শনিবার ৮১ উপজেলায় ভোট, শঙ্কা-আতঙ্কে ভোটার প্রার্থীরা

১৫ মার্চ শনিবার ৮১ উপজেলায় চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের তৃতীয় পর্বের ভোট। এই নির্বাচন নিয়ে জনমনে উদ্বেগ উৎকন্ঠা বাড়ছে। প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। ভোটের আগেই বেশকিছু এলাকায় সহিংসতা হয়েছে। হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কঠোর অবস্থানের পরিবর্তে রহস্যজনক বক্তব্য দিচ্ছে।

দেশের ৪১ জেলার ৮১ উপজেলায় শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার রাত থেকে প্রচারণা বন্ধ হয়ে গেছে। শুক্রবার রাত থেকে যান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হবে। ৮৩ উপজেলার তফসিল ঘোষণা করা হলেও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সহিংসতার কারণে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা নির্বাচন স্থগিত করে দেয়া হয়েছে।

ধাপে ধাপে নির্বাচন হচ্ছে আর বাড়ছে সহিংসতা। প্রথম দফা নির্বাচনে কেউ নিহত হয়নি। দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের সময় ভোটের দিন একজন নিহত হয়েছে। আর তৃতীয় দফা নির্বাচনের আগেই একজন নিহতের ঘটনা ঘটেছে। তাই তৃতীয় দফা নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনের একতরফা ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ জন্য নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে নির্বাচনে সহিংসতা প্রতিরোধ করার পরিবর্তে রহস্যজনক বক্তব্য দিচ্ছে। আর তাতে সহিংসতাকারীরা আরো উৎসাহিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে অনিয়ম ও সহিংসতা সম্পর্কে অভিযোগ করা হচ্ছে। উপজেলা নির্বাচন সম্পর্কে ইসিকে সরকারের আজ্ঞাবহ বলে আসা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী তার ‘ইচ্ছাধীন’ করে রেখেছেন। এই কারণে উপজেলা নির্বাচনে সরকারি দলের সীমাহীন তা-বে তারা জেগে জেগে ঘুমাচ্ছে। যেমন সরকার তেমন তার বিশ্বস্ত পার্শ্বচর।

রিজভী অভিযোগ করেন, নেত্রকোনা সদর, ঝিনাইদহের হরিণাকু-, শরীয়তপুর সদর, ভোলার মনপুরা, পিরোজপুরের মঠবাড়ীয়া, ভা-ারিয়া উপজেলায় ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত প্রার্থীরা তা-ব চালাচ্ছে। বিরোধী দলের সমর্থিত প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখানো, প্রচারে বাধা দেয়া হচ্ছে বলেও তার অভিযোগ।

এসব অভিযোগ নির্বাচন কমিশনকে জানানোর পরও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না বলে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, অভিযোগের কোনো প্রতিকার তো পাচ্ছিই না, উল্টো এই নির্বাচন কমিশন দখলকৃত ভোটকেন্দ্রের জাল ভোটের ফলাফল ঘোষণা করে সরকারি দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করছে।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন বিএনপির এসব অভিযোগ আমলে না নিয়ে বরং উপেক্ষা করছে। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার মোঃ আব্দুল মোবারক গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছেন, কারো মুখে তো আর লাগাম দিয়ে রাখতে পারব না। আর সবার কথার জবাব দেয়াও সমীচীন নয়।

এর আগে গত ৫ মার্চ তিনি বলেছেন, নির্বাচন চলাকালে দায়িত্বরত কর্মকর্তারা আইন ভঙ্গ করবে না এমন গ্যারান্টি দেয়া যাবে না। দেশের অনেক স্থানেই একযোগে উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে ইসির কোনো কর্মকর্তা স্বেচ্ছায় আইন ভঙ্গ করবে না এমন গ্যারান্টি ইসি দিতে পারবে না। যদি অপরাধ প্রমাণিত হয় তাহলে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে গত বুধবার নির্বাচন কমিশনার মোঃ আবু হাফিজ বলেছেন, নির্বাচনে সহিংসতা হবে না এটা আশা করা ঠিক না। তিনি মন্তব্য করেন সহিংসতা হবেই।

নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার জন্য সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে বলে ইসি দাবি করেছে। নির্বাচনী এলাকায় স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে বুধবার মধ্যরাত থেকে মাঠে নেমেছে সেনাবাহিনী। সাথে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণ র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্য। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকেই শেষ হয়েছে মিছিল-মিটিংসহ সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা। নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মাঝে রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ। ভোটগ্রহণ উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে (ইসি)।

