সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীদের অর্থ-অস্ত্রের জোগান বন্ধ করুন: বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি শেখ হাসিনা

সন্ত্রাসী, উগ্রবাদীদের অর্থ ও অস্ত্র-শস্ত্রের জোগান বন্ধ এবং তাদের প্রতি নৈতিক ও বৈষয়িক সমর্থন না দিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনে বাংলায় দেয়া ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান সময়ের দু’টি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হচ্ছে-জঙ্গিবাদ ও সহিংস চরমপন্থা। এই চ্যালেঞ্জগুলো কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো দেশই আপাতদৃষ্টিতে নিরাপদ নয়। কোনো ব্যক্তি এদের লক্ষ্যের বাইরে নয়। আমেরিকা থেকে ইউরোপ, আফ্রিকা থেকে এশিয়ায়; অগণিত মানুষ সন্ত্রাসবাদের শিকার হচ্ছে। আমরা মনে করি, সন্ত্রাসের কোনো ধর্ম, বর্ণ বা গোত্র নেই। এদের সর্বত্রভাবে সমূলে উৎ​পাটন করার সংকল্পে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”

শেখ হাসিনা বলেন, “এই বিশ্ব উত্তেজনা, ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্ত নয়। বেশ কিছু স্থানে সহিংস সংঘাতের উন্মত্ততা অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে অগণিত মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। যারা সংঘাত থেকে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন, প্রায়ই বিভিন্ন দেশ তাঁদের নিরাপত্তা দিতে অস্বীকার করছে। কখনো কখনো অত্যন্ত জরুরি মানবিক চাহিদা অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। অথবা সেগুলো প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।”

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, “কী অপরাধ ছিল সাগরে ডুবে যাওয়া সিরিয়ার তিন বছরের নিষ্পাপ শিশু আয়লান কুর্দির? কী দোষ করেছিল পাঁচ বছরের শিশু ওমরান? যে আলেপ্পো শহরে নিজ বাড়িতে বসে বিমান হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। একজন মা হিসেবে আমার পক্ষে এসব নিষ্ঠুরতা সহ্য করা কঠিন। বিশ্ব বিবেককে কি এসব ঘটনা নাড়া দেবে না?”

শেখ হাসিনা বলেন, “সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদের মূল কারণগুলো আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। একই সঙ্গে এদের পরামর্শদাতা, মূল পরিকল্পনাকারী, মদদদাতা, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহকারী এবং প্রশিক্ষকদের খুঁজে বের করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ সন্ত্রাসবাদে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিগ্রহণ করেছে।”

রাজধানীর গুলশান হামলার বিষয়টি তুলে শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় ভয়ঙ্কর ঘটনা বাংলাদেশের জনগণের মনে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে আমরা এই নতুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি।”

সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকারের পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রভাবিত হয়ে কিছু আঞ্চলিক জঙ্গি সৃষ্টি হচ্ছে, বাংলাদেশ এসব জঙ্গি দমনে সফল হয়েছে। দেশীয় জঙ্গিদের ওই হামলার পর জনগণকে সচেতন করতে সরকারের গৃহীত কর্মসূচি এবং তাতে মানুষের সাড়া পেয়েছি। আমি আশাবাদী বাংলাদেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসীরা সমূলে উৎখাত হবে।”

তিনি বলেন, “কয়েকটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় কিছু প্রান্তিক গোষ্ঠী তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পুরো সংগঠনের মাধ্যমে নতুনরূপে আবির্ভূত হয়ে থাকতে পারে। আমি সন্ত্রাসী ও উগ্রবাদীদের অর্থ ও অস্ত্রশস্ত্রের জোগান বন্ধ এবং তাদের প্রতি নৈতিক ও বৈষয়িক সমর্থন না দেয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে আহ্বান জানাচ্ছি।”

‘বাংলাদেশ শান্তির পক্ষে‘ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “ঢাকায় ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কেন্দ্র’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত সহিংসতার কবল থেকে বেরিয়ে আসা দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ করে দিবে। মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া পুনরায় চালু ও ভ্রাতৃপ্রতিম ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি বৈরিতা নিরসনে সাম্প্রতিক প্রচেষ্টাগুলোকে সঠিক দিকে পরিচালিত করতেও সবাইকে ভাবতে হবে।”

জাতিসংঘে অভিবাসী ও শরণার্থী বিষয়ক সম্মেলনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি আশা করি- এই সম্মেলনের ফলাফল বর্তমান সময়ে অভিবাসনের ধারণা ও বাস্তবতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে সাহায্য করবে। অভিবাসী ও শরণার্থীদের স্বদেশ ও গন্তব্য উভয় স্থানের জন্যই সম্ভাবনাময় পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।”

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য স্থানীয় অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা বিগত কয়েক দশকের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি।”

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনে দেয়া প্রায় ১৯ মিনিটের ওই ভাষণে জলবায়ু, বিশ্ব মানবতার বির্পযয়ের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

You Might Also Like