হোম » শহীদ কাদরীর কবিতা

শহীদ কাদরীর কবিতা

admin- Saturday, August 13th, 2016

ওমর শামস

শহীদ কাদরী, ২০০৫ এর দিকে, তাঁর ‘বৃষ্টি’ কবিতা প্রসঙ্গে আমাকে একদিন ফোনে বলেছিলেন, “এই হচ্ছে আমার ওয়েস্ট ল্যান্ড”। এটি তাঁরই কবিতা হলেও, আমি ঠিক ওই বিবেচনায় রচনাটির রস গ্রহণ করি না। তবে উক্তিটির মধ্যে কাদরীর কবিতাবোধের ও কবিতা রচনার প্রক্রিয়ার অনেকখানি সূত্র আছে। আরেকটু বিস্তৃত করা যাক। রোমান্টিসিজম-এর পরে উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে ফরাসী, জর্মন, ইংরেজী তার কিছু পরের হিস্পানীক কবিতায় যে এবং যে সব বাঁক উঠলো তাতে চিন্তা এবং সারবত্তার আয়তন সমধিক বৃদ্ধি পেয়ে সেটি নির্মল আবেগের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ালো। এই ধরনের ঘটনা যে কোন শিল্পের, চিত্র এবং সংগীতেরও প্রগতির অন্ত:সার হতে বাধ্য। কেননা ব্যক্তিগত এবং সামাজিকভাবে আমরা বেশি জানতে এবং ভাবতে অভ্যস্ত হচ্ছি প্রতিদিন। রাজনীতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান, যুদ্ধ, অর্থনীতি, ব্যবসা, জনগোত্রের বিস্তার – আমরা সবই আরো-আরো জানছি । ১৮ শতক থেকে যন্ত্রবিপ্লবের সঙ্গে-সঙ্গে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে জড়ো হয়েছে, এখনো হচ্ছে। ফলে কবিতা শুধু মাত্র প্রকৃতি, ঈশ্বর, সৌন্দর্য এইসব বিষয় থেকে অপরাপর বিষয় নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে । ১৯ শতকের মাঝামাঝির থেকে বোদলেয়ার যা করেছিলেন, তার সারার্থ হচ্ছেঃ ১) কবিতাকে মেদ নিষ্ক্রান্ত করে, শ্রুতি-চিত্রকল্পে ব্যঞ্জনা বৃদ্ধির কৌশল নিরূপণ, ২) নাগরিক জীবনের চিত্রায়ন, ৩) প্রকৃতি বিরূপতা, ৪) জীবনের ক্লেদ-গ্লানি থেকেও কবিতা তৈরী করা। বোদলেয়ার রোমান্টিসিজমের কবিতাকে যে স্তরে নিয়ে গেলেন, সেটাকেই আধুনিক কবিতা, অন্তত এক প্রকারের আধুনিক কবিতা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। তাঁর উত্তরসুরি– র্যাম্বো, মালার্মে, ভালেরি – আধুনিক কবিতাকে আরো অন্যান্য সম্পদে বিত্তশালী করে তোলেন পরবর্তী কালে। সেই বিবরণে যাবার সুযোগ নেই এখানে। ফরাসী এই কবিতা-ধারা, যাকে সিম্বলিজমও বলা হয়ে থাকে, পরে ইংরেজী এবং জর্মন কবি ও কবিতাকে আক্রান্ত করে – ইয়েটস, এলিয়ট, পাউন্ড, রিলকে-র কবিতা তার সাক্ষ্য।
বাংলা কবিতায় এই দায়িত্বের ভার যাঁরা দেদীপ্যমানভাবে সম্পন্ন করেছেন তাঁরা তিরিশের কবি। তবে জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে এবং বুদ্ধদেব বসুর ধীশক্তি এবং আত্মনিয়োগ এতোটা মার্জিত ছিলো যে তাঁরা নতুন বোধ এবং বিকাশকে বাংলা কবিতার ট্রাডিশনের সঙ্গে মাস-মজ্জার সম্পর্কে বেঁধে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন, বাংলা ভাষার আধুনিক কবিতা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। ঐ বড়ো ঢেউয়ের পারম্পরিক বিকিরণ এখনো চলছে। এবং এখনো বোধ হয় সাক্ষ্য এবং যুক্তি যথোপযুক্ত পরিমাণে জোটেনি, যাতে বলা যায় যে ১৯৫০-এর পরে উভয় বাংলার কবিতা সম্পূর্ণ বিমুক্ত, স্বতন্ত্র কোন তরঙ্গ সৃষ্টি করেছে। বড়ো অর্থে যে কোনো সময়ের সাম্প্রতিক সাহিত্য-শ্রমিক তো পূর্বোক্তদোর কাঁধেই দাঁড়িয়ে থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে নতুনরা কতোদূর দেখতে পাচ্ছেন এবং অবলোকিত দৃশ্যের স্বরূপ কতোটা দিতে পারছেন।
