রিখটার স্কেলের ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে রাজধানী ঢাকা : ৮০ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ

ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে রাজধানীর ৮০ হাজার ভবন। বিশেষজ্ঞদের মতে, রিখটার স্কেলের ৬ থেকে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে মহাদুর্যোগ দেখা দেবে। বিশেষ করে পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার নিচু এলাকা ধ্বংস্তূপে পরিণত হবে।

ঝড়-জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলার অভিজ্ঞতা  থাকলেও  ভূমিকম্পের মতো বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় কোনো অভিজ্ঞতা নেই। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে বিপর্যয় সামলানোর মতো আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নেই।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়, রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা প্রায় ৮০ হাজার। অন্যদিকে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ ইমারতের সংখ্যা ৭২ হাজার।

সূত্র মতে, রাজউক এলাকায় বৈধ ও অবৈধ ভবন কতটি সে সম্পর্কে কারও কাছে সঠিক কোনো তথ্য নেই। তবে ছয় তলা ভবনের বেশি বহুতল ভবনের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ১শ’। এসব ভবনের কমবেশি নির্মাণগত দুর্নীতি ও ত্রুটি রয়েছে।

তবে রাজউকের এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। এর মধ্যে ৩২১টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। বাকি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে আগের অবস্থায়। এসব ভবনের অধিকাংশই পুরান ঢাকায়। তবে এরপরও নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করেছিল রাজউক। কিন্তু সে তালিকায় কতগুলো ভবনকে চিহ্নিত করা হয়েছে তা স্পষ্ট করেনি রাজউক কর্তৃপক্ষ।

কমপ্রিহ্যানসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম (সিডিএমসি) এক জরিপে বলা হয়েছে, সাড়ে ৭ বা ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় শহরের ৪০ ভাগ ভবন ধসে পড়বে। জরিপে আরও বলা হয়েছে, মধুপুর ফল্টে দিনে ভূমিকম্প হলে ঢাকায় ৩০ হাজারের ওপর মানুষ প্রাণ হারাবে; আহত হবে হাজার হাজার মানুষ। একই মাত্রার ভূমিকম্প রাত ২টায় হলে প্রাণ হারাবে ১ থেকে দেড় লাখ মানুষ। এছাড়া পুরান ঢাকার হতাহতের ঝুঁকি আরও বেশি।

গবেষকরা জানান, ঢাকা মহানগরীর অর্ধেকের বেশি ভবনের ভূমিকম্প প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই। পুরান ঢাকায় প্রকৌশলীদের পরামর্শ, ডিজাইন বা সাহায্য ছাড়াই  তৈরি হয়েছে ৬০ শতাংশ বাড়িঘর; ৬৫ শতাংশ বাড়িই ইট-সুরকির তৈরি।
সিডিএসমসি সমীক্ষায় প্রাপ্ত উপাত্ত দেখে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকায় ৫ দশমিক ৫ রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প হলে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এবং ৭-৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ দালানকোঠা, ভবন বা ঘরবাড়ি ধসে পড়বে। ঢাকার প্রায় ৬৫ শতাংশ এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে নরম মাটিতে কিংবা জলাশয় ভরাট করা জায়গায় ৯ থেকে ১৪ তলা ভবন তৈরি। ভূমিকম্পে এ ধরনের পুরো বাড়িই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র বলছে, বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতেই প্রায় দেড় কোটি লোকের বসবাস। ৬০ শতাংশ ভবন ভেঙে পড়লে কী পরিমাণ লোকের প্রাণহানি ঘটতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৩ লাখ ২৬ হাজার বসতবাড়ির ওপর এক সমীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, ৭ থেকে সাড়ে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানীর প্রায় ৭২ হাজার বসতবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। ৮৫ হাজার ভবনের মাঝারি ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

রাজউকের নগর পরিকল্পনা শাখার একজন কর্মকতার দাবি, নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পুরনো যে তালিকা ছিল সেটা ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা  হয়েছিল। কিন্তু তারা এ ব্যাপারে এখনও কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।

রাজউকের একটি সূত্র জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যে জনবল দরকার তা রাজউকের নেই। যে কারণে তালিকা থাকার পরও ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে অনেক সময় বাধার সম্মুখীন হতে হয়। কখনও কখনও ওপর মহলের অনুরোধ রাখতে গিয়ে তালিকায় থাকার পরও কিছু করা সম্ভব হয় না।

সম্প্রতি ‘আগামী প্রজন্মের ঢাকা : আমাদের করণীয়’ গবেষণাভিত্তিক এক সম্মেলনে দেশের বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেন, ঢাকা মহানগরের এখন বিকলাঙ্গ অবস্থা। যেভাবে মহানগরটি বেড়ে উঠেছে, তাতে এর অস্তিত্ব ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ঢাকা মৃত নগরে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা বিশ্বের অনেক নগর মরে যাওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। আগামী প্রজন্মের জন্য ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে কালবিলম্ব না করে সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলেই রাজধানী ঢাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। কিছুদিন পরপরই ঢাকায় মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়। সেমিনারে নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, ভূমিকম্পে ঢাকা শহর মহাঝুঁকিতে আছে। রিখটার স্কেলে ৬ থেকে ৭ মাত্রার ওপর ভূমিকম্প হলে ঢাকায় প্রচ- ক্ষতি হবে। যারা নতুন ঢাকার জলাশয় ভরাট করে নিচু এলাকায় ভবন তৈরি করেছে, তারাসহ পুরান ঢাকার ভবনগুলো মহাঝুঁকিতে পড়বে। এগুলো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা খুব বেশি। এ ব্যাপারে সবার বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করা উচিত।
সরকারের প্রস্তুতি কেমন আছে বলে মনে করেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একেবারেই প্রস্তুতি নেই। ভূমিকম্পে ভবন ধসের নিচে পড়ে থাকা মানুষকে উদ্ধার করার ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশে সাইক্লোনের যে প্রস্তুতি রয়েছে, সেরকম প্রস্তুতিও নেই। তিনি বলেন, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে আমাদের মহাদুর্যোগ দেখা দেবে।

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের সূত্রে জানা গেছে, ভূমিকম্প কিংবা যে কোনো ধরনের ভবন ধসের দুর্ঘটনা পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য অনেক যন্ত্রপাতি আমদানি করেছে সরকার। ওইসব যন্ত্রপাতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে করণীয় সম্পর্কিত পোস্টার, লিফলেট ছাপিয়ে শহরগুলোতে বিতরণ করা হচ্ছে। ২,১০০ নির্মাণ কর্মীকে ভূমিকম্প সহণীয় টেকসই বিল্ডিং তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়ার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪৫০ জন নির্মাণ কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। সিডিএমপি-র সহায়তায় ৬২,০০০ নগর স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

You Might Also Like