হোম » শহীদ কাদরীর শেষ সাক্ষৎ​কার

শহীদ কাদরীর শেষ সাক্ষৎ​কার

admin- Thursday, September 1st, 2016

শহীদ কাদরীর শেষ সাক্ষৎ​কার নিয়েছেন:
কাজী জহিরুল ইসলাম
(শহীদ কাদরী বাংলাদেশের প্রধান কবিদের একজন। ২৮ আগস্ট মারা যাওয়া​র আগে এটিই তাঁর শেষ সাক্ষাৎ​কার।)
কাজী জহিরুল ইসলাম: আপনার ‘বৃষ্টি বৃষ্টি’
কবিতা প্রসঙ্গ নিয়ে আবদুল মান্নান
সৈয়দের অভিমত, ‘বাংলা কবিতায় বৃষ্টি
নিয়ে তিন ধারার কবিতা রচিত হয়েছে।
একটি ধারার জন্ম দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুর, অধিকাংশ কবি এ ধারাতেই লেখেন।
দ্বিতীয় ধারার জন্ম দেন অমিয় চক্রবর্তী
আর তৃতীয় ধারাটির প্রবর্তন করেন শহীদ
কাদরী।’ কী বলবেন এ বিষয়ে?
শহীদ কাদরী: কী আর বলব, বলো। এক
ঝড়ঝঞ্ঝার দিনে বাসায় আটকা পড়লাম।
বাইরে বের হওয়ার কোনো উপায় নেয়। তখন
কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে শুরু করি। এক
টানেই লিখে ফেলি কবিতাটি। পরে আল
মাহমুদ এসে হাজির। বলে, দোস্ত, সমকাল-
এর জন্য কবিতা দাও। আমি বলি, কবিতা
তো নাই, একটা খসড়া আছে, দেখো। আল
মাহমুদ কবিতাটি পড়লেন। তারপর বললেন,
এটাই চলবে। বলেই খাতা থেকে ছিঁড়ে
নিয়ে গেলেন পৃষ্ঠাটি। আমার কাছে
কোনো কপিও রাখিনি।
জহির: শামসুর রাহমানও তো আপনার বন্ধু
ছিলেন। কবিতা নিয়ে অনেক আলোচনা
হতো আপনাদের মধ্যে। এই কবিতা নিয়ে
তিনি কিছু বলেননি?
শহীদ: ছাপা হওয়ার আগে তো কবিতাটি
তিনি দেখেননি। ছাপার পরে একদিন বলেন,
বাংলা ভাষায় এভাবে বৃষ্টির কবিতা আর
কেউ লেখেনি।
জহির: ৩১ বছর পর ২০০৯ সালে ‘আমার
চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ শিরোনামে
চতুর্থ কবিতার বই বের হলো আপনার। বইটি
বের করতে এত দীর্ঘ সময় নিলেন কেন?
শহীদ: আমার বই বের করার কোনো ইচ্ছেই
ছিল না। জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত জোর করল।
আমি বলি, আমার কাছে তো কোনো
কবিতা নেই, বই হবে কী দিয়ে? তখন
তোমার ভাবি একটি থলে নিয়ে এল।
খুঁজেটুজে ওর মধ্যে কিছু কবিতা পাওয়া
গেল। এভাবেই চতুর্থ বইটা হয়ে গেল।
জ্যোতির জন্যই বইটা হয়েছে। ও জোর না
করলে হতো না।
জহির: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের প্রতিটি
কবিতার নিচে রচনার তারিখ ও স্থানের
নাম লিখে রেখেছেন, পরবর্তী সময়ে
অনেকেই এটা করেছেন, কিন্তু আপনার
কোনো কবিতায় রচনাকাল বা রচনার স্থান
পাওয়া যায় না। এটা কি সচেতনভাবেই
এড়িয়ে গেছেন?
