শিক্ষার্থীদেরকে জ্ঞান অর্জনের নিশ্চয়তা দিন

রাজু আহমেদ :একটি দেশের ভবিষ্যত নির্ভর করে সে দেশের শিক্ষার্থীদের ওপর। শিক্ষা জীবনে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে যত বেশি যোগ্য ও দক্ষ করে গড়ে তোলা যাবে, জাতি ও রাষ্ট্র গঠনে তারা ততোটাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। সেজন্যই উন্নত বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় অন্যান্য খাতের মধ্যে তারা শিক্ষা খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। তারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, শিক্ষায় অগ্রগতি করতে না পারলে কোন ভাবেই বর্তমান প্রতিযোগীতামূলক বিশ্বে টিকে থাকা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদেরকে তারা রাষ্ট্রের পুঁজি বলে মনে করে। সীমাহীন ত্যাগ করে হলেও তারা শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা করে। শিক্ষার্থীদেরকে মেধা-মননে যোগ্য করে গড়ে তুলতে তারা চেষ্টায় কোন ত্রুটি রাখে না। সর্বোপরি, শিক্ষাকে তারা সকল স্বার্থের উর্ধ্বে স্থান দেয়। তাইতো উন্নত বিশ্বের কোথাও কখনো শিক্ষার্থীদেরকে তাদের স্বার্থ আদায়ের জন্য ক্লাসরুম ছেড়ে রাস্তায় নামতে দেখা যায়না। এমনকি রাষ্ট্রে সরকারসহ অন্যসব কিছুর ভেতর বিশাল পরিবর্তন হয়ে গেলেও তার সামান্যতম আছড় তারা শিক্ষার্থীদেরকে অনূভব করতে দেয় না। তাদের মতে, শিক্ষাজীবনের প্রধান দায়িত্বই হল জ্ঞানার্জন করা। মানবজীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সময় যেন কোনভাবেই হেলায়-ফেলায় নষ্ট না হয় সেজন্য তারা সর্বদা সচেতন থাকে। পরিবার কর্তৃক সন্তানকে শিক্ষিত করার সামর্থ্য না থাকলেও সে সন্তানকে যথোপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য রাষ্ট্র সকল ব্যয়ভার বহন করে। সে সকল দেশের শিক্ষা কাঠামোকেও এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে কাউকে উচ্চশিক্ষা গ্রহন শেষে বেকার বসে থাকতে না হয়। রাজনৈতিক স্বার্থে শিক্ষার্থীদেরকে ব্যবহার করার প্রশ্ন তো তাদের কাছে আসেই না। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরস্পর বিবাদ দেখা দিলে তারা ঐক্যবদ্ধভাবেই শিক্ষার্থীদেরকে তা থেকে দূরে রাখে। আমরা কথায় কথায় বলি, শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড অথচ মেরুদন্ডকে সোজা রাখতে যেটুকু দায়িত্ব পালন করা দরকার তা আমাদের দেশে অনুপস্থিত থাকলেও উন্নত বিশ্বের কোন রাষ্ট্রেই তা অনুপস্থিত নয়। কাজেই সে সকল দেশের মানুষ যখন বলে, শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড তখন তাদের সে কথার সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আর আমরা যখন তাদের মত করে বলি, তখন আমাদের মূখের কথা মূখেই শোভা পায় কিন্তু বাস্তবতার সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা আমাদের ব্যক্তি স্বার্থের কাছে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও জিম্মি করে রাখি অথচ উন্নত জাতিসমূহ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও অজস্র ত্যাগ স্বীকার করে তাদের শিক্ষার্থীদের সামনে জ্ঞানের রাজ্য উম্মুক্ত করে দেয়। আমাদের দেশের শিক্ষকরা যখন তাদের আয় দিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করে ন্যূণতম সম্মান নিয়েও সমাজে বাস করতে পারে না তখন অন্যান্য দেশের শিক্ষকরা সমাজের সবচেয়ে সম্মানীত আসনে সমাসীন হয়। সুযোগ পেলেই বাক্যবাণে আমরা আমাদের ভবিষ্যত উন্নতির স্বপ্ন ফেরি করে দেশকে হাজার বছর এগিয়ে দেই অথচ যাদেরকে পুঁজি করে স্বপ্ন দেখি সেই তাদেরকে কতটুকু নির্ভরতা দিতে পেরেছি?

