মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কামারুজ্জামানের রিভিউ কার্যতালিকায়

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদনটি শুনানির দিন ধার্যের আদেশের জন্য সুপ্রিম কোর্টের ‍আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় এসেছে। সোমবারের (৯ মার্চ) কার্যতালিকায় এটি রয়েছে এক নম্বরে।
রোববার (৮ মার্চ) বিকেলে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের এ কার্যতালিকা প্রকাশিত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকালে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল মামলার চূড়ান্ত পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদনটি দাখিল করেন কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা। পরে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার বিচারপতির আদালতে শুনানির দিন ধার্যের আবেদন জানান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
এ আবেদনের প্রেক্ষিতে রোববার চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী রিভিউ আবেদনটি শুনানির জন্য পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন। সোমবারের কার্যতালিকায় রিভিউ আবেদনটি আসায় সেদিনই শুনানি শুরু হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
দুপুরে মাহবুবে আলম তার চেম্বারে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মাহবুবে আলম বলেন, আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পর রিভিউতে তা কমেছে বলে বাংলাদেশে কোনো ঘটনা আমি দেখিনি। এ ব্যাপারে আগাম কোনো মন্তব্য করা সঠিক না। আদালত কি করবেন, সেটা আদালতই জানেন।
এর আগে ২০১৩ সালে ফাঁসি কার্যকর হওয়া জামায়াতের অপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
তবে কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে রিভিউ করার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল না। এবার আপিল বিভাগ মানবতাবিরোধী অপরাধীদের জন্য রিভিউ করার সময়সীমা ১৫ দিন নির্ধারণ করে দেন। সাধারণত রিভিউ করার সময় থাকে ৩০ দিন। এ ক্ষেত্রে শুনানি নিষ্পত্তির সময়ে কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের ক্ষেত্রে রিভিউ আবেদন যতো দ্রুত সম্ভব নিষ্পত্তি করতে হবে। যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত কামারুজ্জামান যে রিভিউ আবেদন দায়ের করেছেন, সেটা শুনানির জন্য সোমবার আদালতে আসবে। আজ (রোববার) চেম্বার বিচারপতি আদেশ দিয়েছেন, আগামীকাল (সোমবার) এটা তালিকাভূক্ত হয়েছে। আশা করি, শুনানিও হবে।
শুনানি শেষ হতে কতোদিন লাগতে পারে এ প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, কাদের মোল্লার রিভিউয়ের রায়ে কতগুলো বিষয় বলে দেওয়া হয়েছে। প্রথমত: এটা রিভিউ, আপিল না। এখানে বিস্তারিত শুনানির কোনো অবকাশ নাই। আদালতের যদি কোনো ভুল থাকে, শুধুমাত্র সেটাই আদালতকে দেখিয়ে দেওয়া। প্রয়োজনবোধে আদালত সেটা সংশোধন করবেন। এটা যতো দ্রুত সম্ভব নিষ্পত্তি করতে হবে।
মাহবুবে আলম বলেন, রিভিউ খারিজ হয়ে গেলে আসামি যদি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা করেন, সেটা নিশ্চয়ই রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন ঠিক করার আগেই যদি করেন, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের পর আসামি ক্ষমা না পেলে দণ্ড কার্যকর হবে। জেলকোড এখানে প্রযোজ্য হবে না, এটা আমিও বলেছি। রিভিউয়ের রায়েও এটা বলে দেওয়া আছে। এখানে (ফাঁসি কার্যকরের ক্ষেত্রে) ২১-২৮ দিনের কোনো ব্যাপার নাই।
রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আপাতত কামারুজ্জামানের মৃত্যু পরোয়ানা স্থগিত থাকবে বলেও জানান রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা।
প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চে রিভিউ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হচ্ছেন বিচারপতি আব্দুল ওহাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
মাহবুবে আলম বলেন, যারা পূর্ণাঙ্গ রায় দিয়েছেন তারাই রিভিউ শুনানি নেবেন। তাই আমি মনে করি না, রিভিউয়ে আপিল বিভাগের রায় পরিবর্তিত হবে। কারণ, চূড়ান্ত রায়ে অপরাধ যে হয়েছে ও তাতে আসামির দায় নিয়ে চার বিচারপতিই একমত হয়েছেন। একজন শুধু দণ্ডের বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করেছেন।
মোট ৭০৫ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে ৪৪টি যুক্তি দেখিয়ে কামারুজ্জামানের ফাঁসির আদেশ বাতিল ও তার খালাস চেয়েছেন আসামিপক্ষ।
