক অভ্যেসমতো চা খেতেন। দিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি সম্পর্কে আলোচনা সেরে নিতেন। সে সাথে পূর্বের দিনের কোনো কাজ অনিষ্পন্ন থাকলে সে বিষয়েও করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিতেন। কোনো কাজের বিষয়ে কর্মকর্তাদের ওপর নিজস্ব অভিমত চাপিয়ে দিতে কখনও দেখিনি তাঁকে। কোনো জটিল বিষয় হলে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আলাপ আলোচনা করে তিনি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পছন্দ করতেন। মন্ত্রণালয়ের সব কাজে ছিল স্বচ্ছতা। কোনো কাজে অস্পষ্টতা রাখতেন না। আবার তাঁর মতের বিপরীতে কোনো কিছু বললেও, তা যথামর্যাদায় বিবেচনা করতেন এবং যেটি অধিক উত্তম হতোÑ সেটিই গ্রহণ করতেন। কোনো অহঙ্কার তাঁর মধ্যে কাজ করত না। শুধু একটিই উদ্দেশ্য দেখতাম, সেটি হল মন্ত্রণালয়ের কাজ দ্রুত এবং সফলতার সাথে সম্পন্ন করে জনকল্যাণ নিশ্চিত করা।
ঐ মন্ত্রণালয়ের সচিব অবসরে যাওয়ায় আমি তখন সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্বে ছিলাম। সে সময় একদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সভায় যোগ দিতে যাই। সভা চলাকালে হঠাৎ শুনি মাননীয় মন্ত্রী সভাস্থলের বাইরে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। তড়িঘড়ি করে গিয়ে দেখি তিনি একটি জরুরি নথি আমার স্বাক্ষরের জন্য নিজে নিয়ে এসেছেন। আমি সত্যিই অবাক হই সরকারি কাজের ব্যাপারে তাঁর এ ধরনের ব্যতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি দেখে। তিনি সব গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য কর্মকর্তাদের সময় বেঁধে দিতেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন না হলে তার খুব অস্বস্তি হতো।
আর একদিনের ঘটনা : মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতাল ভর্তি হয়েছেন। এ খবর পাওয়ামাত্রই তাকে দেখেছি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলতে। তিনি বলেছিলেন, ‘যত টাকা প্রয়োজন হয়, আমি দেবো। কিন্তু আমার অফিসারের সুচিকিৎসা যেন ব্যাহত না-হয়।’ পরে জেনেছি উক্ত কর্মকর্তার আত্মীয়স্বজনকে কিছু জানতে না-দিয়েই তিনি সমুদয় চিকিৎসা ব্যয় পরিশোধ করেছেন। এ ধরনের অনেক ঘটনা আছে, যা শুনলে আমাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে। তিনি যতবার বিদেশ যান ততবারই সহকর্মীদের কথা মনে করে কিছ-না-কিছু উপহার নিয়ে আসেন। এমনকি আমি ঐ মন্ত্রণালয় থেকে বিদায় নেয়ার পরও তিনি আমার দু’মেয়ের কথা ভোলেননি।
মাননীয় মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন নিঃসন্দেহে একজন কর্মবীর, সে সাথে হৃদয়বান মানুষও। আমাদের এ ক্ষয়িষ্ণু সমাজে তিনি ভালো মানুষ ও নিরলস কর্মীর এক অপূর্ব যুগলবন্দি। কর্মসূত্রে এখন আমার অবস্থান অন্যত্র। তবু দূর থেকে তাঁকে জানাই আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও উষ্ণ অভিনন্দন।

শফিক আলম মেহেদী : সচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, কবি ও গবেষক।
একজন স্বয়ংসিদ্ধ মানুষ সম্পর্কে
আবদুল গাফফার চৌধুরী
সৈয়দ আবুল হোসেন বাংলাদেশের একজন কৃতি সন্তান। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও রাজনীতিতেও তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ব্যবসায়ে যেমন শীর্ষ স্থানে পৌঁছেছেন, তেমনি রাজনীতি করেও তিনি এখন একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। রাজনীতিতে তিনি সুযোগ-সুবিধার অন্বেষণ করেননি। বরং আদর্শভিত্তিক রাজনীতি করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে দলটি নেতৃত্ব দিয়েছে, সেই আওয়ামী লীগ ভিত্তিক রাজনীতি করেছেন, সেই আওয়ামী রাজনীতিই তিনি আঁকড়ে ধরে আছেন এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের গণতান্ত্রিক ও ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ গঠনের কাজে নিজেকে জড়িত রেখেছেন। কোন কোন ব্যবসায়ী যেমন ব্যবসার স্বার্থে ঘন ঘন দল ও মত পরিবর্তন করেন, আবুল হোসেন তা করেননি। এখানেই তার বৈশিষ্ট্য।
সৈয়দ আবুল হোসেনের জন্ম মাদারীপুরের কালকিনি গ্রামে। তিনি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিলেও সোনার চামচ মুখে জন্মাননি। নিজের চেষ্টায় তিনি উচ্চ শিক্ষা লাভ করেছেন এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। দেশের শিল্প উন্নয়নে তার যেমন অবদান আছে, তেমনি শিক্ষা বিস্তারে এবং সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নয়নেও তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
তিনি বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন এবং জনহিতকর নানা প্রতিষ্ঠান স্থাপনেও অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন।
জননেত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রীসভায় যোগাযোগ মন্ত্রী হিসেবে তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়াও আবুল হোসেন বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের জোরালো অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের কাজেও চমৎকার ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়, শিক্ষা এবং রাজনীতির অঙ্গনে আবুল হোসেন নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠা দানে সক্ষম হয়েছেন।
সুনাম-দুর্নাম মানুষ মাত্রেরই থাকে। আবুল হোসেনের সুনামের পাল্লাটাই ভারি। এই সুনাম রক্ষায় তার আন্তরিক প্রচেষ্টা রয়েছে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাকে দেশের নানা ধরণের উন্নয়ন তৎপরতায় সাহায্য যোগাচ্ছে। এই মানুষটি ভবিষ্যতে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করে দেশ ও দশের ভাগ্য উন্নয়নে আরও সাফল্য দেখাতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।
আমি তার দীর্ঘ জীবন ও এবং সকল তৎপরতার সাফল্য কামনা করি।

আবদুল গাফফার চৌধুরী : আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রচ্ছারি খ্যাত প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও গবেষক।

সৈয়দ আবুল হোসেনের রাজনীতিক দর্শন
ড. আবদুল করিম
