যতক্ষণ জান ততক্ষণ গান

প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান করার অপরাধে এক তরুণকে জরিমানাসহ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন সাইবার অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারক। এটাই দেশে সাইবার আইনে দেয়া প্রথম দণ্ডাদেশ। এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় সম্পর্কে এখনও বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, আসামি তন্ময় মজুমদার প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি ব্যঙ্গ গান রচনা করে তা প্রচার করে। যা তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে অপরাধ।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনটি ২০০৬ সালের। কিন্তু ২০১৩ সালের ১৯ আগস্ট তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (সংশোধন) অধ্যাদেশের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সংশোধিত এ আইনে ন্যূনতম সাত বছর এবং সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড রাখা হয়। মূল আইনে জামিনের বিধান থাকলেও তা সংশোধন করে কয়েকটি অপরাধ জামিন অযোগ্য করা হয়।
শুরু থেকেই এ বিতর্কিত আইনের ৪৬ ও ৫৭ ধারা নিয়ে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রবল আপত্তি রয়েছে। কারণ এটা সংবিধানে প্রদত্ত জনগণের মৌলিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটা কালো আইন। এটাকে চ্যালেঞ্জ করে করা রিট মামলায় ২০১০ সালের ২৬ জুলাই হাইকোর্ট সরকারের বিরুদ্ধে রুল জারি করেছে। যদিও সরকার এখন পর্যন্ত হাইকোর্টের এ রুলের জবাব দেয়ার প্রয়োজনও মনে করেনি। তবে এ আইনে শাস্তি দেয়া শুরু করে দিয়েছে ঠিকই।

রাজনীতি করলে সমালোচিত হবেনই। এটা সারা বিশ্বেই সর্বত্র হচ্ছে। সবসময়ই হয়েছে, এখনও হচ্ছে। জনগণ রাজনীতিকদের খুঁটিনাটি সবকিছুই খেয়াল রাখে। সেগুলো নিয়ে কথাও বলে, সমালোচনাও করে। কেউবা প্রশংসা করে, কেউ আবার কটূক্তি করে। গণতান্ত্রিক বিশ্বে নেতারা কেউ কেউ আবার এটাকে উপভোগও করে। আমাদের দেশে সাধারণত রাজনীতিক নেতাদের ব্যক্তি জীবন নেই বললেই চলে। এলাকার হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় স্থানীয় এমপিদের সদর আঙিনা মুখরিত থাকে। তাদের অন্দরমহল পর্যন্ত লোকারণ্য হয়ে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। এ নিয়ে নেতারা জনসম্মুখে তা বলতে গর্ববোধও করেন। নেতাদের কোনো গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি যেন থাকতে নেই- এটাই বিশেষ করে আমাদের এ অঞ্চলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা অংশ ছিল।

কিন্তু হঠাৎ করে সমালোচকদের জেলে ঢুকিয়ে দেয়ার দণ্ডাদেশ জনমানুষের মনে চরম ভীতি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তাও আবার এ অপরাধে চরম গুরুদণ্ড প্রদান! তার মানে এ অপরাধ কতটা ভয়ংকর! কিছুদিন আগে এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে ধর্ষণচিত্র ভিডিওতে ধারণ করে তা জনসম্মুখে প্রচার করার অপরাধে নরসিংদীর এক তরুণকে ২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। আরেকটি মামলায় ক’দিন আগে চট্টগ্রামে হাজার হাজার মানুষের জীবনঘাতী মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনুমোদহীন বিষাক্ত ওষুধ তৈরির অপরাধে কারখানার এক কর্মকর্তাকে ২ বছরের জেল দিয়েছেন আদালত। বর্ণিত অপরাধ দুটিও কিন্তু নেতাদের কটূক্তি করার মতো এতটা ভয়ংকর নয়! রাজনীতিকদের কটূক্তি করা কতটা ভয়ংকর ও বিপজ্জনক তা গুরুদণ্ড দেখলেই বোঝা যায়।
২৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পত্রিকার পাতায় ছাপা হল হোয়াইট হাউসের সামনে ওবামার ব্যঙ্গচিত্র হাতে নিয়ে বিক্ষোভের ছবিগুলো। এরকম ব্যঙ্গাত্মক ছবি, কার্টুন প্রদর্শন বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের একটা প্রধান উপকরণও বটে। তবে ব্যক্তিগত শালীনতা ভঙ্গ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ সমালোচনা কোনোভাবেই গণতন্ত্রের সঙ্গে মানানসই হতে পারে না। নৈতিকতার স্বার্থেও এগুলো কখনও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আমাদের সংবিধানও ৩৯(২) অনুচ্ছেদে স্পষ্টতই বলে দিয়েছে যে, আইনের দ্বারা যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। তবে এরকম আইনি বাধানিষেধও স্বেচ্ছাচারমূলক হতে পারবে না বলে সংবিধান প্রটেকশন দিয়েছে। যে আইনই আমরা করি না কেন তা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত হতে হবে। আবার সমালোচকদেরও অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট সীমারেখা মেনে চলতে হবে।

