মাঠে নামার আগেই মাশরাফিদের লড়াই

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের আগে ধর্মশালায় পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে থিতু হতেই লড়াই করতে হচ্ছে বাংলাদেশ দলকে।
ফাইনালের পরের দিন সকালেই উড়তে হয়েছে ভারতের উদ্দেশ্যে, এশিয়া কাপের উত্তাপের আঁচ তখনও হয়ত গায়ে লেগে ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের। আবহাওয়ার উত্তাপ তো ছিলই। চৈত্র আসার আগেই বাংলাদেশে মোটামুটি গরম পড়ে গেছে। কিন্তু সোমবার বিকেলে ধর্মশালায় বাংলাদেশ দলকে স্বাগত জানিয়েছে শীতল হাওয়া। বিমানবন্দর থেকে শহরে আসতে না আসতেই তুমুল শিলা বৃষ্টি। ভেজা বাতাস বয়ে এনেছে হাড়কাঁপানো শীত।
এমনিতে এ সময়ে এখানে দিনের তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশেই থাকে; একটু কমে রাতে। কিন্তু অসময়ের বৃষ্টি নিয়ে এসেছে প্রচণ্ড শীত। গত কয়েক দিন ধরেই হুটহাটই এভাবে বৃষ্টি নামছে, সঙ্গে শীত। স্থানীয়রা গরম কাপড় আলমারিতে তুলে রেখেও এখন আবার বের করে গায়ে চাপাচ্ছেন।
স্থানীয়দের জন্য এসব নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য তো আবহাওয়া দেশের একদম উল্টো! টিম হোটেলও পাহাড়ের ওপর। উঁচুতে ঠাণ্ডা আরও বেশি। মাঠে নামার আগেই লড়াই শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশ দলের।
এমনিতে ধর্মশালার হিমাচল ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (এইচপিসিএ) স্টেডিয়াম ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে নয়নাভিরাম স্টেডিয়ামগুলোর একটি। মাঠের এক পাশে উঁচু পাহাড়, হিমালয়ের শৃঙ্গ। বরফ ঢাকা পাহাড় চিকচিক করে রোদের ছোঁয়ায়, সৌন্দর্য্য-ছটায় ধাঁধিয়ে যায় চোখ। টিম হোটেল থেকে আরও ভালোভাবে উপভোগ করা যায় সেই সৌন্দর্য্য।
কিন্তু নানা বাস্তবতায় অপরূপ সৌন্দর্য্য স্রোতে অবগাহনের অবস্থায় নেই বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। বড় একটা কারণ ঠাণ্ডায় জবু-থবু অবস্থা। মাঠের সৌন্দর্য্যের কথা বলতেই অনুশীলনের ফাঁকে মাশরাফি নিজের মত মজা করে বললেন, “সুন্দর আর কীৃঠাণ্ডায় তো পাগল হয়ে গেলাম!”
আরেকটা সমস্যা উচ্চতা। সাড়ে ৪ হাজার ফুট উচ্চতায় এই স্টেডিয়াম। সাধারণ মানুষ বা দর্শক-পর্যটকদের হয়ত তেমন কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু অ্যাথলেটদের জন্য ভিন্ন, ছুটোছুটি করতে গেলে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা টের পাওয়া যায়। মঙ্গলবার সকালে অনুশীলনে এসেই আগে রানিং করেছে বাংলাদেশ দল। শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যাটা অনুভবও করেছে সবাই। এই উচ্চতার সঙ্গে স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাসে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগেই।
মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে শুরুর দিকেই মাশরাফি বললেন কন্ডিশনের এত সব চ্যালেঞ্জের কথা।