আমার ছাত্র মোহাম্মদ আমীন। এখন সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। কিন্তু কর্মকর্তা হিসেবে নয়, লেখক এবং ইতিহাসবেত্তা হিসেবে তার সাথে আমার হৃদ্যতা। সে অনেকগুলো ইতিহাস গ্রন্থ রচনা করেছে। তার লেখার হাতিয়ার ইতিহাস, অভয়নগরের ইতিহাস এবং চকরিয়ার ইতিহাস আঞ্চলিক ইতিহাসের অনবদ্য সংযোজন বলে আমি মনে করি। এক সন্ধ্যায় সে আমাকে সৈয়দ আবুল হোসেনের উপর একটি লেখা দেয়ার অনুরোধ করে। ‘আমি ইতিহাসের ছাত্র। রাষ্ট্র নিয়ে, রাষ্ট্রনায়ক নিয়ে আমার কাজ। আমি ব্যক্তি নিয়ে লিখিনা। আমার উত্তরে হতাশ না-হয়ে আমীন বলল, ‘ইতিহাস ব্যক্তির কার্যকলাপের বর্ণনা। সৈয়দ আবুল হোসেন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। আপনার রাজা, সম্রাট, আকবর, জাহাঙ্গীর কারও চেয়ে তিনি কম নন। আপনার রাজা-সম্রাটগণ খৈ এর তেল দিয়ে খৈ ভাজেন। সৈয়দ আবুল হোসেন নিজের কষ্টার্জিত অর্থ উদার হস্তে দান করেন’। সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে আমি পত্র-পত্রিকায় পড়েছি। কোনোদিন তাকে অধ্যয়ন করিনি। তিনি একজন লেখকও বটে। তার অনেকগুলো কলাম আমি পড়েছি, বইও পড়েছি। বললাম: ঠিক আছে। তার এক সেট বই দিয়ে যাও, বই পড়লে লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি জানা যায়। পরদিন আমীন আমাকে সৈয়দ আবুল হোসেনের কয়েকটি বই, তিন পাতার একটি জীবনবৃত্তান্ত ও কর্ম-পরিচিতি দিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে লিখে ফেলার জন্য এমনভাবে অনুরোধ করল, মনে হলো তাৎক্ষণিক লিখে দেই। কিন্তু শরীর এত দুর্বল যে, মন তাকে কোনোভাবে বশ করতে পারল না। তারপরও লিখতে হবে, কারও কারও অনুরোধ না-রেখে উপায় থাকে না। আমীনকে বিদায় দিয়ে লিখতে বসলাম।
রাজনীতি সৈয়দ আবুল হোসেনের অস্থিমজ্জায় তবে তা দেশ ও জাতির জন্য, ব্যক্তির জন্য নয়। যদিও রাজনীতি তাঁর জীবনের কোনো পরিকল্পনা নয়, আকস্মিক ঘটনা মাত্র। তিনি নিজের জন্য রাজনীতিতে আসেননি, জনগণের দাবিকে সম্মান করে তাদের কল্যাণে রাজনীতিতে এসেছেন। তিনি মনে করেন, “সমাজ, সভ্যতা ও প্রগতির নিয়ামক হচ্ছে রাজনীতি। মহত্তর ও উন্নততর জীবনের সন্ধানেই মানুষ রাজনীতি করে থাকে। রাজনীতির পেছনে থাকে সুনির্দিষ্ট আদর্শ। যদি তা না-হতো তাহলে মানুষ রাজনীতি করতে গিয়ে জেল-জুলুম সহ্য করত না, বুলেট বেয়নটের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারত না।”১ তবে রাজনীতি হতে হবে সুশৃঙ্খল, নীতিবদ্ধ। যা সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে পরিবর্তনশীল হবে, হবে কল্যাণমুখী। এ বিষয়ে সৈয়দ আবুল হোসেনের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার, “সব কিছুরই একটা নিয়মশৃঙ্খলা বা ব্যাকরণ থাকে। তেমনি রাজনীতিরও নিজস্ব ব্যাকরণ ও নিয়মশৃঙ্খলা রয়েছে। এটা ভঙ্গ করলে রাজনীতি হয় না, দলনীতি হয়। গণতন্ত্র হয় না, হয় দল ও ব্যক্তিতন্ত্র।২ সৈয়দ আবুল হোসেন এ উক্তিগুলো শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্রয়োগ করে চলছেন তার জীবনে, রাজনীতির মঞ্চে এবং সমাজ জীবনের অন্দরে অন্দরে। তাই তিনি রাজনীতি করতে গিয়ে মেনে চলেন রাজনীতির নিয়ম, রাজনীতির ব্যাকরণ। যা গণতন্ত্রকে পরিশীলিত করার লক্ষ্যে উজ্জীবিত করছে অনেককে।
সৈয়দ আবুল হোসেন সহনশীল রাজনীতির একনিষ্ঠ সমর্থক। রাজনীতিকে তিনি উন্নয়নের হাতিয়ার ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মূল মাধ্যম মনে করেন। রাজনীতি ক্ষমতা দেয়, এ ক্ষমতা ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতিহত করার জন্য নয় বরং উন্নয়নের জন্য, মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্য। যে রাজনীতি ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতিহত করে, অন্যের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ ও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়, সেটি রাজনীতি নয়, পশ্বনীতির নামান্তর। যাকে সাধারণভাবে স্বৈরাচার বলা হয়। তাঁর মতে, ‘গণতন্ত্র মানে জনগণের অংশীদারিত্বমূলক শাসন ব্যবস্থা।’৩ গণতন্ত্র রাজনীতির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব পায়। যেখানে রাজনীতি অন্যকে দলিত করে সেখানে জনগণের অংশীদারিত্ব ব্যাহত হয়। সৈয়দ আবুল হোসেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে নতুনভাবে চিন্তাভাবনা করার কথা বলেন। বিঘ্ন দেখে দুঃখ পান কিন্তু হতাশ হন না। তার আক্ষেপ-‘… গণতন্ত্রের জন্য মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আসছে। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করে চলেছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত সে গণতন্ত্র আজও অ-ধরা রয়ে গেছে। জনগণের বিজয় বারবার ছিনতাই হয়ে যায়। যেমন হয়েছে পঁচাত্তরে।’৪ জন-বিজয় ছিনতাই হয়ে গেলেও সৈয়দ আবুল হোসেন তা পুনরুদ্ধারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং আশান্বিত। বাধা আসবে, বিঘ্ন থাকবে। এরই মধ্যে এগিয়ে যেতে হবে সামনে।
তাই আক্ষেপ করলেও তিনি হতাশ নন, প্রতিকূলতা দেখে মুষড়ে পড়েন না। তিনি জানেন, শান্ত সমুদ্র কোনো দক্ষ নাবিকের জন্য নয়। তাই তিনি উচ্ছ্বসিত প্রত্যাশায় উদ্বেল হয়ে বলতে পারেনÑ ‘আমি আশাবাদী। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রাম বৃথা যাবে না।’৫ তাকে দেখলাম তিনি প্রচণ্ড আশাবাদী এবং আত্মপ্রত্যয়ী। অন্যে যেখানে দুর্যোগ দেখেন সেখানে তিনি দেখেন সুযোগ। অন্যে যেখানে শোনেন কান্না, সেখানে তিনি দেখেন, কলকল ঝর্না। এ আশাবাদী মনোভাব তার উত্তরণের জ্বালানি- এ ব্যাপারে আমার সন্দেহ নেই।