শহীদ: আমি যে কবিতার বই বের করব, এমন
কোনো ইচ্ছে আমার ছিল না। এ জন্যই
তারিখ-টারিখ আর দিইনি। প্রথম বইটা
শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদ জোর করে
বের করে দিল। ওদের চাপেই ওটা
করেছিলাম। দ্বিতীয় বইটাও বন্ধুবান্ধবেরা
জোর করে প্রকাশ করে দেয়। তৃতীয় বই করার
ইচ্ছে আমার মধ্যে তৈরি হয়েছিল অবশ্য।
তখন ভেবেছিলাম, দেশ ছেড়ে তো চলেই
যাচ্ছি, যাওয়ার আগে কবিতাগুলোকে
একসাথে করে একটা বই রেখে যাই। মনটা খুব
খারাপ ছিল। সেই সময় ঢাকা ছেড়ে
চট্টগ্রাম চলে গেলেই তুমি শেষ। কেউ আর
তোমার কথা মনে রাখবে না। কত কবি
কর্মসূত্রে ঢাকার বাইরে যাওয়ার কারণে
হারিয়ে গেছে তখন! খুব খারাপ একটা সময়
যাচ্ছিল ঢাকার সাহিত্যাঙ্গনে। কেবল
কাদা ছোড়াছুড়ি চলত। দুজন মানুষ শুধু
আমাকে বলেছিল, আমি যেন দেশ ছেড়ে না
যাই-একজন রফিক আজাদ আর অন্যজন
মাহমুদুল হক বটু। এরা অনুরোধ করেছিল,
যেয়ো না। চলে গেলেই হারিয়ে যাবে।
জহির: আপনার দ্বিতীয় বইয়ের শিরোনাম
কবিতা ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’।
এর অংশবিশেষ সুর করে গেয়েছেন সুমন
চট্টোপাধ্যায়, মানে কবীর সুমন। কবিতাটি
গীত হওয়ার আগে আপনি কি বিষয়টি
জানতেন?
শহীদ: হ্যাঁ, জানতাম। তখন আমি বোস্টনে
থাকি। সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায় ছিলেন
বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা
বিভাগের অধ্যাপক। একদিন টেলিফোন করে
বললেন, সুমন এই কবিতাটিকে সুর করে
গাইতে চান। এভাবেই গানটি হয়।
তুমি কবি, তুমি বুঝবে। ইট ইজ পোয়েট টু
পোয়েট। তুমি কথাটা কাউকে বোলো না।
আমি মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছি।
জহির: মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা আপনার
একটি অসাধারণ কবিতা ‘সঙ্গতি’। এই
কবিতার ‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার
সাথে ঠিকই/ কিন্তু শান্তি পাবে না,
পাবে না, পাবে না…’-মানুষের মুখে মুখে
ফেরে। এ কবিতার বিপুল জনপ্রিয়তার
পেছনে ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্তের দ্যোতনা
কিছুটা কি কাজ করেছে?
শহীদ: জনপ্রিয়তা নিয়ে আমি কখনোই
ভাবিনি। জনপ্রিয়তা একটা ফালতু বিষয়।
না, আমি মনে করি না মাত্রাবৃত্তের
কারণে পাঠক এটা পছন্দ করে। বাংলা
ভাষায় ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্তের কবিতা
ভূরি ভূরি আছে। শামসুর রাহমানেরও অনেক
আছে। শোনো, এই জনপ্রিয়তার কোনো দাম
নেই, বুঝলে। একসময় তো শহীদ কাদরীর কথা
উঠলে লোকেরা ‘তোমাকে অভিবাদন
প্রিয়তমা’ শুনিয়ে দিত। জনপ্রিয়তা একটা
মিস্ট্রি। কখন যে কী জনপ্রিয় হয়ে যায়,
বলা মুশকিল।
জহির: আপনার কবিতায় সামরিক অনুষঙ্গ
এসেছে প্রচুর ‘গ্রেনেড’, ‘ট্যাঙ্ক’ ‘গোলন্দাজ’
‘সাব-মেরিন’, ‘সাঁজোয়া বাহিনী’,
‘সাইরেন’, ‘বেয়োনেট’, ‘ক্যাপ্টেন’-এই
শব্দগুলো কেবল একটি কবিতা
‘স্কিৎসোফ্রেনিয়া’-তেই এসেছে। এ ধরনের
প্রচুর শব্দ আছে আপনার কবিতাজুড়ে।
কোনো সামরিক সখ্য বা বৈরিতা থেকে
কি?
