মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সের সমরগাথা

সাঈফ সিরাজ

জেড ফোর্স – মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সাড়া জাগানো প্রথম নিয়মিত পদাতিক ব্রিগেড। ব্রিগেড কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের নামের আদ্যাক্ষর ‘জেড’ দিয়ে যার নাম হিরন্ময় অক্ষরে খোদিত।
অমর বীরত্ব বিচ্ছুরিত আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আত্নত্যাগের মহামহিমায় যেই ফোর্সটির যুদ্ধনামচায় কালের অমোচনীয় কালিতে লেখা রয়েছে কামালপুর বিওপি, বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট আর নকশী অভিযানের মতো বিখ্যাত সব যুদ্ধের রোমাঞ্চগাথা।

১৯৭১-এর রৌমারি মুক্তাঞ্চলের স্মৃতির দেরাজে যে ফোর্সটি ঘুমিয়ে আছে। চিলমারী, ছাতক, কোদালকাটি, বকশীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, টেংরাটিলা, বড়লেখার সময়তটে স্পষ্ট ছাপচিহ্ন রেখে গেছে যে বাহিনীটির স্বাধীনতা ক্ষুধার্ত যোদ্ধারা।

আসুন সেই যুদ্ধ নামচার পাতা ওল্টাই, স্মৃতির দেরাজ খুলে জাগিয়ে তুলি সেইসব ফেলে আসা দিনকে, জমে থাকা ধুলো সরিয়ে দেই যুদ্ধ ময়দানের সময়তটে।

১ম সপ্তাহ, জুন, ১৯৭১…
কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত হলো –

নিয়মিত পদাতিক একটি ব্রিগেড তৈরি করা হবে প্রতিরোধ যুদ্ধকে জোরদার করার জন্য। উদ্দেশ্য – হিট অ্যান্ড রান গেরিলা ট্যাকটিকসের বদলে সুসংহত নিয়মিত বাহিনীর মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সরাসরি যুদ্ধে মোকাবেলা করা। আর সে লক্ষ্যেই মেজর জিয়াউর রহমানের উপর ন্যস্ত করা হয় ব্রিগেডটির অধিনায়কত্ব।

জন ন ১০ তারিখে বৃহত্তর চট্রগ্রামের ১নং সেক্টরের অধিনায়কত্ব ক্যাপ্টেন রফিকের হাতে দিয়ে জিয়া চলে আসেন বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের পাদদেশে ঘন গহিন জঙ্গল তেলঢালায়।

চারদিকে ছোট ছোট পাহাড়ে ঘেরা – সাপ, বাঘ আর বুনো শুয়োরের আস্তনা শ্বাপদ সংকুল এই জঙ্গলটিতেই স্থাপিত হয়েছিলো জেড ফোর্সের হেডকোয়ার্টার।

জিয়ার সঙ্গে ছিলেন ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ এবং ক্যাপ্টেন সাদেক।জিয়া আগেভাগে চলে এলেও রেখে এসেছিলেন তাঁর ৮ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের অনেক সৈনিককে।

কিছুদিনের মধ্যে মেজর এ জে এম আমিনুল হক চট্রগ্রামের রামগড় থেকে ৮ম বেঙ্গলের বাকি সব সৈন্যকে নিয়ে হাজির হন তেলঢালায়।

কাছাকাছি সময়ে ২৫ জুনের আগেই ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (বর্তমানে বিএনপির রাজনীতিবিদ) বনগাঁ থেকে ১ম বেঙ্গলকে নিয়ে যোগ দেন তেলঢালায়।

তবে তার আগে জুন ১৭ তারিখে মেজর শাফায়াত জামিল তাঁর ৩য় বেঙ্গলের ১১০০ সৈন্য নিয়ে তেলঢালায় জেড ফোর্স হেড কোয়ার্টারে যোগ দেন ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের রায়গঞ্জ জংশন থেকে।

১৩ই জুন কলকাতায় ৮নং থিয়েটার রোর্ডে স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানীর সাথে দেখা করেন মেজর মইনুল হোসেন এবং ওসমানীকে অভিমত জানান যে সরাসরি সেট পিস যুদ্ধে যাওয়ার মতো প্রশিক্ষিত যোদ্ধা এবং পর্যাপ্ত যুদ্ধ উপকরণ এখন বেঙ্গল রেজিমেন্টগুলোর নেই। ওসমানি তাঁর সঙ্গে একমত হন নি এবং জেড ফোর্স গঠনের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।

ওসমানীর নির্দেশ মোতাবেক মেজর মইন কলকাতা থেকে আসামের গুয়াহাটি হয়ে তেলঢালায় এসে যোগ দেন জেড ফোর্সে।