রাজনীতিকে ভালোবাসলেও রাজনীতির কুফল, বিশেষ করে, বাংলাদেশে এর অপব্যবহারে সৈয়দ আবুল হোসেন শঙ্কিত। ছাত্র রাজনীতি তিনি সমর্থন করেন, তবে তা কোনো রাজনীতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করতে নয়। রাজনীতি যদি ছাত্র সমাজের ন্যায্য দাবি-দাওয়া আদায় ও ভবিষ্যৎ-নেতা হিসেবে নিজেদের গঠনের জন্য হয়, তাহলে কেবল তাই সমর্থনযোগ্য। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য যেমন গঠনমূলক তেমনি কার্যকর, ‘দেশের প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবন ও দেয়াল যেন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থক ছাত্র সংগঠনসমূহের রাজনৈতিক বিপণনের বিজ্ঞাপন বা বিলবোর্ডে রূপান্তরিত হয়েছে।৬ এর পরিবর্তন আবশ্যক। প্রত্যেক দলের এ দিকে খেয়াল দেয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন তার গড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতি মুক্ত রেখেছেন। কলেজ অঙ্গন ও দেয়ালে রাজনীতিক শ্লোাগানের বদলে শোভা পাচ্ছে øমনীষীদের অসংখ্য বাণী। আমি মনে করি, এটি একটি নতুন ধারণা, মানসিকতা পরিবর্তনের নতুন দর্শন। সৈয়দ আবুল হোসেনের এ দর্শনকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার কার্যক্রম গ্রহণ করলে শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশে আমূল পরিবর্তন আসতে পারে। এ ব্যাপারে সৈয়দ আবুল হোসেনকে সরকার কাজে লাগাতে পারেন।
রাজনীতি করতে হলে দল প্রয়োজন। সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, আওয়ামী লীগ একটি গণমুখী দল। এর ব্যাখ্যাও তাঁর লেখায় পাওয়া যায়। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত। এ দল জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্রষ্টা এবং রক্ষক। আওয়ামী লীগ জনগণের দল এবং জনগণই এর মালিক। তাঁর ভাষায়, ‘আওয়ামী লীগের জন্ম কোনো সামরিক ছাউনিতে নয়, আওয়ামী লীগের স্পন্দন জনগণের মনের গভীরে গ্রোথিত।৭ জনগণের সাথে আওয়ামী লীগ সবসময় একাত্মকরণ-এর স্পন্দন জনগণের হৃদস্পন্দনের সাথে অবিচ্ছেদ্য। জনগণের অবহেলা মানে আওয়ামী লীগের স্পন্দন থেমে যাওয়া। আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা দিয়েছে, মুক্তি দিয়েছে, দুর্বলকে আশ্রয় দিয়েছে। সংখ্যালঘুরা আওয়ামী লীগে তাদের নিরাপত্তা ও নিশ্চিত আশ্রয় খুঁজে পায়। তাই বাংলাদেশে এত দল থাকা সত্ত্বেও সৈয়দ আবুল হোসেন আওয়ামী লীগের প্রতি অনুরক্ত। এটি নিঃসন্দেহে তাঁর প্রগতিশীল মনোভাবের পরিচায়ক। প্রগতিশলীলতা কোনো আকস্মিক উপলব্ধি নয়, গভীর আত্মদর্শন ও নিবিড় অধ্যয়নের বিষয়। উদার মনোভাবের সাথে সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার বীজ অঙ্কুরিত হলে এ বোধ স্ফুরিত হয়।
নেতা হিসেবে সৈয়দ আবুল হোসেন দূরদর্শী। কথায় ও চালচলনে তিনি ধীরস্থির ও প্রজ্ঞাময়। বলার আগে ভাবেন এবং ভাবেন বলে অশালীন কোনো বাক্য বের হয় না তার মুখ দিয়ে। রাজনীতির চালক নেতা, তবে নেতা যদি নেতৃত্বের গুণাবলীতে বিভূষিত না-হন, তাহলে সে রাজনীতি দেশের কল্যাণ নয় বরং অকল্যাণই বয়ে আনে। নেতাকে কথা ও কাজে যেমন শালীন তেমন আন্তরিক হতে হয়। নইলে রাজনীতি মিথ্যানীতির জঞ্জালে পরিণত হয়। আমাদের দেশের নেতৃবৃন্দ অনেক সময় অশালীন ও রূঢ় মন্তব্য করে বসেন। এ দিকটার দিকে আঙুল দেখিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন বলেছেন, “একজন নেতা বা নেত্রীকে কথায় ও কাজে কেবল পারফেক্ট হলেই চলবে না, তাকে অনুকরণীয় গুণাবলীর অধিকারীও হতে হবে। তার কাছ থেকে মানুষ প্রেরণা পাবে। তিনি হবেন আদর্শ স্থানীয়। মানুষ তাকে অনুসরণ করবে। তাকে দেখে শিখবে, উজ্জীবিত হবে। সে জন্যে একজন নেতা বা নেত্রীকে মেপে মেপে কথা বলতে হয়। তিনি যা বলছেন তার তাৎপর্য, মর্ম এবং জনগণের কি সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া হতে পারে সে সম্পর্কে তার সঠিক ধারণা থাকতে হবে। কারণ রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তার প্রতিটি কথারই গুরুত্ব রয়েছে। তাই দৃষ্টি নন্দনের চেয়ে তাকে হতে হবে বেশি মাত্রায় উক্তি নন্দন। তাকে সবসময় স্মরণ রাখতে হবে তার অসংলগ্ন বা বল্গাহীন উক্তি তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে।৮ হোসেন সাহেবের এ কথাটি আমার কাছে অত্যন্ত কার্যকর মনে হয়েছে। আমাদের নেতা-নেত্রীদের কথায় লাগাম টানার অপরিহার্যতা কী চমৎকার ভাষায় সৈয়দ আবুল হোসেন তুলে ধরেছেন!
নেতার আদিরূপ প্রজা। সাধারণ জনগণই ব্যক্তিকে সাধারণ পর্যায় হতে নেতায় রূপান্তর করে। অনেক নেতা ক্ষমতা পেয়ে নিজেকে সর্বাধিনায়ক ভেবে বসেন। মনে করেন তিনিই সব। যারা তাকে নেতা করেছেন, ক্ষমতায় এনেছেন তাদেরকে তুচ্ছ মনে করেন এবং নেতা হয়ে তাদের কথা ভুলে যান। সৈয়দ আবুল হেসেন এ নীতির বিরোধী তাই তিনি সবাইকে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় আগ্রহী। রাষ্ট্র সবার জন্য, সবাইকে সংশ্লিষ্ট করতে না-পারলে রাষ্ট্র পরিচালনায় কাক্সিক্ষত সাফল্য আসে না। তাঁর ভাষায়, ‘আমিই রাষ্ট্র, আমি যা ভালো মনে করব তাই হবে। আমরাই সব আর কেউ কিছু নয়, এসব মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক চিন্তাধারা এখন সম্পূর্ণ অচল। গণতন্ত্রে জনগণই হচ্ছে সবকিছুরই নিয়ামক ও নির্ধারক।৯ আবুল হোসেন সাহেবের এ বিশ্বাস যথাযথভাবে কার্যকর করা আবশ্যক। তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিকাংশ নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে। কেবল তখনই জাতির সার্বিক উন্নয়ন প্রতিষ্ঠা পাবে। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন বলতে কোনো ব্যক্তি বা অঞ্চল বিশেষের উন্নয়ন বোঝায় না। এটি আলোর মতো সার্বজনীন কেতনে আপতিত না-হলে উন্নয়ন হয়ে উঠতে পারে প্রলয়ের চেয়ে ভয়ঙ্কর।
ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার চেষ্টা গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রতিকূল ধারণা। সৈয়দ আবুল হোসেন যাদের সমর্থনে নেতা হয়েছেন তাদের সুঃখ দুঃখের সাথে নিজেকে একাকার করে দেয়ার চেষ্টায় অবিরাম নিবিষ্ট থাকেন। এ বোধ যাদের থাকে, তারা সহনশীল, বিনয়ী ও নিরহঙ্কারী না-হয়ে পারেন না। নেতা মানে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। যিনি জনগণের কাজ করবেন, জনগণের কাজে দায়বদ্ধ থাকবেন। নেতা হয়ে যিনি যাদের জন্য নেতা তাদের ভুলে যান, নিজেকে নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়েন তারা নেতা নয়, ব্যথা।
