শেষ বাতিঘর

ভাষা আন্দোলন থেকে এমন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন নেই, যাতে আনিসুজ্জামান অবদান রাখেননি। মুক্তিযুদ্ধেও তিনি শক্তি ও সমর্থন জুগিয়েছেন। শত্রু-মিত্র সবাই তাঁকে ভালোবাসতেন

পঞ্চাশের শেষ বাতি নিভে গেল। ড. আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে আমি হারালাম ব্যক্তিগত বন্ধু আর জাতি হারাল তাদের একজন শ্রেষ্ঠ অভিভাবককে। পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃসময়ে আমরা বাস করছি। ২০২০ শুধু একটি সাল নয়, একটি ঘাতক সাল। তার ডানায় বসে শুধু করোনাই আসেনি, এসেছে এক মৃত্যুদূত, যে একে একে আমাদের বরেণ্য পুরুষ ও মনীষীদের হরণ করছে। প্রথমে গেলেন ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। তারপর গেলেন জামিলুর রেজা চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার চলে গেলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। জাতিকে পথ দেখাবে, তাদের মনে আশা জাগাবে এমন বিবেক একে একে চলে গেলেন। করোনার এই মৃত্যুভয়ের মধ্যেও ড. আনিসুজ্জামানের মৃত্যুশোক আরো বেশি করে আপামর মানুষের মনে আঘাত করবে।

বয়সে আনিসুজ্জামান আমার কিছু ছোট; কিন্তু তাঁর সঙ্গে পরিচয় সেই কলেজজীবন থেকে। তিনি ছাত্র ছিলেন জগন্নাথ কলেজের, আমি ঢাকা কলেজের। কিন্তু প্রগতিশীল সংস্কৃতির অঙ্গনে আমরা পরিচিত হই এবং কিছুদিনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে যাই। তাঁর সঙ্গে আমার মতান্তর ছিল; কিন্তু মনান্তর ছিল না। তাঁর সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। তা এই মুহূর্তে লেখা যাবে না। শোকের এই গভীর আঘাত চলে গেলে হয়তো লিখতে পারব। আনিসুজ্জামান এবং আমি ছিলাম একই মতাদর্শে দীক্ষিত। হয়তো একটু হেরফের ছিল, তা গণনার নয়। ভাষা আন্দোলন থেকে এমন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন নেই, যাতে আনিসুজ্জামান অবদান রাখেননি। রবীন্দ্রসংগীত বর্জন ও বাংলা হরফ বদলের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়, আনিসুজ্জামান তার পুরোভাগে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধেও তিনি শক্তি ও সমর্থন জুগিয়েছেন। বাংলা একাডেমির সভাপতি থাকাকালে এই প্রতিষ্ঠানে নতুন প্রাণ সঞ্চার হয়। বাহাত্তরের সংবিধানের প্রথম খণ্ড তাঁর হাতের লেখা দ্বারা তৈরি হয়। তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত প্রিয় শিক্ষক। স্বাধীনতার পর যখন বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী নিধনের ফলে এক প্রকার মনীষাহারা ছিল তখন তিনি তা পূরণ করেন। সেই স্থানটি আবার শূন্য হলো। কবে কে তা আবার পূর্ণ করতে পারবেন, তা জানি না।

ড. আনিসুজ্জামান ছিলেন অজাতশত্রু। তাঁর চরিত্রে এমনই একটি গুণ ছিল যে শত্রু-মিত্র সবাই তাঁকে ভালোবাসতেন। সবার কাছেই তিনি ছিলেন গ্রহণযোগ্য। তিনি শুধু পণ্ডিত ছিলেন না, ছিলেন একজন নিপুণ কথাশিল্পী। অনেকের হয়তো জানা নেই, তিনি কলেজজীবনে গল্প লিখেছেন। গবেষণা সাহিত্যেও তাঁর ছিল অগাধ জ্ঞান। তাঁর লেখা বইগুলো শুধু পাঠ্য বই হিসেবেই নয়, এটি আমাদের মনন সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দলিল। তিনি চলে গেলেন জাতি তার বিবেক ও একজন শ্রেষ্ঠ অভিভাবক হারাল। ব্যক্তিগত শোক কাটিয়ে উঠে তাঁকে আরো বড় করে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাব।

লন্ডন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২০