য়ুরোপীয় দুটো বিশেষ প্রচারণা পঞ্চাশের কবিদের সামনে ছিলো- সমর সেন এবং বিষ্ণু দে-র মধ্যে দিয়ে এলিয়ট ( তিরিশের দশক থেকেই) এবং বুদ্ধদেব-এর অনুবাদে বোদলেয়ার (১৯ সন থেকে)। পঞ্চাশ-ষাটের কালে যতোই প্রচ্ছন্ন হোক এই ছত্রছায়া বাংলাদেশী কবিতায় ছিলো, যখন বুদ্ধদেব বসু-র ‘কবিতা’ পত্রিকা অনেকখানি দিকনির্দেশনার কাজ করে যেত। এই ভূমিকাটুকু শহীদ কাদরীর কবিতার আলোচনায় অনিবার্য এই জন্য যে, কাদরী তাঁর কাব্য-জীবনের প্রথম পর্বে এই দুই স্রোত দিয়ে বাহিত – অন্তত কবিতার বিষয় ও বোধ বিচারে। তাঁর দ্বিতীয় পর্বের কবিতায় দেশজ বিষয়ে গ্রাম, স্বজন, প্রেম এসব এসেছে, যেগুলো প্রথম পর্বে প্রায় অনুপস্থিত। এবার বিস্তৃত আলোচনা।
কাদরী-র প্রকাশিত কবিতা গ্রন্থ চারটি : উত্তরাধিকার, ১৯৬৭, তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা, ১৯৭৪, কোথাও কোন ক্রন্দন নেই, ১৯৭৮ এবং আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও, ২০০৯। কবিতায় যশোপ্রার্থী সব সময়ই বহু। কিন্তু প্রথমে যে ছাঁকুনিতে সার আর খোসা আলাদা হয়ে যায়, সেটা হচ্ছে কণ্ঠস্বর, ভিড়ের মধ্যেও শুনেই চেনা যায় এমন স্বরচ্ছাপ। পঞ্চাশের দশক থেকে কাদরী কবিতার লেখার ব্যাপারে যে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন যাতে তাঁর প্রকাশিত প্রথম কবিতাগুলোতেই এই স্বরচ্ছাপ খুব স্পষ্ট স্বাতন্ত্র্যে চেনা গিয়েছিলো- বলবার ভঙ্গীতে, স্বরপ্রক্ষেপে প্রাথমিকভাবে অক্ষরবৃত্তে, গদ্য কবিতায়। আমার মনে হয়েছে, তাঁর চিত্রকল্প সমেত শ্রুতিকল্পে – মানে ধ্বনি প্রক্ষেপের কথ্য চালে, অনুপ্রাসের ( “এবং চৈতন্যের নেই অবিরাম অনিশ্চিত, অশেষ পতন/ পলে-পলে স্খলনের অঙ্গীকার আর অনুর্বর মহিলার/ উদরের মত আর্ত উৎকণ্ঠিত, আবর্তিত শূন্যতার ভার,/ নেই এই ভীড়াক্রান্ত, বিব্রত, বর্বর, ঊর্ধ্বশ্বাস শহরের/ তীক্ষ্ণধার জনতা এবং তার একচক্ষু আশার চীৎকার …” ) উত্থান-পতনের সম্মিলিত বাতাবরণে কাদরী নিজস্ব বাক- ভঙ্গীমা গঠন করেছেন। প্রথম দিককার কবিতায় এর গড়ন একটু যুক্তাক্ষর বহুল। শেষের দিককার কবিতায় সামান্য কম আঁট-সাঁট এবং তৎসম শব্দ বিরল। সরলভাবে বললে, তাঁর ভাষা নিজস্ব এবং উচ্চারণের মধ্যে একটা তীক্ষ্ণ মেজাজ, বল্লমের মতো বলবার একটা ভঙ্গী। এই কথন খুব প্রত্যক্ষ, মেদবিহীন, আয়রনি সমৃদ্ধ, চিত্রকল্প সংযোজিত, অনুপ্রাসে ক্বণিত। আরেকটি জিনিশ লক্ষ্যণীয়, তাঁর বেশির ভাগ কবিতাই প্রথম পুরুষে স্বগতোক্তির। উত্তরাধিকার গ্রন্থে ৪০টি কবিতার মধ্যে ২৬টি স্বগতোক্তির। কয়েকটি কবিতার নিকাশী প্রুফ্রকের উচ্চারণ মেজাজের। কাদরীর ভাষা, ভঙ্গী, অলংকরণ স্বগত-বচনের কবিতার খুব উপযোগী। এর উদাহরণে এবং অনুধাবনে আমরা পরে যাবো।
কাদরী-র কবিতার বিষয় হচ্ছে :
১. কবিতায় নিসর্গ-প্রেম এবং ব্যাকুল ভালোবাসা চর্চার প্রতি বিরূপতা (অন্তত উত্তরাধিকার-এ )
২. কবিতা ও শিল্পের সম্মোহনে তার উদ্দেশে কবিতা।
৩. বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং ঐ সময়কার ঐতিহাসিক পরিস্থিতিজনিত কবিতা।
৪. স্বগত জীবনের দেয়াল কিছুটা খাটো করে অবশেষে স্বজ্ঞানে সাধারণ্যে মিশে যাবার আয়োজন ঘটিত কবিতা।
৫. কয়েকটি প্রেমের কবিতা, যার অর্ধেক ভালোবাসার উল্লাসের নয় বরং বিষাদের – বাকী অর্র্ধেক ইতিবাচক জীবনের।
৬. আত্মীয়বর্গ সম্পর্কীয় কবিতা।
মোটা দাগে এই হচ্ছে কবিতায় রূপায়িত কাদরী-র অভিজ্ঞতার জগত। তাঁর নিজের অবস্থানে কিছুটা বিব্রত বোধ করেও, “ কবিতাই আরাধ্য আমার মানি; এবং বিব্রত তার জন্য কিছু কম নই। উপরন্তু পড়ে আছি উপাধীবিহীন “ / (কবিতাই আরাধ্য আমার, উত্তরাধিকার)- এই হচ্ছে কবিতায় নিয়োজিত হবার জন্য তাঁর আত্ম-অবস্থান।
