মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা কোথায় যাবো? কী খাবো?

শাম্মী আক্তার : তারা দেখতে কেমন? মানুষের মত নাকি এলিয়েনদের মত? তারা কি খাবার খায়? নাকি না খেয়েই থাকে? দেশে থাকে না আকাশে থাকে? এমন অসংখ্য প্রশ্ন এখন সবার মনে। তারা আসলে বিকৃত মস্তিষ্কের ভেজাল, দূষিত মানুষ!

আমরা খাদ্যে ভেজাল সৃষ্টিকারী এইসব ভেজাল, দূষিত মালিকদের ধিক্কার দিতে চাই। আমরা  স্লো পয়জন দিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ ধ্বংসকারী  এইসব খুনিদের সমূলে বিনাশ চাই।

চারদিকে শুধু ভেজাল আর ভেজাল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটা এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে যে এটাকে আর ‘ভেজাল খাদ্য’ বলে আখ্যায়িত করলে যথেষ্ট হবে না। দেহের প্রাণ খাদ্য, সেই খাদ্য ভেজাল, নষ্ট মানুষের হাতে পড়ে বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। একজন ভোক্তা হিসেবে বিষয়টা খুবই আতঙ্কের এবং শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি!

প্রতিকারের চেয়ে নিশ্চয়ই প্রতিরোধ উত্তম। কিন্তু বর্তমানে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে প্রতিকারই একমাত্র পন্থা হয়ে যাচ্ছে । প্রতিকার চলছে, চলবে। পাশাপাশি এই অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য কিছু প্রতিরোধের পথও অবলম্বন করতে হবে।

আমরা সুস্থ স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চাই। যেখানে সবার প্রকৃতি প্রদত্ত খাদ্য নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ থাকার কথা সেখানে সবাই ভেজাল, বিষাক্ত খাদ্যের দুষ্ট চক্রে পড়ে খাদ্যের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের পথ আসলে কী হতে পারে?

কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে শিশু অপুষ্টি অনেক বড় সমস্যা ছিল যাই হোক সেই অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু সাথে সাথে বিশেষভাবে শহরের শিশুদের ক্ষেত্রে আর আরেকটা আপদ তৈরি হচ্ছে তা হচ্ছে অতি পুষ্টি বা স্থূলতা।  আগের দিনের শিশুরা বেশি বেশি খেলাধুলা করতো, লাফালাফি করতো। কিন্তু সেই অনুযায়ী তাদের ক্যালরি গ্রহণ হতো না। নেগেটিভ ক্যালরিক ব্যালেন্সে থাকতো। এখন চিত্র অনেকটা উল্টা হয়ে যাচ্ছে। নেগেটিভ থেকে আমরা পজিটিভ এর দিকে চলে যাচ্ছি। আগে যেখানে নেগেটিভ ক্যালরিক ব্যালান্স বেশি দেখা যেত এখন সেখানে পজেটিভ ক্যালরিক ব্যালান্স বেশি দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ শরীরের গঠন, ওজন ও দৈনন্দিন কার্যক্রম অনুযায়ী যে পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করা দরকার তার থেকে বেশি ক্যালরি শরীরে জমা হচ্ছে কিন্তু সেই অনুযায়ী ক্যালোরি খরচ হচ্ছে না কারণ দৈনন্দিন কার্যক্রম কম, খেলাধুলা কম, মুভমেন্ট কম। দিনে দিনে আমাদের ছেলেমেয়েরা ব্যাটারি-ফার্মড চিকেন এর মতো হয়ে যাচ্ছে।

আমরা সবাই সেভিংস করতে পছন্দ করি কিন্তু  ক্যালরি সেভিংস শরীরের জন্য ভালো না। যদি ব্যাগ (স্টমাক) ভর্তি করতেই হয় তাহলে আটা, চিনি জাতীয় প্রক্রিয়াজাত খাবার দিয়ে না ভরে ফলমূল-শাকসবজি দিয়ে ব্যাগ ভরানোই উত্তম। এতে করে ব্যাগ ভরবে কিন্তু সেটা ভারী হবে না, হালকা লাগবে, শরীরও ভালো থাকবে।