২০ জুন আনুষ্ঠানিক নিয়োগ সম্পন্ন হয় ব্রিগেড অধিনায়কত্বের।

ব্রিগেড কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমান।

১ম, ৩য় এবং ৮ম ই বেঙ্গল – এই ৩টি রেজিমেন্টকে সমন্বিত করেই গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত প্রথম ব্রিগেড জেড ফোর্স।

২৫ জুনের মধ্যে জেড ফোর্স বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর ১ম পদাতিক ব্রিগেড হিসেবে সুসংগঠিত হয়।

৭ই জুলাই প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে ১ম নিয়মিত পদাতিক বেঙ্গল ব্রিগেডটিকে, সেপ্টেম্বরের শুরুতে যার নাম রাখা হয় ‘জেড ফোর্স’।

জুনের ২৫ তারিখ থেকেই শুরু হলো জেড ফোর্সের যুদ্ধ প্রশিক্ষণ।

জুলাই ২৮ তারিখ পর্যন্ত সেটি চলতে থাকে দুর্গম প্রতিকূল এক পরিবেশে যেমনটা জানা যায় ৩য় বেঙ্গল সিও মেজর শাফায়াত জামিলের কাছ থেকে:

২৮ জুলাই পর্যন্ত তেলঢালায় সর্বাত্নক যুদ্ধের ট্রেনিং চলতে থাকে। প্রায় সারাদিন ট্রেনিং চলে। রাতে প্রচন্ড মশার কামড় আর শুয়োর, সাপ ইত্যাদির উৎপাতে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল আমাদের। বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকার জন্য মনে মনে সবাই অস্থির হয়ে উঠছিলাম…
এ প্রসঙ্গে ১ম বেঙ্গল সিও মেজর মইন যা বলেছেন:

আমরা ছিলাম এক গহিন জঙ্গলে যেখানে খাবার ও রসদ সরবরাহ ছিল অত্যন্ত দুরূহ। আমাদের অবস্থান থেকে সবচেয়ে নিকটবর্তী শহর ছিল তুরা – যার দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। নিকটবর্তী গ্রামাঞ্চল ছিল আমাদের খাদ্যক্রয়ের স্থান। অন্যান্য রসদপত্র ও সামগ্রী তুরা শহর থেকে সংগ্রহ করা হতো। এই অঞ্চলে ভারতীয় 101 COMMUNICATION ZONE কমান্ড করতেন মেজর জেনারেল গুলবত সিং গিল। সমস্ত বাধা বিপত্তির মধ্যেও গারো পাহাড়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আমরা প্রশিক্ষণ পূর্ণ উদ্যমে চালিয়ে যাচ্ছিলাম।
প্রসঙ্গত জানাতে হয় – তেলঢালার দুর্গম পরিবেশে যে প্রতিকূলতা আর অসহনীয়তা মোকাবেলা করতে হয়েছে জেড ফোর্সকে তার কানাকড়িও সইতে হয় নি ত্রিপুরার মেলাঘরে অবস্থানরত খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং ক্যাম্পটিকে।

এমনকি বেশির ভাগ সেক্টর কমান্ডারদের হেড কোয়ার্টার ছিল সীমান্তবর্তী শহরগুলোতে।

যাহোক, এবার যুদ্ধের ইতিহাসে ফিরি…

২৮শে জুলাই ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর জিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন ৩টি বিপদজনক অপারেশনের যার প্রতিটি ছিল কৌশলগত দিক থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ন ৩টি পজিশনে। এ যুদ্ধগুলোর প্রতিটিতে ‘ডাই হার্ড স্ট্যামিনা’ আর ‘ডু অর ডাই’ আত্নপ্রতিজ্ঞার পরিচয় দিতে হয়েছিল জেড ফোর্স যোদ্ধাদের।

প্রথমটি ছিলো কামালপুর যুদ্ধ।

জুলাইয়ের ৩য় সপ্তাহে ১ম বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন কমান্ডার মেজর মইনুল হোসেনকে জিয়াউর রহমান জানালেন কামালপুর বিওপি-তে হিট করতে হবে। মেজর মইন রাজি ছিলেন না। তাঁর মতে কামালপুরের মতো যথেষ্ট শক্তিশালী পাকিস্তানী ঘাঁটিতে সেট-পিস যুদ্ধের মাধ্যমে আক্রমণ করার সক্ষমতা জেড ফোর্সের নেই বা তার ব্যাটালিয়নের নেই। মেজর মইনের প্ল্যান ছিলো হিট অ্যান্ড রান গেরিলা পদ্ধতিতে পাকিস্তানি ফোর্সকে দুর্বল ও নাজেহাল করা।