উল্লিখিত নিসর্গের প্রতি বিরূপতা, এ উপাদান বোদলেয়ারের এবং নাগরিক জীবনের প্রকাশ, এ উপাদান বোদলেয়ার১ এবং এলিয়ট২-এর চিন্তা থেকে আসা। অবশ্য কাদরী লিখেছেন বাংলায় এবং তাঁর স্বকীয় ঝাঁঝালো ভাষা শৈলীতে, আর গ্রহণ অবশ্যই করা যায়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ, উত্তরাধিকার-এ, আবহমান বাংলা কবিতার প্রকৃতি বন্দনার – রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ স্মরণ করুন – বিরুদ্ধে কাদরী কটাক্ষ করছেন। ‘নপুংসক সন্তের উক্তি’, ‘কবিতাই আরাধ্য আমার ’, ‘সমকালীন জীবন দেবতার প্রতি এবং ‘নিসর্গের নুন’ কবিতাগুলিতে এই প্রথম বোধটি তীক্ষ্ণ এবং কাদরীর বিদ্রুপে জর্জর। গ্রাম্যজন যে গান চায়, সে বিগত এবং তার পনুরুদ্ধারও অসম্ভব। সনাতন বাঁশিটিও বেণুবনে নি:শব্দ, নিসর্গের নাচও খ্যামটা –
কেক-পেস্ট্রির মতোন সাজানো থরেথরে নয়নাভিরাম
পুষ্পগুচ্ছের কাছেও গিয়েছি তো, ম্লান রেস্তোরাঁর
বিবর্ণ কেবিনে আশ্রয়ের যে আশ্বাস এখনও
টেবিল ও চেয়ারের হিম-শূন্যতায় লেখা আছে
তেমন সাইনবোর্ড কোন জুঁই, চামেলী অথবা
চন্দ্রমল্লিকার ঝোপে-ঝাড়ে আমি তো খুঁজেও পেলাম না।
——
কে দ্যাখে নি? আজীবন নন্দিত রবীন্দ্রনাথ থেকে
শুরু করে তিরিশ ও তিরিশোত্তর অনেকেই,
এমন কি কোন-কোন অনুজ পর্যন্ত। আর তোমার নিবিড়
নীলাকাশ, যার নিচে ভাঁটফুলের ঘুঙুর শুনে
একদা জীবনানন্দ বসবাসযোগ্য ভেবে
আমরণ থেকেই গেলেন বাঙলাদেশের শহরতলীর কোন
স্বল্প-পাওয়া ময়লা-ধোঁয়াশা-ঢাকা বৃক্ষের মতন।
(নিসর্গের নুন, উত্তরাধিকার)
এই ব্যঙ্গ সম্পর্কে তিনি এতো সচেতন, যে বঙ্গদেশীয় সুতীক্ষ্ণ বাঁকা চাঁদ বটির মতো তাঁকে দ্বিখল্ডিত কেন করছে না, এই বিস্ময়েরও ইংগিত তিনি নিসর্গের নুন কবিতার শেষ পংক্তিতে নিবিষ্ট করেছেন। এই মর্মের কবিতাগুলোর বর্ণনায়, ভাষায়, বুনোটে যে বিস্ময় আছে তা স্বীকার্য। এই বোদলেয়ারীয় প্রকৃতির প্রতি অনীহার ব্যবহার করে তিনি ‘একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল’ নামে চমৎকার কবিতা লিখেছিলেন। কবিতাটি নভেম্বর ১২, ১৯৭০ সনে ভোলা অঞ্চলে বঙ্গোপসাগরে সাইক্লোন হবার পর ৪ দিনে লেখা ৪টি কবিতার সমাহার। সাইক্লোনে মানবিক ক্ষয়-ক্ষতির জন্য হা-হুতাশ নেই এখানে। প্রকৃতি সৌন্দর্য ও সুষমায় মানুষকে ভুলিয় রাখে কিন্তু সহসাই হাজির হয় তার সংহার ভয়াবহতা নিয়ে – বক্তব্য এই। এখানে তাঁর রপ্ত কৌশল, চিত্রকল্পের মধ্যে দিয়ে উক্তি, ঘটনার সঙ্গে সঙ্গতি কবিতাটিকে শক্তিশালী করে তুলেছে। পাদটীকায় পুরো উদ্ধৃত কবিতাটি৩ খুব পঠিত নয়, কিন্তু দ্যোতনাময়, অপূর্ব।
শহীদ কাদরী যে একটি কবিতার জন্য পাঠক মহলে সমধিক পরিচিতি সেটি হচ্ছে ‘বৃষ্টি’। এই বৃষ্টির বিবরণ কোন নারী, প্রকৃতি, প্রেমিকের বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল-এর অভিষেক নয়; নয় আবেগ, যে ‘কেঁদেও পাবে না তাকে’ বর্ষায়। এটি কেয়া-কেতকী তমাল-তরী-ধান দোলানো মিষ্টি বৃষ্টি নয় – এটি শহরের অলি-গলি-দালান, রাস্তা, সাইনবোর্ড অফিস-আদালত, যান, ব্যবসা, মহাজন-সাহেব, পৌর সমিতিকে তাড়িত করা বিহ্বল বর্ষা : ‘অবিরল করাত কলের চাকা, লক্ষ লেদ মেশিনের আর্ত অফুরন্ত আর্বতন … বিপন্ন বিদ্যুৎ মেঘ, জল, হাওয়া … ময়ুরের মতো যার বর্ণালী চিৎকার, জল, জল, জল, তীব্র হিংস্র খল … ’। এই পৃথক সুর এবং ক্ষিপ্র বেগ কাদরী তাঁর নিজস্ব অক্ষর-বৃত্ত চালে ঝরিয়েছেন, যা বাংলা-পদ্যে-ধারাবাহিত ঝংকৃত ৮/৬ চাল নয় আবার জীবনানন্দের বিলম্বিত সুরও নয়। প্রথমেই ৮ মাত্রার শোঁ শোঁ : ‘সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো’, তারপর যতি নিয়ে ১২ অথবা ২০ মাত্রা-র দৌড়। এই আনোখা বাঁটের চলনে কবিতার শ্রুতিকল্প বক্তব্যটিকেও স্বতন্ত্র ওজন দিয়েছে। বৃষ্টিতে নাগরিক উপাদান সব ভেসে যাচ্ছে। বাড়ী-ঘর নড়ে উঠেছে টিরোনসরাসের মতোন।
ভেসে যায় ঘুঙুরের মতো বেজে সিগারেট-টিন
ভাঙা কাঁচ, সন্ধ্যার পত্রিকা আর রঙিন বেলুন
মৃসণ সিল্কের স্কার্ফ, ছেঁড়া তার, খাম, নীল চিঠি
লন্ড্রির হলুদ বিল, প্রেসক্রিপশন, সাদা বাক্স ওধুষের,
সৌখিন শার্টের ছিন্ন বোতাম ইত্যাদি সভ্যতার
ভবিতব্যহীন নানা স্মৃতি ….