ইদানিং আসলে আমরা সবাই খুবই সময়ের দারিদ্রতায় ভুগছি। দেখা যাচ্ছে মানুষ যত আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হচ্ছে সময়ের দিক দিয়ে ততোই দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে! রেডিমেড জামা কাপড়ের মতো সবাই আমরা ঝটপট তাড়াহুড়া করে সুপার শপ থেকে, রেস্টুরেন্ট থেকে প্রক্রিয়াজাত খাবার কিনে নিজেরা খাচ্ছি, শিশুদের খাওয়াচ্ছি, অতিথিদের আপ্যায়ন করছি যা পরবর্তীতে বুমেরাং হয়ে যাচ্ছে আমাদের জন্য।

আমরা সন্তানদেরকে কোয়ালিটি টাইম দিতে পারছিনা। আমাদের কী করা উচিত? নিজে না পারি প্রয়োজনে কুক রেখে হলেও সন্তানদের বাসায় তৈরি খাবারের ব্যাপারে আমাদের উৎসাহিত করা প্রয়োজন। এতে করে সবাই ব্যালান্সড ডায়েট পাবে, রেস্টুরেন্টগুলোতে ভিড় কমবে,প্যাকেটজাত খাবার এর চাহিদা কমবে, শরীরে ক্ষতিকর কেমিক্যালসের আধিক্য কমবে, মানুষের অসুস্থতা কমবে, হেলথ স্প্যান অর্থাৎ সুস্থ থাকার সময়কাল বাড়বে। লাইফস্প্যান বাড়ার সাথে সাথে আসলে হেলথস্প্যান বাড়াটাও খুবই জরুরি। অসুস্থ থেকে ৮০/ ৯০ বছর বাঁচা আসলে কষ্টের। হেলথস্প্যান বাড়ানোর ব্যাপারে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।

খাবার খেয়ে আসলে স্বস্তি নাই। অবস্থা এমন হয়েছে ১০০ টাকার খাবার খেয়ে ১০০০ টাকা ডাক্তারকে  দিতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে দেশে ওষুধের উৎপাদন আরো বাড়ানো লাগবে। ইদানিং চিত্র তো ভয়াবহ! রেস্টুরেন্ট এবং হাসপাতাল অনেকটা সমানুপাতিক হারে বাড়ছে। মানুষ খাচ্ছে আর হাসপাতালে যাচ্ছে, ফার্মেসিতে যাচ্ছে। প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটজাত খাবারের উপর আমাদের নেশা কমাতে হবে। নাহলে এক সময় দেখা যাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে যেমন মহা বিপদ সংকেত দেওয়া হয় তেমনি আমাদের দেশে উৎপাদিত খাবারের বেলায়ও মহাবিপদ সংকেত চলে আসবে।

কী হচ্ছে এসব? এমন তো আমরা চাই না।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই) মাঝে মধ্যেই তাদের জনবল ঘাটতির বিষয়ে বলে থাকে। তারা নির্দিষ্ট সময় পর পর খাদ্য পণ্য টেস্ট এবং রিটেস্ট করাতে সক্ষম হয় না জনবলের অভাবে। আবার অনেক খাদ্যপণ্য বিএসটিআই এর তালিকাভুক্ত নাই। যা অবশ্যই প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানোর মাধ্যমে সম্পূর্ণ করা প্রয়োজন। কোন খাদ্যদ্রব্যই যেন বাদ না পড়ে।

বর্তমানে বিএসটিআইয়ের চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট এবং বরিশাল বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যক্রম আছে। যা কিনা সময়ের চাহিদা অনুযায়ী অপ্রতুল। প্রতিটি জেলা শহরে বিএসটিআই এর কার্যক্রম থাকা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সময়ের উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় এটা  সমাধান সহায়ক হতে পারে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কতৃপক্ষের কার্যক্রম প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। শুধু রাজধানী বা শহর কেন্দ্রিক মানসিকতা পরিবর্তন করা দরকার।

মানসম্মত খাবার উৎপাদনের জন্য ফুড ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফুড টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। উপযুক্ত জায়গায় উপযুক্ত দক্ষ মানুষের কোনও বিকল্প নাই। ইন্ডাস্ট্রিগুলোতে লোয়ার লেভেল থেকে টপ লেভেল পর্যন্ত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন স্ট্যান্ডার্ড করা প্রয়োজন যাতে করে তাদের নৈতিক অবক্ষয় না হয়।

আইএসও সার্টিফাইড ফুড ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে হাইলাইট করা যেতে পারে। গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস অর্থাৎ জিএমপি, গুড ল্যাবরেটরি প্র্যাকটিস অর্থাৎ জিএলপি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। গুণগত মান বাড়ানোর মাধ্যমে আইএসও সার্টিফিকেশনের ব্যাপারে ফুড ইন্ডাস্ট্রিগুলোকে তৎপর হতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটা ফুড ইন্ডাস্ট্রিতে ইথিকস পলিসি থাকা এখন সময়ের দাবি।

