যে কারণে ইরানে হামলা ‘করেননি’ ট্রাম্প

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তার নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইরানে আক্রমণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়েই ছিল, কিন্তু তাতে দেড়শ মানুষের মৃত্যু হতে পারে শুনে শেষ মুহূর্তে তিনি হামলার সিদ্ধান্ত বদলান।

তার ভাষায়, একটি মানুষবিহীন ড্রোন ভূপাতিত করার বদলায় দেড়শ মানুষের মৃত্যু ঠিক যুক্তিযুক্ত হত না।

ট্রাম্প বলছেন, তারা ইরানের তিনটি স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। নির্ধারিত সময়ের মাত্র ১০ মিনিট আগে তা বাতিলের ওই নির্দেশ দেন তিনি।

বৃহস্পতিবার খুব ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা ‘ড্রোন’ (চালকবিহীন বিমান) গুলি করে ভূপাতিত করে ইরান। ড্রোনটি ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমুজগান প্রদেশে কুহমোবারকের কাছে আকাশসীমা লংঘন করেছিল বলে অভিযোগ তেহরানের।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, ড্রোনটি আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় ছিল। ইরান ‘বিনা উসকানিতে’ হামলা করেছে।

ওই অঞ্চলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমর প্রস্তুতি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এমনিতেই উত্তেজনা চলছিল। ইরান গুলি করে ড্রোন নামানোর পর তা নতুন মাত্রা পায়।

আরকিউ-৪ গ্লোবাল হক ড্রোনটি ভূপাতিত করে ইরান ‘চরম ভুল’ করেছে বলে এক টুইটে হুঁশিয়ার করেন ট্রাম্প।

শুক্রবার সকালে এ বিষয়ে একাধিক টুইট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ইরানে হামলা চালানোর জন্য তড়িঘড়ি নেই তার।

“আমাদের সেনাবাহিনী পুনঃসজ্জিত, নতুন এবং এগিয়ে চলার জন্য প্রস্তুত, এখন পর্যন্ত বিশ্বের সেরা।”

যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ইরানের সময় বৃহস্পতিবার ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানালেও ট্রাম্প বলেছেন সোমবার ঘটেছে ঘটনাটি।

সম্প্রতি পারস্য উপসাগরে সৌদি আরবের তেলের ট্যাঙ্কারে হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। এরমধ্যে শিগগিরই পরমাণু কর্মসূচি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে বেঁধে দেওয়া সীমার উপরে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় ইরান।

ইরানের ভূপাতিত করা যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ ইরানের ভূপাতিত করা যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ তেহরানের ওপর চাপ প্রয়োগের কথা বলে গত বছর এককভাবে ২০১৫ সালের ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র।

হামলা পরিকল্পনা বাতিলের কথা জানান দেওয়া টুইটে ট্রাম্প লেখেন, “ইরান কখনও পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।।”

বৃহস্পতিবার রাতে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর কথাও জানান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্র এখন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে ইরানের বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য সোমবার বসার আহ্বান জানিয়েছে।

যে পরিকল্পনা হয়েছিল

নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের প্রথম প্রতিবেদনে জানায়, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায়ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ও কূটনীতিকরা ইরানের রাডার ও মিসাইল ব্যাটারিসহ কয়েকটি স্থাপনায় হামলা চালানো হচ্ছে বলে জানতেন।

নাম প্রকাশ না করে একজন জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এতে বলা হয়, “জঙ্গি বিমান আকাশে ছিল এবং যুদ্ধ জাহাজও অবস্থান নিয়ে ছিল। তবে থেমে যাওয়ার আদেশ আসার পর কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়নি।”

ইরানি সেনাবাহিনী বা বেসামরিক নাগরিকদের হতাহত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে শুক্রবার প্রথম প্রহরেই ওই হামলা চালানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে জানায় নিউ ইয়র্ক টাইমস।

যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যগুলো বলছে, হামলার প্রস্তাব দিয়েছিল পেন্টাগন। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সামনে যে প্রস্তাবগুলো তোলা হয়, তার মধ্যে একটি ছিল হামলা।

তবে হামলা চালানো হলে ওই অঞ্চলে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছিলেন পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

পরে ট্রাম্প বৃহস্পতিবার বেশিরভাগ সময় তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাবৃন্দ এবং কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে ইরান নিয়ে আলোচনার পর সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত বাতিল হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন কঠোর অবস্থানের পক্ষে থাকলেও কংগ্রেস সদস্যরা সাবধানে এগোনোর আহ্বান জানান।

এদিকে দুই ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, রাতেই ওমানের মাধ্যমে ট্রাম্পের কাছ থেকে আসন্ন আক্রমণের হুঁশিয়ারি পান তারা।

তবে পরে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের একজন মুখপাত্র এই খবর অস্বীকার করেছেন।

ইরান যা বলছে

ইরানে যে কোনো ধরনের হামলা চালানো হলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করেছেন দেশটির একজন কর্মকর্তা।

ইরানের উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেয়েদ সাজ্জাদপুর বিবিসিকে বলেন, “আপনি ইরানের সীমানা লংঘন করলে আমরা নিজেদের রক্ষা করব।”

ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অনেকে ইরানে সরকার উৎখাত করতে চায় বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

অন্যরা যা বলছেন

যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেট দলের নেতা ও হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর কোনো তাড়না নেই আমেরিকার।

আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট দলীয় প্রার্থী হওয়ার লড়াইয়ে এগিয়ে থাকা জো বাইডেন ইরান নিয়ে ট্রাম্পের নীতিকে ‘নিজে বিপর্যয় টেনে আনা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, যুদ্ধ বাঁধলে তা ‘কল্পনাতীত পরিণতির বিপর্যয়’ নিয়ে আসবে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সহনশীলতা দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক জরুরি আদেশে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারলাইনগুলোকে তেহরান নিয়ন্ত্রিত আকাশ সীমা ব্যবহার না করার নির্দেশ দিয়েছে।

এর বাইরে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, নেদারল্যান্ডসের কেএলএম, এমিরেটস এবং অস্ট্রেলিয়ার কান্তাসসহ অন্যান্য দেশের বেশ কয়েকটি এয়ারলাইন ইরানের আকাশ সীমা এড়াতে ফ্লাইট রুট পরিবর্তনের কথা জানিয়েছে।

You Might Also Like