কিন্তু জিয়া সিদ্ধান্ত পাল্টালেন না। এর মূল কারণ হাইকমান্ডের নির্দেশ এবং ঘাঁটিটির কৌশলগত গুরুত্ব।

মূলত জামালপুর, টাঙ্গাইল ও ঢাকার সংযোগ সড়কটির উপর ছিল কামালপুর বিওপি। তাই ঢাকা অভিমুখে অগ্রসর হতে হলে কামালপুর বিওপি অবশ্যই দখল করতে হবে।

এটি এতই শক্তিশালী ঘাঁটি যে এই ঘাঁটিতে সর্বমোট ৪ বার নিয়মিত বাহিনী পর্যায়ে সরাসরি সেট-পিস যুদ্ধ হয়েছে – যথাক্রমে ৩১ জুলাই, ২২ অক্টোবর, ১৪ নভেম্বর, ২৪ নভেম্বর – ৪ ডিসেম্বর।

হিট অ্যান্ড রান হয়েছে মোট ২০ বার!

প্রথম গেরিলা হিট হয়েছিল ১২ জুন ।

এখানেই ১৪ নভেম্বরের যুদ্ধে মর্টার শেলের আঘাতে পা হারিয়েছেন মেজর তাহের বীরউত্তম।

পুরো মুক্তিযুদ্ধে কামালপুর অভিযানে সর্বমোট ১৯৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন অসংখ্য, অন্যদিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর আইয়ুব সহ ২২০ জন সেনা নিহত হয়েছেন।

বীরউত্তম থেকে বীরপ্রতীক মিলিয়ে সর্বমোট ২৯ জন মুক্তিযোদ্ধা সাহসিকতা পদক পেয়েছেন কেবল কামালপুর যুদ্ধের জন্যই, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন উদাহরণ আর একটিও নেই।

এতকিছুর পরও ডিসেম্বরের ৪ তারিখের আগে কামালপুর মুক্ত হয় নি!

কাজেই ৩১ জুলাই জিয়ার নির্দেশে ১ম সেট-পিস হিটটি হয়েছিল রীতিমত ‘বাঘের ডেরায়’। সেটি ছিল অজানা ভয়, দুঃসাহসিকতা আর রোমাঞ্চ মিশ্রিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওয়ার ম্যাপে বৃহত্তর টাংগাইল ও ময়মনসিংহের দায়িত্বে ছিল মেজর জেনারেল জামশেদের ৩৬ অ্যাডহক ডিভিশন। ১৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই এলাকাটিতে ২টি রাস্তা ছিল ঢাকার দিকে মুক্তিবাহিনীর অগ্রসর হওয়ার। একটি হালুয়াঘাট-ময়মনসিংহ হয়ে, অন্যটি কামালপুর-জামালপুর দিয়ে। এটি আটকানোর দায়িত্বে ছিল ব্রিগেডিয়ার কাদিরের পাক আর্মির ৯৩ ব্রিগেড – যার দুটি রেজিমেন্ট যথাক্রমে ৩৩ পাঞ্জাব এবং ৩১ বালুচ।

৩৩ পাঞ্জাব অবস্থান নিয়েছিল হালুয়াঘাটে আর ৩১ বালুচ অবস্থান নিয়েছিল কামালপুর, নকশী আর বারোমারিতে। কামালপুরে ৩১ বালুচের সাথে ছিল ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্স আর আর ১ প্লাটুন রাজাকার। কামালপুর বিওপির সিও ছিল ক্যাপটেন আহসান মালিক। প্রচুর শক্তিশালী অস্ত্র আর গোলাবারুদের পাশাপাশি ৮১ মি.মি. ৩টি মর্টার ছিল কামালপুর বিওপিতে।

অন্যদিকে মেজর মইনের ১ম বেঙ্গল ব্যাটালিয়নে সৈন্য ছিল সর্বসাকুল্যে ৮৫০ জন। ৩১ জুলাই রাত ৩টায় এই যুদ্ধ শুরু হয়। জেড ফোর্সের ১ম সম্মুখ সমর কামালপুর অপারেশনে জিয়াউর রহমান নিজে উপস্থিত ছিলেন যুদ্ধ সমন্বয় করার জন্য।

রাত ৩:০০-র দিকে জিয়া ও মেজর মইন ১ম বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন নিয়ে পাকিস্তান আর্মির ঘাঁটি থেকে প্রায় ১১০০-১২০০ গজ দূরে অবস্থান নেন।

সে রাতে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল।

পরিকল্পনা মোতাবেক –

১. ক্যাপটেন মাহবুব শত্রু ঘাঁটির পেছনে অবস্থান নেন তাঁর কোম্পানি সহ।

২. ক্যাপ্টেন হাফিজ ও ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন ৬০০ গজ ইনসাইড এনিমি লাইন অগ্রসর হয়ে পাটক্ষেতে অবস্থান নেন।

