হোম » যুদ্ধটা কি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা’র একার?

যুদ্ধটা কি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা’র একার?

admin- Wednesday, August 16th, 2017

সাহেদ আলম : বাংলাদেশের বিচার বিভাগ যে সম্প্রতি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে সেটা বোঝা যাচ্ছে কিছু বাক বিতণ্ডায়। কিছু যুগান্তকারী রায়ে এবং কিছুটা প্রধান বিচারপতির কথাবার্তাতে স্পষ্ট হচ্ছে। বেশ খানিকটা অবাক করে দিয়ে সম্প্রতি সরকার আর বিচার বিভাগের মধ্যকার যে যুদ্ধ চলছিল, বিচারপতি অপসারণ ক্ষমতা নিয়ে, সেখানে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব, অর্থাৎ নিজেদের বিচার নিজেরা করার পক্ষেই আইন সমুন্নত রেখেছে আদালত।

এ নিয়ে ঝড়টা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। অর্থাৎ খুব বেশি ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। এটি যে কত বড় একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ সেটা আমি এই লেখার শেষ দিকে আলোচনা করবো। এখনই যেটা বলতে চাচ্ছি সেটা হলো, সব দেখে মনে হচ্ছে প্রধান বিচারপতি একাই যুদ্ধটা চালিয়ে নিচ্ছেন। তার পক্ষে বাংলাদেশের গণমাধ্যম আছে বলে মনে হয়নি। অন্তত কিছু সংবাদের ধরন দেখে। এজন্যই লিখছি, এই যুদ্ধটা কি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা’র একার? নাকি এটা একটা সার্বভৌম দেশের জন্য, বিচার বিভাগের মর্যাদা সমুন্নত রাখার দায়িত্ব সবার?

গণতান্ত্রিকভাবে সফল এবং আমরা কথায় কথায় যে দেশের উদাহরণ টানি সেই আমেরিকার বিচার বিভাগ আর সবচেয়ে ব্যর্থ রাষ্ট্র, অসভ্য রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের বিবেচনায় যেই দেশ সেই পাকিস্তানের কিছু প্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা করেই লেখাটির গভীরে যেতে চাই।

আমেরিকার মহাপ্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশের মালিকানা যারা দাবী করেন, সেই শেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ সমর্থন তার দিকে। একমাত্র জনসাধারণের সমর্থনের প্রেক্ষিতেই তিনি একের পর এক হঠকারী, অসাংবিধানিক পদক্ষেপ নিয়ে চলছেন। দুটি বিপক্ষ শক্তি সক্রিয় তার ঐ সব অসাংবিধানিক কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। একটি হলো বিচার বিভাগ অন্যটি হলো নানা ধারায় ছড়ানো ছিটানো গণমাধ্যম অথবা সামাজিক প্রচারমাধ্যম।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তিনি এক নির্বাহী আদেশ জারি করলেন, যে মুসলিম প্রধান ৭টি দেশ থেকে সকল ধরনের নাগরিক এবং শরণার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়ে। কী অরাজকতা শুরু হলো সেই নির্বাহী আদেশে।

দেশের সবগুলো বড় বড় বিমান বন্দরে স্বাভাবিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরী হলো। বিমান বন্দর থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হলো শতাধিক মানুষকে। এরপর জন আন্দোলনের ডাক দিল আমেরিকান সিভিল রাইটস মুভমেন্ট এর সদস্যরা। কয়েকটি রাজ্যে আলাদা আলাদা ভাবে মামলা হলো প্রেসিডেন্ট এর নির্বাহী আদেশের বিরুদ্ধে।

উত্তর পশ্চিম কোনের রাজ্য ওয়াশিংটন এর রাজধানী সিয়াটল এর ফেডারেল বিচারপতি যিনি নিজে একজন কনজারভেটিভ বা ট্রাম্পের দলের মৃদু সমর্থনকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনি নিজেও দেখলেন এই নির্বাহী আদেশ সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি আদেশ দিলেন প্রেসিডেন্ট এর নির্বাহী আদেশ এর কার্যকারিতা বন্ধে।

সাথে সাথে সব বিমান বন্দর আদালতের আদেশ পালন করতে শুরু করলো এবং যাদেরকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল দেশে, তাদেরকে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার অনুমতি দিতে লাগলো ইমিগ্রেশন বিভাগ। এর পর ডোনাল্ড ট্রাম্প যারপরণাই ক্ষিপ্ত হয়ে কটূক্তি করতে শুরু করলেন বিচারকদের নিয়ে, এবং বিচার ব্যবস্থা নিয়ে।