শহীদ: আমার এক কাজিন ছিলেন
পাকিস্তান আর্মিতে, ডা. শাহানু। শাহানু
ভাইকে একাত্তরে পাকিস্তানিরা গুলি
করে মেরে ফেলে। এটা একটা কারণ হতে
পারে। আর মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি তো সব সময়
মাথায় ছিলই।
জহির: আপনার কবিতায় বারবারই যে ফুলের
কথা এসেছে, সেটি চন্দ্রমল্লিকা।
শহীদ: আমার মা চন্দ্রমল্লিকা ফুল খুব
ভালোবাসতেন। মায়ের ভালোবাসাই
আমাকে প্রভাবিত করেছে। আমার কবিতায়
অন্য ফুলের নামও এসেছে। তবে এ কথা ঠিক
যে চন্দ্রমল্লিকা বেশি এসেছে।
চন্দ্রমল্লিকাই আমার সবচেয়ে প্রিয় ফুল।
আর সচেতনভাবেই আমি গোলাপকে এড়িয়ে
গেছি। সাহিত্যে গোলাপের অতি
ব্যবহারের কারণেই ফুলটির প্রতি আগ্রহ
হারিয়ে ফেলেছি।
জহির: আটত্রিশ বছর বিদেশ-বিভুঁইয়ে
কাটাচ্ছেন। একদা ‘কোনো নির্বাসনই
কাম্য নয়’ কবিতাটিতে লিখেছিলেন,
‘কোনো নির্বাসনই কাম্য নয় আর/ ব্যক্তিগত
গ্রাম থেকে অনাত্মীয় শহরে/ পুকুরের যৌথ
স্নান থেকে নিঃসঙ্গ বাথরুমে’…‘জীবনের
ওপারে কোনো অন্তহীন কফিনে/ এই যে
নির্বাসন/ আমার কাম্য নয় আর,/ কোনো
নির্বাসনই কাম্য নয়’। শুধু দেশান্তরি হওয়া
নয়, প্রিয় পরিবেশ ছেড়ে যাওয়া সকল
অবস্থানই নির্বাসন, এমনকি মৃত্যুও। এখানে
মাইগ্রেশনকে হয়তো আপনি
নেতিবাচকভাবে দেখেছেন…।
শহীদ: তোমাক একটা কথা বলি।
নেতিবাচকতাই সহজাত। এই যে প্রকৃতি-
প্রকৃতিও নেতিবাচক। ইতিবাচক আসলে
কিছুই না। আমরা এই পৃথিবীকে আমার বলে
আঁকড়ে ধরতে চাই কিন্তু প্রকৃতি ঝড়,
জলোচ্ছ্বাস, সুনামি দিয়ে আমাদের ধ্বংস
করে দেয়। প্রকৃতি কখনোই বলে না তুমি
আমার। চেনা পরিবেশ ছেড়ে অন্য কোথাও
অবস্থানের নামই নির্বাসন। বিষয়টাই তো
নেতিবাচক। সর্বশেষ নির্বাসন হলো
কফিন। এক অনন্ত অচেনা পরিবেশ। ভিন্ন
পরিবেশ কখনোই আপন হয় না। তোমাকে
একটা গল্প বলি। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
লন্ডনে গেলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের
শাখা খুলতে। ওখানকার বাঙালিরা তাঁকে
বলল, আমরা বাংলা বইয়ের বিশ্বসাহিত্য
কেন্দ্র কেন করব? আমরা তো ব্রিটিশ।
সায়ীদ তখন ওদের জিজ্ঞেস করলেন,
আপনারা ব্রিটিশ? ব্রিটিশরা কি মনে
করে যে আপনারা ব্রিটিশ?
জহির: ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’
কবিতাবইয়ের প্রথম কবিতা ‘স্বতন্ত্র
শতকের দিকে’-এর জন্মের পেছনে নাকি
মজার এক গল্প আছে। গল্পটি বলা যাবে?
