রিমান্ডেও যেসব নাটক করছেন প্রতারক সাহেদ!

আলোচিত রিজেন্ট গ্রুপ ও রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান শাহেদ করিম ওরফে মো. সাহেদ গ্রেফতারের পরেও তাঁর নাটকের যেন শেষ নেই। র‌্যাব অফিসে র‌্যাবের কর্মকর্তাদের হুঙ্কার দেওয়ার এক দিনের মাথায় এবার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাহেদ কাঁদলেন।

নিজেকে ‘করোনা রোগী’ বলে দাবি করে বললেন, ‘আমি নির্দোষ। পুলিশ ও র‌্যাব আমার সঙ্গে “অন্যায়” করেছে।’

বুধবার সকালে ‘সীমান্ত পেরিয়ে পালানোর সময়’ সাতক্ষীরা থেকে গ্রেফতার সাহেদকে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত হাজির করা হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গ্রেফতার হাসপাতালের এমডি মাসুদ পারভেজকেও একইসঙ্গে আদালতে তোলে গোয়েন্দা পুলিশ।

তাদের দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করা হয় গোয়েন্দা পুলিশের পক্ষ থেকে। শুনানি শেষে মহানগর হাকিম মোহাম্মদ জসিম তা মঞ্জুর করেন।

এ ছাড়া পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে এ মামলায় সাহেদের অন্যতম সহযোগী তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীকে ফের সাত দিনের রিমান্ড দিয়েছেন বিচারক। গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসিম রিমান্ডের এ আদেশ দেন।

আদালতে হাজির করার সময় তাদের নিরাপত্তার কড়াকড়ি বাড়ানো হয়। সাংবাদিকদের এ সময় ভিতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে শুনানিতে উপস্থিত আইনজীবীদের কাছ থেকে দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক আর সাহেদের বক্তব্য জানা গেছে।

এদিকে গোয়েন্দা দফতরে সাহেদকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ তার কাছ থেকে জালিয়াতির নেপথ্য গডফাদারদের নাম জানার চেষ্টা করছে। আদালতে গোয়েন্দা পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসামিরা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট তৈরি ও সরবরাহ করে আসছিলেন।

এজন্য রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ নিজেকে সুধী ও ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি বলে দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন ধুরন্ধর, অর্থলিপ্সু ও পাষণ্ড প্রকৃতির লোক। অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার কাছে মানুষের জীবন-মৃত্যুর কোনো মূল্যই নেই। এ ক্ষেত্রে কোনো রোগী তাদের প্রতারণার কথা বুঝতে পেরে প্রতিবাদ করলে তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দিতেন।

এ ছাড়া করোনা আক্রান্ত রোগীদের নমুনা পরীক্ষার ফর্মে বিনামূল্যে পরীক্ষা করার কথা উল্লেখ থাকলেও সরলমতি প্রত্যেক রোগীর কাছ থেকে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকা করে আদায় করে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আসামিদের এ ধরনের অবৈধ কর্মকা-, প্রতারণা, ভুয়া, জাল-জালিয়াতি, অবহেলা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতি ও প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটে। তাই মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিদের ১০ দিন করে রিমান্ড প্রয়োজন।

আদালতের পরিবেশ : গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয় থেকে সাহেদ ও মাসুদকে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় প্রধান আসামি সাহেদের গায়ে ছিল নীল রঙের শার্ট। শরীরে ছিল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট। মাথায় হেলমেট। মুখে মাস্ক। কোমরে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা ছিল। পায়ে ছিল স্যান্ডেল। শুনানির একপর্যায়ে সাহেদ পানি খেতে চাইলে বিচারক পানি অন্য একজনকে আগে পান করিয়ে পরীক্ষার পর সাহেদের হাতে বোতল দিতে বলেন। আদালতের একজন কর্মচারী তখন নিজে পরীক্ষা করে বোতল সাহেদের হাতে দেন। পরে সাহেদ আদালতকে বলেন, ‘স্যার! আমি একটু কথা বলতে চাই।’ বিচারক তাকে অনুমতি দেন।

অনুমতি পেয়ে সাহেদ বলেন, ‘আমার দুটি হাসপাতালসহ একটি হোস্টেল গভর্নমেন্টকে দিই। এরই মধ্যে যে জিনিসটা হয় স্যার, সেটি হলো আমাদের লাইসেন্স এক বছরের জন্য নবায়ন করা হয়নি। ওনারা লাইসেন্স নবায়নের জন্য আমাদের কাছ থেকে সোনালী ব্যাংকের ট্রেজারিতে টাকা জমা নেয়। টাকা জমা নিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে স্যার। আমি দেড় মাস ধরে নিজেও করোনায় আক্রান্ত ছিলাম।

আমার বাবা করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। যখন কেউ করোনার চিকিৎসা দিতে এগিয়ে আসেনি, তখন বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে আমরাই প্রথম এগিয়ে এসেছি। বাংলাদেশে যখন কোনো হাসপাতাল করোনা চিকিৎসা দিচ্ছিল না তখন রিজেন্ট হাসপাতাল চিকিৎসা দিয়েছে।

কিন্তু আকস্মিকভাবে এ রিপোর্টগুলো সামনে আসে। শুধু তাই না, আমাদের হেড অফিসকে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। হেড অফিসের তো কোনো অন্যায় নাই। আমাদের একটি ল ফার্ম ছিল সেটিও সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের সব প্রতিষ্ঠান সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে।’

এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সাহেদকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি আইনজীবী যে ল ফার্ম দিয়েছেন?’ আইনজীবীরা বিচারককে বলেন, ‘দেখেন স্যার, এখানেও প্রতারণা করেছেন এই আসামি।’

এদিকে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আবু রিমান্ড আবেদেনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘এই সাহেদ বিদেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। তার কারণে ইতালি থেকে বাংলাদেশি শ্রমিক, প্রবাসী কর্মীদের ফেরত আসতে হয়েছে। তিনি পরীক্ষা না করেই ভুয়া করোনা সার্টিফিকেট দিয়েছেন। তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। তারা একটা চক্র। এ চক্রের আরও লোকজনের নাম-ঠিকানা জানার জন্য আরও তথ্য উদ্ধারের জন্য জিজ্ঞাসাবাদ করতে ১০ দিনের রিমান্ডে দেওয়া হোক।’

এ ছাড়া অতিরিক্ত পিপি কে এম সাজ্জাদুল হক শিহাব বলেন, ‘৬ হাজারের বেশি ভুয়া করোনা পরীক্ষার সার্টিফিকেট আসামিরা দিয়েছিলেন। প্রতিটি সার্টিফিকেটের জন্য ৪-৫ হাজার টাকা আদায় করতেন তারা। তারা বড় রকমের ধড়িবাজ, প্রতারক। এই আসামি প্রতারণার গুরু। জাতীয় প্রতারক। ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য তাদের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।’

মামলাসূত্রে জানা গেছে, করোনা সংক্রমিত ব্যক্তিদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে চুক্তি করেন। তবে করোনার নমুনা সংগ্রহ করে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগ ওঠে রিজেন্টের বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া করোনা সংক্রমিত রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের টাকা। এসব অভিযোগ পাওয়ার পর র‌্যাব রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায়।

করোনার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার প্রমাণ পেয়ে র‌্যাব রিজেন্টের সাহেদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা করে। পরে সাহেদ পলাতক ছিলেন। বুধবার ভোরে সাতক্ষীরা থেকে তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।