নির্বাচন কমিশন তৃতীয় দফায় ৮৩ উপজেলার তফসিল ঘোষণা করলেও আগামী ১৫ মার্চ ভোট হবে ৮১ উপজেলায়। অপরটি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার নির্বাচন উচ্চ আদালতের নির্দেশে এবং সহিংসতায় একজনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে র্নিবাচনি পরিবেশ না থাকায় গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার নির্বাচন স্থগিত করে দেয় ইসি। এ নিবাচন কবে নাগাদ হবে তা এখনো নির্ধারণ করেনি ইসি।

নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে ৮১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৮১ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে। এ ৮১ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট গত ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

তাছাড়া নির্বাচনের ২ দিন আগে থেকে আরো ২৪৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় নির্বাচনের পরের একদিন দায়িত্ব পালন করবেন।

ইতোমধ্যে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার ৩১ ভোট কেন্দ্রে মালামাল ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ সংশ্লিষ্টদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া আসার জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহারের ব্যবস্থা করেছে ইসি।

ইসি জানায়, ৮১ উপজেলায় মোট ১ হাজার ১১৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে চেয়ারম্যান প্রার্থী রয়েছে ৪১৯, ভাইস-চেয়ারম্যান (পুরুষ) প্রার্থীর সংখ্যা ৪২৩ জন ও ভাইস-চেয়ারম্যান (মহিলা) প্রার্থীর সংখ্যা-২৭৭ জন।

এসব উপজেলায় মোট ভোটার ১ কোটি ৩১ লাখ ৮৫ হাজার ১৩  জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬৫ লাখ ৬৭ হাজার ৯৩২ জন, মহিলা ভোটার ৬৬ লাখ ১৭ হাজার ১৮১ জন।

ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৫ হাজার ৪৪৪টি, ভোটকক্ষ ৩৫ হাজার ২৩১ টি। প্রিজাইডিং অফিসার প্রতি ভোটকেন্দ্রে একজন করে ৫ হাজার ৪৪৪ জন। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার প্রতি ভোটকক্ষের জন্য এক জন করে মোট ৩৫ হাজার ২৩১ জন। এবং পোলিং অফিসার সংখ্যা ৭০ হাজার ৪৬৪ জন দায়িত্ব পালন করবেন।

এছাড়া নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী চতুর্থ ধাপে ৯২ উপজেলায় ২৩ মার্চ ও ৫ম ধাপের ৭৪ উপজেলায় ৩১ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

৩য় দফায় যে ৮১ উপজেলায় নির্বাচন হচ্ছে: ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর, দিনাজপুরের সদর, নবাবগঞ্জ, নীলফামারীর সদর, লালমনিরহাটের আদিতমারী, কুড়িগ্রামের সদর, রৌমারী, চিলমারী, গাইবান্ধার সদর, সাদুল্যাপুর, জয়পুরহাটে আক্কেলপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জে সদর, ভোলাহাট, শিবগঞ্জ, নওগাঁর মান্দা, পোরশা, ধামইরহাট, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, চারঘাট, দুর্গাপুর, চুয়াডাঙ্গার দামুরহুদা, যশোরের মনিরামপুর, নড়াইলের লোহাগড়া, বাগেরহাটের সদর, মোড়েলগঞ্জ, মোংলা, রামপাল, শরণখোলা, খুলনার পাইকগাছা, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ, ভোলার সদর, বরিশালের মুলাদী, হিজলা, বাবুগঞ্জ, পিরোজপুরে নেছারাবাদ, টাঙ্গাইলে ধানবাড়ী, দেলদুয়ার, জামালপুরে দেওয়ানগঞ্জ, শেরপুরে শ্রীবর্দী, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া, গৌরীপুর, মুক্তাগাছা, ফুলপুর, ধোবাউড়া,  নেত্রকোনার সদর, মোহনগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের সদর, কুলিয়ারচর, হোসেনপুর, মানিকগঞ্জের ঘিওর, ফরিদপুরের সদর, চরভদ্রাসন, আলফাডাঙ্গা, ভাংগা, মধুখালী, সদরপুর, গোপালগঞ্জে টুংগীপাড়া, শরীয়তপুরে সদর, নড়িয়া, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, সিলেটের দক্ষিণ সুরমা, মৌলভীবাজারে বড়লেখা, কুমিল্লায় নাংগলকোট, হোমনা, বুড়িচং, চৌদ্দগ্রাম, ব্রাহ্মণপাড়া, তিতাস, চাঁদপুরের কচুয়া, হাজীগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর, ফেনীর দাগনভূইয়া, নোয়াখালীর সেনবাগ, লক্ষ্মীপুরে কমলনগর, চট্টগ্রামে চন্দনাইশ, সীতাকু-, বরকল, রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি, কাউখালী, বান্দরবানের বান্দরবান সদর, আলীকদম।

You Might Also Like