(বৃষ্টি, উত্তরাধিকার)
ছেঁড়া পাৎলুনে হাওয়ার পালের শার্টের ভিতরে একাকী এই বর্ষায় কাদরী নূহের উদ্দামতা নিয়ে নতুন নৌকোর মতো আগ্রহী অথচ জনপ্রাণী সাড়াহীন। অতএব তিনি কোন দিকে ভেসে যাবেন – সেই প্রশ্নটিই কবিতার অন্তিমে সমুস্থিত হয়ে উঠেছে।
দুটি স্তবকে সিপাই, সান্ত্রী, রাজস্ব-আদায়কারী মহাজন-মোসাহেবদের পলায়নে এবং বাউন্ডেলে, লক্ষ্মীছাড়া উন্মুল, উদ্বা¯, ভিক্ষুক চোর, অর্ধ-উন্মাদের রাজত্বে কিছুটা অ্যানার্কী এবং কিছুটা সর্বহারা আন্দোলন মূলত বাম আন্দোলনের সম্ভাব্য ইংগিত থাকলেও মনে হয় না কবিতাটি শ্রেণী-সংগম জাতীয় উদ্যোগ সম্পন্ন। সেই ধরনের কবিতা কাদরীর অন্য বইতেও ঠিক নেই। এটি শুধু একটি ঘটনা যার বিপ্রতীপে তিনি হয়তো একাই নতুন নৌকোর মতো, অথবা হয়তো সবাইকেই নুহের মতো অন্য স্থলভাগে নিয়ে যেতে চান। এই সংকেতটি কিন্তু খুব জোরালো নয়। হয়তো পুরো কবিতাটি কবিতা-সাহিত্যের অথবা সমূহ সংস্কৃতির অগতি ও স্থবিরতা মোচনের রূপক। এখানে নগরচিত্র, ভবিতব্যহীন সভ্যতার সব প্রতীক ভেসে যাওয়া, কবির “বিপর্যস্ত রক্তেমাংসে নূহের উদ্দাম” রাগ, জনতার সাড়াহীনতা – এইসব একটু এলিয়টী আভাস সত্বেও, প্রথম মহাযুদ্ধের পরেকার য়ুরোপীয় সভ্যতার সংকটের পটভূমি কি ষাটের বাংলাদেশে ছিলো? এই অনচ্ছতা নিয়েও কবিতাটি কিন্তু সংগতির দিক থেকে ত্রিশংকু হয়ে থাকে না, যে কোন পাঠককে কিছুটা ভাবায় এবং পুনরপি পড়তে উদ্বুদ্ধ করে। আমি নগরে বৃষ্টির রূপ হিশেবেই কবিতাটিকে উপভোগ করি – যা রবীন্দ্রনাথের, অমিয় চক্রবর্তীর বৃষ্টি থেকে আলাদা, হয়তো বুদ্ধদেব বসু-র শেষ পর্বের বৃষ্টির একটু কাছাকাছি।
‘আমি কিছুই কিনবো না’ আরেকটি উদ্দীপনার কবিতা, গদ্য কবিতা যার ভিতরে শহরে নাগরিক বিপণী ও দোকানের বর্ণনার মধ্যে নিজস্ব পকেটে সুপ্ত স্বপ্নের চমৎকার-এর বিশ্বাসে তিনিই কিছুই কিনবেন না। বরং পথচারী নাগরিকদের জন্য ‘যাদের আঙুলে কালির দাগ, মুখে ভয়’, তাদের জন্যই তাঁর আশংকা এবং কৃপা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যায়ের যে কটি কবিতা কাদরী লিখেছেন তার মধ্যে স্বতন্ত্র হচ্ছে ‘গাধা টুপী পরে’। এটি যুদ্ধকালীন নির্বাসনে অন্য পারে যাবার প্রসঙ্গ। এই কবিতায় তিনি স্বাধীনতা সম্পর্কে উদ্দীপনা,কিংবা সাহস, কিংবা ভীতি এগুলোর প্রস্তাব দ্যান নি। ঘটনার অবলীলায় অনেকটা এক্সিসটেনশিয়ালিস্টকভাবে তিনি পথ অতিক্রম করেন। সবাই বলে, এই তো কয়েক ফার্লং – কেউ বলে বহুদূর। অথচ আসলে কেউই জানে না মঞ্জিল কই অথবা তার অস্তিত্বের সম্ভাবনা কতটুকু? স্বাধীনতা প্রসঙ্গে যতো কবিতাই লেখা হয়েছে, সার্থকগুলোর মধ্যে এটির নিজস্বতা আছে বিষয়টুকুর চারিত্র্য হেতু।
প্রেম-বিষয়ক কবিতার মধ্য থেকে উঠে আসে: ‘সংগতি’, ‘এ-ও সঙ্গীত’, ‘প্রেম’ এবং ‘দাঁড়াও আমি আসছি’। সংগতি কবিতাটি অমিয় চক্রবর্তীকে উৎসর্গ করা, আসলে এর মধ্যে ‘মেলাবেন তিনি মেলাবেন’- এর কিছু নেই। বরং জীবনানন্দীয় একটি শ্রুতিকল্প : পাবে না আর (শীতরাত, মহাপৃথিবী), কোথাও পাবে না শান্তি (দেশ কাল সন্ততি, বেলা অবেলা কালবেলা), কোথাও পাবে না কিছু (হে হৃদয়, বেলা অবেলা কালবেলা), তিনি চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন মাত্রাবৃত্তে। ‘কিন্তু শান্তি পাবে না পাবে না পাবে না’-র তোহাই এবং ধুয়া অস্থায়ী-অন্তরায় সোমের মতো ফিরে-ফিরে এসেছে। কবিতার বিষয়, যা কিছু প্রাকৃতিক তা সংগতি-সম্পন্ন হিসেবে ঘটবে কিন্তু প্রেমের পরিণতি হয়তো শান্তি নয়। শুধু একটিই অনুযোগ যে, এই ছোট কবিতাটি অমুক্তক হলে আরেকটু নিটোল মনে হতো।