৩. মেজর মইন তাঁর ওয়ারলেস অপারেটর এবং ফ্লা. লে. লিয়াকত সহ পাটক্ষেতে অবস্থান নেন।

৪. টিলায় মেজর জিয়া হালকা কামান ও হেভি মেশিনগান সহ অবস্থান নেন।

৫. কাট অফ পার্টি হিসেবে একটি বাহিনী কামালপুর-বকশীগঞ্জ সড়কে মাইন পুঁতে রেখে কামালপুর-শ্রীবর্দি জংশন এবং উঠানীপাড়ায় অবস্থান নেন যাতে বকশীগঞ্জ থেকে হঠাৎ কোন পাকিস্তানি রিইনফোর্সমেন্ট ৩১ জুলাই রাতে কামালপুরে আসতে না পারে।

জিয়ার অবস্থান থেকে কামানের গোলা বর্ষণের মাধ্যমেই যুদ্ধ শুরু হয়। রাত সাড়ে ৩টায় ক্যাপটেন সালাউদ্দিন মমতাজ তাঁর ২ প্লাটুন সৈন্য নিয়ে শত্রুঘাঁটিতে ঢুকে পড়েন। সেখানে তিনি বিওপির একদম কাছে গিয়ে মেগা ফোনে পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন – “আভি তক ওয়াক্ত হ্যায়, শালা লোক সারেন্ডার করো, নেহি ত জিন্দা নেহি ছোড়েঙ্গা।”

সালাউদ্দিন মমতাজের অসীম সাহসে আর তাঁর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমণে পাকিস্তানিদের ১ম ডিফেন্স কর্ডন শেল প্রুফ বাংকারে ঢুকে পড়ে।

শহীদ ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ বীরউত্তম
এ সময় সালাউদ্দিন মমতাজ আরও সাহসী হয়ে উঠে ২০-২৫ জনকে নিয়ে বিওপির কমিউনিটি সেন্টারে ঢুকে পড়েন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তিনি কমান্ড করছিলেন। তাঁর সহযোদ্ধারা তাঁকে নিরাপদ পজিশন নিতে বলেও লাভ হয় নি। হঠাৎই মেশিন গানের গুলি এসে ঢোকে তাঁর মাথায়। মর্টারের গোলাও এসে পড়ে পাশে।

লুটিয়ে পড়েন এই ‘বীরউত্তম’…স্বপ্নের স্বাধীনতার সোনালি রোদের স্পর্শ তাঁর পাওয়া হলো না আর…

এক পর্যায়ে সেখানে আগ্নেয়াস্ত্রের পরিবর্তে হাতাহাতি আর বেয়নেট দিয়ে যুদ্ধ হয় বাংকারের ভেতরে।

সালাউদ্দিন মমতাজ নিহত হওয়ার খবর জানতে পেরে মেজর মইন ওয়ারলেসে ক্যাপ্টেন মাহবুবকে কমান্ড করেন পেছন থেকে আক্রমণের জন্য। কিন্তু ক্যাপ্টেন মাহবুবের সাড়া না পেয়ে তিনি ঝোপঝাড় গাছের আড়াল থেকে খোলা জায়গায় চলে আসেন যাতে ওয়ারলেস ভালোভাবে কাজ করতে পারে। দুর্ভাগ্য সাথে সাথেই এক ঝাঁক মেশিনগানের গুলি এসে তাঁর ওয়ারলেস অপারেটর শহীদ হন। এ সময় তাঁর ওয়ারলেস সেটটিও অকেজো হয়ে যায়। মেজর মইন হতভম্ব হয়ে এসময় চিৎকার করে নির্দেশ দিতে থাকেন। খুব দ্রুত ভোরের আলো ফুটে ওঠে। এ সময় তাঁরা দেখতে পান চারদিকে হতাহতের ছড়াছড়ি। ক্যাপটেন হাফিজ আহত হয়ে মাটিতে পড়ে আছেন। লে. মান্নানও আহত হয়েছিলেন। জিয়া এ সময় উদ্ধারকাজে যোগ দেন। গোলাগুলি চলা অবস্থাতেই জিয়া, মইন, লিয়াকতরা মিলে হাফিজ, মান্নান সহ অন্য আহত যোদ্ধাদের উদ্ধার করে পিছু হটেন।

অন্যদিকে ২টি ১২০ মি. মি. মর্টার আর বেশ কিছু সেনা সহ বকশীগঞ্জ থেকে কামালপুরের দিকে আসতে থাকা ৩টি লরি উড়ে যায় কাট অফ পার্টির পুঁতে রাখা মাইনে। তাদের অ্যামবুশে ১০ জন পাকিসেনা নিহত এবং ১০-১১ জন আহত হয়। ১ মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন, ২-৩ জন আহত হন।

