‘সম্ভাব্য তিন ঘাতকের ছবি আঁকল এফবিআই’

লেখক ও মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়ের সম্ভাব্য তিন ঘাতকের ছবি (স্কেচ) আঁকলেন ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (এফবিআই) প্রতিনিধিরা। ঘটনার রাতে প্রত্যক্ষদর্শী দু’জনের দেয়া বর্ণনা অনুযায়ী শনিবার সম্ভাব্য ওই ঘাতকদের ছবি আঁকেন এফবিআই সদস্যরা। এছাড়া প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ঘটনার রাতে অভিজিৎ রায় যে স্থানে খুন হন তার একশ’ গজ আশপাশে থাকা ৫৭টি মোবাইল ফোন শনাক্ত করেছেন এফবিআই সদস্যরা।

নিহত অভিজিৎ রায়ের মোবাইল ফোনের আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি)-এর সহায়তা নিয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ওই মোবাইল ফোনগুলো শনাক্ত করেছে এফবিআই। ওই মোবাইল ফোন গ্রাহকদের ব্যাপারে অভিজিৎ হত্যার তদন্তকারী সংস্থা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে তথ্য চেয়েছে অভিজিৎ হত্যা তদন্তে সহায়তা দিতে আসা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এফবিআই) সদস্যরা।

এদিকে শনিবার প্রত্যক্ষদর্শী দু’জন ছাড়াও এফবিআই সদস্যরা কথা বলেছেন অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাপক অজয় রায়ের সঙ্গে। দিনভর মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে অবস্থানকালে এফবিআই সদস্যরা ঘটনার রাতে বইমেলা ও আশপাশে থাকা বিভিন্ন সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজও প্রত্যক্ষ করেন। চাঞ্চল্যকর অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, মার্কিন নাগরিক হওয়ায় এফবিআই সদস্যরা অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের তদন্তে এ দেশে এসেছেন। তদন্তে সন্তোষজনক অগ্রগতি রয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সম্ভাব্য ঘাতকদের একটি তালিকা করে তাদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া শনিবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ডিএমপির টেকনোলজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তিনি বলেন, অভিজিৎ হত্যাকারীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য এফবিআই কারিগরি ওই সহায়তা দিচ্ছে। অভিজিৎ হত্যা মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদককে বলেন, ঘটনার রাতে প্রত্যক্ষদর্শী দু’জনকে শনিবার সকালে গোয়েন্দা কার্যালয়ে এফবিআই সদস্যদের সামনে হাজির করা হয়। প্রায় ২ ঘণ্টা ওই দুই প্রত্যক্ষদর্শীর দেয়া বর্ণনা শুনে সম্ভাব্য তিন ঘাতকের ছবি আঁকেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে তদন্তে সহায়তা করতে আসা এফবিআই সদস্যরা।

ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ঘটনার সময় অভিজিৎ ও তার স্ত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে তিন যুবক। এদের বয়স ২০ থেকে ২৫-এর মধ্যে। তাদের দেয়া বর্ণনায় চাল-চলনে স্মার্ট এ তিন যুবকের মধ্যে একজনের মুখে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি রয়েছে। বাকি দু’জন ক্লিন সেভ করা। হত্যার সময় তারা সবাই জিন্স প্যান্ট ও টি শার্ট পরিহিত ছিল। ১৫ থেকে ২০ সেকেন্ডের মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে দৌড়ে টিএসসির সামনে দিয়ে রোকেয়া হলের দিকে চলে যায়।

ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও জানান, বর্ণনা অনুযায়ী ছবি (স্কেচ) আঁকার পর প্রত্যক্ষদর্শীরা সম্ভাব্য ঘাতকদের চিহ্নিত করেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, এর আগেও প্রত্যক্ষদর্শীদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ঘাতকদের সংখ্যা তিন বলে তারা জানতে পেরেছেন। ওই তিনজনই মূলত অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপায়। তবে এ হত্যাকাণ্ডের সময় আশপাশে ওই চক্রের আরও কয়েকজন অবস্থান করেছিল বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।

ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক অভিজিৎ রায়ের মোবাইল ফোনের আইএমইআই’র সহায়তা নিয়ে ঘটনার রাতে ওই স্থানের একশ’ গজের মধ্যে থাকা ৫৭টি মোবাইল ফোন নম্বর শনাক্ত করেছে এফবিআই। শনাক্ত করার পর ওই মোবাইল ফোনের গ্রাহক কারা সে ব্যাপারে তথ্য পেতে তদন্তকারী সংস্থা গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তা চেয়েছে এফবিআই সদস্যরা।
গোয়েন্দা সংস্থার ওই কর্মকর্তা এই প্রতিবেদককে বলেছেন, মোবাইল ফোনের সূত্র ধরেই মামলার তদন্তে অনেকদূর এগোনো সম্ভব। তবে সন্দেহভাজন মোবাইল শনাক্তের পর সেটি ভুয়া নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলে এক্ষেত্রে কিছুটা বিড়ম্বনায় পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মনিরুল ইসলাম প্রতিবেদককে বলেছেন, অভিজিতের ঘাতকদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই মামলার তদন্তে সাত সদস্যের একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সন্দেহভাজন ঘাতকদের একটি তালিকা করে গ্রেফতার অভিযানও চলছে।

অন্যদিকে শনিবার সকালে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে অবস্থানরত ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগশন (এফবিআই) সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন নিহত অভিজিৎ রায়ের বাবা অধ্যাপক অজয় রায়। সকালে গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল অজয় রায়কে তার বাসা থেকে নিয়ে আসে। প্রায় আধা ঘণ্টা তিনি এফবিআই সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় অভিজিৎ রায় সম্পর্কে বেশ কিছু প্রশ্নেরও জবাব দেন তিনি। পরে বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের সঙ্গেও তিনি কথা বলেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, এফবিআই স্বাধীনভাবে তদন্ত করুক এটাই তার চাওয়া। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যেভাবে পরিকল্পিতভাবে টিএসসি এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে তাতে এক সময় ওই স্থানটি হত্যা চত্বর বলে পরিচিতি পাবে।

প্রসঙ্গত, ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে কুপিয়ে আহত করে দুর্বৃত্তরা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান অভিজিৎ। এ ঘটনায় গুরুতর আহত অভিজিতের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও পরে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে হাসপাতাল থেকেই ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে ৩ মার্চ উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান বন্যা।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের ২ ঘণ্টার মধ্যে আনসার বাংলা-৭ নামে একটি সংগঠন টুইটারে হত্যার দায় স্বীকার করে। পরদিন নিহত অভিজিতের বাবা অধ্যাপক অজয় রায় ২৭ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় তিনি কারও নাম উল্লেখ না করলেও সাংবাদিকদের বলেন, ধর্মীয় উগ্রবাদীরাই অভিজিতকে হত্যা করেছে।

এরই মধ্যে অভিজিৎ হত্যার ঘটনায় সন্দেহভাজন শফিউর রহমান ফারাবীকে গ্রেফতার করে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। ফারাবী এর আগে ২০১৩ সালে ব্লগার রাজীব হত্যাকাণ্ডের পর ফেসবুকে উসকানিমূলক স্ট্যাটাস দিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন। বাংলা বই বিক্রির ওয়েবসাইট ‘রকমারি ডটকম’ থেকে অভিজিৎ রায়ের বই সরাতেও হুমকি দিয়েছিলেন ফারাবী।

হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তদন্তে বাংলাদেশ সরকারে সহযোগিতা করার আগ্রহের কথা জানায়। আগ্রহ প্রকাশের পর ১ মার্চ অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সায় পেয়ে ৫ মার্চ সকালে চার সদস্যের এফবিআই প্রতিনিধি দলটি ঢাকায় আসে।

এবারের একুশে বইমেলায় নিজের বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এসেছিলেন অভিজিৎ-রাফিদা দম্পতি। আমেরিকান নাগরিক অভিজিৎ পেশায় প্রকৌশলী আর তার স্ত্রী বন্যা চিকিৎসক। ধর্মবিষয়ক ও বিজ্ঞানভিত্তিক লেখালেখির কারণে উগ্রবাদীরা অভিজিৎকে বেশ কিছুদিন ধরেই হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল।-যু

You Might Also Like