‘সংগতি-র আকর্ষণ সত্ত্বেও ‘প্রেম’ কবিতাটি আরো অন্তঃসারসম্পন্ন এবং ব্যঞ্জনা সঞ্চারক। এই কবিতাটি পড়লে স্বভাবতই জীবনানন্দ-র ‘আদিম দেবতারা’ মনে আসে, শুধু বোধ প্রসঙ্গে। কিন্তু এই কবিতার ভঙ্গী, গঠন, ভাষা আলাদা। এটি ভালোবাসার সংকটের – পাওয়া-না-পাওয়া, রাখা-না-রাখার, দ্বন্দ্বে কম্পমান।
ফুস্ফুসের ভিতরে যদি পোকা মাকড় গুঞ্জন করে ওঠে –
না, প্রেম তখন আর শুশ্রূষাও নয়; সর্বদা, সর্বত্র
পরাস্ত সে; মৃত প্রেমিকের ঠাণ্ডা হাত ধরে
সে বড়ো বিহ্বল, হাঁটু ভেঙে-পড়া কাতর মানুষ।
মাথার খুলির মধ্যে যখন গভীর গুঢ় বেদনার
চোরাস্রোত হীরকের ধারালো ছটার মতো
বয়ে যায়, বড়ো তাৎপর্যহীন হয়ে ওঠে আমাদের
ঊরুর উত্থান, উদ্যত শিল্পের লাফ, স্তনের গঠন।
(প্রেম, কোথাও কোন ক্রন্দন নেই)
‘দাঁড়াও আমি আসছি’, একটি ইতিবাচক শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতা। জীবন এবং অভিজ্ঞতা এর বচনের আঁশে-পেশিতে সম্পৃক্ত। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে আবেগের আদিরস থেকে আমুল ঊর্দ্ধপাতন ঘটিয়ে বক্তব্য-অনুভূতিকে রূপক-প্রতিমা-চিত্রকল্পে একটি আধো মুরাল- আধো সংগীত-এর মতো পেশ করেছেন কাদরী। বাস্তবের সংঘাতে আহত কাদরী জীবনসঙ্গিনীকে সমস্যা, জটিলতা, অসহায়তার ইঙ্গিত দিয়েও বলছেন, “ এখন তোমার সব দায় দায়িত্ব আমাকে নিয়ে নিতে হবে, হবেই-“। জীবন যাপন ও ধারণকে একটি নদীতে খাদ্য সংগ্রহ এবং সঙ্গে-সঙ্গে ডুব-সাঁতার, চিৎ-সাঁতার, উবু-সাঁতার, মৃদু-সাঁতার, মরা সাঁতার, বাঁচা-সাঁতার’-এ টিকে থাকার প্রতিমায়; নৌকা ফুটো হবে এই সমূহ অশংকার স্বীকার ব্যক্তিতে পুরো কবিতাটি একটি পরিপক্ক ফলের মতোন। বচনের ঢং কথ্য ভাষা থেকে গুঞ্জিত, ভালোবাসা-মথিত সঙ্গে-সঙ্গে আশংকা সস্ফুল- এ বাকী সংলাপ কিন্তু নাট্য-উচ্চাবচতায় টান-টান। এখানে অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ আবেগ পরিশ্রুত। বাচন ইংগিত সম্পন্ন, সংলাপ স্মরণটি সমূহ ব্যাঞ্জনাদায়ী। যেহেতু প্রেম কবিতার প্রাচীনতম বিষয়, ভালো প্রেমের কবিতা লেখা সব সময়ই চ্যালেঞ্জ। সব শেষে কবিতাটিতে দয়িতাকে না হারাবার আকূতি, “ দাঁড়াও আমি আসছি / তোমাকে চাই ভাসতে-ভাসতে / ডুবতে- ডুবতে, /ডুবে যেতে-যেতে আমার / তোমাকে চাই”।
তাঁর শেষ কবিতাগ্রন্থ, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও, – এর নাম কবিতাটি আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রেম এবং শিল্প-সত্তার সহাবস্থানের কবিতা। কবিতার প্রথম কালের, “কে যেন চীৎকার করছে প্রাণপণে ‘গোলাপ! গোলাপ!’ ঠোঁট থেকে গড়িয়ে পড়ছে তার সুমসৃণ লালা,‘প্রেম, প্রেম’ বলে এক চশমা-পরা চিকন যুবক…“, এই জাতীয় বিদ্রূপ সত্ত্বেও উত্তরাধিকার-এর পরবর্তীতে তিনি প্রেমের কয়েকটি কবিতাই সংবেদনশীলতার সঙ্গে লিখেছেন তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার থেকে। তেমনি প্রথম দিককার কবিতায় নিসর্গের প্রতি অবহেলায়, নাগরিক অনিকেত-এর সম্মোহনে অনেক সময় তিনি পারিপার্শ্বিক সামাজিক এবং গার্হস্থ্য বৃত্ত থেকে কিছুটা দূরাবস্থান নিয়েছলেন। সেটা স্মরণ করে অথবা জীবনের পরিব্যপ্ত অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়ে উত্তরাধিকার-এর পরের কালের ‘কেন যেতে চাই’, ‘এবার আমি’ – এ দুটো কবিতায় শহীদ স্বজন এবং সাধারণ্যের কাছে সহজ, মিশুক এবং আগ্রহী হিসেবে আবার ফিরে এসেছেন। এখানে উনিশ-বিশ শতকের য়ুরোপ-চর্চিত নাগরিকতার সাহিত্য থেকে একটু ঘুরে-বেড়িয়ে এসে নিজের শিকড় সন্ধানে উৎসাহী। এখানে ভাষাও সহজ, আহ্বায়ক এবং সংলাপশীল :
এই লোহা, তামা, পিতল ও পাথরের মধ্যে আর কতদিন?
