সন্তান হত্যার দায় স্বীকার করলেন বাবা!

মাত্র ২৫দিন বয়সী শিশু সন্তানকে হাসপাতালের সাত তলা থেকে ছুড়ে ফেলে নির্মমভাবে হত্যা করেছে এক পাষন্ড পিতা। ঘটনাটি ঘটেছে সোমবার ভোরে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

আটকের পর শিশুটির বাবা ফজলুল হক পুলিশকে বলেছে ‘স্যার আমিই হত্যা করছি আমার বাচ্চারে। ভাবছিলাম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতে ও এমনিতেই মারা যাবে। কিন্তু মরলো না। বরং ডাক্তারদের সেবায় অলৌকিকভাবে বেঁচে উঠলো সে। আর তাই ছুটিতে যাবার আগেই পরিকল্পনা করি বাচ্চাটাকে মেরে ফেলার।’

নিজের শিশু সন্তান আবদুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ফজলুল হক পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আরো জনায়, সে মানিকগঞ্জের দৌলতপুর থানার ইসলামপুর গ্রামের মৃত চান মিয়ার ছেলে। সোমবার ভোরে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাততলার একটি কেবিন থেকে ছুড়ে ফেলে নিজেই হত্যা করে তার শিশু সন্তান আবদুল্লাহকে।

এর আগে মৃতপ্রায় শিশুটিকে চিকিৎসার জন্যে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর্যায়েই নিজ জন্মদাতার হাতেই খুন হতে হলো নিস্পাপ শিশুটিকে। হাসপাতালে পঁচিশ দিন বয়সী শিশুটি হত্যাকাণ্ডে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে চাঞ্চল্য।

এ ঘটনার পর ফজলুল হক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে তার ফুফু শাশুড়ি জবেদা খাতুনদের দিকে সন্দেহের আঙুল তোলেন। তবে ফজলুল হকের অসংলগ্ন কথা-বার্তায় হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মীরা ফজলুল হক ও জবেদা খাতুন দু’জনকেই আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দু’জনই খুনের ঘটনায় নিজেদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি এড়িয়ে গেলে দ্বন্ধে পড়ে যায় পুলিশ।

পুলিশের সামনে প্রশ্ন আসে, তাহলে কে খুনি? কেবিনে থাকা অবশিষ্ট ব্যক্তিটি শিশুটির মা নুরুন্নাহার। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়েও বিপাকে পড়ে পুলিশ। কারণ শোকাহত এই মা জন্ম থেকেই বাকপ্রতিবন্ধী। দু’জনকেই সামনে নিয়ে চলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ। ক্রমেই বেরিয়ে আসতে থাকে হত্যাকাণ্ডের রহস্য। রাতেই পুলিশ নিশ্চিত হয় খুনি আর কেউ নয়, স্বয়ং শিশুটির বাবা। তারপরও মুখ খুলছিলেন না গাড়িচালক ফজলুল হক। শেষে পুলিশের জেরা আর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে দায় স্বীকার করেন সে। বলে, ‘আমিই খুনি। আমিই ওরে ছুইড়া ফ্যালাইয়া মারছি।’

মাত্র তিন বছর আগে ফজলুল হকের সঙ্গে বিয়ে হয় সাভারের জামসিং মহল্লার নুরুল ইসলামের মেয়ে নুরুন্নাহারের (২৫)। মেয়ে বাকপ্রতিবন্ধী বলে শ্বশুর ১৮ লাখ টাকা দিয়ে ফজলুকে একটি গাড়ি কিনে দেন। ফজলুল হক থাকতো শ্বশুরবাড়িতে। আল আমীন নামে তার এক বছরের আরেকটি সন্তান রয়েছে।

সাভারের একটি হাসপাতালে সন্তান প্রসব করার পর মাত্র চারদিনের মাথায় গুরুতর রোগে আক্রান্ত হয় শিশু আবদুল্লাহ। রক্তে জীবাণু সংক্রমণ ও মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুটিকে গত ৬ জুলাই উন্নত চিকিৎসার জন্যে ভর্তি করা হয় এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেই শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শাহীন আক্তারের তত্ত্বাবধানে শিশুটিকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালের নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে। আর নবজাতকের মাকে রাখা হয় ৭১৬ নম্বর কেবিনে। সুস্থ হওয়ার পর শিশুটির নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ।

গত রোববারই হাসপাতাল ত্যাগের ছাড়পত্র দেওয়া হয় তাদের। তবে চিকিৎসা ব্যয় যোগাড় হয়নি অজুহাত তুলে অতিরিক্ত আরও একদিন হাসপাতালে অবস্থান করেন ফজলু। আর সেই রাতেই শিশুটিকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে সে।

ফজলু পুলিশকে জানায়, ‘কেবিনে বাচ্চাডার লগে ছিলো আমার বউ নুরুন্নাহার (২৫) তার ফুফু জবেদা খাতুন (৫০) ও আমি। রাত দুইডায় বাচ্চাডারে মায়ের বুকের দুধ খাওনের পর সবাই ঘুমায়া গেলেও আমি ঘুমাই নাই। ভোরে ফজরের আজান দেওনের পর পরই বাচ্চাডারে মায়ের বুক থাইক্যা তুইল্যা জানালার দিয়ে বাইরে ছুইড়া ফালাইয়্যা দেই। তারপর ঘুমের ভান ধরি। হঠাৎ কইরা আমার ফুফু শাশুড়ি আমারে জাগাইয়া কয় বাচ্চা পাওন যাইতেছে না। তখন শুরু করি খোঁজাখুজি। আর আমারে যাতে কেউ সন্দেহ না করে তাই আমি দায় চাপাই ফুপু শাশুড়ির ওপর।’

ফজলুর জবানে এ বক্তব্য শোনার পর খবর দেওয়া হয় ফজলুর শ্বশুর নুরুল ইসলামকে। তার হাতে নিরপরাধ জবেদা খাতুনকে তুলে দিয়ে সবিস্তারে শিশু খুনের আদ্যপান্ত জানানো হয়। এ কথা শুনে রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে পড়েন তিনি। পরে নিজে বাদী হয়ে মেয়ের জামাইয়ের বিরুদ্ধেই দায়ের করেন হত্যা মামলা। হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে বিধির ৩০২ ও ২১১ ধারায় সাভার মডেল থানায় দায়ের করা হয় একটি হত্যা মামলা।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, নিজের সন্তান হত্যার দায় স্বীকার করায় আমরা ফজলুকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছি। কিন্তু বাবা হয়েই বা কেন নিজের সন্তানকে হত্যা করবে সেটা জানার চেষ্টা করছি।

You Might Also Like