ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী, আর একবার যাবেন কি বেগম জিয়ার কাছে?

এমনিতেই জ্বালার শেষ নাই তার ওপর বেহুদা গাব-গ্যাজাগেজি চলছে প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার আবাসস্থলে গিয়ে অশোভন পরিস্থিতির শিকার হয়ে ফিরে এলেন কেন তাই নিয়ে। কাল সারাদিন ক্লাবে আড্ডায় পথে ঘাটে মিডিয়ায় পত্রিকায় এই এক আলোচনা। সরকার পক্ষরা এই ইস্যুতে প্রমান করার চেষ্টা করছেন বেগম জিয়া একজন অতিবড় অভদ্রমহিলা। পক্ষান্তরে তাদের নেত্রী মমতায় মহীয়ান, শিষ্টাচারের অবতার। বিরোধী পক্ষরা মিনমিন গলায় আত্মপক্ষ সমর্থনে বলতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করার কোন অভিপ্রায় তাদের ছিলনা, যা ঘটেছে দু:খজনক। এক পত্রিকায় দেখলাম লিখেছে যাও একটা সংলাপের সম্ভাবনা ছিল এই ঘটনায় সে আশাও শেষ!

কিন্তু কথাটা হচ্ছে ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী ওইরকম একটা পরিস্থিতিতে হুট করে বেগম জিয়ার ওখানে গেলেন কেন? মানবিক কারনে? বেগম জিয়ার ছেলে মারা গেছেন, একজন মা হয়ে আর একজন মায়ের শোকে কাতর হয়ে তাকে গিয়ে সমবেদনা জানাতে? বেশ ভাল কথা। এটাই মানবিকতা এটাই মনুষত্য। কিন্তু গুলশান যাবার আগে তিনি কি একবারও ভাববেন না বেগম জিয়ার সাথে তার সম্পর্কটা কেমন! রাজনৈতিক সম্পর্ক যেমন সাপে নেউলে ব্যক্তিগত সম্পর্কও কি তেমনি অহি-নকুল নয়? নিকট অতীতে কেউ কি কারও মুখটি দেখেছেন! আছে কি কোন পারষ্পরিক সৌজন্যতা এবং সম্মানবোধ? দুইজন কি একে অপরকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে করেন না ব্যক্তিগত শত্রু মনে করেন! বেগম জিয়া কিছুটা রয়েসয়ে বললেও প্রধানমন্ত্রী মহোদয়া কি কোন শালীনতা শিষ্টাচারের ধার ধারেন! ‘খুনী’ ‘সন্ত্রাসের রানী’ ইত্যাদী থেকে শুরু করে এমন কোন ভাষা নাই যা তিনি ব্যবহার করেন না বেগম জিয়া সম্পর্কে। এই সেদিনও বড় ছেলেকে জানোয়ার কুলাঙ্গার বলে গালমন্দ করেছেন। পরশু দুপুরেও এক হাত নিয়েছেন।

এই যেখানে দু’জনের পারস্পরিক সম্পর্ক সেখানে শোক জানাতে হোক বা কোন বিষয় নিয়ে আনন্দ শেয়ার করতে হোক, যাবার আগে কি আগ-পিছ ভেবে নেয়া দরকার ছিলনা? প্রধানমন্ত্রী তো ব্যক্তি শেখ হাসিনা নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের এমনি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কি হুটহাট তাৎক্ষণিকতা বা শুধুমাত্র আবেগ ইমোশনের ওপর চলে?