– – – – – –
আমি করাত-কলের শব্দ শুনে মানুষ।
আমি জুতার ভিতর মোজার ভিতর সেঁধিয়ে যাওয়া মানুষ
এবার আমি গাঁও-গেরামে গিয়ে
যদি ট্রেন-ভর্তি শিউলি নিয়ে ফিরি
হে লোহা, তামা, পিতল এবং পাথর
তোমরা আবার আমায় চিনতে পারবে তো হে।
(এবার আমি, কোথাও কোন ক্রন্দন নেই)
আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও কবিতাগ্রন্থে মোট ৩৭টি কবিতার ৭টি কবিতাই পরবাসে ভ্রাম্যমান, অস্থির, অনিকেত অবস্থা থেকে স্বদেশ-স্বজন এর দিকে প্রত্যাবর্তনের বাসনা বিমণ্ডিত। এই কবিতাগুলো হচ্ছে : ১. তাই এই দীর্ঘ পরবাস, ২. সব নদী ঘরে ফেরে, ৩. কোন নির্বাসনই কাম্য নয় আর, ৪. স্বগতোক্তি, ৫. প্রবাসের পংক্তিমালা, ৬. গন্তব্য, ৭. নিরুদ্দেশ যাত্রা। সবগুলো কবিতাই গদ্য কবিতা সংলাপ, স্বগতোক্তি এবং প্রশ্ন-জর্জরিত; বাক্যের স্পন্দন তীক্ষ্ণ এবং ধারালো – পাঠককে তাঁর নিজের মনের দিকে তাকিয়ে দিতে সক্ষম। শুধু একটি কবিতার থেকে স্মরণ করি :
অন্য একবার, উদ্দাম সমুদ্রে, ঝোড়ো আবহাওয়ায়
একটি নিমজ্জমান জাহাজের ডকে দাঁড়িয়ে দেখেছি
অপসৃয়মাণ উপকূলে,
তিমিরে আচ্ছন্ন,
একটি অচেনা পাহাড়ের সানুদেশে,
আমার মা’র কপালের টিপের মতন
আমার বোনের নাকফুলের মতন
জ্বলজ্বল করছে একটি গ্রাম।
‘ক্যাপ্টেন, ক্যাপ্টেন জাহাজ থামাও’।
না, আমি পারি নি চিৎকার করতে
অথচ আমার
হৃৎপিণ্ডে এখনো বেজে চলেছে জলের পর ঘর-ফেরা
ছিপ নৌকোর বৈঠার মতন! ‘ক্যাপ্টেন, ক্যাপ্টেন’
তিন তিনটে মহাদেশ থেকে
অন্তত ছ’বার উড়োজাহাজের টিকেট কিনেও
তোমাদের উঠোন পেরিয়ে
নিজস্ব আটচালার দিকে যাত্রা সাঙ্গ হয় নি এখনো।
তোমরা বিশ্বাস করো
ছয় বেহারার পালকিতে আমিও
চেপেছি একদা এবং ‘হুমনা হুমনা’
করতে করতে সেই গাঁয়ের নদীর
কিনার অবধি
পৌঁছে
‘পৃথিবীকে মায়াবী নদীর তীরে এক দেশ বলে
আমারও হয়েছে মনে’
কিন্তু আমি
সেখানে আমার গাঁ কিংবা শহর
কিংবা বাড়ি কিছুই এখনো খুঁজে পেলাম না।
(নিরুদ্দেশ যাত্রা, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও)
কাদরীর অন্য উল্লেখযোগ্য উচ্চারণ হচ্ছে ‘একটি উত্থান-পতনের গল্প’, কোথাও কোন ক্রন্দন নেই। নিজেকে (এবং অন্যকে) নিয়ে কাদরীর কৌতুক ও ব্যঙ্গজনিত আয়রনি বহুকাল স্বীকৃত। এই কবিতায় পিতার সঙ্গে নিজের প্রতিতুলনা করে স্বরণীয় দ্বন্দ্ব এবং যে কারুরই আত্ম-অবলোকনের আয়না তৈরী করেছেন কাদরী। কবিদের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের পরের আত্মবিশ্বাস এবং রচনা-সাফল্যের সহযাত্রী আর্থিক অসফলতার দ্বন্দ্ব চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে ‘টাকাগুলো কবে পাবো’, কোথাও কোন ক্রন্দন, নেই কবিতায়।
মাত্রাবৃত্তে দু-একটি কবিতা লিখলেও কাদরী মূলত অক্ষরবৃত্ত এবং গদ্য কবিতা চর্চা করেছেন। তাঁর কিছু উপমাও৪ স্মরণীয় – “সুগোল তিমির পেটে/ বিদ্ধ হলো বিদ্যুতের উড়ন্ত বল্লম’, “হরিদ্রাভ আকাশের ওষ্ঠে চিনে ওঠা/ আমি কী হটাত কোনো পথভ্রষ্ঠ চুন”, “জলের ওপর আমার কৈশোর, আমার যৌবন/ কচুরিপনার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে কী দারুণ সবুজ”। তাঁর শ্রেষ্ঠ উপমা “একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল” কবিতার অন্তর্গত ৪টি কবিতার সবচেয়ে ছোটোটি, পুরোটা, যা নভেম্বর ১২, ১৯৭০ এর সাইক্লোনের রূপায়ণ –
নিসর্গ সেদিন তার ছদ্মবেশ খুলেছিল
একে একে সব অলংকার সে ফেলেছে,
যেমন রাজর্ষি যুবা প্ররোচিত হবার পর
বিয়ের সোনালি খাট থেকে হঠাত সভয়ে দ্যাখে
রক্ত-মাংসভুক ডাইনী এক তার প্রিয় প্রাসাদ জুড়ে
নর্তনে-কুদনে মেতে সব গয়না পরিত্যাগ করেছে।
১৩ই নভেম্বর, ১৯৭০
