হোম » রায় নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্কের সুযোগ নেই : শফিক আহমেদ

রায় নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্কের সুযোগ নেই : শফিক আহমেদ

admin- Saturday, August 5th, 2017

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেওয়া রায় নিয়ে নানা মহলে আলোচনা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গত শনিবারের প্রথম আলো’য় একটি  সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। সরকারের আরেক সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ ও ষোড়শ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষের অন্যতম আইনজীবী মনজিল মোরসেদের সাক্ষাৎকার।

প্রথম আলো : ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে রাজনীতির প্রসঙ্গ আনাকে কীভাবে দেখছেন?

শফিক আহমেদ : এটা বিচার্য ছিল না। মূল বিষয়ের সঙ্গে অন্য যেসব বিষয় এসেছে, তার সম্পর্ক খুব বেশি নেই।

প্রথম আলো : আপনি কি আশঙ্কা করেন সংসদ অতীতের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে?

শফিক আহমেদ : বিচারকেরা বিচার করতে গিয়ে সমসাময়িক কিছু বিষয়ের ওপর মতামত দিতেই পারেন। কিন্তু সেসব বিষয়ে উভয় পক্ষের শুনানির সুযোগ ছিল না। এটা তাই প্রধান বিচারপতির ব্যক্তিগত অভিমত হিসেবে দেখা যায়।

প্রথম আলো : আচরণবিধিতে যেসব নতুন বিধান আনা হয়েছে, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে?

শফিক আহমেদ : ৩৯ দফা আচরণবিধি দেওয়া হয়েছে, কীভাবে বিচারকেরা নিজেদের সংযত করে চলবেন, একে তার একটা নীতিমালা হিসেবেই দেখব।

প্রথম আলো : বিচারকদের সম্পদের বিবরণী এবার আমরা পাব তো?

শফিক আহমেদ : যখন এটা তাঁরা অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তখন তাঁরা এটাকে কার্যকর করার পদক্ষেপ নিশ্চয়ই নেবেন। এতে কোনো অসুবিধা আছে বলে আমি মনে করি না। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় বিচারকদের যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা এতে প্রতিফলিত হতে পারে।

প্রথম আলো : রায় প্রদানের ছয় মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রায় না দেওয়া অপসারণযোগ্য অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বিচারকের সংখ্যা না বাড়িয়ে এটা কি কার্যকর করা সম্ভব?

শফিক আহমেদ : শুনানি করে যে মামলার রায় দেওয়া হয়েছে, সেই মামলার রায় ছয় মাসের মধ্যে সই করতে বলা হয়েছে। এটা সম্ভব। এটা না দিলে পরে বরং বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে। যেসব রায় ইতিমধ্যে ছয় মাসের বেশি সময় চলেছে, তা–ও এখন থেকে ছয় মাসের মধ্যে দিতে হবে।

প্রথম আলো : বিচারক নিয়োগে আইন না হওয়ায় রায়ে উষ্মা প্রকাশ করা হয়েছে। আপনি একটি খসড়া তৈরি করে রেখে এসেছিলেন, এখন সরকার কি এটা করবে?

শফিক আহমেদ : এটা করা উচিত হবে। ৯৫(২)গ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি একটি খসড়া তৈরি করে রেখে এসেছি, এখন তা কোথায় পড়ে আছে জানি না। মামলা ও জনসংখ্যা অনুপাতে বিচারকদের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

প্রথম আলো : পঞ্চম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলে আওয়ামী লীগ এবং ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে শুধু বিএনপি সন্তোষ প্রকাশ করছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

শফিক আহমেদ : কোনো দলবিশেষের জন্য রায় নয়। এ রায় সমগ্র বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সবার জন্য প্রযোজ্য। কোনো রাজনৈতিক দলকে উদ্দেশ করে রায় দেওয়া হয় না। এভাবে চিত্রিত করা কোনো দলেরই উচিত নয়।

প্রথম আলো : প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, দুই সামরিক শাসক দেশকে ব্যানানা রিপাবলিক করেছিলেন। তখন বিচার বিভাগের কী ভূমিকা ছিল।

শফিক আহমেদ : পঁচাত্তরের সামরিক শাসনের পরে সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে বলেছিলেন, সংবিধান সামরিক ফরমানের অধীনে চলে এসেছে। সেটা দুর্ভাগ্যজনক ছিল।

প্রথম আলো : রায় বলেছে, তিনটি স্তম্ভের মধ্যে বিচার বিভাগ অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় রয়েছে। তা–ও ডুবতে বসেছে?

শফিক আহমেদ : এটা সঠিক মন্তব্য।

প্রথম আলো : আদালত বলেছেন, সমাজ এতটাই পঙ্গু হয়ে পড়েছে যে এখানে কোনো ভালো মানুষ আর স্বপ্ন দেখে না। এর দায় কি শুধুই রাজনীতিবিদদের?