শহীদ: বাংলা ১৪০০ সালে নিউইয়র্কের
কবিরা একটি সংকলন বের করবেন। ওটার
নামও দিয়েছে তাঁরা ‘১৪০০ সাল’। আমি তখন
বোস্টনে থাকি। তো, একদিন আমাকে
টেলিফোন করলেন কাজী ফয়সাল আহমদ।
বললেন, সংকলনের জন্য একটা কবিতা দিতে
হবে। আমি বললাম, কবিতা লিখতে খরচ
আছে। একটি কবিতা লিখতে হলে আমাকে
দু-প্যাকেট সিগারেট খেতে হয়, এক কাপ
কফি খেতে হয়। আমার কাছে ভালো কলম
নেই, একটি কলম কিনতে হবে, কাগজ কিনতে
হবে। ভদ্রলোক মনে হয় একটু ভয় পেয়ে
গেলেন। বললেন, আমাকে কী করতে হবে।
আমি বললাম, আপনি এক কাজ করুন। আমাকে
দু-কার্টন সিগারেট পাঠিয়ে দিন। আমার
কাছে কলম আছে, কাগজও আছে; কফি, চিনি
সবই আছে। শুধু সিগারেট ফুরিয়ে গেছে।
এভাবেই কবিতাটি লিখেছিলাম।
জহির: খানিকটা পেছনে ফিরে যাই। গত
শতকের চল্লিশের কবি আবুল হোসেন
নিয়মিত একটি আড্ডা করতেন, সেই আড্ডায়
আপনার ডাক আসে অনেক পরে। এর কারণ
কী?
শহীদ: কারণ আর কিছুই না, আমার খোঁজ
পায়নি। শামসুর রাহমান নিয়মিতই যেতেন
ওখানে। আমি জানতাম। আমাকে
জানিয়েই যেতেন। কিন্তু কখনোই আমাকে
বলেননি যে শহীদ, আপনিও চলুন। প্রায় তিন-
চার বছর ওখানে যাতায়াতের পর হঠাৎ
একদিন শামসুর রাহমান আমাকে বললেন,
আবুল হোসেন আপনাকে ডেকেছেন। আমি
গেলাম। তিনি আমাকে দেখে বললেন, কবি,
আমি তোমার লেখা পড়লাম। এদ্দিন খেয়াল
করিনি, তবে এখন করেছি। এখন থেকে আর
কোনো ভুল হবে না। আমাদের পত্রিকার
জন্য লেখা দিয়ো, ভালো টাকা পাবে।
জহির: প্রায় একই রকমভাবে নীলিমা
ইব্রাহীমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন
সম্ভবত।
শহীদ: না, তিনি আমাকে চিনতেন। একদিন
হঠাৎ বলে বসলেন, এই যে কবি শোনো, আমি
এই বছর তোমাকে বাংলা একাডেমি
পুরস্কার পাইয়ে দেব।
জহির: ১৯৭৩ সালে কবি ফজল
শাহাবুদ্দীনের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলা
একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন আপনি,
তাই না?
শহীদ: হ্যাঁ, ওদের টাকা জমে গিয়েছিল,
তাই দুজনকে পুরস্কার দেয় সে বছর। শোনো
মিয়া, পুরস্কারের প্রতি আমার কোনো
মোহ ছিল না। কিন্তু টাকার দরকার ছিল।
সে সময় সিদ্ধেশ্বরীতে বাসা নিয়েছি,
কিন্তু ফার্নিচার কেনার টাকা নেই। তখনই
পুরস্কারের টাকাটা পাই। ওটা দিয়ে
ফার্নিচার কিনেছিলাম। ভালো একটা
সোফা কিনেছিলাম।
জহির: পঞ্চম বইয়ের জন্য কি প্রস্তুতি
নিচ্ছেন?
শহীদ: চারটে কবিতা লেখা হয়েছে। ১৫টা
হলেই পাঁচ নাম্বার বইটা করে ফেলব।
জহির: বিশ্ব কবিতার প্রেক্ষাপটে বাংলা
কবিতার অবস্থান কোথায়? তুলনামূলক
বিচারে আমরা কি পিছিয়ে আছি, দুর্বল?