‘বৃষ্টি’, ‘উত্তরাধিকার’, ‘নিসর্গের নুন’, ‘কেন যেতে চাই’, ‘প্রেম’, ‘এবার আমি’, ‘দাড়াও আমি আসছি’, এগুলো কবিতায় তার সমূহ সাক্ষ্য রয়েছে। তবে চোখে-কানে পড়ে যে, বড়ো দর্জায়, তাঁর স্টাইল ৪টি বইতে খুব পালটায় নি বা বিবর্তিত হয় নি। তাঁর বিষয়বস্তু ও বক্তব্যের সারপদার্থের মধ্যে প্রথম দিককার কবিতায় বোদলেয়ার, এলিয়ট এবং হয়তো অন্যান্য য়ুরোপীয় কবিদের প্রচ্ছায়া আছে। সেটাকে স্বীকার করতে হবে। ‘বৃষ্টি’ কবিতার শেষে কাদরী বলেন – তাঁর “নূহের উদ্দাম রাগী গরগরে লাল আত্মা জ্বলে”, “সাড়া নেই জনপ্রাণীর অথচ জলোচ্ছাসে নিঃশ্বাসের স্বর বাতাসে চীৎকার, কোন আগ্রহে সম্পন্ন হয়ে, কোন শহরের দিকে জলের আহ্লাদে এক ভেসে’’ যাবেন তিনি ; “জনতার আলিঙ্গনে অপ্রতিভ, অপ্রস্তুত, অনাত্মীয় একা। আঁধার টানেলে ভূতলবাসীর মতো। – – – এক বিবর্ণ গোষ্ঠির গোধূলির শেষ বংশজাত আমি/ ( নপুংসক সন্তের উক্তি, উত্তরাধিকার ) । তাঁর শেষ বই, আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও এর প্রথম কবিতা স্বতন্ত্র শতকের দিকে, এই কবিতাতেও তার প্রশ্ন ‘স্বতন্ত্র সহজের দিকে যথার্থ যাত্রী কারা’। আমাদের ন্যুজপৃষ্ঠে মরা হরিণের মতো পড়ে আছে বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা ইতিহাসের রঙ-বেরঙের শতচ্ছিন্ন তালি-মারা জনগণতান্ত্রিক জামা পরে আছি আমরা” “তাই বলি, বারবার বলি; না যেন পড়ে আমার রক্ত পদচ্ছাপ তোমাদের স্বতন্ত্র শতকে।” অতএব শুরু এবং শেষে (প্রায়!) শহীদ কাদরী তার যাত্রার দার্শনিক দিক সম্পর্কে সন্দিহান। এই সন্দেহ, অস্থিরতা তাঁর কবিতার একটি চারিত্র্য।
উপরোক্ত আলোচনার পটভূমিতে এটুকু সারমর্ম ছাঁকা যায় যে,
• উত্তর-তিরিশের কবিদের পরে, পঞ্চাশের পরে শহীদ কাদরী এক সচেতন, স্বকণ্ঠধারী কবি যিনি ছন্দ এবং গদ্য উভয় আঙ্গিকে লিখেছেন। পঞ্চাশের পরের উভয় বাংলার অগ্রগণ্য কবিদের মধ্যে তিনি একজন – তাঁর কন্ঠচ্ছাপ, নির্মাণ, এবং উত্তর-রোমান্টিক কাব্যচিন্তা হেতু।
• তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার-এর কিছু কবিতায় এলিয়ট, বোদলেয়ারীয় বোধ ( প্রকৃতি সম্মোহন থেকে বিরতি, নাগরিক চেতনা, অনিকেত ) আছে, কিন্তু তাঁর স্বকীয় ভাষায়, চিত্রকল্পে, বর্ণনায়।
• তার পরবর্তীকার কবিতার বিষয় নিজস্ব জীবন এবং অভিজ্ঞতা সঞ্জাত। এখানে তাঁর ভাষা সহজতর হয়েও টান-টান। যাযাবর জীবনে রেস্তোরাঁর চায়ের কাপের মতো ঘুরে-ঘুরে অবশেষে স্বস্তি এবং স্বজনের কাছে ফেরার আকাংক্ষা এবং প্রেমের ভঙ্গুরতা, সঙ্গে-সঙ্গে ‘দাঁড়াও আমি আসছি’ বলে ভালোবাসার অবলম্বন, রোমান্টিকদের প্রকৃতি সম্মোহনের বিপ্রতীপ অবস্থান – কাদরীর এবিধ বিষয়ের কবিতা সংবেদনশীল, মর্মস্পর্শী।
তবে কাদরীর রচনার পরিমাণ কম। মান এবং পরিমাণের বিরোধ সর্বদাই। এক গাদা তৃতীয় মানের কবিতা লিখে লাভ নেই। তবু কোনো চিন্তা, আধারকে কখনো স্টাইলকে অস্তিত্ব দিতে কিছু ভল্যুমের দরকার হয়। দ্বিতীয়ত, তাঁর কবিতার স্টাইলের একই ধারা, খুব বিরাট পরিবর্তন নেই চারটি গ্রন্থে।
উত্তর আমেরিকার এক কবিতা সম্মলেনে শহীদ কাদরী-র স্বকন্ঠে কবিতা সম্পর্কিত আলোচনা শুনবার সুযোগ ঘটেছিলো আমার। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে কিছু আলাপও ঘটেছিলো। কবিতার প্রগতি এবং তার সঙ্গে সমাজ ও বিজ্ঞানের বিকাশের সম্পর্কের ইতিহাস সম্বন্ধে শহীদ কাদরীর ধারণা স্বচ্ছ। এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি বিনয়ের সঙ্গে মন্তব্য করেছেন: “আমার মনন যে পরিমাণ বিস্তারিত, সংহত এবং প্রতিষ্ঠিত সেই পরিমাণ আমি কবিতায় আনতে পারি নি”৪। প্রশ্ন এবং চেতনাই সমাধানের প্রথম ছাপ এই সূত্রকে স্মরণ করে আমরা আশা করবো যে শহীদ কাদরী তাঁর আরাদ্ধ ঐ সব মানস এবং ভূগোলের কবিতায় শিগগিরই হাত দেবেন।
শর্করার মতো রাশি রাশি নক্ষত্রবিন্দু / নপংসুক সন্তের উক্তি
প্লাটিনাম সে কি দস্তা কিংবা তামা নাকি নকল সে তারা মঞ্চের কালো পর্দার পর রূপার চুমকি তুমি মনে হয় যেন বার্মা টিকে নিপুণ পালিশ / প্রেমিকের গান
কেক-পেস্ট্রির মতোন সাজানো থরেথরে নয়নাভিরাম পুষ্পগুচ্ছের কাছেও / নিসর্গের নুন
জ্যোস্নাকে করোগেট শিট ভেবে / একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল
পাদটীকা
১ নির্বাণ >>
রাস্তার ধারে সে ফুলছে, বাচাল বসন্তের অধিরাজ,
পিচ্ছিল পোকাগুলো তার হা-করা চোখের
চুঁইয়ে পড়া রসে ঘুরছে, কী মসৃণ।
২ উত্তরাধিকার >>
– এইমতো জীবনের সাথে চলে কানামাছি খেলা
এবং আমাকে নিষ্পদক, নিস্ক্রিয়, নঞঅর্থক
ক’রে রাখে ; পৃথিবীতে নিঃশব্দে ঘনায় কালবেলা !
