মিরপুরে নিহত তিন তরুণের দেহে ৫৪ গুলি

রাজধানীর মিরপুর কাজীপাড়ায় রবিবার রাতে তিন তরুণ নিহত হন। পুলিশের দাবি, নাশকতাকারী সন্দেহে গণপিটুনিতে তারা নিহত হন।

তবে পুলিশেরই করা লাশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নিহত তিন তরুণের দেহে মোট ৫৪টি গুলির চিহ্ন রয়েছে। পিটুনির কোনো চিহ্ন নেই। স্থানীয়রাও বলছেন, ওইরাতে কাজীপাড়ায় গণপিটুনির কোনো ঘটনা ঘটেনি।

পুলিশ নিহত তিন তরুণকে ‘নাশকতাকারী’ দাবি করলেও মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি।

জানা গেছে, রবিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে তিন তরুণের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় মিরপুর থানার পুলিশ। ওই তিনজনের বয়স ২০ থেকে ২২ বছর। কাজীপাড়ার বাইশবাড়ী এলাকায় রবিবার রাত পৌনে ১০টা থেকে ১০টার মধ্যে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ সূত্র জানায়, ময়নাতদন্তে তাদের শরীরে মারধরের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সুরতহাল প্রতিবেদনে মিরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ পারভেজ উল্লেখ করেন, তিনজনের মধ্যে একজনের দেহে ২২টি, একজনের দেহে ১৭টি এবং অপরজনের দেহে ১৫টি গুলির ক্ষত (মোট ৫৪টি) রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী বলেও সুরতহালে উল্লেখ করা হয়।

সুরতহাল প্রতিবেদনে ‘প্রাথমিক তদন্তের’ বরাত দিয়ে বলা হয়, নিহত তিনজন কয়েকজন সহযোগীসহ কাজীপাড়ার কৃষিবিদ ভবনের সামনে ককটেল, পেট্রোল, পেট্রলবোমাসহ নাশকতার জন্য অবস্থান করলে জনতা তাদের ধাওয়া দেয়। বাইশবাড়ী এলাকায় তাদের ধরে ফেলে পিটুনি দেয় ও গুলি করে গুরুতর জখম করে, যার কারণে তাদের মৃত্যু হয়।

তবে মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহউদ্দীন খান বলেন, শেওড়াপাড়া এলাকা (কাফরুল থানার মধ্যে পড়েছে) থেকে ওই তিনজনকে তিনটি ককটেল, চার লিটার পেট্রোলসহ ধরে জনতা। এরপর তাদের মিরপুর থানাধীন বাইশবাড়ী এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের পিটিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে।

কারা গুলি করল জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেকের কাছেই লাইসেন্স করা অস্ত্র রয়েছে। মানুষকে অস্ত্র দেওয়া হয়েছে নিজের ও অন্যের জানমাল রক্ষার জন্য। এখন সেই অস্ত্র নাশকতার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে। এটা আসলে নাশকতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে জনরোষের প্রচণ্ড বহিঃপ্রকাশ।

ওসি জানান, পুলিশ গতকাল পর্যন্ত গুলিবর্ষণকারীকে সনাক্ত করতে পারেনি। নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় জানা গিয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওরা পেশাদার নাশকতা সৃষ্টিকারী। যারা প্রথমে তাদের ধরেছে, তারা বলেছে, ওই নাশকতাকারীরা মনিপুর স্কুলের একটি শাখা পুড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। তাদের নাম-পরিচয় সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য আসছে। এগুলোর কোনোটিরই সত্যতা মেলেনি।

পুলিশ জানিয়েছে, এই তিনজনের নাম জুয়েল, সুমন ও রবিন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে বিস্তারিত পরিচয় মেলেনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাইশবাড়ী গলিতে জনতার ধোলাই ও গুলিতে তিন বোমাবাজ নিহত হয়েছে। এ ব্যাপারে মিরপুর মডেল থানায় মামলা হয়েছে।

কাজীপাড়ার বাইশবাড়ী সড়কের গলি ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, আবর্জনার মধ্যে ছড়ানো-ছিটানো কিছু গুলির খোসা। পাশে রক্তমাখা এক ছড়ি নাইলনের দড়ি, জমাট কালচে রক্ত।

এলাকাবাসী জানান, আরো কিছু গুলির খোসা ছোট ছেলেমেয়েরা কুড়িয়ে নিয়ে গেছে। সাধারণত গণপিটুনির ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলে এর শিকারদের কাপড়-চোপড়, স্যান্ডেল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে। পড়ে থাকে লাঠি বা গণপিটুনিতে ব্যবহৃত উপকরণও। তবে এই ঘটনাস্থলে গুলির খোসা, দড়ি ছাড়া সে রকম কিছু ছিল না।

