মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিশংসিত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিশংসনের প্রস্তাব কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাস হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কংগ্রেসের কাজে বাধা সৃষ্টির অভিযোগে দেশের ইতিহাসে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিশংসিত হলেন ট্রাম্প। তবে এর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে এখনই বিদায় নিতে হচ্ছে না তাঁকে। তিনি এই পদে থাকতে পারবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত হবে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে। রিপাবলিকান পার্টি নিয়ন্ত্রিত সিনেট তাদের দলীয় ট্রাম্পকে এ যাত্রায় খাদ থেকে টেনে তুলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

 

এই বিশ্বাস থেকেই গত বুধবারের হাউসের ভোটাভুটি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ট্রাম্প। মিশিগানে এক নির্বাচনী প্রচারের সভায় তিনি এই অভিশংসনপ্রক্রিয়াকে বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির ‘রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে জানান, অভিশংসিত হয়েছেন এমন কোনো বোধ তাঁর মধ্যে কাজ করছে না।

 

ট্রাম্পকে জানুয়ারি মাসে সিনেটে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। শুনানি শেষে অপসারণের পক্ষে দু-তৃতীয়াংশ ভোট পড়লে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়তে হবে তাঁকে। তবে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেটে সেই আশঙ্কা নেই বললেই চলে। ট্রাম্পের আগে প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসন ও বিল ক্লিনটন হাউসে অভিশংসিত হয়েছিলেন। তবে কাউকেই সিনেট পদচ্যুত করেনি। সূত্র : সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স, গার্ডিয়ান

 

হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে গত বুধবার স্থানীয় সময় সকালে অভিশংসন প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। ডেমোক্র্যাট স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি প্রস্তাবটি তোলার সময় বলেন, ‘শত শত বছর ধরে আমেরিকানরা গণতন্ত্র রক্ষার জন্য লড়াই করেছে, প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রজাতন্ত্রের দর্শন আজ হোয়াইট হাউসের কর্মকাণ্ডে হুমকির মুখে পড়েছে। আমরা যদি এখনই উদ্যোগী না হই, তাহলে তা হবে দায়িত্ব এড়ানো। প্রেসিডেন্টের দায়িত্বহীন আচরণ আজ অভিশংসনকে জরুরি করে তুলেছে, এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। তিনি আমাদের জন্য অন্য কোনো সুযোগ রাখেননি।’

 

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল দুটি—প্রেসিডেন্ট তাঁর ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। এবং দ্বিতীয়টি অভিশংসনের তদন্তে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করে প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের কাজে বাধা সৃষ্টি করেছেন। এ দুই অভিযোগ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মোট ১০ ঘণ্টা বিতর্ক চলে। স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১০টায় ওই দুই অভিযোগের ভিত্তিতে ট্রাম্পকে অভিশংসন করা হবে কি না, সেই প্রশ্নে শুরু হয় ভোটাভুটি।

 

দুটি অভিযোগেই ট্রাম্পকে অভিশংসনের প্রস্তাব হাউসে পাস হয় মূলত দলীয় মতামতের ভিত্তিতে। ডেমোক্র্যাটদের প্রায় সবাই অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরা ভোট দেন বিপক্ষে। প্রথম অভিযোগ ২৩০-১৯৭ ভোটে এবং দ্বিতীয় অভিযোগ ২২৯-১৯৮ ভোটে অনুমোদন করে প্রতিনিধি পরিষদ।

 

প্রসঙ্গত, ৪৩৫ আসনের হাউসে ডেমোক্রেটিক পার্টির আসনসংখ্যা ২৩০ এবং রিপাবলিকানদের ১৯৭। রিপাবলিকান পার্টির সবাই এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির তিনজন প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেন।

 

ভোটাভুটির আগে বিতর্কে অংশ নেন দুই দলের সদস্যরা। এ সময় প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির নাতি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রতিনিধি জো কেনেডি বক্তব্য দিতে দাঁড়িয়ে সরাসরি নিজের সন্তানদের নাম ধরে তাঁদের উদ্দেশে ব্যাখ্যা করেন, কেন তিনি ইমপিচমেন্টের পক্ষে। তিনি বলেন, ‘প্রিয় এলি ও জেমস : এটা এমন এক মুহূর্ত, যার কথা তোমরা পরে ইতিহাসের বইতে পড়বে।’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নিজের ক্ষমতাকে নিজের জনগণের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ আনেন ম্যাসাচুসেটসের এই কংগ্রেস সদস্য।