আর আমি শুধু আঁধার নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটে রক্তাক্ত জবার মতো
বিপদ সংকেত জ্বেলে একজোড়া মূল্যহীন চোখে
প’ড়ে আছি মাঝ-রাতে কম্পমান কম্পাসের মতো অনিদ্রায়।
৩ একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল
১২ই নভেম্বর, ১৯৭০
এতসব ছদ্মবেশ আছে চৌদিকে, আজন্ম উন্মূল মানুষ
ভেবেছে তারও ঘর আছে, নিকেতনে ভ’রে আছে সমস্ত নিসর্গ –
দুধ-সরোবর ব’লে ভেবেছে সে স্বপ্নগ্রস্থ চোখে দূর থেকে
অতল খাদের পর কুয়াশার নিস্তরঙ্গ নিরন্ত বিস্তার।
তাই সে বেঁধেছে ঘর সন্ধ্যার পাখির স্বরে, চুপিচুপি
চুরি ক’রে ঢুকে গেছে শিশিরের টলটলে ফোটার ভেতর
জ্যোৎস্নাকে করোগেট শিট ভেবে প্রাণদাত্রী নদীর নিক্কণে
তার সব নিরাপত্তা জমা আছে ভেবে বন্দনায় কন্ঠ ছিঁড়েছে।
রাত্রে গাছের পাতায় আর ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে
খুচরো পয়সার মতো ছড়ানো জ্যোৎস্নারাজি দেখে
ভিক্ষুকের মতো বার বার আমিও দাঁড়িয়েছি
হাতের রুক্ষ তালু প্রসারিত ক’রে;
দেখেছি উদ্বাহু, আত্মীয়ের নৃত্য
সমুদ্রের ডুগডুগি শুনে
আমি তাই বহুবার ভেবেছি
আমার বুভুক্ষা মেটাতে পারে কোন ইন্দ্রধনু,
কিংবা রাত্রে শাদা কুয়াশায় মোড়া
সেবাপরায়ণ গাছগুলো নিপুণ নার্সের মতো
দাঁড়াবে মাথার কাছে,
ওষুধের ফোঁটার মতো বিন্দু বিন্দু
প্রতিশ্রুতিশীল শিশির গলধঃকরণ ক’রে
নিন্দ যাবে নিশ্চিন্তে নিশীথে।
আজীবন লোকালয় থেকে আমি
পালাতে চেয়েছি – অন্ধকারে টর্চের আলোর চেয়েও
নির্ভরযোগ্য ভেবে জ্যোতিষ্মান পুষ্পরাজিকে,
মেধার চেয়ে অধিক মেধাবী ব’লে ভেবেছি জ্যোস্নাকে।
জানি নিসর্গ এক নিপুণ জেলে
কখনো গোধূলির হাওয়া, নিস্তরঙ্গ জ্যোৎস্নার ফাঁদ পেতে রাখে,
তার অলৌকিক বড়শী থেকে ঝোলে পাখি, দোলে মেঘ
কোমল আহ্বানে উন্মুখ হয়ে যায়
কখনো নিশীথ আসে নিঃশব্দে নিশির মতো
বড়ো অন্তরঙ্গের মতো কড়া নাড়ে
বন্ধুর আজন্ম চেনা কন্ঠস্বরের ডাক শুনে যে যায়
সে জানি দাঁড়ায় না আর
তাল তাল কাদার মধ্যে ঘাড় গুঁজে প’ড়ে থাকে, একগুঁয়ে, বেসামাল।
৪ এই উপমাগুলোয় কিছুটা জোর করে নাগরিকতা ঢুকানোর অভিপ্রায় মনে হয়েছে >>
শর্করার মতো রাশি রাশি নক্ষত্রবিন্দু / নপংসুক সন্তের উক্তি
প্লাটিনাম সে কি দস্তা কিংবা তামা নাকি নকল সে তারা মঞ্চের কালো পর্দার পর রূপার চুমকি তুমি মনে হয় যেন বার্মা টিকে নিপুণ পালিশ / প্রেমিকের গান
কেক-পেস্ট্রির মতোন সাজানো থরেথরে নয়নাভিরাম পুষ্পগুচ্ছের কাছেও / নিসর্গের নুন
জ্যোস্নাকে করোগেট শিট ভেবে / একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল
১৩ আগস্ট ২০১৬