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে কখনোই পূর্ণভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসেনি। ব্যক্তিগত, দলীয় এবং রাজনৈতিক স্বার্থে দেশের নানা ধরণের ক্ষতি সাধিত হচ্ছেই। বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে ভয়াবহ ও দুর্বিষহ সময় চলছে। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এত দীর্ঘসময় টানা অবরোধ ও সাপ্তাহিক ছুটির দিন ব্যতিরেকে হরতালের স্বাক্ষী অতীতে কোন প্রজন্মকেই হতে হয়নি। দিন যত বাড়ছে সমস্যাও বোধ হয় তত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ক্ষমতার মোহে রাজনৈতিক দলগুলো সকল স্বার্থ ত্যাগ করে শুধু নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কথা ভাবছে। নমনীয়তা তো দূরের কথা বরং হাতের নাগালে পেলে পরস্পর বিরোধীপক্ষকে যেন ছিড়ে খাওয়ার অবস্থা। রাজনৈতিক আন্দোলনের নামে জীবনহানী ও সম্পদ ধ্বংসের মিছিল কেবল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। একের পর এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়ে গুটিয়ে নিচ্ছে। আশঙ্কাজনভাবেই কমে যাচ্ছে বিদেশী বিনিয়োগ। এত কিছুর পরেও এ জাতির দমে যাওয়ার কথা নয় কেননা এদেশের সম্পদ-সম্বল স্বরূপ রয়েছে প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থী। জনসংখ্যায় বাংলাদেশের কাছাকাছি বিশ্বের এমন কোন দেশ নাই যারা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে যে, তাদের এত অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী রয়েছে। যারা ভবিষ্যতে যে কোন ধরণের প্রতিকূলতার উপরে দাড়িয়েও বিপ্লব আনয়ণের ক্ষমতা রাখে। বাংলাদেশের মত তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়শীল রাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহনরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় অর্ধ কোটি। এমন সম্পদ থাকায় এ জাতির ভাগ্য বদলানো তো সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে রাষ্ট্র যে পন্থায় শিক্ষার্থীদেরকে পরিচালিত করছে তাতে শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রের উন্নয়ণের বাহন হবে নাকি বোঝা হবে-তার সঠিক জবাব কার কাছে আছে? সরকার এবং বিরোধীপক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে দেশের শিক্ষার্থীদের জীবন শুধু থমকে দাঁড়ায়নি বরং তা ধীরে ধীরে পিছু হটতে শুরু করেছে। রাষ্ট্র ইচ্ছা করলে সম্পদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবে কিন্তু সময় চলে গেলে বুক ফাটিয়ে কাঁদলেও শিক্ষার এবং শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে যে সম্পদ নষ্ট হয়েছে তার ক্ষত কাটিয়ে উঠতে যদি ১০ বছর লাগে তবে এই সময়ে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে আগামী ১০০ বছর লাগবে না! শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে তা কোন দিনই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। প্রত্যহ হরতালের মধ্যেও বাজারে মাছ, ডিম, গোস্ত, তরিতরকারী পাওয়া যাবে কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে তা কখনো, কোথাও পাওয়া যাবে না।

বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৫২ দিন সাপ্তাহিক ছুটি এবং ৮৫ দিন সরকার ছুটি থাকে। শিক্ষা বর্ষের বাকী ২২৮ দিন শিক্ষা অর্জনের সুযোগ যদি শিক্ষার্থীরা নির্ভাবনায় পেত তবে এ জাতির অগ্রগতি রোধ করার সাধ্য ছিল কার? অগ্রগতি তো পরের কথা এখন অবনতি রোধ করাও যে কষ্ট সাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন থেকে তত বেশি সময় চুরি হয়ে যাচ্ছে। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক কারণে এবং সরকারী ছুটি মিলিয়ে একটি শিক্ষা বর্ষের ২০৮ দিন শিক্ষার্থীরা শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পায়নি। বাকী যে দিনগুলো অবশিষ্ট ছিল তাতে সিলেবাসের এক-তৃতীয়াংশও শেষ করা সম্ভব ছিল না। দৈব ক্রমে হয়ত শিক্ষার্থীরা পূর্বের চেয়েও ভালো রেজাল্ট পেয়ে যায় কিন্তু শিক্ষার মানে যে কতটা অধঃপতন হয় তা কি সঠিকভাবে ভাবা হয়? ২০১৫ সাল সম্ভবত শিক্ষার্থীদের জন্য সুনামি হয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। বছরের প্রথম দিনটাই হরতাল দিয়ে শুরু হয়ে এখন তো লাগাতার রাজনৈতিক কর্মসূচী চলছে। অবরোধের সাথে হরতাল এবং হরতালের সাথে অবরোধ যোগ হয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন প্রায় শিঁকেয় উঠেছে। ক্ষমতাশীনরা বলছে দেশ স্বাভাবিকভাবে চলছে এবং বিরোধীরা বলছে, আগে গণতান্ত্রিক অধিকার পরে পরীক্ষা-এমন অবস্থায় বছরের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন ভেস্তে যাওয়ার অবস্থায়। দেশের সর্ব-বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা (এসএসসি/সমমান) শুরু হয়েছে ঠিকই কিন্তু কবে শেষ হবে তা যেমন কর্তৃপক্ষও জানেনা তেমনি শিক্ষার্থীদের তো জানার প্রশ্নই আসে না। দুর্বিষহ মানসিক চাপে শিক্ষার্থীরা ভেঙ্গে পড়তে শুরু করেছে। এপ্রিলে এইচএসসি পরীক্ষা  শুরু হওয়ার কথা রয়েছে কিন্তু তার নিশ্চয়তা কতটুকু তাও সময় বলবে। পাবলিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বর্ষের বার্ষিক পরীক্ষা থমকে দাঁড়িয়েছে। কবে শুরু হবে তারও যেমন নিশ্চয়তা নেই তেমনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতও অনিশ্চয়তায় আটকে পড়েছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্তি আলিয়া মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শ্রেণীর (কামিল) পরীক্ষার পূর্ব ঘোষিত তারিখ এখন পর‌্যন্ত ৫ বার স্থগিত করা হয়েছে। এভাবে কি শিক্ষাজীবন চলে? এসএসির ১৫ লাখ, এইচএসসির ১২ লাখ কিংবা পাবলিক ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালেয়ের অর্ধ কোটি শিক্ষার্থীর জীবন নিয়ে এমন ধ্বংসাত্মক খেলার অধিকার রাষ্ট্রের নাই, থাকতে পারে না। এই মূহুর্তে যদি রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা আসে তবুও শিক্ষার্থীদের পূর্ব নির্ধারিত শিক্ষা জীবনের সাথে আরও ৬-৮ মাস বেশি যোগ করতে হবে কেননা ইতোপূর্বে এই পরিমানই ক্ষতি হয়েছে। ধনী কিংবা বিত্তশালীদের কথা বাদ দিলাম কিন্তু গরীব পিতা কিভাবে তার সন্তানের জন্য কয়েক মাসের বাড়তি ব্যয় বহন করবে? তবে রাজনৈতিক দলগুলোর বর্তমানে যে অবস্থান, তাতে শুধু ৬-৮ মাস নয় বরং আরো কত অধিক সময় যোগ করতে হয় তা কে জানে? রাষ্ট্রের পূঁজিতুল্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার পরিণতি রাষ্ট্রের জন্য শুভ বার্তা বহন করবে বলে জ্ঞানীগুনীর কেউ বলে না।

শুধু উচ্চশিক্ষারত ৫০ লাখ শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষাগ্রহন ব্যাহত হওয়ায় প্রতিদিন তারা ৫০ লাখ দিন পিছিয়ে পড়ছে! হিসাবটা অবাক শোনালেও এটাই ধ্রুব সত্য। আমরা বিপুল পরিমান শিক্ষার্থীদেরকে কেন্দ্র করে এদেশেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি। আমাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন হতে দিন। রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে শিক্ষার্থীদেরকে জিম্মি করবেন না। শিক্ষার্থীরা মেধা-মননে বাড়তে না পারলে হয়ত আপনাদেরকে খুব বেশি খেসারত দিতে হবে না কিন্তু আপনাদের পরবর্তী প্রজন্ম থেকে যারা রাজনীতিতে আসবে তাদের মরন দশা হবে। যে প্রজন্ম দেশের সম্পদ হওয়ার কথা ছিল তারা যদি দেশের বোঝা হয় তবে সে বোঝার ভার বহন করার সামর্থ্য ছোট্ট বাংলাদেশের থাকবে না। তখন এ দেশ ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবে। যদি দাবী করেন, আপনারা এ দেশের কল্যানেই রাজনীতির চর্চা করেন তবে সব ভেদাভেদ ভূলে দেশের উন্নয়ণে সামিল হউন। বছরের প্রথম দিনে যেমন শিক্ষার্থীদের হাতে কোটি কোটি নতুন বই তুলে মনে স্বপ্ন এঁকে দেন তেমনি সেই স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটাতেও সাহায্য করুণ। তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম আপনাদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে এবং আপনাদের প্রতি সম্মানে বিনয়াবনত হবে। আর যদি এমন থাকেন (বর্তমানে যেভাবে চলছে) তবে প্রজন্মের ঘৃণা আপনাদের অস্তমিত করে দিবে। মিনতির সুরেই বলছি, শিক্ষার্থীদের সর্বনাশের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভবিষ্যত অন্ধকারে নিমজ্জিত করতে দিয়েন না। জাতির মেরুদন্ডকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করুণ ।

কলামিষ্ট ।

facebook.com/raju69mathbaria/

 

You Might Also Like