আমাদের দেশে এমন অনেক ফুড ইন্ডাস্ট্রি আছে যেগুলো বিদেশে খাদ্য দ্রব্য রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। দেশে এখন ভেজাল, বিষাক্ত খাবারের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে তা কিন্তু আর বাংলাদেশের সীমাবদ্ধ থাকছে না মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাচ্ছে যা পরবর্তীতে দেশের অর্থনীতিতে একটা ডমিনো ইফেক্ট ফেলবে।

আসলে সবাই আমরা স্বাস্থ্যের ব্যাপারে অনেক উদ্বিগ্ন।

আমার মনে হয় যদি কাঁচামালের মান উন্নত করা হয় সে ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্যের দাম আলটিমেটলি যদি একটু বেড়েও যায় তবু মনে হয় ভোক্তারা সেটা গ্রহণ করবে। কারণ এতে করে তো আর ভোক্তাদের ভেজাল মানহীন খাবার খেয়ে অর্থনৈতিক বোঝা বাড়াতে হবে না।

যেসব খাদ্য পণ্যের শেলফ লাইফ (যে সময় পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের মান অক্ষুণ্ণ থাকে) ৬ মাস হওয়া উচিত সে সব খাদ্যপণ্য যেন অতিমাত্রায় কেমিক্যাল বা প্রিজারভেটিভ দিয়ে ১ বছর লেভেলিং না করা হয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সৎ হওয়া প্রয়োজন।

মোদ্দা কথা হচ্ছে আসলে যদি মনের ভেজাল দূর না হয় তাহলে এই মানবসৃষ্ট খাদ্যের এই দুর্যোগ মোকাবেলা করা কষ্টসাধ্য হবে।

খাদ্য উৎপাদনকারী মালিক পক্ষদের নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায় থেকে  নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর “ভেজাল খাদ্য মুক্ত বাংলাদেশ চাই” শীর্ষক বিভিন্ন সম্মেলন করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, বিভিন্ন ধরনের শাস্তির পাশাপাশি আসলে স্বীকৃতিটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যেসব খাদ্য দ্রব্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সকল কোয়ালিটি প্যারামিটার সঠিকভাবে মিট করবে এবং যাদের খাবারের হেলথ ইম্প্যাক্ট ভালো (প্রয়োজনে সার্ভে করে এটা বের করতে হবে) তাদেরকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায় থেকে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহিত করতে হবে। এতে করে অন্যরাও উৎসাহিত হবে।

লোকাল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরকেও মোটিভেট করতে হবে। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর মতো আরও সংগঠনকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে হবে, তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি কাউন্সেলিং, মোটিভেশন এবং স্বীকৃতি প্রদানের কালচার গড়ে তুলতে হবে।

খাদ্যের এই দুর্যোগ মোকাবেলায় বিশেষভাবে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে খাদ্য ও পুষ্টি বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগ আছে সেই সব শিক্ষকদেরকে, ছাত্র-ছাত্রীদের কে সমস্ত জায়গায় স্বেচ্ছাসেবী কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সবাই যেন নির্ভেজাল সোনার বাংলা বিনির্মাণে মানুষকে সচেতন করে, সজাগ করে।

দেশে এখন সবচেয়ে বেশি যে সেক্টরে জনবল বাড়ানো দরকার তা হচ্ছে খাদ্য পরিদর্শন ,মান উন্নয়ন এবং নিশ্চিতকরণ। এজন্য প্রয়োজনে পদ সৃষ্টি করার মাধ্যমে পর্যাপ্ত  ফুড ইন্সপেক্টর সারাদেশব্যাপী সৈনিকের মতো ছড়িয়ে দিতে হবে। এ যুদ্ধে কোনওভাবেই হারা যাবে না। আমাদের জিততেই হবে।

ইতিমধ্যে আমরা বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে মাদকের বিরুদ্ধে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সফল হতে দেখেছি। তাই আমরা আশা রাখি আমাদের সুযোগ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবারও এই ভেজাল, বিষাক্ত খাদ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সফল হবেন।

নিরাপদ, ভেজাল, বিষাক্ত খাদ্য মুক্ত সোনার বাংলাদেশ চাই। আসুন সবাই বদলে যাই, বদলে দিই।

বিডি নিউজ ২৪.কম এর সৌজন্যে

You Might Also Like