শহীদ: বাংলা কবিতা যে দুর্বল নয়, তা
প্রমাণ করেছেন তিরিশের পাঁচ কবি-
জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, অমিয়
চক্রবর্তী, বিষ্ণু দে আর সুধীন দত্ত। সুধীন
দত্ত তাঁর ‘কাব্যের মুক্তি’ প্রবন্ধে বলেছেন,
‘বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে বীজ তুলে এনে রোপণ
করতে হবে।’ অর্থাৎ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে
হবে, পড়তে হবে। বাংলা ভাষায় বড় কবি
বের হয়ে আসবে। নিজেদের সম্বন্ধে
নিজেদের দৃষ্টি কখনো কখনো মেঘলা হয়।
আমরা কেউ ঠিক জানি না আমরা কোথায়।
জহির: মডার্ন, পোস্টমডার্নের পর সেদিন
এক আর্ট গ্যালালিতে লেখা দেখলাম
‘আফটার মডার্নিজম’। কত কত মতবাদ আসে।
এলিয়েনের দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখার
প্রয়োজনে একদিন হয়তো ‘এলিয়েনিজম’
নামেও কোনো মতবাদ আসবে।
শহীদ: শোনো, তরঙ্গ আসে, তরঙ্গ চলে যায়।
পোস্টমডার্ন কী এনেছে? আত্মায় বিশ্বাস,
আধ্যাত্মিকতা, সুফিজম, লোকজ ভাবনা।
অধ্যাপকেরা এসব করে বুঝলা। বই লেখার
দরকার। এসব খুঁজে খুঁজে বের করে আর
একেকটা নাম দেয়। নতুন কিছু পায় না।
ল্যান্ডস্কেপ কিছুটা বদলে যায় কালের
প্রবাহে। নতুন প্রযুক্তি আসে, যোগ হয় নতুন
শব্দ । চলমান জীবনের অভিঘাত থেকেই তো
তৈরি হয় শিল্পসাহিত্য। চিরকাল তাই হয়ে
এসেছে। সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিল,
‘তিরিশ বছর ধরে বারবার বদলেছি নাম
কিন্তু বদলাতে পারিনি হৃদয়’।
এলিয়েনিজম, হ্যাঁ, ভালোই বলেছ।
সিনেমায় এসে গেছে। কবিতায়ও আসতে
পারে। মানুষ মঙ্গলে যাচ্ছে, ওখানে গিয়ে
বসবাস করবে। এগুলো নিয়ে সাহিত্য হবে,
কবিতা হবে। এগুলোই হবে এলিয়েনিজম।
কোনো এক অধ্যাপক একটা বই লিখে
ফেলবেন নিশ্চয়।
পুনশ্চ
‘আমি মৃত্যুর গন্ধ পাচ্ছি’
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এই সাক্ষাৎকারটি
নেওয়া হয় এ মাসেই, শহীদ কাদরী অসুস্থ
হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার এক সপ্তাহ
আগে। এর দুদিন পরে টেলিফোনে কুশল
বিনিময়ের একপর্যায়ে তিনি আমাকে
(কাজী জহিরুল ইসলাম) বলেন, ‘জহির,
তোমাকে একটি কথা বলি। কথাটা আমি
নীরাকেও বলিনি। তুমি কবি, তুমি বুঝবে।
ইট ইজ পোয়েট টু পোয়েট। তুমি কথাটা
কাউকে বোলো না। আমি মৃত্যুর গন্ধ
পাচ্ছি।’
এরপর ২২ আগস্ট কবি ভর্তি হলেন
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ শোর লং আইল্যান্ড জুইশ
হাসপাতালে। রোগশয্যায় যখন তিনি
হাসপাতালের আইসিইউতে, সে সময় ঘরে
ফেরা প্রসঙ্গে প্রবাসী সাংবাদিক আকবর
হায়দার কিরণের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি
বললেন, ‘আমি যে ঘরে ফিরে যাব, নিয়মিত
ডায়ালাইসিসের ব্যয়ভার কে বহন করবে? এত
টাকা কোথায় পাব?’ প্রশ্নকর্তা
নিউইয়র্কের ঘরের কথা ইঙ্গিত করলে তিনি
বলেন, ‘আরে ওটা তো বাসা, ঘর তো একটাই- বাংলাদেশ।’
প্রথমআলো
(১৪ আগস্ট ১৯৪২-২৮ আগস্ট ২০১৬)
ছবি: নাসির আলী মামুন, ফটোজিয়াম