এর পর জেদি এবং একরোখা প্রেসিডেন্ট অনেক কাট ছাঁট করে, মাস দুয়েক পর আবারো একটি নির্বাহী আদেশ জারি করলেন। সেখানে ৭টির পরিবর্তে ৬টি দেশের নাম রাখলেন। এবং অনেক সংশোধনী আনলেন সেই নির্বাহী আদেশে।

এবারও মামলা হলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে হাওয়াই দ্বীপের ফেডারেল আদালত এই নির্বাহী আদেশটিকেও অবৈধ ঘোষণা করলো। পরে অবশ্য সুপ্রিম কোর্টে ট্রাম্প মনোনীত একজন বিচারপতি আসার প্রেক্ষিতে সেই নির্বাহী আদেশটির সব ধারালো বিধি বিধানকে বসিয়ে রেখে নাম মাত্র একটি কার্যকারিতা বলবৎ রাখার পক্ষে রায় দিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের কথা যখন আসলো তখন আরো একটু কথা বলি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত বিধি বিধান আর ধারা নিয়ে। সুপ্রিম কোর্ট এখানে ৯ বিচারপতির পদ আছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ বিষয়টি এখানে পুলসিরাত পার হওয়ার মতই একটি প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট তার বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির আসনে কাকে মনোনয়ন দেবেন সেটা তার উপর নির্ভর করে, তবে তার মনোনয়ন হলেই যে একজন বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাবেন সেই সুযোগ নেই।

বলে রাখি এই দেশে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে যিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তিনি আজীবন সেই দায়িত্বে থাকেন। তাই তার নিয়োগের আগে সর্বসম্মত ভাবে সব দল মিলে একটা পর্যায়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হয়।

একেবারে কট্টর ডানপন্থি বিচারক হিসেবে পরিচিত বিচারপতি অ্যান্থনি স্কালিয়া হঠাৎ মারা যাওয়ার পর, একজন বিচারপতি নিয়োগের সুযোগ হয়েছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার। তিনি ঘটা করে, মধ্যপন্থী উদার একজন বিচারপতি, মেরিক গ্যারল্যান্ডকে মনোনীত করেছিলেন। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আইন বিভাগ সিনেটের সদস্যরা ( রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেট, যেখানে ওবামা বা ডেমোক্রাটদের কোন ক্ষমতা ছিল না) সেই বিচারপতি মেরিক গ্যারল্যান্ডের মনোনয়ন চূড়ান্তে কোন শুনানী বা জেরা পর্যন্ত করতে সম্মত হয়নি।

ফলাফল বিফলে গিয়েছিল সেই বিচারপতি মনোনয়ন। পরে ট্রাম্প জয়ী হওয়ার পর, একজন বিচারপতি নেইল গোরসাচকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান সিনেট তার মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছে, তবে ৬০ জন সিনেটরের যে সমর্থন দরকার ছিল সেটা পায়নি সিনেট। তাই আগের নিয়ম ভেঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিনেটরের সমর্থনের মাধ্যমেই তার নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে।

এত দীর্ঘ লেখার কারণ, ঐ দেশের বিচারপতি নিয়োগ দানের প্রক্রিয়া একটু ব্যাখ্যা করা। যেখানে বিচারপতিকে মনোনয়ন দেন ঠিকই প্রেসিডেন্ট কিন্তু তার নিয়োগ চূড়ান্ত হতে দরকার হয় সব দল আর মতের সমর্থন। আর একবার নিয়োগ দেয়া হলেই যে তিনি প্রেসিডেন্ট বা নির্বাহী বিভাগের দাসে রূপান্তরিত হন, সেই নজির নেই। যে কারণেই প্রেসিডেন্ট এর আদেশ মুহূর্তেই বাতিল করার ক্ষমতা রাখেন একজন রাজ্য বিচারকও, এবং সেটা পালনে বাধ্য হয় দেশের সকল প্রশাসন।

এবার আসি পাকিস্তানের কথায়। পাকিস্তানের আদালত সম্প্রতি রায় দিয়েছে যে ক্ষমতাসীন দলের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ একজন দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ। আলোচিত পানামা পেপার্স এর দুর্নীতির তালিকায় তার নাম ছিল এবং তার পরিবার অবৈধভাবে লন্ডনে বাড়ি গাড়ির মালিক হয়েছে এই অভিযোগে নওয়াজের বিরুদ্ধে মাঠে আন্দোলন শুরু করেছিল ইমারান খান, তার তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের মাধ্যমে।