ক্ষমতা একটা অদ্ভুত ধারণা। ক্ষমতা কুক্ষিগতকারী নেতৃত্ব ক্ষমতা সুসংহত করা নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকেন যে, নিজের বিপদ কোনো দিক দিয়ে চলে আসে সে বিষয়ে মোটেও সজাগ থাকার সুযোগ পায় না। তাই এত সতর্ক থাকার পরও শেষ পর্যন্ত নিজেদের রক্ষা করতে পারে না। জনবিচ্ছিন্ন নেতৃত্ব ক্ষমতার মোহে এত অন্ধ থাকে যে, কারও পরামর্শ গ্রাহ্য করে না। সৈয়দ আবুল হোসেন বিষয়টি খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীনরা কখনও কোনো সৎ পরামর্শ গ্রহণ করে না। সংকট সমাধানে নয়, সংকট সৃষ্টিতেই তারা বেশি পারদর্শী ও উৎসাহী।’ তিনি আরও মনে করেন, ‘যা অনিবার্য তার জন্য দুঃখ বা অনুশোচনা হয় না, কিন্তু যা পরিহার করা যেতে পারত, তা ঘটে গেলে বা ঘটতে দিলে অবশ্যই মনস্তাপ হবে, ক্ষোভ হবে, কষ্ট হবে।’১০
ইতিহাসে অনেক শিক্ষা থাকে কিন্তু কেউ গ্রহণ করে না। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও সকল স্বৈরাচারকেই একদিন না একদিন বিদায় নিতে হয়। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। কিন্তু এ শিক্ষাটা কেউ নেয় না, নিতে চায় না। সে কারণেই বোধ হয় বার বার স্বৈরাচারের আবির্ভাব ঘটে।১১ এ রকম অদূরদর্শী নেতাগণের প্রতি তাঁর উপদেশ, ‘জনগণকে ভালোবাসুন, নিরাপত্তা আপনা আপনি নিশ্চিত হয়ে যাবে।’ তাই তিনি জনগণে বিলীন হয়ে নিজেকে সাধারণ্যের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। এখানেই তার আনন্দ। এটাই তার প্রাপ্তি। সংগতকারণে জনগণও তাঁকে উজাড় করা ভালোবাসায় বার বার অভিষিক্ত করেন।
অনেকের কাছে নেতৃত্ব ক্ষমতা জৌলুসের বিষয়, গর্বের বিষয়। সৈয়দ আবুল হোসেন নেতৃত্ব ও দায়িত্বকে জৌলুসময় মনে করেন না। তার মতে, ‘একটি কার্য আর একটি বোঝা। এ বোঝা মূলত বাস্তবায়নের, দায়িত্বের এবং প্রতিজ্ঞার। …যে মস্তকে শোভিত হয় মুকুট, সে মস্তক কখনও নিশ্চিত থাকে না। হাজারও চিন্তাভাবনা, শত সমস্যার কণ্টকে সে মুকুট থাকে শোভিত। রাতের ঘুম, দিনের আরাম তখন বিলকুল হারাম হয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো হতদরিদ্র দেশ হলে তো কথাই নেই। তাই দায়িত্ব পাবার আগে প্রত্যেকের উচিত দায়িত্ব বহনের সামর্থ্য অর্জন।’
‘সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রজ্ঞা।’১২ উপযুক্ত শিক্ষা আর ত্যাগী মনোভাব ছাড়া তা অর্জন করার কোনো উপায় নেই। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন প্রজ্ঞাময় প্রজন্ম সৃষ্টির মানসে কার্যকর শিক্ষার বিস্তার ও প্রসারে সমর্পিত। এর মাধ্যমে মননশীল জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির সহিংস ক্ষেত্রকে সহনশীলতার উর্বর ক্ষেত্রে পরিব্যাপ্ত করার ইচ্ছায় ব্যাকুল। স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি যে সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, যেভাবে শিক্ষার প্রসারে কাজ করে যাচ্ছেন, সে রকম ব্যক্তি যদি অন্তত প্রতি জেলায় একজন করে হলেও থাকত, তো বাংলাদেশ এতদিনে যে কোনো উন্নত দেশের সাথে পাল্লা দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে সক্ষম হতো।
সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশের সমস্যা গুড গভর্নেন্স, সুষ্ঠু ও সৎ শাসন ব্যবস্থা না-থাকা। তিনি সুশাসন বলতে সৎ ও প্রত্যয়দীপ্ত নেতৃত্ব; সুষ্ঠু নির্বাচন বা অংশীদারিত্বমূলক গণতন্ত্র এবং উপযোগী নীতিমালা গ্রহণপূর্বক এ সবের কার্যকর বাস্তবায়নকে বুঝে থাকেন। এ তিনটি বিষয়কে সমন্বিত করার জন্য তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। এ কাজ করতে গিয়ে সৈয়দ আবুল হোসেন কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। রাজনীতিক সদিচ্ছার অভাবের কারণে বার বার সুশাসন প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হয়েছে। ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মৌলবাদ, কুসংস্কার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কার্যকলাপ, দলীয়করণ, যুক্তিহীন সমালোচনা ইত্যাদি কারণে সুশাসন বিকাশ হতে পারছে না। তার অভিজ্ঞতার প্রকাশ সত্যিকার অর্থে অকাট্য- ‘একটি সৎ ও সত্যিকারের জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারই কেবল এ সব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সুশাসনের অন্যতম পূর্বশর্ত।’ তিনি বিশ্বাস করেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সুশিক্ষিত ও প্রজ্ঞাময় মানুষ এবং দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। এ জন্য তার দৃষ্টি সর্বাগ্রে শিক্ষার উপর। এ বিষয়ে তার বক্তব্য প্রত্যেকের অনুধাবন করা উচিত-
‘শিক্ষকতা একটি মামুলী পেশা নয়। শিক্ষকতা একটি ব্যতিক্রমধর্মী সম্মানিত পেশা। শিক্ষকতাকে অভিহিত করা হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ব্রত ও মহানতম আদর্শ পেশা হিসেবে। বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (দঃ) বলতেন, তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়Ñ তিনি মানব জাতির শিক্ষক। গ্রিক দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ প্লেটো শিক্ষাকে তুলনা করেছিলেন অন্ধকার গুহার মধ্যে অজ্ঞতার শিকলবদ্ধ মানুষের কাছে আলোক রশ্মির আকস্মিক বিকিরণের সাথে। সে অর্থে শিক্ষা হচ্ছেÑ তিমির অভিসারী ও আলো বিতরণকারী। শিক্ষকদের বলা হয়, মানুষ গড়ার রূপকার। মহাবীর আলেকজান্ডার বলেছিলেন, আমার জীবনের জন্যে, আমার জন্মের জন্যে আমি আমার পিতামাতার কাছে ঋণী। কিন্তু আমার বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের জন্যে; কৃতিত্ব, বীরত্ব ও গৌরবের জন্যÑ ঋণী হচ্ছি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এরিস্টটলের কাছে। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি হয়ে সন্তুষ্ট থাকেননি। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তিনি নিজেকে একজন নিবেদিত প্রাণ আদর্শ শিক্ষকে রূপান্তরিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। আধুনিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাওসেতুং প্রায় সময় বলতেন, তিনি একজন শিক্ষক মাত্র। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক হোয়াইটহেড বলেছিলেন, ঘড় ঝুংঃবস ড়ভ ঊফঁপধঃরড়হ রং ইবঃঃবৎ ঃযধহ ধ ঞবধপযবৎ. অর্থাৎ কোনো শিক্ষা ব্যবস্থাই শিক্ষকের চেয়ে উন্নত নয়। শিক্ষকই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ। শিক্ষা প্রক্রিয়ার অন্তস্থলে শিক্ষকদের অবস্থান। দার্শনিক বার্টান্ড রাসেলের কথায়- শিক্ষক সমাজ হচ্ছে প্রকৃতই সমাজ ও সভ্যতার বিবেক। এজন্য শিক্ষকদের বলা হয় সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ার (ঝড়পরধষ ঊহমরহববৎ) বা সমাজ নির্মাণের স্থপতি।১৩