এ যুদ্ধে মোট ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন আর আহত হন ৫৭ জন যা মোটামুটি ১ম বেঙ্গলের এক দশমাংশ।

কামালপুরের সেই যুদ্ধ ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের জন্য ছিলো নাইটমেয়ার।

তারা ধারণাই করতে পারে নি যে নাতিদীর্ঘ প্রশিক্ষিত যোদ্ধাদেরকে নিয়ে জেড ফোর্স এত শক্ত কামড় দিতে পারে।

ক্যাপ্টেন হাফিজউদ্দিন আহমেদ স্বাধীনতার দলিল পত্রের ১০ম খন্ডে জানিয়েছেন কমপক্ষে ৫০ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছিল সে যুদ্ধে।

শাফায়াত এবং মইন দু’জনেই বলেছেন –
টানা ৩ দিন পাকিস্তান আর্মির হেলিকপ্টার ঢাকা থেকে কামালপুর আসা যাওয়া করেছে কেবল পাকিস্তান আর্মির লাশ আর আহতদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য।
যুদ্ধের পর জেনারেল মানেকশ হেলিকপ্টারে করে জেড ফোর্স হেড কোয়ার্টারে আসেন আর উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলেন:

“জেড ফোর্স শোড আপ রিয়াল টাইগার ক্যারেক্টার!”
এমনকি এটাও বলেন যে তার ধারণাতেও ছিল না যে জেড ফোর্স এমন অপারেশনের সাহস রাখে।

শহীদ সালাউদ্দিন মমতাজ স্মরণে কামালপুরে স্বাধীনতা সৌধ।
৩১ বালুচ রেজিমেন্টকে এমন একটি সর্বো”চ দুঃস্বপ্ন উপহার দেয়ার পরও এ যুদ্ধে হেরে যাওয়ার কারণ মূলত ৪টি:

[১]

২৮ জুলাই সন্ধ্যায় রেকি করার সময় ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ, লে. মান্নান, সুবেদার আবদুল হাই, সুবেদার হাশেম, নায়েক শফি ভুলে কামালপুর বিওপির অবজার্ভেশন পোস্টে ঢুকে পড়েন এবং ২ জন পাকিস্তানি সেনার সামনে পড়ে যান। ২ জনকেই মেরে ফেললেও সেটাই বিপদ বাড়িয়ে দেয়। ৩১ বালুচ সতর্ক হয়ে যায়। এর জের ধরে ২৯ জুলাই স্বয়ং লে. জে. নিয়াজী কামালপুরে আসেন। বলাই বাহুল্য এর ফলে তারা সেনাসংখ্যা এবং গোলাবারুদ প্রচুর বাড়িয়েছিল যা যুদ্ধ চলাকালে মেজর মইন তীব্রভাবে টের পান।

[২]

ভারতীয় সেনাবাহিনী যে ওয়ারলেস সেটগুলো দিয়েছিলো জেড ফোর্সকে সেগুলো নিম্নমানের এবং ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে মেজর মইন জেনারেল মানেকশ’র কাছে অভিযোগ করেছিলেন। মেজর মইনের মতে ক্যাপ্টেন মাহবুবকে সময়মতো ওয়ারলেসে কমান্ড করতে পারলে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কম হতো এবং শত্রুপক্ষের ক্যাজুয়ালটি আরো বেশী হতো। অতি দরকারের সময় ওয়ারলেস কাজ না করা ছিল মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

[৩]

যুদ্ধের সেই সময়টায় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল এবং আগের কয়েকদিন বৃষ্টি হওয়ায় পাটক্ষেতে ১ ফুট পানি জমে গিয়েছিল। এ ধরনের যুদ্ধে ক্রলিং ও কুইক মুভের যে প্রয়োজন হয় তার বিপরীতে এই ব্যাপারটাকে ‘ক্রুশাল লুজিং ফ্যাক্টর’ হিসেবে বিবেচনা করেছেন মেজর মইন।

[৪]

কামালপুর যুদ্ধে ঘোর অন্ধকার আর মুষলধারে বৃষ্টির কারণে যুদ্ধ প্রায় মিনিট ৩০ দেরীতে শুরু হয়। কিন্তু এদিকে জেড ফোর্সের প্রিএইচ আওয়ার বোমাগুলোও বিস্ফোরিত হতে থাকে । ফলে নিজেদের বোমাতেও ১ম বেঙ্গল ধরাশায়ী হয়েছিলো সে রাতে।