প্রথম কথা বেগম জিয়ার ওইরকম মানসিক অবস্থায় সমবেদনা জানাতে ঠিক ওই সন্ধ্যায়ই তার ওখানে যাওয়াই উচিত হয় নাই। এই ক্ষেত্রে বেগম জিয়া একজন মা। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। ছেলেরা এখানে ওখানে। এক একজন কয়েক ডজন করে মামলার আসামী। কেউ দেশে ফিরতে পারেননা। এই বয়সে পরিবারের কাউকে পাশে পান না। নিজে একাধিক মামলার ট্রায়াল ফেস করছেন। রয়েছে যে কোন মূহুর্তে গ্রেফতার হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। এবং এই সমস্ত কিছুর জন্য তিনি দায়ী মনে করেন ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রীকে। বিশ্বাস করেন যেহেতু তিনি তার রাজনৈতিক এবং ক্ষমতার প্রতিদ্বন্ধি সে কারনেই তিনি এবং তার পরিবার এই হেনস্থার শিকার। ছোট ছেলেটা মারা গেছে বিদেশে। প্রবাসী হওয়ার পর থেকে সরকার তাকে একটিবারের জন্যও দেশে আসতে দেয় নাই। দীর্ঘ সাত বছরে মা ছেলের দেখা হয়েছে দুই কি তিনবার। এইরকম অবস্থায় ছেলে মারা গেলে প্রথম আক্রোশটা গিয়ে পড়বে সরকারের ওপর- এটা বোঝা কমনসেন্সের ব্যপার। সেই সরকারের প্রধান যদি মানবিক কারনেও তাকে সমবেদনা জানাতে যান যথেষ্ট আশংকা থাকে বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবার। প্রধানমন্ত্রী মহোদয়া ডিসিশনটা নেবার আগে এই বিষয়গুলো কি বিবেচনায় নিয়েছিলেন?

আমি তো মনে করি বেগম জিয়ার সাথে সেদিন প্রধানমন্ত্রীর দেখা না হওয়ায় ভালই হয়েছে। যে বয়সে সন্তান মা’কে কবরে শোয়ায় সেই বয়সে মা রিসিভ করছেন সন্তানের লাশ। সেই মায়ের মানসিক অবস্থা তখন সহজেই অনুমেয়। তার ওপর তিনি নানা রোগ ব্যধিতে আক্রান্তু। নানা নিয়ম মেনে অষুধ খেয়ে সুস্থ থাকতে হয়। বলা হয়েছে মানসিক চাপ থেকে রক্ষা করতে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছিল। হয়তো তাই। যদি তেমনটা  না হতো! অর্থাৎ বেগম জিয়া জেগে থাকতেন! অবশ্যই তিনি সেন্সে থাকতেন না। তেমনি অবস্থায় ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী যদি তার সামনে গিয়ে উপস্থিত হতেন- যথেষ্ঠ আশংকা কি ছিলনা বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবার! যদি বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রীকে উল্টাসিধা কিছু বলে বসতেন! যদি ছেলের অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী করে তাকে গালমন্দ করতেন, বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলতেন!

বেগম জিয়ার তখন যে মানসিক অবস্থা তাতে এমনটি ঘটবার আশংকা ছিল ষোল আনা। যতই তিনি নেত্রী হন তিনি একজন মা এবং একজন বাঙ্গালী মা। তাতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মান এবং মর্যাদাটুকু কোথায় গিয়ে ঠেকতো! কেউ বলতে পারেন এসব কিছু নাও ঘটতে পারতো। প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার কাছ থেকে যথাযোগ্য মর্যাদা পেতেন। হতে পারে। তবে সেই সম্মান পেতেন একজন মা শেখ হাসিনা, বেগম জিয়ার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্ধি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নন। এটাই হিসাবের কথা। কারন বেগম জিয়া তো তাকে বৈধ প্রধানমন্ত্রীই মনে করেন না।

এখন দেখা যাক প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ার এই হুট করে গুলশান ছুটে যাবার সিদ্ধান্তের পেছনে কি কি কারনগুলো কাজ করেছে। একটা হতে পারে নিছকই সৌজন্যতা। প্রধানমন্ত্রীর স্বামী মারা গেলে বেগম জিয়া তার বাসায় গিয়ে সমবেদনা জানিয়ে এসেছিলেন। হতে পারে এটা ছিল এক ধরনের ফিরতি সৌজন্যতা। দ্বিতীয়ত: একজন মা হিসেবে আর এক শোকাহত মা’কে সমবেদনা জানানো। তৃতীয়ত: রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজী।

