রাত পোহালেই দিল্লীর মসনদ দখলের লড়াই! কে বসবে মসনদে?

বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ বলে পরিচিত ভারতের এক নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে দেশটিতে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন। ভারতের ৯০ কোটি ভোটার এখন টানটান উত্তেজনা আর ঔৎসুক্যে অপেক্ষায় আছেন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিতে। ভারতবাসী কাকে বসবেন দিল্লীর মসনদে!

সারা দেশব্যাপি অর্থনৈতিক মন্দা, ব্যাপক বেকারত্ব, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, কৃষক বিক্ষোভ, কালো টাকা আর দুর্নীতির ছড়াছড়ি; পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় বিদ্রোহীদের হামলা, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ। এমনসব ইস্যু নিয়ে দেশব্যাপী লোকসভার ৫৪৩ নির্বাচনী এলাকায় প্রায় ৯০ কোটি ভোটার এখন অপেক্ষায় আছেন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে বেছে নিতে। তাদের পছন্দের ওপরই নির্ভর করে নরেন্দ্র মোদির ভাগ্য। আর এই নির্বাচনেই নির্ধারিত হবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসবেন, নাকি রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস আবার ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করবে।

ভারত পার্লামেন্টের নিম্ন কক্ষ লোকসভার ৫৪৫টি আসনের মধ্যে নির্বাচন হয় ৫৪৩টিতে। ঔপনিবেশিক যুগে ভারতীয়দের বিয়ে করা ইউরোপীয় নাগরিকদের উত্তরসূরিদের জন্য বাকি দুটি আসন সংরক্ষিত থাকে। দেশটির প্রেসিডেন্ট এ দুই আসনে মনোনয়ন দেন। আজ থেকে মোট ৭ দফায় এ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যা শেষ হবে আগামী ১৯ মে। আর ফল ঘোষণা হবে ২৩ মে। আজ প্রথম দফায় ২০টি রাজ্যের মোট ৯১টি লোকসভা আসনে ভোটগ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল,

মেঘালয়, উত্তরাখ-, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম, লক্ষদ্বীপ, আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপ এবং তেলেঙ্গানার আসনগুলোয় আজ ভোটগ্রহণ হবে। এ ছাড়া অন্যান্য রাজ্যের প্রথম ধাপের নির্বাচনী এলাকার মধ্যে রয়েছে আসাম, বিহার, ছত্তিশগড়, জম্মু-কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র, মনিপুর, উড়িষ্যা, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ। এর মধ্যে প্রথম দফায় অন্ধ্রপ্রদেশে মোট ২৫ আসনে ভোট হবে। এগুলো হলো- অমলাপুরম, অনাকাপল্লি, অনন্তপুর, আরাকু, বাপাটলা, চিত্তুর, এলুরু, গুন্টুর, হিন্দুপুর, কাডাপা, কাকিনাড়া, কুরনুল, মছলিপট্টনম, নান্দিয়াল, নরসরাওপেট, নরসাপুরম, নেল্লোর, ওঙ্গল, রাজামুন্দ্রি, রাজমপেট, শ্রীকাকুলাম, তিরুপতি, বিজয়ওয়াডা, বিশাখাপত্তনম, বিজয়নগরম। অরুণাচলে মোট আসন সংখ্যা ২। এগুলো হলো পূর্ব অরুণাচল ও পশ্চিম অরুণাচল। মেঘালয়ে মোট আসন সংখ্যা ২। এগুলো হলো শিলং ও তুরা। উত্তরাখ-ে মোট আসন সংখ্যা ৫। এগুলো হলো আলমোড়া, গাড়োয়াল, হরিদ্বার, নৈনিতাল-উধম সিংহ নগর, টেহরি গাড়োয়াল। ত্রিপুরা, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম, ছত্তিশগড় ও লক্ষদ্বীপে ভোট হবে ১টি করে আসনে। উড়িষ্যায় ভোট হবে ৪টি আসনে। এগুলো হলো- ব্রহ্মপুর, কালাহান্ডি, কোরাপুট ও নবরংপুর। তেলেঙ্গানায় ভোট হবে ১৭টি আসনে। এগুলো হলো- আদিলাবাদ, ভোঙ্গির, চেলভেলা, হায়দরাবাদ, করিমনগর, খাম্মাম, মেহবুবাবাদ, মেহবুবনগর, মালকাজগিরি, মেডক, নগরকুরনুল, নালগোন্ডা, নিজামাবাদ, পেড্ডাপলে, সেকন্দরাবাদ, বরঙ্গল, জাহিরাবাদ। উত্তরপ্রদেশে ভোট হবে ৮ আসনে। এগুলো হলো- বাগপত, বিজনৌর, গৌতমবুদ্ধ নগর, গাজিয়াবাদ, কৈরানা, মেরঠ, মুজফফরনগর, সহারানপুর। জম্মু-কাশ্মীরে ভোট হবে ২টি আসনে, এগুলো হলো- বারামুলা ও জম্মু। আসামে ভোট হবে ৫ আসনে। এগুলো হলোÑ ডিব্রুগড়, জোরহাট, কলিয়াবর, লখিমপুর, তেজপুর। বিহারে ভোট হবে ৪ আসনে। এগুলো হলো- অওরঙ্গাবাদ, গয়া, জমুই ও নওয়াদা। পশ্চিমবঙ্গে ভোট হবে দুটি আসনে; এগুলো হলো- আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার। এ নির্বাচনের দ্বিতীয় থেকে সপ্তম দফায় ভোটগ্রহণ চলবে ১৮, ২৩ ও ২৯ এপ্রিল এবং ৬, ১২, ১৯ মে পর্যন্ত।

ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন ইডিআই জানিয়েছে, এবারের লোকসভা নির্বাচনের জন্য তারা প্রায় ১০ লাখ ভোটকেন্দ্র স্থাপন করছে, যা গত লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। কোনো কেন্দ্রই যেন ভোটারদের থেকে ২ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে না হয়, এ নির্দেশনা মেনেই এবার এতগুলো কেন্দ্র বসানোর পরিকল্পনা করা হয়। বিপুল এ কর্মযজ্ঞে প্রচুর সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা রক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটের সময় সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসী কোনো গোষ্ঠী বা বিদ্রোহীরা যেন নাশকতা করতে না পারে, সে জন্য সতর্ক রয়েছে পুলিশ ও বিএসএফ। অন্যবারের মতো এবারও দুর্গম অঞ্চলগুলোয় হেঁটে, সড়কপথে, বিশেষ ট্রেনে, হেলিকপ্টারে, নৌকা, এমনকি কখনো কখনো হাতির পিঠে চেপে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন কর্মকর্তারা।

এর আগে ২০১৪ সালে ভারতে ষষ্ঠদশ লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় বিজেপি। আর দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিসহ নানা কারণে ভরাডুবি ঘটে তৎকালীন ক্ষমতাসীন কংগ্রেসের। ওই নির্বাচনে ৫৪৩ আসনের মধ্যে ২৮২টি লাভ করে বিজেপি। জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ) লাভ করে ৫৪টি আসন। অন্যদিকে কংগ্রেস লাভ করে মাত্র ৪৪টি আসন। এ ছাড়া ইউপিএ জোট ১৬, এডিএমকে ৩৭, তৃণমূল ৩৪, বিজেডি ২০, বামফ্রন্ট ১২, টিআরএস ২১ ও অন্য দলগুলো ৩৩টি আসন লাভ করে।

এবারও টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে বেশ আটঘাট বেঁধেই নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি ও তার দল বিজেপি। ইতোমধ্যেই চারটি সংস্থার পরিচালিত সমীক্ষাও বলেছে, ২০১৪ সালের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বিজেপিই আবারও ক্ষমতায় আসবে। এ ক্ষেত্রে তাদের ঢাল হতে পারে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট (এনডিএ)। অর্থাৎ জোটের হিসাবেই বিজেপি পৌঁছাতে পারে সরকার গঠনের জন্য ম্যাজিক ফিগার বলে পরিচিত ২৭২ আসনে।

অন্যদিকে হারানো ক্ষমতা ফিরে পেতে এবার কংগ্রেসও মরণকামড় দিয়েছে। তবে তাদের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট আগের মতো কার্যকর না হওয়ায় এ ক্ষেত্রে একটু পিছিয়ে আছে তারা। যদিও এর মধ্যেই খবর এসেছে দিল্লি ও হরিয়ানাতে বিজেপিকে রুখতে কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টি জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে পারে।

You Might Also Like