তবে শুধু সাজা দিয়েই কি কটূক্তি বন্ধ করা সম্ভব? দেশে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি কারাগারে বসে বাসর উৎযাপন করতে পারলেও তার কোনো বিচার হয় না। আর নেতাদের কটূক্তি করলে এত বছরের জেল হয়! এরকম কটূক্তি তো বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা হর-হামেশাই সরকারের বিরুদ্ধে করে যাচ্ছেন। কই তাদের তো কোনো জেল হয়নি কখনও? তন্ময় নামের এক তরুণের বেলায় কি এ গুরুদণ্ড প্রযোজ্য?
আরেকটি দুখঃজনক বিষয়, এদেশে ব্যক্তির অবমাননা বা ছবি প্রদর্শন না করলে সংবিধানে তা মারাত্মক অপরাধ বলে গণ্য হয়। দেশে আদালতের প্রতি কোনো ধরনের বেয়াদবি করা যায় না। নেতাদের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগে কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের মামলা হচ্ছে। কেবল বিচার হয় না ইসলামের অবমাননার। এ কথা বললে তেড়ে আসে তথাকথিত প্রগতিশীলরা। আইনের আশ্রয় ও প্রতিকার লাভের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার সবার রয়েছে। অধিকার শুধু নেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম অবমাননার বিচার চাওয়ার। আমার সৃষ্টিকর্তার অপমানের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারব না, জীবনের চেয়ে প্রিয় নবীর অবমাননাকারীদের বিচার চাইতে পারব না, এটা কোন ধরনের মানবতা?
তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন থেকে শুরু করে দণ্ডবিধির ২৯৫-২৯৮ ধারা, এমনকি আমাদের সংবিধানের ৩৯, ৪১ অনুচ্ছেদে রয়েছে ধর্মীয় অধিকারের রক্ষাকবচ। কিন্তু সরকার কচ্ছপগতির একটি দায়সারা তদন্ত কমিটি করে দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করেছে। একদিকে সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় বসে একজন শিক্ষক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ফেসবুকে কটূক্তি করলে বিদ্যুৎগতিতে তার শাস্তি হয়, অন্যদিকে মহান সৃষ্টিকর্তা ও মহানবীকে নিয়ে অশ্লীল ব্লগের কোনো বিচার হয় না এ দেশে।

পত্রিকার খবরে প্রকাশ, পুলিশ সদর দফতরের উদ্যোগে গঠন করা হচ্ছে সাইবার ক্রাইম অ্যান্ড ফরেনসিক ইউনিট। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের মাধ্যমেই এ ইউনিট পরিচালিত হবে। সরকারের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ফেসবুক পেইজগুলোর ফ্যানদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে বলে ২৮ সেপ্টেম্বরের জাতীয় দৈনিকগুলোতে খবর প্রকাশ পেয়েছে। কেউ সেসব পেইজে লাইক দিলেই তাকে নাকি আটক করা হবে। জঙ্গি প্রতিরোধের নামে সরকারের বিরুদ্ধে এসব পেইজে বা পোস্টে লাইক দেয়াকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কী বিচিত্র আইন! অথচ এর আগেও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সাইবার ক্রাইম প্রতিরোধে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছিল ইসলাম অবমাননাকর ব্লগগুলো বন্ধের জন্য। গত বছর জানুয়ারিতে এগুলো বন্ধে হাইকোর্টে একটি রিট পর্যন্ত হয়েছে। হাইকোর্ট এগুলো বন্ধের জন্য নির্দেশ দিলেও অদ্যাবধি তা মানা হয়নি। সবাই ব্যস্ত শুধু নেতাদের অবমাননা রোধে।
সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ছবি ‘হীরক রাজার দেশে’ দেখেননি এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েতই খুব কম। এ ছবিতে রাজার বিরুদ্ধে গান গাওয়ার অপরাধে হাত-পা-মুখ বেঁধে রাখত হীরক রাজা। গায়েনকে তখন বলতে শোনা যায়, ‘যতক্ষণ জান ততক্ষণ গান’। তবে রাজার শেখানো যন্ত্রের ভেতরে একসময় রাজার বিরুদ্ধেই গান ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ব্যস যায় কোথায়। রাজা নিজেও সেই গান গেয়ে গেয়েই বলতে থাকে- ‘দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খানখান’। আসলেই মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে এভাবে রুখতে যাওয়াটা বড়ই বিপজ্জনক! যুগে যুগে তাই প্রমাণিত হয়েছে। সমালোচনা সহ্য করতে না পারলে রাজনীতি করার কোনো নৈতিক অধিকার থাকে কি-না- এটাই এখন বিবেচ্য বিষয়।
ড. তুহিন মালিক : সুপ্রিমকোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

You Might Also Like