শফিক আহমেদ : সবাইকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে। বারবার সামরিক শাসনের ফলে যে দুরবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তার জের এখনো চলছে।

প্রথম আলো : সাত বিচারকই একমত যে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছিল। বিচারক অপসারণের ক্ষমতা নির্দিষ্টভাবে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ পঞ্চম সংশোধনীর সমালোচনা করে চতুর্থ বিষয়ে নীরব থাকে।

শফিক আহমেদ : রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি এবং দেশের স্বাধীনতা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ায় তখন বাকশাল হয়েছিল। স্বাধীনতার পর মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়ে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠন করা উচিত ছিল। কিছু দেশের চাপে তা হয়নি। পরে বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল।

প্রথম আলো : রাষ্ট্রধর্ম ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে অপরিবর্তনীয় মৌলিক কাঠামো করে সংবিধানের ৭(খ) সংযোজনের সময় আপনি আইনমন্ত্রী ছিলেন।

শফিক আহমেদ : বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল মামলায় কোরআন থেকে সুরার বরাত দিয়ে পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছেন বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম একটি ইসলামবিরোধী বিষয়। কারণ, ইসলাম সমগ্র বিশ্ব উম্মাহর জন্য একটি জীবনদর্শন।

প্রথম আলো : মৌলিক কাঠামো বিবেচনায় আমরা অনেক রায় পেয়েছি। কিন্তু রাষ্ট্রধর্ম প্রশ্নের রিট সুপ্রিম কোর্ট নাকচ করে দিয়েছেন।

শফিক আহমেদ : তার কারণ রিট আবেদনকারীরা এই রায়টি দেখাতে পারেননি। যদি দেখাতেন তাহলে হয়তো ভিন্ন ফল মিলত। ভবিষ্যতে এটা চ্যালেঞ্জ করার পথ খোলা আছে। আমি বিচারপতি ইনায়েতুর রহিমের সঙ্গে একমত যে আমরা সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে রাখলে তা কোরআন নির্দেশিত বিশ্ব উম্মাহর মুক্তির ধর্ম হিসেবে মর্যাদা হারায়। জামায়াতের নিবন্ধনসংক্রান্ত ওই রায় আপিল বিভাগে বিচারাধীন। অ্যাটর্নি জেনারেল এটা শুনানির জন্য উদ্যোগ নিতে পারেন।

প্রথম আলো : সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কার্যকর হবে বলে আশাবাদী?

শফিক আহমেদ : ১৯৭৭ সালে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংবিধানে আসার পরে এ পর্যন্ত দুজনকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। একজনের এলএলবির সনদ জাল ও অন্যজনকে এরশাদের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করার কারণে। তাঁরা পদত্যাগ করেছিলেন। আশা করব, এটা কার্যকর হবে।

প্রথম আলো : এখন এটা সংবিধানে কীভাবে ঢুকবে? আপনি পঞ্চম সংশোধনীর রায়ের পরে সংসদের বিল পাসের আগেই সংবিধান ছাপিয়েছিলেন। তখন প্রধানমন্ত্রীর তাতে সম্মতি ছিল?

শফিক আহমেদ : অবশ্যই ছিল। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়েই আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে সংবিধান পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। এখন যদি রিভিউ করে তাহলে তার ফলাফলের জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে অপেক্ষা করতে হবে।

প্রথম আলো : সংসদের আগামী অধিবেশনে আপনি কী আশা করেন? কোনো ঝোড়ো হাওয়া?

শফিক আহমেদ : আমার মত হলো অনেকে বলছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংবিধানে ফিরে এসেছে। আরেক দল বলছে, এটা এখনো সংসদের এখতিয়ারের মধ্যে রয়ে গেছে। এটা একটা বিষয়। অন্যটি হলো, আচরণবিধিতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের বিচারকদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে তাঁরা নিজেরাই তদন্ত করতে পারবেন। আমার মনে হয়, এই রায়ের পরে জাতীয় সংসদে বিতর্কের আর কোনো অবকাশ নেই। তা না হলে তাঁরা রিভিউর কথা বলতেন না।

প্রথম আলো : কাউন্সিল–ব্যবস্থা ফিরে আসায় কেন মনে করেন যে বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা অধিকতর সমুন্নত থাকবে?

শফিক আহমেদ : আমি বলব, বাস্তব কোনো অসুবিধা হবে না। বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা বিচারকদের হাতে থাকাই ভালো। পঞ্চদশ সংশোধনীতে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা শেষে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল রেখে দেওয়া হয়েছিল।

প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।

শফিক আহমেদ : ধন্যবাদ।

প্রথম আলো’র সৌজন্যে

সর্বশেষ সংবাদ