সৈয়দ আবুল হোসেন তাঁর ধারণা ও বিশ্বাসকে শুধু তথ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন না। যা বিশ্বাস করেন তা মনেপ্রাণে কার্যকর করার চেষ্টা করেন। তিনি শিক্ষক সমাজকে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এটি তাঁর ব্যবহার ও কার্য দ্বারা বার বার মূর্ত হয়ে উঠেছে। তিনি শুধু তাত্ত্বিক নন, একই সাথে প্রায়োগিকও বটে। পর্যবেক্ষণের পর সিদ্ধান্তে আসেন, সিদ্ধান্তের পর বাস্তবায়নে। হুজুগের মাথায় কোনো কিছু করা হতে প্রবল মানসিক চাপ সত্ত্বেও বিরত থাকার চেষ্টা করেন। তাঁর জ্ঞান ও দক্ষতাকে তিনি লুকিয়ে রাখেন না। সমাজের জন্য তা ব্যবহার করেন। এ রকম মানুষই সমাজের উপকার করতে পারেন। যে জ্ঞান নিজের মনে সীমাবদ্ধ থাকে সে জ্ঞান থাকা না-থাকা একই।
রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সমাজব্যবস্থা সব কিছুর লক্ষ্য উন্নয়ন। তবে উন্নয়ন একটি বহুমাত্রিক ধারণা। সৈয়দ আবুল হোসেনের ভাষায়, ‘গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন সমার্থক এবং পরস্পর গভীরভাবে সম্পৃক্ত। একটির উপর নির্ভর করে এদের সাফল্য।’১৪ তিনি মুক্ত অর্থনীতির সমর্থক। অর্থনীতিকে বন্দি করে রেখে খাঁচার পাখির মতো অথর্ব করে দেয়ার পক্ষপাতি নন তিনি। শিল্পায়নকে তিনি উন্নয়নের অগ্রাধিকার প্রাপ্ত খাত হিসেবে দেখতে চান। তিনি মনে করেন, ‘শিল্পায়ন ছাড়া জনগণের জীবনধারণের মান উন্নয়ন করা যায় না। শিল্পায়ন ছাড়া বেকার সমস্যার কার্যকর ও ফলপ্রসূ সমাধান সম্ভব নয়। এক কথায়, শিল্পায়নই হচ্ছে সমৃদ্ধি ও অগ্রগতির সোপান। কৃষির মাধ্যমে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন সম্ভব নয়। কারণ, ভূমির একটি সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতা রয়েছে। এ কারণেই আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিল্পায়নের কোনো বিকল্প নেই।’১৫ তাই বলে তিনি কৃষিকে অবহেলা করার কথা বলেন না। বলেন, কৃষিকেও আধুনিক প্রযুক্তির সামিল করতে। তাহলে কৃষিও শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
ছাত্র রাজনীতি নিয়ে তিনি শুরু হতে শঙ্কিত ছিলেন। তাই নিজের চেষ্টায় গড়ে তুলেছেন একের পর এক অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যা ছাত্র রাজনীতি নামক লেজুড়বৃত্তি হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। তিনি মনে করেন, ছাত্ররাই জাতির ভবিষ্যৎ। আগামী দিনের নেতৃত্ব আসবে তাদের কাছ থেকেই। ছাত্রদের ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক কোন্দল, হানাহানি ও সংঘাতের দিকে ঠেলে দিলে শিক্ষাব্যবস্থা যেমন হবে বিপর্যস্ত, তেমনি বিকশিত হতে পারবে না জাতির আগামী দিনের সম্ভাবনাময় তরুণ মেধা ও প্রতিভা।১৬ তাই তিনি তাঁর প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণভাবে লেজুড়বৃত্তিময় রাজনীতি হতে মুক্ত রেখেছেন এবং এ ব্যাপারে অনড়।
সৈয়দ আবুল হোসেন একজন গণতন্ত্রমনা নেতা। গণতন্ত্রের অনেকগুলো সংজ্ঞার ক্ষেত্রে তিনি আব্রাহাম লিংকনের সংজ্ঞাকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন। তাঁর গণতন্ত্রে জনগণই সব। রাষ্ট্র পরিচালনায় যাতে সর্বাধিক লোকের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত হয় সেভাবে তিনি রাজনীতিক কলাকৌশল নির্ধারণে আগ্রহী। তিনি মনে করেন, ‘সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনই হচ্ছে গণতন্ত্রের প্রধান স্তম্ভ। জনগণের সম্মতি ও স্বার্থ অনুযায়ী শাসন করা সরকারের একটি মহৎ ও গৌরবজনক লক্ষ্য। জনপ্রিয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করা ব্যতিরেকে এই লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে না।’১৭ তিনি আরও মনে করেন, ‘গণতন্ত্রে ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ জ্ঞাপনের অধিকার আইনসম্মতভাবে স্বীকৃত।’১৮ তার মতে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সহনশীলতাই গণতন্ত্রের মূল কেন্দ্র। এ প্রসঙ্গে তার অভিমত খুবই অর্থবহ- ‘শিক্ষা তখনই প্রকৃত অর্থে আমাদের ঋদ্ধ করতে সক্ষম হয় যখন আমরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল হই। গণতন্ত্র হচ্ছে বৈচিত্র্যময় অনেকগুলো পথ-মতের সমাহার। গণতন্ত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন প্রত্যেক মানুষ আপন দর্শনে স্থিত থেকে স্বাধীনভাবে উচ্চকিত হওয়ার পরিবেশ পায়। সহাবস্থান, সহনশীলতা ও শিক্ষার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা যায়। তাই ছাত্রদের উচিত আগে জ্ঞান অর্জন করা। জ্ঞান তখনই অর্জিত হবে বলে ধরে নেয়া যাবে, যখন ব্যক্তি নিজের সুখের জন্য অন্যের সুখ হরণকে অত্যন্ত গর্হিত মনে করবে। পক্ষান্তরে সবার সুখ নিশ্চিত করার জন্য আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ হবে।’১৯
রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতিক উদ্দেশ্য হাওয়ায় বাস্তবায়ন করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন লাগসই নীতি, টেকসই প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, অদম্য স্পৃহা এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রযুক্তি প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি। সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, নিবেদিত প্রাণ সৎ, দক্ষ ও কঠোর পরিশ্রমী আমলাতন্ত্র ছাড়া সরকারের নীতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।২০ তিনি এগুলোর সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের লক্ষ্যকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য রাজনীতি করেন। সংকীর্ণ স্বার্থসিদ্ধির জন্য নন। ধর্ম বিষয়ে তার উদারতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত মানসিকতা সৈয়দ আবুল হোসেনের রাজনীতিক দর্শনের বিমল অলঙ্কার, বস্তুত সাম্প্রদায়িকতাহীন বলে তিনি এত উদার, সহনশীল এবং মহানুভব হতে পেরেছেন।