কামারুজ্জামানের প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন রিভিউ দাখিলের পরে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছিলেন, আপিল মামলার রায়ে একজন বিচারপতি ফাঁসির আদেশের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন। তার পয়েন্টগুলো ধরেই আমরা রিভিউ আবেদনের শুনানি করবো। ট্রাইব্যুনালে বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে চার্জশিটভুক্ত (ফরমাল চার্জ) দশজন সাক্ষীর বাইরে রাষ্ট্রপক্ষের নতুন তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছিল। এটা নিয়েও শুনানি করবো।
কামারুজ্জামানের পক্ষে রিভিউ শুনানিতে নেতৃত্ব দেবেন তার এই প্রধান আইনজীবী। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে নেতৃত্ব দেবেন অ্যাটর্নি জেনারেল।
গত ১৮ ফেব্র“য়ারি আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি (বর্তমান প্রধান বিচারপতি) এসকে সিনহার নেতৃত্বে চার বিচারপতির একই বেঞ্চ কামারুজ্জামানের আপিল মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হচ্ছেন বিচারপতি আব্দুল ওহাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
এরপর ১৯ ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ তিন বিচারপতি কামারুজ্জামানের মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করেন। অন্য দুই বিচারপতি হচ্ছেন বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি শাহীনুর ইসলাম।
পরে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার মুস্তাফিজুর রহমান মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে আইজিপি (প্রিজন) এর বরাবরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠান।
পরে কারাগারে কামারুজ্জামানকে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয়।
গত বছরের ৩ নভেম্বর কামারুজ্জামানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর দেওয়া ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে চূড়ান্ত রায় সংক্ষিপ্ত আকারে দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনীর বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা কমান্ডার কামারুজ্জামানকে ২০১৩ সালের ৯ মে ফাঁসির আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
মুক্তিযুদ্ধকালে ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার সভাপতি ছিলেন কামারুজ্জামান। ২২ এপ্রিল তিনি জামালপুরের আশেক মাহমুদ কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা নেতাকর্মীদের নিয়ে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলেন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ আলবদর বাহিনীর কমান্ডার কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে এই বাহিনী ওই অঞ্চলজুড়ে মানবতাবিরোধী বিভিন্ন অপরাধ ঘটায়।
কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা মোট ৭টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মধ্যে সোহাগপুর গণহত্যার (৩ নম্বর অভিযোগ) দায়ে চূড়ান্তভাবে ফাঁসির আদেশ হয়েছে তার। এ অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।
বিচারপতি ওয়াহহাব মিয়া সোহাগপুর গণহত্যায় কামারুজ্জামানকে অভিযুক্ত করলেও এ অভিযোগে তিনি তাকে যাবজ্জীবন দণ্ডের পক্ষে মত দেন। সেই সঙ্গে ১, ২, ৪, ৭ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া দণ্ড থেকে কামারুজ্জামানকে খালাস দেওয়ার পক্ষে মত দেন তিনি।
আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি (বর্তমানে প্রধান বিচারপতি) এসকে সিনহা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী সর্বোচ্চ সাজার পক্ষে মত দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আসামির দণ্ড নির্ধারিত হয় মৃত্যুদণ্ড।
অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফাকে হত্যার (৪ নম্বর অভিযোগ) দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন তিনি। এ অভিযোগে ট্রাইবুন্যাল কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও সাজা কমিয়ে দিয়েছেন আপিল বিভাগ।
এ অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কামারুজ্জামানকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়।
দারাসহ ছয় হত্যার (৭ নম্বর অভিযোগ) দায়ে যাবজ্জীবন ও অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নানকে নির্যাতনের (২ নম্বর অভিযোগ) দায়ে আরও ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া এ সাজাও বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ।
তবে মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জামান হত্যার (১ নম্বর অভিযোগ) দায় থেকে আপিল বিভাগ তাকে খালাস দেন। এ অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছিলেন কামারুজ্জামান। এছাড়া ৫ নম্বর (১০ জনকে হত্যা) ও ৬ নম্বর অভিযোগে (টুনু হত্যা ও জাহাঙ্গীরকে নির্যাতন) ট্রাইব্যুনালের রায়ের সঙ্গে একমত হয়ে আপিল বিভাগও খালাস দিয়েছেন।

You Might Also Like