রোহিঙ্গা সংকটে দেশের রাজনীতির ইস্যুগুলো চাপা পড়ে গেছে

সৈয়দ সাইফুল ইসলাম : রোহিঙ্গা সংকটে দেশের রাজনীতির জটিল ইস্যুগুলো চাপা পড়ে গেছে। আগস্টে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন চরম উত্তপ্ত ছিল। এক তীব্র ঝড় সৃষ্টি হয়েছিল জাতীয় রাজনীতিতে। সারাদেশের মানুষের মধ্যেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছিল কি হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে। সর্বত্রই আলোচনার বিষয় ছিল সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও রায়ে দেয়া সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ। রায়ে জাতীয় সংসদকে অকার্যকর বলে মন্তব্য করাসহ সরকার পরিচালনায় নানা ব্যর্থতার কথা তুলে ধরা হয়। সামাজিক সম্প্রীতি ধ্বংস হওয়া থেকে শুরু করে সভ্যতা-সংস্কৃতির নানা বিপর্যয়ের কথাও উল্লেখ করা হয় ওই রায়ে। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে প্রধান বিচারপতির অপসারণ চায় ক্ষমতাসীনরা। ২৭ আগস্ট থেকে প্রায় একমাস সুপ্রিমকোর্ট বন্ধ থাকলেও ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা ছিল ঠিকই। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওগর রিজভীর বৈঠকসহ সরকার পক্ষের নানা তৎপরতায় কেউ কেউ ধরে নিয়েছিল কোনো একটা সমঝোতা হয়েছে বা হতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ও দলটির নেতারা কিছুদিন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে বক্তৃতা দেয়া কমিয়েও দিয়েছিল। কিন্তু না, পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের উপর আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ও  আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমসহ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা এস কে সিনহাকে তুলোধুনো করার পর সমঝোতা না হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

তবে রোহিঙ্গা সংকটের কারণে দেশের রাজনীতির এ ইস্যুগুলো মোটামুটি চাপা পড়েই গেছে বলা যায়। যেহেতু উচ্চ আদালতও এখন অবকাশকালীন ছুটিতে। এ ছুটি শেষ হবে আগামী ২ অক্টোবর। সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আপিল করবে কিনা তখনই স্পষ্ট হবে। তাছাড়া আইন সচিবের নিয়োগ বাতিলের বিষয়টিও তখন সামনে আসবে। এদিকে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দেশে ফেরার কথা রয়েছে অক্টোবরের প্রথমার্ধে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও বাংলাদেশ সফরের কথা রয়েছে। যদিও তিনি দ্বিপাক্ষিক একটি বৈঠকে যোগ দিতে ঢাকা আসছেন, কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তার এ সফরকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই দেখা হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে লন্ডনে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ঠ লোকজনের একাধিক বৈঠক হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। ঢাকায়ও সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার একান্ত বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ নিয়ে কৌতুহলও রয়েছে দেশের রাজনীতিতে।

অক্টোবর যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গা মুসলিমরা প্রাণ বাঁচাতে স্বদেশ ছেড়ে বাংলাদেশে দলে দলে প্রবেশ করে। রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই আলোচনার শীর্ষ চলে আসে। যেহেতু রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট এবং সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী বাংলাদেশ তাই এদিকেই নজর দেয় সবাই। এক পর্যায়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম তাদের জন্মস্থান ছেড়ে বাংলাদেশে আসার স্রোত তৈরি হওয়ায় এটি এখন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ে খুব বেশি স্থায়ী হবে না। অক্টোবরেই রোহিঙ্গা সংকটকে ছাপিয়ে রাজনৈতিক সংকটের ইস্যুগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। কারণ, অক্টোবরে জাতীয় রাজনীতি সংশ্লিষ্ট চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে যা পরিস্থিতিকে ভিন্নমাত্রা দিতে পারে। এক. তিন অক্টোবর সুপ্রিমকোর্ট খুলছে। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে কেন্দ্র করে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপে রাজনীতিতে নতুন উপকরণ পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া আইন ও বিচার বিভাগের সচিব পদে আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হকের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তিন মাসের জন্য হাইকোর্টের দেয়া স্থগিতাদেশ ৮ সপ্তাহের জন্যে স্থগিত করেছেন চেম্বার আদালত। গত ২২ আগস্ট আদালত থেকে এ আদেশ আসে। ৮ সপ্তাহ শেষ হচ্ছে অক্টোবরে। তবে এর আগেই সুপ্রিমকোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি হবে স্থগিত আদেশ বহাল থাকবে কি থাকবে না এ বিষয়ে। এতে সরকার ও আদালতের মধ্যে সম্পর্কের দূরত্ব আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দুই. আওয়ামী লীগ-বিএনপি সহ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসির সংলাপ অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহেই শেষ হচ্ছে। এই সংলাপ ও ইসির পরবর্তী পদক্ষেপ খুবই সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ও করণীয় নিয়ে জাতীয় রাজনীতির সুরও পাল্টে যেতে পারে। তিন. অক্টোবর মাসেই ফিরছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। দেশে ফিরেই তিনি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা দেবেন। দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে কর্মসূচী ঘোষণা করবেন। দেখতে যাবেন রোহিঙ্গা পরিস্থিতি। চার. ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ আগামী ২৩ অক্টোবর দু’দিনের সফরে ঢাকা আসছেন। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিসি) বৈঠকে অংশ নিতে ঢাকায় আসলেও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করবেন সুষমা। তাঁর সফরকালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে একটি বৈঠক হতে পারে বলেও আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, সুষমা স্বরাজের সফরসূচি এখনো ঠিক হয়নি। সুষমার ঢাকা সফর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে সংসদে তুমুল আলোচনার পর এ বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নিতে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ হিসেবে ‘রিভিউ’ (রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন) এর সিদ্ধান্ত আ্যাটর্নি জেনারেলকে চিঠি দিয়ে জানাবেন বলে সাংবাদিকদের বললেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। দেশে ফিরে এস কে সিনহা প্রধান বিচারপতি পদে বসবেন কি বসবেন না সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্টতা লক্ষ্য করা না গেলেও সরকার চিন্তামুক্ত হতে পারেনি। তাছাড়া রিভিউর কথা বললেও এস কে সিনহা পদে থাকা অবস্থায় রিভিউ করা নিয়ে এখনো দোটানায় রয়েছে সরকার। অন্যদিকে, খালেদা জিয়া ফিরলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে যেতে পারে এমন ইঙ্গিতও দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, লন্ডনে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠজনদের একাধিক বৈঠকের কথা ইতোমধ্যে সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সব মিলিয়ে অক্টোবর মাসেই চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক অঙ্গন।

ভারতের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে?

সরকারের সঙ্গে বর্তমানে ভারতের যে টানা-পোড়েন চলছে তাও অনেকটা স্পষ্ট। নানা ইস্যুতে মোদি সরকারের সঙ্গে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের দূরত্ব বাড়ছেই। রোহিঙ্গা ইস্যুতেও আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্নভাবে ভারতকে পাশে চেয়েছিল কিন্তু তাতেও সাড়া মেলেনি। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওই বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। এটি ছিল স্রেফে একটি সৌজন্য সাক্ষাত। এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। এদিকে গত ২২ সেপ্টেম্বর শুক্রবার জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সংবাদ সম্মেলনে ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন-ভারতের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয় বলে’ মন্তব্য করেন। শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও চীন যা বলছে, তা বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের সঙ্গে সরকারের যে দূরত্ব বাড়ছে সেটিও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সূত্র: সাপ্তাহিক শীর্ষ কাগজ

You Might Also Like