সৈয়দ আবুল হোসেনের কর্মকাণ্ড ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হয়েছে, তিনি এমন একজন রাজনীতিবিদ, যিনি জনগণের কল্যাণে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত একজন সাধারণ মানুষ। জনগণ এমন একজন সহজ মানের অসাধারণ রাজনীতিবিদকে তাদের নেতা হিসেবে চান। এমন নেতাই দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারেÑ স্বপ্নীল আগামীর ভাবনায়। অনেক রাজনীতিবিদ মনে করেন ক্ষমতায় যেতে হলে সন্ত্রাসীদের সহায়তা প্রয়োজন। সৈয়দ আবুল হোসেন এটি মোটেও বিশ্বাস করেন না। তিনি মনে করেন, সন্ত্রাসীরা পক্ষান্তরে দলকে জনবিমুখ করে তোলে। জনগণের কাছে যেতে হলে জনগণের শত্রু সন্ত্রাস আর সন্ত্রাসীকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।
জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন, কারও চারিত্রিক পূততা পরীক্ষা করতে হলে তাকে অর্থ বা ক্ষমতা দাও, তারপর দেখো তিনি কেমন। আমীন আমাকে গ্রন্থের সাথে আলহাজ্ব সৈয়দ আবুল হোসেনের একটি বায়োডাটা দিয়েছিল। তা পড়ে মুগ্ধ না-হয়ে পারলাম না। তাঁর জন্ম ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের ১ আগস্ট। আশির দশকের শেষভাগ হতে তার জনসেবার অভিযাত্রার সূচনা। কতইবা বয়স, মাত্র পঁয়ত্রিশ। এ বয়সে কত বিত্তবান লোককে দেখেছি হোটেলে, ক্লাবে, দেশে-বিদেশে ফুর্তি আনন্দে মজা লুটতে; অসামাজিক কাজ করতে। সে ক্ষেত্রে সৈয়দ আবুল হোসেন স্কুল করেছেন, কলেজ করেছেন, বৃত্তি দিয়েছেন, গরিবদের দু’হাতে তুলে দিয়েছেন নিজের কষ্টার্জিত অর্থ। এটি আমাকে অভিভূত করেছে। তাঁর মতো মানুষ বাংলাদেশে বড় প্রয়োজন।

ড. আবদুল করিম : প্রাক্তন উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, লেখক, গবেষক; উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইতিহাসবেত্তা।

১. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা ২৯
২. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা- ৪৩
৩. গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রকাশকাল ফেব্রচ্ছারি, ১৯৯৬।
৪. গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রকাশকাল ফেব্রচ্ছারি, ১৯৯৬।
৫. ঐ
৬. ঐ পৃষ্ঠা- ৩০।
৭. ঐ
৮. ঐ পৃষ্ঠা- ৪১।
৯. গণতন্ত্র নেতৃত্ব উন্নয়ন গ্রন্থের প্রবন্ধ, লেখক সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা ৪৩
১০. গণতন্ত্র নেতৃত্ব উন্নয়ন গ্রন্থের প্রবন্ধ, লেখক সৈয়দ আবুল হোসেন, ৪৫
১১. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা ৬৪
১২. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা ৬৯।
১৩. শিক্ষক ও শিক্ষা ব্যবস্থা, গণতন্ত্র নেতৃত্ব উন্নয়ন গ্রন্থের প্রবন্ধ, লেখক সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা ২২।
১৪. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন।
১৫. শিল্পায়ন ও অর্থনীতির বিকাশ, সৈয়দ আবুল হোসেন, গণতন্ত্র, নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা ৩৮)
১৬. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা ৩৪
১৭. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা ৬৬
১৮. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, পৃষ্ঠা ৩২
১৯. সূত্র অধ্যাপক মনোরঞ্জন দাস।
২০. গণতন্ত্র নেতৃত্ব ও উন্নয়ন, সৈয়দ আবুল হোসেন, পৃষ্ঠা ৭৬।

সততাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা
এম মতিউর রহমান
১৯৭৬ সালে আমি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের কয়েকদিন পর একজন ব্যবসায়ী আমার দপ্তরে আসেন। সুন্দর, সুঠাম ও আভিজাত্যময় চেহারা। নিপুণভঙ্গিতে আঁচড়ানো চুলে মাথা ভর্তি। ফর্সা মুখে সারল্যের হাসি। রুচিশীল টাই-স্যুট পোশাকে তাঁকে অপূর্ব লাগছিল। মানুষ হিসেবে আমিও কম সুন্দর নই। তবে যুবককে দেখে আমার সুন্দরটা নি®প্রভ মনে হলো। বিনয়ের সাথে সালাম দিয়ে বললেন: ‘আমার নাম সৈয়দ আবুল হোসেন। নতুন ব্যবসায় নেমেছি। ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমায় বাড়ি। আপনার সাথে পরিচিত হতে আসলাম।’ চেয়ারে বসতে বসতে আরও বলেছিলেন, ‘বাড়ি মাদারীপুর হলেও লেখাপড়া করেছি বরিশাল। গৌরনদী কলেজের ছাত্র ছিলাম।’
আমার বাড়ি বরিশাল (বর্তমান পিরোজপুর)। প্রশাসনিক বিভাজনের অবস্থানগত নৈকট্য মানুষের পরস্পর সম্পর্ক সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমার নিজ জেলার পাশের জেলা ফরিদপুরের ছেলে সৈয়দ আবুল হোসেনের উপস্থাপনাগত সৌন্দর্যের সাথে ঠিকানাগত নৈকট্য আমাকে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট করে। অনেকে এটাকে আঞ্চলিকতা বলবেন। আমি বলব আঞ্চলিকতা নয়, দেশপ্রেম। চ্যারিটি বিগেইনস এট হোম। চা পানের ফাঁকে ফাঁকে অনেক ব্যক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান হয়ে গেল। তাঁর ব্যক্তিত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব, দেশপ্রেম, জীবনের লক্ষ্য এবং ব্যবসায় হিসেবে লক্ষ্যস্থলে পৌঁছার দৃঢ়তার সাথে সৎ থাকার অঙ্গীকার আমাকে মোহিত করে। শুধু অবয়বগতভাবে নয়, হৃদয়গতভাবেও তিনি মনকাড়া গুণাবলীর অধিকারী মনে করার যথেষ্ট কারণ আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
গত বছর (১৯৭৫) সৈয়দ আবুল হোসেন ‘সাকো ইন্টারন্যাশনাল’ নামক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেছেন। নতুন উদ্যোক্তা, অল্প বয়স। বলেছিলাম, ‘বাণিজ্য সচিব হিসেবে আপনাকে সহযোগিতা করা আমার কর্তব্য এবং নৈতিক দায়িত্ব।’ তিনি বলেছিলেন, ‘আপনার কথা শুনে আমি খুশি হলাম। তবে অনৈতিক কিছু আমি চাইব না এবং করব না; এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।’ এ রকম প্রত্যয়দীপ্ত কথা প্রথমে অনেকের কাছে অহঙ্কার বা আস্ফালন মনে হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এখানে তাঁর অহঙ্কারের কিছু ছিল না। এর মাধ্যমে কেবল তাঁর সততার পরিচয়টা ফুটে উঠেছিল। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঔদার্যের সুযোগে মুনাফালোভী কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কালোবাজারি ও মজুদদারি করে দেশের যে ক্ষতি করেছিল তা ইতিহাসের পাতায় এখনও কলঙ্ক হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু এসব অসাধু, মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও কালোবাজারিদের অপকর্মে এতই ক্ষিপ্ত ছিলেন যে, বিভিন্ন বক্তৃতায় বারবার তাদের সতর্ক করে দিতেন। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু-পরবর্তী বাংলাদেশকে আধুনিক বিশ্বের উন্নয়ন স্রোতে সম্পৃক্ত হতে হলে সততার সাথে কোনো আপোষ করলে চলবে না- এটি সৈয়দ আবুল হোসেন সচেতনভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।