কামালপুর যু্দ্ধের আহত-শ্রান্ত যোদ্ধাদের নিয়ে ফিরে আসেন জিয়া ও মইন। সেদিন ৩১ জুলাইতেই মেজর শাফায়াত জামিলকে জিয়া ৩য় বেঙ্গল সহ পাঠান জেড ফোর্সের ২য় অপারেশনে।

এটিই ছিল বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাটের যুদ্ধ…

১৯৭১, জুলাই ৩১, দুপুরবেলা যাত্রা শুরু করেন ৩য় বেঙ্গলের সৈন্যরা। বাম থেকে ৪র্থ কমান্ডার শাফায়াত জামিল, ৫ম লে. নুরুন্নবী, ৭ম সুবেদার হাফিজ এবং তাঁর পেছনে ক্যাপ্টেন আনোয়ার। লক্ষ্য বাহাদুরাবাদ ফেরীঘাট।

কামালপুরের শাহ কামাল (রাঃ)-এর মাজারের পাশ দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকেন শাফায়াত জামিল। এর পর ৩টি ছোট বড় নদী আর কাদাপানিতে হেঁটে প্রায় ২৫ মাইল পেরিয়ে সবুজপুরে পৌঁছান। সেখান থেকে ১২টি নৌকায় অপারেশন জোনে পৌঁছান।

ব্রহ্মপুত্র আর যমুনার সাথে যেখানে তিস্তা এসে মিশেছে তার বিপরীতে ব্রহ্মপুত্রের পূর্বপাড়ে বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট যেখান থেকে চিলমারি বন্দর, কুড়িগ্রাম, উত্তরাঞ্চল আর ব্রহ্মপুত্রের দুই পাড়ে মুক্তিযোদ্ধা ঘাঁটিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

১ আগস্ট ভোর রাত ৫টায় লে. নুরুন্নবির ডেল্টা কোম্পানি ১ম হিট করে। তাদের ব্যাকআপ দেয় লে. আনোয়ারের আলফা কোম্পানি। আক্রমণে ছিল মর্টার প্লাটুন আর স্বয়ং শাফায়াত জামিল তাঁর ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার নিয়ে অপারেশন ফ্রন্টে ছিলেন।

৩০ মিনিটের সেই যুদ্ধে ৩টি বার্জ, ২টি শান্টিং ইঞ্জিন ধ্বংস করা হয় আর ২টি বগিতে হেভি মেশিন গানের ব্রাশ ফায়ার করে বেশ কিছু পাকিসেনা হতাহত করা হয়। এর ফলে বাহাদুরাবাদ ঘাট ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয় আর উত্তরাঞ্চলের সাথে বাহাদুরাবাদ রেলরুট বন্ধ হয়ে যায়।

এই অপারেশনে জেতার পর ৩য় বেঙ্গল দেওয়ানগঞ্জ স্টেশন এবং সুগারমিল রেস্ট হাউজের পাকিস্তানি ঘাঁটিতে আক্রমণ করে সফল হন। পুরো অভিযানে সবুজপুরের মানুষ শাফায়াত জামিলের বাহিনীকে আপনজনের মতো আতিথেয়তা দেয়। এর জের ধরে পরবর্তী সময়ে সবুজপুর গ্রামটিকে পাকি বাহিনী প্রতিশোধ স্পৃহায় জ্বালিয়ে ছাই করে দেয়, রক্তাক্ত ম্যাসাকার চালায়।

এরই মাঝে জেড ফোর্সের ৩য় অপারেশনে জিয়া আবার নিজে আবার সম্মুখ সমরে হাজির হন ৩ আগস্ট ভোর ৩টা ৪৫-এ। অপারেশনটির দায়িত্ব ছিল ৮ম বেঙ্গলের উপর।

সেটি নকশী বিওপির যুদ্ধ…

শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানার এ যুদ্ধে পাকিস্তানিদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। মুক্তিযোদ্ধারা ‘রান অ্যান্ড ক্রল’ করে বিওপির ৫০ গজের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের তীব্রতায় পাকিস্তানি সেনারা বিওপি ছেড়ে পাশের ক্ষেতে পালিয়েছিল। তারপরও এ যুদ্ধে হেরে যাওয়ার মূল কারণ পাকিবাহিনীর প্রচন্ড মর্টার আক্রমণ। তাদের পুঁতে রাখা মাইনও আরেকটি কারণ। সেদিন আক্রমণে ছিল ক্যাপ্টেন আমিন আহমেদের ব্রাভো কোম্পানি আর লে. মোদাসেরের ডেল্টা কোম্পানি। সুবেদার হাকিমের ইপিআর কোম্পানিটি ছিল কাট অফ পার্টি হিসেবে। ফায়ারিং কভার দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন ব্যাটালিয়ন কমান্ডার মেজর আমিনুল হক। আর বিওপির পাশে শালবনে ফরোয়ার্ড এরিয়া অ্যাসেম্বলী থেকে জিয়া ওয়ারলেস যোগাযোগের মাধ্যমে যুদ্ধ কোঅর্ডিনেট করছিলেন। সে যুদ্ধে মেশিনগানের গুলিতে ক্যাপ্টেন আমিন আহত হলে ব্রাভো কোম্পানি মনোবল হারায়। মোট ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা সে যুদ্ধে শহীদ হন। ক্যাপ্টেন আমিন আহমেদ আহত হয়ে মাটিতে পড়ে থাকলে মেজর আমিনুল হক ২ জন এসিও আর জেসিওকে সঙ্গে নিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন করে হেভি মেশিনগানের ফায়ারিং-এর ভেতর তাঁকে উদ্ধার করেন।