“ভারতের বেশিরভাগ জায়গা আমাদের মতোই; কিন্তু এই জায়গাটা নয়। এখানে কিছু পার্থক্য অনুভব করেছি। যেমন শ্বাস নিতে একটু সমস্যা হয়। মাঠে দৌড়েছি আমরা, শ্বাসের সমস্যাটা অনুভব করেছি। রাতে ঠাণ্ডা পড়ে, গত রাতে যেমন পড়েছিল। আমার মনে হয়, আমাদের মানিয়ে কিছুটা সময় লাগবে।
মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত অবশ্য আর বৃষ্টি হয়নি। শীতের তীব্রতা তাই ছিল না। তবে রাতে তাপমাত্রা অনেকটাই কমে যায়। বৃষ্টি হলে বাড়ে শীতের তীব্রতা। বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচটি স্থানীয় সময় দুপুর তিনটায়। তবে পরের দুটি ম্যাচই শুরু হবে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়, শেষ হতে হতে প্রায় মাঝরাত। এ সব ভাবাচ্ছে বাংলাদেশ অধিনায়ককে।
“আমাদের দুটি মাচ খেলতে হবে রাতে। রাতে এখানে অনেক বেশি শীত।”
মানসিক স্থিরতার ব্যাপারও আছে। এক দিন আগে পর্যন্তও এশিয়া কাপে ডুবে ছিল দল। পুরো মনোযোগ দিয়ে ক্রিকেটাররা সর্বোচ্চটা উজার করে দিয়েছে সেখানে। এশিয়া কাপের ফাইনাল গড়িয়েছে অনেক রাত অবধি। পরদিন সকালেই আবার চাপতে হয়েছে ভারতের বিমানে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে মাত্র এক দিনের অনুশীলন সেশন।
মাশরাফি অনুভব করছেন, ধর্মশালায় আরেকটু সময় পেলে ভালো হতো।
“এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলেছি। পর দিন সকালেই বিমানে উঠেছি। সন্ধ্যা ৬টায় এখানে হোটেলে এসেছি। খুব তাড়াহুড়ো হয়ে গেছে। আরেকটু সময় পেলে ভালো হতো। তবে বিকল্প তো ছিল না। আশা করি, আমরা যত দ্রুত সম্ভব মানিয়ে নিতে পারব।”
অস্বস্তি আছে আরেকটি ব্যাপার নিয়েও। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে ঘিরে উত্তেজনা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, প্রাদেশিক ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে রাজ্য সরকারের টানাপোড়েন, সব মিলিয়ে ধর্মশালা শহর এখন নিরাপত্তার জালে বন্দি। একটু পরপরই পুলিশ চেক পোস্ট, স্টেডিয়াম এলাকাসহ পুরো শহরেই গিজগিজ করছে পুলিশ। শান্ত, পাহাড়ি শহরটির মানুষ এ রকম যুদ্ধ পরিস্থিতির স্বাদ কখনও পায়নি।
ক্রিকেটারদেরও আছে নানা রকম বিধি-নিষেধ, সতর্কতা। এসব নিয়েও একটু অস্বস্তি, একটু মানসিক অস্থিরতা দলে।
এশিয়া কাপে নিজেদের সেরাটা উজার করে দেওয়ার পর একটু মানসিকভাবে থিতু হওয়ার সময়ও ছিল না। ২ দিন পরই নামতে হচ্ছে বিশ্বকাপে। একই একাগ্রতা, মনোযোগ আবার ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ আছে।
উইকেটে মাত্র একবারই চোখ বুলাতে পেরেছেন মাশরাফিরা। সেটি সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা নেওয়ার জো ছিল না টিম ম্যানেজমেন্টের। আর ম্যাচের আগে অনুশীলন সেশন পাওয়া গেল মাত্র একটিই। সেটি বাস্তবতার কারণেই। কিন্তু সামনে আসা চ্যালেঞ্জটাও বাস্তবতারই অংশ।
সব মিলিয়ে মনিসিক, শারীরিকভাবে থিতু হতে লড়ছে দল। মাশরাফির কণ্ঠে অবশ্য সব প্রতিকূলতা জয় করার প্রত্যয়।
“আমরা পেশাদার, সেই হিসেবে সব কিছুর সঙ্গেই মানিয়ে নিতে হবে। হ্যা, বলার চেয়ে কাজটা করা অনেক কঠিন। বিশেষ করে বাস্তবতা যখন এখানকার মতো এরকম। তারপরও মাঠে সেরাটা দিতে আমরা চেষ্টার কমতি রাখব না।”

You Might Also Like