কেউ কেউ এই তৃতীয় কারনটিকেই সামনে আনতে চাইছেন। বলা হচ্ছে, তাই যদি না হবে বেগম জিয়া ঘুমিয়ে আছেন বা এলে দেখা হবেনা এ কথা পূর্বাহ্নেই জানিয়ে দেয়ার পরও প্রধানমন্ত্রী সেখানে গেলেন কেন? গেলেন যদি গেটের সামনে ৬ মিনিট অপেক্ষা না করে ভেতরে ঢুকলেন না কেন? প্রধানমন্ত্রী গাড়ী ঘোরানোর পর মূহুর্তেই মিডিয়ার সামনে এসে সরকারি নেতারা বলতে শুরু করলেন কেন এটা অসৌজন্যতা অভদ্রতা, প্রধানমন্ত্রীকে অপমান। প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি এই কথাগুলো বলার জন্য, দেশে একটা সংকটকাল চলছে, সবাই চাইছে দুই নেত্রীর একটা সমঝোতা হোক- এমনি প্রেক্ষিতে বেগম জিয়ার বাসায় গিয়েও সেখানে ঢুকতে না পেরে এটা বোঝানোর চেষ্টা করা, সরকারপ্রধান যে কোন উছিলায়ই হোক কথা বলতে গেছিলেন কিন্তু বেগম জিয়াই কথা বললেন না দেখাও করলেন না! অর্থাৎ তিনিই কোন সমাধান চাননা! দোষটা তার ওপর চাপিয়ে দেয়া!

এরকম কোন উদ্দেশ্য ছিল কিনা আমি জানিনা। তবে ঘটনাটিকে নিয়ে সরকারের লোকজন যেভাবে ফেনাচ্ছে তাতে সন্দেহ হওয়ার যথেষ্ঠ অবকাশ আছে পুরো ব্যপারটিই কোন রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজী ছিল কিনা। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বেগম জিয়াকে ঘুম পারিয়ে রাখা হয়েছে এ কথা জানানোর পরও প্রধানমন্ত্রী হুট করে চলে এসেছেন। তাকে রিসিভ করতে যাওয়ার আগেই তিনি চলে গেছেন। এটাও বলা হচ্ছে গেটের তালা খোলা-বন্ধ করার দায়িত্ব পালন করছে সরকারি বাহিনীগুলো। প্রধানমন্ত্রী যদি ভেতরে ঢুকতে চাইতেন তিনি কি তালা খুলিয়ে নিতে পারতেন না! মাসখানেক হতে চললো এ বাসায় কে ঢুকবে কে বের হবে তা নিয়ন্ত্রন করছে প্রধানমন্ত্রীরই লোকজন। তাহলে তিনি কেন বাসার সামনে এসেও ৬ মিনিট গাড়ীতে বসে থেকে বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে ফিরে যাবেন! ভেতরে গিয়ে ঢুকলে বাসার লোকজন বা উপস্থিত নেতারা কি তাকে বসতে দিতেন না? এক কাপ চা খাওয়াতেন না? তিনি যদি ঘুমন্ত বেগম জিয়াকে দেখতে চাইতেন তাকে কি তার কাছে নিয়ে যেতেন না?

আন্তরিকতা থাকলে সবই হয়। প্রথম থেকেই সন্দেহ ঢুকেছে কথা নাই বার্তা নাই হুট করে প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়াকে সমবেদনা জানাতে আসতে চাইছেন কেন। রাজনীতিকে আমরা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছি কারও প্রতি কারও বিশ্বাস নাই আস্থা নাই। সব তাতেই সন্দেহ। শোক জানানোর মত একটা মানবিক ব্যপার, তাতেও সন্দেহ- না জানি কোন মতলব আছে! বলা হচ্ছে, বেগম জিয়া সেদিন আদৌ ঘুমিয়ে ছিলেন না। তিনিই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চান নাই বা তার নির্দের্শেই প্রধানমন্ত্রীকে গেটের সামনে থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। হতে পারে। যদি তাই হয় এখানেও কাজ করেছে রাজনীতি। কোনটাই ঠিক নয়।

পুরো বিষয়টিকে নিয়ে একটা ধারনা দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে, বর্তমানে যে রাজনৈতিক স্টেলমেট- এ থেকে উত্তরণে একটা উছিলা ধরে কথা বলার জন্য প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার কাছে গেছিলেন। কিন্তু ২০১৩ সালের সেই টেলিআলাপের মত এবারও বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে সারা দেন নাই। উল্টো তাকে অপমান করেছেন। অতএব এরপর কি তার সাথে আর কোন আলাপ চলে!