ঘটনাস্থলের আশপাশের লোকজন জানিয়েছেন, রবিবার রাতে এখানে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেনি। রাত পৌনে ১০টার দিকে অপরিচিত ১০-১২ জন লোক ওই তিন তরুণকে বেঁধে অন্ধকার গলিতে ঢোকে। কিছুক্ষণ পর গলি থেকে একসঙ্গে প্রচুর গুলির শব্দ আসে। প্রায় এক ঘণ্টা পর লোকগুলো তিন তরুণের লাশ ফেলে চলে যায়। পরে গভীর রাতে পোশাকধারী পুলিশ এসে গাড়িতে করে লাশগুলো নিয়ে যায়।

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, গণপিটুনি হলে তারা লোকজনের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতেন। কিন্তু শুনেছেন কেবল গুলির শব্দ।

রাত দেড়টার দিকে ঢাকা মেডিকেলে লাশগুলো নিয়ে যান এসআই মাসুদ পারভেজ। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রোগীনিবন্ধন ও মৃত্যুনিবন্ধন খাতায় এই তিনজনকে অজ্ঞাতনামা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাদের মৃত্যুর কোনো কারণ না লিখেই মৃত ঘোষণা করেছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক। তবে মৃত্যুনিবন্ধন খাতায় আর সব মৃত্যুর কারণ উল্লেখ রয়েছে।

ওই রাতে মিরপুর এলাকাতেই পুলিশের সঙ্গে তাদের ভাষ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন আবদুল ওদুদ ব্যাপারী (২৬)। তবে নিহতের স্বজনদের দাবি, ওদুদ রাজনীতি করতেন না। পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে।

নিহত আবদুল ওদুদ ঝুট ব্যবসায়ী বলে তার পরিবার দাবি করেছে। সোমবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে লাশ সনাক্ত করার পর তার বাবা আবদুল আলী ব্যাপারী সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, পুলিশ ওদুদকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছে।

তিনি বলেন, রবিবার সকালে মোটরসাইকেলে করে টোলারবাগের বাসা থেকে মিরপুর ১০ নম্বরের সি ব্লকের দোকানে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন ওদুদ। মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। কোথাও খুঁজে না পেয়ে বেলা তিনটার দিকে তিনি মিরপুর থানায় যান। গিয়ে দেখেন, ওদুদের হিরো সিবিজেড মোটরসাইকেল থানার প্রাঙ্গণে।

তিনি ওদুদের খোঁজ করলে জানানো হয়, এই নামে কাউকে আটক করা হয়নি। ভোরে টিভির খবরে ছেলের মৃত্যুর খবর জানেন। আবদুল আলী বলেন, ‘আমার ছেলে তো রাজনীতি করে না। আমরা আওয়ামী লীগের সমর্থক। ওর নামে তো কোথাও জিডিও নাই। তার পরও আমার ছেলেরে ধইরা মাইরা ফেলল। কেন মারল, এটা আমি আপনাদের (সাংবাদিক) মাধ্যমে জানতে চাই।’

তবে পুলিশ বলছে, ওদুদ ১০ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের আহ্বায়ক ছিলেন। মিরপুর থানার ওসি সালাহউদ্দীন খানের দাবি, রবিবার সকাল ১০টার দিকে ওদুদকে আটক করা হয়। এরপর তাকে নিয়ে সহযোগীদের ধরতে দিনভর অভিযান চালানো হয়।

রাত দেড়টার দিকে টেকনিক্যাল মোড়সংলগ্ন হাউজিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সামনের পদচারী সেতুর নিচে তাকে নিয়ে অভিযানে যায় পুলিশ। এ সময় তার সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি-ককটেল ছোড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এতে সহযোগী সন্ত্রাসীদের গুলিতেই ওদুদ নিহত হন। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় হত্যা মামলা করা হয়েছে।

ওদুদের চাচা চান মিয়া ব্যাপারী জানান, দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে ওদুদ ছোট। তারা পারিবারিকভাবে ব্যবসায়ী। ওদুদ কখনো রাজনীতি করেননি। বিএনপি করলে তো তিনি আর এই পরিস্থিতিতে বাড়িতে থাকতেন না।

সোমবার সকালে ঝিনাইদহেও গুলিবিদ্ধ দুই বিএনপি কর্মীর লাশ পাওয়া যায়। পরিবারের দাবি, গ্রেপ্তারের পর ডিবি পুলিশ তাদের গুলি করে হত্যা করেছে। তবে ডিবি তা অস্বীকার করেছে।

You Might Also Like