লঞ্চডুবি : এতো মৃত্যুর দায় কার?

ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান :

পিনাক-৬ দুর্ঘটনার ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই আবারো লঞ্চ ডুবির ঘটনা ঘটলো। রোববার পদ্মায় পাটুরিয়া ঘাটের অধূরে এই লঞ্চডুবির ঘটনায় ইতোমধ্যে ৭০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি পুরুষ, ২৪টি নারী ও ১৯টি শিশুর লাশ। স্বজনদের কাছে ইতোমধ্যে ৬৮টি লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। ডুবে যাওয়া লঞ্চটিও উদ্ধার হয়েছে । কিন্তু নদীর তীরে এখনো অবস্থানরত শত শত মানুষ আহাজারি করছে, তাঁদের নিখোঁজ স্বজনেদের খোজেঁ পেতে।

এদিকে সোমবার সকাল ১০টার দিকে উদ্ধার অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। তবে নিখোঁজদের সন্ধান চলার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কিন্তু নদী তীরে শোকাহত স্বজনরা অপেক্ষার অসহ্য যন্ত্রণার প্রহর গুনছেন। সময় যতই গড়াচ্ছে স্বজনের লাশ পাওয়ার আশাটুকুও হারিয়ে ফেলছেন তারা। তারা বুঝে গেছেন, প্রিয়জনদের আর জীবিত পাওয়ার কোনো আশা নেই। এখন শুধু লাশের অপেক্ষা। কিন্তু উদ্ধার কাজ সমাপ্তিতে লাশগুলো পাওয়া নিয়েও তাদের মধ্যে শঙ্কা বিরাজ করছে।

প্রসঙ্গত, শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ঘাট থেকে এমভি মোস্তফা রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে দৌলতদিয়া ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ১৫ মিনিট পরই কার্গো জাহাজ নার্গিস-১-এর ধাক্কায় লঞ্চটি পাটুরিয়ার অদূরে পদ্মায় ডুবে যায়। যাত্রীরা বলছেন, লঞ্চটিতে দুই শতাধিক যাত্রী ছিল। অনেকে সাঁতড়িয়ে প্রাণ বাঁচান। কিন্তু নিখোঁজ ও ডুবে মারা যাওয়াদের বেশীর ভাগই নারী-শিশু।

নৌমন্ত্রনালয়ের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে ৫৮০টি লঞ্চ চলাচল করছে। উৎসবের ছুটি ছাড়া এসব লঞ্চে গড়ে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ যাত্রী চলাচল করে থাকেন। আর যাত্রীদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, লঞ্চ মালিকদের উদাসীনতা, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যথাযথ তদারকির অভাব ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় অহরহই ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে মানুষের মৃত্যুর মিছিল যেন বেড়েই চলেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৯৭৬ সাল থেকে সর্বশেষ পিনাক-৬ ডুবি পর্যন্ত দেশে লঞ্চ দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৩ হাজারের অধিক এবং আহতের সংখ্যা ছয় শতাধিক।এরপরও রোববার আরেকটি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল আরো ৭০ জনের।এটাই কী শেষ ঘটনা?

পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, দেশটা যেন আবার প্রকৃতির রাজ্যে ফিরে যাচ্ছে। লঞ্চ ডুবে, ভয়াবহ আগুনে, সড়কপথে দুর্ঘটনা, ফ্লাইওভার ভেঙে, আন্দোলন-হরতালে পেট্রোল বোমায়, র‌্যাব, বিজিবি-পুলিশের গুলিতে, ভবন ধসে, শুধু সারি সারি লাশ আর লাশ। লাশের গন্ধ আর স্বজনদের আহাজারিতে আজ সাধারণ মানুষের চোখ ভিজে রক্তজবা। এভাবে মৃত্যুর মাতম ইতিপূর্বে আর দেশের মানুষ দেখেনি।

আর প্রতিটি ঘটনার পর স্বজনদের আহাজারি, আমাদের মন্ত্রী-এমপি আর নেতা-নেত্রীদের শোক, দুঃখ প্রকাশ, তদন্ত কমিটি আর আশ্বাসের বাণী শুনেই বেঁচে আছে এ দেশের কোটি কোটি নিরীহ জনগণ। অনিয়ম, অবহেলা, অব্যবস্থাপনা, আত্মসাৎ, সংশ্লিষ্টদের নজরদারি, দুর্নীতি ও ক্ষমতার লোভের কারণে বাংলাদেশে এই হত্যার সংস্কৃতি চালু হয়েছে। পুলিশের গুলি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা দুর্ঘটনা কোন মৃত্যুরই আজ বিচার নেই। আর এভাবেই চলছে দেশ।

নিহতদের স্বজনদের সান্ত্বনা আর ক্ষতিপূরণের প্রচার-প্রচারনায় সরব আমাদের মিডিয়াগুলো। কিন্তু এতো মৃত্যুর দায়ভার কার? রাষ্ট্রপতির, প্রধানমন্ত্রীর কিংবা বিরোধী নেত্রীর? আমরা জানি, এই দায় তারা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না । আর সরকারের নির্বাহী প্রধান হিসেবে এই সবের দায় মূলত: প্রধানমন্ত্রীর উপরেই বর্তায়। কিন্তু এর কি কোনো প্রতিকার নেই? প্রতিটি ঘটনার পর আমরা আমাদের নেতানেত্রীদের দুঃখ প্রকাশ করতে দেখি কিন্তু আমাদের দুঃখ লাঘব করার কোন স্থায়ী প্রচেষ্টা তাদের নিতে দেখি না। জনগণের একান্ত প্রত্যাশা ও দাবি, মানুষের এই মৃত্যুর মিছিল রাষ্ট্রকেই থামাতে হবে। তাই ঘটনার পর দু:খ প্রকাশ নয়, হানাহানি বন্ধে ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চাই কার্যকর পদক্ষেপ।

লেখক: শিক্ষা ও সমাজ বিষয়ক গবেষক। ই-মেইল: sarderanis@gmail.com

You Might Also Like