সাত বছর আমি বাণিজ্য সচিব ছিলাম। এ দীর্ঘ সাত বছর সৈয়দ আবুল হোসেনকে একজন ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি হিসেবে নিবিড়ভাবে খুব কাছ হতে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব হবার পরও তাঁর সাথে আমার পরিচয়ের ছেদ নামেনি। দীর্ঘ এক যুগের বেশি সময় অনেক বার তিনি আমার কাছে এসেছেন, একা এসেছেন, অনেককে নিয়ে এসেছেন। মাঝে মাঝে ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রণালয়ের সভায়ও যোগ দিয়েছেন। সবখানে তাঁকে আমি তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন একজন আদর্শ ব্যবসায়ী হিসেবে প্রত্যক্ষ করেছি।
ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষকতার চাকুরি ছেড়ে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে আমি সরকারি চাকুরিতে যোগ দেই। দীর্ঘ চাকুরি জীবনে ভালোমন্দ অনেক অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। শুধু সিভিল সার্ভেন্ট ছিলাম না, সংসদ সদস্য হয়েছি, মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছি। একটি বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত তিক্ত সেটি হচ্ছে, নীতি-নৈতিকতা অবহেলা করে যেনতেন প্রকারে অর্থ উপার্জন করা এবং তাড়াতাড়ি ধনী হবার মানসিকতা। ব্যবসা যে শুধু অর্থ উপার্জন নয়, সাথে সাথে সমাজসেবা- এ ধারণা খুব কম ব্যবসায়ীই পোষণ করতেন। এ ক্ষেত্রে আমি সৈয়দ আবুল হোসেনকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম দেখতে পেয়েছি। লাভের জন্য ব্যবসা, এটি শতভাগ সত্য। তার মানে নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে অসৎ উপায়ে ব্যবসা পরিচালনা, প্রকৃত অর্থে ব্যবসা হতে পারে না। সৈয়দ আবুল হোসেনের দর্শন ছিল সমাজসেবার জন্য উপার্জন, কল্যাণের জন্য উপার্জন। মঙ্গলজনক কাজের উদ্দেশ্যে ধাবিত আয় কখনও অসৎ উপায়ে অর্জিত হতে পারে না। আর যারা অসৎ উপায়ে অর্জন করেন, তারা কখনও অবৈধ পন্থায় অর্জিত অর্থ কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে পারেন না। নেকড়ের কাছ হতে কখনও কোকিলের গান পাওয়া যায় না।
অধিকাংশ ব্যবসায়ী অনৈতিক উপায়ে লাভবান হতে চাইতেন। সৈয়দ আবুল হোসেন অনৈতিক সুবিধা গ্রহণকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। তিনি শুধু আইনগতভাবে প্রাপ্য তার ন্যায্য অধিকারটুকু চাইতেন। তার চাওয়াটা ‘সুবিধা’ ছিল না, ছিল ‘অধিকার’Ñ দেশের নাগরিক হিসেবে যা রাষ্ট্র তাকে সাংবিধানিকভাবে প্রদান করেছে। এর বাইরে তিনি চাইতেন না। সৈয়দ আবুল হোসেনকে ভালো লাগার অন্য যত কারণই থাকুক না কেন, এ গুণটির জন্য জন্য আমি এ ব্যবসায়ী যুবকটিকে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের চেয়ে আলাদা চোখে দেখতাম। শুধু আমি নই, সবাই তাকে পছন্দ করতেন। তাঁর মধ্যে অন্যের পছন্দকে প্রভাবিত করার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে।
প্রথম যখন আবুল হোসেনের সাথে আমার পরিচয় হলো, তখন তিনি এত বড় ব্যবসায়ী ছিলেন না। ব্যবসা শুরু করেছিলেন মাত্র। পুঁজিও ছিল যৎসামান্য। অধিকন্তু তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও নীতিবান। তাহলে কীভাবে তিনি এত বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন? উত্তর- অনেস্টি ইজ দ্যা বেস্ট পলিসি। আসলে সততার মতো বড় মূলধন আর নেই। তাঁর আর্থিক পুঁজি কম ছিল এটা ঠিক- তবে তাঁর এমন কিছু পুঁজি ছিল যা পৃথিবীর সকল অর্থ একত্রিত করলেও হার মানবে। এ পুঁজি হচ্ছে পরিশ্রম, সততা, সময়নিষ্ঠা আর ভদ্রতা। তিনি কীভাবে এত বড় ব্যবসায়ী হতে পেরেছেন, মর্যাদায় পৌঁছোতে সক্ষম হয়েছেনÑ তা নিচের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
মার্জিত আচরণ, সুললিত ভদ্রতা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, নজরকাড়া আভিজাত্য, মোহনীয় রুচি সৈয়দ আবুল হোসেনকে অনেক বড় মাপের মানুষে পরিণত করেছে। যদিও এগুলো জন্মগতভাবে অর্জন করা কঠিন অবশ্য। পরে জানতে পেরেছি, এসব গুণাবলী অর্জনে সৈয়দ আবুল হোসেনের ব্যক্তিগত সাধনা ছিল, তদসাথে তার বংশমর্যাদা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। পেশাগতভাবে সৈয়দ আবুল হোসেন ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও স্বচ্ছ; ব্যবহারে ছিলেন ব্যক্তিত্বময়, বিনয়ে পরিপূর্ণ মার্জিত। তিনি মিথ্যা বলতে পারেন- এমন কেউ ভাবতে পারত না। তাই সৈয়দ আবুল হোসেন যা বলতেন তা সবাই কোনোরূপ দ্বিধা ছাড়া সত্য মর্মে মেনে নিত। শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নয়, পুরো সচিবালয়ে এবং যাদের সাথে তিনি ব্যবসা করতেন, যারা তাঁর কাছে আসতেন-যেতেন, কথা বলতেন, কথা শুনতেন সবার কাছে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মানুষের পূর্ণ প্রতিচ্ছবির আদর্শিক নান্দনিকতায় গড়ে ওঠা একজন। সংগতকারণে তিনি পুরো সচিবালয়ে ছোটবড় সবার পরিচিত সর্বমহলের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। আমি মনে করি, সৈয়দ আবুল হোসেনের বড় হবার পেছনে এটি অন্যতম কারণগুলোর অন্যতম।
সৈয়দ আবুল হোসেনের বড় পুঁজি সততা। সততার সাথে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ব্যবসায় কার্যক্রম পরিচালনায় সুবিধাভোগীদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। যাকে যেটুকু দেবার অঙ্গীকার করতেন, তার কম দিতেন না, বরং বেশিই দিতেন। ফলে অল্প সময়ে তাঁর ও তাঁর ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সুনাম দ্র্রুত বেড়ে যায়। এটিও মূলত সততার পুরস্কার। ওয়ান-এলেভেনে তাঁকে হয়রানি করার চেষ্টা করা হচ্ছে শুনে বড় কষ্ট পেয়েছিলাম। কারণ, এমন একজন সৎ ব্যক্তিকে হয়রানি করা মানে সততাকেই হয়রানি করা।