শোকের ব্যপারাদী ছাপিয়ে রাজনীতির এই বিষয়টিই সামনে উঠে আসছে। এ কথা দিনে দিনে ষ্পষ্ট হয়ে উঠছে সমঝোতা ছাড়া শুধুমাত্র বলপ্রয়োগে এই স্টেলমেট উত্তরণ সম্ভব নয়। মানুষ অতীষ্ঠ হয়ে উঠছে। এ অবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে অব্যাহত থাকলে দেশের যেমন বারটা বাজবে মানুষও এক সময় বিক্ষুব্ধ হয়ে পথে নেমে আসবে। সেটা সামাল দিতে আর এক ল্যাঠা। যত শীঘ্র সম্ভব কথাবার্তা বলতে হবে। দেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি সরকার তাকে নিছক আইনশৃংখলাজনিত পরিস্থিতি হিসেবে ধরে নিয়ে বলপ্রয়োগে তা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু আজকের যে সংকট তা সর্বাংশে রাজনৈতিক। কাল যদি বিরোধী দল বলে অবরোধ প্রত্যাহার কাল থেকেই সবকিছু স্বাভাবিক। কোথাও একটা বোমাবাজী হবে না গাড়ী পুড়বে না। বিরোধী দলকে দিয়ে তা বলাতে হলে তাদের সাথে কথা বলতে হবে, একটা সমঝোতায় আসতে হবে। এটাই এখন দেশবাসীর দাবী। সমঝোতা মানেই কালকেই ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়া নয়, সমঝোতা মানে নতুন একটা নির্বাচন। সে নির্বাচন দুই বছর পারে হতে পারে তিন বছর বা চার বছর পরেও হতে পারে। কথা বলতে দোষ কি! সরকারি মহলে কারও কারও আতংক বিরোধী দলের সাথে কথা বললেই বুঝি কাল ক্ষমতা চলে যাবে, স্বর্গরাজ্য হাতছাড়া হয়ে যাবে! কত পদের আহম্মক যে আছে দুনিয়ায়!

রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজী না হয়ে যদি নিছক মানবিক কারনে প্রধানমন্ত্রী আবেগের বশে বেগম জিয়ার বাসায় ছুটে গিয়ে থাকেন সেটা অবশ্যই একটা মহৎ কাজ। তবে আগেই বলেছি সেই সন্ধ্যায়ই ওভাবে ছুটে যাওয়াটা তার উচিত হয়নি। দুই একদিন গেলে বেগম জিয়া কিছুটা ধাতস্থ হলে তাকে গিয়ে সমবেদনা বা স্বান্তনা জানিয়ে আসার উদ্যোগ নিলে ব্যপারটা নিয়ে জটিলতা তৈরী হতো না। সে সুযোগ এখনও আছে। ছেলের লাশ আসুক দাফন হোক, বেগম জিয়াও কিছুটা শোক কাটিয়ে উঠুন, এরপর প্রধানমন্ত্রী আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে গিয়ে বেগম জিয়ার সাথে কথা বলে আসতে পারেন। শোক জানিয়ে আসতে পারেন। দেশের ষোল কোটী মানুষের সাথে আমারও দৃড় বিশ্বাস দুই নেত্রী মুখোমুখি হলে, যে কোন উছিলায় কথা হলেও তাতে দেশের কথা থাকবে। হতে পারে সেটাই হবে সংলাপ বা আলোচনা। তাতে মূহুর্তে হাসি ফুটে উঠতে পারে ষোল কোটীর মুখে।

ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী, দেশের স্বার্থে দু:খী মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে মান অভিমান দু:খব্যথা ভুলে আর একবার কি যাবেন বেগম জিয়ার কাছে!

২৬ জানুয়ারি, ২০১৫

e-mail: mail@saeedtarek.com

saeedtarek@yahoo.com

You Might Also Like