আদালতের রায়ে যখন নওয়াজ পদত্যাগে বাধ্য হলেন তখন আমাদের অনেক বিশ্লেষক বলতে শুরু করলেন, পাকিস্তানের আদালত সামরিক বাহিনীর বেশ্যা’য় পরিণত হয়েছে। এই রায় সেনাবাহিনীর ইচ্ছার প্রতিফলন। কিন্তু তারা ভুলে গেছেন, এই একই আদালত সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিল।

সে সময় প্রধান বিচারপতি ইফতেখার মাহমুদকে বরখাস্ত করেছিল পারভেজ মোশাররফ। কিন্তু বিচারবিভাগ ইফতেখারকে পুনর্বহাল করতে এক দৃষ্টান্তমূলক ঐক্য গড়ে তুলেছিল। সকল বিচার বিভাগ এক হয়ে গিয়েছিল সামরিক মদদপুষ্ট পারভেজ মোশাররফ এর বিরুদ্ধে। পরে তাকে আবার স্বপদে নিতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানের প্রশাসন। এখন আবার অনেক দিন পর আলোচনায় পাকিস্তানের বিচারবিভাগ।

আমাদের বিচার বিভাগ নিয়েও এখন সতেচন মহলে মৃদু আলোচনা হচ্ছে। সেই আলোচনা হলো, সরকার দারুন ভাবে চেয়েছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল, যেই কাউন্সিল-ই সিদ্ধান্ত দেবে কোন বিচারকের অপসারণ ক্ষমতা কার কাছে থাকবে। সংসদের দ্বারা গৃহীত সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতির নির্দেশে নাকি বিচারকদের অভিভাবক প্রতিষ্ঠান জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে।

বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, অনেকটা যুদ্ধ করছেন নিজে নিজেই, এবং তিনি বিচার অঙ্গনে পুতুল সংসদ আর পুতল রাষ্ট্রপতির কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছেন। যার প্রেক্ষিতে, আমাদের সরকারের অ্যাটর্নী জেনারেল মাহবুব আলম তার প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কনসেপ্টটা হলো সেনা শাসকদের কনসেপ্ট, পাকিস্তানের কনসেপ্ট, জিয়াউর রহমানের কনসেপ্ট। এই রায়ের মধ্য দিয়ে যা কিছু পুনঃস্থাপিত হলো, তা আমাদের মূল সংবিধান থেকে দূরে নিয়ে যাবে (বাংলা ট্রিবিউন ২ আগষ্ট, ২০১৭)।’

এই অ্যাটর্নী জেনারেল এবং আইনমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি অনেকবার। বারবারই তাকে বলতে শোনা গেছে কুচক্রীরা দেশে আইনের শাসন উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে। বিচার বিভাগের সাথে নির্বাহী বিভাগের দুরত্ব বাড়াতে এই দু’জন কাজ করছেন এই অভিযোগ প্রকাশ্যে বিচারপতি না বললেও তার কথাবার্তায় বোঝা গেছে, তিনি এই দু’জনকে মানতে পারছেন না।

এই আইনমন্ত্রী যিনি বিনা ভোটে, টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রী হয়েছেন। তিনি অনেক ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চেয়েও বেশি আওয়ামী লীগার বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। সেটা তার কথাবার্তাতে প্রকাশ পায় হর হামেশায়। আগের দিন তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে যে বিষোদগার করেছেন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে তার কটি লাইন এখানে তুলে দিলাম।

আইনমন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির যে ক্ষমতা, সেটা তারা নিয়ে নিতে চায়! আমি কিভাবে সেটা দেই? আপনারাই রায় দেন আপনারা বলেন, আমিতো সেটা দিতে পারি না। আমি বললাম, আমি তো সেটা দিতে পারি না, আসুন আমরা আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সেটা ঠিক করে নিই। আমরা আপনাদের কাছে এটা রাফ পাঠিয়েছি। আপনারা সেটা সংশোধন করে পাঠিয়েছেন। তার ওপর আমরা শুধু একটা জায়গায়ই হাত লাগিয়েছি, যেখানে ১১৬ অনুচ্ছেদ দ্বারা রাষ্ট্রপতির যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সেটাতে।

আর তিনি কি করলেন? এজলাসে উঠে বলেন হাইকোর্টটা উঠিয়ে দেন। আরে, হাইকোর্ট তো করে দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমরা কিভাবে হাইকোর্ট উঠিয়ে দেবো!’ (সুত্র চ্যানেল আই অনলাইন)