ভোগের জন্য আয় এটা কেউ অস্বীকার করে না এবং পেশা এক ধরনের ভোগ। তবে ভোগের মধ্যে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে তফাৎ লক্ষ্য করা যায়। পশুরাও ভোগ করে, মানুষও ভোগ করে, আবার হিটলারও ভোগ করেছেন, মাদার তেরেসাও ভোগ করেছেন কিন্তু এ ভোগের পার্থক্য প্রবল, কারও ভোগ অন্যের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, আবার কারও ভোগ সমাজে বিস্তার করে শান্তি, বইয়ে দেয় আনন্দ। যাদের ভোগ অন্যকে কষ্ট দেয়, রীতিনীতি, আইন-কানুন বা নৈতিকতার সাথে সাংঘর্ষিক, তাদের ভোগ পাশবিকতাময়। ভোগের জন্য পশু হয়ে যেতে হবে এমন আচরণ কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। মূলত এটিই পশু আর মানুষের মধ্যে পার্থক্য। মানবীয় ভোগ মানবীয় সৌন্দর্যে বিভূষিত থাকতে হবে। নৈতিকতা বিবর্জিত কোনো মানুষের মাঝে মানবীয় ভোগ থাকতে পারে না। সৈয়দ আবুল হোসেন মানবীয় ভোগে বিদূষিত একটি অত্যত্তুম চরিত্র। তিনি আয় করেছেন একা, তবে তা শুধু একার উপভোগের জন্য নয়। তাঁর ভোগ প্রতিষ্ঠা করেছে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, রাস্তা ইত্যাদি।
শুধু স্কুল কলেজ নয়, শিক্ষার যে কোনো ক্ষেত্রে তিনি উদার। তাঁর অর্থায়নে অনেক লেখক তাঁদের অপ্রকাশিত গ্রন্থ প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ সংবাদটি অনেকে জানেন না। আমার মনে হয়, সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেব নিজেও জানেন না তিনি কয়জন লেখককে গ্রন্থ প্রকাশে কতভাবে সহায়তা করেছেন। আমি অনেকের নাম জানি। তবে দাতার মহত্ততার প্রতি সম্মান রেখে তা প্রকাশ নাই-বা করলাম। তিনি দান করতেন গোপনে, গ্রহীতাকে তা গোপন রাখার অনুরোধ করতেন। এ যে দান গোপন রাখার মতো মহৎ মন, কয়জনের আছে আমার জানা নেই।
অনেকে কম পরিশ্রম করে বেশি উপার্জনকে পেশাগত উন্নয়ন ও আর্থিক সফলতার সবচেয়ে উত্তম কৌশল বলে মনে করেন। সৈয়দ আবুল হোসেন মনে করেন, এটি সবচেয়ে নিকৃষ্ট এবং বিপজ্জনক পন্থা। যে গাছ দ্রুত বাড়ে সে গাছ সামান্য বাতাসে ভেঙে পড়ে। সময়ের আগে পাকা ফল লাল হতে পারে, পরিপক্ব হয় না, পাকার মতো মনে হলেও মুখে দিলে বিস্বাদের কষ্টে ছুড়ে দেয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। কম পরিশ্রম করে বেশি উপার্জনকারী ব্যক্তি অকালপক্ব ফলের ন্যায় বিরক্তিকর। কম শ্রমে বেশি উপার্জন করার ফন্দি মূলত অসৎ উপায় অবলম্বন করার নামান্তর। এ জন্য অনেকে অনৈতিক পথ অবলম্বন করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে। সৈয়দ আবুল হোসেন কম পরিশ্রম করে বেশি উপার্জন করার কৌশল অবলম্বন করার কথা ভাবতেও পারতেন না। তিনি যতটুক পরিশ্রম করতেন ততটুক চাইতেন। তার চাওয়া শ্রম আর চেষ্টার সাথে সংগতিপূর্ণ থাকত বিধায় তিনি যতটুক চাইতেন ততটুক পেতেন। চাওয়া পাওয়ার সমান্তরাল বোধ তাকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল সে যুবা বয়সে। তাই দিন দিন তিনি হয়ে উঠেছেন শ্রম-বিশ্বাসী একজন আত্মপ্রত্যয়ী মানুষ। শ্রমের যথাযথ মূল্য দিতে গিয়ে তিনি সময়নিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
আমি যখন যোগাযোগ মন্ত্রী, তখনও সৈয়দ আবুল হোসেনের সাথে মাঝে মধ্যে কথা হতো, দেখা হতো। জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলে সৈয়দ আবুল হোসেন এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। একদিন তাঁর অফিসে এলাকার একটি কাজের জন্য তদ্বির করতে যাই। আমাকে দেখে তিনি এমন বিনীত ব্যবহার করলেন, যেন আমি বাণিজ্য সচিব এবং তিনি একজন ব্যবসায়ী। তাঁর বিনয়ী আচরণ আমাকে আবার মুগ্ধ করল। বিশ বছর আগে তাঁকে যে মূল্যায়ন আমি করেছিলামÑ তা অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে দেখে গর্বে বুকটা ফুলে উঠেছিল। প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন আমার নিজ এলাকা পিরোজপুর জেলার কাউখালীর উন্নয়নে আমাকে যেভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন, তা তাঁর বিনয় আর কৃতজ্ঞতার প্রতিচ্ছবি।
এখনকার আবুল হোসেন আগের সে অখ্যাত ব্যবসায়ী আবুল হোসেন নন। তিনি এখন রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, দানবীর, সংগঠক, শিক্ষাবিদ ও লেখক। দেশব্যাপী রয়েছে তার প্রচুর খ্যাতি। সাধারণত মানুষ বিখ্যাত হবার পর অহঙ্কারী হয়ে ওঠেন, বিনয়ের পরিবর্তে হামবড়া প্রকট হয়ে ওঠে। আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি সৈয়দ আবুল হোসেন যত বড় হচ্ছেন, যত বিখ্যাত হচ্ছেন, ততই তাঁর বিনয় প্রসারিত হচ্ছে। কোনো মানুষ বড় হবার সাথে সাথে যদি তার বিনয়-ভাব প্রসারিত হয়, ধরে নিতে হবে তিনি বড়ত্বের যোগ্য। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি গ্যাস ভরলে বেলুন ফেটে যায়। ঐ ফেটে যাওয়াটা অহঙ্কারের প্রতিক্রিয়া। যা আমাদের অনেক পদাধিকারীর মাঝে লক্ষ করা যায়। বর্তমানে সৈয়দ আবুল হোসেন যোগাযোগ মন্ত্রী। মাঝে মাঝে এলাকার বিভিন্ন কাজ নিয়ে তার অফিসে যাই। যোগাযোগ মন্ত্রীকে সবসময় ব্যস্ত থাকতে হয়। তবু যখনই তাঁর কাছে গিয়েছি, অনেক ব্যস্ততার মাঝেও সম্মানের সাথে কাছে ডেকে নিয়েছেন, যথা মর্যাদায় স্বাগত জানিয়ে এবং সময় দিয়ে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন।
বাণিজ্য সচিব ও শিল্প সচিব হিসেবে আমি একটা কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, সৈয়দ আবুল হোসেন কখনও সরকার বা অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হতে অনৈতিক কোনো সুবিধা আদায় করেননি কিংবা অনুরূপ আদায়ের চেষ্টাও করেননি। তিনি কাউকে ঠকাননি, কেউ তাঁকে ঠকালে বিস্ময়ের সাথে ভেবেছেন- মানুষ কীভাবে প্রতারক হতে পারে! এবং এ ভেবে লজ্জা পেয়েছেন। আমার চাকুরি জীবনে আমি যত ব্যবসায়ী দেখেছি, যত মানুষ দেখেছি তন্মধ্যে সৈয়দ আবুল হোসেন সততা, মানবতা, ভদ্রতা আর নিষ্ঠা বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ একজন।

এম মতিউর রহমান : প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত জাপান এবং কোরিয়া; প্রাক্তন সচিব বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়; প্রাক্তন সংসদ সদস্য এবং প্রাক্তন মন্ত্রী যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

You Might Also Like