বাহাদুরাবাদ ঘাট আর দেওয়ানগঞ্জে যুদ্ধবিজয়ী ৩য় বেঙ্গল তেলঢালায় ফেরার পথে শাহ কামালের মাজারের পাশে একটি জিপ গাড়ির পাশে মেজর জিয়াকে দুঃশ্চিন্তিত দেখতে পায়। ফিরতে দেরী দেখে জিয়া ধারণা করেছিলেন ৩য় বেঙ্গল বাহাদুরাবাদ অপারেশনে হয়তো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে। কিন্তু সাফায়াত জামিল দেওয়ানগঞ্জ অপারেশনের কথা জানিয়ে জিয়াকে বলেন এখন দেশের ভেতরে থেকে যুদ্ধ চালানো কোনো ব্যাপারই না।

শুনে জিয়া হেসে ওঠেন, বলেন –

“তাহলে তো একবার সবাইকে নিয়ে ভেতরে ঢুকতেই হয়।”
এখানেই শুরু হয় জেড ফোর্স আর রৌমারির ইতিহাস…

রৌমারি হাইস্কুলের সামনে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন জেড ফোর্স অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ।
৬ই আগস্ট ৩য় বেঙ্গলের লে. নুরুন্নবির ডেল্টা কোম্পানিকে রৌমারি মুক্তাঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়। এর আগে পাকিস্তানী বাহিনী ৪ আগস্ট চর কোদাল কাটি নামক রৌমারির নিকটবর্তী স্থান দখল করে নেয়। বাহাদুরাবাদ এবং দেওয়ানগঞ্জ অপারেশনে দুঃসাহসিক সাফল্যের জন্যই ডেল্টা কোম্পানিকে রৌমারি ডিফেন্সের দায়িত্ব দেন জিয়া সাফায়াত জামিলের সুপারিশ ক্রমে।

৮ আগস্ট ফোর্স কমান্ডার জিয়ার নির্দেশে লে. নুরুন্নবি রৌমারির স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে নগর কমিটি তৈরি করেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ১ম বেসামরিক প্রশাসন চালু করেন।

১১ আগস্ট মেজর জিয়া ভারতীয় মেজর জেনারেল গুলবত সিং গিলকে সঙ্গে নিয়ে রৌমারি পরিদর্শনে আসেন তেলঢালা থেকে।

১৩ আগস্ট জিয়ার নির্দেশে লে. নুরুন্নবী রৌমারি হাইস্কুলে স্বাধীন বাংলাদেশের ১ম সেনানিবাস স্থাপন করেন। সেখানে সামরিক স্কুলও চালু করা হয় যেখান থেকে ১৮-২০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং নিয়েছে।

অপারেশনে যাওয়ার আগে জিয়া মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুতি তদারকি করছেন ।
সে সময় জিয়া আর শাফায়াত একসাথে ঘুরে বেড়াতেন রৌমারী মুক্তাঞ্চলের আনাচে কানাচে মাতৃভূমির স্বাদ নেয়ার জন্য। তাদের ভেতরে দাগ কেটেছিলো স্বাধিকার-স্বাধীনতাকামী এদেশের মানুষের সুকঠিন প্রতিরোধ সংকল্প, ‘মেরে মরবো’ যুদ্ধ ক্ষুধা।

তেমনই দু’টো ঘটনা শাফায়াত জামিলের কাছ থেকে –

এই রৌমারি থেকেই জিয়ার নির্দেশে বকশীগঞ্জ, ছালিয়া পাড়া , কোদালকাটি যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। ১৮ আগস্ট কোদালকাটি যুদ্ধে ৩৫০ জন পাকসেনা নিহত হয়। যুদ্ধে ব্যাপকভাবে মার খেয়ে পাকিস্তানি আর্মি কোদালকাটির দখল ছেড়ে চিলমারীতে পালিয়ে যায়।