 

অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা ব্যারি লাউডারমিল্ক এই অভিশংসনপ্রক্রিয়াকে তুলনা করেন যিশুখ্রিস্টকে ক্রুসিফিকেশনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ক্রুসে বিদ্ধ করার আগে যিশুকেও ট্রাম্পের চেয়ে বেশি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।’

 

গত বুধবার ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত হাউস যখন ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে ভোট দিচ্ছে, তখন ট্রাম্প মিশিগানে একটি নির্বচনী প্রচার সমাবেশে ছিলেন। কয়েক সপ্তাহ আগে এই সমাবেশের সূচি ঠিক করা হয়েছিল, আর হাউসে ভোটের দিনই সমাবেশটি হয়। কয়েক হাজার উত্ফুল্ল সমর্থকের সামনে ভাষণ দেওয়ার জন্য মঞ্চে ওঠার আগে ট্রাম্প হাউসে ভোট শুরু হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। ভোট শুরু হওয়ার পর তিনি মঞ্চে ওঠেন। এতে নাটকীয়ভাবে টেলিভিশনের স্ক্রিন ভাগ করে একদিকে হাউসের ভোট এবং অন্যদিকে ট্রাম্পের ভাষণ দেখানো শুরু হয়।

 

হাউস যখন তাঁকে অভিশংসন করার পক্ষে ভোট দেয়, তখনই সমাবেশে উপস্থিত সমর্থকদের উদ্দেশে ট্রাম্প বলেন, ‘এই স্বেচ্ছাচারী, দলীয় আনুগত্যের অভিশংসন ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য রাজনৈতিকভাবে আত্মহত্যার শামিল।’ হাউসে স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ও ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের ‘চিরকালের জন্য লজ্জার মধ্যে ফেলেছেন’ এবং আগামী বছর কোটি কোটি মানুষ হাউসে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ পাল্টে দেবে এবং ‘পেলোসির বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে তাকে দপ্তরছাড়া করবে’ বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘তাদেরই অভিশংসন করা দরকার, তাদের প্রত্যেককে।’ এ সময় সমর্থকরা ‘আরো চার বছর’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল।

 

অভিশংসনের ভোটটি পার্টি লাইন অনুসরণ করে হলেও এটি ইমেজসচেতন ট্রাম্পের ওপর ছায়া ফেলবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মোট ৪৫ জন প্রেসিডেন্টের মধ্যে মাত্র চারজনের একজন হয়ে উঠলেন, যাঁদের অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এই চারজনের মধ্যে একমাত্র রিচার্ড নিক্সন হাউসের অভিশংসন ভোটের আগেই পদত্যাগ করেছিলেন।

 

রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেট বিচারে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করবে না বলে ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেছেন সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান দলের নেতা মিচ ম্যাককনেল। সিনেটে উঠলেই অভিশংসনপ্রক্রিয়াটির ‘মৃত্যু’ হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এই মিত্র। ১০০ আসনের সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি। আর ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। সংবিধান অনুসারে, অভিশংসন নিশ্চিত করতে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হবে, যার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। অর্থাৎ হাউসে অভিশংসিত হলেও পদ ছাড়তে হচ্ছে না ট্রাম্পকে। আর কোনোভাবে সেই অঘটন যদি ঘটেই যায়, তাহলে দায়িত্ব নেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স।

 

ট্রাম্পের এবারের সংকট শুরু হয় গত জুলাইয়ে। ২৫ জুলাই ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ফোন করে ডেমোক্রেটিক প্রতিনিধি জো বাইডেনের ছেলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে তদন্ত করার জন্য চাপ দেন ট্রাম্প। বাইডেনের ছেলে একসময় ইউক্রেনে জ্বালানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তদন্ত শুরু না করলে ইউক্রেনের সামরিক সহয়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন তিনি। টোপ হিসেবে জেলেনস্কিকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানোর কথাও বলা হয়। পরের মাসে এক হুইসল ব্লোয়ার বিষয়টি ফাঁস করে দেন। তার পর থেকেই এ নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।

 

প্রথমে হাউসের গোয়েন্দা কমিটিতে তদন্ত চলে। পরে বিচার বিভাগীয় কমিটিতে। এই তদন্তের সব পর্যায়েই অসহযোগিতা করেছেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের কোনো কর্মকর্তাকে তিনি তদন্তে অংশ নিতে দেননি।

You Might Also Like