অর্থাৎ উনি বলতে চান, যেহেতু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাইকোর্ট করেছিলেন, তাই তাঁর দল বল, তার পরিবার আর তার সমর্থকেরা যতদিন বেঁচে থাকবে, বা যেভাবে চাইবে সেভাবেই চলতে হবে হাইকোর্টকে। তার চাওয়ার সাথে সরকার প্রধানের চাওয়ার যে খুব বেশি ফারাক নেই সেটা কদিন আগে প্রধান বিচারপতির সামনে প্রধানমন্ত্রীর করা একটি ধমক সুলভ উক্তিতেই প্রকাশ পেয়েছে।

‘জনপ্রতিনিধিরাই কিন্তু জনগনের ভোটে নির্বাচিত। তারা জনগণের পক্ষে কাজ করে, আইন প্রণয়ন করার জন্য রাত দিন খাটাখাটুনী করে। সবাই মিলে যখন একটি আইন করা হয়, আর আপনারা দু’জন মিলে বসে সেটাকে যখন বাতিল করেন, তখন কিন্তু সব পরিশ্রম বৃথা যায়। কাজেই, বিচার বিভাগ আর আইন বিভাগের মধ্যে দ্বন্দ্ব কাম্য নয়। সবার কিন্তু ক্ষমতা আছে। কেউ কারো উপরে নয়’- যতটুকু মনে পড়ে এ জাতীয় কিছু কথা বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী যদি আমার স্মৃতি ভ্রম না ঘটে।

আমি পরম শ্রদ্ধা নিয়েই বলতে চাই প্রধানমন্ত্রী অথবা অ্যাটর্নী জেনারেল, আপনারা যে সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতা নিয়ে আক্ষেপ করছেন, সেটা কি বিড়ালের মায়াকান্নার মতই না? এই সংসদে প্রধানমন্ত্রীসহ ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত। গত নির্বাচনে আপনাদের হিসাবে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে বাকী সংসদ সদস্যদের ভাণ্ডারে, যদিও প্রকৃতসংখ্যা ১০ শতাংশের বেশি নয়। সেই সংসদ কিভাবে সকল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, দয়া করে বলবেন কী?

আর যেই রাষ্ট্রপতি আপনার দলীয় আদর্শের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ তিনি তো আপনাদের করা আইনেই একজন পুতুল রাষ্ট্রপতি। কবর জিয়ারত করা ছাড়া তো তার আর কোন কাজ নেই। কোন স্বাধীনতা নেই। তাহলে এই ১৫৪ জন আর বাকী ৪০ ভাগ ভোট পাওয়া সদস্যদের আঙুলের নির্দেশনায় চলবে একটা দেশের বিচারপতিরা? এর চেয়ে বে-আইনী শাসন আর কোন সভ্য দেশে থাকতে পারে?

সবই ঠিক ছিল, যদি সত্যিকার অর্থে সংসদটি প্রতিনিধিত্বমূলক থাকত। সত্যিকারের জন প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে আসতেন এখানে। সত্যিকারের দল মতের পরীক্ষা দিয়ে সততার নজির সৃষ্টি করে একজন বিচারপতি নিয়োগের বিধান থাকতো দেশে। সত্যিকারের নির্বাচন ব্যবস্থার মাধ্যমে জনমত প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ থাকত। প্রধানমন্ত্রী আপনার কথাখানি যেটি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে শুনিয়েছেন সেই কথাখানি আপনাকে একবার শুনিয়ে এই লেখার শেষ টানতে চাই।

আপনি বলেছিলেন, সকল কষ্টের আইন দু’জন বিচারপতি বসে না করে দিলেন, আর সব কষ্ট বৃথা গেল। বিচারপতি খায়রুল হকের দেয়া একটি রায়, দেশের সকল জনগোষ্ঠীর আক্ষেপের কারণ হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক বাতিল করার রায়। তখন আপনি বিনা বাক্যে সেটি মেনে নিয়ে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন দেশকে। এখন সুরেন্দ্র কুমার সিনহার প্রতি নাখোশ হওয়াটা কতটা যুক্তিযুক্ত?

এজন্যই বলি, এই যুদ্ধটা সুরেন্দ্র কুমার সিনহার একার যুদ্ধ নয়। মানুষকে সচেতন হতে হবে। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করতে পেরেছেন যখন, তার হাতে আরো দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা আছে। তিনিই পারবেন দেশকে আবার সঠিক পথে, সংবিধানের আদি মৌলিকত্ব প্রতিষ্ঠার পথে নিতে।

এই কাজগুলোর সাথে সাথে দেশে বিচারপতি নিয়োগের পদ্ধতি পরিবর্তন করারও দাবী জানাই। নিশ্চই পরবর্তীতে লিখবো সেটা নিয়ে বিস্তারিত, আপাতত এ পর্যন্তই।

সাহেদ আলম: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

shahedalam1@gmail.com