চিলমারী , সেপ্টেম্বর ১৯৭১ , মেজর জিয়া , মেজর সাফায়াত জামিল , লে: নুরুন্নবী ।
কোদালকাটির সেই সম্মুখ সমরে জিয়া নিজে উপস্থিত ছিলেন।

রৌমারী , সেপ্টেম্বর , ১৯৭১, দেওয়ানগঞ্জে একটি পাকিস্তানী ঘাঁটিতে সফল অপারেশনের পর মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে আসছে।
এ সময় জেড ফোর্সের মুক্তিযুদ্ধের উপর মার্কিন এনবিসি চ্যানেলের একটি দল রবার্ট রজার্সে নেতৃত্বে সারা বিশ্বে সাড়াজাগানো দু’টি প্রতিবেদন তৈরি করে – A Country Made for Disaster এবং Dateline Bangladesh।

ইউটিউবে মেজর জিয়ার একটি মুক্তিয্দ্ধু চলাকালীন ইংরেজি সাক্ষাৎকার বহুল প্রচারিত। এটি সম্ভবত রবার্ট রজার্স জিয়ার যে সাক্ষাৎকার রৌমারিতে নিয়েছিলেন তারই খন্ডাংশ।

নুরুন্নবি সেখানে কাস্টমস অফিস, থানা, স্কুল এবং পোস্ট অফিসের কাজ শুরু করেছিলেন। ১০ শয্যার ১টি হাসপাতালও চালু করেছিলেন।

চমকপ্রদ এই যে যুদ্ধ চলাকালেই জিয়া রৌমারী থেকে ১ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তহবিলে জমা দিয়েছিলেন।

২১ আগস্ট জিয়া ক্যাপটেন অলি আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় রৌমারি আসেন এবং দিনক্ষণ আলোচনা করেন কখন স্বাধীন বাংলাদেশের ১ম বেসামরিক প্রশাসন উদ্বোধন করা যায়।

২৮ আগস্ট সকাল ৮টায় মেজর জিয়াউর রহমান মুক্ত বাংলাদেশের ১ম পোস্ট অফিস উদ্বোধন করেন।

একে একে জিয়া থানা সদর, হাসপাতাল, স্কুল, আদালত, রাজস্ব ও অন্যান্য অফিস উদ্বোধন করেন।

সেদিন মেজর জিয়া সেখানে হাজার হাজার জনতার উদ্দেশ্য ভাষণে বলেন –

“রৌমারির প্রতিটি নারী-পুরুষ আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে…”
জবাবে সমবেত জনতা গর্বভরা গর্জন আওয়াজে জিয়াকে অভিনন্দিত করেন –

“জয় বাংলা, জয় জিয়া, জয় মুক্তিবাহিনী”
আর এভাবেই মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে কালুরঘাটের “আমি মেজর জিয়া বলছি” কিংবদন্তির পর আরো একবার ভাগ্যের বরমাল্য পেলেন মেজর জিয়াউর রহমান বীরউত্তম।

তথ্যসূত্র

১. মুক্তির জন্য যুদ্ধ: কর্নেল শাফায়াত জামিল বীরবিক্রম

২. এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: মে. জে. মইনুল হোসেন বীরবিক্রম

৩. উইটনেস টু সারেন্ডার: মেজর সিদ্দিক সালিক

৪. বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি: মুক্তিযুদ্ধে রৌমারি: অজয় রায়

৫. মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট

৬. মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধা: গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক ওয়েবসাইট

সংবাদপত্র সংযুক্তি

তোমাদের এই ঋণ শোধ হবেনা / দৈনিক প্রথম আলো

১. ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ বীরউত্তম-এর পরিবারের সাক্ষাৎকার

২. লে. আবদুল মান্নান বীরবিক্রম-এর সাক্ষাৎকার

৩. আবদুল হক বীরপ্রতীক-এর সাক্ষাৎকার

৪. জালাল আহমেদ বীরপ্রতীক-এর পরিবারের সাক্ষাৎকার

৫. এম এ মান্নান বীরবিক্রম-এর সাক্ষাৎকার

৬. শামসুজ্জামান বীরউত্তম-এর পরিবারের সাক্ষাৎকার

১-৩: কামালপুর বিওপির যোদ্ধা

৪-৬: নকশী বিওপির যোদ্ধা

দৈনিক সমকাল / লে. ক. নুরুন্নবী খান বীরবিক্রমের সাক্ষাৎকার

দৈনিক ভোরের কাগজ / ডিসেম্বর ৪, ২০০৯

দৈনিক আমার দেশ / ডিসেম্বর ১৫, ২০০৯

দৈনিক ইত্তেফাক / মার্চ ২৬, ২০১১

লেখক প্রকৌশলী এবং ব্লগার। ক্যালিফোর্নিয়া, ইউএস

 

You Might Also Like